📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 বদরযুদ্ধে আবু বকর

📄 বদরযুদ্ধে আবু বকর


আবু বকর রা. দ্বিতীয় হিজরিতে সংঘটিত বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই যুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হচ্ছে:
১. যুদ্ধবিষয়ক পরামর্শ কুরাইশদের কাফেলা যখন নাগালের বাইরে চলে যায় এবং 'কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে' মর্মে সংবাদ পান, নবিজি তখন সাহাবিগণকে পরামর্শের জন্য ডাক দিলে সর্বাগ্রে কথা রাখেন আবু বকর রা.। তিনি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সুন্দর পরামর্শ দেন। এরপর দাঁড়ান উমর রা.। তিনিও সুন্দর কথাবার্তা বলেন।
২. নবিজির সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানে তাঁর অবদান মুশরিকবাহিনীর অবস্থা জানতে আবু বকর রা. রাসুলের সঙ্গে বের হন। তারা উভয়ে ওই এলাকায় ঘোরাফেরা করছিলেন। একসময় জনৈক বৃদ্ধের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। নবিজি কুরাইশবাহিনী এবং মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথিদের ব্যাপারে লোকটিকে প্রশ্ন করেন। বৃদ্ধ বলে, 'আপনাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া অবধি আমি এ ব্যাপারে কথা বলতে পারব না।' নবিজি বলেন, 'আপনি বলুন, তার পর আমরা আমাদের পরিচয় বলব।' বৃদ্ধ বলে, 'কথা ঠিক থাকবে?' নবিজি বলেন, 'হ্যাঁ।'
বৃদ্ধ বলতে থাকে, 'শুনেছি, মুহাম্মাদ এবং তাঁর সাথিরা অমুক দিন বেরিয়ে পড়েছে। আমাকে যে সংবাদটি দিয়েছে, সে যদি সত্যবাদী হয়ে থাকে, তাহলে আজ তাদের অমুক স্থানে থাকার কথা। (লোকটি ঠিক সে জায়গার কথাই বলে, যেখানে মুসলিমবাহিনী শিবির পেতে অবস্থান করছিল।) আর কুরাইশদের ব্যাপারে আমি জেনেছি যে, তারা অমুক দিন বের হয়েছে। যদি সংবাদটি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে আজ তারা অমুক স্থানে থাকার কথা।' (লোকটি ঠিক সেই জায়গার কথাই বলে, যেখানে কুরাইশরা অবস্থান করছিল।)
এরপর বৃদ্ধ বলে, 'আমি তো আপনাদের প্রার্থিত বিষয় বলে দিলাম। এবার আপনাদের পরিচয় দিন।' রাসুল জবাবে বলেন, 'আমরা পানি থেকে এসেছি।' কথাটি বলেই তিনি আবু বকরকে নিয়ে চলে যেতে থাকেন। বৃদ্ধ তখন বকবক করছিল—'পানি থেকে' দ্বারা কী উদ্দেশ্য। ইরাকের পানি থেকে নাকি!
এই অবস্থান থেকেও নবিজির সঙ্গে সিদ্দিকের নৈকট্যের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়ে ওঠে। তিনি রাসুলের কাছ থেকে সকল সবকই শিখে নিয়েছিলেন।
৩. শামিয়ানার নিচে রাসুলের নিরাপত্তায় আবু বকর মুসলিমবাহিনী যুদ্ধের সারি বিন্যস্ত করে নিলে রাসুল যুদ্ধ পরিচালনার কেন্দ্রস্থলে চলে আসেন, যা একটি টিলায় ঝুপড়ির মতো করে উপরে শামিয়ানা টানিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। সেখান থেকে পুরো মাঠের দৃশ্য দেখা যেত। এর ভেতরে আবু বকরও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। কয়েকজন আনসারি যুবক সাহাবি সাআদ ইবনু মুআজের নেতৃত্বে জায়গাটি পাহারা দিচ্ছিলেন।
আলি রা. আবু বকরের এই অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞেস করেন, 'বলো তো দেখি, সবচেয়ে বড় বাহাদুর কে?' লোকজন জবাবে বলে, 'আমিরুল মুমিনিন, আপনি।' আলি বলেন, 'আমার বিষয়ে তোমাদের অবশ্যই জানা আছে যে, আমার মোকাবিলায় যে-ই এসেছে, আমি তার থেকে বদলা নিয়েছি। তবে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাহাদুর ছিলেন আবু বকর। বদরযুদ্ধে আমরা রাসুলের জন্য একটি শামিয়ানা টানিয়েছিলাম। প্রশ্ন উঠেছিল, সেখানে রাসুলের পাশে কে থাকবে? মুশরিকরা রাসুলের পাশ ঘেঁষতে চাইলে কে প্রতিহত করবে? তখন আমাদের মধ্য থেকে আবু বকরই তরবারি নিয়ে রাসুলের পাশে দাঁড়িয়ে যান। এরপর যে-ই তাঁর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তিনি তার ওপর আক্রমণ করে পালাতে বাধ্য করেন। নিঃসন্দেহে আবু বকরই ছিলেন সবচেয়ে বড় বাহাদুর ব্যক্তি।'
৪. বিজয় ও সাহায্যের সুসংবাদ এবং রাসুলের পাশে থেকে যুদ্ধ
সামরিক সাজসরঞ্জাম যতটুকু সম্ভব জোগাড় করার পর রাসুল আল্লাহর দিকে নত হন। তাঁর দরবারে বিজয় ও সাহায্যের প্রার্থনা করে যেতে থাকেন। বলতে থাকেন, 'হে আল্লাহ, তুমি আমার সঙ্গে যে অঙ্গীকার করেছিলে তা পূর্ণ করে দেখাও। মুসলমানদের এই কাফেলা যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে জমিনে তোমার ইবাদত করার মতো কেউ থাকবে না।' নবিজি অব্যাহতভাবে দুআ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তাঁর কাঁধ থেকে চাদর পড়ে যায়। আবু বকর তখন সেটি নবিজির কাঁধে উঠিয়ে দিতে দিতে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, যথেষ্ট হয়েছে। আল্লাহ অবশ্যই তাঁর অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবেন।' তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করেন,
স্মরণ করো, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেছিলে, তখন তিনি তোমাদের জবাব দিয়েছিলেন। [সুরা আনফাল: ৯]
ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত; রাসুল বদরের দিন বলেছিলেন, 'হে আল্লাহ, তুমি তোমার অঙ্গীকার বাস্তবায়িত করে দেখাও। আল্লাহ, তুমি চাইলে (মুমিনদের ধ্বংস চাইলে জমিনে কখনো আর) তোমার ইবাদত হবে না...।' আবু বকর তখন রাসুলের হাত ধরে বলেন, 'আল্লাহ আপনার জন্য যথেষ্ট।' এরপর নবিজি এই আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে বেরিয়ে আসেন - سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلَّوْنَ الدُّبُرَ 'এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে। ' [সুরা কামার: ৪৫]
শামিয়ানার নিচে থাকাবস্থায় রাসুল-কে তন্দ্রা পেয়ে বসে। খানিক পর তন্দ্রাভাব কেটে গেলে তিনি বলেন, 'আবু বকর, আনন্দিত হও, তোমাদের কাছে আল্লাহর সাহায্য এসে গেছে। এই তো জিবরিল আমিন! নিজের ঘোড়ার লাগাম হাতে এগিয়ে যাচ্ছেন! চারদিকে কেবল ধুলো উড়ছে!' এরপর নবিজি শামিয়ানা থেকে বেরিয়ে এসে লোকজনকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহ দিতে থাকেন।
আবু বকর সিদ্দিক রা. বদরের এই ঘটনা থেকে বিজয় ও সাহায্যের জন্য প্রবৃত্তিপরায়ণতা থেকে দূরে থেকে নিষ্ঠা, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আল্লাহর সামনে নত হওয়া, হাঁটু গেড়ে আল্লাহর দরবারে পড়ে যাওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। এই দৃশ্যটি তাঁর অস্তিত্বের ফলকে খোদাই হয়ে গিয়েছিল। নবিজির মতো তিনিও এমন কঠিন মুহূর্তে দুআর এই অস্ত্র ব্যবহার করতেন। যারা সাহাবিদের অনুসরণ করতে চায়, তাঁদের জীবনাচার থেকে শিক্ষা নিতে চায়—এমন প্রত্যেক নেতা, শাসক ও মানুষের জন্য আবু বকরের জীবনে রয়েছে বিরাট শিক্ষা।
যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করলে নবিজি নিচে নেমে এসে মানুষকে উদ্দীপনা দিতে থাকেন। মানুষ স্ব স্ব কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর জিকির আদায় করছিলেন। নবিজি নিজেও বীরত্বের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর পাশে থেকে আবু বকরও বীরদর্পে লড়াই করছিলেন। সে দিন তাঁর থেকে অস্বাভাবিক বীরত্ব প্রকাশ পাচ্ছিল। তিনি প্রতিটি অহংকারী কাফিরের সঙ্গে লড়তে প্রস্তুত ছিলেন; যদিও সে তাঁর পুত্র হতো। আবদুর রাহমান ইবনু আবি বকর, যাঁকে আরবের শ্রেষ্ঠতম লড়াকু হিসেবে গণ্য করা হতো, যিনি কুরাইশের কাছে একজন দক্ষ তিরন্দাজ হিসেবে খ্যাত ছিলেন, বদরে মুসলিমবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে এসেছিলেন। ইসলামগ্রহণের পর একদিন পিতাকে বলেন, 'আব্বু, বদরের দিন আপনি আমার স্পষ্ট লক্ষ্য ছিলেন; কিন্তু আমি সরে গিয়েছিলাম। আপনাকে হত্যা করতে মন চায়নি।' আবু বকর জবাবে বলেন, 'কিন্তু তুমি যদি সে দিন আমার সামনে আসতে, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাকে ছেড়ে দিতাম না।
৫. আবু বকর এবং যুদ্ধবন্দি
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাসের বর্ণনা; “বদরযুদ্ধে মুসলমানগণ যখন কাফিরদের বন্দি করেন, তখন রাসুল আবু বকর ও উমরকে বলেন, 'বন্দিদের ব্যাপারে তোমাদের সিদ্ধান্ত কী?' আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, এরা তো আমাদেরই চাচাতো ভাই, আমাদেরই বংশের লোক। আমার মত হচ্ছে, আপনি মুক্তিপণের বিনিময়ে এদের মুক্ত করে দিন। এর ফলে কাফিরদের মোকাবিলায় আমরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠব। আশা করি, আল্লাহ তাদের হিদায়াত দ্বারা ধন্য করবেন। তারা মুসলমান হয়ে যাবে।'
রাসুল উমরকে বলেন, 'ইবনুল খাত্তাব, তোমার মত কী?' উমর বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমার মত আবু বকরের মতো নয়। আমার মত হচ্ছে, ওদের আপনি আমাদের হাতে তুলে দেবেন, আমরা তাদের প্রত্যেকের গর্দান উড়িয়ে দেবো! আকিল ইবনু আবি তালিবকে আলির জিম্মায় ছেড়ে দিন। আর অমুককে (যে উমরের নিকটাত্মীয় ছিল) আমার দায়িত্বে ছেড়ে দিন! আমরা ওদের গর্দান উড়িয়ে দিই! এরা সকলেই কুফরের নেতা! শত্রুদের মধ্যমণি!
উমর রা. বর্ণনা করেন; কিন্তু নবিজির কাছে আবু বকরের মতই সংগত মনে হয়। তিনি আমার কথা গ্রহণ করেননি। সুতরাং বন্দিদের থেকে মুক্তিপণ নেওয়ার সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়। পরদিন আমি রাসুলের দরবারে হাজির হয়ে দেখি নবিজি ও আবু বকর এক জায়গায় বসে অঝোরে কাঁদছেন। আমি বলি, 'আল্লাহর রাসুল, বলুন, আপনি এবং আপনার সঙ্গী এভাবে কাঁদছেন কেন? যদি দেখি এতে আমার জন্যও কান্নার বিষয় রয়েছে, তাহলে আমিও কাঁদব। কান্নার কারণ না পেলেও আপনাদের দেখাদেখি কাঁদব!'
রাসুল বলেন, 'তোমার সাথিরা মুক্তিপণ গ্রহণের যে অভিমত আমাকে দিয়েছিল, আমি সে জন্য কাঁদছি।' এরপর তিনি নিকটস্থ একটি গাছের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, 'মুক্তিপণ গ্রহণের কারণে আল্লাহর শাস্তি আমার কাছে এই গাছের থেকেও নিকটে নিয়ে আসা হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে আয়াত নাজিল করেছেন,
দেশে শত্রুকে ব্যাপকভাবে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দি রাখা কোনো নবির জন্য সংগত নয়। তোমরা কামনা করো পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চান পরলোকের কল্যাণ; আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ববিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ, এ জন্য তোমাদের ওপর মহা শাস্তি আপতিত হতো। যুদ্ধে তোমরা যা লাভ করেছ, তা বৈধ ও উত্তম হিসেবে ভোগ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' [সুরা বাকারা: ৬৭-৬৯]
এভাবে আল্লাহ তাদের জন্য গনিমতের সম্পদ হালাল করে দেন।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত; যুদ্ধ সমাপ্ত হলে নবিজি সাহাবিগণকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, 'বন্দিদের ব্যাপারে তোমাদের অভিমত কী?' আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, এরা তো আপনারই বংশের। মুক্তিপণের বিনিময়ে এদের ছেড়ে দিন। আরেকটু অবকাশ দিন, সম্ভবত আল্লাহ এদের তাওবার তাওফিক দান করবেন।' উমর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, এরা আপনাকে আপনার প্রিয় জন্মভূমি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাকে মিথ্যা প্রতিপাদন করেছে। আপনি ওদের আমার জিম্মায় ছেড়ে দিন, আমি এদের মস্তকগুলো উড়িয়ে দিই।'
আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রা. বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, এমন একটি উপত্যকার সন্ধান করুন, যেখানে প্রচুর খড়ি রয়েছে। সেখানে আগুন ধরিয়ে ওদের জ্বালিয়ে দিন।' এর জবাবে আব্বাস রা. বলেন, 'তুমি কি তোমার আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ করবে।' এরপর রাসুল কিছু না বলেই নিজের ঘরের ভেতর চলে যান।
এদিকে লোকজন পরস্পর যার যার অভিমত ব্যক্ত করছিলেন। কেউ বলছিলেন, আবু বকরের সিদ্ধান্ত অনুসারে কাজ করা হোক। কেউ বলছিলেন, উমরের সিদ্ধান্ত অনুসারে কাজ করা হোক। আর কেউ কেউ আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার অভিমতের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছিলেন। তখন রাসুল ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলেন, 'আল্লাহ কতক মানুষের অন্তরকে মাটির মতো নরম করে দেন; আর কতক মানুষের অন্তর পাথর থেকেও কঠিন করে দেন। আবু বকর, তোমার উদাহরণ ইসা আ.-এর মতো, যিনি বলেছিলেন,
তুমি যদি তাদের শাস্তি দাও তাহলে তারা তো তোমারই বান্দা; আর যদি তাদের ক্ষমা করে দাও তাহলে তো তুমি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। [সুরা মায়িদা: ১১৮]
আর হে উমর, তোমার উদাহরণ হচ্ছে নুহ আ.-এর মতো, যিনি বলেছিলেন,
নুহ আরও বলেছিল, হে আমার পালনকর্তা, পৃথিবীর কাফিরদের মধ্যে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিয়ো না। [সুরা নুহ : ২৬]
আর তোমাদের উদাহরণ মুসা আ.-এর মতো, যিনি বলেছিলেন,
মুসা বলল, হে আমার রব, তুমি তো ফিরআউন ও তার পরিবারবর্গকে পার্থিব জীবনে শোভা ও সম্পদ দান করেছ, যা দিয়ে তারা মানুষকে তোমার পথ থেকে ভ্রষ্ট করে থাকে। হে আমাদের রব, ওদের সম্পদ বিনষ্ট করো, ওদের হৃদয় কঠিন করে দাও, ওরা তো মর্মন্তুদ শাস্তি প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত ইমান আনবে না। [সুরা ইউনুস: ৭৭]
নবিজি যখনই সাহাবিদের থেকে পরামর্শ নিতেন, তখন আবু বকরই প্রথম কথা বলতেন। অনেক সময় অন্যরা কথা বলতেন না, তখন আবু বকরের মতের আলোকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। আর অন্যরা কথা বললেও তাঁদের বিপরীতে আবু বকরের অভিমতকেই প্রাধান্য দেওয়া হতো।

টিকাঃ
১৯৭ সহিহ বুখারি: ৩৯৫২।
১৯৮ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু হিশাম : ২/৪৪১।
১৯৯ কুরাইশি বৃদ্ধের কাছে তাঁর নিজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার অর্থ ছিল লোকটির কাছে যেন তাঁর ব্যক্তিপরিচয় গোপন থাকে। -অনুবাদক
২০০ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু হিশাম: ২/২২৮।
২০১ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু হিশাম: ২/২৩৩।
২০২ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/২৭১, ২৭২।
২০০ সহিহ মুসলিম: কিতাবুল জিহাদ, বাবুল ইমদাদি বিল মালায়িকাতি বি বাদরিন: ১৭৬৩।
২০৪ সহিহ বুখারি: কিতাবুল মাগাজি, বাবু কিসসাতি বাদরিন: ৩৯৫৩।
২০০ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু হিশাম: ২/৪৫৭; উদ্ধৃত তারিখুদ দাওয়াহ: ১২৫।
২০৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/২৭৮।
২০৭ তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি: ৯৪।
২০৮ সহিহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার: ১৭৬৩।
২০৯ মুসনাদু আহমাদ: ১/৩৭৩; তাফসিরু ইবনি কাসির: ২/৩২৫।
২১০ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., মালুল্লাহ: ৩৩৫।

📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 উহুদ এবং হামরাউল আসাদযুদ্ধে আবু বকর

📄 উহুদ এবং হামরাউল আসাদযুদ্ধে আবু বকর


উহুদযুদ্ধে মুসলমানদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। একপর্যায়ে সাহাবিগণ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন। এর মধ্যে এই মর্মে সংবাদ রটে যায় যে, মুহাম্মাদ শহিদ হয়েছেন। সাহাবিগণের ওপর এর প্রভাব বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়। ময়দান ছিল বেশ প্রশস্ত। প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সর্বাগ্রে আবু বকরই শত্রুর সেনাসারি দুমড়ে-মুচড়ে রাসুলের কাছে পৌঁছান। এরপর তাঁর পাশে একে একে জড়ো হন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, আলি, জুবায়ের, তালহা, উমর ইবনুল খাত্তাব, হারিসা ইবনু সাম্মাহ, আবু দুজানা, সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস প্রমুখ। তাঁরা তাঁদের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি পুনর্বার সংহত করার লক্ষ্যে রাসুল -কে উহুদের উপত্যকায় নিয়ে যান।
আবু বকর সিদ্দিক রা. উহুদের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, 'পুরো যুদ্ধটি ছিল তালহার জন্য। (অর্থাৎ, তিনিই রাসুলের নিরাপত্তাবিধানে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিলেন।) এরপর বলেন, উহুদযুদ্ধের দিন আমিই ছিলাম প্রথম ব্যক্তি, যে নবিজির কাছে ফিরে এসেছিলাম। আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে লক্ষ করছিলাম, এক ব্যক্তি তীব্রবেগে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আমি মনে মনে বলি, তুমি তালহাই হয়ে থাকবে। আমার থেকে এই সোনালি সুযোগটা ছুটে গিয়েছিল। আমার ও মুশরিকদের মধ্যখানে এক ব্যক্তি ছিল, আমি তাকে চিনতে পারিনি। আমি লোকটি অপেক্ষা রাসুলের বেশি কাছে ছিলাম। লোকটি লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাকিয়ে দেখি, তিনি ছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ।
এরপর আমরা রাসুলের একেবারে নিকটে পৌঁছাই। ততক্ষণে নবিজির দাঁত মুবারক শহিদ হয়ে গেছে। চেহারায় আঘাতের চিহ্ন। শিরস্ত্রাণ ভেঙে এর দুটি টুকরো চোখের নিচে গালের ভেতর ঢুকে পড়েছিল। নবিজির শরীর থেকে তখন রক্ত ঝরছিল; কিন্তু তিনি বলছিলেন-'তোমাদের সাথি তালহার খবর নাও।' আমরা তাঁর অবস্থা দেখে তাঁর কথায় মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। আমি রাসুলের চেহারা থেকে শিরস্ত্রাণের ওই টুকরো দুটি বের করতে উদ্যত হলে আবু উবায়দা বলেন, 'আমি আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, টুকরো দুটি আমাকে বের করতে দিন। আমি তখন নিজ ইচ্ছা বাদ দিয়ে দিই। তাঁর চিন্তা ছিল, টুকরোটি দুটি বের করতে হলে তো রাসুল কষ্ট পেতে পারেন। তাই দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ধীরে ধীরে বের করে নিতে চাচ্ছিলেন। অবশেষে একটি টুকরো তিনি বের করতে সক্ষম হন, তবে সে সঙ্গে তাঁর নিচের পাটির একটি দাঁত উপড়ে পড়ে। এ অবস্থা দেখে আমি দ্বিতীয় টুকরোটি বের করতে উদ্যত হই; কিন্তু ইবনুল জাররাহ এবারও আমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে থামিয়ে দেন। তিনি একই প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় টুকরোটিও বের করে নিয়ে আসেন। ফলে তাঁর নিচের পাটির আরেকটি দাঁত উপড়ে যায়।
নিঃসন্দেহে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ ছিলেন আকর্ষণীয় দেহকাঠামোর অধিকারী। তিনি নবিজির ক্ষতস্থানে পট্টি লাগিয়ে দেওয়ার পর তালহার কাছে যান। তালহা রা. তখন আহত অবস্থায় একটি গর্তে ছিলেন। আমরা দেখতে পাই, তাঁর শরীরে ৭০-এর অধিক বর্শা, তির ও তরবারির আঘাত রয়েছে। তাঁর আঙুল কেটে পড়েছিল। আমরা তাঁর ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে দিই।
এই যুদ্ধে আবু সুফিয়ানের ওই অবস্থান থেকেই আবু বকরের মর্যাদা পরিষ্কার হয়, যখন আবু সুফিয়ান চিৎকার দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'মুহাম্মাদ কি বেঁচে আছে?' আবু সুফিয়ান তিনবার একই প্রশ্ন করেছিলেন। রাসুল সাহাবিগণকে তার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বারণ করছিলেন। এরপর তিনি (তিনবার) বলেন, 'তোমাদের মধ্যে কি ইবনু কুহাফা বিদ্যমান আছে?' এরপর (তিনবার) বলেন, 'তোমাদের মধ্যে কি ইবনুল খাত্তাব বিদ্যমান আছে?' কোনো উত্তর না পেয়ে তিনি সঙ্গীদের বলেন, 'এদের সবাই নিহত হয়েছে।
এ থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, মুশরিকদের নেতা আবু সুফিয়ানের বিশ্বাস ছিল, ইসলামের স্তম্ভই ছিলেন রাসুল এবং আবু বকর ও উমর।
মুশরিকরা মুসলমানদের ধ্বংস করতে এবং তাদের সমূলে উৎখাত করতে তৎপর হলে নবিজির পরিকল্পনা সামনে আসে। তাঁর পরিকল্পনা ওদের চক্রান্তগুলোকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে নিয়ে যায়। উহুদ থেকে মদিনায় ফেরার পর নবিজির সন্দেহ হয়, কুরাইশরা হয়তো মদিনায় চড়াও হতে পথ পালটিয়ে ফের আসতে পারে। যদিও তখন সাহাবিগণ ছিলেন আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এবং পুরো মদিনা ছিল শহিদদের শোকে কাতর, এরপরও তিনি সাহাবিগণকে কুরাইশদের পশ্চাদ্ধাবনে ডাক দেন। সাহাবিগণও তখন লাব্বাইক বলে তাদের ধাওয়া করতে বেরিয়ে পড়েন। মুসলিমবাহিনী যখন মদিনা থেকে বের হয়ে আট কিলোমিটার দূরবর্তী হামরাউল আসাদ-প্রান্তরে গিয়ে পৌঁছান, তখন তাঁদের দেখে মুশরিকরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা মদিনায় আসার চিন্তা বাদ দিয়ে মক্কার দিকে পালাতে শুরু করে। আল্লাহ বলেন,
জখম হওয়ার পর যারা আল্লাহর রাসুলের ডাকে সাড়া দিয়েছে, তাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে চলে, তাদের জন্য মহা পুরস্কার রয়েছে। [সুরা আলে ইমরান: ১৭২]
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা উরওয়া ইবনু জুবায়েরের কাছে এ আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “ভাগনে, যে দিন উহুদ প্রান্তরে مسلمانوں ওপর বিপদ ভেঙে পড়েছিল, মুশরিকরা পালিয়ে যাচ্ছিল, সে দিন তোমার পিতা জুবায়ের এবং নানা আবু বকর সেই লোকদের মধ্যে ছিলেন। রাসুলের সন্দেহ ছিল কাফিরগণ হয়তো পালিয়ে না গিয়ে মদিনায় ফিরে এসে হামলা চালাতে পারে। তিনি তখন সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে বলেন, 'ওদের পিছু ধাওয়ায় বের হবে, এমন কেউ আছ?' তখন ৭০ জন সাহাবি 'লাব্বাইক' বলে বেরিয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে আবু বকরও ছিলেন।”

টিকাঃ
*** মাওয়াকিফুস সিদ্দিক মাআন নাবি ফিল মাদিনা, ড. আতিফ লিমাজা : ২৭।
২১৯ মিনহাতুল মাবুদ : ২/১৯; তারিখুদ দাওয়াতিল ইসলামিয়া: ১৩০ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত।
২১০ ফাতহুল বারি: ৬/১৮৮, ৭/৪০৫।
২১৪ মাওয়াকিফুস সিদ্দিক মাআন নাবি ফিল মাদিনা, ড. আতিফ লিমাজা: ২৮।
২১৪ সহিহ মুসলিম: ২৪১৮।

📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 গাজওয়ায়ে বনু নাজির, বনু মুসতালিক, খন্দক ও

📄 গাজওয়ায়ে বনু নাজির, বনু মুসতালিক, খন্দক ও


১. বনু নাজিরযুদ্ধ
বনু আমির এবং রাসুলের মধ্যে সহযোগিতা-চুক্তি বিদ্যমান ছিল; কিন্তু আমর ইবনু উমাইয়া নামের জনৈক মুসলিম ভুলক্রমে বনু আমিরের দুই ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেন। নবিজি তাদের রক্তপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে সাহায্যের জন্য বনু নাজিরের কাছে যান। অঙ্গীকারের ভিত্তিতে এমন ক্ষেত্রে তাদের জন্য সাহায্যপ্রদান ছিল বাধ্যতামূলক। বনু নাজির এবং বনু আমিরের মধ্যেও সহযোগিতা-চুক্তি বিদ্যমান ছিল। নবিজি তাদের কাছে গিয়ে পৌঁছালে সাহায্যের ব্যাপারে তাদের সম্মতির কথা জানিয়ে দেয়। তারা বলে, 'আবুল কাসিম, আপনি যেমনটি চাচ্ছেন আমরা তা-ই করব।' রাসুল তখন একটি দেয়ালের ছায়ায় অবস্থান করছিলেন। এদিকে ইয়াহুদিরা গোপনে একত্র হয়ে পরস্পর বলাবলি করে, 'এমন মোক্ষম সুযোগ আর আসবে না। কে আছে যে মুহাম্মাদ থেকে আমাদের চিরমুক্তি দানের জন্য এই ঘরের ছাদে উঠে সেখান থেকে ভারী পাথর ফেলে তাকে থ্যাঁতলে দেবে?'
এ আবেদন শুনে হতভাগা ইয়াহুদি আমর ইবনু জাহহাশ বলে, আমি এই কাজ আনজাম দেবো। সে ঘরের ছাদে উঠে যায়। তখন নবিজির সঙ্গে ছিলেন আবু বকর, উমর, আলিসহ একদল সাহাবি। আল্লাহ তাঁর রাসুলকে ওহির মাধ্যমে ইয়াহুদিদের এই অসদিচ্ছা জানিয়ে দিলে তিনি দ্রুত মদিনায় ফিরে আসেন। এদিকে নবিজির ফিরতে বিলম্ব হতে দেখে সাহাবিগণ তাঁর খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিলেন। পথে মদিনা থেকে আগত জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। তারা তার কাছে রাসুল-কে মদিনায় প্রবেশ করতে দেখেছি।' এরপর সাহাবিগণ তাঁর পাশে জড়ো হলে তিনি ইয়াহুদিদের চক্রান্ত সম্পর্কে তাদের অবহিত করেন।
মদিনায় এসেই মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার হাতে এই মর্মে একটি প্রজ্ঞাপন দিয়ে বনু নাজিরের কাছে পাঠিয়ে দেন যে, 'তোমরা এক্ষুনি সেখান থেকে বেরিয়ে যাও।' কিন্তু মদিনার মুনাফিকরা বনু নাজিরের কাছে অটল থাকার এবং সাহায্যপ্রদানের প্রতিশ্রুতি-সংবলিত বার্তা পাঠালে তাদের সাহস বেড়ে যায়। ফলে ইয়াহুদি-সরদার হুয়াই ইবনু আখতাব ঔদ্ধত্যের সঙ্গে নবিজির নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে। এ ছাড়া সে ইতিপূর্বে অঙ্গীকার ভঙ্গেরও ঘোষণা দেয়। নবিজি তখন সাহাবিগণকে বনু নাজিরের দিকে বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দিলে তাঁরা সেখানে পৌঁছে ১৫ দিন পর্যন্ত তাদের দুর্গ অবরোধ করে রাখেন। ইয়াহুদিরা দুর্গের পাঁচিল থেকে পাথর ও তির ছুড়তে থাকে। খেজুরবাগান তাদের অবস্থানে দৃঢ় থাকতে সহায়তা করছিল বিধায় নবিজি সেগুলো কেটে জ্বালিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। ফলে তারা অস্ত্রসমর্পণে বাধ্য হয়। নবিজি তখন তাদের এ আবেদন মেনে নেন যে, উটের পিঠে করে যেসব মালসামানা তাদের জন্য নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তারা তাসহ তাদের পরিবার-পরিজন ও সন্তানসন্ততি নিয়ে চলে যাবে। তবে অস্ত্র নিতে পারবে না। এ প্রসঙ্গেই সুরা হাশর অবতীর্ণ হয়েছিল।
২. বনু মুসতালিকযুদ্ধ
বনু মুসতালিক মদিনায় হামলার পরিকল্পনা করেছিল। নবিজি ব্যাপারটি জানতে পেরে সাহাবিদের নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বেরিয়ে পড়েন। সেখানে পৌঁছে মুহাজিরদের পতাকা আবু বকরের হাতে অর্পণ করেন। কেউ কেউ বলেছেন, পতাকাটি ছিল আম্মার ইবনু ইয়াসিরের হাতে। আর আনসারদের পতাকা দেন সাআদ ইবনু উবাদার হাতে। এরপর উমরকে ঘোষণার নির্দেশ দিলে তিনি তাদের মধ্যে এই বলে ঘোষণা দিতে থাকেন, 'লোকসকল, তোমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করে নাও, তোমাদের জানমাল নিরাপদ হয়ে যাবে।' বনু মুসতালিক তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মুসলমানদের ওপর তির ছুড়তে থাকে। রাসুল তখন সাহাবিগণকে হামলার নির্দেশ দেন। সাহাবিদের চতুর্মুখী হামলায় তাঁদের কেউ পালিয়ে যেতে পারেনি। তাঁরা তাদের ১০ জনকে হত্যা করে বাকিদের বন্দি করেন। মুসলমানদের পক্ষে মাত্র একজন তখন শহিদ হন।
৩. খন্দক ও বনু কুরাইজার যুদ্ধ আবু বকর রা. এই যুদ্ধ দুটিতেও রাসুলের সঙ্গী ছিলেন। খন্দকের যুদ্ধে খন্দক তথা পরিখা খননের সময় তিনি মাটিগুলো নিজের কাপড়ে পুরে পুরে সরাতেন। নির্ধারিত দিনে কাজটি দ্রুত সমাপ্তির লক্ষ্যে সাহবিদের সঙ্গে মিলে কাজ চালিয়ে যান। পরিখাটি মুসলমানদের জন্য কল্যাণবহ প্রমাণিত হয়।

টিকাঃ
২১৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/১৫৭১।
২১২ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/১৫৭১।
মাওয়াকিফুস সিদ্দিক রা. মাআন নাবি ফিল মাদিনা, ড. আতিফ লিমাজা: ৩২।

📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি

📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি


৬ হিজরির জুলকাদা মাসে বিশ্বনবি ১ হাজার ৪০০ সাহাবি নিয়ে কাবাঘর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে বের হন। যাত্রীদলের সঙ্গে ছিল কুরবানির পশু। মুসলমানগণ ছিলেন উমরার পোশাক পরিহিত, যাতে মক্কাবাসী তাদের অবস্থা দেখেই বুঝে নিতে পারে তিনি (রাসুল)-সহ পুরো দল যুদ্ধের জন্য নয়; বরং বায়তুল্লাহর জিয়ারতের উদ্দেশ্যেই বের হয়েছেন। নবিজি বনু খুজাআ থেকে একজন গোয়েন্দাকে অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য মক্কায় পাঠিয়ে দেন। তিনি এসে সংবাদ দেন, মক্কাবাসীরা আপনাকে প্রতিহত করতে কাবাপ্রাঙ্গণে জড়ো হয়েছে।
রাসুল তখন সবাইকে বলেন, 'লোকসকল, পরামর্শ দাও এ মুহূর্তে কী করতে পারি?'
আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আপনি তো কাবার জিয়ারতে বের হয়েছেন, কাউকে হত্যা কিংবা কারও সঙ্গে যুদ্ধ করতে নয়। অতএব আমার মত হচ্ছে, আপনি এগিয়ে যান। যদি বাধা আসে, তাহলে আমরা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত আছি।' রাসুল তখন বলেন, 'আল্লাহর নাম নিয়ে এগিয়ে চলো।' এদিকে কুরাইশরা এ সংবাদ পেয়ে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে। তারা কিছুতেই 'মুহাম্মাদ -কে মক্কায় ঢুকতে দেবে না' মর্মে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। এরপর মক্কাবাসী এবং রাসুলের মধ্যে কথাবার্তা আদান-প্রদান শুরু হয়। রাসুল তখন এই সংকল্প দৃঢ় করে নিয়েছিলেন যে, তারা যেসব দাবি উত্থাপন করবে, মক্কাবাসীদের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার লক্ষ্যে তিনি তা মেনে নেবেন।
১. সন্ধি নিয়ে আলাপ-আলোচনা রাসুল সন্ধির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করলে কুরাইশের প্রতিনিধিদলের আগমন শুরু হয়। প্রথমে আসেন বনু খুজাআর বুদাইল ইবনু ওয়ারাকা। তিনি রাসুল এবং مسلمانوں উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হলে কুরাইশদের কাছে ফিরে যান। এরপর পর্যায়ক্রমে মিকরাজ ইবনু হাফস, হুলাইস ইবনু আলকামা, উরওয়া ইবনু মাসউদ সাকাফি উপস্থিত হন। একপর্যায়ে নবিজি এবং উরওয়া ইবনু মাসউদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় আবু বকরসহ অন্য কয়েকজন সাহাবিও অংশ নেন।
উরওয়া বলেন, 'মুহাম্মাদ এই অভদ্র লোকগুলো নিয়ে নিজের বংশ ধ্বংস করতে এসেছ? স্মরণ রাখবে, কুরাইশের নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সবাই বের হয়ে গেছে। তারা চিতার চামড়া পরে নিয়েছে। তারা আল্লাহর নামে শপথ করে নিয়েছে যে, মক্কায় তোমাদের প্রবেশ করতে দেবে না। আল্লাহর শপথ, এই লোকগুলো (সাহাবিগণ) পালিয়ে যেতে বাধ্য হবে।'
আবু বকর উরওয়ার কথাগুলো সহ্য করতে পারেননি। তিনি বলে উঠেন, 'যা, গিয়ে "লাত” প্রতিমার লজ্জাস্থান চাটতে থাক। আমরা কি রাসুলের সঙ্গ ছেড়ে পালিয়ে যাব?' বাক্যবাণে আহত উরওয়া নবিজিকে জিজ্ঞেস করে, 'ইনি কে?' নবিজি জবাব দেন 'আবু বকর।' উরওয়া বলে, 'সেই সত্তার শপথ, যদি আমার ওপর তোমার অনুগ্রহ না থাকত, তাহলে অবশ্যই তোমার কথার জবাব দিতাম।' আবু বকর অতীতে তার ওপর অনুগ্রহ করেছিলেন, উরওয়া তার কথার মাধ্যমে সেই স্বীকৃতি দিচ্ছিল।
উরওয়া ইবনু মাসউদ সাকাফি ছিল অত্যন্ত ঝানু ব্যক্তি। সে সাহাবিদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টির প্রয়াস চালায়, যাতে তাঁরা ভেতরে ভেতরে পরাজিত হয়ে পড়েন। কুরাইশের শক্তির ব্যাপারে সে বাড়াবাড়িমূলক শব্দ প্রয়োগ করছিল। কুরাইশের চিত্রকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলছিল, যাতে ধারণা জন্মে-অবশ্যই তারা বিজয়ী হবে। সে মুসলমানদের সারিতে ফিতনা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালায়। নেতৃবর্গ এবং সেনাদলের সম্পর্কে ফাটল ধরাতে প্রথমেই নবিজিকে বলছিল, 'এই অসভ্য লোকগুলো তো আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে।' জবাবে আবু বকরের উচ্চারণ ছিল অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল। এতে পালটা উরওয়ার ব্যক্তিত্ব আহত হয়। আবু বকরের এ জবাব ছিল তাঁর ইমানি দৃঢ়তার পরিচায়ক। যে ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিতও হয়ো না। তোমরাই বিজয়ী, যদি তোমরা মুমিন হও। [সুরা আলে ইমরান: ১৩৯]
২. সন্ধির ব্যাপারে সিদ্দিকের অবস্থান সুহাইল ইবনু আমরের নেতৃত্বে মুশরিকরা যখন রাসুলের সঙ্গে সন্ধি করতে সম্মত হয়, তখন নবিজি মুশরিকদের যেসব দাবি-দাওয়া ঐকমত্য পোষণ করেছিলেন, আবু বকর রা. বিনা বাক্যে তা মেনে নেন। যদিও বাহাত চুক্তির দফাগুলো মুসলমানদের স্বার্থের প্রতিকূলে দেখা যাচ্ছিল; কিন্তু যেহেতু তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল-নবিজি প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে কিছু বলেন না, করেনও না; বরং ওহির ভিত্তিতেই করে থাকেন, সেহেতু রাসুল নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষ থেকে এর মধ্যকার সুফল সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন মনে করে নবিজির সিদ্ধান্তকেই অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেন।
তবে ইতিহাসবিদগণ উমর রা. সম্পর্কে লেখেন, তিনি সন্ধির দফাগুলো নিয়ে অস্থির হয়ে পড়েন এবং এ ব্যাপারে তাঁর অভিযোগ নিয়ে রাসুলের কাছে গিয়ে বলেন, 'আপনি কি আল্লাহর রাসুল নন?' নবিজি বলেন, 'অবশ্যই আমি আল্লাহর রাসুল।' উমর বলেন, 'আমরা কি মুসলমান নই?' নবিজি বলেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই তোমরা মুসলমান।' উমর বলেন, 'ওরা কি মুশরিক নয়?' নবিজি বলেন, 'অবশ্যই তারা মুশরিক।' উমর বলেন, 'তাহলে দীনের ব্যাপারে আমরা কেন হীনতা গ্রহণ করব?' নবিজি বলেন, 'উমর, আমি আল্লাহর রাসুল। আমি আল্লাহর অবাধ্যতা করতে পারি না।' অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, নবিজি বলেছিলেন- 'আমি আল্লাহর বান্দা এবং রাসুল, আমি তাঁর নির্দেশ অমান্য করতে পারি না। তিনি আমাকে ধ্বংস করবেন না।
উমর বলেন, আমি তখন বলি, 'আপনি কি আমাদের বলেননি যে, আমরা কাবায় যাব এবং সেখানে তাওয়াফ করব?' নবিজি বলেন, 'অবশ্যই যাবে এবং তাওয়াফও করবে।'
এরপর তিনি আবু বকরের কাছে যান। তাঁকেও একইভাবে জিজ্ঞেস করেন— 'মুহাম্মাদ কি আল্লাহর রাসুল নন?' আবু বকর বলেন, 'কেন নন, অবশ্যই তিনি আল্লাহর রাসুল।' উমর বলেন, 'আমরা কি মুসলমান নই?' আবু বকর বলেন, 'অবশ্যই আমরা মুসলমান।' উমর বলেন, 'ওরা কি মুশরিক নয়।' আবু বকর বলেন, 'অবশ্যই ওরা মুশরিক।' উমর বলেন, 'তাহলে কেন আমরা নিজেদের দীনের ব্যাপারে হীনতা গ্রহণ করব?'
আবু বকর তখন উমরকে উপদেশের সুরে বলেন, 'অভিযোগের পথ পরিহার করে আনুগত্যের পথ ধরো।' এরপর তিনি বলেন, 'আমি এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রাসুল। তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটিই সঠিক। তিনি আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করতে পারেন না। আল্লাহ নিশ্চয় তাঁকে ধ্বংস করবেন না।'
নবিজি উমরকে যে জবাব দিয়েছিলেন, আবু বকরও তাঁকে হুবহু একই উত্তর দিয়েছিলেন; অথচ নবিজি তাঁকে কী জবাব দিয়েছেন, আবু বকর তা জানতেন না। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, সিদ্দিক ছিলেন উমর অপেক্ষা রাসুলের অধিক অনুসরণকারী। যদিও উমর ইলহামপ্রাপ্ত হতেন; কিন্তু আবু বকর ছিলেন সিদ্দিক; আর সিদ্দিকের মর্যাদা ছিল অনেক উপরে। আবু বকর নিষ্পাপ রাসুল থেকে সবকিছু আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
হুদায়বিয়ার মহাসাফল্যের কথা আলোচনা করতে গিয়ে আবু বকর বলেন, 'ইসলামে হুদায়বিয়ার চেয়ে বড় কোনো বিজয় হয়নি; কিন্তু সন্ধির দিন মানুষ এই মহাবিজয়ের গূঢ় বাস্তবতা বুঝতে পারেনি। বান্দা সব সময় তাড়াহুড়ো করে, আল্লাহ তাড়াহুড়ো করেন না। আমি বিদায়হজের দিন সুহাইলকে দেখতে পাই, তিনি নবিজির পাশে দাঁড়িয়ে কুরবানির উটগুলো তাঁর কাছে এগিয়ে দিচ্ছিলেন; আর তিনি সে সেগুলো নহর (জবাই) করছিলেন।
এরপর নবিজি চুল কর্তনকারীকে ডেকে মাথা মুন্ডিয়ে নেন। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, সুহাইল নবিজির বরকতময় চুলগুলো উঠিয়ে চোখে লাগাচ্ছিলেন; অথচ এই ব্যক্তিই হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” এবং "মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" লেখার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন—তিনি এটা মানতে রাজি ছিলেন না। আমি তখন আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আদায় করি, যিনি তাঁকে ইসলামের হিদায়াতের মাধ্যমে ধন্য করেছেন। আবু বকর রা. ছিলেন সাহাবিদের মধ্যে সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্তদাতা ও পূর্ণ বুদ্ধিমান সত্তা।

টিকাঃ
২১৯ তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ১৩৬, ১৩৭।
২২০ 'লাত' হচ্ছে বনু সাকিফের উপাস্য প্রতিমার নাম।
২২১ প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্ট শব্দে লজ্জাস্থানের উল্লেখ জায়িজ আছে। এটা তখন অশ্লীল উচ্চারণ হিসেবে গণ্য হবে না। সূত্র, আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, মুহাম্মাদ মালুল্লাহ : ৩৫০।
২২২ সহিহ বুখারি, আশ-শুরুতু ফিল জিহাদ: ২৭৩২।
২২৩ তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম : ১৩৮।
২২৪ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ : ইবনু হিশাম : ৩/৩৪৬, তারিখুত তাবারি : ২/৩৬৪।
২২৫ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু হিশাম: ৩/৩৪৬।
২২৬ মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ১১/১১৭।
২২৭ কানজুল উম্মাল : ৩০১৩৬ খুতাবু আবি বাকরিনিস সিদ্দিক থেকে উদ্ধৃত, মুহাম্মাদ আহমাদ আশুর: ১১৭।
২২৮ তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি : ৬১০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00