📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 অবতরণিকা

📄 অবতরণিকা


الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي جَعَلَ جَنَّةَ الْفِرْدَوْسِ لِعِبَادِهِ الْمُؤْمِنِيْنَ، وَيَسَّرَهُمْ لِلْأَعْمَالِ الصَّالِحَةِ الْمُوْصِلَةِ إِلَيْهَا، فَلَمْ يَتَّخِذُوا سِوَاهَا شُغُلاً، وَسَهَّلَ طُرُقَهَا فَسَلَكُوا السَّبِيلَ الْمُوْصِلَةَ إِلَيْهَا ذُلُلاً، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى أَشْرَفِ الْأَنْبِيَاءِ وَالْمُرْسَلِينَ الَّذِي قَامَ مِنَ اللَّيْلِ حَتَّى تَفَطَّرَتْ قَدَمَاهُ.
সকল প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের জন্য, যিনি তাঁর মুমিন বান্দাদের জন্য জান্নাতুল ফিরদাওস প্রস্তুত করেছেন এবং জান্নাতের পাথেয়স্বরূপ তাদেরকে নেক আমলের তাওফিক দিয়েছেন; তাই তারা সর্বদা আমলে লিপ্ত থাকে। তিনি তাদের জন্য জান্নাতের পথকে সহজ ও সুগম করেছেন। সালাত ও সালাম নাজিল হোক সর্বশ্রেষ্ঠ নবি ও রাসুলের ওপর, যিনি রাতে এত দীর্ঘ সময় ধরে সালাত আদায় করতেন যে, তাঁর পা ফুলে যেত।
হামদ ও সালাতের পর...
সৎলোকদের সাহচর্য, নেককারদের সঙ্গে ওঠাবসা এবং পুণ্যবানদের জীবনচরিত অধ্যয়ন অন্তরে নেক আমলের প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে। বিপুল চেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমে তারা যে অবস্থানে পৌঁছেছেন তাদের জীবনকথা শুনে অন্যান্যরাও তাদের পথে চলার প্রেরণা পায়। আর মানুষের হৃদয়ও উপদেশ এবং উৎসাহের মুখাপেক্ষী— বিশেষ করে বর্তমান যুগে, যখন মানুষ দীর্ঘ আশার ধোঁকায় পড়ে তুচ্ছ দুনিয়ার পেছনে ছুটছে।
তাই পাঠকদের সামনে পেশ করতে যাচ্ছি ( أَيْنَ نَحْنُ مِنْ هَؤُلَاءِ ) ‘সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!’ সিরিজের তৃতীয় বই ( أُولَئِكَ الْأَخْيَار ) ‘আঁধার রাতে আলোর খোঁজে’। এতে কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে—যা আমাদের সালাফের আমলনামার একটি আলোকিত অধ্যায়।
আশা করি, এই বইয়ের মাধ্যমে আমাদের হৃদয় গাফিলতির মরণ ঘুম থেকে জেগে উঠবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল আমলে ইখলাস ও নিষ্ঠা দান করুন।
আব্দুল মালিক বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আল-কাসিম

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 কিয়ামুল লাইল

📄 কিয়ামুল লাইল


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ﴿أَمَّنْ هُوَ قَانِتُ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ﴾
'যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন প্রহরে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং আপন রবের রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না? বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না—তারা উভয়ে কি সমান হতে পারে? বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।'
তিনি আরও বলেন : ﴿إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ - آخِذِينَ مَا آتَاهُمْ رَبُّهُمْ إِنَّهُمْ كَانُوا قَبْلَ ذَلِكَ مُحْسِنِينَ - كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ - وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ﴾
'মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাত ও ঝরনাধারার মাঝে। তাদের রবের দেওয়া নিয়ামত উপভোগ করবে। কারণ পার্থিব জীবনে তারা নেককার ছিল। তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমিয়ে কাটাত। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।'
যে ব্যক্তি সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটায়, তার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন :
ذَاكَ رَجُلٌ بَالَ الشَّيْطَانُ فِي أُذُنَيْهِ، أَوْ قَالَ: فِي أُذُنِهِ»
'সে এমন ব্যক্তি, যার উভয় কানে শয়তান পেশাব করে দিয়েছে।' অথবা তিনি বলেছেন, 'তার কানে।'
আল্লাহ তাআলা কিয়ামুল লাইলের ফজিলত বর্ণনা করে বলেন:
إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا )
'নিশ্চয় ইবাদতের জন্য রাত্রি জাগরণ প্রবৃত্তি দলনে অধিক সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অধিক অনুকূল।'
ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'দিনের নামাজের চেয়ে রাতের নামাজে কিরাআত সুস্পষ্ট হয় এবং তার মর্ম অন্তরে বেশি বদ্ধমূল হয়; কারণ দিনের বেলা লোকের আনাগোনা এবং শোরগোল থাকে। তা ছাড়া দিন হলো জীবিকা নির্বাহের সময়।'
কিয়ামুল লাইল প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে মুজাহাদা ও সাধনা করার এক বড় মাধ্যম। নিরবচ্ছিন্ন ইবাদত, বিশেষ করে শান্ত ও নিরিবিলি সময়ের ইবাদত মানুষের নফস ও প্রবৃত্তির ওপর অসাধারণ প্রভাব ফেলে। তাই যারা কিয়ামুল লাইল আদায় করে, তারা খাঁটি মুমিন হওয়ার ব্যাপারে খোদ আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদেরকে বিশাল পুরস্কারের ওয়াদাও দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন:
إِنَّمَا يُؤْمِنُ بِآيَاتِنَا الَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِهَا خَرُّوا سُجَّدًا وَسَبِّحُوا بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ - تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ - فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ)
'কেবল তারাই আমার আয়াতসমূহের প্রতি ইমান আনে, যারা আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং অহংকারমুক্ত হয়ে তাদের রবের সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে। তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের রবকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে। কেউ জানে না তাদের জন্য কৃতকর্মের কী কী নয়ন- প্রীতিকর প্রতিদান লুক্কায়িত আছে।'
প্রিয় ভাই,
কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ এমন এক ইবাদত, যা কলবকে রবের সঙ্গে জুড়ে দেয়, দুনিয়ার ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা থেকে হিফাজত করে এবং কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। যে সময় সকল আওয়াজ থেমে যায়, চোখগুলো ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায়, নিদ্রার ঘোর আবেশে মানুষ পাশ পরিবর্তন করে ঘুমায়—সে সময় তাহাজ্জুদগুজার লোকেরা কোমল বিছানা ও আরামদায়ক শয্যা ত্যাগ করে রবের ইবাদতে দাঁড়িয়ে যায়। রাতের খুব অল্প সময়ই তারা ঘুমায়। তাই তো কিয়ামুল লাইলকে দৃঢ় সংকল্পের মানদণ্ড ও পরিশুদ্ধ আত্মার পরিচায়ক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আর আল্লাহ তাআলা তাহাজ্জুদগুজার লোকদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদেরকে অন্যদের চেয়ে আলাদা বলে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
﴿أَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ)
‘যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন প্রহরে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং আপন রবের রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না? বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না—তারা উভয়ে কি সমান হতে পারে? বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।

টিকাঃ
১. সুরা আজ-জুমার, ৩৯ : ৯।
২. সুরা আজ-জারিয়াত, ৫১: ১৫-১৮।
৩. সহিহুল বুখারি: ৩২৭০, সহিহু মুসলিম: ৭৭৪; আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর সূত্রে বর্ণিত।
৪. সুরা আল-মুজ্জাম্মিল, ৭৩: ৬।
৫. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/৪৩৬।
৬. এটি সিজদার আয়াত।
৭. সুরা আস-সাজদা, ৩২ : ১৫-১৭।

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 কিয়ামুল লাইল সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ

📄 কিয়ামুল লাইল সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ


কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। রাসুলুল্লাহ ﷺ কিয়ামুল লাইল আদায়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন :
عَلَيْكُمْ بِقِيَامِ اللَّيْلِ فَإِنَّهُ دَأَبُ الصَّالِحِينَ قَبْلَكُمْ، وَإِنَّ قِيَامَ اللَّيْلِ قُرْبَةٌ إِلَى اللهِ، وَمَنْهَاةً عَنِ الإِثْمِ، وَتَكْفِيرُ لِلسَّيِّئَاتِ، وَمَطْرَدَةُ لِلَّدَاءِ عَنِ الْجَسَدِ»
'তোমাদের জন্য তাহাজ্জুদ আদায় করা আবশ্যক। কারণ এটা তোমাদের পূর্ববর্তী নেককারদের অনুসৃত রীতি। তাহাজ্জুদ আল্লাহর নৈকট্যলাভ ও গুনাহ থেকে বাঁচার উপায়; মন্দ কাজের কাফফারা এবং শরীরের রোগ-প্রতিরোধক।
কিয়ামুল লাইলের ফজিলت বর্ণনা করতে গিয়ে অন্যত্র তিনি বলেন:
أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الصَّلَاةِ الْمَكْتُوبَةِ، الصَّلَاةُ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ»
'ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ সালাত হলো তাহাজ্জুদের সালাত।
রাসুলুল্লাহ কিয়ামুল লাইলের প্রতি খুব বেশি যত্নবান ছিলেন। ঘরে কিংবা সফরে কখনোই তিনি তাহাজ্জুদ ছাড়তেন না। তিনি গোটা মানবজাতির সর্দার-সকল আদম-সন্তানের নেতা। তাঁর পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে; তবুও তিনি এত বেশি কিয়ামুল লাইল করতেন যে, তাঁর পা মুবারক পর্যন্ত ফুলে যেত। তাঁকে বলা হলো, 'আপনার তো পূর্বাপর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে; তবুও আপনি এত কষ্ট করেন কেন? উত্তরে তিনি বলেন:
أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا
'আমি কি তবে কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?'
মহা পুরস্কার ও কল্যাণের সুসংবাদ দিয়ে রাসুলুল্লাহ কিয়ামুল লাইলের প্রতি উম্মাহকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
إِنَّ مِنَ اللَّيْلِ سَاعَةً، لَا يُوَافِقُهَا عَبْدُ مُسْلِمٌ، يَسْأَلُ اللَّهَ خَيْرًا، إِلَّا أَعْطَاهُ إِيَّاهُ»
'রাতে এমন একটি সময় রয়েছে, যদি কোনো মুসলিম বান্দা ওই সময়ে আল্লাহর কাছে কোনো কল্যাণ প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দান করবেন।
এটি আমাদের প্রতি আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ ও দয়া।
ইবাদতের এসব উর্বর মুহূর্ত ও রাতসমূহের ব্যাপারে উমর বিন জার বলেন, 'নিজেদের কল্যাণের জন্য রাত ও রাতের আমল করো—আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন—কারণ রাত ও দিনের কল্যাণ থেকে যে বঞ্চিত হয়েছে, সে ঠকেছে। রাত ও দিনকে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্য ইবাদতের মাধ্যম বানিয়েছেন আর গাফিলদের জন্য বিপদ—কারণ তারা ইবাদতের ব্যাপারে অবহেলা করে নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনে। সুতরাং জিকিরের মাধ্যমে নিজেদের কলবকে জীবন্ত রাখো। কারণ আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই কলব জীবিত থাকে। কিয়ামত দিবসে যখন ইবাদতকারীরা আল্লাহর বিশেষ মর্যাদা ও অনুগ্রহ লাভে ধন্য হবে, তখন অনেক ঘুমকাতুরে তাদের দীর্ঘ ঘুমের জন্য আফসোস করবে। সুতরাং জীবনকে মূল্য দাও। জীবনের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি রাত ও প্রতিটি দিনকে মূল্যায়ন করো। আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর রহম করুন।'
হে ভাই, আজই সওদা করে নাও। কেননা, আজ আমলের বাজার বসেছে। মালামাল সস্তা দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থও তোমার হাতে আছে। কিন্তু অচিরেই এই বাজার বন্ধ হয়ে যাবে— তখন তুমি চাইলেও আর কিছুই কিনতে পারবে না। ﴾ذَلِكَ يَوْمُ التَّغَابُنِ﴿ 'সেদিন হবে লাভ-লোকসানের দিন।' ﴾وَيَوْمَ يَعَضُ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ﴿ 'সেদিন জালিম অনুশোচনায় তার হাত কামড়াবে।'
আবু দারদা বলেন, 'কবরের অন্ধকার দূর করার জন্য রাতের অন্ধকারে দুই রাকআত সালাত পড়ো।'
আহমাদ বিন হারব ঘুমকাতুরেদের ঘুম এবং গাফিলদের গাফিলতির ব্যাপারে আশ্চর্য হয়ে বলেন, 'ওই ব্যক্তিকে দেখে আমি খুবই অবাক হই, যে জানে যে, তার ওপরে জান্নাত সজ্জিত এবং নিচে জাহান্নাম প্রজ্বলিত; তারপরও সে উভয়ের মাঝে কীভাবে ঘুমিয়ে থাকতে পারে?!'
তাই তুমি সালাফগণকে দেখবে, তারা রাতের ইবাদতের জন্য পূর্ব থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। রাতের আগমনে আনন্দিত হতেন এবং বিদায়ে ব্যথিত হতেন। উমর বিন জার যখন দেখতেন রাত ঘনিয়ে আসছে, তখন তিনি বলতেন, 'রাত এসেছে। নিশ্চয় রাত ভীতিকর, তবে ভয় যদি পেতে হয়, তবে আল্লাহকেই পাওয়া উচিত।'
তাদের হৃদয়ে আল্লাহর আজমত ও মর্যাদা ছিল, তাঁকে পাওয়ার আগ্রহ ছিল; এ জন্যই তারা এমন ছিলেন। তারাই সে জাতি, যাদের ব্যাপারে ফুজাইল বিন ইয়াজ বলেছেন, 'আমি এমন লোকদের পেয়েছি, যারা রাতের আঁধারে ঘুমিয়ে থাকতে আল্লাহকে লজ্জা পেতেন। তাদের কেউ এক পার্শ্বের ওপর ঘুমাতেন। যখনই পার্শ্ব পরিবর্তন করতেন, নিজেকে বলতেন, “এই আরামের ঘুম তোমার জন্য নয়। ওঠো, তোমার আখিরাতের অংশটি অর্জন করে নাও।”
আব্দুর রহমান বিন ইয়াজিদ বিন জাবির বলেন, 'আমরা আতা খুরাসানি -এর সাথে একটি লড়াইয়ে ছিলাম। আমাদের অবস্থান কাছাকাছি ছিল। তিনি রাত জেগে ইবাদত করতেন। তারপর তাঁবু থেকে মাথা বের করে বলতেন, “হে আব্দুর রহমান, হে হিশাম বিন গার, হে অমুক... রাতে নামাজ পড়া এবং দিনে রোজা রাখা অনেক সহজ জাহান্নামে পুঁজ পান, লোহার কাপড় পরিধান এবং জাক্কুম ভক্ষণের চেয়ে। সুতরাং সময় থাকতে জাহান্নাম থেকে নাজাত পাওয়ার সাধনা করো।”
প্রিয় ভাই আমার,
রাতের সফর সে-ই করতে পারে, যে ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে পারে। দ্রুতগামী উষ্ট্রী কাফেলার অগ্রভাগেই থাকে আর ভারবাহী উষ্ট্রী থাকে সবার শেষে।
لبست ثوب الرجا والناس قد رقدوا وقمت أشكو إلى مولاي ما أجد وقلت يا عدتي في كل نائبة ومن عليه لكشف الضر أعتمد أشكو إليك أمورًا أنت تعلمها ما لي على حملها صبر ولا جلد وقد مددت يدي بالضر مبتهلاً إليك يا خير من مدت إليه يد فلا تردنها يا رب خائبة فبحر جودك يروي كل من يرد
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে—আর আমি জেগে আছি একবুক আশা নিয়ে। হে মাওলা, মনের ব্যথাগুলো বলতেই আমি দাঁড়িয়েছি। সংকটে-দুর্যোগে আমার একমাত্র আশা হে আমার রব, বিপদ থেকে বাঁচতে আমি কার ওপর ভরসা করব? আমার দুঃখ-কষ্টগুলো আপনি জানেন, যেগুলো সহ্য করার শক্তি আমি হারিয়ে ফেলেছি। আমি দুহাত প্রসারিত করেছি আপনার দরবারে—অনুনয়-বিনয় করছি কায়মনোবাক্যে। আপনি তো প্রার্থনা মঞ্জুরকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। হে আমার রব, আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেবেন না। আপনার করুণার সাগর থেকে তো কেউ মাহরুম হয় না।'

টিকাঃ
৮. সুরা আজ-জুমার, ৩৯ : ৯।
৯. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫৪৯।
১০. সহিহু মুসলিম: ১১৬৩।
১১. সহিহুল বুখারি: ৪৮৩৬, সহিহু মুসলিম: ২৮১৯।
১২. সহিহু মুসলিম: ৭৫৭।
১৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/১০৯।
১৪. সুরা আত-তাগাবুন, ৬৪: ৯।
১৫. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ২৭।
১৬. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬৪ পৃ.।
১৭. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ২৬৪ পৃ.।
১৮. আল-ইহইয়া: ৪/৪৩৫।
১৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/১১১।
২০. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৪১।
২১. আস-সিয়ার: ৬/১৪৩।
২২. আল-ফাওয়ায়িদ : ৬৭ পৃ.।

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 রাত্রি জাগরণের সাধনা

📄 রাত্রি জাগরণের সাধনা


হাসান বলেন, 'রাত্রি জাগরণের সাধনা ও অর্থ-সম্পদ সদাকা করার চেয়ে কঠিন কোনো আমলের কথা আমার জানা নেই।'
তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তাহাজ্জুদগুজার লোকের চেহারা এত সুন্দর হয় কেন?' তিনি উত্তরে বলেন, 'তারা পরম করুণাময়ের সাথে একান্তে সময় কাটায়। তাই তিনি তাঁর নূরের একটি অংশ তাদের পরিয়ে দেন।'
কিয়ামুল লাইল বা রাত জেগে ইবাদত করা প্রথম প্রথম কষ্টকর হলেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখলে একসময় তা ভালোবাসা ও শখে পরিণত হয়। সাবিত বুনানি সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাতে ইবাদত করতেন এবং দিনে রোজা রাখতেন। তিনি বলতেন, ‘কিয়ামুল লাইলের মাধ্যমে আমি আমার অন্তরে যে স্বাদ পাই, সে স্বাদ আর কোনো কিছুতেই পাই না।’
আমাদের মতো রাত জেগে ইবাদতকারী লোকেরাও ঘুম, বিশ্রাম ও আরামকে পছন্দ করে। তবে পার্থক্য হলো, তারা অলসতার ধুলো ঝেড়ে ফেলে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করে। এমনই একজন হলেন আব্দুল আজিজ বিন রাওয়াদ। রাতের অন্ধকার যখন পৃথিবীকে ঢেকে নিত, তখন তিনি বিছানার ওপর হাত বুলিয়ে বলতেন, ‘নিঃসন্দেহে তুমি আরামদায়ক; কিন্তু আল্লাহর কসম, জান্নাত তোমার চেয়ে অনেক গুণ বেশি আরামদায়ক।’ এই বলে তিনি সারা রাত নামাজ পড়তেন।
রাত জেগে ইবাদতগুজার লোকেরা আমাদের মতো রাতে ঠিকই ঘুমায়; তবে তা রাতের শেষ প্রহরে ইবাদত করার বিশুদ্ধ নিয়তে। মুআবিয়া বিন কুররা -এর পিতা তার সন্তানদেরকে কিয়ামুল লাইল আদায় করার উপদেশ দিতেন। তারা যখন ইশার সালাত সম্পন্ন করত, তখন তিনি তাদের বলতেন, 'হে আমার ছেলেরা, ঘুমিয়ে পড়ো। হতে পারে এই রাতে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে (রাতের শেষাংশে ইবাদত করার মাধ্যমে) কল্যাণ অর্জনের তাওফিক দান করবেন।'
মুসলিমদের দিন-রাত এমন না হওয়া চাই—যেমনটি কবি বলেছেন:
نَهارُكَ يَا مَغْرُورُ سَهْوٌ وَغَفْلَةٌ وَلَيْلُكَ نَوْمُ الرَّدَى لَكَ لَازِمُ وَتَتْعَبُ فِيمَا سَوْفَ تَكْرَهُ غِبَّهُ كَذَلِكَ فِي الدُّنْيَا تَعِيشُ الْبَهَائِمُ
'হে প্রবঞ্চিত, তোমার দিন কাটে গাফিলতি ও উদাসীনতায়। রাত কাটে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। তোমার ধ্বংস তো অনিবার্য। তুমি এমন বিষয়ের পেছনে ঘাম ঝরাচ্ছ, অচিরেই যার পরিণাম তোমার মোটেই ভালো লাগবে না। পৃথিবীর বুকে তোমার এই জীবন তো চতুষ্পদ প্রাণীদের জীবনের মতো!'
সুতরাং হে ভাই, আখিরাতের সন্তান হও। দুনিয়ার সন্তান হোয়ো না। কারণ সন্তান তার মায়েরই অনুগামী হয়।
সুলাইমান তাইমি এমন স্তরে উপনীত হয়েছিলেন যে, তিনি ইশার সালাতের অজু দিয়ে ফজরের সালাত আদায় করতেন। আর হাসান -এর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলতেন, 'তিনি তন্দ্রাভাব অনুভব করলে অজু করতেন।'

টিকাঃ
২৩. তাবাকাতুশ শাফিয়িয়্যাহ : ৪/২৩৫।
২৪. আল-ইহইয়া: ১/২২০।
২৫. আল-ইহইয়া: ১/৪২০।
২৬. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬৮ পৃ.।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00