📄 তাবুকযুদ্ধ, হজকাফেলার নেতৃত্ব এবং বিদায়হজ
১. তাবুকযুদ্ধে আবু বকর
রাসুল ৩০ হাজার সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী নিয়ে রোমানদের মোকাবিলার উদ্দেশ্যে শামের দিকে রওনা হন। যখন তাঁর নেতৃত্বে মুসলমানগণ 'সানিয়াতুল বিদা' উপত্যকার পাশে সমবেত হন, তখন নেতা এবং অধিনায়ক মনোনীত করা হয়। তাদের জন্য বিভিন্ন পতাকা নির্ধারণ করেন। তখন সবচেয়ে বড় পতাকাটি অর্পণ করেন আবু বকরের হাতে। এই যুদ্ধে আবু বকরের স্বতন্ত্র অবস্থান স্পষ্ট হয়।
ক. আবদুল্লাহ জুল বিজাদাইনের ইনতিকালের ব্যাপারে তাঁর অবস্থান
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের বর্ণনা; আমি রাসুলের সঙ্গে তাবুকযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। রাতে ঘুম থেকে উঠলে একদিকে মশাল জ্বলতে দেখি। কী হচ্ছে তা দেখতে সেদিকে এগিয়ে যাই। দেখতে পাই সেখানে নবিজি, আবু বকর ও উমর উপস্থিত। আবদুল্লাহ জুল বিজাদাইন ইনতিকাল করেছেন। তাঁর কবর খনন করা হয়ে গিয়েছিল। রাসুল নিজে কবরে নেমে আবু বকর ও উমরকে বলছিলেন, 'তোমাদের ভাইকে আমার নিকটে পৌঁছে দাও।' তাঁরা উভয়ে তাঁকে কবরে পৌঁছে দেন। নবিজি তাঁকে কবরে শুইয়ে রেখে বলেন, 'হে আল্লাহ, আমি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলাম, আপনিও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান।' ইবনু মাসউদ বলতেন, 'আহ! আমি যদি এই কবরের অধিবাসী হতাম।'
আবু বকর যখনই কোনো মৃতকে কবরে রাখতেন তখন বলতেন, 'আল্লাহর নামে, রাসুলের মিল্লাতের ওপর, বিশ্বাসের সঙ্গে, মৃত্যুর পরে জীবিত হওয়ার বিশ্বাসের সঙ্গে।'
খ. রাসুলের কাছে مسلمانوں জন্য দুআর প্রার্থনা উমর রা. বর্ণনা করেন; আমরা কঠিন গরমের মৌসুমে তাবুকের উদ্দেশে বের হয়েছিলাম। পথে একজায়গায় শিবির স্থাপন করি। আমাদের খুব তৃষ্ণা পেয়েছিল। মনে হচ্ছিল মৃত্যু খুব কাছেই। তৃষ্ণার পরিমাণ এতই তীব্র ছিল যে, জীবন বাঁচাতে মানুষ তাদের উটগুলো জবাই করে এর ভেতরকার থলেতে থাকা পানি পান করছিল। এমতাবস্থায় আবু বকর রাসুলের কাছে গিয়ে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ তো আপনাকে কল্যাণের আধার বানিয়েছেন; অতএব আপনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন।' রাসুল বলেন, 'তুমিও কি তা চাও।' তিনি উত্তরে বলেন, 'হ্যাঁ।' নবিজি তখন দুআর জন্য হাত ওঠান। ফলে এমন বৃষ্টিপাত হয় যে, সকল মানুষ তাদের পাত্রগুলো পানি দ্বারা পূর্ণ করেন। এরপর আমরা বের হয়ে দেখি, সেনাবাহিনীর অবকাশস্থলের বাইরে বৃষ্টির কোনো চিহ্নও নেই।
গ. তাবুকযুদ্ধে আবু বকরের দান তাবুকযুদ্ধের সময় রাসুল সাধ্যানুসারে যথাসম্ভব যুদ্ধ-তহবিলে দান করতে মানুষকে উৎসাহ দেন। কেননা, সফর ছিল দূরপাল্লার এবং কষ্টসাধ্য। শত্রুরাও সংখ্যায় ছিল অগণন এবং প্রশিক্ষিত। নবিজি দানকারীদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণের অঙ্গীকার দিয়েছিলেন। প্রত্যেকেই নিজের সাধ্যানুযায়ী দান করেন। এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি দান করেছিলেন উসমান রা.। উমর রা. তাঁর সম্পদের অর্ধেক আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দেন। তাঁর ধারণা ছিল, আজ আমি আবু বকরকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি।
তিনি নিজেই বর্ণনা করেন; রাসুল দান করতে আমাদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তখন আমার কাছে ভালোই সম্পদ ছিল। আমি মনে করেছিলাম, এবার আমি আবু বকরকে ছাড়িয়ে যেতে পারব। সুতরাং আমি পুরো সম্পদের অর্ধেক আল্লাহর রাসুলের খিদমতে নিয়ে আসি। রাসুল তখন আমাকে জিজ্ঞেস করেন, 'উমর, ঘরে কিছু রেখে এসেছ?' আমি বলি, 'ঠিক এই পরিমাণ অর্থাৎ, অর্ধেক রেখে এসেছি।' ইতিমধ্যে আবু বকর তাঁর ঘরের সমুদয় মাল নিয়ে হাজির হন। নবিজি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'আবু বকর, সন্তানদের জন্য কী রেখে এসেছ?' তিনি বলেন, 'তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে এসেছি।' আমি তখন তাঁকে বলি, 'আবু বকর, আমি কোনো ব্যাপারেই আপনার থেকে এগিয়ে যেতে পারলাম না।' পুণ্যকাজে উমরের এ ঈর্ষাপোষণ জায়িজ; কিন্তু আবু বকরের অবস্থান ছিল তাঁর থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁর অন্তরে প্রতিযোগিতার কোনো ধারণাও ছিল না। নিজের দানকে অন্যের দানের সঙ্গে তুলনা করারও কোনো ইচ্ছা ছিল না। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি।
২. হজকাফেলার আমির হিসেবে আবু বকর রাসুলের যুগে সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রগঠনের প্রশিক্ষণ ছিল আকিদা, অর্থনীতি, সামাজিক ঐক্য, রাজনৈতিক, সামরিক ব্যবস্থাপনাসহ ইবাদতের সমন্বয়ে। আগের বছর হজ আদায় করা সম্ভব হয়নি। মক্কাবিজয়ের পর অষ্টম হিজরিতে আত্তাব ইবনু উসায়দের ওপর হজের দায়িত্ব অর্পণ করা হলেও মুসলিম এবং অমুসলিমদের হজনীতির মধ্যে কোনো ভেদরেখা টানা সম্ভব হয়নি। সুতরাং নবম হিজরিতে হজের মৌসুম এলে রাসুল হজ আদায়ের ইচ্ছা পোষণ করেন; কিন্তু পরে এই বলে ইচ্ছা বাদ দিয়ে দেন যে, 'মুশরিকরা উলঙ্গ হয়ে কাবাঘর প্রদক্ষিণ করবে, এটা আমার কাছে মোটেও পছন্দনীয় নয়। আমি এ অবস্থায় হজ করতে পারি না।' তাই রাসুল হজ আদায়ের জন্য আবু বকরকে কাফেলার আমির বানিয়ে পাঠান।
আবু বকর লোকজনকে নিয়ে মক্কায় রওনা হন। ইতিমধ্যে রাসুলের ওপর সুরা তাওবা অবতীর্ণ হয়। নবিজি তখন আলিকে ডেকে পাঠান। তাঁকে নির্দেশ দেন, 'তুমি গিয়ে আবু বকরের সঙ্গে মিলিত হও।' আলি তখন রাসুলের উট আজবায় চড়ে বেরিয়ে পড়েন। জুলহুলায়ফায় পৌঁছে আবু বকরের সঙ্গে মিলিত হন। আবু বকর তাঁকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'আমির হয়ে এসেছ, নাকি সাধারণ অনুসারী হিসেবে?' আলি বলেন, 'সাধারণ একজন অনুসারী হিসেবে।' এরপর কাফেলা রওনা হয়ে যায় এবং তাঁরা আবু বকরের নেতৃত্বে হজের কাজ সম্পাদন করেন।
সঠিক বর্ণনামতে, ওই বছর হজ জিলহজ মাসে আদায় করা হয়। অনেকে জুলকাদা মাসের কথা বলেছেন; কিন্তু তা সঠিক নয়। আবু বকর ইয়াওমে তারবিয়ার পূর্বে (জিলহজ মাসের ৮ তারিখ), ইয়াওমে আরাফা (৯ জিলহজ), ইয়াওমে নাহার (১০ জিলহজ) এবং ইয়াওমে নাফারিল উলায় (১২ জিলহজ) খুতবা প্রদান করেন।
খুতবায় তিনি মানুষকে হজের গুরুত্বপূর্ণ বিধান, আরাফায় অবস্থান, তাওয়াফে ইফাজা, মিনায় নির্ধারিত স্থানে পাথর ছোড়া এবং মিনা থেকে রওনা হওয়া- সংক্রান্ত যাবতীয় মাসআলা শিক্ষা দেন। আলি রা. সকল ব্যাপারেই তাঁর পেছনে অবস্থান করছিলেন। তিনি লোকজনকে সুরা তাওবার প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে শোনাতেন; আর জনগণের মধ্যে এই চারটি বিষয়ের ঘোষণা দিতেন- ১. জান্নাতে কেবল মুমিনগণ প্রবেশ করবে। ২. আগামী বছর থেকে কেউ উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করতে পারবে না। ৩. রাসুলের সঙ্গে যাদের অঙ্গীকার রয়েছে, তা নির্ধারিত তারিখ পর্যন্ত বহাল থাকবে। ৪. এবারের পর মুশরিকদের আর হজের অনুমতি দেওয়া যাবে না।
আবু বকর আবু হুরায়রার নেতৃত্বে সাহাবিদের একটি দলকে এই বিশাল খিদমতের জন্য আলির সহযোগী হিসেবে নিযুক্ত করেন।
মুশরিকদের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার অকার্যকর করে দিতে রাসুল কর্তৃক আলিকে নিযুক্তির কারণ, তৎকালে সমাজের সাধারণ রীতি ছিল-কোনো অঙ্গীকার স্থিতিশীল রাখা বা ভঙ্গের ঘোষণা দিতে হলে গোত্রের সর্দার কিংবা তাঁর ঘনিষ্ঠ নিকটাত্মীয়কেই ঘোষণাটি দিতে হতো। যেহেতু রীতিটা ইসলামের কোনো বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল না, তাই রাসুল আলিকে এর জন্য নিযুক্ত করেন। তাঁকে সুরা তাওবার প্রথমিক আয়াতগুলো প্রচারের জন্য পাঠানোর এটাই ছিল মূল কারণ। রাফিজিদের এ ধারণা মোটেও সঠিক নয় যে, আলি রা. খিলাফতের অধিক হকদার ছিলেন বিধায় তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। শায়খ মুহাম্মাদ আবু শাহবা এতে সংযুক্ত করে বলেন, জানি না, এই দুষ্ট লোকগুলো সিদ্দিকের এ কথাটি কীভাবে হজম করে নিল যে, "তুমি নেতা হয়ে এসেছ, নাকি অনুসারী হয়ে।" আর অনুসারী নেতা থেকে খিলাফতের অধিক হকদার হয় কীভাবে? আবু বকরের নেতৃত্বে এই হজ ছিল বিদায়হজের ভূমিকাস্বরূপ। এই হজে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল—‘আজ থেকে মুর্তিপুজার যুগ শেষ, এখন থেকে ইসলামের নতুন যুগের শুরু।’ এখন মানুষের জন্য দরকার হচ্ছে, আল্লাহর শরিয়তের অনুসরণ করা। আরব গোত্রগুলোর কাছে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার পর তাদের বিশ্বাস জন্মে যায় যে, এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এখন থেকে মূর্তিপুজার আর কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং তারা নিজেদের মুসলমান ঘোষণা দিয়ে স্ব স্ব গোত্রের প্রতিনিধিদল রাসুলের কাছে পাঠাতে থাকে।
৩. বিদায়হজ
আসমা বিনতু আবি বকর রা. থেকে বর্ণিত; "আমরা বিদায়হজে রাসুলের সহযাত্রী হই। ওয়াদিয়ে আরাজে পৌঁছালে নবিজি সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। আয়েশা নবিজির পাশে বসা ছিলেন। আবু বকরের কাছে তখন মালসামানার জন্য একটিমাত্র বাহন ছিল; আর সেটি ছিল তাঁর গোলামের সঙ্গে। তিনি বাহনটির অপেক্ষা করছিলেন। ইতিমধ্যে গোলাম এসে হাজির হয়; কিন্তু তার সঙ্গে কোনো বাহন ছিল না। আবু বকর গোলামকে জিজ্ঞেস করেন, 'উট কোথায়?' গোলাম জবাব দেয়, 'রাতে পালিয়ে গেছে।' আবু বকর রেগে বলেন, 'একটিমাত্র উট ছিল, সেটিও হারিয়ে ফেললে?' কথাটি বলে তিনি গোলামকে পেটাতে শুরু করেন। দৃশ্যটি দেখে নবিজি মুচকি মুচকি হাসছিলেন আর বলছিলেন, 'দেখো, এই বঞ্চিত লোকটিকে কী করা হচ্ছে!’
টিকাঃ
২৬২ সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৪৩।
সাহিহুস সিরাতিন নাবাবিয়াহ: ৫৯৮।
মুসান্নাফু আবদির রাজ্জাক: ৩/৪৯৭; মাওসুআতু ফিকহিস সিদ্দিক থেকে উদ্ধৃত: ২২২।
সাহিহু ইবনি হিব্বان, কিতাবুল-জিহাদ, বাবু গাজওয়াতি তাবুক ১৭০৭।
আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ ফি জুইল মাসাদিরিল আসলিয়াহ : ৬১৫।
২৮৭ সুনান আবি দাউদ, কিতাবুজ জাকাত: ২/৩১২-৩১৩ (১৬৭৮) আলবানি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
২৬৮ মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবন তাইমিয়া: ১০/৭২-৭৩।
২৯ দিরাসাতুন ফি আহদিন নুবুওয়াহ, ইমাদুদ্দিন খলিল: ২২২।
২৭০ এর অপর নাম তাওয়াফে জিয়ারাহ, এটি ফরজ তাওয়াফ।
২৭১ সাহিহুস সিরাতিন নাবাবিয়াহ: ৬২৫।
২৭২ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু আবি শাহবা: ২/৫৩৭।
২৭০ সাহিহুস সিরাতিন নাবাবিয়াহ: ৫২৪১
২৭১ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু আবি শাহবা: ২/৫৪০।
২৭৫ কিরাআতুন সিয়াসিয়াহ লি সিরাতিন নাবাবিয়াহ, কালআজি: ২৮৩।
২৭৬ হিজাজের তিহামাস্থ ওয়াদি ফাহালে অবস্থিত। মুজামুল মাআলিমিল জু'রাফিয়া: ২০২।
২৭৭ মুসনাদু আহমাদ: ৬/৩৪৪।