📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 সাধারণ বায়আত

📄 সাধারণ বায়আত


সাকিফায়ে বনু সায়িদায় খিলাফতের জন্য আবু বকরকে নির্ধারিত করতে বিশেষ বায়আত সংঘটিত হওয়ার পর পরবর্তী দিন সাধারণ মানুষ মসজিদে নববিতে সাধারণ বায়আতের জন্য একত্র হন।৪৯১ সে মুহূর্তে উমর রা. আবু বকরের সমর্থনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

আনাস ইবনু মালিক বর্ণনা করেন; সাকিফায়ে বনু সায়িদায় বায়আত সংঘটিত হওয়ার পর দ্বিতীয় দিন আবু বকর মিম্বারে আরোহণ করেন। তাঁর পূর্বে উমর দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপনের পর বলেন,

লোকসকল, গতকাল আমি তোমাদের যে কথাটি বলেছিলাম, তা আমি কিতাবুল্লাহর মধ্যে পাইনি। রাসুল ﷺ-ও আমাকে এর অঙ্গীকার দিয়ে যাননি। আমার ধারণা ছিল, নবিজি আমাদের বিষয়াদির দেখাশোনা করবেন এবং সকলের শেষে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেবেন। আল্লাহ তোমাদের হাতে তাঁর কিতাব দিয়ে রেখেছেন, যার মাধ্যমে নবিজিও পথনির্দেশনা পেয়েছেন। আল্লাহ তাঁর নবিকে যে পথনির্দেশনা দিয়েছিলেন, তোমরা তা আঁকড়ে ধরলে এ থেকে সব বিষয়ে পথনির্দেশনা খুঁজে পাবে। আল্লাহ তোমাদের এমন এক নেতৃত্বের ছায়াতলে জড়ো করেছেন, যিনি তোমাদের সকলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, যিনি রাসুলের সর্বক্ষণের সাথি, যিনি দুইয়ের দ্বিতীয়জন এবং নবিজির গুহাজীবনের সঙ্গী। উঠো, তাঁর হাতে বায়আত হও।

তখন লোকজন সাকিফায়ে বনু সায়িদার বায়আতের পর সাধারণ বায়আত গ্রহণ করেন। এরপর আবু বকর দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করে বলেন,

লোকেরা, তোমাদের ওপর আমাকে শাসক নিযুক্ত করা হয়েছে; অথচ আমি তোমাদের থেকে উত্তম নই। আমি যদি ভালো কাজ করি, তাহলে আমার সঙ্গ দেবে। যদি ভুল করি তাহলে শুধরে দেবে। সত্যবাদিতা হচ্ছে আমানত এবং মিথ্যা হচ্ছে খিয়ানত। তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিও আমার কাছে শক্তিশালী, যতক্ষণ-না আমি অন্যের কাছ থেকে তার অধিকার আদায় করিয়ে দিই। আর শক্তিমান ব্যক্তিও আমার কাছে দুর্বল, যতক্ষণ আমি তার থেকে অন্যের হক আদায় করে না নিচ্ছি; ইনশাআল্লাহ।

স্মরণ রেখো, যে জাতি জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাদের লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করে থাকেন। যে জাতির মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তাদের বিপদে পতিত করেন। আমি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করি, তাহলে তোমরা আমার আনুগত্য করবে; আর যদি বিরুদ্ধাচরণ করি, তাহলে তোমাদের ওপর আমার আনুগত্য জরুরি নয়। আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন। সালাতের জন্য দাঁড়িয়ে যাও।৪৯২

এ দিন উমর রা. আবু বকরকে মিম্বারে আরোহণের জন্য পীড়াপীড়ি করছিলেন। তাঁর পীড়াপীড়িতেই তিনি মিম্বারে আরোহণ করেন এবং বায়আত সংঘটিত হয়।৪৯৩ খুতবাটি সংক্ষিপ্ত হলেও এটি ইসলামি খুতবার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। এই খুতবায় আবু বকর রা. শাসক এবং শাসিতের মধ্যে আচরণের ক্ষেত্রে ইনসাফ ও মহানুভবতাকেই প্রাধান্য দেন। তিনি এ দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যে, 'উলুল আমর' তথা শাসকদের আনুগত্য হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্যের নামান্তর। এ ছাড়া তিনি জিহাদের দিকেও তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করেন, যা ইসলামের মর্যাদা ও গৌরব প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। অনুরূপ অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকারও তাগিদ দেন। কেননা, সমাজকে অধঃপতন থেকে রক্ষার জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম।৪৯৪ এই খুতবা এবং রাসুলের ইনতিকাল-পরবর্তী ঘটনার আলোকে পর্যালোচক ও গবেষকগণ খিলাফতে রাশিদার প্রথম দিকে তাঁদের শাসনব্যবস্থায় কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেতে পারেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে:

১. বায়আতের মূল অর্থ
আলিমগণ বায়আতের বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করে থাকেন। আল্লামা ইবনু খালদুনের সংজ্ঞা হচ্ছে, 'বায়আত হলো উলুল আমরদের (শাসকদের) আনুগত্যের এঙ্গীকার।৪৯৫ কেউ কেউ এর সংজ্ঞা এভাবে বলেছেন, 'বায়আত হচ্ছে ইসলামের ওপর অটল থাকার অঙ্গীকার।'৪৯৬ অনুরূপ বলা হয়েছে, 'কুরআন-সুন্নাহ যেগুলো জারি রাখার নির্দেশ দিয়েছে, সেগুলো জারি রাখা এবং যেগুলো প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে, সেগুলো প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করার নাম বায়আত।'৪৯৭ আমিরের আনুগত্য এবং শপথের গুরুত্বপ্রদানের লক্ষ্যে উপস্থিত মুসলমানগণ আমিরের হাতের ওপর হাত রাখাকে 'বায়আত' বলে। এ যেন ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যকার লেনদেনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার মতো।

আবু বকরের বায়আত থেকে আমরা এ শিক্ষা পাই যে, উম্মাহর যে-সকল মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী, তারা যখন বায়আতের মাধ্যমে কারও হাতে ক্ষমতাভার তুলে দেন, তখন সকলের ওপর আবশ্যক হচ্ছে আমিরের হাতে বায়আত গ্রহণ এবং তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। শত্রুদের মোকাবিলায় জিহাদের ডাক দিলে তাঁকে সহযোগিতা করা, ভেতর ও বাইরের শত্রুদের বিপরীতে উম্মাহকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করা ওয়াজিব।৪৯৮ রাসুল বলেছেন,

যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা গেল যে, তার গর্দান ছিল শাসকদের বায়আতমুক্ত, তাহলে তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু।৪৯৯

এই হাদিসে উম্মাহকে বায়আতের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তা পরিত্যাগের ব্যাপারে ভীতির কথা শোনানো হয়েছে। বলা হয়েছে, যে সমকালের (ইসলামি) শাসকের হাতে বায়আত করে না, তার জীবন ভ্রান্তির ওপর অতিবাহিত হয় এবং তার মৃত্যুও হয় ভ্রান্তির মৃত্যু।৫০০ রাসুল আরও বলেছেন,

যে ইমামের (খলিফার) হাতে বায়আত করে নেয় এবং নিজ হাত ও অন্তর তাকে দিয়ে দেয়, সে যেন যথাসম্ভব তার আনুগত্য করে। আর কেউ যদি তার শাসন ছিনিয়ে নিতে চায়, তাহলে তার ঘাড় মটকে দেয়।৫০১

এই হাদিসে রাসুল সমকালের ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। নবিজির এই নির্দেশই বিদ্রোহ হারাম হওয়ার দলিল। বিদ্রোহী ব্যক্তি যেন প্রথম বায়আতের বিপরীতে অন্যায়ভাবে আরেক বায়আতের দিকে আহ্বান জানাচ্ছে।

রাজধানীতে বায়আত নেবেন খোদ খলিফা এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় সম্ভব হলে তিনি অথবা তাঁর নিযুক্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে বায়আত নেবেন। আবু বকরের বায়আতের ক্ষেত্রে এমনটিই হয়েছিল। মক্কা এবং তায়েফবাসীর বায়আত নিয়েছিলেন খলিফার নিযুক্ত প্রতিনিধি।

সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন বিষয়ে মানুষ যাদের অনুসরণ করে, যারা উম্মাহর শূরাপরিষদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা রাখেন কিংবা বিভিন্ন এলাকা শাসন করছেন, তাদের জন্য বায়আতগ্রহণ করা ওয়াজিব। বাকি সাধারণ জনতাকে তাদের বায়আতের অনুগামী হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তবে বিশিষ্টদের বায়আতের পর সাধারণ মানুষও বায়আত গ্রহণ করতে পারেন।৫০২ কিছু আলিমের মতে, জনসাধারণের বায়আতগ্রহণও জরুরি। তাদের দলিল হচ্ছে, আবু বকর রা. তখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি, যতক্ষণ-না মদিনার সর্বস্তরের মানুষের বায়আত গ্রহণ করেছেন।৫০৩

এই বিশেষ বায়আত, যা আবু বকর রা. উম্মাহর কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলেন, তা ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান নেতা তথা খলিফার অধিকার। এতে অন্য কারও অধিকার নেই। যেহেতু এর ওপর বহু বিধান নির্ভরশীল।৫০৪ সারকথা, বায়আতের বিশেষ অর্থ হচ্ছে, খলিফার সঙ্গে ওয়ালা (আল্লাহর জন্য ভালোবাসা), তাঁর নির্দেশ পালন ও আনুগত্যের অঙ্গীকার। তবে শর্ত হচ্ছে, তিনি কুরআনের আলোকে রাষ্ট্রপরিচালনা করবেন। মূলত ইসলামের বায়আত হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় একটি অঙ্গীকার। যেখানে খলিফা হয়ে থাকেন প্রথম পক্ষ এবং উম্মাহ দ্বিতীয় পক্ষ। ইমাম অঙ্গীকার করবেন কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী শাসনকাজ পরিচালনা করার; আর উম্মাহ অঙ্গীকার করবে শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে তাঁর আনুগত্য করার।

বায়আত ইসলামি শাসনব্যবস্থার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। অতীত ও বর্তমানের সকল শাসনব্যবস্থার বিপরীতে এই নীতি কেবল ইসলামের মধ্যেই পাওয়া যায়। এর গূঢ়ার্থ হচ্ছে, শাসক এবং শাসিত সবাই হবে ইসলামি বিধানের অধীন। শাসক হোক কিংবা শাসিত, কারও পক্ষে শরিয়তের সীমারেখা অতিক্রম কিংবা কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়নের অধিকার থাকবে না। যদি সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়ন করে, তবে তা হবে ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্পষ্ট বিদ্রোহ, ইসলামের বিরুদ্ধে স্পষ্ট যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর।৫০৫ আল্লাহ বলেন,

কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ, তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসংবাদের বিচারভার তোমার ওপর অর্পণ না করে; এরপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়। [সুরা নিসা: ৬৫]

আবু বকরের খিলাফতের আলোকে বায়আতের এই অর্থই ফুটে ওঠে।

২. আবু বকরের খিলাফতের শরয়ি উৎস
খিলাফতের দায়িত্বগ্রহণের পর আবু বকর রা. তাঁর সেই ভাষণে বলেছিলেন, 'যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করব, তোমরাও আমার আনুগত্য করবে। আর যখন আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে যাব, তখন তোমাদের ওপর আমার আনুগত্য করা জরুরি নয়।'৫০৬

ক. কুরআনুল কারিম
আল্লাহ বলেন,

আমি তো আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন, সে অনুযায়ী আপনি মানুষের মধ্যে বিচার-মীমাংসা করেন এবং বিশ্বাস ভঙ্গকারীদের সমর্থনে তর্ক করবেন না। [সুরা নিসা: ১০৫]

শরয়ি বিধানের প্রথম উৎস কুরআন, যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র-সংক্রান্ত শরয়ি বিধিবিধান অন্তর্ভুক্ত রাখে। অনুরূপ কুরআন কিছু মূলনীতি বর্ণনা করেছে, রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মুসলমানগণ সচরাচর যেসবের মুখোমুখি হয়ে থাকেন।

খ. হাদিসে নববি
হাদিস হচ্ছে শরিয়তের দ্বিতীয় সেই উৎস, যা থেকে ইসলামি সংবিধান তার মূলনীতি আহরণ করতে পারে। হাদিসের আলোকেই কুরআনি আইনের বাস্তবায়ন, ব্যাখ্যা-পর্যালোচনা ও সমন্বয়সাধন সম্ভব। আবু বকরের খিলাফত ছিল শরিয়তের অনুগামী। সে শাসনব্যবস্থার প্রতিটি আইনে ছিল শরিয়তের প্রাধান্য। খিলাফতে সিদ্দিকি ইসলামি শাসনব্যবস্থার উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরেছিল। যে শাসনব্যবস্থার প্রতিটি দপ্তর ও বিভাগ হতো শয়িয়তের আইনের অনুগামী। এই শাসনব্যস্থায় সরকারপ্রধানও হতেন শরয়ি আইনের অধীন। শাসকের পক্ষেও সুনির্দিষ্ট এই আইন থেকে পিছু হটার সুযোগ ছিল না।

আবু বকরের খিলাফত এবং সাহাবিদের সমাজব্যবস্থায় শরিয়তের বিধান ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। শাসক এবং শাসিত সবাই ছিলেন এর অনুগত। এ জন্যই আবু বকর রা. মানুষের কাছ থেকে যে আনুগত্য চেয়েছিলেন, তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের নামান্তর বলেছিলেন। রাসুল বলেন, গুনাহের ক্ষেত্রে কোনো আনুগত্য নেই। আনুগত্য হতে পারে কেবল উত্তম কাজে।

৩. শাসককের কাজ পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহিতা
আবু বকর রা. বলেছিলেন, 'আমি ভালোকাজ করলে তোমরা আমাকে সহায়তা করবে; আর বক্রতা অবলম্বন করলে সোজা করে দেবে।

এখানে আবু বকর রা. কেবল তাঁর কাজ পর্যবেক্ষণ করতে এবং কাজের হিসাব রাখতে উম্মাহর অধিকারের কথাই বলেননি; বরং প্রত্যেক মন্দকাজ থেকে তাঁকে জোরপূর্বক বিরত রাখা এবং শরিয়তসিদ্ধ কাজে বাধ্য করার অধিকারেরও স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি তাঁর ভাষণের শুরুতেই এই বাস্তবতার স্বীকৃতি দিয়েছেন- যেকোনো শাসকের পক্ষ থেকে ভুল হতে পারে এবং তাকে সংশোধন করা যেতে পারে। কারণ, এ পদ তার ব্যক্তিগত কোনো বৈশিষ্ট্যের কারণে নয় যে, তিনি অন্য থেকে শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হবেন। নিষ্পাপ হওয়ার গুণটি কেবল নবিদের জন্য বরাদ্দ। তাঁদের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে গেছে। শেষ নবি হলেন মুহাম্মাদ —যার ওপর ওহি অবতীর্ণ হয়েছিল, তিনি তাঁর প্রতিপালকের রহমতের আশ্রয়ে চলে গেছেন। নবি এবং নিষ্পাপ হওয়া হিসেবে তাঁর যে দীনি ক্ষমতা, রাসুল হিসেবে আসমানি শিক্ষা এবং পথপ্রদর্শনের যে অবস্থান ছিল; তাঁর ইনতিকালের পর সে ধারা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে শাসন এবং বায়আত উম্মাহর হাতে সমর্পিত রয়ে গেছে।৫১১

আবু বকরের মতে উম্মাহ হচ্ছে একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, যার রয়েছে সাহায্যপ্রদান, হিসাবগ্রহণ এবং সতর্কীকরণের অধিকার। অর্থাৎ, জনসাধারণের জন্য ওয়াজিব হচ্ছে, তারা দীন ও জিহাদের ব্যাপারে শাসককে সহায়তা দেবে। শাসকের সাহায্য-সহায়তার মধ্যে এটিও একটি যে, তাকে হেয়প্রতিপন্ন কিংবা লাঞ্ছিত করা যাবে না। তাঁর সমর্থনের অর্থ হচ্ছে, তাঁকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। কারণ, তাঁর ওপর উম্মাহর শাসন এবং অধিকারের যে ক্ষমতা রয়েছে, তা তো কেবল আল্লাহর দীন ঊর্ধ্বে তুলে ধরার লক্ষ্যে। তাঁর সম্মান মূলত আল্লাহর নির্দেশ এবং শরিয়তের সম্মান। দীনের জন্য তাঁকে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। রাসুল বলেন,

নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও সম্মানের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ মুসলমান, মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী কুরআনের ধারক এবং ন্যায়পরায়ণ শাসকরা অন্তর্ভুক্ত।৫১২

উম্মাহর জন্য জরুরি হলো, তারা শাসকের কল্যাণকামী হবে। রাসুল বলেছেন, 'দীন হচ্ছে কল্যাণকামিতার নাম।' সাহাবিগণ বলেন, 'কার জন্য?' রাসুল বলেন, 'আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসুলের জন্য, মুসলিম শাসক এবং জনসাধারণের জন্য।৫১৩

সাহাবিদের অন্তরে এ কথাটি ভালোভাবে বসে গিয়েছিল যে, উম্মাহর স্থিতি মূলত শাসকদের স্থিতাবস্থার অনুদান। তাই সাধারণ মানুষের আবশ্যিক দায়িত্বের অনুষঙ্গই হচ্ছে শাসকদের সম্মান করা, তাদের কল্যাণ কামনা, তাদের সৎপরামর্শ দেওয়া এবং সংশোধন করা। আবু বকরের সেই আলোকিত রাজনীতিই বর্তমানে অনেক উন্নত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানগণ অনুসরণ করে চলেছেন। তারা বিশেষায়িত কিছু কমিটি গঠন করে রেখেছেন। ভিন্ন নামে হলেও শুরাব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটাচ্ছেন, যারা সরকারপ্রদানকে সবসময় কল্যাণকর পরামর্শ দিচ্ছে। মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করছে।

তবে আফসোসের বিষয় হলো, মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এসব সুন্দর নীতিমালা এড়িয়ে চলছে। যে কারণে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে শাসকদের জুলুম-অত্যাচারে জনসাধারণের অবস্থা একেবারে নাজেহাল। অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে শাসকদের বিরুদ্ধে যেসব তৎপরতা দেখা যায়, তা ওই অভিশপ্ত স্বেচ্ছাচারিতার ফল, যা উম্মাহর মধ্যকার পারস্পরিক কল্যাণকামিতা এবং বীরত্বের প্রাণকে মেরে ফেলেছে। তাদের মধ্যে ভয় ও ভীব্রতা জন্ম দিয়েছে। যে উম্মাহ একজন সত্যিকার নেতার তত্ত্বাবধানে পারস্পরিক কল্যাণকামিতা অবলম্বন করে, জাগতিক শক্তি অর্জনে প্রয়াসী হয়, সেই উম্মাহ আল্লাহর দীনের দাওয়াত নিয়ে বিশ্বের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন বিজয় তাদের পদচুম্বন করে।৫১৪

৪. মানুষের মধ্যে সাম্য ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা
আবু বকর তাঁর ভাষণে বলেন, 'তোমাদের মধ্যকার দুর্বল ব্যক্তিও আমার মোকাবিলায় খুবই শক্তিশালী, যতক্ষণ-না আমি অন্যের কাছ থেকে তার হক আদায় করে দিই। আর তোমাদের শক্তিমান ব্যক্তিও আমার কাছে দুর্বল, যতক্ষণ-না আমি তার থেকে অন্যের হক আদায় করে নিচ্ছি, ইনশাআল্লাহ।'৫১৫

ইসলামি রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যের মধ্যে শাসনব্যবস্থার ভিত্তি রক্ষা করা অন্যতম, যা মুসলিম সমাজব্যবস্থার জন্য সহায়ক প্রমাণিত হবে। এর অন্যতম হচ্ছে শূরাব্যবস্থাপনা, ন্যায়বিচার, সাম্য ও স্বাধীনতা। আবু বকর রা. তাঁর শাসনামলে এই রাজনীতি ও ভিত্তিগুলোই প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর বায়আত, নির্বাচন এবং মসজিদে প্রদত্ত ভাষণ থেকে যেমন শুরাব্যবস্থাপনা প্রমাণিত হয়, তেমনি ন্যায়পরায়ণতাও প্রতিভাত হয়। নিঃসন্দেহে আবু বকরের ন্যায়পরায়ণতা দ্বারা ইসলামি ন্যায়পরায়ণতা উদ্দেশ্য, যা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। যে সমাজব্যবস্থায় থাকে অনাচার-অত্যাচারের জয়জয়কার, যেখানে ইনসাফ ও সাম্যের অনুপস্থিতি, সেখানে ইসলামের অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে না।

মানুষের মধ্যে ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র হিসেবে ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা এমন কোনো নফল কাজ নয় যে, তা রাষ্ট্রপ্রধানের মর্জির ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে; বরং ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় একটি বিধান। ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা তো ইজমার ভিত্তিতেই ওয়াজিব।৫১৬ ইমাম রাজি বলেন, 'ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রপরিচালনা শাসকের জন্য উম্মাহর ইজমা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।'৫১৭

কুরআন-সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত দলিলও এ নির্দেশের সমর্থন করে। ইসলামি সমাজব্যবস্থার মূল্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ন্যায়বিচার ও সাম্যপ্রতিষ্ঠা অন্যতম। এই বসনব্যবস্থা জুলুম ও অবিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। মানুষের সামনে অধিকার আদায়ের পথ সুগম করে তুলবে। মানুষ কোনো প্রকার কষ্ট, পরিশ্রম ও সম্পদব্যয় ব্যতিরেকে দ্রুত ও সহজ পন্থায় নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে পারবে। এসব অধিকার আদায়ে বাধাবিপত্তি এলে তা দূর করাও ইসলামি রাষ্ট্রের দায়িত্বের আওতায় পড়ে।

ইসলাম শাসকদের ওপর মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাকে অপরিহার্য করেছে। বলেছে, 'ভাষা, আঞ্চলিকতা ও সামাজিক পেশার ভিত্তিতে কোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না।' বিচারকের জন্য আবশ্যক হচ্ছে, তিনি ইনসাফপূর্ণ বিচার করবেন। কখনোই এদিকে তাকাবেন না—লোকটি শত্রু না মিত্র, ধনী না গরিব, শ্রমিক না ব্যবসায়ী।৫১৮ আল্লাহ বলেন,

ইমানদারগণ, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যপ্রদানে তোমরা অবিচল থাকবে; কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন সুবিচার বর্জনে তোমাদের কখনো প্ররোচিত না করে। সুবিচার করবে, এটি তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা যা করো, নিশ্চয় আল্লাহ তার সম্যক খবর রাখেন। [সুরা মায়িদা : ৮]

আবু বকর রা. ছিলেন সুবিচারের আদর্শপুরুষ। তিনি মানুষের অন্তর জয় করে নিতেন। তাঁর আচরণ দেখে মানুষ বিস্মিত হয়ে যেত। তাঁর দৃষ্টিতে সুবিচার ছিল ইসলামের প্রতি দাওয়াতের একটি অনুপম পন্থা। এর ফলে মানুষের অন্তর ইমানের জন্য খুলে যেত। দানের ক্ষেত্রেও সুবিচার করতেন। মানুষের কাছে আবেদন রাখতেন, তারা যেন সুবিচারে তাঁকে সহায়তা করে। একবার তিনি নিজে নিজেকে কিসাসের জন্য পেশ করেছিলেন। এটি ছিল তাঁর সুবিচার ও আল্লাহভীতির অনুপম নিদর্শন।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত; আবু বকর রা. একবার জুমআয় ঘোষণা দেন, 'কাল আমরা জাকাতের উট বণ্টন করব। আপনারা আসবেন। তবে অনুমতি ছাড়া কেউ প্রবেশ করবেন না।' এক মহিলা তার স্বামীর হাতে লাগাম ধরিয়ে দিয়ে বলে, 'এটি সঙ্গে নিয়ে যান, হয়তো আল্লাহ আমাদের একটি উট দিয়ে দিতে পারেন!' লোকটি পৌঁছে দেখে, আবু বকর উটের আস্তাবলে ঢুকছেন। সে-ও তাঁর পেছনে পেছনে সেখানে ঢুকে পড়ে। আবু বকর ঘুরে তাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি এখানে কীভাবে এলে?' এরপর লোকটির হাত থেকে লাগাম কেড়ে নিয়ে তাকে পেটাতে শুরু করেন।

উট বণ্টন থেকে অবসর হয়ে তাকে ডেকে পাঠান এবং তার হাতে উটের লাগাম দিয়ে বলেন, 'প্রতিশোধ নিয়ে নাও।' উমর রা. বলেন, 'আল্লাহর শপথ, সে প্রতিশোধ নিতে পারে না। আপনি একে সুন্নাতে পরিণত করবেন না!' তিনি বলেন, 'কিন্তু কিয়ামতের দিন আমাকে আল্লাহর কাছ থেকে কে রক্ষা করবে?' উমর বলেন, 'আপনি তাকে সন্তুষ্ট করে নিন।' আবু বকর তখন তাঁর গোলামকে ডেকে বলেন, 'একে একটি হাওদা বোঝাই উট, একটি চাদর এবং পাঁচটি দিনার দিয়ে খুশি করে নাও।৫১৯

আবু বকর তাঁর খিলাফতের ভাষণে যে সাম্যনীতির কথা বলেছিলেন, এটি হচ্ছে ইসলামের সাধারণ মূলনীতিসমূহের একটি। এটি ইসলামি সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ এক অনুষঙ্গ। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত উন্নত রাষ্ট্রের উন্নত আইনকানুনের ইসলাম অনেক অনেক ঊর্ধ্বে। আল্লাহ বলেন,

হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব খবর রাখেন। [সুরা হুজুরাত : ১৩]

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ পরস্পর সমান। শাসক হোক কিংবা শাসিত, পুরুষ হোক কিংবা নারী, আরব হোক কিংবা অনারব, সাদা হোক কিংবা কালো, ইসলাম জাত-পাত, বর্ণ, বংশ ও শ্রেণিভেদে বৈষম্য নিশ্চিহ্ন করে থাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে শাসক-শাসিত সবাই সমান।৫২০ আবু বকর রা. এই মূলনীতির কঠোর অনুসরণ করতেন। তিনি বলতেন, 'আমাকে তোমাদের শাসক নির্বাচন করা হয়েছে; অথচ আমি তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নই। যদি ভালোকাজ করি, তাহলে সহায়তা করবে; আর বক্রতা অবলম্বন করলে সোজা করে দেবে। তোমাদের মধ্যকার দুর্বল ব্যক্তিও আমার মোকাবিলায় খুবই শক্তিশালী, যতক্ষণ-না আমি অন্যের কাছ থেকে তার হক আদায় করে দিই; আর তোমাদের শক্তিমান ব্যক্তিও আমার কাছে দুর্বল, যতক্ষণ-না আমি তার থেকে অন্যের হক আদায় করে নিচ্ছি।

তিনি বায়তুলমাল থেকে মানুষের ওপর খরচ করতেন। সেখানে যা থাকত, তা মানুষের মধ্যে সমানহারে বণ্টন করে দিতেন। ইবনু সাআদ প্রমুখের বর্ণনা: সুনাহ নামক জায়গায় তাঁর বায়তুলমাল থাকত। সেখানে কোনো পাহারাদার ছিল না। লোকজন বলেছিল, 'বায়তুলমালের জন্য পাহারাদার নিযুক্ত করুন।' জবাবে তিনি বলেন, 'কোনো প্রয়োজন নেই।' লোকজন জিজ্ঞেস করেন, 'কেন?' তিনি বলেন, 'সেখানে তালা লাগানো থাকে।'

সেখানে যা কিছু এসে জমা হতো, সবই তিনি মানুষের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। এরপর মদিনায় চলে এলে বায়তুলমালও মদিনায় সরিয়ে নিয়ে আসেন। তখন তাঁর ঘরই ছিল বায়তুলমাল। জুহায়নার খনি থেকে অনেক সম্পদ আসে। তাঁর খিলাফতকালে বনু সুলায়মের ভূখণ্ডে খনি খনন করা হয়। সেখান থেকেও জাকাত আসত। এগুলোও তিনি বায়তুলমালে রাখতেন। এরপর মানুষের মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে সমহারে বণ্টন করে দিতেন। স্বাধীন-পরাধীন, নারী-पुरुष ও ছোট-বড় সবাইকে সমানভাবে দান করতেন।

উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. বলেন, 'প্রথম বছর তিনি স্বাধীন, গোলাম, নারী, বাঁদি সবাইকে ১০ দিনার করে দান করেন। পরের বছর ২০ দিনার করে দেন। কয়েকজন সাহাবি তখন বলেন, 'আল্লাহর রাসুলের খলিফা, আপনি সকলের মধ্যে সম্পদ সমানহারে বণ্টন করেছেন; অথচ তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছেন, যারা অন্যের থেকে মর্যাদায় এবং ইসলামগ্রহণে এগিয়ে। আহ! আপনি যদি মর্যাদায় আগুয়ানদের একটু বেশি দান করতেন।' জবাবে তিনি বলেন, 'আপনারা মর্যাদা ও ইসলামে এগিয়ে থাকার যে কথা বলছেন, এর প্রতিদান তো আল্লাহর কাছে পাবেন। এটা তাদের জন্য দানের ক্ষেত্রে সমতা অপেক্ষা অগ্রাধিকার প্রদান থেকে উত্তম।'

তাঁর সময়ে দানের ক্ষেত্রে সকলকে সমানহারেই দেওয়া হতো। এ বিষয়ে একবার উমর রা. তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। উমর বলেন, 'যারা দুই হিজরত করেছে এবং উভয় কিবলার দিকে সালাত পড়েছে, তাদের এবং যারা মক্কা বিজয়ের বছর ইসলামগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে সমান আচরণ করবেন?' আবু বকর বলেন, 'এগুলো তো তারা আল্লাহর জন্য করেছেন। এর প্রতিদান তারা আল্লাহর কাছে পাবেন। দুনিয়ার জীবনে তারা মুসাফির; আর মুসাফিরের পাথেয় সমান হওয়া চাই।'

যদিও উমর রা. তাঁর শাসনামলে বণ্টনপদ্ধতির মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে এসেছিলেন, ইসলামে অগ্রবর্তী এবং মুজাহিদদের তিনি বেশি দান করতেন; কিন্তু শাসনামলের শেষ দিকে বলেছিলেন, 'যদি ব্যাপারটি আগে থেকে বুঝতাম তাহলে আবু বকরের পদ্ধতিই গ্রহণ করতাম। সবাইকে সমানহারে দান করতাম।'৫২৩

আবু বকর রা. উট-ঘোড়া কিনে মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। এক বছর মদিনার গ্রামাঞ্চল থেকে চাদর কিনে শীতমৌসুমে বিধবাদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। তাঁর শাসনামলে তিনি যে সম্পদ পেয়েছিলেন, তার পরিমাণ ছিল ২ লাখ দিনার। সব তিনি পুণ্যকাজে বণ্টন করে দেন।৫২৪

ন্যায়পরায়ণতা এবং সমতা প্রতিষ্ঠায় আবু বকর রা. আল্লাহর নীতি অবলম্বন করেন। দুর্বলদের অধিকারের ব্যাপারে বেশি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি নিজেকে তাদের কাতারে রাখাটাই উচিত মনে করেন। তাঁদের সঙ্গে থাকেন। দুনিয়াবি ক্ষমতা তাঁকে আপন অবস্থান থেকে সরিয়ে নিতে পারেনি। এ ছিল সেই ব্যক্তির ইসলামের নমুনা, যিনি সর্বপ্রকার জুলুমের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। সুবিচার ও সুশাসনের মাধ্যমে মানুষের মাথা উঁচু করেছিলেন— যে সুবিচার ও সুশাসনের ওপর ছিল তাঁর সালতানাতের বিশ্বাস, যার মাধ্যমে তিনি উম্মাহর নিরাপত্তাবিধান করেছিলেন।৫২৫

আবু বকর রা. প্রথম দিন থেকেই এই সমুন্নত বিধানগুলোর বাস্তবায়নে লেগে পড়েন। তিনি জানতেন, ন্যায়পরায়ণতার মধ্যেই শাসক ও শাসিতের সম্মান নিহিত। এই লক্ষ্যেই তিনি তাঁর রাজনীতি বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি আল্লাহর এই বাণী স্মরণ করে চলছিলেন, আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎকর্ম ও সীমালঙ্ঘন থেকে; তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো। [সুরা নাহল: ৯০]

আবু বকরের কামনা ছিল, মানুষ দীনের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে যাক। দাওয়াতি কাজে স্বাধীনতা লাভ করুক। মুসলমানগণ তখনই নিশ্চিন্ত হতে পারে, যখন তাদের শাসক প্রবৃত্তিপরায়ণতা থেকে মুক্ত হয়ে কেবল ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রপরিচালনা করবেন। এই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার চাহিদা হচ্ছে, শাসক ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন থেকে ঊর্ধ্বে থাকবেন। তাঁর মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা ও দয়ার্দ্রতার গুণ বিদ্যমান থাকবে। রাষ্ট্রীয় কাজে অধিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে আবু বকরের মনোভাব ছিল, ব্যক্তি-অহমিকা পরিহার করতে হবে। আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্য থাকতে হবে। এর ফলে দুর্বলদের দুর্বলতা এবং সমাজের প্রয়োজন অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। সুবিচার ও ইনসাফের মাধ্যমে আত্মচাহিদার ওপর প্রাধান্য অর্জন করে নিতে পেরেছিলেন। এরপর সজাগ মস্তিষ্কে সালতানাতের ছোটবড় সকল কাজের হিসাব নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।৫২৬

মোটকথা, তিনি ন্যায়পরায়ণতার পতাকা উড্ডীন করছিলেন। দুর্বলরা তাদের অধিকারের ব্যাপারে নিঃশঙ্ক ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে ফায়সালা করা হলে তাদের দুর্বলতা থাকবে না। ন্যায়পরায়ণতার কল্যাণে তারা হবে শক্তিশালী, কেউ তাদের অধিকার হরণ কিংবা ধ্বংস করতে পারবে না। কোনো শক্তিমান জুলুম করতে এগিয়ে এলে তিনি তাকে প্রতিহত করতেন। তার কাছ থেকে মাজলুমের অধিকার আদায় করে দিতেন। এ ক্ষেত্রে লোকটির প্রশাসনিক পদমর্যাদা অথবা সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বও তাকে রক্ষা করতে পারত না। এটিই হচ্ছে জমিনে সম্মান ও আধিপত্য অর্জনের মূল রহস্য।৫২৭

ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহ. কতই-না সুন্দর বলেছেন, 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা ন্যায়পরায়ণতার ওপর প্রতিষ্ঠিত কুফরি প্রশাসনকেও সাহায্য করে থাকেন। পক্ষান্তরে জুলুমবাজ প্রশাসন ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকলেও তাদের সহায়তা করেন না। ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে মানুষ সৎ ও পুণ্যবান হয়ে থাকে। সম্পদেও প্রবৃদ্ধি হতে থাকে।'৫২৮

৫. সত্যবাদিতা হচ্ছে শাসক-প্রজার সম্পর্কের ভিত্তি
আবু বকর রা. তাঁর ঐতিহাসিক সেই ভাষণে বলেছিলেন, 'সত্যবাদিতা হচ্ছে আমানত এবং মিথ্যা হচ্ছে খিয়ানত।'৫২৯

উম্মতের নেতৃত্বদানে তিনি এই মূলনীতির কথা ঘোষণা করেছিলেন যে, সত্যবাদিতা হচ্ছে শাসক ও শাসিতের মধ্যকার আচরণের ভিত্তি। এটি শাসকের শাসনে শক্তি জোগায়। এর মাধ্যমে শাসক-প্রজার মধ্যে আস্থা-বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হয়। এই রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ইসলামের সত্য দাওয়াতের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন,

মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও। [সুরা তাওবা: ১১৯]

রাসুল বলেছেন,

তিন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না। তাদের পবিত্রও করবেন না। তাদের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করবেন না-বৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যাবাদী বাদশাহ এবং অহংকারী ফকির।৫৩০

সত্যবাদিতা আমানত এবং মিথ্যাবাদিতা খিয়ানত, কথাটি বেশ অর্থবহ। এর মধ্যে এমন এক প্রাণ বিদ্যমান, যা সকাল-সন্ধ্যা মানুষের ওপর আবর্তিত হয়। তাদের প্রেরণা জাগিয়ে তোলে। আশাবাদী করে তোলে। আবু বকরের দৃষ্টি এর অর্থের ওপর নিবদ্ধ ছিল, শব্দের মধ্যে নয়। তিনি যাবতীয় বিষয়কে তার যথাযথ অবস্থান ও মর্যাদা দিতেন। মিথ্যাবাদী শাসক বিশ্বাসঘাতক উকিলের মতো, যারা উম্মাহর রুটি খেয়ে উম্মাহকেই ধোঁকা দিয়ে থাকে, সে শাসক কতই-না নিকৃষ্ট এবং ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, যে মিথ্যাকে তার অভ্যাসে পরিণত করে নেয়। মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে ফেলে। আবু বকর রা. এই মিথ্যাকে বিশ্বাসঘাতকতা বলেছেন। এমন বাদশাহ তার জনসাধারণের শত্রু। বিশ্বাসঘাতকতা অপেক্ষা বড় কোনো শত্রুতা হতে পারে কি?

বাস্তবতা হচ্ছে, আবু বকর তাঁর অবস্থানের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকেই যেন প্রশান্তির ছায়া দিয়ে চলছিলেন। কিছু জাতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছিলেন এবং কিছু জাতিকে ভূমিতে আছড়ে ফেলছিলেন। শাসকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ব্যক্তিগঠন। কারণ, ব্যক্তি হচ্ছেন রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান পুঁজি। ব্যক্তির সহায়তায় রাষ্ট্র তার বিপদাপদ কাটিয়ে উঠতে পারে। নিজেদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। নিঃসন্দেহে আবু বকরের এ কথা নিয়ে যে-ই গভীর চিন্তাভাবনা করবে, তার সামনে এই বাস্তবতা ফুটে উঠবে যে, তিনি ছিলেন এই শাস্ত্রের উস্তাজ। তিনি সর্বক্ষণ নবিজির নীতির ওপর অটল ছিলেন।৫৩১

আজকের বিশ্বসভ্যতার জন্য শাসক ও শাসিতের মধ্যে আল্লাহপ্রদত্ত এই নীতির অনুসরণ অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে নির্বাচনসমূহে প্রোপাগান্ডা, অপবাদ, শাসকদের বিরোধিতা ও মনগড়া সমালোচনা প্রচার-প্রসারে যেসব মাধ্যম গ্রহণ করা হয়, তা বন্ধ করা যায়। নিঃসন্দেহে এটা অত্যন্ত জরুরি যে, উম্মাহ বিভিন্ন ব্যানারে শাসকশ্রেণিকে সত্যের অনুবর্তীকরণের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে, যাতে তারা সত্যের দিকে ফিরে আসে। এমন একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করা দরকার, শাসকশ্রেণি সত্যবিচ্যুত হলে যারা তাদের সত্যের পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।৫৩২ জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর সরকারি হস্তক্ষেপের পথ রুদ্ধ করবে। এভাবেই উম্মাহর সম্মান-মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত করাসহ সম্পদ চুরি করা থেকে শাসকদের বাধা দেওয়া সম্ভব।

৬. জিহাদ আঁকড়ে ধরা এবং উম্মাহকে তৈরিকরণ
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের সময় আবু বকর রা. জনগণকে তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, 'যে জাতি আল্লাহর পথের জিহাদ ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাদের অপমানের গভীরে ছুড়ে মারেন।'৫৩৩

আবু বকর রা. তাঁর পথপ্রদর্শক বিশ্বনবি থেকে জিহাদের শিক্ষা পেয়েছিলেন। একত্ববাদ-শিরক, ইমান-কুফর, হিদায়াত-পথভ্রষ্টতা এবং কল্যাণ-অকল্যাণের মধ্যকার চিরন্তন লড়াইয়ের গতিবিধি বুঝে পেয়েছিলেন। ইতিপূর্বে যুদ্ধাভিযানসমূহে আবু বকরের অবস্থান কী ছিল, তা আমরা উল্লেখ করে এসেছি। রাসুল বলেছেন,

যখন তোমরা আইনা-পদ্ধতির বেচাকেনায় জড়িয়ে পড়বে, গরুর লেজ আঁকড়ে ধরবে, কৃষিকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, জিহাদ ছেড়ে দেবে, তখন আল্লাহ তোমাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেবেন। আর এটা তখন পর্যন্ত দূর করবেন না, যতক্ষণ-না তোমরা দীনের পথে ফিরে আসবে।৫৩৪

আবু বকর রা. হাদিসটির মর্ম পূর্ণরূপে উপলব্ধি করেছেন। অর্থাৎ, উম্মাহ যখনই জিহাদ ছেড়ে দেবে, তখনই লাঞ্ছনার অতলে তলিয়ে যেতে থাকবে। এ জন্যই তিনি রাষ্ট্রপরিচালনার ভিত্তির মধ্যে জিহাদকেও অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলেন।৫৩৫ মাজলুমদের থেকে জুলুম দূর করতে জিহাদের মাধ্যমে উম্মাহর শক্তি সংহত করে নিয়েছিলেন, যাতে পরাজিতদের চোখ খুলে যায়। বঞ্চিতরা হারানো স্বাধীনতা ফিরে পায়। আল্লাহর দাওয়াত পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে আর এ পথের সব বাধা দূর হয়ে যায়।

৭. অশ্লীলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা
আবু বকর রা. তাঁর ঐতিহাসিক সেই ভাষণে বলেছিলেন, 'যে জাতির মধ্যে অশ্লীলতা ছেয়ে যায়, আল্লাহ তাদের বিপদগ্রস্ত করেন।'৫৩৬

তিনি মূলত এখানে উম্মাহকে রাসুলের ওই বাণী স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন, যেখানে তিনি বলেছেন, 'যখনই কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা ব্যাপক হয়ে যায়, তখন ওই জাতির মধ্যে মহামারিসহ এমনসব রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের পূর্ববর্তীরা কখনো দেখেনি।'৫৩৭

ব্যভিচার এবং অশ্লীলতা সমাজের জন্য একটি ব্যাধি। এটা লাম্পট্য এবং দুর্বলতার পথ, যেখানে কারও পবিত্রতার কোনো মূল্য থাকে না। অশ্লীল সমাজব্যবস্থা থেকে আত্মমর্যাদাবোধ হারিয়ে যায়। রুচিহীনতা প্রসার পায়। সেখানে এগুলোকেই সুন্দর দেখায়; কিন্তু সেই সমাজব্যবস্থা হয় ভঙ্গুর। রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়াটা ওই সমাজের ভাগ্যলিপিতে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। সেই সমাজের মানুষের বাহ্য চেহারাই সামাজিক অশান্তির কথা বলে। আবু বকর রা. উম্মাহকে প্রতিষ্ঠা এবং তাদের চরিত্রের নিরাপত্তার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছিলেন।৫৩৮ তিনি তাঁর রাজনীতির মাধ্যমে উম্মাহকে পবিত্রীকরণ এবং এসব মন্দ আচরণ থেকে বের করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছিলেন। এমন এক শক্তিমান জাতি দেখার প্রত্যাশী ছিলেন, যারা প্রবৃত্তিপরায়ণ হবে না। শয়তান যাদের জড়াতে পারবে না তার রঙিন ফাঁদে। তারা হবে এমন এক জাতি, যারা মানুষের কাছে কেবল কল্যাণই উপস্থাপন করবে।

রাষ্ট্রসমূহের প্রতিষ্ঠা এবং সভ্যতার আত্মপ্রকাশের সঙ্গে চারিত্রিক আচরণের সম্পর্ক খুবই গভীর। যদি চরিত্রে অধঃপতন নেমে আসে, তাহলে দেশ ও জাতি ধ্বংসের খাদে পড়ে যায়। ফিতনা ও অরাজকতা ব্যাপক হয়ে পড়ে। যারা অতীতের সভ্যতা, জাতি ও রাষ্ট্রসমূহের ইতিহাসের গভীর অধ্যয়নকারী, তারা অবশ্যই দেখতে পাবে, কীভাবে সভ্যতাগুলো উত্তম চরিত্রকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। যেমন : দাউদ ও সুলায়মান আ.-এর যুগের সভ্যতা ও সাম্রাজ্য। জুলকারনাইনের সময়ের সভ্যতা ও সাম্রাজ্য।

যেসব জাতি উত্তম আচরণকে পুঁজি বানিয়েছিল, সর্বকালে তারাই শক্তিশালী জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তারা তত দিন মহা প্রতাপ নিয়ে টিকে থেকেছিল, যত দিন এই উত্তম আচরণ আঁকড়ে ধরেছিল; কিন্তু যখনই তাদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, তখনই তারা শয়তানের অসহায় শিকারে পরিণত হয়েছে। কুফরির মাধ্যমে আল্লাহর নিয়ামতকে আজাবে রূপান্তর করে নিয়েছে। তাদের শক্তিমত্তা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ধ্বংস হয়ে গেছে।৫৩৯

আবু বকর জাতি এবং রাষ্ট্রসমূহের উত্থান-পতনের ব্যাপারে আল্লাহর নীতির অনুসরণে পূর্ণ সজাগ ছিলেন। তিনি জানতেন, দেশ-জাতি অশ্লীলতা ও পাপাচারিতার কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন,

وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ تُهْلِكَ قَرْيَةً اَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْ نَهَا تَدْمِيرًا

আমি যখন কোনো জনপদকে ধ্বংস করে দিতে চাই, তখন এর সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিদের সৎকর্মের নির্দেশ দিই; কিন্তু তারা সেখানে অসৎকর্ম করে, এরপর তাদের প্রতি দণ্ডাজ্ঞা নিশ্চিত হয়ে যায় এবং আমি তা সম্পর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি। [সুরা বনি ইসরাইল: ১৬]

অর্থাৎ, আমি তাদের আনুগত্যের কথা বলি। পাপাচারিতা ছেড়ে দিতে বলি; কিন্তু তারা আমার আদেশের অবাধ্যতা করতে থাকলে আমি পাপাচারিতার কারণে তাদের ধ্বংস করে ফেলি। এখানে এক কিরাআত অনুযায়ী مُتْرَفِيهَا ('মীম'-এর ওপর তাশদিদের সঙ্গে) পড়া হয়ে থাকে।৫৪০ অর্থাৎ, আমি তাদের নেতা বানিয়ে দিই। সম্পদের প্রাচুর্য, সাম্রাজ্য এবং শক্তি যদিও ভোগবিলাসিতা ও খোদাদ্রোহিতার মাধ্যম, যদিও এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার জন্ম দেয়, যা আল্লাহর নীতির ওপর অটল থাকার বিরোধী; তথাপি সব সম্পদ কিন্তু ভোগবিলাসিতা এবং আল্লাহদ্রোহিতার মাধ্যম নয়।৫৪১

অশ্লীলতা এবং নিষিদ্ধতার বিপরীতে আবু বকরের রাজনীতি মুসলিম শাসকদের জন্য আদর্শ। একজন খোদাভীরু, সচেতন ও ন্যায়পরায়ণ শাসকই তার জাতিকে চরিত্রের সর্বোত্তম আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারেন। তারা হয়ে থাকেন এমন নেতা, যাদের শিরা-উপশিরায় মানবতার প্রতি দরদ বহমান থাকে। যারা মানবতাকে মনে করে থাকেন শিরিন-শরাব। আর যদি শাসক সজ্ঞান হারিয়ে হয়ে পড়ে দুশ্চরিত্রবান, তাহলে অবশ্যই তার রাষ্ট্রের সর্বত্র অশ্লীলতা ও নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়বে। সে আইন ও শক্তির মাধ্যমে এই অন্যায়কে শক্তি জোগাবে। উত্তম চরিত্রের বিরদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। সব শেষে নিজেসহ জাতিকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে ঠেলে দেবে।

তাদের উদাহরণ হচ্ছে দিশাহারা প্রাণী কিংবা ভয়কাতুরে বিভ্রান্ত পশুপালের মতো। তাদের লক্ষ্য হয়ে থাকে দুনিয়ার সৌন্দর্য ও ভোগবিলাস। যে কারণে তারা বীরত্বের জীবন পরিহার করে দুশ্চরিত্রের জীবনযাপন করতে থাকে।৫৪২ এদের সম্পর্কেই আল্লাহ বলেছেন,

আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিয়েছেন এক জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসত সব দিক থেকে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল, ফলে তারা যা করত তজ্জন্য আল্লাহ তাদের আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদন দ্বারা। [সুরা নাহল: ১১২]

আল্লাহর অনুগ্রহে আবু বকরের খিলাফতের ভাষণের ওপর কিছু বক্তব্য তুলে ধরা হলো। এর মাধ্যমে সিদ্দিকি শাসনব্যবস্থার যে রূপরেখা প্রকাশ পায়, তা হচ্ছে— এখানে কথা বলা হয়েছে শাসকের দায়িত্ব নিয়ে। আলোকপাত করা হয়েছে শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের বিষয়ে। উল্লেখ করা হয়েছে রাষ্ট্রগঠন, রাষ্ট্রপরিচালনা এবং জাতিকে সৎকাজের প্রশিক্ষণ প্রদান-সংক্রান্ত মূলনীতি। দেখানো হয়েছে ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রপরিচালনার মূল উদ্দেশ্যকে কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করার চিত্র। সাহাবিগণ কর্তৃক খলিফা নির্বাচনের প্রবল আগ্রহ এবং দ্রুত ব্যবস্থাগ্রহণের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, রাসুল ﷺ যে নীতি প্রবর্তন করেছিলেন, তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি ছিল। যদিও নবিজি ইনতিকাল করেছেন, তবু পথচলার নিয়ামক হিসেবে রেখে গেছেন দীন ও কুরআন। সেদিন আবু বকরের খিলাফতের ব্যাপারে লোকজনের ঐক্যবদ্ধতা প্রমাণ করে—উম্মাহ তখন সেই ব্যবস্থার ওপরই অটল ছিল, যা রেখে গিয়েছিলেন রাসুল ﷺ।৫৪৩

আবু বকরের শাসনব্যবস্থা থেকে উম্মাহ সামান্য কিছুদিন উপকৃত হতে পেরেছিল। তবে তাঁর খিলাফতের ভাষণে তিনি অতীত এবং বর্তমানের শাসনব্যবস্থার একটি রূপকল্প এঁকে দিতে পেরেছিলেন। তাঁর শাসনব্যবস্থা ছিল শূরায়ি ব্যবস্থাপনা। সর্বযুগে যা স্বাধীনতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী। জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্য এর চেয়ে উন্নত ও উত্তম কোনো শাসনব্যবস্থা হতে পারে না,৫৪৪ যে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করে গেছেন নবিজির প্রিয়তম ছাত্র—ভদ্রতা, মেধা, ইমান ও ইখলাসের আদর্শব্যক্তি আবু বকর সিদ্দিক রা.।

ইমাম মালিক বলেন, 'এসব শর্ত ব্যতীত কোনো ব্যক্তিই ইমাম (শাসক) হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।৫৪৫ এর দ্বারা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, আবু বকর রা. তাঁর খিলাফতগ্রহণকালীন খুতবায় অর্থবহ যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলো একজন শাসকের জন্য গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।

টিকাঃ
৪৯১. আসরুল খুলাফায়ির রাশিদিন, ড. ফাতিহা আন নিবরায়ি: ৩০১
৪৯২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩০৫, ৩০৬; সনদ সহিহ।
৪৯৩. সহিহ বুখারি, আল-আহকাম: ৭২১৯।
৪৯৪. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/২৮১।
৪৯৫. আল মুকাদ্দিমা, ইবনু খালদুন: ২০৯।
৪৯৬. জামিউল উসুল ফি আহাদিসির রাসুল: ১/২৫২।
৪৯৭. নিজামুল হুকমি ফিল ইসলাম, আরিফ আবু উবায়দ: ২৪৮।
৪৯৮. নিজামুল হুকমি ফিল ইসলাম, আরিফ আবু উবায়দ: ২৫০।
৪৯৯. সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ: ১৮৫১।
৫০০. নিজামুল হুকমি ফিল ইসলাম: ২৫০।
৫০১. সহিহ মুসলিম, আল-ইমারাহ: ১৮৫২।
৫০২. নিজামুল হুকমি ফিল ইসলাম: ২৫৩।
৫০৩. ফিকহুশ শুরা, ড. তাওফিক আশ-শাবি: ৪৩৯; আসরুল খুলাফায়ির রাশিদিন: ৩০।
৫০৪. নিজামুল হুকমি ফিল ইসলাম: ২৫৪।
৫০৫. নিজামুল হুকমি ফিল ইসলাম: ১৫২, ১৫৩।
৫০৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩০৬
৫১১. ফিকহুশ শুরা ওয়াল ইসতিশারাহ: ৪৪১।
৫১২. সুনানু আবি দাউদ: ৩৫০৪।
৫১৩. সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ইমান, আদ-দিনু আন-নাসিহা অধ্যায় : ৫৫।
৫১৪. তারিখুদ দাওয়াহ ইলাল ইসলাম: ২৪৯।
৫১৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩০৫।
৫১৬. ফিকহুত তামকিন ফিল কুরআনিল কারিম, সাল্লাবি: ৪৫৫।
৫১৭. তাফসিবুর রাজি: ১০/১৪১।
৫১৮. ফিকহুত তামকিন ফিল কুরআনিল কারিম, সাল্লাবি: ৪৫৯।
৫১৯. তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম ফি আহদিল খুলাফা: ৪১০, ৪১১।
৫২০. ফিকহুত তামকিন ফিল কুরআনিল কারিম, সাল্লাবি: ৪৬০, ৪৬১।
৫২৩. আল-আহকামুস সুলতানিয়া, আল মাওয়ারদি: ২০১।
৫২৪. তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ২৫৮।
৫২৫. আবু বাকরিন রাজুলুদ দাওলাহ: ৪৬।
৫২৬. আস-সিদ্দিক, হায়কাল পাশা: ২২৪।
৫২৭. তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ২৪৬।
৫২৮. আস-সিয়াসাতুশ শারইয়াহ: ১০১।
৫২৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩০৫।
৫৩০. সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ইমান: ১৭২।
৫৩১. আবু বাকরিন রাজুলুদ দাওলাহ, মাজদি হামদি: ৩৬, ৩৭।
৫৩২. ফিকহুশ শুরা ওয়াল ইসতিশার: ৪৪২।
৫৩৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩০৫।
৫৩৪. সুনানু আবি দাউদ: ৩৪৬২। বাইয়ে আইনা হচ্ছে, কাউকে ঋণ প্রদান করত তার থেকে স্বল্পমূল্যে কোনো বস্তু ক্রয় করে নেওয়া। যেহেতু এটি সুদের একটি বাহানা, তাই এ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।
৫৩৫. আবু বাকরিন রাজুলুদ দাওলাহ: ৭৩।
৫৩৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩০৫।
৫৩৭. সহিহুল আলবানি, ২/৩৭০; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪০১৯।
৫৩৮. আবু বাকরিন রাজুলুদ দাওলাহ: ৬৬।
৫৩৯. তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ২৫২।
৫৪০. তাফসির ইবনি কাসির: ৫/৫৮।
৫৪১. মানহাজু কিতাবিত তারিখিল ইসলামি, মুহাম্মাদ হামিল: ৬৫।
৫৪২. তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ২৫৩।
৫৪৩. দিরাসাতুন ফিল হাজারাতিল ইসলামিয়া, আহমাদ ইবরাহিম আশ-শারিফ: ২০৯, ২১০।
৫৪৪. আশহাবু মাশাহিরিল ইসলাম ফিল হারবি ওয়াস সিয়াসাহ: ১২০১
৫৪৫. তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি: ৯২।
৫৪৬. ফিত-তারিখিল ইসলামি, ড. শাওকি আবু খলিল: ২১৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00