📄 সাকিফায়ে বনু সায়িদা
নবিজির ইনতিকালের ব্যাপারে সাহাবিগণ নিশ্চিত হওয়ার পর আনসার সাহাবিগণ সাকিফায়ে বনু সায়িদায় জমায়েত হন। ঘটনাটি ঘটে ১১শ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল। এ দিন নবিজি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। বনু সায়িদার এই সমাবেশে নবি-পরবর্তী খিলাফত-বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
আনসারি সাহাবিগণ খাজরাজ গোত্রের নেতা সাআد ইবনু উবাদার পাশে জড়ো হয়েছিলেন। মুহাজিরদের কানে আনসারদের সমাবেশের সংবাদ এসে পৌঁছলে তাঁরা আবু বকরের পাশে জড়ো হয়ে খিলাফতের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। ভাবতে থাকেন, কাকে এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া যায়। মুহাজিরগণ তাঁকে বলেন, ‘চলুন, আমরা আনসারি ভাইদের কাছে যাই, এ ব্যাপারে তাঁদেরও মতপ্রকাশের অধিকার আছে।’
এ সম্পর্কে উমর রা. বর্ণনা করেন; আমরা আনসারদের পাশে যেতে রওনা হই। সেখানে পৌঁছলে প্রথমেই পুণ্যাত্মার সঙ্গে (উয়াইম ইবনু সায়িদা এবং মাআন ইবনু আদি) সাক্ষাৎ হয়। তাঁরা উভয়ে আনসারদের অভিপ্রায় জানিয়ে আমাদের প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?’ আমরা বলি, ‘আনসারি ভাইদের কাছে যাচ্ছি।’ তারা বলেন, ‘তাঁদের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আপনারা নিজেরাই বিষয়টি সমাধা করে নিন।’ আমরা বলি, ‘আল্লাহর শপথ, তাঁদের কাছে আমাদের যেতেই হবে।’
আমরা চলতে চলতে একসময় সাকিফায়ে বনু সায়িদায় পৌঁছে যাই। সেখানে দেখতে পাই একব্যক্তি চাদর মুড়িয়ে বসে আছেন। আমি সেখানে উপস্থিত লোকজনকে জিজ্ঞেস করি ‘তিনি কে?’ লোকজন জবাব দেন, ‘সাআদ ইবনু উবাদা।’ আমি জিজ্ঞেস করি, ‘তাঁর কী হয়েছে?’ লোকজন জবাবে বলেন, ‘তিনি জ্বরে আক্রান্ত।’ আমরা সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর তাদের একজন আল্লাহ তাআলার প্রশংসাপাঠ শেষে বলতে শুরু করেন, ‘আমরা আল্লাহর আনসার এবং ইসলামের সৈনিক। হে মুহাজির ভাইগণ, তোমরা ছোট্ট একটি দল। তোমাদের মধ্য থেকে কিছু লোক উঠে দাঁড়িয়েছে, তাঁরা খিলাফত থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে চাচ্ছে।’
লোকটির কথা বলা শেষ হলে আমি কথা বলতে উদ্যত হই। আবু বকরকে সামনে রেখেই আমি কথাগুলো বলতে চাচ্ছিলাম। এ জন্য কিছু কথা আমি আগ থেকেই সাজিয়ে রাখি এবং পুরো বিষয়টি একরকম আয়ত্তে নিয়ে এসেছিলাম; কিন্তু আমি যখন দাঁড়াতে যাব, ঠিক তখন আবু বকর বলেন, ‘উমর, থামো!’ আমি থেমে যাই। কারণ, আমি তাঁকে অসন্তুষ্ট করতে চাইনি। এরপর আবু বকর কথা বলতে শুরু করেন। তিনি ছিলেন আমার চেয়ে অনেক বেশি গম্ভীর এবং ধৈর্যশীল। আল্লাহর শপথ, আমি যে কথাগুলো বলতে চাচ্ছিলাম, আবু বকর হুবহু তা-ই।
বলেন। আমার অন্তরে পুষে রাখা একটি কথাও তিনি ছেড়ে দেননি; বরং তিনি যা বলেছেন, তা ছিল আমার গুছিয়ে রাখা কথার চেয়েও অনেক অনেক উত্তম।
এরপর আবু বকর বলেন, 'আমি আপনাদের ব্যাপারে যা বলেছি, অবশ্যই আপনারা এ সবের হকদার; কিন্তু খিলাফত অবশ্যই কুরাইশদের জন্য বেশি মানানসই এবং উচিত। কারণ, বংশগত আভিজাত্যে তারাই আরবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আমি আপনাদের জন্য এই দুজনের মধ্যে একজনকে পছন্দ করছি, যাকে ইচ্ছা বেছে নেন, যার হাতে ইচ্ছা বায়আত হন।' কথাগুলো বলে তিনি আমার ও আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহর হাত ধরে আমাদের মধ্যখানে বসে পড়েন। আমার কিন্তু কথাটি মোটেও ভালো লাগছিল না। আল্লাহর শপথ, আবু বকরের উপস্থিতিতে তাঁর হাতে আমির নির্বাচিত হওয়ার চেয়ে আমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়াটাই শ্রেয়, আনসারদের একজন তখন দাঁড়িয়ে বলেন, 'আমার মনে হয়, এটাই সবচেয়ে উত্তম হবে যে, আমির হবেন আমাদের মধ্য থেকে একজন এবং আপনাদের থেকে একজন।' পরে এ নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হলে আওয়াজ উঁচু হতে থাকে। আমি অনুভব করতে পারি, ব্যাপারটি ঘোলাটে হতে যাচ্ছে। তাই দেরি না করে আবু বকরকে বলি, 'আবু বকর, হাত বাড়ান।' তিনি হাত বাড়ালে প্রথমে আমি তাঁর হাতে বায়আতগ্রহণ করি। পরে ক্রমান্বয়ে মুহাজিরগণ ও আনসারগণও বায়আতগ্রহণ করে নেন।
মুসনাদু আহমাদে বর্ণিত আছে; আবু বকর রা. কথা বলতে গিয়ে আনসারদের প্রশংসায় কুরআনে যেসব আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল, প্রথমে সেগুলো তিলাওয়াত করেন। এ ছাড়া রাসুলের হাদিসেও তাঁদের সম্পর্কে যেসব প্রশংসা বর্ণিত হয়েছে, সেসব উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, 'আপনারা জানেন, আল্লাহর রাসুল বলেছিলেন, "মানুষ যদি কোনো এক উপত্যকা ধরে চলে এবং আনসারগণ ভিন্ন উপত্যকা ধরে চলেন, তাহলে আমি আনসারদের উপত্যকা ধরেই চলব।” সাআদ, তোমার কি স্মরণ নেই, তুমি বসা ছিলে, তখন রাসুল বলেছিলেন, "কুরাইশিরাই খিলাফত ও নেতৃত্বের হকদার। পুণ্যবান লোকজন তাদের পুণ্যবান লোকদের অনুসরণ করবে এবং খারাপ লোকজন তাদের খারাপ লোকজনের অনুগত থাকবে।""
এ কথা শুনে সাআদ বলে উঠেন, 'হ্যাঁ, আপনি সত্য বলেছেন। আপনারা আমির আর আমরা আপনাদের উজির। '
টিকাঃ
৩৯৪ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/২১।
৩৯৬ আসরুল খিলাফাতির রাশিদা: উমরি: ৪০।
৩৯৭ সহিহ বুখারি, কিতাবুল হুদুদ: ৬৮৩০।
৩৯৮ মুসনাদু আহমাদ: ১/৫; আল খিলাফাতু ওয়াল খুলাফা, আল বাহানসাবি: ৫০।
📄 শিক্ষা ও তাৎপর্য
১. মানুষের সঙ্গে ব্যবহার এবং আস্থায় নিয়ে আসার যোগ্যতা
মুসনাদু আহমাদের বর্ণনা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, আবু বকর রা. কীভাবে আনসারদের অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি করে নিয়েছিলেন। কেমন করে তাদের প্রশান্ত করেছিলেন; অথচ তাঁরা মনে করছিলেন, তাঁরাই খিলাফতের হকদার। এর মাধ্যমে তিনি মুসলিম উম্মাহকে সুবিশাল এক ফিতনা থেকে রক্ষা করেছিলেন। আনসারদের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহে যেসব প্রশংসা বিদ্যমান, তিনি সেগুলো বর্ণনা করেন। বিরুদ্ধবাদীদের উপযুক্ত প্রশংসা ইসলামের নীতি। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাঁদের সঙ্গে ইনসাফের জানান দেওয়া ও তাদের ক্ষোভ দমন করা। তাদের ভেতর থেকে আমিত্ব, অহম ও অহংকার নিংড়ে বের করে ফেলা, যেন সত্য প্রকাশ পাওয়ার পর তারা সত্য গ্রহণে প্রস্তুত হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে নবিজি থেকে বর্ণিত অনেক হাদিস বিদ্যমান। এরপর আবু বকর রা. এই উপসংহারে পৌঁছোন যে, যদিও আনসারদের সম্পর্কে প্রশংসা রয়েছে, তথাপি এর উদ্দেশ্য কিন্তু এটা নয় যে, তারা খিলাফতেরও হকদার। কেননা, নবিজি অন্যত্র স্পষ্টভাবে বলেছেন, 'খিলাফতের প্রশ্নে মুহাজির কুরাইশদের হক সবার চেয়ে বেশি।
ইমাম ইবনুল আরাবি মালিকি বর্ণনা করেন; আবু বকর রা. 'খিলাফতের অধিকার কুরাইশদের হাতে' মর্মে বর্ণিত রাসুলের এই হাদিস উল্লেখ করেছিলেন, যে হাদিসে আনসারদের কল্যাণমূলক আচরণ, তাঁদের পুণ্যবানদের গ্রহণ এবং মন্দ লোকদের ক্ষমার কথা বলেছিলেন। আবু বকর রা. আনসারদের ওপর এভাবেও দলিল তুলে ধরেছিলেন যে, আল্লাহ আমাদের বলেছেন 'সাদিকিন' (সত্যবাদী) আর তোমাদের বলেছেন 'মুফলিহিন' (সফল)। তিনি মূলত কুরআনের ওই আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন,
এই সম্পদ অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য, যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি থেকে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি এবং তাঁর রাসুলের সাহায্য-কামনা করে। তারা তো সত্যাশ্রয়ী। এ ছাড়া তাদের জন্য, মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা এই নগরীতে বসবাস করেছে ও ইমান এনেছে, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে এবং মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে, এর জন্য তারা অন্তরে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না। তারা তাদেরকে নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়।
নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও। অন্তরের কার্পণ্য থেকে যাদের মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফল। [সুরা হাশর: ৮-৯]
আবু বকর বলেন, 'তোমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আমরা যেখানে যে অবস্থায়ই থাকি না কেন, তোমরা আমাদের পাশে থাকবে। আল্লাহ বলেছেন, মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও। [সুরা তাওবা: ১১৯]
এভাবে তিনি সমুজ্জ্বল কিছু প্রমাণ তুলে ধরেন, যে কারণে আনসারগণ তাঁর উপদেশ গ্রহণ করে তাঁর আনুগত্য মেনে নেন।
আবু বকর রা. তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে এ কথা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, খিলাফত ও নেতৃত্বের জন্য সেই লোকদেরই সামনে রাখা যায়, আরবরা যাদের নেতৃত্ব অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিতে পারে এবং যাদের মাধ্যমে সামাজিক স্থিতিশীলতা আসবে। ফিতনার উদ্ভব ঘটবে না। তিনি এই বাস্তবতাও তুলে ধরেছিলেন যে, আরবরা কেবল কুরাইশি মুসলমানদের নেতৃত্বই গ্রহণ করতে পারে। যেহেতু খোদ রাসুল এই বংশের লোক। এরপর তাদের মনমগজে কুরাইশের সম্মানের বিষয়টি স্থান করে নেয়। আবু বকরের মূল্যবান ও যৌক্তিক এসব কথার ফলে আনসারগণ শান্ত হয়ে যান। তাঁরা মুহাজিরদের নেতৃত্ব মেনে তাঁদের অনুগত হয়ে থাকতে আগ্রহী হন। নবিজির সময়েও এমন ছিল। এভাবেই মুসলমানরা এক মহা দুর্যোগের সময়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং উম্মাহ এক মহা বিভেদ থেকে মুক্তি পায়。
২. খিলাফতের দায়িত্বগ্রহণে অনীহা: জাতীয় ঐক্যকে অগ্রাধিকার প্রদান আবু বকর রা. সাকিফায়ে বনু সায়িদায় তাঁর বক্তব্য শেষ করে খিলাফতের জন্য উমর ও আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে এগিয়ে ধরেন। উমর রা. বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। পরে তিনি তা প্রকাশও করেছেন। উমর বলেন, 'আবু বকরের কেবল এ কথাটিই আমার অপছন্দ লেগেছিল। আল্লাহর শপথ, আবু বকরের উপস্থিতিতে তাঁর হাতে আমির নির্বাচিত হওয়ার চেয়ে আমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়াটাই শ্রেয়। যেহেতু আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে উমরের আস্থায় একটুও ঘাটতি ছিল না এবং তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্তও ছিলেন, তাই তাঁকে বলেন, 'আবু বকর, আপনার হাত বাড়ান।' অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তখন আবু বকরও হাত বাড়িয়ে দেন। উমর রা. বলেন, 'আমি তাঁর হাতে বায়আতগ্রহণের পরই মুহাজিরগণ বায়আত হন। এরপর আনসারগণও হয়ে যান।'
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, উমর রা. বলছিলেন, 'আনসারগণ, তোমরা কি জানো না, রাসুল ﷺ আবু বকরকে সালাতের ইমামতির নির্দেশ দিয়েছিলেন? তোমাদের মধ্যে কে এ বিষয়টি পছন্দ করবে যে, সে আবু বকরের সামনে এগিয়ে যাবে?' এ কথা শুনে আনসারগণ বলেন, 'আমরা আবু বকর থেকে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।' সত্যিই আবু বকরকে খলিফা নির্বাচন এমন এক গুরুত্বপূর্ণ অনুগ্রহ, যা আল্লাহ তাআলা উমর রা.-কে দান করেছিলেন।
সত্যিই এটা ভাবার বিষয় যে, রাসুল ﷺ তাঁর জীবনের শেষ দিকে অসুস্থ অবস্থায় এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আবু বকরের ইমামতের ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। এ থেকেও তো ধারণা পাওয়া যায় যে, খিলাফতের ব্যাপারে আবু বকর রা. ছিলেন অন্যদের থেকে এগিয়ে। উমরের কথাটি ছিল সাথিকে সম্মান জানানোর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ এবং প্রবৃত্তিপরায়ণতা থেকে মুক্ত।
অপরদিকে খিলাফতের ব্যাপারে আবু বকর রা. তাঁর অনাগ্রহের কথা বার বার বলছিলেন। এর মাধ্যমে তাঁর তাকওয়া ও পরহেজগারির বিষয়টি ফুটে ওঠে। দায়িত্বগ্রহণের পর বিভিন্ন ভাষণে তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি কখনোই খিলাফত গ্রহণে প্রত্যাশী ছিলাম না। কখনো আমার মধ্যে এমন আগ্রহ জন্মায়নি। আমি আল্লাহর কাছে এ ব্যাপারে প্রার্থনাও করিনি; কিন্তু তখন আমার ভয় হচ্ছিল, যদি আমি হাত না বাড়াই, তাহলে উম্মাহ এক ভয়াবহ ফিতনায় পতিত হবে। খিলাফত গ্রহণে আমার কোনো শান্তি না থাকলেও আমি এই গুরুদায়িত্ব নিজ কাঁধে উঠিয়ে নিয়েছি। আল্লাহ যদি আমাকে এটি বহনের ক্ষমতা না দেন, তাহলে এ ভার বহনের শক্তি আমার নেই। আমার কামনা ছিল, যদি আমার পরিবর্তে কোনো শক্তিমান ব্যক্তি এ ভার বহন করে নিত। '
এ ছাড়া আবু বকর রা. থেকে এ কথাটিও প্রমাণিত যে, 'আহ! আমি যদি উমর কিংবা আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহর হাতে খিলাফতের দায়িত্ব তুলে দিয়ে তাদের অনুগত হয়ে থাকতে পারতাম। '
আবু বকর তাঁর ভাষণে বেশ কয়েকবার খিলাফতের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগের আগ্রহ প্রকাশ করছিলেন। বলছিলেন, 'লোকসকল, এটা তোমাদের দায়িত্ব, যা তোমরা আমার ওপর অর্পণ করে রেখেছ। তোমরা যাকে ইচ্ছা তার হাতে এ দায়িত্ব তুলে দাও। আমি তোমাদের মতো সাধারণ একজন হয়ে থাকতে চাই।' লোকজন জবাবে বলতেন, 'আবু বকর, এ দায়িত্ব আপনার হাতে অর্পিত হওয়ায় আমরা খুশি। আপনি তো দুইয়ের দ্বিতীয়জন এবং রাসুলের গুহার সাথি।
আবু বকর রা. مسلمانوں আত্মাগুলোকে তাঁর খিলাফতের ব্যাপারে ভিন্নমত কিংবা ভিন্নচিন্তা থেকে পবিত্র করেন। তিনি শপথ করে বলেন, 'লোকসকল, তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো। যে ব্যক্তিই আমার বায়আত গ্রহণে নিজের মধ্যে লজ্জা অনুভব করে, সে যেন আপন পায়ে দাঁড়িয়ে যায়।' এ সময় আলি রা.-ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর হাতে তরবারি ছিল। তিনি আবু বকরের একেবারে নিকটে পৌঁছে যান। আলির এক পা তখন মিম্বারের এক থাকে; আর এক পা ছিল নিচের কাঁকরে। এমতাবস্থায় বলে ওঠেন, 'আল্লাহর শপথ, আমরা আপনাকে পদচ্যুত করতে পারি না কিংবা পদচ্যুত করার দাবিও করতে পারি না। আপনাকে খোদ আল্লাহর রাসুল যেখানে সামনে বাড়িয়ে দিয়েছেন, সেখানে কে আছে, যে আপনাকে পেছনে টেনে নামায়। ' শুধু আবু বকরই নন, সে সময়ের সোনালি মানুষগুলোর চরিত্রই ছিল এমন যে, তাঁদের কেউ নেতৃত্বের জন্য লালায়িত ছিলেন না।
উল্লিখিত প্রমাণপঞ্জির আলোকে আমরা বলতে পারি, সাকিফায়ে বনু সায়িদায় সাহাবিদের মধ্যে যে আলোচনা ছিল, তা ওই আলোকিত মনমানসিকতা থেকে মুক্ত ছিল না। এ কথা তো দিবালোকের মতোই উজ্জ্বল যে, আনসার সাহাবিগণ ইসলামের সমুজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশী ছিলেন। তাই তাঁরা যতক্ষণ-না আবু বকরের হাতে বায়আত নিতে পারছেন, ততক্ষণ যেন শান্ত হতে পারছিলেন না। আর আবু বকরও এই উদ্দেশ্য সামনে রেখেই বায়আতের জন্য নিজের হাত প্রসারিত করতে সম্মত হয়েছিলেন। নতুবা সাহাবিদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মেজাজ সে-সকল লোকের দৃষ্টিভঙ্গি ও মেজাজ থেকে শত শত মাইল দূরত্বে ছিল, যারা ইলমি মানহাজ এবং আলোচ্য চিন্তাধারার বাইরে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। বলতে গেলে তথাকথিত ওই গবেষকদের গবেষণার ভিতটাই ছিল তখনকার যুগের মানুষের মনমানসিকতার বিপরীত। যদি ওদের এ কথা স্বীকার করে নেওয়া হয় যে, সাকিফায়ে বনু সায়িদায় খিলাফতের বিষয় নিয়ে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও বিবাদ জন্ম নিয়েছিল তাহলে আনসারগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং মদিনার অধিবাসী হওয়ার পরও কেন তাঁরা আবু বকরের হাতে বায়আতগ্রহণ করলেন? কেন তারা খিলাফতের নিবেদিতপ্রাণ সৈনিকদের কাতারে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন? কেন এরপর খিলাফতের ঝান্ডা হাতে প্রাচ্য থেকে প্রতীচ্যে দাবড়ে বেড়ালেন?
সিদ্দিকি খিলাফতের নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং মুরতাদদের ফিতনা দমনে আনসারদের আগ্রহ-উদ্দীপনা থেকেই বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে থাকে—তাঁরা ছিলেন প্রবৃত্তিপরায়ণতার থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। অন্যদের মতো আনসারগণও আবু বকরের হাতে খিলাফতের বায়আতগ্রহণ করেন। মুহাজির ও আনসারদের মধ্যকার ভ্রাতৃবন্ধন ছিল ওই কথিত গবেষকদের ভ্রান্ত চিন্তাভাবনার অনেক ঊর্ধ্বে, যে গবেষকরা আঁতিপাঁতি করে কেবল আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে মতভিন্নতাই দেখতে চায়。
৩. সাআদ ইবনু উবাদার অবস্থান সাকিফায়ে বনু সায়িদায় পারস্পরিক আলোচনার পরই সাআদ ইবনু উবাদা রা. তাঁর খিলাফতির দাবি প্রত্যাহার করেন। তিনি আবু বকরের খিলাফত গ্রহণপূর্বক তাঁর হাতে বায়আত হন। তাঁর চাচাতো ভাই বাশির ইবনু সাআদ আনসারি ছিলেন ওই সমাবেশে আনসারদের পক্ষ থেকে প্রথম বায়আত গ্রহণকারী। খিলাফতের বিষয় নিয়ে সেখানে দলাদলি বা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল মর্মে কোনো বিশুদ্ধ বর্ণনা খুঁজে পাওয়া যায় না; অথচ কতিপয় ইতিহাসবিদ ইনিয়ে-বিনিয়ে তা-ই বলার চেষ্টা করে থাকেন। তখনো তাঁদের মধ্যে পুরোমাত্রায় ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় ছিল। বিশুদ্ধ বর্ণনামতে, সেই ক্রান্তিলগ্নে তা আরও প্রগাঢ় হয়েছিল। এ ছাড়া কোনো বিশুদ্ধ বর্ণনা দ্বারা এ মর্মে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা আদৌ সম্ভব নয় যে, রাসুলের ইনতিকালের পর আবু বকর, উমর ও আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. খিলাফত কুরাইশ ও মুহাজিরদের মধ্যে ধরে রাখার চক্রান্ত আঁটতে কোথাও একত্র হয়েছিলেন। কেননা, তাঁরা তো ছিলেন আল্লাহভীরু। তাকওয়া ছিল তাঁদের চরিত্রের ভূষণ। তারা এমন হীন আচরণ থেকে অনেক অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন।
কতিপয় কালো অন্তরের অধিকারী বিদআতি ইতিহাসবিদ সাআد ইবনু আবি উবাদাকে মুহাজিরদের প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থানের অসৎ প্রয়াস পেয়ে থাকে। তারা বলতে চায়, তিনি ছিলেন খিলাফতের দাবিদার, নেতৃত্বলাভী। এ লক্ষ্যে তিনি নিরন্তর চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছিলেন। চক্রান্ত বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে मुसलमानों মধ্যে ভাঙন ধরানোরও প্রয়াস পাচ্ছিলেন; অথচ যখন আমরা এই মহান সাহাবির জীবনেতিহাস অধ্যয়ন করি, তাঁর জীবনধারা পর্যালোচনা করি, তখন ইসলামের খিদমতের প্রশ্নে তাঁর ব্যক্তিত্ব এতটাই উজ্জ্বল হয়ে প্রতিভাত হয় যে, তিনি ছিলেন ওই হাতেগোনা অল্প লোকদের একজন, যাঁদের মধ্যে দুনিয়ার লোভ বলতে কিছুই ছিল না। তিনি ছিলেন দুনিয়াপ্রীতি থেকে পবিত্র। আকাবার দ্বিতীয় বায়আতে তিনিই আনসারদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কুরাইশরা যখন তাঁকে ধাওয়া করে বন্দি করে ফেলে, তাঁর উভয় হাত গলার সঙ্গে জড়িয়ে বেঁধে মক্কায় নিয়ে আসে, তখন জুবায়ের ইবনুল মুতয়িম বিষয়টি জানতে পেরে এগিয়ে এসে তাঁকে মুক্ত করেন। কেননা, তিনি মদিনায় এলে তাঁর বাড়িতেই উঠতেন।
সাআদ ইবনু উবাদা ছিলেন সেই মহান সাহাবিদের একজন, যিনি বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আল্লাহর কাছে বদরি সাহাবিদের মর্যাদা কতটুকু, তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর পরিবার ছিল বদান্যতার গুণে গুণান্বিত। খোদ নবিজিই এর সাক্ষ্য দিয়েছেন। রাসুল তাঁর এবং সাআদ ইবনু মুআজের ওপরই বেশি নির্ভর করতেন। যেমন : গাজওয়ায়ে খন্দকের ঘটনা থেকেই ব্যাপারটি স্পষ্টতা পায়। যখন আল্লাহর রাসুল তাঁদের উভয়ের সঙ্গে মদিনার উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ উয়াইনা ইবনু হিসন ফাজারিকে দেওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ করেন, তখন উভয়ে যে জবাব দিয়েছিলেন, তা ছিল তাঁদের ইমানের গভীরতা এবং নবিজির ওপর চূড়ান্ত পর্যায়ের আত্মোৎসর্গের দলিল।
সাআদের ব্যাপারটি একেবারেই স্পষ্ট। তিনি ছিলেন এমন এক সাহাবি, ইসলামের খিদমতে যাঁর অতীত ছিল স্বর্ণোজ্জ্বল। রাসুলের প্রতি ছিল যাঁর অন্তহীন ভালোবাসা। তাঁর ব্যাপারে এ কথা কল্পনাও করা যায় না যে, তিনি সাকিফায়ে বনু সায়িদায় জাহিলি যুগের গোত্রপ্রীতি জাহির করে নিজের হাতে খিলাফত তুলে নেওয়ার চেষ্টা চালাবেন। অনুরূপ কোনো কোনো গ্রন্থেও এ কথাটি দেখতে পাওয়া যায় যে, 'তিনি আবু বকরের হাতে খিলাফতের বায়আতগ্রহণের পর مسلمانوں সঙ্গে একত্রে সালাত আদায় করেননি এবং হজের সফরে مسلمانوں সঙ্গে মুজদালিফা থেকেও বের হননি; বরং তিনি মুসলিমসমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা গ্রহণ করেছিলেন। আসলে এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং অপবাদ বই কিছু নয়। বিশুদ্ধ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত, সাআদ ইবনু উবাদা আবু বকরের হাতে বায়আতগ্রহণ করেছিলেন।
সাকিফায়ে বনু সায়িদার ভাষণে আবু বকর রা. আনসারদের প্রশংসা করেন। তিনি তাঁদের বলেন, 'আপনারা নিশ্চয় জানেন, রাসুল বলেছেন, “যদি মানুষ এক উপত্যকা দিয়ে চলে আর আনসারগণ ভিন্ন উপত্যকা দিয়ে চলে, তাহলে আমি আনসারদের উপত্যকা দিয়েই চলব। ” এরপর সাআদ ইবনু উবাদাকে অকাট্য দলিল এবং সিদ্ধান্তকর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, 'সাআদ, তোমার কি স্মরণ আছে, তুমি বসা ছিলে আর রাসুল বলেছিলেন, "খিলাফতের অধিকারী হবে কুরাইশের লোকজন। তাদের পুণ্যবান লোকগুলো পুণ্যবানদের এবং মন্দ লোকজন মন্দ লোকদের অনুসরণ করবে," তখন সাআد বলেন, 'আপনি সত্য বলেছেন, আমরা প্রজা এবং আপনারা নেতা। ' তাঁর এ কথা বলার পরপরই লোকজন আবু বকরের হাতে বায়আতের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান।
এর মাধ্যমে আবু বকরের হাতে সাআদের বায়আত প্রমাণিত হয় এবং তাঁর খিলাফতের ওপর আনসারদের ইজমাও প্রমাণিত হয়। এমতাবস্থায় ভ্রান্ত ও মনগড়া বর্ণনাগুলো প্রচার করে বেড়ানোর কোনো মানে হয় না। এগুলো বাস্তবতাবিরোধী এবং মহান আনসারদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর অপবাদ বই কিছু নয়। এগুলো বলে বেড়ানো দ্বারা প্রকারান্তরে এই অপপ্রচারই চালানো হয় যে, আনসারগণ मुसलमानों ঐক্যে ফাটল ধরানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন। এ দ্বারা ইসলামের জন্য আনসারদের সাহায্য-সহায়তা এবং জিহাদের জন্য তাঁদের অকল্পনীয় ত্যাগ অস্বীকার করা হয়। প্রকারান্তরে তাদের ইসলামকেই আহত করা হয়। কী ভয়ংকর কথা, ইসলামের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া সেই সোনার মানুষই নাকি তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয় মুহাজির ভাইদের বলেছেন, 'আমি তোমাদের হাতে ততক্ষণ পর্যন্ত বায়আত করব না, যতক্ষণ আমার তৃণীরে থাকা তির তোমাদের ওপর নিক্ষেপ না করছি। আমার বর্শা তোমাদের রক্তে রঞ্জিত না করছি। আমার তরবারি দিয়ে তোমাদের গর্দানে আঘাত না হানছি।' এরপর তিনি নাকি তাঁদের পেছনে সালাত পড়েননি, তাঁদের কোনো সমাবেশেও অংশগ্রহণ করেননি এবং তাঁদের সঙ্গে হজেও যাননি। আল্লাহর শপথ, এসব কথা ইসলামের শত্রুদের তৈরি, বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
এই যে বর্ণনা, যার মাধ্যমে মুহাজির ও আনসারদের অকল্পনীয় ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যকে আহত করার ঘৃণ্য চেষ্টা চালানো হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, মনগড়া। নিশ্চয় এর বর্ণনাকারী জঘন্য বিদআতি এবং প্রবৃত্তির দাস। আলিমগণের কাছে এসবের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। নিশ্চয় সে একজন ভ্রান্ত ইতিহাসবিদ। বিশেষ করে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোই ছিল তার উপাদেয় খাদ্য।
ইমাম জাহাবি এই বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, এর সনদটি কেমন আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। অর্থাৎ, চূড়ান্ত পর্যায়ের দুর্বল। এই বর্ণনাটি সাআদ ইবনু উবাদার পবিত্র জীবনাচারের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি রাসুলের হাতে যে বিষয়ে বায়আত হয়েছিলেন এবং তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, তা এসব মনগড়া কল্পকাহিনিকে সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দেয়।
৪. উমর এবং হাব্বাব ইবনু মুনজিরের মধ্যকার বিরোধের বাস্তবতা
সাকিফায়ে বনু সায়িদায় উমর এবং হাব্বাব ইবনু মুনজিরের মধ্যকার মতবিরোধ প্রসঙ্গে যে বর্ণনা রয়েছে, তা আদৌ সঠিক নয়। উমর রা. রাসুলের জীবদ্দশায় কখনো হাব্বাব ইবনু মুনজিরকে অসন্তুষ্ট করেননি। এ সম্পর্কে উমর রা. বলেন, 'হাব্বাব নিজে আমার কথার জবাব দিচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার কোনো প্রকার মনোমালিন্য হয়নি। নবিজির জীবদ্দশায় তাঁর ও আমার মধ্যে একবার সামান্য কথা কাটাকাটি হলে নবিজি আমাকে নিষেধ করেছিলেন। সেই থেকে আমি শপথ করে নিয়েছিলাম, আর কখনো তাঁকে এমন কোনো কথা বলব না, যে কারণে তিনি কষ্ট পান। অনুরূপ হাব্বাব ইবনু মুনজির রা. সম্পর্কে এই বর্ণনায় যা কিছু বলা হয়েছে, এগুলো তাঁর সুখ্যাত প্রজ্ঞা এবং সুন্দর সিদ্ধান্ত প্রদান ক্ষমতার বিরোধী। তিনি উত্তম সিদ্ধান্ত প্রদানের যোগ্যতা রাখতেন বিধায় রাসুলের যুগে 'জুর-রায়' (সিদ্ধান্তদাতা) হিসেবে খ্যাত ছিলেন। রাসুল বদর এবং খন্দকযুদ্ধে তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন। বাকি থাকে হাব্বাবের এ কথা যে, 'আমাদের মধ্য থেকে একজন আমির হবেন; আর আপনাদের মধ্য থেকে একজন।' এর ব্যাখ্যা তিনি নিজেই দিয়েছেন এভাবে-এর দ্বারা তাঁর নেতৃত্বপ্রাপ্তি উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, খিলাফতের মাসআলায় আমরা আপনাদের সমকক্ষতার দাবি করতে পারি না। আমাদের কেবল এই ভয় ছিল যে, কী জানি এমন মানুষ ক্ষমতায় এসে যায়, যাদের পিতা ও ভাইদের আমরা ইতিপূর্বে হত্যা করেছিলাম। মুহাজিরগণ তাঁর কথা গ্রহণ করেন। তাঁর ওজর সঠিক মনে করেন; আর খোদ মুহাজিরগণও মুশরিকদের হত্যায় শরিক ছিলেন।
৫. হাদিস الائمة من قريش এবং আনসারদের অবস্থান
হাদিসটি বুখারি-মুসলিমসহ হাদিসের অন্যান্য গ্রন্থে বিভিন্ন শব্দে এসেছে। বুখারিতে মুআবিয়া রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেছেন,
খিলাফতের এ ব্যাপারটি কুরাইশদের হাতে তত দিন থাকবে, যত দিন তারা দীনের ওপর অটল থাকবে। যারা এটি তাদের থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইবে, আল্লাহ তাদের মুখ উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। সহিহ মুসলিমে এসেছে,
ইসলাম খলিফাদের মাধ্যমে সব সময় বিজয়ী ও সম্মানজনক অবস্থানে থাকবে, আর খলিফাগণ সকলেই হবেন কুরাইশদের মধ্য থেকে। আবদুল্লাহ ইবনু উমর রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেছেন,
খিলাফত কুরাইশদের মধ্যেই থাকবে, যদিও তাদের মধ্য হতে শুধু দুজন মানুষই অবশিষ্ট থাকে。
এ ছাড়া রাসুল বলেছেন,
মানুষ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কুরাইশদের অনুগামী হবে। मुसलमानों মধ্যে مسلمانগণ এবং কাফিরদের মধ্যে কাফিরগণ।
বুকায়র ইবনু ওয়াহাব আল জাজারি থেকে বর্ণিত; আনাস ইবনু মালিক রা. আমাকে বলেছেন, 'আমি তোমার কাছে একটি হাদিস বর্ণনা করছি, যা সবাই বর্ণনা করে না। আমরা আনসারদের এক ঘরে বসা ছিলাম। রাসুল -ও সেখানে উপস্থিত হন। তিনি দরজার উভয় কপাট ধরে দাঁড়িয়ে থেকে বলেন,
ইমাম হবেন কুরাইশদের মধ্য থেকে, তোমাদের ওপর তাদের অধিকার রয়েছে; আর তোমাদেরও তাদের ওপর অধিকার রয়েছে। তাদের কাছে দয়া চাইলে তারা দয়া করবে, অঙ্গীকার করলে তা পূরণ করবে; আর শাসন পরিচালনা করলে ইনসাফ করবে।
আল্লামা ইবনু হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে الامراء من قريش (আমির হবেন কুরাইশ থেকে) এর অধীনে বিষয়টি অনেক হাদিস, সুনান, মাসানিদ এবং মুসান্নাফাত দ্বারা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। বিষয়টি বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে। তবে পাশাপাশি অর্থবোধক এবং সব বর্ণনাই এ কথা প্রমাণ করে যে, শরয়ি নেতৃত্ব থাকবে কুরাইশদের হাতে। এই নেতৃত্ব দ্বারা খিলাফত উদ্দেশ্য। খিলাফত ছাড়া অন্য সব নেতৃত্বে مسلمانরা পরস্পর সমান অধিকার ভোগ করবে।
হাদিসে স্পষ্টভাবে 'খিলাফত কুরাইশদের অধিকার' কথাটি যেভাবে বলা হয়েছে, তেমনিভাবে অনেক হাদিসে তাদের অন্ধ-অনুসরণের ব্যাপারেও নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা ততক্ষণ খিলাফতের হকদার থাকবে, যতক্ষণ দীনের ওপর অটল থাকবে। মুআবিয়া এবং আনাস রা. বর্ণিত হাদিসে এ কথাই এসেছে।
যদি তাদের কাছে দয়া প্রার্থনা করা হয় তাহলে তারা দয়া করবে; আর অঙ্গীকার করলে তা পূরণ করবে, শাসন করলে ইনসাফ বজায় রাখবে। যে এমন করবে না, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা এবং পুরো মানবজাতির অভিসম্পাত।
একইভাবে কুরাইশরা যদি আল্লাহর নাজিলকৃত শরিয়ত অনুযায়ী শাসন পরিচালনা থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে তাদের অনুসরণের ব্যাপারে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কারণ, শরিয়ত বাস্তবায়নে অনীহ হওয়া উম্মাহর জন্য বিপজ্জনক। এমতাবস্থায় হাদিস তাদের অনুসরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। তাদের থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এমতাবস্থায় তাদের সঙ্গ দেওয়া হবে উম্মাহর ভবিষ্যৎ শঙ্কার মধ্যে ঠেলে দেওয়া। রাসুল ﷺ বলেছেন, 'আমার উম্মাহর ধ্বংস এবং বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ হবে কুরাইশের কতিপয় যুবক শাসক। এরপর যখন তাঁর কাছে প্রশ্ন করা হয়, 'এমতাবস্থায় আমাদের কী করতে আপনি আদেশ দেন।' তখন রাসুল ﷺ বলেন, 'আহ! লোকজন যদি তাদের পদচ্যুত করে দিত। '
এই দলিলসমূহের আলোকে الائمة من قريش (ইমাম হবেন কুরাইশ থেকে) মাসআলাটি পরিষ্কার হয়ে যায়। অনুরূপ এ বিষয়টিও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আনসারগণ উক্ত নীতি, শর্ত ও ভিত্তির নিরিখেই কুরাইশদের আনুগত্য কবুল করে নিয়েছিলেন। তাঁরা রাসুলের হাতে বায়আত গ্রহণ করে আনুগত্য, বিপদে ধৈর্যধারণ এবং নেতৃত্ব থেকে স্পষ্ট কুফরি প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের থেকে শাসনক্ষমতা ছিনিয়ে না নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন。
আনসারদের কাছে খিলাফতের পূর্ণ ধারণা বিদ্যমান ছিল। এটা তাঁদের কাছে অজানা কিংবা দ্ব্যর্থবোধক কিছু ছিল না। তাঁদের অনেকেই ছিলেন الائمة من قريش হাদিসটির বর্ণনাকারী। আর যাঁদের জানা ছিল না, তাঁরাও আবু বকরের মুখে হাদিসটি শুনে নীরব হয়ে গিয়েছিলেন। অতএব বলা যায় খিলাফতের মাসআলাটি পারস্পরিক পরামর্শ ও শরিয়তের দলিলের মাধ্যমে পূর্ণতায় পৌঁছেছিল।
সাকিফায়ে বনু সায়িদায় বায়আত সংঘটিত হওয়ার পর আনসারদের মধ্যে কাউকে খিলাফতের দাবি নিয়ে দাঁড়াতে শোনা যায়নি। এ থেকেও প্রমাণিত হয়, এই সমাবেশে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তাতে সকলের পূর্ণ সমর্থন ছিল। কোনো ভিন্নমত ছিল না। তাঁরা এটার সত্যায়ন করেছিলেন।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ওই লোকদের কথা একেবারে অগ্রহণযোগ্য ও অযথার্থ প্রমাণিত হয়, যারা বলে থাকে الائمة من قريش ছিল একটি বাহানামাত্র, যা কুরাইশরা আনসারদের থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করছিলেন।
অথবা এটি ছিল আবু বকরের ব্যক্তিগত অভিমত। এটি কোনো হাদিসে রাসুল ছিল না কিংবা এটি ছিল কুরাইশের রাজনৈতিক চিন্তাধারার ফসল, যা তৎকালে খ্যাত ছিল; আর আরব সমাজব্যবস্থায় কুরাইশের চাপ প্রতিভাত হচ্ছিল। এই হাদিসগুলোকে আবু বকরের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কিংবা কুরাইশদের রাজনৈতিক চাল আখ্যা দেওয়া খুলাফায়ে রাশিদার ইতিহাসে বিকৃতিসাধন বই কিছু নয়; অথচ সেই সোনালি যুগের ইতিহাস মুহাজির-আনসার এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের কল্যাণময় প্রচেষ্টা এবং দীনি ভ্রাতৃত্বের ওপরই প্রতিষ্ঠিত।
৬. আবু বকরের খিলাফতের প্রতি কুরআনের ইঙ্গিতপূর্ণ আয়াত কুরআনুল কারিমে এমন কিছু আয়াত রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, রাসুলের পরে খলিফা হবেন আবু বকর রা.। আল্লাহ কুরআনে বলেন, আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করো—তাদের পথ, যাদের তুমি অনুগ্রহ দান করেছ। তাদের পথ নয়, যারা ক্রোধ-নিপতিত ও ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত। [সুরা ফাতিহা : ৫, ৬, ৭]
আবু বকর রা. ছিলেন সেই লোকদের একজন, যাঁদের ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের নির্দেশ দিয়েছেন—তারা যাতে আল্লাহর দরবারে দুআ করে, আল্লাহ যেন তাদের সে-সকল লোকদের পথে পরিচালিত করেন। কারণ, ওরা আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত বান্দা। আর সাহায্যপ্রাপ্ত বান্দাদের মধ্যে সিদ্দিকদের কথাও রয়েছে। যেমন: আল্লাহ বলেছেন, আর কেউ আল্লাহ এবং রাসুলের আনুগত্য করলে সে নবি, সত্যনিষ্ঠ, শহিদ, সৎকর্মপরায়ণ—আল্লাহ যাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন—তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী। [সুরা নিসা : ৬৯]
রাসুল বলেছেন, 'আবু বকর রা. সিদ্দিকদের মধ্যে গণ্য।' অতএব প্রমাণিত হয়, তিনি কেবল সিদ্দিকদের দলের সাধারণ একজন সদস্যই ছিলেন না; বরং তাঁদের অগ্রপথিক ছিলেন। এ ছাড়া এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, আবু বকর সেই লোকদের একজন, যাঁদের পথ ছিল সরল। তাই সাধারণ কোনো মুসলমানেরও বুঝতে বাকি ছিল না—নবিজির অবর্তমানে তিনিই হবেন খলিফাতুন নবি।
ইমাম রাজি রাহ. বলেন, আল্লাহর বাণী— 'আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করো— তাদের পথ, যাদের তুমি অনুগ্রহ দান করেছ। তাদের পথ নয়, যারা ক্রোধ-নিপতিত ও ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত। [সুরা ফাতিহা : ৫, ৬, ৭] আবু বকরের ইমামতের ওপর স্পষ্ট দলিল। কেননা, আমরা উল্লেখ করে এসেছি যে, এখানে صِرْطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ এর পূর্বে اَهْدِنَا উহ্য রয়েছে। মূলত ছিল اَهْدِنَا صِرُطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ আমাদের সাহায্যপ্রাপ্ত বান্দাদের পথপ্রদর্শন করুন। আর আল্লাহ অন্য আয়াতে সাহায্যপ্রাপ্ত বান্দাদের ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন,
তারা নবি, সত্যনিষ্ঠ, শহিদ সৎকর্মপরায়ণ—যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন—তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী। [সুরা নিসা : ৬৯]
আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সত্যনিষ্ঠ তথা সিদ্দিকদের নেতা হলেন আবু বকর রা.। অতএব আয়াতের মর্ম দাঁড়াচ্ছে—আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমরা যেন সেই হিদায়াত খুঁজি, যে হিদায়াতের ওপর আবু বকর এবং অন্য সিদ্দিকগণ ছিলেন। আবু বকর যদি পথভ্রষ্ট হতেন, তাহলে তিনি অনুসরণীয় হতে পারতেন না। সুতরাং আমরা বলতে পারি, এই আয়াত আবু বকরের খিলাফত ও ইমামতের কথা প্রমাণ করে।
আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু আমিন শানকিতি বলেন, এই আয়াতের মাধ্যমে আবু বকরের ইমামত প্রমাণিত হয়। তিনি ওই লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যাঁদের অনুসরণ করতে আল্লাহ আমাদের 'সাবউল মাসানি' তথা সুরা ফাতিহায় নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা যেন তাঁদের পথে চলতে পারি, এ জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাই। আল্লাহ বলেন,
মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে কেউ দীন থেকে ফিরে গেলে নিশ্চয় আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং তারাও তাঁকে ভালোবাসবে; তারা হবে মুমিনদের প্রতি কোমল এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন এবং আল্লাহ প্রাচুর্যময় সর্বজ্ঞ। [সুরা মায়িদা : ৫৪]
এই আয়াতে উল্লিখিত গুণাবলি আবু বকর এবং তাঁর বাহিনী তথা সাহাবিদের মধ্যেই প্রথম দেখা যায়, যাঁরা মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন। আল্লাহ পূর্ণ গুণাবলি দ্বারা তাঁদের প্রশংসা করেছেন। একইভাবে এই আয়াত খিলাফতে সিদ্দিকের কথাও প্রমাণ করে।
আল্লাহ তো সর্বজ্ঞানী। তিনি প্রথম থেকেই জানতেন, রাসুলের ইনতিকালের পরই ইরতিদাদি ফিতনার ঢেউ উথলে উঠবে। তাই তিনি এমন লোকদেরই নিয়ে আসার অঙ্গীকার করেন। আল্লাহর ওয়াদা তো অবশ্যই সত্য হয়ে থাকবে। তারা হবে আল্লাহর প্রিয়পাত্র এবং তারা আল্লাহকে ভালোবাসবে, যারা হবে মুমিনদের মোকাবিলায় কোমল এবং কাফিরদের মোকাবিলায় কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না।
অতএব আল্লাহর ইলম অনুযায়ী রাসুলের ইনতিকালের পর ইরতিদাদি ঢেউ উথলে ওঠে এবং আল্লাহর সেই ওয়াদা বাস্তবায়িত হয়। আবু বকর রা. তখন জিহাদের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে যান। তাঁর অনুসরণকারী সাহাবিগণও তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে জিহাদ করেন। যারা তাঁদের কথা অমান্য করছিল এবং তাঁদের সমালোচনা করছিল, তাঁরা তাদের কোনো পরোয়া করেননি। ওদের ভয়ে তাঁরা কাবু হননি। ফলে হক বিজয়ী হয় এবং বাতিল পরাস্ত হয়।
রাসুলের ইনতিকালের পর আল্লাহর অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হওয়া ছিল বিশ্ববাসীর জন্য একটি নিদর্শন। তেমনই আবু বকরের খিলাফত সত্য হওয়ার বড় এক দলিলও এটি। আল্লাহ বলেন,
যদি তোমরা তাকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন। যখন কাফিরগণ তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দুজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয় গুহার ভেতর ছিল। সে তখন তার সঙ্গীকে বলেছিল, "বিষণ্ণ হয়ো না, আল্লাহ তো আমাদের সঙ্গে আছেন।” এরপর আল্লাহ তার ওপর প্রশান্তি বর্ষণ করেন এবং তাকে এমন এক বাহিনী দ্বারা শক্তিশালী করেন, যা তোমরা দেখোনি এবং তিনি কাফিরদের কথা হেয় করেন। আল্লাহর কথাই সর্বোপরি সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [সুরা তাওবা : ৪০]
ইমাম কুরতুবি বলেন, কয়েকজন আলিম আল্লাহর বাণী إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ ثَانِيَ اثْنَيْنِ 'সে ছিল দুজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয় গুহার ভেতর ছিল' দ্বারা প্রমাণ করে থাকেন, এ আয়াতে রাসুলের পরে আবু বকরের খলিফা হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত বিদ্যমান। কেননা, খলিফা তো সব সময় দ্বিতীয়ই হয়ে থাকেন। তিনি বলেন, আমি আমার উসতাজ আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনু উমরকে বলতে শুনেছি, আবু বকর রা. এ কারণে ثَانِيَ اثْنَيْنِ তথা 'দুজনের দ্বিতীয়জন' হতে পেরেছিলেন যে, তিনি রাসুলের ইনতিকালের পর ইসলামি বিশ্বকে এমনভাবে সামলে নিয়েছিলেন, যেভাবে শুরুর দিকে রাসুল সামলে নিয়েছিলেন। আর তা এমনভাবে যে, আল্লাহর রাসুলের ইনতিকালের পরপরই আরববাসী মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। ইসলাম কেবল মদিনা এবং জাওয়াসায় অবশিষ্ট ছিল। সে মুহূর্তে আবু বকর রা. ইসলামের দাওয়াত নিয়ে উঠে দাঁড়ান এবং রাসুলের মতো ইসলামের জন্য জিহাদ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি ثَانِيَ اثْنَيْنِ তথা 'দুইয়ের দ্বিতীয়' হওয়ার যথার্থ হকদার হতে পেরেছিলেন। আল্লাহ বলেন,
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট। তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, যেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। এটি মহাসাফল্য। [সুরা তাওবা: ১০০]
এই আয়াতও রাসুলের অবর্তমানে আবু বকরের খিলাফতের ব্যাপারে স্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী। কেননা, হিজরত তো মানবসত্তার ওপর কঠিন একটি পরীক্ষা। মানবমনে এর মতো ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী দ্বিতীয় আর কিছু নেই। যাঁরা এ পথে আগে কদম বাড়িয়ে অন্যদের ছাড়িয়ে গেছেন, অন্যদের জন্য তাঁরা অবশ্যই অনুকরণীয়। তাঁদের মাধ্যমেই নবিজি তাঁর অন্তরে শক্তি অনুভব করেছেন। তাঁর অন্তর থেকে অস্বস্তি দূর হয়েছে। একইভাবে সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে থাকাও তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও ইমামতের প্রতি ইঙ্গিতবাহী।
মদিনায় আসার পর যারা নবিজিকে সাহায্য করেছিলেন, অবশ্যই তাঁরাও মর্যাদার অধিকারী; কিন্তু একমাত্র আবু বকরই ছিলেন সেই কঠিন হিজরতের সঙ্গী। অনুরূপ নবিজি যখন নবুয়াতপ্রাপ্ত হন, তখন তাঁর সহায়তায় তিনিই সবার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। সব সময় তাঁর সঙ্গেই থেকেছেন। এদিক দিয়ে কেউ তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না। এ বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনিবার্যভাবে ওই বিষয়ও প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাঁর ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন। আর কারও মর্যাদার ব্যাপারে আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কোনো স্বীকৃতি হতে পারে না। অতএব এ আয়াতটিও আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁর ইমামতের ব্যাপারে ইঙ্গিত প্রদান করে। আল্লাহ বলেন,
তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই পৃথিবীতে তাদের প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের। তিনি অবশ্যই তাদের জন্য দীনকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং ভয়ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদের নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, আমার সঙ্গে কোনোকিছুকে অংশীদার বানাবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারা তো সত্যত্যাগী। [সুরা নূর: ৫৫]
এ আয়াত আবু বকরসহ তাঁর পরবর্তী খলিফাত্রয়ের খিলাফতের সত্যতার স্পষ্ট দলিল। যখন খলিফা হওয়া এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়া গুণটি তাঁদের খিলাফত তথা শাসনব্যবস্থায় পাওয়া যায়, তখন এমনিতেই প্রমাণিত হয়, তাঁদের খিলাফত ছিল সত্য। হাফিজ ইবনু কাসির বলেন, কতিপয় সালাফ বলেছেন, আবু বকর ও উমরের খিলাফত কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। তাঁরা এর প্রমাণে এই আয়াত তিলাওয়াত করেছেন। আল্লাহ বলেন,
قُلْ لِلْمُخَلَّفِينَ مِنَ الْأَعْرَابِ سَتُدْعَوْنَ إِلَى قَوْمٍ أُولِي بَأْسٍ شَدِيدٍ تُقَاتِلُونَهُمْ أَوْ يُسْلِمُونَ فَإِنْ تُطِيعُوا يُؤْتِكُمُ اللَّهُ أَجْرًا حَسَنًا وَإِنْ تَتَوَلَّوْا كَمَا تَوَلَّيْتُمْ مِنْ قَبْلُ يُعَذِّبُكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا
যে-সকল মরুবাসী পেছনে থেকে গিয়েছিল, তাদের বলে দিন, তোমরা আহূত হবে এক প্রবল পরাক্রান্ত জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যতক্ষণ-না তারা আত্মসমর্পণ করে। তোমরা এ নির্দেশ পালন করলে আল্লাহ তোমাদের উত্তম পুরস্কার দেবেন। আর তোমরা যদি পূর্বানুরূপ পৃষ্ঠপ্রদর্শন করো, তিনি তোমাদের মর্মন্তুদ শাস্তি দেবেন। [সুরা ফাতহ : ১৬]
ইমাম আবুল হাসান আশআরি বলেন, সুরা তাওবার মধ্যে আবু বকরের ইমামতের ওপর দলিল বিদ্যমান। যারা নবিজির সাহায্য-সহযোগিতা এবং তাঁর সঙ্গে জিহাদে বের হওয়ার সময় পেছনে থেকে গিয়েছিল, আল্লাহ সে-সকল লোকের প্রসঙ্গে বলেন,
আল্লাহ যদি তোমাকে ওদের কোনো দলের নিকট ফেরত আনেন এবং ওরা অভিযানে বের হতে তোমার অনুমতি চায়, তখন তুমি বলবে, তোমরা তো আমার সঙ্গে কখনো বের হবে না এবং তোমরা আমার সঙ্গী হয়ে কখনো শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। তোমরা তো প্রথমবার বসে থাকাই পছন্দ করেছিলে। সুতরাং যারা পেছনে থাকে তাদের সঙ্গে বসেই থাকো! [সুরা তাওবা: ৮৩]
অন্যত্র বলেন,
তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহের জন্য যাবে, তখন যারা পেছনে থেকে গিয়েছিল তারা বলবে, তোমাদের সঙ্গে আমাদের যেতে দাও। তারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পরিবর্তন করতে চায়। [সুরা ফাতহ : ১৫]
এখানে আল্লাহর কালাম দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, لَّن تَخْرُجُوا مَعِيَ أَبَدًا অর্থাৎ, 'তোমরা আমার সঙ্গে কখনো বের হবে না।' [সুরা তাওবা: ৮৩] আল্লাহ আরও বলেন,
বলো, তোমরা কিছুতেই আমাদের সঙ্গী হতে পারবে না, আল্লাহ পূর্বেই এরূপ ঘোষণা করেছেন। ওরা অবশ্যই বলবে, তোমরা তো আমাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করছ। বস্তুত ওদের বোধশক্তি সামান্য। [সুরা ফাতহ : ১৫]
আর সুরা ফাতহের মধ্যে এসেছে, 'ওরা চায় আল্লাহর কালাম বদলে দিতো।' আল্লাহ নবিজির সঙ্গে তাদের বের হতে নিষেধ করেছেন এবং এটাকে 'আল্লাহর কালামে পরিবর্তন' আখ্যা দিয়েছেন। তাই এ কথা প্রমাণিত হয় যে, জিহাদের দিকে তাদের আহ্বানকারী নবিজির পরবর্তী কেউ হবেন না।
ইমাম মুজাহিদ রাহ. ( اولى بأس شدید ) (প্রচণ্ড যোদ্ধা জাতি)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে পারস্য ও রোমান শক্তি। হাসান বসরি, ইমাম আতাও অনুরূপ বলেছেন। ইবনু আব্বাসের একটি মতও এমন। তাঁর অন্য মত হচ্ছে, 'এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে বনু হানিফা, যাদের বিরুদ্ধে ইয়ামামার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।' যদি এই আয়াত দ্বারা ইয়ামামাবাসী উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আবু বকরের যুগে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আবু বকরই ইয়ামামাবাসী এবং ভন্ডনবি মুসায়লিমার বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দিয়েছিলেন। আয়াতের উদ্দেশ্য যদি হয়ে থাকে রোম ও পারস্যবাসী, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আবু বকরের শাসনামলে যুদ্ধ হয়েছে। তাঁর পরে উমর রা. যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েছেন।
অতএব এর মাধ্যমে যখন উমরের ইমামত প্রমাণিত হয়, তখন আবশ্যিকভাবে আবু বকরের ইমামতও প্রমাণিত হয়। এ দ্বারা এই বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আবু বকর ও উমরের খিলাফতের ব্যাপারে কুরআন সাক্ষ্য দেয়। আর যখন প্রমাণিত হয়, রাসুলের পর তিনি ছিলেন সত্য খলিফা, তখন আবশ্যিকভাবে উম্মাহর মধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টিও প্রমাণিত হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন,
এই সম্পদ অভাবগ্রস্ত মুহাজিরগণের জন্য, যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি থেকে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাহায্য করে। তারা তো সত্যাশ্রয়ী। [সুরা হাশর: ৮]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুহাজিরদের সাদিকিন (সত্যাশ্রয়ী) নাম দিয়েছেন। আল্লাহ যাঁদের সত্যতার স্বীকৃতি দেন, তাঁদের থেকে মিথ্যা প্রকাশ পেতে পারে না। তাঁরা মিথ্যাকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করতে পারেন না। অনুরূপ আল্লাহ যাঁদের 'সাদিকিন' বলেছেন, তাঁদের সকলেই আবু বকরকে 'খলিফাতুর রাসুল' নামে অভিহিত করেছিলেন। এভাবে এই আয়াত আবু বকরের খিলাফত সাব্যস্ত করে থাকে।
৭. আবু বকরের খিলাফতের প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ হাদিস আবু বকরের খিলাফতের ওপর প্রমাণ বহন করে, এমন হাদিসের সংখ্যাও কম নয়। এর মধ্যে অনেকগুলো 'মাশহুর' ও 'মুতাওয়াতির' পর্যায়ের। কোনো কোনো হাদিসে স্পষ্টভাবে এবং কোনোটিতে আকারে-ইঙ্গিতে তাঁর খিলাফতের কথা বলা হয়েছে। আর এসব হাদিস প্রসিদ্ধতা এবং অকাট্যতার ভিত্তিতে معلوم من الدين بالضرورة )অর্থাৎ, দীনের ব্যাপারে পরিচিত জরুরি নির্দেশাবলি)-এর পর্যায়ভুক্ত। বিদআতিদের কাছেও যেগুলো অস্বীকারের কোনো অবকাশ নেই। এই পর্যায়ের হাদিসসমূহের কয়েকটি হচ্ছে:
ক. জুবায়ের ইবনুল মুতয়িম রা. থেকে বর্ণিত; জনৈক মহিলা এসে রাসুলের দরবারে উপস্থিত হয়। নবিজি তাকে আরেকবার আসতে নির্দেশ দেন। মহিলা তখন বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমি যদি আবার ফিরে এসে আপনাকে না পাই?' (মহিলা যেন বলছিল, যদি আপনার ইনতিকাল হয়ে যায়?) রাসুল তাকে বলেন, 'আমাকে না পেলে আবু বকরের কাছে হাজির হবে।'
হাফিজ ইবনু হাজার রাহ. বলেন, এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, রাসুলের অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন করা তাঁর পরবর্তী খলিফার জিম্মাদারির অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া হাদিসটি শিয়াদের এই বিশ্বাস-'রাসুল তাঁর পরবর্তী খলিফা হিসেবে আলি ও আব্বাসকে স্থির করে গিয়েছিলেন'-এর খন্ডন করে থাকে।
খ. হুজায়ফা রা. থেকে বর্ণিত; আমরা নবিজির পাশে বসা ছিলাম, এমতাবস্থায় তিনি বলেন, 'জানি না আমি কত দিন তোমাদের মধ্যে আছি! আমার মৃত্যুর পর তোমরা এই দুজনের অনুসরণ করবে।' এ কথা বলে তিনি আবু বকর ও উমরের দিকে ইশারা করেন।
এখানে হাদিসে فاقتدوا بالذين من بعدى কথাটি এসেছে। এর অর্থ তো এটাই যে, আমার পরে এই উভয় খলিফার অনুসরণ করবে। এঁরা আমার স্থলাভিষিক্ত হবে। এখানে রাসুল উভয়ের উত্তম চরিত ও অন্তরের সত্যতার ভিত্তিতে তাঁদের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং এ হাদিসটি তাঁদের খিলাফতের ব্যাপারে স্পষ্ট দলিল।
গ. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেছেন, 'আমি ঘুমন্ত ছিলাম। দেখতে পাই, আমার হাউজ থেকে পানি উঠিয়ে লোকজনকে পান করাচ্ছি। এর মধ্যে আবু বকর এসে উপস্থিত হন এবং আমাকে বিশ্রাম দিতে বালতিটি আমার হাতে থেকে নিয়ে নেন। তিনি দুটি বালতি পরিমাণ পানি বের করেন। তবে তাঁর পানি বের করার দুর্বলতা পরিলক্ষিত হচ্ছিল। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন। এরপর চলে আসেন উমর ইবনুল খাত্তাব। তিনি তাঁর কাছ থেকে একটি বালতি নিয়ে নেন। আমি তাঁর থেকে শক্তিমান কোনো বালতি উত্তোলনকারী দেখিনি। শেষপর্যন্ত লোকজন পরিতৃপ্ত হয়ে ফিরে যান। আর হাউজটি পূর্বের মতোই পূর্ণ থেকে যায়, তা থেকে যেন পানি উছলে উঠছিল।'
ইমাম শাফিয়ি রাহ. বলেন, নবিদের স্বপ্ন ওহি হয়ে থাকে। আর 'তাঁর পানি বের করায় দুর্বলতা অনুভূত হচ্ছিল' দ্বারা তাঁর খিলাফতকাল সংক্ষিপ্ত হওয়ার, অল্পকালের মধ্যে তাঁর ইনতিকাল হওয়ার এবং মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্দে জড়িয়ে পড়ার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। যদ্দরুন উমরের খিলাফতকালে ইসলামের বিজয়াভিযান যতটুকু ব্যাপ্ত হয়েছিল, তাঁর খিলাফতকালে ততটুকু ছিল না। কেননা, তিনি দীর্ঘদিন খিলাফত পরিচালনা করতে পেরেছিলেন。
ঘ. উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত; মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় রাসুল আমাদেরকে বলেছিলেন, 'তুমি আবু বকর ও তোমার ভাইকে আমার কাছে ডেকে পাঠাও, আমি লিখে দিয়ে যাই। আমার আশঙ্কা, আশা পোষণকারীরা আশা পোষণ করতে পারে এবং বক্তা বলতে পারে আমি (খিলাফতের) অধিক হকদার; অথচ আল্লাহ এবং ইমানদারগণ কেবল আবু বকরকেই চান।'
এই হাদিস আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্বের স্পষ্ট দলিল। এখানে খোদ নবিজি তাঁর নিজের পরে সংঘটিতব্য বিষয়ের কথা বলে গেছেন। এ কথাও বলে গেছেন যে, মুসলমানগণ আবু বকর ছাড়া অন্য কাউকে খিলাফতের মসনদ প্রদান করবেন না। হাদিসে এ দিকেও ইঙ্গিত বিদ্যমান যে, এ নিয়ে হালকা মতবিরোধ দেখা দেবে। দেখা গেছে রাসুল যেভাবে বলে গেছেন, পরবর্তীকালে বিষয়টি হুবহু সেভাবেই সংঘটিত হয়েছে। শেষপর্যন্ত সবাই আবু বকরকে খলিফা হিসেবে মেনে নিয়েছেন。
ঙ. উবায়দুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত; আমি উম্মুল মুমিনিন আয়েশার কাছে গিয়ে বলি, 'আপনি কি আমাকে নবিজির মৃত্যুশয্যার অবস্থার বিবরণ দেবেন?' তিনি বলেন, 'কেন নয়, অবশ্যই বলব।' নবিজির রোগ তীব্র হয়ে উঠতে থাকলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “মানুষ কি সালাত পড়ে নিয়েছে?” আমরা জবাব দিই, "আল্লাহর রাসুল, এখনো পড়েনি, তাঁরা আপনার অপেক্ষা করছে।” রাসুল বলেন, “আমার জন্য গামলায় পানি রেখো।” আমরা পানি রেখে দিই। নবিজি তখন এই পানি থেকে গোসল করেন। এরপর উঠতে গেলে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। খানিক পর জ্ঞান ফিরলে জিজ্ঞেস করেন, "মানুষ কি সালাত পড়ে নিয়েছে?" আমরা উত্তর দিই, “তাঁরা আপনার অপেক্ষা করছে।”” আয়েশা রা. বলেন, 'লোকজন মসজিদে তাঁর অপেক্ষায় বসা ছিলেন। রাসুল আবু বকরকে বলে পাঠান, তিনি যেন তাঁদের সালাত পড়িয়ে দেন। আবু বকর যেহেতু নরম হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন, তাই তিনি উমরকে বলেন, "উমর, তুমি সালাত পড়িয়ে দাও।” উমর বলেন, "আপনিই এর বেশি হকদার।”
এরপর আবু বকর নবিজির অসুস্থতার দিনগুলোতে সালাত পড়াতে থাকেন। একদিন রাসুল কিছুটা সুস্থতা অনুভব করলে দুজনের কাঁধে ভর করে সালাতের উদ্দেশ্যে বের হন। তাঁদের একজন ছিলেন নবিজির চাচা আব্বাস রা.। আবু বকর সালাত শুরু করে দিয়েছিলেন। নবিজিকে আসতে দেখে তিনি পেছনে সরে আসতে থাকেন। রাসুল তখন তাঁকে ইঙ্গিতে পেছনে না সরার নির্দেশ দেন। নবিজি তখন তাঁর উভয় সাহায্যকারীকে বলেন, "আমাকে আবু বকরের পাশে বসিয়ে দাও।” তাঁরা তাঁকে আবু বকরের পাশে বসিয়ে দেন। আবু বকর দাঁড়িয়ে নবিজির অনুসরণ করছিলেন; আর লোকজন আবু বকরের অনুসরণে সালাত আদায় করছিলেন। নবিজি বসে বসে সালাত আদায় করছিলেন।
উবায়দুল্লাহ রা. বলেন, এরপর আমি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাসের কাছে গিয়ে বলি, 'আমি কি আপনাকে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা থেকে শোনা নবিজির মৃত্যুশয্যাকালীন হাদিসটি শোনাব?' তিনি 'হ্যাঁ' বলেন। এরপর আমি হাদিসটি তাঁকে শোনাই, তিনি তখন এর সত্যায়ন করেন। কোনো একটি কথাও অস্বীকার করেননি। শুধু এতটুকু বলেন, 'আব্বাসের সঙ্গে যিনি ছিলেন উম্মুল মুমিনিন কি তাঁর নাম নিয়েছেন?' আমি জবাব দিই 'না।' তিনি বলেন, 'তিনি ছিলেন আলি রা.। '
এই হাদিস অনেকগুলো উপকারিতা ধারণ করে। যেমন:
সকল সাহাবির ওপর আবু বকরের মর্যাদা এবং সকলের ওপর তাঁর অগ্রাধিকার ও শ্রেষ্ঠত্ব। এতৎসঙ্গে অন্যদের তুলনায় তাঁর খিলাফতের অধিক হকদার হওয়ার বিষয়টিও।
কোনো ওজর থাকলে ইমাম সাহেব অন্যকে ইমামতির দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন। তবে যাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তার মর্যাদা সকলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হতে হবে।
আবু বকরের পর উমরের শ্রেষ্ঠত্ব। আবু বকর তাঁকেই ইমামতের আবেদন জানিয়েছিলেন, অন্য কাউকে নয়。
চ. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. বর্ণনা করেন; রাসুলের ইনতিকালের পর আনসার সাহাবিগণ বলেন, 'আমির হবেন আমাদের থেকে একজন, আপনাদের থেকে একজন।' তখন উমর বলেন, 'আনসার ভাইয়েরা, আপনারা কি জানেন না, নবিজি আবু বকরকে সালাতের ইমাম নিযুক্ত করে দিয়েছিলেন। অতএব তোমাদের মধ্যে কে আবু বকরের আগে যেতে চাইবে?'
ছ. আলি ইবনু আবি তালিব রা. বলেন, রাসুল ইনতিকাল করলে আমরা নিজেদের ব্যাপারে (খিলাফতের ব্যাপারে) চিন্তাভাবনা শুরু করি। তখন দেখতে পাই, নবিজি তাঁর জীবনের শেষ সময়ে আবু বকরকে সালাতের ইমামতির দায়িত্বভার অর্পণ করছিলেন। সুতরাং আমরা বুঝে নিই, রাসুল যাঁকে আমাদের দীনের জন্য নির্বাচন করেছিলেন, আমরা তাঁকে আমাদের দুনিয়ার জন্য নির্বাচন করে নিই এবং খিলাফতের দায়িত্বগ্রহণের জন্য আবু বকরকে সামনে বাড়িয়ে দিই。
ইমাম আবুল হাসান আশআরি বলেন, রাসুল কর্তৃক আবু বকরকে এগিয়ে দেওয়া দীনের এমন একটি বিষয়, যা জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাঁকে এগিয়ে দেওয়ার অর্থ এটাই যে, তিনি ছিলেন সাহাবিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলিম, সবচেয়ে বড় কারি (কুরআন-বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ তিলাওয়াতকারী)। কারণ, 'মুত্তাফাক আলাইহি' হাদিস দ্বারা প্রমাণিত সত্য যে, রাসুল বলেছেন,
মানুষের ইমামতি সে-ই করবে, যে অন্যদের তুলনায় কুরআন বেশি মুখস্থকারী। যদি কুরআন হিফজের ক্ষেত্রে সমান হয়ে থাকে, তাহলে ইমামতি করবে যে সবচেয়ে বেশি সুন্নাহর আলিম। যদি সুন্নাহর ইলমে সমান হয়ে থাকে, তাহলে ইমামতি করবে যে বয়সে প্রবীণ। আর যদি বয়সে সমান হয়ে থাকে, তাহলে তিনি ইমামতি করবে, যে ইসলামগ্রহণে অগ্রসর।
হাফিজ ইবনু কাসির বলেন, ইমাম আশআরির এ কথাটি সোনার হরফে লিখে রাখার উপযুক্ত। উল্লিখিত সব গুণই আবু বকরের সত্তায় বিদ্যমান ছিল。
আবু বকরের খিলাফত প্রকাশ্য দলিল নাকি অপ্রকাশ্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত, এ সম্পর্কে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আলিমদের মধ্যে দুটি অভিমত রয়েছে। প্রথম অভিমত হচ্ছে, তাঁর খিলাফতের ব্যাপারটি অপ্রকাশ্য এবং কিছু ইঙ্গিত-ইশারার দলিল দ্বারা প্রমাণিত। বলা হয়ে থাকে, এই অভিমতটি ইমাম হাসান বসরিসহ আহলুল হাদিসের আলিমগণের। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের এক অভিমতও অনুরূপ। তাঁদের কথা হচ্ছে, ইনতিকালের পূর্বে রোগাক্রান্ত অবস্থায় তিনি আবু বকরকে সালাতের ইমামতির জন্য আগে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আবু বকরের দরজা ব্যতীত মসজিদের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তাঁর ইমামত ও খিলাফতের দিকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
অপর অভিমত হচ্ছে, আবু বকরের খিলাফতের ব্যাপারটি স্পষ্ট দলিল দ্বারা প্রমাণিত। আহলুল হাদিসের এক দলের অভিমতও অনুরূপ। ইমাম ইবনু হাজাম জাহিরিও অনুরূপ বলে থাকেন। তাঁদের দলিল হচ্ছে সেই মহিলার হাদিস, যাকে রাসুল বলেছিলেন, 'যদি আমাকে না পাও, তাহলে আবু বকরের কাছে যাবে।' অনুরূপ সেই হাদিস দ্বারাও, যেখানে রাসুল উম্মুল মুমিনিন আয়েশাকে বলেছিলেন, 'তুমি আবু বকর ও তোমার ভাইকে আমার কাছে ডেকে পাঠাও, আমি লিখে দিয়ে যাই। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, আশা পোষণকারীরা আশা পোষণ করতে পারে এবং বক্তা বলতে পারে “আমি (খিলাফতের) অধিক হকদার”; অথচ আল্লাহ এবং ইমানদারগণ কেবল আবু বকরকেই চান। 'একইভাবে সেই হাদিস দ্বারাও, যেখানে রাসুল তাঁর স্বপ্ন বলেছিলেন। তিনি হাউজের ওপর ছিলেন এবং সেখান থেকে পানি উঠিয়ে মানুষকে পান করাচ্ছিলেন। এরপর আবু বকর এসে তাঁর হাত থেকে বালতি নিয়ে পানি উঠাতে থাকেন, যাতে রাসুল বিশ্রাম নিতে পারেন。
আলোচনা-পর্যালোচনার পর আমি যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি এবং যে অভিমত আমার কাছে অগ্রগণ্য, সেটি হচ্ছে, রাসুল তাঁর জীবদ্দশায় এমন কোনো নির্দেশ দিয়ে যাননি যে, আমার ইনতিকালের পর তোমরা আবু বকরকে খলিফা বানাবে। তবে তিনি এ ব্যাপারে পথনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। আল্লাহ তাঁকে আগেই বলেই দিয়েছিলেন। মুমিনগণ আবু বকরকেই খলিফা নির্বাচন করবেন। কারণ, তাঁর মধ্যে সেসব উন্নত গুণ বিদ্যমান ছিল, যেগুলোর উল্লেখ কুরআন-সুন্নাহে রয়েছে। তাই তিনি উম্মাহর সকলের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব রাখতেন।
আল্লামা ইবনু তাইমিয়া রাহ. বলেন, গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত হচ্ছে, রাসুল আবু বকরকে খলিফা নির্ধারণের ব্যাপারে مسلمانوں সংবাদ দিয়ে গেছেন। তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে সেদিকে তাদের পথপ্রদর্শন করে গেছেন। এ ব্যাপারে তিনি একটি অঙ্গীকারনামা লিপিবদ্ধ করানোরও ইচ্ছা করেছিলেন। এরপর যখন জানতে পারেন مسلمانগণ তাঁর খিলাফতের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাবে, তখন সে ইচ্ছা বাদ দিয়ে দেন। খলিফা নির্ধারণের ব্যাপারটি যদি উম্মাহর কাছে আমূল সংশয়যুক্ত বিষয় হতো, তাহলে অবশ্যই রাসুল স্পষ্টভাবে বলে যেতেন; কিন্তু তিনি যেহেতু বিভিন্ন আঙ্গিকে সে দিকে ইশারা করে গেছেন এবং মানুষও তা বুঝে নিতে সক্ষম হয়েছিল, তাই উদ্দেশ্য চরিতার্থ হওয়ায় উম্মাহর শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। এ জন্যই তো উমর রা. আনসারদের বলেছিলেন, 'তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে আবু বকর থেকে এগিয়ে যেতে চায়?'
ইবনু তাইমিয়া আরও বলেন, বিশুদ্ধ অনেক দলিল দ্বারা আবু বকরের খিলাফত, তাঁর ওপর আল্লাহ ও রাসুলের সন্তুষ্টির বিষয়টি প্রমাণিত। তাঁর খিলাফতের ওপর বায়আত সংঘটিত হয়েছিল مسلمانوں ঐকমত্যে। সাহাবিগণ সে-সব দলিলের আলোকেই তাঁকে খলিফা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যেগুলোতে রাসুলের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা বিদ্যমান ছিল। তাই বলা যায়, আবু বকরের খিলাফত সংঘটিত হয়েছে দলিল এবং ইজমা উভয়টির ভিত্তিতে।
দলিলের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হচ্ছিল, আল্লাহ এবং রাসুল তাঁর ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন। এটা সত্য যে, আল্লাহও অনুরূপ আদেশ করেছেন, তবে সেটি ছিল উহ্য। যেমন, মুমিনগণ তাঁকে নির্বাচন করবেন এবং এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকবে। এ প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ সরাসরি নির্দেশের মাধ্যমে নির্ধারণ অপেক্ষা উত্তম এবং হৃদয়ে প্রভাব সৃষ্টিকারী। যদি সরাসরি নির্দেশ থাকে, তাহলে নির্ধারণটি হবে কেবল নির্দেশের ভিত্তিতে। তাতে আন্তরিকতা না-ও থাকতে পারে। আর উপরিউক্ত প্রক্রিয়ায় নির্ধারণের মধ্যে আন্তরিক কামনা থাকে। তাই আল্লাহ ও রাসুল তাঁর প্রিয় বান্দাকে বাছাই করতে ওই প্রক্রিয়াটিই অবলম্বন করেছেন। এ থেকে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার বিষয়টিও প্রতিভাত হয়。
৮. আবু বকরের খিলাফতের ব্যাপারে ইজমা
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, নবিজির পর খিলাফতের সর্বাধিক হকদার ছিলেন আবু বকর রা.। এই অধিকার লক্ষ্ম হয়েছিল সাহাবিদের ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব এবং নবি-জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তাঁকে সালাতের ইমামতি অর্পণের মাধ্যমে। তাঁকে সালাতে এগিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে রাসুলের মূল উদ্দেশ্য সাহাবিগণ অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই বিনা বাক্যে তাঁর হাতে বায়আত হন। তাঁকে এগিয়ে রাখার ব্যাপারে তাঁরা ঐকমত্যে পৌঁছে যান। একজন সাহাবিও এই অবস্থান থেকে পিছু হটেননি। আল্লাহ সকল সাহাবিকে ভ্রান্তির ওপর একমত করতে পারেন না। তাঁরা অনুগত হয়েই বায়আত হন। প্রশান্তচিত্তে তাঁর নির্দেশাবলি মেনে নেন। কেউ এর সামান্যতম বিরোধিতা করেননি。
সুতরাং সায়িদ ইবনু জায়েদকে 'কখন আবু বকরের হাতে বায়আত সংঘটিত হয়' মর্মে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, যে দিন রাসুল ইনতিকাল করেছিলেন, সে দিন। সাহাবিগণ দিনের কিছু অংশও বায়আতমুক্ত থাকতে পছন্দ করেননি। গ্রহণযোগ্য একদল আলিম আবু বকরের খিলাফতের ব্যাপারে সাহাবিগণ এবং তাঁদের পরে আগত পুরো আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইজমার কথা উল্লেখ করেছেন। শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন আলিমের অভিমত এখানে তুলে ধরা হলো:
ক. খতিব বাগদাদি রাহ. বলেন, মুহাজির ও আনসারগণ আবু বকরের খিলাফতের ব্যাপারে একমত ছিলেন। তাঁরা তাঁকে 'খলিফাতুর রাসুল' নামে ডাকতেন। তাঁর পরে এই নামে কাউকে ডাকা হয়নি। বলা হয়ে থাকে, রাসুলের ইনতিকালের সময় ৩০ হাজার মুসলমান ছিলেন, তাঁদের সকলেই আবু বকরকে খলিফা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আর রাসুলের পর তাঁকে খলিফা হিসেবে পেয়ে তাঁরা ছিলেন সন্তুষ্ট।
খ. ইমাম আবুল হাসান আশআরি রাহ. বলেন, আল্লাহ তাআলা মুহাজির, আনসার এবং ইসলামে অগ্রবর্তীদের প্রশংসা করেছেন। কুরআনের অনেক জায়গায় তাঁদের প্রশংসা রয়েছে। অনুরূপ প্রশংসা রয়েছে 'বায়আতে রিজওয়ানে' অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কেও। আল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তো মুমিনদের ওপর সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষতলে তোমার কাছে বায়আত হয়েছিল।' [সুরা ফাতহ: ১৮]
উপর্যুক্ত আয়াতে আল্লাহ যাঁদের প্রশংসা করেছেন, তাঁদের সকলেই ছিলেন আবু বকরের খিলাফতের ব্যাপারে একমত। তাঁকে রাসুলের খলিফা হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন তাঁরা। তাঁর হাতে খিলাফতের বায়আত করেছিলেন। তাঁর অনুগত থেকেছিলেন। তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে যে পরহেজগারি, আল্লাহভীতি, প্রজ্ঞা এবং রাজনৈতিক ও সামরিক দূরদর্শিতা ছিল, সেসব গুণের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি দিয়ে তাঁকে অন্যান্য সাহাবির ওপর শ্রেষ্ঠ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন।
গ. ইমাম আবদুল মালিক জুয়ানি রাহ. বলেন, আবু বকরের ইমামত সাহাবিদের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। সকল সাহাবি তাঁর আনুগত্য গ্রহণের ওপর একমত ছিলেন। রাফিজিরা তাঁর বায়আত প্রসঙ্গে আলির কঠিন বিরোধিতার যে গল্প বলে বেড়ায় এবং নিজেদের চরিত্রহীনতার গোদাম উদুম করে থাকে, সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কল্পকাহিনি বই কিছু নয়। নিঃসন্দেহে এ কথা সত্য যে, আলি রা. সাকিফায়ে বনু সায়িদায় খিলাফত-সংক্রান্ত আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন না। তিনি নবিজির ইনতিকালে সীমাহীন ব্যথিত হয়ে নির্জনতা অবলম্বন করে নিয়েছিলেন। তবে সাকিফায়ে বনু সায়িদায় লোকজন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা গ্রহণ করেছিলেন এবং সাধারণ জনসমাবেশে উপস্থিত হয়ে আবু বকরের হাতে বায়আত গ্রহণ করেছিলেন।
ঘ. ইমাম আবু বকর বাকিল্লানি রাহ. আবু বকরের খিলাফতের ব্যাপারে ইজমার প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, আবু বকরের প্রতি আনুগত্য করা ছিল ফরজ। কেননা, তাঁর ইমামত ও আনুগত্যের ওপর উম্মাহর ইজমা হয়ে গিয়েছিল। যখন তিনি বলেছিলেন, 'আমাকে সরিয়ে দাও, আমি তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নই', তখন আলি বলেছিলেন, 'আমরা যেমন আপনাকে সরিয়ে দিতে পারি না, তেমনি সরিয়ে দেওয়ার দাবিও করতে পারি না। নবিজি নিজেই যেহেতু দীনের খাতিরে আপনাকে আগে বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাই আমরা দুনিয়ার জন্য আপনাকে আগে বাড়িয়ে নেব না কেন?' এখানে দীনের ক্ষেত্রে আগে বাড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, নবিজি কর্তৃক তাঁকে ইমামতির দায়িত্ব অর্পণ। হজের ক্ষেত্রে তাঁকে নিজের স্থলবর্তী করা। আবু বকর ছিলেন উম্মাহর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তম, ইমানে সবচেয়ে শক্তিশালী, জ্ঞানে সবচেয়ে অগ্রগামী, ইলমের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ।
৯. খিলাফত ও খলিফা উম্মাহ নিজেদের বিষয়াদির শৃঙ্খলা, কল্যাণের নিরাপত্তা এবং তত্ত্বাবধানের লক্ষ্যে যে শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতি গ্রহণ করেছিল, যার ওপর তারা ইজমা করে নিয়েছিল, সেটিই হচ্ছে ইসলামি খিলাফতব্যবস্থার নীতি। উম্মাহর কাছে যখন এর প্রয়োজন অনুভূত হয় এবং তাঁরা এই শাসনব্যবস্থার ওপর আশ্বস্ত হয়, তখনই এই খিলাফতব্যবস্থা অস্তিত্বে আসে। এ জন্যই নবিজির ইনতিকালের পর উম্মাহ সবকিছুর ওপর খিলাফতের ব্যাপারটিকেই অগ্রাধিকার প্রদান করে।
ইমাম আবুল হাসান মাওয়ারদি রাহ. বলেন, মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ উম্মাহকে ওই পন্থা অনুসরণের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যে পন্থায় রাসুলের প্রতিনিধিত্ব অস্তিত্বে এসেছিল, যার মাধ্যমে উম্মাহর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত ব্যক্তির হাতেই খিলাফতের বাগডোর তুলে দিয়েছিলেন, যাতে উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ হয়, দীন নিরাপদ হয়। অতএব ইমামত হচ্ছে এমন এক মৌলনীতি, যার ওপর উম্মাহর সবকিছু নির্ভর করে। সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হয়। সব বিষয়ে স্থিতি আসে। আর এ থেকে অন্য সব নেতৃত্ব অস্তিত্বে আসে।
উম্মাহর ওপর দায়িত্ব ছিল—রাসুলের ইনতিকালের দরুন যে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে, তার মোকাবিলা করবে এবং অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কৌশলী প্রক্রিয়ায় খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে নৈরাজ্য বিস্তারের সুযোগ দেবে না, যাতে মানুষের অন্তরে সন্দেহ দানা বাঁধতে না পারে। তাদের মধ্যে দুর্বলতা দেখা না দেয়। রাসুলের প্রতিষ্ঠিত দুর্গ কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
খিলাফত যেহেতু ইসলামি শাসনব্যবস্থা, তাই এর মূল ও শাখাগত সব বিষয় হবে কিতাব ও সুন্নাহ থেকে গৃহীত। উম্মাহর ফকিহগণ ইসলামি খিলাফতের ভিত্তি-সম্পর্কীয় আলোচনায় বলেন, 'শুরাব্যবস্থা এবং বায়আত এমন দুটি মূলনীতি, যেগুলোর ব্যাপারে কুরআনে ইশারা বিদ্যমান।'
খলিফা পদের ওপর ইমামত এবং ইমারত শব্দটিও প্রয়োগ হয়ে থাকে। খিলাফত-প্রতিষ্ঠা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে উম্মাহর ইজমা (ঐকমত্য) বিদ্যমান। মুসলমানদের ওপর তাদের খলিফা নির্ধারণ করে নেওয়া ফরজ, যাতে উম্মাহর সব বিষয়াশয়ের তত্ত্বাবধান সম্ভব হয়। আল্লাহর বিধানসমূহ প্রতিষ্ঠা পায়। ইসলামি দাওয়াতের প্রচার-প্রসারের কাজ এগিয়ে নেওয়া যায়। অত্যাচার ও নৈরাজ্য দূরীকরণ সম্ভব হয়। মানুষের সার্বিক প্রয়োজনের সমাধান নিশ্চিত করা যায়। এগুলো কিতাব ও সুন্নাহ দ্বারা নির্দেশিত ও প্রমাণিত। আল্লাহ বলেন, মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রাসুলের এবং তাদের, যারা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতার অধিকারী। [সুরা নিসা : ৫৯]
অন্যত্র বলেন, দাউদ, আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার করো এবং খেয়ালখুশির অনুসরণ করো না। কেননা, এটা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। যারা আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। কারণ, তারা বিচারদিবস থেকে বিস্মৃত হয়ে আছে। [সুরা সোয়াদ: ২৬]
রাসুল বলেছেন, যে ব্যক্তি সমকালের ইমামের আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নেয়, কিয়ামতের দিন তার কাছে কোনো দলিল থাকবে না। আর যার ঘাড়ে কোনো ইমামের বায়আত থাকবে না, সে যদি ওই অবস্থায় মারা যায়, তাহলে সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল।
রাসুলের ইনতিকালের পর সাহাবিগণ তাঁর দাফনের ওপর খলিফা নির্বাচনের ব্যাপারটিকে প্রাধান্য দেন। আর আবু বকর খিলাফতের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেন, 'খলিফা নির্ধারণ না করলে উম্মাহর মধ্যে ফিতনার আশঙ্কা থেকে যায়।
ইমাম শাহরাস্তানি বলেন, আবু বকরসহ অন্য কারও অন্তরে জমিন খিলাফতশূন্য অবস্থায় থাকা জায়িজ, এই ধারণাও জন্ম নেয়নি। এসব বিষয় স্পষ্ট করে, সকল সাহাবি একমত ছিলেন যে, জমিন খিলাফতশূন্য থাকতে পারে না। সাহাবিদের ইজমা ইমাম নির্ধারণের ব্যাপারে অকাট্য দলিল।
ইসলামের শত্রুরা যে প্রোপাগান্ডা চালায়—সাহাবিগণকে নেতৃত্বলোভ এমনভাবে পেয়ে বসেছিল যে, তারা নবিজির দাফন-কাফনের বিষয়টি পেছনে ফেলে নেতৃত্ব নিয়ে মেতে ওঠেন—এটি বিদ্বেষী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ব্যতীত কিছুই নয়। সত্যতা ও বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
আল্লামা ইবনু খালদুন খিলাফতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, খিলাফত হচ্ছে ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের কল্যাণের বিষয়ে শরয়ি চিন্তা এবং চেতনাজাত চাহিদার প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণ ও তৈরিকরণ। কেননা, বিধানদাতার কাছে জাগতিক সকল কল্যাণকাজ মূলত পরকালীন কল্যাণের ভিত্তি। তাই খিলাফত মূলত ইসলামের নিরাপত্তাবিধান এবং বিধানদাতার প্রতিনিধিত্ব করার নাম।
আল্লামা আবুল হাসান আলি নদবি রাহ. মহানবির খিলাফতের শর্তাবলি এবং এর চাহিদা বর্ণনা করেছেন। এরপর তিনি আবু বকরের আচরিত রীতির আলোকে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। আমরা এখানে অতি সংক্ষেপে নদবি রাহ. কর্তৃক উল্লিখিত শর্ত ও প্রমাণগুলো উল্লেখ করব। কেননা, এগুলোই আমরা এই গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করে এসেছি। শর্তগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হচ্ছে:
ক. তাঁর ব্যক্তিত্ব এমন বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হতে হবে যে, খোদ রাসুল ﷺ তাঁর সাক্ষ্য দিয়ে থাকবেন। দীনের গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও অতি জরুরি বিষয় সম্পাদনের জন্য তাঁর ওপর দায়িত্ব অর্পণ করে থাকবেন। তাঁর থাকবে অত্যন্ত সঙ্গিন মুহূর্তে নবিজিকে সঙ্গদানের গৌরব। যে সঙ্গিন মুহূর্তে একজন মানুষ কেবল তাঁকেই সঙ্গে রাখতে পারে, যার ওপর থাকে তার পরিপূর্ণ আস্থা-বিশ্বাস থাকে।
খ. তাকে এই দিক দিয়েও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে হবে যে, ইসলামের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা ঝড়ের মোকাবিলায় পাহাড়প্রমাণ দৃঢ়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন, যে ঝড় দীনকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য, নবিজির জীবন-প্রচেষ্টার ফসল ধ্বংস করে দিতে এবং অনেক দৃঢ়চেতা মুমিনের ইমানের মধ্যে ভূমিকম্প সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। অনুরূপ তিনি সব ভয়াবহ ফিতনার মোকাবিলায় পাথরের মতো অনড় থেকে মানুষের স্মৃতিতে নবিদের শাসনব্যবস্থার স্মৃতি জাগিয়ে তুলবেন, তাদের চোখের সামনে থেকে ভ্রান্তির পর্দা ছিঁড়ে ফেলবেন, দীনের ভিত্তির ওপর জমে থাকা ধুলোবালি সরিয়ে দিয়ে দীনকে উজ্জ্বলরূপে তুলে ধরবেন।
গ. ইসলামের বোধজ্ঞানে তিনি হবেন অনুপম ও অদ্বিতীয়। রাসুলের জীবনের বিভিন্ন অবস্থা তথা যুদ্ধ, সন্ধি, শান্তি, নিরাপত্তা, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব, সর্বাবস্থায় নিরন্তর তাঁর সঙ্গ দিয়ে থাকবেন।
ঘ. তিনি হবেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল। দীনকে তার মৌলিক অবস্থানে ধরে রাখার ব্যাপারে তাঁর মর্যাদাবোধ হবে নিজের মান-সম্ভ্রম, পরিবার- পরিজনের মান-সম্ভ্রম ও মর্যাদাবোধের চেয়েও বেশি। এ ক্ষেত্রে তাঁর সামনে কোনো প্রকারের লোভ-লালসা, ভ্রান্ত ব্যাখ্যা কিংবা স্বজন-বন্ধুদের বিরোধিতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।
ঙ. রাসুলের খিলাফতের জন্য জরুরি হবে, যিনি খলিফা হবেন তাঁর মধ্যে রাসুলের চাহিদার বাস্তবায়ন হবে মুখ্য। তাকে এ ব্যাপারে প্রচণ্ড আগ্রহী হতে হবে। থাকতে হবে সূক্ষ্ম ধ্যানধারণা। চুল পরিমাণও বিচ্যুত হতে পারবেন না। তা নিয়ে কোনো প্রকার সওদাবাজি সহ্য করবেন না। কোনো সমালোচকের সমালোচনার পরোয়া করবেন না। ভয় পাবেন না।
চ. পার্থিব বস্তু এবং এর সুবিধাদি দ্বারা উপকৃত হওয়া থেকে তিনি নিরাপদ দূরত্বে থাকবেন। এমন দুনিয়াত্যাগী হবেন, নবি ছাড়া যেমনটি কারও মধ্যে কল্পনা করা যায় না। তাঁর অন্তরে সাম্রাজ্যপ্রতিষ্ঠা, বাদশাহির ধ্যানধারণা কিংবা আপন পরিবার ও গোত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া, তাদের এর উত্তরাধিকার বানিয়ে যাওয়ার কল্পনাও থাকবে না; যেমনটি আরব উপদ্বীপের দুই পাশে রোমান ও পারস্য-সাম্রাজ্যের মধ্যে চলে আসছিল। উপরিউক্ত গুণ ও বৈশিষ্ট্য আবু বকরের জীবনে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। এগুলোই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাসুলের জীবদ্দশায় খিলাফতগ্রহণের পূর্বে এবং রাসুলের অবর্তমানে খিলাফতগ্রহণের পর জীবনভর তিনি এরই ওপর অধিষ্ঠিত ছিলেন। কোনো মানুষের পক্ষে এ কথা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করার কোনো অবকাশও নেই। এ বিষয়গুলো অকাট্যভাবে মুতাওয়াতির বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত।
সাকিফায়ে বনু সায়িদায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী শীর্ষস্থানীয় যে-সকল সাহাবি উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের ঐকমত্যের ভিত্তিতেই আবু বকরের হাতে সে দিন বিশেষ বায়আত সংঘটিত হয়েছিল। অবশ্য পরদিন জনসাধারণের সামনে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের সন্তুষ্টিতে সাধারণ বায়আত সংঘটিত হয়。
সাকিফায়ে বনু সায়িদায় আলাপ-আলোচনার পর যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, এর আলোকে বেশ কিছু মৌলনীতি আমাদের সামনে আসে। যেমন :
১. নির্বাচনের মাধ্যমে উম্মাহর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।
২. নেতৃত্বের প্রামাণিকতা এবং নির্বাচনের মূল বিষয় হবে বায়আত।
৩. যিনি দীনের ব্যাপারে দৃঢ়প্রত্যয়ী এবং শাসন-সংক্রান্ত বিষয়াদি নির্বাহের পূর্ণ যোগ্যতাধারী, তিনিই খিলাফতের যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন।
৪. খলিফা নির্বাচিত হবেন দীনি, চারিত্রিক ও সহজাত বৈশিষ্ট্যের আলোকে।
৫. পরিবার ও গোত্রের সঙ্গে খিলাফতের উত্তরাধিকারের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।
৬. সাকিফায়ে বনু সায়িদায় সমকালীন অবস্থা এবং বাস্তবতার নিরিখেই কুরাইশের হাতে নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিল। খলিফা নির্বাচনে সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা এবং উপযোগিতা সব সময় মাথায় রাখা জরুরি। তবে শর্ত হচ্ছে, তা ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থি হতে পারবে না।
৭. সাকিফায়ে বনু সায়িদায় যেসব কথাবার্তা হয়েছিল, তা मुसलमानों সার্বিক নিরাপত্তা ও কল্যাণকে সামনে রেখেই করা হয়েছিল। সেখানে ফিতনা- ফ্যাসাদ, মিথ্যা, চক্রান্ত, গাদ্দারি, স্বার্থপরতা কিংবা ঐক্য বিনষ্টের কোনো কথা হয়নি। সেখানে ছিল ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির পরিবেশ। শরিয়তের মূলনীতিই ছিল খলিফা নির্ধারণের মানদণ্ড।
ড. তাওফিক শাবি সাকিফায়ে বনু সায়িদার আলোচনা থেকে এমনকিছু বিষয়ের ওপর দলিল দিয়ে থাকেন, যেগুলো খুলাফয়ে রাশিদিনের যুগে শুরার ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হয়েছিল :
• কুরআন যে শূরার কথা বলেছে, সেই শুরার ভিত্তিতে প্রথম যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল সেটি হচ্ছে, রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা শুরার ভিত্তিতেই সম্পাদিত হবে। এ ছিল একটি ইজমা এবং এই ইজমার মূল ছিল সেই কুরআনি দলিল, যা শুরাব্যবস্থাকে ফরজ সাব্যস্ত করে থাকে। অর্থাৎ, এই ইজমা ইসলামি শাসনব্যবস্থার আগে শুরাব্যবস্থাকে জরুরি সাব্যস্ত করে। রাসুলের ইনতিকালের পর উম্মাহর ঐকমত্যে নির্ধারিত হওয়া বিষয়ের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম আইনি পদক্ষেপ। আর এই ঐকমত্যই ছিল কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত ইজমার प्रतिरूप।
• সাকিফায়ে বনু সায়িদায় দ্বিতীয় যে বিষয়টি গৃহীত হয়েছিল, তা ছিল রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন এবং তার অধিকারের সীমারেখা নির্ধারণ। এটিও শূরার আলোকেই হয়েছিল। অর্থাৎ, স্বাধীন বায়আত, যা শাসকের হাতে শর্তযুক্ত ক্ষমতা অর্পণ করে, তা বায়আতের মধ্যেই অন্তর্নিহিত থাকে। এটা আলাদাভাবে স্পষ্ট করার প্রয়োজন পড়ে না। এটি ছিল দ্বিতীয় মূলনীতি, যা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছিল।
• উল্লিখিত দুই মূলনীতি বাস্তবায়ন করেই খলিফা হিসেবে আবু বকরকে নির্বাচন করা হয়। এই নির্বাচন তখন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে, যখন সাধারণ বায়আত সংঘটিত হয়। অর্থাৎ, সকল মুসলমান দ্বিতীয় দিন মসজিদে নববিতে বায়আত গ্রহণ করেন। আবু বকর এসব শর্তে তা গ্রহণ করেন, যা তিনি তাঁর প্রথম খুতবায় উল্লেখ করেছিলেন। ইনশাআল্লাহ, আমরা তা সামনে বিস্তারিত আলোচনা করব।
টিকাঃ
আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/২৪।
৪০০ আল আওয়াসিমু মিনাল কাওয়াসিম: ১০।
৪০১ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/২৪।
৪০২ সহিহ বুখারি, কিতাবুল মুহারিবিন: ৬৮৩০।
৪০৩ মুসনাদু আহমাদ: ১/২১। শায়খ আহমাদ শাকির এর সনদ সহিহ বলেছেন। (১/২১৩); (১৩৩)।
৪০৪ আল-মুসতাদরাক: ৩/৬৬। ইমাম হাকিম একে সহিহ বলেছেন এবং জাহাবিও এর সত্যতা স্বীকার করেছেন।
আল-আনসার ফিল আসরির রাশিদি হামিদ মুহাম্মাদ আল-খলিফা ১০৮; তারিখল খুলাফা, সুয়তি: ৯১।
৪০৬ আল-খিলাফাতুর রাশিদা, উমরি: ১৩।
৪০৭ আল-আনসারু ফিল আসরির রাশিদি: ১০৮।
৪০৮ দ্রষ্টব্য: আল-ইসলাম ওয়া উসুলিল হিকাম, মুহাম্মাদ আমারাহ : ৭১-৭৪।
৪০৯ আল-আনসারু ফিল আসরির রাশিদি: ১০৯।
৪১০ ইসতিখলাফ আবি বাকর, জামাল আবদুল হাদি: ৫০, ৫১-৫৩।
*১১ আল-ইসতিআব ফি মারিফাতিল আসহাব: ২/৫৯৪।
*১২ আল-খিলাফাতু ওয়াল খুলাফাউর রাশিদুন, সালিম বাহানসাবি: ৪৮।
*১* আল-খুলাফাউর রাশিদুন, সালিম বাহানসাবি: ৪৯।
*** সহিহ বুখারি, কিতাবুত তামান্নি: ৭২৪৪।
৪১৫ মুসনাদু ইমাম আহমাদ: ১৮; সহিহ লি গাইরিহি।
৪১৬ আল-আনসাবু ফিল আসরির রাশিদি: ১০২।
৪১৭ তারিখুত তাবারি: ৪/৪২।
৪১৮ মিজানুল ইতিদাল ফি নাকদির রিজাল, জাহাবি: ৩/২৯৯২। এই বর্ণনাকারী লুত ইবনু ইয়াহইয়া আবু মিখনাফ একজন প্রত্যাখ্যাত বর্ণনাকারী। শিয়াসম্প্রদায় ব্যতীত তার বর্ণনায় অন্য কেউ তিল পরিমাণ বিশ্বাস করেন না। ইবনু কুমির বর্ণনামতে, সে শিয়াদের একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ। দ্রষ্টব্য : মারবিয়াতু আবি মিখনাফ ফি তারিখিত তাবারি: ড. ইয়াহইয়া আল ইয়াহইয়া: ৪৫-৪৬।
৪১৯ সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/২৭৭।
৪২০ আল-আনসারু ফিল আসরির রাশিদি: ১০২-১০৩।
৪২১ আল-আনসারু ফিল আসরির রাশিদি: ১০০।
৪২২ আল-ইসতিআব: ১/৩১৬।
৪২০ আল-আনসাবু ফিল আসরির রাশিদি: ১০০। বদরযুদ্ধ প্রসঙ্গে হাব্বাব রা.-এর ব্যাপারে যে বর্ণনাটি প্রসিদ্ধ, জাহাবি রাহ. একে প্রত্যাখ্যান করেছেন। দ্রষ্টব্য: তালখিসু মুসতাদরাক: ৩/১২৬-১২৭।
৪২৪ আল-আনসারু ফিল আসরির রাশিদি: ১০০।
৪২৫ সহিহ বুখারি, কিতাবুল আহকাম : ৭১৩৯।
৪২৬ সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ: ১৮২১।
৪২৭ সহিহ বুখারি, কিতাবুল আহকাম : ৭১৪০।
৪০১ সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ: ১৮১৮।
৪০২ আল-ফাতহুর রাব্বানি, সাআতি, খিলাফাহ অধ্যায়: ৫/২৩,৬৫; ইবনু আবি শায়বা: ৫/৫৪৪।
৪০৩ আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বা: ৫/৫৪৪।
৪০৪ আল-আনসারু ফিল আসরির রাশিদি: ১১১।
৪০৫ আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বা: ৫/৫৪৪।
* সহিহ বুখারি, কিতাবুল ফিতান : ৭০৫৮।
৪০১ দালায়িলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকি: ৬/৪৬৪; আল-ইহসান ফি তাকরিবি সাহিহি ইবনি হিব্বান : ৬৭১৩।
৪০২ সহিহ বুখারি, কিতাবুল ফিতান : ৭০৫৬।
৪০৬ আল-আনসারু ফিল আসরির রাশিদি: ১১৬।
৪০৭ আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআতি ফিস সাহাবাহ: নাসির হাসান আশ-শায়খ: ২/৫৩৯।
তাফসিবুর রাজি: ১/২৬০।
৪০৯ আল-ইতিকাদ, বায়হাকি: ১৭৩-১৭৪।
৪৪০ বাহরাইনের একটি বস্তি। দ্র: মুজামুল বুলদান: ২/১৭৪।
৪৪১ তাফসিরুল কুরতুবি: ৮/১৪৭-১৪৮।
৪৪২ তাফসিবুর রাজি: ১৬/১৬৮-১৬৯।
৪৪৩ তাফসিরু ইবনি কাসির: ৫/১২১।
৪৪৪ আল-ইবানা আন উসুলিদ দিয়ানা: ৬৭; মুকালাতুল ইসলামিয়িন: ২/১৪৪৷
৪৪৫ জামিউল বায়ান, তাবারি: ২৬/৮২-৮৪; আল ইতিকাদ, বায়হাকি: ১৭৩৷
৪৪৬ আল-ইবানা আন উসুলিদ দিয়ানা: ৬৭।
৪৪৭ মিনহাজুস সুন্নাহ: ১/১৩৫; আল-ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নিহাল: ৪/১০৭।
৪৪৮ আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ, নাসির হাসান আশ শাইখ: ২/৫৩৮।
৪৪৯ আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ, নাসির হাসান আশ শাইখ: ২/৫৩৯।
৪৫০ সহিহ বুখারি : ৩৬৫৯; সহিহ মুসলিম, ৪/১৮৫৬-১৮৫৭।
৪৫১ ফাতহুল বারি: ৭/২৪।
৪৫২ সিলসিলাতুল আহাদিসিস সাহিহা, আলবানি: ৩/২৩৩-২৩৬।
৪৫৩ তুহফাতুল আহওয়াজি বি শারহিত তিরমিজি: ১০/১৪৭।
৪৫৪ সহিহ মুসলিম: ৪/১৮৬১,১৮৬২।
৪৫৫ আল-ইতিকাদ: বায়হাকি: ১৭১।
৪৫৬ আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ ফিস সাহাবা: ২/৫৪২।
সহিহ বুখারি : ৬৮৭; সহিহ মুসলিম : ৪১৮; আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ ফিস সাহাবা : ২/৫৪২।
৪৫৮ শারহুন নাবাবি: ৪/১৩৭।
৪৫৯ আল-মুসতাদরাক লিল হাকিম: ৩/৬৭।
৪৬০ আত-তাবাকাত, ইবনু সাআد: ৩/১৮৩।
৪৬১ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৫/২৬৫।
৪৬২ মিনহাজুস সুন্নাহ, ইবনু তাইমিয়া: ১/১৩৪,১৩৫।
৪৬৩ মিনহাজুস সুন্নাহ, ইবনু তাইমিয়া: ১/১৩৪।
৪৬৪ আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ ফিস সাহাবা: ২/৫৪৭
৪৬৫ আল-ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নিহাল: ৪/১০৭।
৪৬৬ সহিহ মুসলিম: ৪/১৮৫৬-১৮৫৯।
৪৬৭ সহিহ মুসলিম: ৪/১৮৫৭, ২৩৮৭।
৪৬৮ সহিহ মুসলিম: ৪/১৮৬১, ১৮৬২।
আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ: ২/৫৪৮।
৪10 মিনহাজুস সুন্নাহ, ইবনু তাইমিয়া: ১/১৩৯, ১৪১; মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩৫/৪৭-৪৯।
৪১১ আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ: ২/৫৫১
৪১২ আবাতিলু ইয়াজিবু আন তুমহা মিনাত তারিখ, ইবরাহিম শাউত: ১০১।
৪১৩ আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ: ২/৫৫১
৪৭৪ তারিখু বাগদাদ: ১০/১৩০, ১৩১।
৪৭৫ আল-ইবানা আন উসুলিদ দিয়ানা: ৬৬।
৪৭৬ কিতাবুল ইরশাদ: ৩৬১।
৪৯৯ আল ইনসাফ ফি মা ইয়াজিবু ইতিকাদুহু ওয়ালা ইয়াজুজুল জাহলু বিহি: ৬৫। এখানে এ বিষয়টি জানিয়ে রাখা দরকার মনে করি যে, আমি আবু বকরের খিলাফত সম্পর্কে যেসব আয়াত, হাদিস এবং ইজমার কথা উল্লেখ করেছি তা ড. নাসির ইবনু আয়িজ হাসান আশ-শাইখ এর বিখ্যাত গ্রন্থ আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ ফিস-সাহাবার সার সংক্ষেপ।
৪৭ম আল-আহকামুস সুলতানিয়া: ৩।
৪৭ আসবুল খিলাফাতির রাশিদিন, ড. ফাতিহা আন নিবরায়ি: ২২, ২৩।
৪৮০ সহিহ মুসলিম: ৩/১৪৭৮, ন. ১৮৫১।
৪৮১ আল-খিলাফাতু ওয়াল খুলাফাউর রাশিদুন, ৫৯।
৪৮২ আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, শাহরাস্তানি: ৭/৮৩; নিজামুল হকমি, মাহমুদ খালিদি: ২৩৭-২৪৮।
৪৮৩ আল-খিলাফাতু ওয়াল খুলাফাউর রাশিদুন, ৪৯।
৪৮৪ আল মুকাদ্দিমা, ইবনু খালদুন: ১৯১।
আল-মুরতাজা সিরাতু আবিল হাসান ইবনু আবি তালিব: ৬৫,৬৬।
৪৮৬ আল-মুরতাজা সিরাতু আবিল হাসান ইবনু আবি তালিব: ৬৭।
৪৮৭ আল-খিলাফাতু ওয়াল খুলাফাউর রাশিদুন, : ৬৬,৬৭।
৪৮৮ দিরাসাতুন ফি আহদিন নুবুওয়াতি ওয়াল খিলাফতির রাশিদা, শুজা: ২৫৬।
৪৮৯ ফিকহুশ শুরা ওয়াল ইসতিশারাহ: ড. তাওফিক আশ-শাবি: ১৪০১।
৪৯০ ফিকহুশ শুরা ওয়াল ইসতিশারাহ: ড. তাওফিক আশ-শাবি: ১৪২।