📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 মাদানি সমাজব্যবস্থায় তাঁর অবস্থান

📄 মাদানি সমাজব্যবস্থায় তাঁর অবস্থান


১. ইয়াহুদি আলিম ফিনহাস সম্পর্কে তাঁর অবস্থান
অনেক সিরাত-বিশেষজ্ঞ এবং মুফাসসিরের বর্ণনায় রয়েছে, একবার আবু বকর রা. ইয়াহুদিদের তাওরাত-পাঠের আসরে গিয়ে দেখতে পান, ইয়াহুদিরা ফিনহাস নামের তাদের বড় এক আলিমের পাশে ভিড় জমিয়ে বসে আছে। ফিনহাস ছাড়াও সেখানে আশইয়া নামের এক পণ্ডিত এবং আরও কয়েকজন বিজ্ঞ আলিম ছিল। আবু বকর ফিনহাসকে বলেন, 'আল্লাহকে ভয় করো, ইসলাম গ্রহণ করে নাও। আল্লাহর শপথ, তুমি জানো, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য দীন নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছেন। তোমরা তাওরাত ও ইনজিলে তাঁর সম্পর্কে অনেক লেখা পেয়েছ।'
আবু বকরের কথা শুনে ফিনহাস বলে, 'আল্লাহর শপথ হে আবু বকর, আমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী নই; বরং আল্লাহই আমাদের মুখাপেক্ষী। আমরা তাঁর প্রতি এতটা বিনয়ী হই না, যতটা বিনীত তিনি আমাদের প্রতি। আমরা তাঁর থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী, তিনি আমাদের থেকে অমুখাপেক্ষী নন। যদি অমুখাপেক্ষীই হতেন, তাহলে আমাদের কাছে ঋণ চাইতেন না। তোমাদের সাথি তো তা-ই মনে করেন। তিনি সুদ থেকে তোমাদের বিরত থাকতে বলে আমাদের সুদ দেন। অমুখাপেক্ষী হলে আমাদের সুদ দিতেন না।'
ফিনহাসের কথা শুনে আবু বকর ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েন। তিনি তার চেহারায় প্রচন্ড জোরে আঘাত করে বলেন, 'সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ: হে আল্লাহর শত্রু, যদি তোমাদের সঙ্গে আমাদের অঙ্গীকার না থাকত, তাহলে আমি তোমার ঘাড় মটকে দিতাম।' ফিনহাস তখন রাসুলের কাছে গিয়ে বলে, 'দেখুন, আপনার সাথি আমার চেহারার কী দশা করেছে।' নবিজি তখন আবু বকরকে ডেকে বলেন, 'আবু বকর, এ তুমি কী করলে?' তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, সে খুব জঘন্য কথা বলছিল। বলছিল, আল্লাহ নাকি দরিদ্র এবং তারা নাকি ধনী। তার কথা শুনে আল্লাহর বড়ত্বের মহিমায় আমি ক্ষেপে যাই এবং তার চেহারায় আঘাত করে বসি।' ফিনহাস তখন তা অস্বীকার করে বলে, 'আমি এমন কথা বলিনি।' তখন আল্লাহ তাআলা ফিনহাসের কথার বিপরীতে আবু বকরের সত্যায়নে অবতীর্ণ করেন,
যারা বলে, আল্লাহ অবশ্যই অভাবগ্রস্ত আর আমরা অভাবমুক্ত, তাদের কথা আল্লাহ শুনেছেন। তারা যা বলেছে তা এবং নবিগণকে অন্যায়ভাবে হত্যার বিষয় আমি লিখে রাখব এবং বলব, তোমরা দহন-যন্ত্রণা ভোগ করো। [সুরা আলে ইমরান: ১৮১]
আর আবু বকরের ক্রোধের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
নিশ্চয় তোমাদের ধনৈশ্বর্য ও জীবন সম্পর্কে তোমাদের পরীক্ষা করা হবে। তোমাদের পূর্বে যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তাদের এবং মুশরিকদের থেকে তোমরা অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে। যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে নিশ্চয় তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ। [সুরা আলে ইমরান: ১৮৬]
২. নবিজির গোপনীয়তা সংরক্ষণ উমর রা. বলেন, বদরে অংশগ্রহণকারী খুনাইস ইবনু হুজায়ফা ইনতিকাল করলে আমার মেয়ে হাফসা বিধবা হয়ে পড়ে। আমি তখন উসমানের কাছে গিয়ে বলি, 'আপনি চাইলে হাফসাকে আপনার হাতে সমর্পণ করতে পারি।' তিনি উত্তর দেন, 'একটু ভেবে দেখি।' কয়েকদিন পর তিনি আমাকে বলেন, 'সিদ্ধান্ত নিয়েছি আপাতত বিয়ে করব না।' এরপর আমি আবু বকরের কাছে গিয়ে তাঁকে হাফসার বিয়ের প্রস্তাব দিই। তিনি নীরব থাকেন। তাঁর নীরবতায় আমি উসমানের চেয়ে বেশি হতাশ হই।
কিছুদিন এভাবে চলে যায়। এরপর রাসুল নিজেই হাফসার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠালে তাঁর সঙ্গে হাফসার বিয়ে দিয়ে দিই। পরে আবু বকর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেন, 'আমি আপনার প্রস্তাবের কোনো জবাব দিইনি, এ জন্য আপনি হয়তো আমার ওপর রেগে আছেন?' আমি বলি, 'অবশ্যই।' তিনি বলেন, 'আমার জবাব না দেওয়ার কারণ ছিল আমি জানতাম, রাসুল হাফসার কথা আলোচনা করছেন। তাই আমি তাঁর গোপনীয়তা ভাঙতে চাইনি। তিনি ইচ্ছা বাদ দিলে অবশ্যই আমি হাফসাকে বিয়ে করতাম।
৩. আবু বকর এবং জুমআর সালাতের আয়াত
জাবির ইবনু আবদিল্লাহ রা. বর্ণনা করেন; রাসুল জুমআর খুতবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় মদিনায় এক বণিক কাফেলা আসে। তাদের দেখে মাত্র ১২ জন ছাড়া উপস্থিত সকলে নবিজিকে খুতবায় রেখেই মসজিদ থেকে বেরিয়ে যান এবং পণ্য কিনতে থাকেন। তখন এ সম্পর্কে কুরআনের এই আয়াত অবতীর্ণ হয়,
যখন তারা দেখল ব্যবসা এবং কৌতুক, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ানো রেখে সেদিকে ছুটে গেল। বলো, আল্লাহর নিকট যা আছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসার চেয়ে উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা। [সুরা জুমুআ : ১১]
যে ১২ জন থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে আবু বকর ছিলেন একজন।
৪. আবু বকরকে নিরহংকার ঘোষণা
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন, 'যে ব্যক্তি অহংকারের কারণে কাপড় ঝুলিয়ে চলে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না।' কথাটি শুনে আবু বকর রা. নবিজিকে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমার লুঙ্গি তো একদিকে ঝুলে যায়। তবে আমি যথাসম্ভব তা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করি।' রাসুল ● তাঁকে বলেন, 'তুমি তো অহংকারের ছলে এমনটা করো না। '
৫. সিদ্দিক রা. কর্তৃক উপার্জনে হালাল অনুসন্ধান কায়েস ইবনু আবি হাজিম রা. থেকে বর্ণিত; আবু বকরের একটি গোলাম ছিল। সে কোনো খাদ্যশস্য নিয়ে উপস্থিত হলে তিনি তাকে খাদ্য সম্পর্কে প্রশ্ন না করা পর্যন্ত সেখান থেকে কিছুই খেতেন না। খাবারের উৎস যদি তাঁর কাছে পছন্দনীয় হতো, তাহলে তিনি তা থেকে খেতেন, নাহয় বিরত থাকতেন। একদিন তিনি খাবারের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে ভুলে যান এবং খাবার খেয়ে ফেলেন। পরে যখন স্মরণ হয়, তখন তিনি গোলামকে প্রশ্ন করলে সেটা তাঁর কাছে অপছন্দনীয় ঠেকে। গলায় হাত ঢুকিয়ে সেই খাবারগুলো বমি করে ফেলে দেন। ভেতরে কিছুই থাকতে দেননি। এই হচ্ছে আবু বকরের তাকওয়া ও পরহেজগারির অবস্থা। তিনি তাঁর আহার্যে হালাল অন্বেষণ করতেন। সন্দেহযুক্ত খাবার থেকে বিরত থাকতেন। তাঁর এই পবিত্র অভ্যাসই প্রমাণ করে, তিনি তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন। হালাল পানাহার ও হালাল পরিধানের মধ্যেই দুআ কবুল হওয়া নিহিত। যেমন: হাদিসে এসেছে, রাসুল ﷺ একজন ধুলোমলিন ব্যক্তিকে বলেছিলেন, 'সে তো তার উভয় হাত আকাশের দিকে তুলে হে আমার পালনকর্তা হে আমার পালনকর্তা বলছে, অথচ তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম। তার প্রতিপালন যখন এমন বস্তু দ্বারা হচ্ছে, তখন তার দুআ কবুল হয় কী করে।
৬. 'আমাকে সন্ধিতে শরিক করুন, যেভাবে যুদ্ধে শরিক করেছিলেন'
একদিন আবু বকর রা. নবিজির ঘরে যান। তাঁর মেয়ে আয়েশা তখন নবিজির সামনে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলছিলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি ঘরে ঢুকেই আয়েশাকে জাপটে ধরে বলতে থাকেন- 'আমি এসব কী দেখেছি? তুমি নবিজির সামনে এমনভাবে কথা বলছ কেন?' এমনকি তিনি আয়েশাকে মারতে উদ্যত হন। তখন রাসুল ﷺ তাঁকে বিরত রাখেন। এরপর তিনি সেখান থেকে চলে আসেন। আবু বকর রা. চলে যাওয়ার পর নবিজি আয়েশাকে বলেন, 'দেখলে, আমি তাঁর হাত থেকে তোমাকে কীভাবে রক্ষা করলাম।' এর কিছুদিন পর পুনরায় আবু বকর রা. রাসুলের খিদমতে উপস্থিত হন এবং দেখতে পান তাদের উভয়ের মধ্যে সন্ধি হয়ে গেছে। তখন তিনি নবিজিকে বলেন, 'আমাকে সন্ধিতে শরিক করুন, যেভাবে যুদ্ধে শরিক করে নিয়েছিলেন।' নবিজি বলেন, 'আমরা শরিক করে নিলাম। '
৭. সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধে গুরুত্বপ্রদান এক ইদে আবু বকর রা. উম্মুল মুমিনিন আয়েশার ঘরে গিয়ে দেখতে পান, সেখানে বসে দুই আনসারি শিশু গীত গাইছে। আবু বকর তখন মেয়েকে বলেন, 'শয়তানের বাঁশরি বুঝি রাসুলের ঘরে?' রাসুল তখন তাঁর দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে রেখে শুয়েছিলেন। নবিজি তখন বলেন, 'আবু বকর, ওদের ছেড়ে দাও, প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই ঈদ-উৎসব থাকে। আজ আমাদের مسلمانوں ঈদ। '
এ হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, এগুলো ছিল রাসুল এবং সাহাবিদের চিরন্তন অভ্যাসের বিপরীত। এ জন্যই আবু বকর একে শয়তানে বাঁশরি বলেছেন। অপরদিকে, রাসুল ওদের এমনটি করার কারণ হিসেবে ইদের মতো আনন্দোৎসবকে তুলে ধরেছিলেন। বাচ্চাদের জন্য তো ইদের দিন এক-আধটু খেলাধুলা ও রং-তামাশার অবকাশ আছে। হাদিসে এসেছে, 'যাতে মুশরিকরা অনুধাবন করতে পারে আমাদের ধর্মে উদারতা আছে। '
আয়েশা বয়সে ছোট হওয়ার কারণে খেলনা নিয়ে খেলাধুলা করতেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর বান্ধবীরাও খেলায় অংশ নিতেন। এ হাদিসে কিন্তু এ কথার কোনো প্রমাণ নেই যে, নবিজি ওদের সংগীত কান লাগিয়ে শুনছিলেন। (যদি সংগীত নবিজির কাছে ভালো লাগত, তাহলে তিনি দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকতেন না।) আদেশ-নিষেধের সম্পর্ক তো মনোযোগ দিয়ে শ্রবণের সঙ্গে; কানে আওয়াজ পৌঁছার সঙ্গে নয়। এ থেকে আমরা এ বিষয়টিও বুঝে নিতে পারি, যে-সকল শিশু খেলাধুলার বয়সে আছে, ইদের দিনে তাদের জন্য খেলাধুলার অবকাশ রয়েছে, যেভাবে আনসারি দুই বালিকা রাসুলের ঘরে ইদের দিন সংগীত গেয়েছিল।
৮. মেহমানদের সম্মান
আবদুর রাহমান ইবন আবি বকর রা. বর্ণনা করেন; সুফফার সদস্যরা একেবারে দরিদ্র ছিলেন। একবার রাসুল ﷺ বলেন, 'যার ঘরে দুজনের খাবার রয়েছে, সে যেন তৃতীয় একজনকে তার সঙ্গে নিয়ে যায়। যার ঘরে চারজনের খাবার রয়েছে, সে যেন পঞ্চম আরেকজন তার সঙ্গে নিয়ে যায়।' আবু বকর রা. তখন তিনজনকে সঙ্গে করে বাড়িতে ফেরেন; কিন্তু বিশেষ কারণে তিনি বিকেলের খাবার রাসুলের সঙ্গে খেয়ে নেন। এরপর রাত কিছুটা ঘনিয়ে এলে নিজের ঘরে ফেরেন। স্ত্রী তখন তাঁকে বলেন, 'আপনি মেহমানদের পেছনে থেকে গেলেন কেন?' তিনি বলেন, 'কেন? এখনো খাবার দাওনি?' স্ত্রী বলেন, 'তাঁরা আপনাকে রেখে খেতে অস্বীকার করছেন। অনেক সাধা হয়েছে; কিন্তু তাঁরা বলছেন আপনাকে রেখে খাবেন না!'
পিতা আবু বকর যখন কথা বলছিলেন, তখন আমি (আবদুর রাহমান) ভয়ে লুকিয়ে যাই। তিনি আমাকে ডাক দিয়ে কিছু কঠোর কথা বলেন। এরপর মেহমানদের বলেন, 'আপনারা খাবার খেয়ে নিন। আল্লাহর শপথ, আমি কিছুই খাব না।' মেহমানগণও শপথ করে বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমরা ততক্ষণ খাব না, যতক্ষণ-না আপনি খাচ্ছেন।' আবু বকর রা. তখন বলেন, 'এটা (কসম) শয়তানের পক্ষ থেকে।' এরপর তিনিও তাঁদের সঙ্গে খাবার খান। আবদুর রহমান বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমরা যে লুকমা উঠাতাম, তার নিচে এর চেয়ে বেশি খাবার জমা হয়ে যেত।' মেহমানগণ তৃপ্ত হয়ে আহার সারেন। তারপরও খাবার পূর্বের চেয়ে বেশি দেখাচ্ছিল।
আবু বকর তখন স্ত্রীকে বলেন, 'বনু ফিরাসের বোন, ঘটনা কী?' তিনি বলেন, 'আমার চোখের প্রশান্তি! এ-তো দেখছি আগের চেয়ে তিনগুণ বেশি খাবার।' আবু বকর তখন আহার করেন এবং বলেন, 'এই শপথ শয়তানের পক্ষ থেকে।' এরপর অবশিষ্ট খাবারগুলো রাসুলের কাছে নিয়ে যান এবং সেখানে সকাল পর্যন্ত অবস্থান করেন।
আমাদের ও মুশরিকদের মধ্যে একটি সন্ধি ছিল, যার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। রাসুল ﷺ ১২ জন লোককে নেতৃত্ব দিয়ে পাঠাচ্ছিলেন। প্রত্যেকের সঙ্গেই ছিল পৃথক পৃথক জামাআত। আল্লাহই ভালো জানেন, তাঁদের সঙ্গে কী পরিমাণ মানুষ ছিল। তাদের সকলেই এই খাবার থেকে পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করেন।”
শিক্ষা ও তাৎপর্য এই ঘটনায় প্রচুর শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে:
ক. আবু বকর ওই সব আয়াত ও হাদিস বাস্তবায়নে প্রচণ্ড আগ্রহী ছিলেন, যেগুলো আতিথেয়তার প্রতি উৎসাহ জোগায়। যেমন: আল্লাহ বলেন, 'এবং তাদের সামনে খাবার রাখল ও বলল তোমরা খাচ্ছ না কেন?' [সুরা জারিয়াত: ২৭] রাসুল বলেছেন, 'যে আল্লাহ এবং কিয়ামত দিবসের ওপর ইমান রাখে, সে যেন তার অতিথির সমাদর করে।
খ. এ ঘটনা থেকে আবু বকরের কারামাতের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। কারামতটি ছিল—পাত্র থেকে যে খাবার উঠানো হতো, তার জায়গায় খাদ্য বেড়ে যেত। আহার করে সকলে পরিতৃপ্ত হয়ে গেলেও খাবার আগের চেয়ে বেশি থেকে যায়। এরপর তা নবিজির খিদমতে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন নবিজির কাছে অসংখ্য মানুষ উপস্থিত ছিল। তারা সকলেই তৃপ্ত হয়ে আহার করে।
সর্বাবস্থায় নবিজির অনুকরণের ফলে তিনি এই কারামতের অধিকারী হয়েছিলেন। ঘটনাটি এ কথাও প্রমাণ করে যে, তিনি ছিলেন আল্লাহর অলিগণের কাতারে। রাসুলের সঠিক অনুসরণকারীরাই আল্লাহর অলি হয়ে থাকেন, যারা রাসুলের আদেশ মানেন এবং নিষেধ থেকে বেঁচে থাকেন। আল্লাহ ফেরেশতা এবং রুহুল আমিন দ্বারা তাদের সহায়তা করেন। তাদের অন্তরসমূহ আলোকিত করে তোলেন। অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে তিনি তাঁর ওই মুত্তাকি বান্দাদের সম্মানিত করে থাকেন।
গ. উম্মুল মুমিনিন আয়েশার বর্ণনা; শপথ ভঙ্গের আয়াত অবতীর্ণ হওয়া অবধি আবু বকর কখনো কোনো শপথ ভঙ্গ করেননি। তিনি বলেন, 'আমি যখনই কোনো শপথ করি, এরপর যখন শপথের বিপরীতে কল্যাণ দেখি, তখন শপথ ভঙ্গ করে কাফফারা আদায় করে নিই। তাই তিনি যখনই কোনো শপথের পর এর বিপরীতকে কল্যাণকর মনে করতেন, তখন কাফফারা আদায়পূর্বক সেটাই গ্রহণ করে নিতেন। এ ঘটনাটি এ কথারও দলিল যে, তিনি মেহমানদের সম্মানে শপথ ভেঙে খাবারে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
৯. 'আবু বকর, এটাই তোমাদের প্রথম বরকত নয়'
আয়েশা রা. বর্ণনা করেন; "এক সফরে আমরা রাসুলের সঙ্গী ছিলাম। বায়দা বা জাতুল জাইশে পৌঁছলে আমার হারটি হারিয়ে যায়। রাসুল হারটি খুঁজে বের করতে সেখানে থেমে যান। সেই এলাকার কোথাও পানির কোনো চিহ্ন ছিল না। এমনকি কাফেলার কারও সঙ্গেও পানি ছিল না। লোকজন তখন আবু বকরের কাছে এসে বলতে থাকেন, 'দেখলেন, আয়েশা কী করলেন। নবিজিসহ পুরো কাফেলাকে এমন এক জায়গায় থেমে যেতে বাধ্য করেছেন, যেখানে না আছে পানির চিহ্ন, না আছে লোকজনের সঙ্গে পানির ব্যবস্থা!'
আবু বকর তখন সোজা আমার কাছে আসেন। এ সময় রাসুল আমার রানে মাথা রেখে আরাম করছিলেন। আবু bকর বলতে থাকেন, 'আয়েশা, তুমি নবিজিসহ পুরো কাফেলাকে এমন একজায়গায় আটকে ফেলেছ, যেখানে না আছে পানি, না আছে মানুষের পানির ব্যবস্থা।' এভাবে তিনি আমাকে তিরস্কার করতে থাকেন। এ ছাড়া রাগে তিনি আমার কোমরে আঘাতও করছিলেন। যেহেতু রাসুল আমার রানে মাথা রেখে শুয়েছিলেন, তাই আমি নড়াচড়াও করতে পারছিলাম না। নবিজি এভাবে শুয়ে থাকেন, এমতাবস্থায় ভোর হয়ে যায়। অথচ তখনো পানির ব্যবস্থা হয়নি। তখন আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করেন- 'তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করবে।' [সুরা নিসা: ৪৩]
এর ভিত্তিতে উসায়দ ইবনু হুজায়র রা. বলে উঠেন, 'হে আবু বকর পরিবার, এটা তোমাদের প্রথম বরকত নয়।' (অর্থাৎ, ইতিপূর্বেও তোমার পরিবারের অনেক বরকত উম্মাহ ভোগ করেছে।)
আয়েশা রা. বলেন, 'আমি যে উটে আরোহী ছিলাম, সেটি সরানো হলে তার নিচে হারটি খুঁজে পাওয়া যায়।”
এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, আবু বকর রা. নবিজিকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। যে কারণে রাসুলের কষ্ট হয়, এমন কিছু তিনি সহ্য করতে পারতেন না। যদিও এ ক্ষেত্রে কষ্টের কারণ তাঁর অতি প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ আয়েশাই হন না কেন। কারণ, নবিজির সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে উম্মাহর আলিম ও দায়িদের জন্য নিজেকে আদর্শ বানিয়ে নিয়েছিলেন।
১০. আবু বকরকে নবিজির সাহায্য-সহায়তা ও সমর্থন অনেক হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, নবিজি আবু বকরকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। মানুষকে তাঁর বিরোধিতা করতে নিষেধ করেছেন।
আবুদ দারদা রা. থেকে বর্ণিত: আমি রাসুলের কাছে বসা ছিলাম। ইতিমধ্যে আবু বকর কাপড় কিছুটা উপরে উঠিয়ে সেখানে এসে পৌঁছান। কাপড় উঠানোর ফলে তাঁর টাখনু দেখা যাচ্ছিল। নবিজি তাঁকে বলেন, 'নিশ্চয় কারও সঙ্গে তোমার ঝগড়া হয়েছে?’ আবু বকর সালাম দিয়ে বলেন, 'হ্যাঁ, আল্লাহর রাসুল, আমার ও ইবনুল খাত্তাবের মধ্যে কিছু কথা কাটাকাটি হয়েছে। আমি তাঁকে অসন্তুষ্ট করে ফেলেছি। এরপর আমি নিজ কৃতকর্মের ওপর অনুতপ্ত হয়ে তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হই; কিন্তু তিনি ক্ষমা করতে অস্বীকার করেন। তাই এ ব্যাপারে আপনার সমীপে উপস্থিত হয়েছি।' নবিজি তখন তিনবার বলেন, 'হে আবু বকর, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিন।'
এদিকে উমরও তাঁর কৃতকর্মের ওপর অনুতপ্ত হয়ে আবু বকরের ঘরে চলে যান; কিন্তু তাঁকে ঘরে না পেয়ে তিনি সোজা নবিজির খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সালাম দেন। নবিজির পবিত্র চেহারা তখন রাগে পরিবর্তন হয়ে গেছে। নবিজির চেহারার অবস্থা দেখে আবু বকর উমরের ব্যাপারে ভীত হয়ে পড়েন। তিনি তখন নবিজির সামনে বিনীতভাবে বসে আবেদন করেন, 'আল্লাহর রাসুল, বাড়াবাড়িটা আমার পক্ষ থেকেই হয়েছিল। আল্লাহর শপথ, আমিই তাঁর সঙ্গে বাড়াবাড়ি করেছিলাম।' তখন রাসুল বলেন, 'আল্লাহ আমাকে তোমাদের দিকে পাঠিয়েছেন। তোমরা যখন আমাকে মিথ্যা বলছিলে, তখন আবু বকরই আমাকে সত্যায়ন করেছিল। সে তাঁর জানমাল দিয়ে আমার সঙ্গ দিয়েছিল। অতএব তোমরা কি আমার খাতিরে আমার সাথিকে ছাড় দিতে পারো না?' নবিজি কথাটি দুবার বলেন। এরপর থেকে আবু বকর কারও থেকে কোনো কষ্ট পাননি।
এ ঘটনার মধ্যে মুমিনদের জন্য রয়েছে অসংখ্য শিক্ষা ও উপদেশ। যেমন : সাহাবিদের মানবিক সত্তা এবং তাঁদের মধ্যে মতভিন্নতার ঘটনা সংঘটিত হওয়া, এরপর দ্রুত নিজেদের কৃতকর্মের ওপর লজ্জিত হওয়া, ভাইয়ের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা, পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার, রাসুলের কাছে আবু বকরের মর্যাদাময় অবস্থান ইত্যাদি।
১১. 'বলো, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিন'
রাবিআ আসলামি বলেন, আমি রাসুলের খিদমত করতাম। ফলে তিনি আমাকে ও আবু বকরকে একখণ্ড করে জমি দেন। এরপর দুনিয়ার প্রাচুর্য আসে। একসময় খেজুরের একটি কাঁদি নিয়ে আমরা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি। আমার বক্তব্য ছিল, বৃক্ষটি আমার সীমানায় অবস্থিত এবং আবু বকর বলছিলেন, এটা তাঁর সীমানায় । এ নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছু কথা কাটাকাটিও হয়ে যায়।
আবু বকর তখন আমাকে একটি অসমীচীন কথা বলে ফেলেন; কিন্তু পরক্ষণেই অনুতপ্ত হয়ে বলেন, 'রাবিআ, তুমিও আমাকে অনুরূপ একটি খারাপ কথা বলে ফেলো।' আমি বলি, 'জি না, আমি বলতে পারব না।' আবু বকর বলেন, 'হয় তুমি আমাকে অনুরূপ কটুকথা বলবে, নতুবা আমি রাসুলের দরবারে সাহায্যপ্রার্থী হব।' আমি বলি, 'যেতে পারেন, তবে আমি বলতে পারব না।' আবু বকর তখন সেখান থেকে চলে আসেন। আমিও তাঁর পেছনে পেছনে আসতে থাকি।
তখন বনু আসলামের কতিপয় লোক এসে বলে, 'আবু বকরের ওপর আল্লাহ রহম করুন, তিনি কোন ব্যাপারে রাসুলের সাহায্য নিতে যাচ্ছেন; অথচ তিনিই তো যা বলার বলে ফেলেছেন!' আমি বলি, 'আপনারা জানেন তিনি কে? তিনি সিদ্দিক। তিনি দুইয়ের দ্বিতীয়জন। مسلمانوں মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদার অধিকারী। সাবধান! তিনি যদি চেহারা ঘুরিয়ে দেখেন তোমরা আমার সাহায্যে আসছ, তাহলে তিনি রাগান্বিত হবেন। রাসুল -কে তা বলে দেবেন। তখন নবিজিও রাগান্বিত হবেন। এরপর তাদের উভয়ের রাগান্বিত হওয়ার কারণে আল্লাহও রাগান্বিত হয়ে যাবেন। এমন হলে আমি রাবিআর ধ্বংস অনিবার্য।' লোকজন বলেন, 'তাহলে আপনি আমাদের কী নির্দেশ দেবেন।' তিনি বলেন, 'তোমরা ফিরে যাও।'
আবু বকর রাসুলের দিকে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। আমিও তাঁর পেছনে পেছনে চলতে থাকি। তিনি রাসুলের কাছে পৌঁছে ঘটনাটি হুবহু তুলে ধরেন। নবিজি আমার দিকে মাথা উঠিয়ে বলেন, 'রাবিআ, তোমার ও সিদ্দিকের মধ্যে কী ঘটেছে?' আমি বলি, 'আল্লাহর রাসুল, এই পরিপ্রেক্ষিতে এই এই কথা হয়েছে। তিনি আমাকে একটি কটুকথা বলে ফেলেন। এরপর তিনি আমাকেও অনুরূপ একটি কথা বলতে বলেন, যাতে বদলা পূর্ণ হয়ে যায়। আমি তা বলতে অস্বীকার করি।' রাসুল বলেন, 'তুমি উত্তম কাজ করেছ।' তাঁর কথার জবাব না দিয়ে বলো, 'আবু বকর, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিন।' আমি বলি, 'আবু বকর, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিন।' ইমাম হাসান বসরি বলেন, 'আবু বকর রা. তখন কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যান।
সুবহানাল্লাহ, কী মহান অনুভূতি! কেমন মহৎপ্রাণ সত্তা ছিলেন তাঁরা। কোনো মুসলমানের সঙ্গে মানবিক দুর্বলতাবশত কিছু ঘটে গেলে তাঁরা তখন পর্যন্ত শান্ত হতেন না, যতক্ষণ-না তার অপরাধের বদলা হয়ে যায় অথবা ক্ষমা করে দেওয়া হয়, যাতে মর্যাদা হাতছাড়া হয়ে না যায়, সম্মান ও মর্যাদা বিনষ্ট না হয়। এই বোধটি তাঁদের মস্তিষ্কে যেন খোদাই হয়ে গিয়েছিল, ফলে ভাষাগত সামান্য ভুলের কারণে তাঁরা ভীত হয়ে উঠতেন। এরপর সমতাবিধান অথবা ক্ষমা করিয়ে নিতে অস্থির হয়ে যেতেন।
কথাটি ছিল একেবারে মামুলি; কিন্তু অন্তরের ভেতর তা প্রতিক্রিয়া করেছিল অনেক বেশি। যে কারণে আবু বকরের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে এবং তিনি রাবিআ থেকে অনুরূপ বিষয় (মন্দ কথা) আদায় করিয়ে নিতে অস্থির হয়ে পড়েন। তিনি যেন এর চেয়ে অল্প আঘাতে সন্তুষ্ট হতে পারেছিলেন না; অথচ তিনি ছিলেন উম্মাহর মধ্যে রাসুলের পর শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি। তাঁর মুখ থেকে বেরোনো কথাটিও কোনো অশ্লীল কথা ছিল না। তাঁর চরিত্রগুণ যে মানে উন্নীত ছিল, তাতে তাঁর থেকে এমনটি কল্পনাও ছিল দুরূহ। জাহিলি যুগেও কখনো তাঁর মুখ দিয়ে কোনো অশ্লীল কথা বের হয়নি।
আবু বকর তাঁর কথার পরিণাম নিয়ে ভীত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি রাসুলের কাছে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন। বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার! প্রচণ্ড ভয়ে তিনি জমির কথা ভুলে যান। যে বিষয় মতবিরোধ সৃষ্টি করেছিল, তা-ও ভুলে যান। তাঁর ধ্যানধারণা শুধু বান্দার হক-সংক্রান্ত, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থেকে ক্ষমা করিয়ে নিতে হয়।
এর মধ্যে উলামা, মাশায়েখ, মুবাল্লিগগণ এবং শাসকশ্রেণির জন্য এই শিক্ষা ও উপদেশ বিদ্যমান যে, কীভাবে নিজেদের ভুলের চিকিৎসা করা উচিত। মানুষের অধিকারকে কী পরিমাণ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এতে এই সাবধানবাণীও রয়েছে যে, কোনো অবস্থায়ই কারও অধিকার হরণ করা যাবে না।
রাবিআর গোত্রের লোকজন এই ঘটনায় আশ্চর্যান্বিত হয়ে যায়। তারা বলে, 'কটু কথাটি তো আবু বকরই বলেছিলেন। আবার তিনিই রাসুলের দরবারে বিচারপ্রার্থী হচ্ছেন!' মূলত আবু বকরকে তারা চিনতে ভুল করেছিল। তারা জানত না, তিনি কোন স্তরের ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দুনিয়ার বিরোধ দুনিয়ায় মিটিয়ে ফেলতে চাচ্ছিলেন, যাতে কিয়ামতের দিন এর জন্য জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে না হয়। যদিও রাবিআ তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ফেলেছিলেন এবং নবিজিও রাবিআকে বদলা নিতে বারণ করেছিলেন, তথাপি আবু বকর আল্লাহর ভয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এটি তাঁর দৃঢ় ইমান ও বিশ্বাসের দলিল।
এখানে রাবিআর ব্যাপারটিও বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তিনি আবু বকরকে অন্তহীন মর্যাদার চোখে দেখছিলেন। কোনো অবস্থায়ই তিনি তাঁকে পালটা কটু কথা বলতে রাজি হচ্ছিলেন না। এটাই হচ্ছে মর্যাদাবানদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান। তাঁর এ আচরণ প্রমাণ করে, তিনিও দীনি ব্যাপারে প্রখর প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন।
১২. সৎকাজে অগ্রগামিতা আবু বকর ছিলেন উন্নত ও প্রশংসাযোগ্য গুণাবলির অধিকারী। সৎকাজে সকলের চেয়ে এগিয়ে থাকার চেষ্টা ছিল তাঁর স্বভাবজাত অভ্যাস। সৎকর্ম ও উত্তম চরিত্রে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আদর্শপুরুষ। তাঁর বিশ্বাস ছিল—মানুষ আজ যা করতে চায়, তা হয়তো কাল করতে পারবে না। আজ আমল করার সময়, হিসাবের সময় নয়। কাল হিসাব দিতে হবে। তখন আমলের কোনো সুযোগ থাকবে না। তাই সব সময় পুণ্যকাজে আগে থাকার চেষ্টা করতেন তিনি।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত; রাসুল জিজ্ঞেস করেন, 'তোমাদের মধ্যে আজ কে রোজা রেখেছ?' আবু বকর বলেন, 'আমি।' নবিজি জিজ্ঞেস করেন, 'তোমাদের মধ্যে আজ কে জানাজায় অংশগ্রহণ করেছ?' আবু বকর জবাব দেন, 'আমি।' নবিজি জানতে চান, 'আজ অনাহারীকে কে আহার করিয়েছ?' আবু বকর বলেন, 'আমি।' বিশ্বনবি আবার প্রশ্ন করেন, 'তোমাদের মধ্যে আজ কে রোগীর সেবা করেছ?' এবারও আবু বকর বলেন, 'আমি।' তখন রাসুল বলেন, 'যার মধ্যে এসব গুণের সমাহার ঘটবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
১৩. ক্রোধদমন আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন; এক ব্যক্তি আবু বকরকে গালি দিচ্ছিল। সেখানে রাসুল -ও উপস্থিত ছিলেন। নবিজি তা দেখে মুচকি হাসছিলেন; কিন্তু লোকটি সীমা অতিক্রম করলে আবু বকর তার কিছু কথার জবাব দেন। তখন নবিজি অসন্তুষ্ট হয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হন। আবু বকর তখন নবিজির পাশে গিয়ে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, সে যে আমাকে গালি দিচ্ছিল, তখন তো আপনি বসে বসে শুনেছেন। যখন সে সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন আমি দু-একটি কথার জবাব দিচ্ছিলাম শুধু। এতেই আপনি রাগ করে বেরিয়ে যাচ্ছেন।' নবিজি তাঁকে বলেন, 'আবু বকর, তোমার সঙ্গে একজন ফেরেশতা ছিলেন, যিনি তোমার হয়ে তার গালির জবাব দিচ্ছিলেন; কিন্তু তুমি যখন নিজে জবাব দেওয়া শুরু করলে, তখন শয়তান তার ও তোমার মাঝখানে ঢুকে পড়ে। আমি তো শয়তানের সঙ্গে বসতে পারি না।'
এরপর নবিজি বলেন, তিনটি বিষয় সত্য—
যদি কোনো বান্দার ওপর জুলুম করা হয় এবং সে তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ছেড়ে দেয়, তাহলে আল্লাহ তার সম্মান বাড়িয়ে দেন।
যে ব্যক্তি দানের দরজা উন্মুক্ত করে এবং তার উদ্দেশ্য হয় আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করা, তখন আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ দান করেন।
যে ব্যক্তি অধিক মাল সংগ্রহের জন্য মানুষের কাছে চাওয়া শুরু করে, আল্লাহ তার সম্পদ কমিয়ে দেন।
ক্রোধ দমন আবু বকরের অনন্য এক গুণ ছিল। তবে ওই ব্যক্তিকে কেবল চুপ করতেই পালটা জবাব দিয়েছিলেন। এরপর রাসুল তাঁকে সহনশীলতার প্রতি উৎসাহ দেন। ক্রোধের সময় ধৈর্যধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ধৈর্যধারণ এবং ক্রোধ দমন এমন গুণ, যা মানুষের সম্মান ও মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়।
আবু বকরের এ আচরণ থেকে এটাও স্পষ্ট যে, তিনি কখনো রাসুলকে রাগাতে চাইতেন না। কখনো রেগে গেলেও দ্রুত তাঁকে সন্তুষ্ট করে নিতেন। এ হাদিসে শুধু সত্তাগত ব্যাপারে রাগ করার নিন্দা করা হয়েছে। এ থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, নবিগণ এ ধরনের সমাবেশ থেকে দূরে থাকেন, যেখানে শয়তান উপস্থিত হয়ে থাকে। এ ছাড়া ধৈর্যধারণকারী ও মাজলুমের মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। দান-খয়রাত করা এবং আত্মীয়তার বিষয়ে গুরুত্বারোপের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মানুষের সামনে হাত পাতার নিন্দা করা হয়েছে।
আবু বকর রা. ক্রোধ দমনের গুণে গুণান্বিত এবং ধৈর্য, সহ্য, সহনশীলতা ও নম্রতায় ছিলেন সকলের মধ্যে খ্যাত। এর অর্থ কিন্তু এটা ছিল না যে, তাঁর সত্তা থেকে ক্রোধ সম্পূর্ণরূপে তিরোহিত হয়ে গিয়েছিল, কখনোই তিনি রাগতেন না। আল্লাহর জন্য তিনি অবশ্যই রাগ করতেন। আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘন হতে দেখলে তিনি রেগে আগুন হয়ে যেতেন。
তিনি আল্লার এই নির্দেশের ওপর চিন্তাভাবনা করে সে অনুযায়ী আমলকারী হয়ে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন,
তোমরা ধাবমান হও নিজের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে, যার বিস্তৃতি আসমান ও জমিনের মতো, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় দান করে, ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল। আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের ভালোবাসেন। [সুরা আলে ইমরান: ১৩৩-১৩৪]
১৪. 'আল্লাহর শপথ, নিশ্চয় আমি চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন'
আবু বকর রা. মিসতাহ ইবনু উসাসা নামের একজনের ভরণপোষণ করতেন; কিন্তু ইফকের ঘটনায় মিসতাহ মুনাফিকদের প্রোপাগান্ডায় জড়িয়ে পড়লে তিনি শপথ করে বলেন, মিসতাহকে আর কখনো তিনি সাহায্য করবেন না। এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন,
তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন শপথ না করে যে—আত্মীয়স্বজন, অভাবগ্রস্ত এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা হিজরত করেছে, তাদের কিছুই দেবে না। তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন? এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা নূর: ২২] আবু বকর আয়াতটি শোনামাত্রই বলে ওঠেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি আর কখনো তাকে সাহায্য করা বন্ধ করব না।
এ আয়াত থেকে আবু বকর রা. স্পষ্ট বুঝে নেন যে, একজন মুমিনের জন্য সৌজন্যমূলক আচরণের অধিকারী হওয়া জরুরি। মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া উচিত, বিনিময়ে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। তার গুনাহের ওপর পর্দা ফেলে দেবেন। যেমন কর্ম তেমন ফল। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি চাও না, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন?’ অর্থাৎ, যেভাবে তোমরা চাও আল্লাহ তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেন, সেভাবে তোমাদেরও অপরের অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। এ আয়াত থেকে যে বিষয়টি স্পষ্টত অনুমিত হয়- কোনো ব্যক্তি একটি কাজ না করার শপথ করেছে। এরপর তার মনে হচ্ছে কাজটি না করে থাকার চেয়ে করাতেই রয়েছে সমূহ কল্যাণ। তখন তার উচিত হবে, শপথটি ভঙ্গ করে কাফফারা দিয়েই পুনরায় সেই কাজ চালিয়ে যাওয়া। এখানে আল্লাহ তাআলা অপবাদ রটনাকারীদের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কোমল শব্দ প্রয়োগ করেছেন।
এ আয়াত এ কথারও প্রমাণ বহন করে যে, নবিজির পর আবু বকরই হচ্ছেন উম্মাহর সর্বোত্তম ব্যক্তি। এ আয়াতে আল্লাহ তাঁকে বিস্ময়কর গুণে গুণান্বিত করেছেন, যা দীনের ব্যাপারে তাঁর সুউচ্চ মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। ইমাম রাজি এই আয়াত থেকে ১২টি গুণ বের করেছেন। সকল গুণের সারকথা হচ্ছে, তিনি কোনো শর্ত ছাড়াই শ্রেষ্ঠতম মর্যাদার আসনে সমাসীন ছিলেন। আল্লাহ তাআলা আবু বকরের প্রশংসা হিসেবে ‘উলুল ফাজলি’ এবং ‘আস-সাআ’ অর্থাৎ, বড়ত্ব ও প্রশস্ততার মতো শব্দ প্রয়োগ করেছেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এখানে বহুবচনসূচক শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। এ থেকেও প্রমাণিত হয়, তিনি ছিলেন সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত। আর এমন প্রশংসিত ব্যক্তি কখনো জাহান্নামি হতে পারে না।
১৫. মদিনা থেকে শামে বাণিজ্যিক সফর নববি যুগে আবু বকর রা. বসরা এবং শামে বাণিজ্যিক সফর করেছেন। নবিজির সঙ্গদানের ভালোবাসা তাঁকে এসব বাণিজ্যিক সফর থেকে আটকাতে পারেনি; আবার রাসুল আবু বকরকে চূড়ান্ত ভালোবাসার পরও তাঁকে সফর থেকে বিরত থাকতে বলেননি।
এ থেকে যে বিষয়ের গুরুত্ব প্রকাশ পায় তা হচ্ছে, একজন মানুষের কাছে এই পরিমাণ সম্পদ থাকা জরুরি, যাতে অন্যের কাছে তাকে হাত পাততে না হয়; বরং সে যেন তার উপার্জন থেকে দরিদ্র, অসহায় ও বন্দিদের মুক্ত করাসহ আল্লাহর পছন্দনীয় খাতে দান-সাদাকা করতে পারে।
১৬. আবু বকরের আত্মমর্যাদাবোধ এবং নবিজি কর্তৃক তাঁর স্ত্রীর পবিত্রতা ঘোষণা
আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আসের বর্ণনা; একবার বনু হাশিমের কতিপয় লোক তাঁর স্ত্রী আসমা বিনত উমায়সের কাছে (পর্দাহীন অবস্থায়) আসেন। আবু বকরের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত পীড়াদায়ক ঠেকে। এ ব্যাপারে তিনি রাসুলের সঙ্গে কথা বললে তিনি তাঁকে বলেন, 'আল্লাহ তোমার স্ত্রীর সাফাই গেয়েছেন।' এরপর রাসুল মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলেন, 'আজকের পর কেউ এমন কোনো মহিলার ঘরে যেতে পারবে না, যার ঘরে তার স্বামী অনুপস্থিত। তবে যদি তার সঙ্গে এক অথবা দুইজন লোক থাকে, তখন অসুবিধা নেই।
১৭. আবু বকরের আল্লাহভীতি
আল্লাহভীতি এমন এক মহান গুণ, যা মানুষকে পাপ থেকে নিবৃত্ত রাখে। মানুষের ভেতর-বাহির দীনি সৌন্দর্যে সাজিয়ে তোলে। এর মাধ্যমে তার কাজকর্ম পরিশুদ্ধ হয়। আল্লাহ মুমিন বান্দাদের তাঁকে ভয় করতে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
হে বনি ইসরাইল, তোমরা আমার অনুগ্রহকে স্মরণ করো, যে অনুগ্রহ আমি তোমাদের প্রতি করেছি এবং তোমরা আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করো, তাহলে আমি তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করব। তোমরা শুধু আমাকেই ভয় করবে। [সুরা বাকারা: ৪০]
অন্যত্র বলেছেন,
সুতরাং তুমি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছ, তাতে স্থির থাকো এবং তোমার সঙ্গে যারা ইমান এনেছে, তারাও স্থির থাকুক এবং সীমালঙ্ঘন করো না। তোমরা যা করো, নিশ্চয় তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা। [সুরা হুদ: ১১২]
যারা আল্লাহকে ভয় করে, তাদের জন্য তিনি মহা পুরস্কার রেখে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
আর যে আল্লাহর সামনে হাজির হওয়ার ভয় করে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান। [সুরা আর-রাহমান: ৪৬]
আনাস থেকে বর্ণিত; রাসুল একবার আমাদের সামনে এমন একটি খুতবা দেন, ইতিপূর্বে তাঁর থেকে কখনো এমন খুতবা শোনা যায়নি। তিনি বলেন, 'আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে তোমরা হাসতে কম, কাঁদতে বেশি।'
কথাটি শুনে সাহাবিগণ তাঁদের চেহারা ঢেকে নেন। তাঁদের থেকে তখন কান্নার আওয়াজ গুঞ্জরিত হতে থাকে।
আবু বকর ছিলেন ভয় ও আশার মূর্তপ্রতীক। তিনি ছিলেন সে-সকল মুসলমানের আদর্শ, যারা পরকালে সফল হতে চায়—চাই সে সাধারণ কেউ হোক কিংবা নেতৃস্থানীয়; সেনাপতি কিংবা সাধারণ সিপাহি।
মুহাম্মাদ ইবনু সিরিন বলেন, 'নবিজির পরে আবু বকরের চেয়ে আল্লাহর ভয়ে ভীত দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না।' আর কায়েসের বর্ণনা; আমি আবু বকরকে দেখেছি, তিনি তাঁর জিহ্বা ধরে বলছিলেন, 'এটাই সেই বস্তু, যা আমাকে ধ্বংসের জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে।
আবু বকর বলতেন, 'কাঁদো, যদি কান্না না আসে তাহলে কান্নার ভান ধরো।
মায়মুন ইবনু মিহরান থেকে বর্ণিত; আবু বকরের কাছে পূর্ণ পাখাবিশিষ্ট একটি কাক নিয়ে আসা হয়। তিনি সেটি উলটে-পালটে দেখে বলেন, 'যা শিকার করা হয় এবং যেসব গাছ কাটা হয়, তা কেবল এ জন্য যে, তারা আল্লাহর তাসবিহ থেকে গাফিল হয়ে পড়েছিল।
হাসান বসরি রাহ. থেকে বর্ণিত; আবু বকর বলেছেন, 'আল্লাহর শপথ, আমার ইচ্ছা জাগে আমি সেই গাছ হয়ে যাই, যাকে কেটে নেওয়া হয় অথবা খেয়ে ফেলা হয়।' আরও বলেছেন, 'আমার চাওয়া হচ্ছে, আমি মুমিনের কোনো একটি পশম হই। তিনি আবৃত্তি করতেন, তুমি প্রিয়তমের সুসংবাদ দিতে দিতে সেখানে পৌঁছে গেছ, মানুষ তো আশায় বুক বাঁধে; আর সে পথেই মারা যায়।

টিকাঃ
২৮ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু হিশাম: ১/৫৫৯,৫৫৯।
*** তাফসিরুল কুরতুবি: ৪/২৯৫।
১২৮০ ফাতহুল বারি: ৯/৮১; আত-তাবাকাতুল কুবরা: ৮/৮২।
২৮১ আল ইহসান ফি তাকরিবি সাহিহি ইবনি হিব্বান: ১৫/৩০০; সহিহ মুসলিম: ৮৬৩।
২৮২ সহিহ বুখারি: ৩৬৬৫।
* আজ-জুহদ, ইমাম আহমদ: ১১০; হুমায়দির আত-তারিখুল ইসলামি থেকে উদ্ধৃত : ১৯/১৩।
*** আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ১৯/১৩।
২৮ সহিহ মুসলিম: ১০১৫।
** সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৯৯। আল্লামা আলবানি আবু দাউদ রাহ.-এর দুর্বল বর্ণনার মধ্যে এটাকে গণ্য করেছেন। সিরাতু সিদ্দিক, মুহাম্মাদি আস সাইয়িদ: ১৩৬।
২৮৭ সহিহ মুসলিম, সালাতুল ইদায়ন: ৮৯২।
২৮৮ মাজমুউল ফাতাওয়া, ১১/৩০৮, মুসনাদু আহমাদ: ৬/১১৬, ২৩৩। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত।
২৮৯ মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩০/১১৮।
২৯০ সহিহ বুখারি, আল-মানাকিব: ৩৫৮১; সহিহ মুসলিম, আল আশরিবা: ২০৫৭।
২৯১ সহিহ মুসলিম: ৩/১৩৫৩।
২৯২ মাজমুউল ফাতাওয়া, ১১/১৫২, ১৫৩।
২৯৩ সুনানুল বায়হাকি: ১০/৩৪; মাওসুআতু ফিকহি আবি বাকরিন থেকে উদ্ধৃত: ২৪০।
২৯৪ মুসান্নাফু ইবনু আবি শায়বা: ১/১৫৮; মাওসুআতু ফিকহি আবি বাকরিন থেকে উদ্ধৃত: ২৪০।
২৯৫ মাওসুআত ফিকহি আবি বাকরিন: ২৪১।
২৯৬ সহিহ বুখারি: ৩৬৭২।
২৯৭ তারিখুদ দাওয়াতিল ইসলামিয়া: ৪০২,৪০৩।
২৯৮ সহিহ বুখারি, ফাজায়িলুস সাহাবা: ৩৬৬১।
২৯৯ মুসনাদু আহমাদ: ৫৮, ৫৯।
৩০০ আশহাবু মাশাহিরিল ইসলাম: ১/৮৮।
০০১ খুলাফাউর রাসুল, খালিদ মুহাম্মাদ খালিদ: ১০৩।
৩০২ আত-তারিখুল ইসলামি: ১৯/১৬।
৩০০ সহিহ মুসলিম: ১০২৮।
* সিরাতু ওয়া হায়াতুস সিদ্দিক, মাজদি ফাতহি আস সাইয়িদ: ১৪৫।
** ষষ্ঠ হিজরিতে বনু মুসতালিকযুদ্ধ থেকে ফেরার পথে আয়েশাকে জড়িয়ে মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনু উবাই যে মিথ্যা অপবাদ রটিয়েছিল, ইতিহাসে তা 'ইফকের' ঘটনা নামে খ্যাত। এ ঘটনার কারণে নবিজি ও আয়েশা রা. বেশ মর্মাহত হন। অবশেষে দীর্ঘ এক মাস পর আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সূরা নুরের ১১ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ করে আয়েশার পবিত্রতা ঘোষণা দেন। - সম্পাদক।
সহিহ বুখারি: ৪৭৫০।
৩০৮ তাফসিরুল মুনির: ১৮/১৯০।
৩০৯ তাফসিবুর রাজি: ১৮/৩৫১।
৩১০ ফাতহুল বারি: ৪/৩৫৭; সূত্রে আল-খিলাফাতুর রাশিদা ওয়াদ দাওলাতুল উমাবিয়াহ মিন ফাতহিল বারি: ১৬৩।
আর-রিয়াজুন নুসরা ফি মানাকিবিল আশারা, আবু জাফর আহমাদ আত-তাবারি : ২৩৭।
০১২ সহিহ বুখারি, কিতাবুত-তাফসির : বাবু লা তাসআল আন আশইয়া : ৬/৬৮।
*১০ তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম, ইয়াসরি মুহাম্মাদ : ৩৯৬।
৩১৪ সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৫৩।
৩১৪ আজ-জুহদ, বাবু জুহদি আবি বাকরিন, ইমাম আহমাদ: ১০৮।
০১৬ প্রাগুক্ত: ১১০।
৩১৭ প্রাগুক্ত: ১১২।
৩১৮ প্রাগুক্ত: ১০৮।

📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 আবু বকরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ গুণ ও মর্যাদা

📄 আবু বকরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ গুণ ও মর্যাদা


আবু বকরের ব্যক্তিত্ব ছিল নেতৃত্বগুণসমৃদ্ধ। তিনি ছিলেন একজন ধর্মনেতার গুণে গুণান্বিত। আমরা এখানে তাঁর সে গুণসমূহ থেকে কিছু সংক্ষেপে; আর কিছু বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
আবু বকরের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় তথা মল্লিজীবনে নবিজির সঙ্গদান, মাদানিজীবনে নবির সঙ্গে জিহাদে অংশগ্রহণ, তাঁর সামাজিক জীবনযাপন এবং শাসনকাল নিয়ে অধ্যয়ন করলে যেসব গুণ সামনে আসে, সেগুলো হচ্ছে আকিদার সংরক্ষণ, শরয়ি প্রজ্ঞা, আল্লাহ-নির্ভরতা, আদর্শ, সততা, বীরত্ব, মানবতা, পরহেজগারি, অপরকে অগ্রাধিকার দান, আত্মত্যাগ, সঠিক সহযোগী নির্বাচন, বিনয়-নম্রতা, সহনশীলতা, শিক্ষা ও শিক্ষাদান ইত্যাদি। আল্লাহ নিজের অনুগ্রহে তাঁর মধ্যে যে নেতৃত্বগুণ রেখেছিলেন, এর মাধ্যমে তিনি ইসলামি সাম্রাজ্যের নিরাপত্তাবিধান করেছিলেন। ইরতিদাদি ফিতনার শিকড় গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। উম্মাহকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর যেসব গুরুত্বপূর্ণ গুণের ওপর এখানে আলোকপাত করতে চাই, সেগুলো হচ্ছে আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ইমান, গভীর প্রজ্ঞা, অধিক দুআ ও বিনয়।
১. ইমানের উচ্চতা আল্লাহর ওপর আবু বকরের বিশ্বাস ছিল গভীর। তিনি ইমানের বাস্তবতা আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন। তাওহিদের আকিদা তাঁর হৃদয়ে একেবারে মিশে গিয়েছিল। এর প্রভাব তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছিল। তিনি জীবনভর তাতে স্থির ছিলেন। উন্নত চরিত্র ধারণপূর্বক অরুচিকর চরিত্র পরিহার করেছিলেন। আল্লাহর শরিয়ত ধারণ করে জীবনযাপন করেন। নবিজির পূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণ করছিলেন। আল্লাহর ওপর তাঁর সুদৃঢ় ইমান তাঁর মধ্যে দীনি প্রয়াস, দুঃসাহস, কর্মতৎপরতা, অনুশীলন, জিহাদ এবং সম্মান ও মর্যাদার আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছিল। তাঁর ইমান ছিল এতই পরিশীলিত যে, সাহাবিদের কেউ তাঁর সমমর্যাদায় পৌঁছতে পারেননি। আবু বকর ইবনু আইয়াশ রাহ. বলেন, 'আবু বকর রা. সালাত ও সাওমের দিক দিয়ে সকল সাহাবিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। এ ছিল তাঁর অন্তরে পুঁতে থাকা ইমানের প্রতিফলন। এ জন্যই বলা হয়েছে, আবু বকরের ইমানকে পৃথিবীর সকল মানুষের ইমানের সঙ্গে ওজন করা হলে তাঁর ইমানের পাল্লাই ভারী থাকবে। সুনানগ্রন্থে আবু বাকরা থেকে বর্ণিত; রাসুল একবার সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন, 'তোমাদের মধ্যে কেউ স্বপ্ন দেখেছ?' একজন বলেন, 'আমি স্বপ্নে দেখেছি, আসমান থেকে একটি পাল্লা নেমে এসেছে এবং আপনাকে ও আবু বকরকে ওজন করা হয়েছে। আপনি ছিলেন আবু বকর থেকে অনেক ভারী। এরপর আবু বকর ও উমরকে ওজন করা হলে দেখা যায়, আবু বকর ছিলেন উমর থেকে ভারী। এরপর উমর ও উসমানকে ওজন করা হয়, তখন দেখা যায় উমর উসমান থেকে ভারী। এরপর পাল্লাটি উঠিয়ে নেওয়া হয়।' নবিজির কাছে স্বপ্নটি ভালো লাগেনি। তিনি বলেন, 'এ-ই হচ্ছে নববি খিলাফতের দিকে ইঙ্গিত। এরপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁকে দেশ ও সালতানাত দান করবেন।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল ফজরের সালাত পড়ানোর পর মুসল্লিদের দিকে ফিরে বলেন, 'এক ব্যক্তি গাভি নিয়ে যাচ্ছিল এবং তাতে চড়ে সেটিকে পেটাতে শুরু করছিল। গাভি বলছিল, আমাদের এ জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। আমাদের তো কৃষিকাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।' কথাটি শুনে লোকজন বলে ওঠেন, 'সুবহানাল্লাহ, গাভি কথা বলছিল!' রাসুল বলেন, 'আমি এর ওপর ইমান রাখি, আবু বকর এবং উমরও এর ওপর ইমান রাখেন।' তাঁরা উভয়ে তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এরপর বলেন, 'এক ব্যক্তি তার বকরি নিয়ে অবস্থান করছিল। ইতিমধ্যে এক নেকড়ে জাপটা মেরে একটি বকরি উঠিয়ে নেয়। লোকটি নেকড়ের পিছুধাওয়া করে। একপর্যায়ে সে বকরিটি নেকড়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। নেকড়ে তাকে লক্ষ করে বলে, আজ তুমি ওকে বাঁচিয়ে নিলে; কিন্তু হিংস্রতার দিনে কে ওকে রক্ষা করবে? সে দিন আমি ছাড়া ওর কোনো নিরাপত্তাদানকারী থাকবে না।' লোকজন বলেন, 'সুবহানাল্লাহ, নেকড়েও কথা বলে!' নবিজি বলেন, 'আমি এর ওপর ইমান রাখি, আবু বকর এবং উমরও এর ওপর ইমান রাখেন।' আবু বকর ও উমর তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
তাঁর মধ্যে সুদৃঢ় ইমান, শরিয়ত অনুসরণ এবং সত্যবাদিতা ও নিষ্ঠার কারণে নবিজি তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। এই ভালোবাসা ছিল অন্য সাহাবিদের ভালোবাসার তুলনায় অনেক বেশি।
আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, 'রাসুল আমাকে জাতুস সালাসিলযুদ্ধের সেনাপতি নির্ধারণ করেছিলেন। তখন আমি তাঁকে বলি, 'আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে?' রাসুল বলেন, 'আয়েশা।' আমি বলি, 'পুরুষদের মধ্যে?' তিনি বলেন, 'আয়েশার পিতা।' আমি জিজ্ঞেস করি, 'এরপর কে?' তিনি বলেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব।' এরপর আরও কয়েকজনের নাম বলেন।
আবু বকর এই সুদৃঢ় ইমান, শরিয়তের প্রতি যত্নবান হওয়া, দীনের প্রতি সাহায্য- সমর্থন এবং অন্তহীন চেষ্টার ফলেই রাসুলের মুখে জান্নাতের প্রতি সাহায্য- হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যাঁকে জান্নাতের সকল দরজা থেকে স্বাগত জানানো হবে।
আবু মুসা আশআরি থেকে বর্ণিত: আমি ঘরে অজু করে বের হই এবং মনে মনে বলি, আমাকে অবশ্যই রাসুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। আজ পুরো দিন আমি তাঁর পাশে থাকব। আমি মসজিদে যাই, সেখানে থাকা লোকজনকে নবিজি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। লোকজন বলে, তিনি এখান থেকে বেরিয়ে ওদিকে গিয়েছেন। আমি তাঁর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে করতে পেছন পেছন যেতে থাকি। নবিজি তখন আরিস কূপের সীমানায় ঢুকে পড়েছিলেন। আমি কূপের ফটকে বসে পড়ি। দরজাটি ছিল খেজুরগাছের কান্ডের। রাসুল প্রাকৃতিক প্রয়োজন শেষে অজু করার পর আমি তাঁর কাছে যাই। তিনি তখন আরিস কূপে উভয় পা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। আমি তাঁকে সালাম করি। এরপর ফিরে এসে দরজায় বসে পড়ি। সিদ্ধান্ত নিই, আজ রাসুলের পাহারার কাজ আনজাম দেবো। ইতিমধ্যে আবু বকর সেখানে উপস্থিত হন এবং দরজায় ধাক্কা দেন। আমি জিজ্ঞেস করি, 'কে?' উত্তর আসে, 'আমি আবু বকর।' আমি বলি, 'একটু অপেক্ষা করুন।' এরপর আমি নবিজির কাছে গিয়ে বলি, 'আল্লাহর রাসুল, আবু বকর আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান।' নবিজি বলেন, 'তাঁকে আসতে দাও এবং জান্নাতের সুসংবাদ দাও।' আমি এসে আবু বকরকে বলি, 'আসুন, আল্লাহর রাসুল আপনাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন।' এরপর তিনি এসে রাসুলের পাশে ঠিক রাসুলের মতো কূপের ভেতর পা ঝুলিয়ে বসে পড়েন।
আর আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় কোনো জিনিসের জোড়া খরচ করবে, তাকে জান্নাতের সব দরজা ডাকবে। যারা নামাজি হবে, তারা বাবুস সালাত, যারা মুজাহিদ হবে তারা বাবুল জিহাদ, যারা জাকাত-সাদাকা করবে, তাদের বাবুস সাদাকা, যারা রোজাদার হবে, তাদের বাবুর রাইয়ান দিয়ে ডাকা হবে।' আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, এসব দরজা দিয়ে যাদের ডাকা হবে, তাদের তো কোনো প্রয়োজন বাকি থাকবে না; কিন্তু এমন কেউ আছে কি, যাকে জান্নাতের প্রতিটি দরজা ডাকবে?’ রাসুল বলেন, 'আবু বকর, আশা করি তুমি তাদের মধ্যে হবে।
২. আবু বকরের প্রজ্ঞা
আবু বকর ছিলেন আল্লাহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান রাখা ব্যক্তি। আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভীতিপোষণকারী। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হচ্ছে, আবু বকর রা. ছিলেন সবচেয়ে বড় আলিম। অনেকে এ ব্যাপারে ইজমার কথা বলেছেন। সকল সাহাবির ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হচ্ছে, সফরে ও বাড়িতে সর্বদা রাসুলের সঙ্গদান। ইশার পরেও তিনি নবিজির সঙ্গে সময় কাটাতেন। مسلمانوں নানাবিধ বিষয় নিয়ে রাসুলের সঙ্গে মতবিনিময় করতেন। অন্য কোনো সাহাবি তখন তাঁর পাশে থাকতেন না। নবিজি কোনো বিষয়ে সাহাবিদের থেকে পরামর্শ চাইলে আবু বকরই প্রথম কথা বলতেন। অন্যরা খুব কম বলতেন। অনেক সময় অন্যরা কোনো কথা বলতেন না। তখন তাঁর কথামতোই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। যদি অন্যদের অভিমত তাঁর অভিমতের বিপরীত হতো, তাহলে রাসুল সেসব অভিমত বাদ দিয়ে আবু বকরের মতকে অগ্রাধিকার দিতেন।
মদিনা থেকে সম্পন্ন প্রথম হজে নবিজি তাঁকেই হাজিদের আমির নিযুক্ত করেছিলেন। সাধারণত হজের বিধান অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে কঠিন ও সূক্ষ্ম। তাঁর মধ্যে ইলমের গভীরতা না থাকলে অবশ্যই নবিজি তাঁকে আমির বানাতেন না। একইভাবে সালাতের ইমামতিতেও তাঁকে স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন। তাঁর ইলম না থাকলে অবশ্যই এমনটি করা হতো না। সালাত ও হজে নবিজি তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত করেননি। আনাস রা. তাঁর থেকেই মহানবি বর্ণিত 'কিতাবুস সাদাকা' বর্ণনা করেছেন। এগুলোই হচ্ছে সাদাকা-সংক্রান্ত সবচেয়ে বিশুদ্ধ বর্ণনা।
উম্মতের ফকিহগণ এর ওপর আস্থা রেখেই নাসিখ-মানসুখ নির্ধারণ করে থাকেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, তিনি নাসিখ সুন্নাহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর থেকে এমন কোনো কথা বর্ণিত হয়নি, যা কুরআনের স্পষ্ট বিধানের বিপরীত। এটা তাঁর গভীরতম প্রজ্ঞা এবং দক্ষতার পরিচায়ক। শরিয়তের এমন কোনো মাসআলা তাঁর থেকে বর্ণিত হয়নি, যেখানে তিনি ভুল করেছেন; অথচ অন্যদের থেকে এমন অনেক বর্ণনা বিদ্যমান। তিনি নবিজির উপস্থিতিতে বিভিন্ন বিষয়ের মীমাংসা করতেন এবং ফাতওয়া দিতেন; অথচ নবিজি কখনো তাঁর ভুল ধরেননি। এই মর্যাদা তিনি ব্যতীত অন্য কেউ অর্জন করতে পারেননি, যেমনটি আমি হুনাইনের যুদ্ধ চলাকালে আবু কাতাদার গনিমত-সংক্রান্ত বিষয়ে বর্ণনা করেছি।
রাসুলের ইনতিকালের পর অন্যদের ওপর তাঁর ইলমি শ্রেষ্ঠত্ব ফুটে উঠেছিল। তাঁর শাসনকালে যে বিষয়েই মতবিরোধ সৃষ্টি হতো, তিনি কুরআন-সুন্নাহর আলোকে তা যথাযথভাবে নিরসন করতেন। এটা তাঁর ইনসাফ এবং শরিয়তের ইলমের ব্যাপারে প্রাজ্ঞতার দলিল। তিনি কাউকে কোনো কাজের নির্দেশ দিলে লোকজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর আনুগত্য করত। তিনিই মানুষের কাছে রাসুলের মৃত্যুর ব্যাপারটি পরিষ্কার করেছিলেন। ইমানের ওপর অটল থাকতে তাদের সহায়তা করেছিলেন। নবিজির দাফনের জায়গা নির্ধারণ করেছিলেন। তাঁর উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিষয়টি খোলাসা করেছিলেন। জাকাত আদায়ে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদের মাসআলা স্পষ্ট করেছিলেন; অথচ উমরের মতো ব্যক্তিরও তাতে দ্বিধা ছিল। এ ছাড়া 'খিলাফত কুরাইশের অধিকার'-এ বিষয়টিও স্পষ্ট করেছিলেন। উসামা-বাহিনীকে প্রস্তুত করেছিলেন এবং চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাঁদের শামের দিকে পাঠিয়েছিলেন। স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন, 'আল্লাহ যে ব্যক্তিকে ইহকাল ও পরকালের মধ্যে যেকোনো একটি গ্রহণের অধিকার দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন নবিজি মুহাম্মাদ। এসব মাসআলার বিস্তারিত বিবরণ ইনশাআল্লাহ যথাস্থানে উল্লেখ করা হবে।
নবিজি আবু বকরকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নও তাঁর গভীর ইলমের বার্তা দেয়। আবদুল্লাহ ইবনু উমর থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেছেন, 'স্বপ্নে দেখি, আমাকে দুধেভরা একটি পাত্র দান করা হয়েছে। আমি তা থেকে তৃপ্ত হয়ে পান করি। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, তা আমার গোশত এবং শিরা-উপশিরায় দৌড়াচ্ছে। এ থেকে কিছু রয়ে গেলে আমি তা আবু বকরকে দিয়ে দিই।' লোকজন বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, এটি নিশ্চয় ইলম, যা আল্লাহ আপনাকে দান করেছেন। আপনি তৃপ্ত হওয়ার হওয়ার পর তা আবু বকরকে দিয়ে দিয়েছেন।' রাসুল বলেন, 'তোমরা সত্য বলেছ।'
আবু বকর রা. স্বপ্নটিকে সত্য মনে করেছিলেন। তা ছাড়া স্বপ্নের ব্যাখ্যায়ও তাঁর পারদর্শিতা ছিল। ভোর হলে তিনি লোকজনকে বলতেন, 'যিনি ভালো স্বপ্ন দেখেছেন, বলুন।' এ ছাড়া তিনি বলতেন, 'একজন মুসলমানের অজু অবস্থায় ভালো স্বপ্ন দেখা আমার কাছে এই এই সম্পদ থেকে উত্তম।'
তিনি যেসব স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে:
• আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত: একব্যক্তি রাসুলের কাছে এসে বলে, 'আমি রাতে স্বপ্ন দেখেছি, একটি মেঘখণ্ড ছায়া দান করছে; আর তা থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঘি ও মধু ঝরছে। মানুষ তা নিজেদের হাতের তালুতে নিচ্ছিল- কেউ বেশি, কেউ কম। এ ছাড়া একটি রশি দেখতে পাই, যা আসমান পর্যন্ত প্রলম্বিত। আমি দেখতে পাই, আপনি রশিটি ধরে আকাশে উঠে গেছেন। এরপর আরেকজন সেটা ধরে এবং সে-ও উপরে চলে যায়। তারপর আরেকজন ধরতেই তা ছিঁড়ে যায়; কিন্তু পুনরায় তা জোড়া লেগে যায়।'
স্বপ্ন শুনে আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল-আমার মাতা-পিতা আপনার ওপর কুরবান হোক-অনুগ্রহপূর্বক আমাকে এর ব্যাখ্যা বলার অনুমতি দিন।' নবিজি বলেন, 'ঠিক আছে, বলো।' আবু বকর বলেন, 'মেঘের ব্যাখ্যা হচ্ছে ইসলাম। তা থেকে যে ঘি ও মধু টপকাচ্ছিল, তা হচ্ছে কুরআন। অর্থাৎ, তার মিষ্টতা টপকাচ্ছিল। কেউ অল্প এবং কেউ বেশি কুরআনের ইলম নিচ্ছিল। আর যে রশি জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল, তা হচ্ছে সত্য, যার ওপর আপনি অধিষ্ঠিত আছেন। আপনি তাতে স্থির থাকবেন। আল্লাহ আপনাকে শীর্ষস্থানে পৌঁছে দেবেন। আপনার পর আরেকজন রশিটা আঁকড়ে ধরবে, ফলে সে-ও শীর্ষস্থানে পৌঁছে যাবে। এরপর এক ব্যক্তি ধরবে, তবে রশিটা ছিঁড়ে যাবে; কিন্তু পরে আবার জোড়া লাগিয়ে দেওয়া হবে। তখন সে-ও উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। আল্লাহর রাসুল-আমার পিতামাতা আপনার ওপর কুরবান হোক-বলুন আমিতি সত্য ব্যাখ্যা দিয়েছি?' নবিজি বলেন, 'কিছুটা ঠিক বলেছ, আর কিছুটা ভুল করেছ।' আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আপনি অবশ্যই বলুন আমি কী ভুল করেছি? নবিজি বলেন, 'আবু বকর, শপথ করো না।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত: তিনি স্বপ্নে দেখেন, তাঁর কক্ষে যেন তিনটি চাঁদ নেমে এসেছে। স্বপ্নটি তিনি আবু বকরকে শোনান। তিনি ছিলেন স্বপ্নব্যাখ্যায় পারদর্শী। তিনি বলেন, 'তোমার স্বপ্ন সঠিক হলে তোমার ঘরে এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তিন ব্যক্তির দাফন হবে। যখন নবিজির ইনতিকাল হয়, তখন তিনি আয়েশাকে বলেন, 'আয়েশা, এ হচ্ছে তোমার শ্রেষ্ঠতম চাঁদ।' এ থেকে বোঝা যায়, নবিজির পর তিনিই ছিলেন স্বপ্নব্যাখায় সবচেয়ে বড় আলিম।
সাহাবিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলিম হলেও তিনি ছিলেন লৌকিকতা থেকে অনেক দূরে। ইবরাহিম নাখায়ি বর্ণনা করেন; একবার আবু বকর তিলাওয়াত করেন, (ফল এবং গবাদি খাদ্য।)। [সুরা আবাসা: ৩১] লোকজন জিজ্ঞেস করেন, 'আব' কী? এরপর সবাই যার যার মতো করে কথা বলতে থাকেন। তখন আবু বকর বলেন, 'এ হচ্ছে লৌকিকতা। কোন ভূমি আমাকে আশ্রয় দেবে, কোন আকাশ আমাকে ছায়া দেবে, যদি আমি কুরআন সম্পর্কে এমন কথা বলি, যা আমি জানি না।
৩. দুআ, বিনয় ও অত্যধিক কান্নাকাটি
দুআ এক বিশাল দরজা। কোনো বান্দার জন্য সে দরজা খুলে দেওয়ার মানে তার জন্য কল্যাণ ও বরকতের সমস্ত দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া। এ জন্য আবু বকর আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে বেশি আগ্রহী ছিলেন। তিনি আল্লাহর দরবারে অধিক দুআ করতেন। কারণ, দুআ শত্রুর ওপর ঐশী সাহায্য-শক্তি প্রাপ্তির অন্যতম একটি মাধ্যম। আল্লাহ বলেন,
তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে বিমুখ, তারা অবশ্যই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে। [সুরা মুমিন: ৬০]
অন্যত্র বলেছেন,
বান্দা যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে প্রশ্ন করে, আমি তো নিকটেই। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই। সুতরাং তারাও আমার আহ্বানে সাড়া দিক এবং আমার ওপর ইমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।। সুরা বাকারা: ১৮৬]
আবু বকর রা. রাসুলের সঙ্গ ধরেছিলেন এবং একেবারে কাছ থেকে দেখেছিলেন-কীভাবে তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানান। কেমন করে তাঁর কাছে সাহায্যপ্রার্থী হন। রাসুলের কাছ থেকে এগুলো শিখতে তিনি বেশি আগ্রহী ছিলেন। এ বিষয়কেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। দুআ ও তাসবিহতে তিনি সেসব শব্দ-বাক্যকে অগ্রাধিকার দিতেন, যেগুলো নবিজি ব্যবহার করতেন। কোনো মুসলমান রাসুল থেকে বর্ণিত শব্দের ওপর অন্য কোনো শব্দ-বাক্যকে অগ্রাধিকার দিতে পারে না-চাই সেসব শব্দ-বাক্য যতই অর্থবহুল এবং সুন্দর হোক না কেন। কারণ, রাসুলই তো ছিলেন কল্যাণের শিক্ষক। সিরাতে মুসতাকিমের প্রথপ্রদর্শক। সর্বোত্তম ও পরিপূর্ণ কোনটি, তিনিই তা ভালো ও বেশি জানতেন।
সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে; আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন একটি দুআ শিক্ষা দিন, যা সালাতে পড়তে পারি।' নবিজি বলেন, বলো-
اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا، وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ، وَارْحَمْنِي، إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
হে আল্লাহ, আমি নিজের ওপর প্রচণ্ড জুলুম করেছি। আপনিই তো পাপ ক্ষমা করে থাকেন। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার ওপর দয়া করুন। নিঃসন্দেহে আপনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
এই দুআয় বান্দা নিজের সত্তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যেন সে তাঁর রহমতের কাঙাল। সে তার প্রতিপালককে এমন গুণে গুণান্বিত করছে, যেন তিনি ছাড়া অন্য কেউ তার উদ্দেশ্যের কথা জানিয়ে দিচ্ছে। কবুল হওয়ার জন্য বিনীতভাবে নিবেদন করছে। ক্ষমা ও রহমতের গুণে আল্লাহকে স্মরণ করছে। এটিই হচ্ছে প্রার্থনার মধ্যে পরিপূর্ণ প্রার্থনা।
সুনানগ্রন্থে আবু বকর রা. থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমাকে সকাল-সন্ধ্যা পড়ার মতো দুআ বলে দিন।' রাসুল বলেন, বলো
فَاطِرَ السَّمَوَاتِ والأَرْضِ عَالَمَ الغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، رَبَّ كُلِّ شَيْءٍ وَمَلِيكَهُ. أَشْهَدُ أَن لا إِله إِلا أَنتَ، أَعُوذُ بكَ منْ شَرِّ نَفسي وَشَرِّ الشَّيْطَانِ وَشِرْكِهِ قَالَ: "قُلْها إِذا أَصْبَحْتَ، وَإِذا أَمْسَيْتَ، وَإِذا أَخَذْتَ مَضْجِعَكَ
হে আল্লাহ, আপনি আসমান-জমিনের স্রষ্টা, দৃশ্য-অদৃশ্যের জ্ঞানী, সবকিছুর পালনকর্তা ও বাদশাহ। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আমি আপনার কাছে আশ্রয় কামনা করছি আত্মপ্রবঞ্চনা ও শয়তানের ধোঁকা থেকে এবং সেসব কাজ থেকেও, যেগুলোর মাধ্যমে নিজের ওপর জুলুম করা হয়; অথবা অপর মুসলমানকে জুলুম করি। নবিজি বলেন, “সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমানোর সময় এই দুআ পাঠ করবে।”
আবু বকর রা. রাসুল থেকে এ বিষয়টির শিক্ষা লাভ করেছিলেন যে, প্রত্যেক মানুষই তাওবা ও ইসতিগফারের মুখাপেক্ষী। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। আল্লাহ বলেন,
আমি তো আসমান জমিন এবং পর্বতমালার প্রতি এই আমানত পেশ করেছিলাম, তারা এটি বহন করতে অস্বীকার করল এবং শঙ্কিত হল; কিন্তু মানুষ এটি বহন করল। নিশ্চয় সে অতিশয় জালিম ও চরম অজ্ঞ। পরিণামে আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও নারীকে শাস্তি দেবেন এবং মুমিন পুরুষ ও নারীকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা আহজাব: ৭২-৭৩]।
মানুষ জালিম এবং অজ্ঞ। তবে মুমিনদের মূল মাকসাদ হচ্ছে তাওবা। আল্লাহ কুরআনে কল্যাণকামী বান্দাদের তাওবা গ্রহণ এবং তাদের ক্ষমাদানের কথা বলেছেন। বুখারি ও মুসলিমে রাসুল থেকে বর্ণিত আছে— 'কোনো মানুষ তার পুণ্যকাজের ভিত্তিতে কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।' সাহাবিগণ বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আপনিও?' রাসুল বলেন, 'হ্যাঁ আমিও—যদি না আল্লাহর রহমত আমাকে ঢেকে নেয়।'
এ হাদিসটি কিন্তু আল্লাহর সেই বাণী-বিরুদ্ধ নয়, যেখানে বলা হয়েছে- ‘তাদের বলা হবে, পান করো তৃপ্তির সঙ্গে, তোমরা অতীতে যা করেছিলে তার বিনিময়ে। [সুরা হাক্কাহ: ২৪] কারণ, রাসুল ﷺ তাঁর বাণী بعمله তে ওই 'ب' অস্বীকার করেছেন, যা ‘মোকাবিলা’র অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর কুরআনে উল্লখিত بِمَا اِسلفتُمْ ওই 'ب' প্রমাণিত করে, যা ‘আসবাব’-এর অর্থ ধারণ করে। অর্থাৎ, সৎকর্ম জান্নাতের মূল্য নয়; বরং জান্নাত লাভের মাধ্যম। আর জান্নাত লাভের জন্য শুধু সৎকর্ম নয়; বরং আল্লাহর রহমত থাকাও অপরিহার্য।
যারা বলে থাকেন, ‘আল্লাহ কোনো বান্দাকে ভালোবাসলে পাপকাজ তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না’– এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ কোনো বান্দাকে ভালোবাসলে তাকে তাওবা-ইসতিগফারের তাওফিক দান করেন। সে তখন গুনাহের কাজে স্থির থাকে না। আর যে মনে করে, গুনাহে স্থির থাকলেও এই গুনাহ তার ক্ষতির কারণ হবে না, সে নিশ্চয় পথহারা। তার কথা কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফের ইজমার বিপরীত। কুরআন বলেছে, যে সামান্যতম পুণ্যকাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে সামান্যতম পাপ করবে, সে-ও তা দেখতে পাবে।
আবু বকর আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত থাকতেন। আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে কান্নাকাটি করতেন। সব সময় আল্লাহমুখী থাকতেন। কখনো দুআ থেকে দূরে থাকতেন না। তিনি যেসব দুআ করতেন তার কয়েকটি হচ্ছে :
ক. হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে সকল বস্তুর মধ্যে নিয়ামতলাভের প্রার্থনা করি। এগুলোর ওপর আমাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের তাওফিক দাও, যতক্ষণ-না তুমি সন্তুষ্ট হচ্ছ। সন্তুষ্ট হওয়ার পরও আমাকে সকল ধরনের পুণ্যকাজ করার তাওফিক দান করো। আমি তোমার কাছে সকল সহজ কাজের প্রার্থনা করি ও জটিল কাজ থেকে আশ্রয় চাই।
খ. হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে ওই জিনিসের প্রার্থনা করি, যা আমার জন্য শুভ পরিণাম বয়ে আনবে। প্রভু, তুমি শেষ কল্যাণ হিসেবে আমাকে যা দান করবেন তা যেন হয় তোমার সন্তুষ্টি এবং জান্নাতুন নায়িমের সুমহান মর্যাদা।
গ. হে আল্লাহ, আমার জীবনের শেষ ভাগকে কল্যাণময় করো এবং তা যেন হয় সর্বোত্তম। যে দিন আমি তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব, সে দিনটিকে সবচেয়ে উত্তম বানিয়ে দিয়ো।
ঘ. হে আল্লাহ, তুমি আমাকে আমার নিজের চেয়ে বেশি জানো। আমিও মানুষের চেয়ে আমাকে বেশি জানি। হে আল্লাহ, আমাকে তাদের ধারণানুযায়ী উত্তম বানিয়ে দাও। আমাকে সেসব পাপ থেকে রক্ষা করো, যা তারা জানে না। তারা যা বলছে, সে ভিত্তিতে আমাকে পাকড়াও করো না।
এই হচ্ছে আবু বকরের সংক্ষেপে উপস্থাপন করা বিশেষ কিছু গুণ। রাসুলের অবর্তমানে আবু বকরের যাপিত জীবনেও আমরা নববি প্রশিক্ষণের ঝলক দেখতে পাব। দেখতে পাব, তিনি কীভাবে আল্লাহর অনুগ্রহে উত্তম দীক্ষাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। দৃঢ় ইমানের অধিকারী এবং কাজে-কর্মে উত্তম হয়েছিলেন। নবিজির শিষ্যত্ব গ্রহণ করে এমন মর্যাদার আসনে আসীন হয়েছিলেন, যেখানে কেউ উপনীত হতে পারেননি। কীভাবে তিনি তাঁর সেনাপতির কাছ থেকে সৈনাপত্য শিখেছিলেন। বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করেছিলেন। যখন খিলাফতের বাগডোর হাতে নেন, তখন অন্ধকার রাতের উত্তুঙ্গ তরঙ্গময়ী সাগরের প্রবল ঝঞ্ঝা এড়িয়ে কীভাবে ইসলামের কিশতিকে শান্তি ও নিরাপত্তার তীরে ভিড়িয়েছিলেন।

টিকাঃ
৩৯ ফাজায়িলস সাহাবা, ইমাম আহমাদ রাহ: ১/১৭৩।
সুনানু আবি দাউদ: ৪৬৩৪; সুনানুত তিরমিজি: ২২৮৮।
সাহিহ মুসলিম: ২৩৮৮।
অন্য কাউকে সেনাপতি না বানিয়ে তাঁকে বানানোয় তিনি ভাবেন, রাসুলের কাছে তিনি-ই হয়তো সবার চেয়ে প্রিয়। আমর ইবনুল আস এ ধারণা থেকেই নবিজিকে প্রশ্নটি করেছিলেন।- সম্পাদকা
২০ সহিহ বুখারি: ২৬৬২।
৩৪২ সহিহ বুখারি, আর-রিকাক: ৬৪৬৩।
৩৪৪ সহিহ বুখারি: ৩৬৭৪।
৩২৫ সহিহ বুখারি: ২৬৬৬।
৩২৬ তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি: ৫৯।
৩২৭ মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৩/১২৭।
৩২৮ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, মালুল্লাহ: ৩৩৪, ৩৩৫।
৩২৯ সহিহ বুখারি: ১৪৪৮।
৩৩০ নাসিখ ওই পরবর্তী বিধান, যা পূর্ববর্তী বিধানকে রহিত করে এবং মানসুখ হচ্ছে বহিত হওয়া বিধান।
৩৩১ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক আফজালুস সাহাবাতি ওয়া আহাক্কুহুম বিল খিলাফাতি : ৬০।
৩৩২ প্রাগুক্ত: ৫৭।
১০০০ প্রাগুক্ত: ৫৯।
আল-ইহসান ফি তাকরিবি সাহিহি ইবনি হিব্বান: ১৫/২৬৯।
খুতাবু আবি বাকিরিনিস সিদ্দিক, মুহাম্মাদ আশুর ও জামাল আল কুমি: ১৫৫।
সহিহ বুখারি, কিতাবুত তাবির: ৭০৪৬।
তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি: ১২৯, ১৩০।
ফাতহুল বারি: ১৩/২৮৫: এই বর্ণনার সনদ ইবরাহিম নাখয়ি থেকে আবু বকর পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন।
৩০৯ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., আলি তানতাবি: ২০৭১।
৩৪০ সহিহ বুখারি: ৮৪৩; সহিহ মুসলিম, আজ-জিকরু ওয়াদ দুআ: ২৭০৫।
৩৪১ মাজমুউল ফাতাওয়া: ৯/১৪৬।
৩৪২ সুনানু আবি দাউদ, আল-আদব: ৫০৬৭; সুনানুত তিরমিজি, আদ-দাওয়াত: ৩৫২৯।
*** মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ১১/১৪২।
৩৪৫ আশ-শুকর, ইবনু আবিদ দুনইয়া: ১০৯; খুতাবু আবি বাকরিনিস সিদ্দিক: ৩৯ থেকে উদ্ধৃত।
৩৪৬ খুতাবু আবি বাকরিনিস সিদ্দিক: ১৩৯।
কানজুল উম্মাল: ৫০৩০; খুতাবু আবি বাকরিনিস সিদ্দিক: ৩৯ থেকে উদ্ধৃত।
উসদুল গাবা: ৩/৩২৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00