📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব এবং মানুষের সঙ্গে আচরণের নিয়ম

📄 আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব এবং মানুষের সঙ্গে আচরণের নিয়ম


হিজরতের সফরের পরতে পরতে রাসুলের প্রতি সিদ্দিকের গভীর ভালোবাসার ব্যাপারটি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। অনুরূপ রাসুলের সিরাত অধ্যয়ন করলে তাঁর প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসার বিষয়টিও প্রতিভাত হয়। এই আন্তরিক মুহাব্বাত হৃদয়ের গভীর থেকেই উৎসারিত হতো। এ ছিল তাঁদের নিষ্ঠার প্রতিফলন। এর মধ্যে কোনো মুনাফিকি বা কৃত্রিমতা ছিল না। ছিল না পার্থিব স্বার্থ কিংবা কোনো প্রকার ভয়ভীতি। এর মূলে ছিল রাসুলের নেতৃত্বগুণ, যিনি মানুষকে ঘুম পাড়ানোর জন্য নিজে সজাগ থাকতেন। মানুষকে শান্তি দিতে নিজে শ্রান্ত হতেন। মানুষকে পরিতৃপ্ত করতে নিজে ক্ষুধার্ত থাকতেন। মানুষের আনন্দে আনন্দিত হতেন, দুঃখে পীড়িত হতেন। যে ব্যক্তিই নিজের সাথিদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে রাসুলের এই সুন্নাহ অনুসরণ করবে, সাথির আনন্দে আনন্দিত হবে; আর তার কাজটি হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে, সে তার সাথিদের আন্তরিক ভালোবাসা অর্জন করতে পারবে—চাই সে কেন্দ্রীয় নেতা হোক বা সাধারণ কোনো দায়িত্বশীল। কবি আল লিবি আহমাদ রফিক মাহদাবি সত্য বলেছেন,
যখন আল্লাহ তার কোনো বান্দার অন্তর পছন্দ করেন, তখন আল্লাহপ্রদত্ত যোগ্যতা তার মধ্যে প্রকাশ পায়। যখন কোনো সংস্কারবাদীর নিয়ত আল্লাহর জন্য নিবেদিত হয়, তখন অন্তরের গভীর থেকেই মানুষ তার অভিমুখী হয়।
সঠিক নেতৃত্ব সবকিছুর আগে মানুষের সঙ্গে আচরণ ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শনের যোগ্যতা নির্ণয় করে। নেতৃত্ব যত ভালো হবে, অনুসারীর আচরণ হবে তত ভালো। নেতৃত্বের পক্ষ থেকে অধীনদের প্রতি যত অনুগ্রহ থাকবে, নেতৃত্বের প্রতি অধীনদের ভালোবাসা হবে তত বেশি। রাসুল তাঁর অনুসারী ও সেনাদলের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত হিজরত করেননি, যতক্ষণ-না তাঁর অধিকাংশ অনুসারী হিজরত করেছিলেন। নবি যখন হিজরত করেন, তখন কেবল দুর্বল লোকজন—যাঁদের হিজরত করতে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল—থেকে গিয়েছিলেন।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, নবির সঙ্গে আবু বকরের যে ভালোবাসা ছিল, তা ছিল কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে। আবু তালিবও কিন্তু রাসুল-কে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন; কিন্তু তাঁর ও আবু বকরের ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্যর ধরন ছিল—আবু তালিবের ভালোবাসা ছিল আত্মীয়তার নিরিখে; আর আবু বকরের ভালোবাসা ছিল নিরেট আল্লাহর জন্য। এ জন্যই আবু বকরের ভালোবাসা হয়েছিল সফল এবং আবু তালিবের ভালোবাসা হয়েছিল ব্যর্থ। এই আয়াত তো তাদের শানেই নাজিল হয়েছিল,
আর তা থেকে দূরে রাখা হবে পরম মুত্তাকিকে, যে নিজের সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির জন্য এবং তার প্রতি কারও অনুগ্রহের প্রতিদানে নয়, কেবল তার মহান পালনকর্তার সন্তুষ্টির প্রত্যাশায়; সে তো অচিরেই প্রশান্তি লাভ করবে। [সুরা লাইল: ১৭-২১]
আবু তালিবের ভালোবাসা তার নিজের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনেনি; বরং প্রবল ভালোবাসা থাকার পরও তিনি হয়েছিলেন জাহান্নামি। যেহেতু তিনি ছিলেন মুশরিক। তার কাজকর্ম ছিল গায়রুল্লাহর জন্য। আবু বকর রা. সৃষ্টির কাছে কোনো কিছু চাইতেন না। এমনকি রাসুলের কাছেও না। তিনি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যেই রাসুলের ওপর ইমান এনেছিলেন। তাঁকে ভালোবেসেছিলেন, সহায়তা দিয়েছিলেন। তিনি প্রতিদান চাইতেন কেবল আল্লাহর কাছে। এ লক্ষ্যেই তিনি আল্লাহর ওয়াদা ও ভীতির কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন।

টিকাঃ
*আল-হিজরাতুন নাবাবিয়াহ, আবু ফারিস: ৫৪।
**আল-হারকাতুস সানুসিয়াহ, সাল্লাবি: ২/৭১।
***আল-হিজরাতুন নাবাবিয়াহ আল-মুবারাকা: ২০৫।
১৮৭ মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ১১/২৮৬।

📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 মদিনায় সিদ্দিকের হিজরত-উত্তর অসুস্থতা

📄 মদিনায় সিদ্দিকের হিজরত-উত্তর অসুস্থতা


মক্কা থেকে সাহাবিদের হিজরত করা ছিল বিরাট এক আত্মত্যাগ। বিষয়টি রাসুল * এভাবে তুলে ধরেছিলেন, 'আল্লাহর শপথ, তুমি ছিলে পুরো পৃথিবীতে আমার কাছে সর্বোৎকৃষ্ট ভূমি। আমাকে যদি তোমার থেকে বিতাড়িত করা না হতো, তাহলে আমি কখনো তোমার পরশ থেকে বেরোতাম না।'
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. বলেন, রাসুল যখন হিজরত করে মদিনায় চলে আসেন, তখন সেখানে জ্বরের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ছিল। উপত্যকার পানি ছিল অপরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধযুক্ত। ফলে সাহাবিগণ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। আল্লাহ তাআলা নবিজিকে এ থেকে নিরাপদ রেখেছিলেন। আবু বকর, আমির ইবনু ফুহায়রা এবং বিলাল রা. একই ঘরে বসবাস করতেন। তাঁরা তিনজনই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। আমি রাসুলের কাছে তাঁদের সেবা করার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে সে অনুমতি দেন। আমি তাঁদের কাছে যাই। এ ছিল হিজাবের হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার আগের ঘটনা। তাঁদের সকলের গায়েই ছিল তীব্র জ্বর। আমি আবু বকরের কাছে এসে বলি, 'আব্বু, আপনার অবস্থা কেমন?' তিনি বলেন,
প্রত্যেকেই তার পরিবার-পরিজনের কাছে সকালে হাজির হয়; আর মৃত্যু তো তার কাছে জুতোর ফিতার চেয়েও কাছে।
তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, পিতা কী বলতে চাচ্ছিলেন আমি বুঝতে পারছিলাম না। এরপর আমির ইবনু ফুহায়রার কাছে যাই। জিজ্ঞেস করি, 'আমির, কেমন আছেন আপনি?' তিনি বলেন,
মৃত্যুর আগেই আমি মৃত্যুর স্বাদ পেয়ে গেছি নিঃসন্দেহে ভীরুতার মৃত্যু তার উপর দিক থেকেই এসে থাকে। প্রত্যেকেই নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ করে থাকে, যেমন ষাঁড় তার শিং দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে থাকে।
আমি বলি, 'আল্লাহর শপথ, আমির যা বলছেন আমি তা বুঝতে পারছি না। আর বিলালের জ্বর ছাড়লেই ঘরের আঙিনায় শুয়ে উঁচু কণ্ঠে বলতে থাকেন, আহ! আমি যদি এমন এক উপত্যকায় রাত যাপন করতাম যেখানে আমার চারপাশে থাকবে ইজখির ও জালিল ঘাস। আমি কি কোনো দিন মাজিন্নার ঘাটে উপনীত হতে পারব, আমার সামনে কি শামা ও তুফায়িল পাহাড় দুটি দৃশ্যমান হবে!
সংবাদটা আমি রাসুলের কাছে দিলে তিনি বলেন, হে আল্লাহ, মক্কার মতো মদিনাকেও আমাদের কাছে প্রিয় করে দাও; অথবা তার থেকে বেশি। হে আল্লাহ, একে সুস্থতার আধার বানিয়ে নাও। এর 'মুদ' ও 'সা'-এর মধ্যে আমাদের জন্য বরকত দান করো এবং এখানকার জ্বরকে জুহফায় পাঠিয়ে দাও।
আল্লাহ তাঁর নবির দুআ কবুল করেন। ফলে মুসলমানগণ ব্যাধিমুক্ত হয়ে ওঠেন। এরপর থেকে মদিনা বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মানুষের জন্য উত্তম জায়গায় পরিণত হয়ে ওঠে।
মদিনায় স্থায়ী হওয়ার পর নবিজি ইসলামি সালতানাতের ভিত্তিপ্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃবন্ধন গড়ে দেন। মসজিদে নববি নির্মাণ করেন। ইয়াহুদিদের সঙ্গে সন্ধিতে উপনীত হন। সামরিক তৎপরতা শুরু করেন; আর নতুন ওই সমাজব্যবস্থায় অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাদীক্ষার কার্যক্রম শুরু করেন। পরামর্শ, সম্পদ এবং সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় এ ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য করা হয়নি।

টিকাঃ
১৮৮ সুনানুত তিরমিজি, আল মানাকিব, বাবু ফাজলি মাক্কাতা: ৫/৭২২। হাদিস নং-৩৯২৫।
*** তৎকালের আরবের পরিমাপ একক।
*** সহিহ বুখারি, আদ-দাওয়াত, বাবুদ দাওয়াত ইয়ারফাউল ওয়াবা ওয়াল ওয়াজ : ৬৩৭২।
১*১ আত-তারবিয়াতুলকিয়াদিয়া: ২/৩১০।
*** তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম ফি আহদিল খুলাফায়ির রাশিদিন: ১২১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00