📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 প্রাককথন

📄 প্রাককথন


ইতিহাসবিদ এবং সিরাত-বিশেষজ্ঞদের বর্ণনা; আবু বকর রা. নবিজির সঙ্গে বদরসহ সব যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেন। একটি গাজওয়া থেকেও অনুপস্থিত থাকেননি। উহুদযুদ্ধে যখন মানুষ দিগ্বিদিক দৌড়াচ্ছিল, তখনো তিনি রাসুলের পাশে দৃঢ়পদ ছিলেন। আর তাবুকের যুদ্ধে তো রাসুল মুসলিমবাহিনীর সুমহান কালো পতাকাটি তাঁর হাতেই অর্পণ করেছিলেন।
ইবনু কাসির বলেন, সিরাত-বিশেষজ্ঞগণ এ ব্যাপারে একমত যে, সিদ্দিক ছিলেন সকল যুদ্ধে নবিজির সহচর, কোনো যুদ্ধেই তাঁর সঙ্গ ছাড়েননি।
জামাখশারি বলেন, আবু বকর রা. নিজেকে সর্বদার জন্য নবিজির সঙ্গে জুড়ে নিয়েছিলেন, আশৈশব তিনি ছিলেন নবিজির সঙ্গী। বড় হলে নিজের সম্পদ তাঁর জন্য খরচ করতে থাকেন। হিজরতের সফরে নিজের বাহন এবং পাথেয় দ্বারা রাসুল-কে মদিনায় নিয়ে যান। তাঁর প্রিয়তম কন্যাকে রাসুলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। নবিজির ইনতিকালের পর তাঁকে তাঁর প্রিয়তম কন্যা সাইয়িদা আয়েশার কক্ষে দাফন করা হয়।
সালামা ইবনু আকওয়া থেকে বর্ণিত; আমি সাতটি গাজওয়ায় রাসুলের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছি। এ ছাড়া রাসুল কর্তৃক প্রেরিত আরও নয়টি অভিযানে অংশ নিয়েছি। এসব অভিযানে কখনো আমাদের আমির হতেন আবু বকর, কখনো উসামা।
এই আলোচ্য বিষয়ের অধীনে আমরা রাসুলের সঙ্গে আবু বকরের জিহাদি খিদমতের ওপর আলোকপাত করব। দেখব আবু বকর রা. কীভাবে দীনের জন্য নিজের জানমাল এবং পরামর্শ দ্বারা জিহাদের দায়িত্ব সম্পাদন করেছিলেন।

টিকাঃ
১৯০ আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/১২৪; সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/২৪২।
১৯৬ উসদুল গাবা: ৩/৩১৮।
১৯৫ খাসায়িসুল আশারাতিল কিরামিল বারারাহ: ৪১।
১৯০ সহিহ বুখারি, কিতাবুল মাগাজি, বাসিন নাবি উসামাতা অধ্যায়: ৪২৭০।

📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 বদরযুদ্ধে আবু বকর

📄 বদরযুদ্ধে আবু বকর


আবু বকর রা. দ্বিতীয় হিজরিতে সংঘটিত বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই যুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হচ্ছে:
১. যুদ্ধবিষয়ক পরামর্শ কুরাইশদের কাফেলা যখন নাগালের বাইরে চলে যায় এবং 'কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে' মর্মে সংবাদ পান, নবিজি তখন সাহাবিগণকে পরামর্শের জন্য ডাক দিলে সর্বাগ্রে কথা রাখেন আবু বকর রা.। তিনি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সুন্দর পরামর্শ দেন। এরপর দাঁড়ান উমর রা.। তিনিও সুন্দর কথাবার্তা বলেন।
২. নবিজির সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানে তাঁর অবদান মুশরিকবাহিনীর অবস্থা জানতে আবু বকর রা. রাসুলের সঙ্গে বের হন। তারা উভয়ে ওই এলাকায় ঘোরাফেরা করছিলেন। একসময় জনৈক বৃদ্ধের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। নবিজি কুরাইশবাহিনী এবং মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথিদের ব্যাপারে লোকটিকে প্রশ্ন করেন। বৃদ্ধ বলে, 'আপনাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া অবধি আমি এ ব্যাপারে কথা বলতে পারব না।' নবিজি বলেন, 'আপনি বলুন, তার পর আমরা আমাদের পরিচয় বলব।' বৃদ্ধ বলে, 'কথা ঠিক থাকবে?' নবিজি বলেন, 'হ্যাঁ।'
বৃদ্ধ বলতে থাকে, 'শুনেছি, মুহাম্মাদ এবং তাঁর সাথিরা অমুক দিন বেরিয়ে পড়েছে। আমাকে যে সংবাদটি দিয়েছে, সে যদি সত্যবাদী হয়ে থাকে, তাহলে আজ তাদের অমুক স্থানে থাকার কথা। (লোকটি ঠিক সে জায়গার কথাই বলে, যেখানে মুসলিমবাহিনী শিবির পেতে অবস্থান করছিল।) আর কুরাইশদের ব্যাপারে আমি জেনেছি যে, তারা অমুক দিন বের হয়েছে। যদি সংবাদটি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে আজ তারা অমুক স্থানে থাকার কথা।' (লোকটি ঠিক সেই জায়গার কথাই বলে, যেখানে কুরাইশরা অবস্থান করছিল।)
এরপর বৃদ্ধ বলে, 'আমি তো আপনাদের প্রার্থিত বিষয় বলে দিলাম। এবার আপনাদের পরিচয় দিন।' রাসুল জবাবে বলেন, 'আমরা পানি থেকে এসেছি।' কথাটি বলেই তিনি আবু বকরকে নিয়ে চলে যেতে থাকেন। বৃদ্ধ তখন বকবক করছিল—'পানি থেকে' দ্বারা কী উদ্দেশ্য। ইরাকের পানি থেকে নাকি!
এই অবস্থান থেকেও নবিজির সঙ্গে সিদ্দিকের নৈকট্যের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়ে ওঠে। তিনি রাসুলের কাছ থেকে সকল সবকই শিখে নিয়েছিলেন।
৩. শামিয়ানার নিচে রাসুলের নিরাপত্তায় আবু বকর মুসলিমবাহিনী যুদ্ধের সারি বিন্যস্ত করে নিলে রাসুল যুদ্ধ পরিচালনার কেন্দ্রস্থলে চলে আসেন, যা একটি টিলায় ঝুপড়ির মতো করে উপরে শামিয়ানা টানিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। সেখান থেকে পুরো মাঠের দৃশ্য দেখা যেত। এর ভেতরে আবু বকরও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। কয়েকজন আনসারি যুবক সাহাবি সাআদ ইবনু মুআজের নেতৃত্বে জায়গাটি পাহারা দিচ্ছিলেন।
আলি রা. আবু বকরের এই অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞেস করেন, 'বলো তো দেখি, সবচেয়ে বড় বাহাদুর কে?' লোকজন জবাবে বলে, 'আমিরুল মুমিনিন, আপনি।' আলি বলেন, 'আমার বিষয়ে তোমাদের অবশ্যই জানা আছে যে, আমার মোকাবিলায় যে-ই এসেছে, আমি তার থেকে বদলা নিয়েছি। তবে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাহাদুর ছিলেন আবু বকর। বদরযুদ্ধে আমরা রাসুলের জন্য একটি শামিয়ানা টানিয়েছিলাম। প্রশ্ন উঠেছিল, সেখানে রাসুলের পাশে কে থাকবে? মুশরিকরা রাসুলের পাশ ঘেঁষতে চাইলে কে প্রতিহত করবে? তখন আমাদের মধ্য থেকে আবু বকরই তরবারি নিয়ে রাসুলের পাশে দাঁড়িয়ে যান। এরপর যে-ই তাঁর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তিনি তার ওপর আক্রমণ করে পালাতে বাধ্য করেন। নিঃসন্দেহে আবু বকরই ছিলেন সবচেয়ে বড় বাহাদুর ব্যক্তি।'
৪. বিজয় ও সাহায্যের সুসংবাদ এবং রাসুলের পাশে থেকে যুদ্ধ
সামরিক সাজসরঞ্জাম যতটুকু সম্ভব জোগাড় করার পর রাসুল আল্লাহর দিকে নত হন। তাঁর দরবারে বিজয় ও সাহায্যের প্রার্থনা করে যেতে থাকেন। বলতে থাকেন, 'হে আল্লাহ, তুমি আমার সঙ্গে যে অঙ্গীকার করেছিলে তা পূর্ণ করে দেখাও। মুসলমানদের এই কাফেলা যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে জমিনে তোমার ইবাদত করার মতো কেউ থাকবে না।' নবিজি অব্যাহতভাবে দুআ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তাঁর কাঁধ থেকে চাদর পড়ে যায়। আবু বকর তখন সেটি নবিজির কাঁধে উঠিয়ে দিতে দিতে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, যথেষ্ট হয়েছে। আল্লাহ অবশ্যই তাঁর অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবেন।' তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করেন,
স্মরণ করো, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেছিলে, তখন তিনি তোমাদের জবাব দিয়েছিলেন। [সুরা আনফাল: ৯]
ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত; রাসুল বদরের দিন বলেছিলেন, 'হে আল্লাহ, তুমি তোমার অঙ্গীকার বাস্তবায়িত করে দেখাও। আল্লাহ, তুমি চাইলে (মুমিনদের ধ্বংস চাইলে জমিনে কখনো আর) তোমার ইবাদত হবে না...।' আবু বকর তখন রাসুলের হাত ধরে বলেন, 'আল্লাহ আপনার জন্য যথেষ্ট।' এরপর নবিজি এই আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে বেরিয়ে আসেন - سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلَّوْنَ الدُّبُرَ 'এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে। ' [সুরা কামার: ৪৫]
শামিয়ানার নিচে থাকাবস্থায় রাসুল-কে তন্দ্রা পেয়ে বসে। খানিক পর তন্দ্রাভাব কেটে গেলে তিনি বলেন, 'আবু বকর, আনন্দিত হও, তোমাদের কাছে আল্লাহর সাহায্য এসে গেছে। এই তো জিবরিল আমিন! নিজের ঘোড়ার লাগাম হাতে এগিয়ে যাচ্ছেন! চারদিকে কেবল ধুলো উড়ছে!' এরপর নবিজি শামিয়ানা থেকে বেরিয়ে এসে লোকজনকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহ দিতে থাকেন।
আবু বকর সিদ্দিক রা. বদরের এই ঘটনা থেকে বিজয় ও সাহায্যের জন্য প্রবৃত্তিপরায়ণতা থেকে দূরে থেকে নিষ্ঠা, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আল্লাহর সামনে নত হওয়া, হাঁটু গেড়ে আল্লাহর দরবারে পড়ে যাওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। এই দৃশ্যটি তাঁর অস্তিত্বের ফলকে খোদাই হয়ে গিয়েছিল। নবিজির মতো তিনিও এমন কঠিন মুহূর্তে দুআর এই অস্ত্র ব্যবহার করতেন। যারা সাহাবিদের অনুসরণ করতে চায়, তাঁদের জীবনাচার থেকে শিক্ষা নিতে চায়—এমন প্রত্যেক নেতা, শাসক ও মানুষের জন্য আবু বকরের জীবনে রয়েছে বিরাট শিক্ষা।
যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করলে নবিজি নিচে নেমে এসে মানুষকে উদ্দীপনা দিতে থাকেন। মানুষ স্ব স্ব কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর জিকির আদায় করছিলেন। নবিজি নিজেও বীরত্বের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর পাশে থেকে আবু বকরও বীরদর্পে লড়াই করছিলেন। সে দিন তাঁর থেকে অস্বাভাবিক বীরত্ব প্রকাশ পাচ্ছিল। তিনি প্রতিটি অহংকারী কাফিরের সঙ্গে লড়তে প্রস্তুত ছিলেন; যদিও সে তাঁর পুত্র হতো। আবদুর রাহমান ইবনু আবি বকর, যাঁকে আরবের শ্রেষ্ঠতম লড়াকু হিসেবে গণ্য করা হতো, যিনি কুরাইশের কাছে একজন দক্ষ তিরন্দাজ হিসেবে খ্যাত ছিলেন, বদরে মুসলিমবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে এসেছিলেন। ইসলামগ্রহণের পর একদিন পিতাকে বলেন, 'আব্বু, বদরের দিন আপনি আমার স্পষ্ট লক্ষ্য ছিলেন; কিন্তু আমি সরে গিয়েছিলাম। আপনাকে হত্যা করতে মন চায়নি।' আবু বকর জবাবে বলেন, 'কিন্তু তুমি যদি সে দিন আমার সামনে আসতে, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাকে ছেড়ে দিতাম না।
৫. আবু বকর এবং যুদ্ধবন্দি
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাসের বর্ণনা; “বদরযুদ্ধে মুসলমানগণ যখন কাফিরদের বন্দি করেন, তখন রাসুল আবু বকর ও উমরকে বলেন, 'বন্দিদের ব্যাপারে তোমাদের সিদ্ধান্ত কী?' আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, এরা তো আমাদেরই চাচাতো ভাই, আমাদেরই বংশের লোক। আমার মত হচ্ছে, আপনি মুক্তিপণের বিনিময়ে এদের মুক্ত করে দিন। এর ফলে কাফিরদের মোকাবিলায় আমরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠব। আশা করি, আল্লাহ তাদের হিদায়াত দ্বারা ধন্য করবেন। তারা মুসলমান হয়ে যাবে।'
রাসুল উমরকে বলেন, 'ইবনুল খাত্তাব, তোমার মত কী?' উমর বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমার মত আবু বকরের মতো নয়। আমার মত হচ্ছে, ওদের আপনি আমাদের হাতে তুলে দেবেন, আমরা তাদের প্রত্যেকের গর্দান উড়িয়ে দেবো! আকিল ইবনু আবি তালিবকে আলির জিম্মায় ছেড়ে দিন। আর অমুককে (যে উমরের নিকটাত্মীয় ছিল) আমার দায়িত্বে ছেড়ে দিন! আমরা ওদের গর্দান উড়িয়ে দিই! এরা সকলেই কুফরের নেতা! শত্রুদের মধ্যমণি!
উমর রা. বর্ণনা করেন; কিন্তু নবিজির কাছে আবু বকরের মতই সংগত মনে হয়। তিনি আমার কথা গ্রহণ করেননি। সুতরাং বন্দিদের থেকে মুক্তিপণ নেওয়ার সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়। পরদিন আমি রাসুলের দরবারে হাজির হয়ে দেখি নবিজি ও আবু বকর এক জায়গায় বসে অঝোরে কাঁদছেন। আমি বলি, 'আল্লাহর রাসুল, বলুন, আপনি এবং আপনার সঙ্গী এভাবে কাঁদছেন কেন? যদি দেখি এতে আমার জন্যও কান্নার বিষয় রয়েছে, তাহলে আমিও কাঁদব। কান্নার কারণ না পেলেও আপনাদের দেখাদেখি কাঁদব!'
রাসুল বলেন, 'তোমার সাথিরা মুক্তিপণ গ্রহণের যে অভিমত আমাকে দিয়েছিল, আমি সে জন্য কাঁদছি।' এরপর তিনি নিকটস্থ একটি গাছের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, 'মুক্তিপণ গ্রহণের কারণে আল্লাহর শাস্তি আমার কাছে এই গাছের থেকেও নিকটে নিয়ে আসা হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে আয়াত নাজিল করেছেন,
দেশে শত্রুকে ব্যাপকভাবে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দি রাখা কোনো নবির জন্য সংগত নয়। তোমরা কামনা করো পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চান পরলোকের কল্যাণ; আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ববিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ, এ জন্য তোমাদের ওপর মহা শাস্তি আপতিত হতো। যুদ্ধে তোমরা যা লাভ করেছ, তা বৈধ ও উত্তম হিসেবে ভোগ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' [সুরা বাকারা: ৬৭-৬৯]
এভাবে আল্লাহ তাদের জন্য গনিমতের সম্পদ হালাল করে দেন।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত; যুদ্ধ সমাপ্ত হলে নবিজি সাহাবিগণকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, 'বন্দিদের ব্যাপারে তোমাদের অভিমত কী?' আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, এরা তো আপনারই বংশের। মুক্তিপণের বিনিময়ে এদের ছেড়ে দিন। আরেকটু অবকাশ দিন, সম্ভবত আল্লাহ এদের তাওবার তাওফিক দান করবেন।' উমর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, এরা আপনাকে আপনার প্রিয় জন্মভূমি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাকে মিথ্যা প্রতিপাদন করেছে। আপনি ওদের আমার জিম্মায় ছেড়ে দিন, আমি এদের মস্তকগুলো উড়িয়ে দিই।'
আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রা. বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, এমন একটি উপত্যকার সন্ধান করুন, যেখানে প্রচুর খড়ি রয়েছে। সেখানে আগুন ধরিয়ে ওদের জ্বালিয়ে দিন।' এর জবাবে আব্বাস রা. বলেন, 'তুমি কি তোমার আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ করবে।' এরপর রাসুল কিছু না বলেই নিজের ঘরের ভেতর চলে যান।
এদিকে লোকজন পরস্পর যার যার অভিমত ব্যক্ত করছিলেন। কেউ বলছিলেন, আবু বকরের সিদ্ধান্ত অনুসারে কাজ করা হোক। কেউ বলছিলেন, উমরের সিদ্ধান্ত অনুসারে কাজ করা হোক। আর কেউ কেউ আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার অভিমতের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছিলেন। তখন রাসুল ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলেন, 'আল্লাহ কতক মানুষের অন্তরকে মাটির মতো নরম করে দেন; আর কতক মানুষের অন্তর পাথর থেকেও কঠিন করে দেন। আবু বকর, তোমার উদাহরণ ইসা আ.-এর মতো, যিনি বলেছিলেন,
তুমি যদি তাদের শাস্তি দাও তাহলে তারা তো তোমারই বান্দা; আর যদি তাদের ক্ষমা করে দাও তাহলে তো তুমি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। [সুরা মায়িদা: ১১৮]
আর হে উমর, তোমার উদাহরণ হচ্ছে নুহ আ.-এর মতো, যিনি বলেছিলেন,
নুহ আরও বলেছিল, হে আমার পালনকর্তা, পৃথিবীর কাফিরদের মধ্যে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিয়ো না। [সুরা নুহ : ২৬]
আর তোমাদের উদাহরণ মুসা আ.-এর মতো, যিনি বলেছিলেন,
মুসা বলল, হে আমার রব, তুমি তো ফিরআউন ও তার পরিবারবর্গকে পার্থিব জীবনে শোভা ও সম্পদ দান করেছ, যা দিয়ে তারা মানুষকে তোমার পথ থেকে ভ্রষ্ট করে থাকে। হে আমাদের রব, ওদের সম্পদ বিনষ্ট করো, ওদের হৃদয় কঠিন করে দাও, ওরা তো মর্মন্তুদ শাস্তি প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত ইমান আনবে না। [সুরা ইউনুস: ৭৭]
নবিজি যখনই সাহাবিদের থেকে পরামর্শ নিতেন, তখন আবু বকরই প্রথম কথা বলতেন। অনেক সময় অন্যরা কথা বলতেন না, তখন আবু বকরের মতের আলোকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। আর অন্যরা কথা বললেও তাঁদের বিপরীতে আবু বকরের অভিমতকেই প্রাধান্য দেওয়া হতো।

টিকাঃ
১৯৭ সহিহ বুখারি: ৩৯৫২।
১৯৮ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু হিশাম : ২/৪৪১।
১৯৯ কুরাইশি বৃদ্ধের কাছে তাঁর নিজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার অর্থ ছিল লোকটির কাছে যেন তাঁর ব্যক্তিপরিচয় গোপন থাকে। -অনুবাদক
২০০ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু হিশাম: ২/২২৮।
২০১ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু হিশাম: ২/২৩৩।
২০২ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/২৭১, ২৭২।
২০০ সহিহ মুসলিম: কিতাবুল জিহাদ, বাবুল ইমদাদি বিল মালায়িকাতি বি বাদরিন: ১৭৬৩।
২০৪ সহিহ বুখারি: কিতাবুল মাগাজি, বাবু কিসসাতি বাদরিন: ৩৯৫৩।
২০০ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু হিশাম: ২/৪৫৭; উদ্ধৃত তারিখুদ দাওয়াহ: ১২৫।
২০৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/২৭৮।
২০৭ তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি: ৯৪।
২০৮ সহিহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার: ১৭৬৩।
২০৯ মুসনাদু আহমাদ: ১/৩৭৩; তাফসিরু ইবনি কাসির: ২/৩২৫।
২১০ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., মালুল্লাহ: ৩৩৫।

📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 উহুদ এবং হামরাউল আসাদযুদ্ধে আবু বকর

📄 উহুদ এবং হামরাউল আসাদযুদ্ধে আবু বকর


উহুদযুদ্ধে মুসলমানদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। একপর্যায়ে সাহাবিগণ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন। এর মধ্যে এই মর্মে সংবাদ রটে যায় যে, মুহাম্মাদ শহিদ হয়েছেন। সাহাবিগণের ওপর এর প্রভাব বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়। ময়দান ছিল বেশ প্রশস্ত। প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সর্বাগ্রে আবু বকরই শত্রুর সেনাসারি দুমড়ে-মুচড়ে রাসুলের কাছে পৌঁছান। এরপর তাঁর পাশে একে একে জড়ো হন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, আলি, জুবায়ের, তালহা, উমর ইবনুল খাত্তাব, হারিসা ইবনু সাম্মাহ, আবু দুজানা, সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস প্রমুখ। তাঁরা তাঁদের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি পুনর্বার সংহত করার লক্ষ্যে রাসুল -কে উহুদের উপত্যকায় নিয়ে যান।
আবু বকর সিদ্দিক রা. উহুদের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, 'পুরো যুদ্ধটি ছিল তালহার জন্য। (অর্থাৎ, তিনিই রাসুলের নিরাপত্তাবিধানে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিলেন।) এরপর বলেন, উহুদযুদ্ধের দিন আমিই ছিলাম প্রথম ব্যক্তি, যে নবিজির কাছে ফিরে এসেছিলাম। আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে লক্ষ করছিলাম, এক ব্যক্তি তীব্রবেগে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আমি মনে মনে বলি, তুমি তালহাই হয়ে থাকবে। আমার থেকে এই সোনালি সুযোগটা ছুটে গিয়েছিল। আমার ও মুশরিকদের মধ্যখানে এক ব্যক্তি ছিল, আমি তাকে চিনতে পারিনি। আমি লোকটি অপেক্ষা রাসুলের বেশি কাছে ছিলাম। লোকটি লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাকিয়ে দেখি, তিনি ছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ।
এরপর আমরা রাসুলের একেবারে নিকটে পৌঁছাই। ততক্ষণে নবিজির দাঁত মুবারক শহিদ হয়ে গেছে। চেহারায় আঘাতের চিহ্ন। শিরস্ত্রাণ ভেঙে এর দুটি টুকরো চোখের নিচে গালের ভেতর ঢুকে পড়েছিল। নবিজির শরীর থেকে তখন রক্ত ঝরছিল; কিন্তু তিনি বলছিলেন-'তোমাদের সাথি তালহার খবর নাও।' আমরা তাঁর অবস্থা দেখে তাঁর কথায় মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। আমি রাসুলের চেহারা থেকে শিরস্ত্রাণের ওই টুকরো দুটি বের করতে উদ্যত হলে আবু উবায়দা বলেন, 'আমি আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, টুকরো দুটি আমাকে বের করতে দিন। আমি তখন নিজ ইচ্ছা বাদ দিয়ে দিই। তাঁর চিন্তা ছিল, টুকরোটি দুটি বের করতে হলে তো রাসুল কষ্ট পেতে পারেন। তাই দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ধীরে ধীরে বের করে নিতে চাচ্ছিলেন। অবশেষে একটি টুকরো তিনি বের করতে সক্ষম হন, তবে সে সঙ্গে তাঁর নিচের পাটির একটি দাঁত উপড়ে পড়ে। এ অবস্থা দেখে আমি দ্বিতীয় টুকরোটি বের করতে উদ্যত হই; কিন্তু ইবনুল জাররাহ এবারও আমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে থামিয়ে দেন। তিনি একই প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় টুকরোটিও বের করে নিয়ে আসেন। ফলে তাঁর নিচের পাটির আরেকটি দাঁত উপড়ে যায়।
নিঃসন্দেহে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ ছিলেন আকর্ষণীয় দেহকাঠামোর অধিকারী। তিনি নবিজির ক্ষতস্থানে পট্টি লাগিয়ে দেওয়ার পর তালহার কাছে যান। তালহা রা. তখন আহত অবস্থায় একটি গর্তে ছিলেন। আমরা দেখতে পাই, তাঁর শরীরে ৭০-এর অধিক বর্শা, তির ও তরবারির আঘাত রয়েছে। তাঁর আঙুল কেটে পড়েছিল। আমরা তাঁর ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে দিই।
এই যুদ্ধে আবু সুফিয়ানের ওই অবস্থান থেকেই আবু বকরের মর্যাদা পরিষ্কার হয়, যখন আবু সুফিয়ান চিৎকার দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'মুহাম্মাদ কি বেঁচে আছে?' আবু সুফিয়ান তিনবার একই প্রশ্ন করেছিলেন। রাসুল সাহাবিগণকে তার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বারণ করছিলেন। এরপর তিনি (তিনবার) বলেন, 'তোমাদের মধ্যে কি ইবনু কুহাফা বিদ্যমান আছে?' এরপর (তিনবার) বলেন, 'তোমাদের মধ্যে কি ইবনুল খাত্তাব বিদ্যমান আছে?' কোনো উত্তর না পেয়ে তিনি সঙ্গীদের বলেন, 'এদের সবাই নিহত হয়েছে।
এ থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, মুশরিকদের নেতা আবু সুফিয়ানের বিশ্বাস ছিল, ইসলামের স্তম্ভই ছিলেন রাসুল এবং আবু বকর ও উমর।
মুশরিকরা মুসলমানদের ধ্বংস করতে এবং তাদের সমূলে উৎখাত করতে তৎপর হলে নবিজির পরিকল্পনা সামনে আসে। তাঁর পরিকল্পনা ওদের চক্রান্তগুলোকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে নিয়ে যায়। উহুদ থেকে মদিনায় ফেরার পর নবিজির সন্দেহ হয়, কুরাইশরা হয়তো মদিনায় চড়াও হতে পথ পালটিয়ে ফের আসতে পারে। যদিও তখন সাহাবিগণ ছিলেন আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এবং পুরো মদিনা ছিল শহিদদের শোকে কাতর, এরপরও তিনি সাহাবিগণকে কুরাইশদের পশ্চাদ্ধাবনে ডাক দেন। সাহাবিগণও তখন লাব্বাইক বলে তাদের ধাওয়া করতে বেরিয়ে পড়েন। মুসলিমবাহিনী যখন মদিনা থেকে বের হয়ে আট কিলোমিটার দূরবর্তী হামরাউল আসাদ-প্রান্তরে গিয়ে পৌঁছান, তখন তাঁদের দেখে মুশরিকরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা মদিনায় আসার চিন্তা বাদ দিয়ে মক্কার দিকে পালাতে শুরু করে। আল্লাহ বলেন,
জখম হওয়ার পর যারা আল্লাহর রাসুলের ডাকে সাড়া দিয়েছে, তাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে চলে, তাদের জন্য মহা পুরস্কার রয়েছে। [সুরা আলে ইমরান: ১৭২]
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা উরওয়া ইবনু জুবায়েরের কাছে এ আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “ভাগনে, যে দিন উহুদ প্রান্তরে مسلمانوں ওপর বিপদ ভেঙে পড়েছিল, মুশরিকরা পালিয়ে যাচ্ছিল, সে দিন তোমার পিতা জুবায়ের এবং নানা আবু বকর সেই লোকদের মধ্যে ছিলেন। রাসুলের সন্দেহ ছিল কাফিরগণ হয়তো পালিয়ে না গিয়ে মদিনায় ফিরে এসে হামলা চালাতে পারে। তিনি তখন সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে বলেন, 'ওদের পিছু ধাওয়ায় বের হবে, এমন কেউ আছ?' তখন ৭০ জন সাহাবি 'লাব্বাইক' বলে বেরিয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে আবু বকরও ছিলেন।”

টিকাঃ
*** মাওয়াকিফুস সিদ্দিক মাআন নাবি ফিল মাদিনা, ড. আতিফ লিমাজা : ২৭।
২১৯ মিনহাতুল মাবুদ : ২/১৯; তারিখুদ দাওয়াতিল ইসলামিয়া: ১৩০ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত।
২১০ ফাতহুল বারি: ৬/১৮৮, ৭/৪০৫।
২১৪ মাওয়াকিফুস সিদ্দিক মাআন নাবি ফিল মাদিনা, ড. আতিফ লিমাজা: ২৮।
২১৪ সহিহ মুসলিম: ২৪১৮।

📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 গাজওয়ায়ে বনু নাজির, বনু মুসতালিক, খন্দক ও

📄 গাজওয়ায়ে বনু নাজির, বনু মুসতালিক, খন্দক ও


১. বনু নাজিরযুদ্ধ
বনু আমির এবং রাসুলের মধ্যে সহযোগিতা-চুক্তি বিদ্যমান ছিল; কিন্তু আমর ইবনু উমাইয়া নামের জনৈক মুসলিম ভুলক্রমে বনু আমিরের দুই ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেন। নবিজি তাদের রক্তপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে সাহায্যের জন্য বনু নাজিরের কাছে যান। অঙ্গীকারের ভিত্তিতে এমন ক্ষেত্রে তাদের জন্য সাহায্যপ্রদান ছিল বাধ্যতামূলক। বনু নাজির এবং বনু আমিরের মধ্যেও সহযোগিতা-চুক্তি বিদ্যমান ছিল। নবিজি তাদের কাছে গিয়ে পৌঁছালে সাহায্যের ব্যাপারে তাদের সম্মতির কথা জানিয়ে দেয়। তারা বলে, 'আবুল কাসিম, আপনি যেমনটি চাচ্ছেন আমরা তা-ই করব।' রাসুল তখন একটি দেয়ালের ছায়ায় অবস্থান করছিলেন। এদিকে ইয়াহুদিরা গোপনে একত্র হয়ে পরস্পর বলাবলি করে, 'এমন মোক্ষম সুযোগ আর আসবে না। কে আছে যে মুহাম্মাদ থেকে আমাদের চিরমুক্তি দানের জন্য এই ঘরের ছাদে উঠে সেখান থেকে ভারী পাথর ফেলে তাকে থ্যাঁতলে দেবে?'
এ আবেদন শুনে হতভাগা ইয়াহুদি আমর ইবনু জাহহাশ বলে, আমি এই কাজ আনজাম দেবো। সে ঘরের ছাদে উঠে যায়। তখন নবিজির সঙ্গে ছিলেন আবু বকর, উমর, আলিসহ একদল সাহাবি। আল্লাহ তাঁর রাসুলকে ওহির মাধ্যমে ইয়াহুদিদের এই অসদিচ্ছা জানিয়ে দিলে তিনি দ্রুত মদিনায় ফিরে আসেন। এদিকে নবিজির ফিরতে বিলম্ব হতে দেখে সাহাবিগণ তাঁর খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিলেন। পথে মদিনা থেকে আগত জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। তারা তার কাছে রাসুল-কে মদিনায় প্রবেশ করতে দেখেছি।' এরপর সাহাবিগণ তাঁর পাশে জড়ো হলে তিনি ইয়াহুদিদের চক্রান্ত সম্পর্কে তাদের অবহিত করেন।
মদিনায় এসেই মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার হাতে এই মর্মে একটি প্রজ্ঞাপন দিয়ে বনু নাজিরের কাছে পাঠিয়ে দেন যে, 'তোমরা এক্ষুনি সেখান থেকে বেরিয়ে যাও।' কিন্তু মদিনার মুনাফিকরা বনু নাজিরের কাছে অটল থাকার এবং সাহায্যপ্রদানের প্রতিশ্রুতি-সংবলিত বার্তা পাঠালে তাদের সাহস বেড়ে যায়। ফলে ইয়াহুদি-সরদার হুয়াই ইবনু আখতাব ঔদ্ধত্যের সঙ্গে নবিজির নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে। এ ছাড়া সে ইতিপূর্বে অঙ্গীকার ভঙ্গেরও ঘোষণা দেয়। নবিজি তখন সাহাবিগণকে বনু নাজিরের দিকে বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দিলে তাঁরা সেখানে পৌঁছে ১৫ দিন পর্যন্ত তাদের দুর্গ অবরোধ করে রাখেন। ইয়াহুদিরা দুর্গের পাঁচিল থেকে পাথর ও তির ছুড়তে থাকে। খেজুরবাগান তাদের অবস্থানে দৃঢ় থাকতে সহায়তা করছিল বিধায় নবিজি সেগুলো কেটে জ্বালিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। ফলে তারা অস্ত্রসমর্পণে বাধ্য হয়। নবিজি তখন তাদের এ আবেদন মেনে নেন যে, উটের পিঠে করে যেসব মালসামানা তাদের জন্য নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তারা তাসহ তাদের পরিবার-পরিজন ও সন্তানসন্ততি নিয়ে চলে যাবে। তবে অস্ত্র নিতে পারবে না। এ প্রসঙ্গেই সুরা হাশর অবতীর্ণ হয়েছিল।
২. বনু মুসতালিকযুদ্ধ
বনু মুসতালিক মদিনায় হামলার পরিকল্পনা করেছিল। নবিজি ব্যাপারটি জানতে পেরে সাহাবিদের নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বেরিয়ে পড়েন। সেখানে পৌঁছে মুহাজিরদের পতাকা আবু বকরের হাতে অর্পণ করেন। কেউ কেউ বলেছেন, পতাকাটি ছিল আম্মার ইবনু ইয়াসিরের হাতে। আর আনসারদের পতাকা দেন সাআদ ইবনু উবাদার হাতে। এরপর উমরকে ঘোষণার নির্দেশ দিলে তিনি তাদের মধ্যে এই বলে ঘোষণা দিতে থাকেন, 'লোকসকল, তোমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করে নাও, তোমাদের জানমাল নিরাপদ হয়ে যাবে।' বনু মুসতালিক তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মুসলমানদের ওপর তির ছুড়তে থাকে। রাসুল তখন সাহাবিগণকে হামলার নির্দেশ দেন। সাহাবিদের চতুর্মুখী হামলায় তাঁদের কেউ পালিয়ে যেতে পারেনি। তাঁরা তাদের ১০ জনকে হত্যা করে বাকিদের বন্দি করেন। মুসলমানদের পক্ষে মাত্র একজন তখন শহিদ হন।
৩. খন্দক ও বনু কুরাইজার যুদ্ধ আবু বকর রা. এই যুদ্ধ দুটিতেও রাসুলের সঙ্গী ছিলেন। খন্দকের যুদ্ধে খন্দক তথা পরিখা খননের সময় তিনি মাটিগুলো নিজের কাপড়ে পুরে পুরে সরাতেন। নির্ধারিত দিনে কাজটি দ্রুত সমাপ্তির লক্ষ্যে সাহবিদের সঙ্গে মিলে কাজ চালিয়ে যান। পরিখাটি মুসলমানদের জন্য কল্যাণবহ প্রমাণিত হয়।

টিকাঃ
২১৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/১৫৭১।
২১২ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/১৫৭১।
মাওয়াকিফুস সিদ্দিক রা. মাআন নাবি ফিল মাদিনা, ড. আতিফ লিমাজা: ৩২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00