📄 শিক্ষা ও তাৎপর্য
রাসুলের সঙ্গে হিজরতের এই ঘটনায় উম্মাহর জন্য রয়েছে অনেক শিক্ষা ও উপদেশ। আল্লাহ বলেন,
যদি তোমরা তাঁকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তো তাঁকে সাহায্য করেছিলেন—যখন কাফিরগণ তাঁকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দুজনের দ্বিতীয়জন—যখন তারা উভয়ে গুহার ভেতর ছিল। সে তখন তাঁর সঙ্গীকে বলেছিল, “বিষণ্ণ হয়ো না, আল্লাহ তো আমাদের সঙ্গে আছেন।” এরপর আল্লাহ তাঁর ওপর তাঁর প্রশান্তি বর্ষণ করেন এবং তাঁকে শক্তিশালী করেন এমন এক বাহিনী দ্বারা, যাদের তোমরা দেখোনি এবং তিনি কাফিরদের কথা অসার প্রমাণিত করেন। আল্লাহর কথাই সর্বোপরি এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [সুরা তাওবা: ৪০] এই আয়াতের মাধ্যমে সাতটি পন্থায় আবু বকরের মর্যাদার কথা ফুটে ওঠে। যথা:
১. কাফিররা তাঁকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল
কাফিররা নবিজিকে মক্কা থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল। এর অবশ্য পরিণতি ছিল যে, তারা আবু বকরকেও মক্কা থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করে। এটিই চিরসত্য, এটিই বাস্তবতা।
২. তিনিই ছিলেন একমাত্র সাথি
যখন কাফিররা নবিজিকে মক্কা থেকে বিতাড়িত করে এবং তিনি আল্লাহর সাহায্যধন্য হন, তখন আবু বকরই ছিলেন তাঁর একমাত্র সাথি। তিনি ছিলেন দুই-এর দ্বিতীয়জন, যাঁদের তৃতীয়জন ছিলেন খোদ আল্লাহ। যেসব জায়গায় অন্য কোনো সাহাবি রাসুলের সঙ্গে থাকতেন না, সেখানে আবু বকরই হতেন তাঁর সঙ্গী। যেমন : হিজরতের সফরে, বদরে শামিয়ানার নিচে। একইভাবে রাসুল আরবের যেকোনো গোত্রে দাওয়াতের কাজে গেলে আবু বকরই তাঁর সঙ্গে থাকতেন। সিরাতের গবেষকগণ একবাক্যে এই সঙ্গদানের কথা স্বীকার করে থাকেন।
৩. তিনিই ছিলেন গুহার সাথি
গুহার সাথি হওয়ার বিষয়টি কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। বুখারি ও মুসলিমে আনাস রা. থেকে বর্ণিত; আবু বকর রা. বলেন, 'গুহায় অবস্থানের সময় আমরা মাথার উপর দিকে মুশরিকদের পা দেখতে পাচ্ছিলাম। তখন আমি রাসুল-কে বলি, আল্লাহর রাসুল, তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের দিকে লক্ষ করে, তাহলে তো আমাদের দেখে ফেলবে!' তখন রাসুল বললেন, 'আবু বকর, সেই দুজনের ব্যাপারে তোমার কী ধারণা, যাঁদের তৃতীয়জন হচ্ছেন আল্লাহ?'
হাদিসটি মুত্তাফাক আলাইহি। আলিমগণ হাদিসটির সত্যতার ব্যাপারে একমত। এ ব্যাপারে কারও থেকে কোনো প্রকার ভিন্নমত পাওয়া যায় না। তা ছাড়া হাদিসটির অর্থ কুরআন দ্বারাও স্বীকৃত।
৪. তিনি ছিলেন শর্তহীন সাথি আল্লাহর বাণী- إِذْ يَقُوْلُ لِصَاحِبِهِ 'যখন তিনি সঙ্গীকে বললেন' থেকে বোঝা যায়, রাসুল-কে সঙ্গদানের বিষয়টি কেবল গুহায় অবস্থান কালের মধ্যেই সীমিত ছিল না; বরং শর্তহীন সঙ্গদানই উদ্দেশ্য ছিল। তিনি রাসুলের সঙ্গে থেকে এমনসব অবিশ্বাস্য কাজ আনজাম দিয়েছিলেন, যা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। অতএব বলা যায়, পূর্ণাঙ্গ সঙ্গদান কেবল আবু বকরের ভাগ্যেই জুটেছিল। সিরাতবিশেষজ্ঞদের থেকে এ ব্যাপারে ভিন্নমত পাওয়া যায় না। এ জন্যই আলিমগণ বলে থাকেন, আবু বকরের মর্যাদায় এমন বৈশিষ্ট্য ছিল, যে বৈশিষ্ট্যে অন্য কেউ শরিক ছিলেন না।
৫. তিনি ছিলেন রাসুলের ওপর খুবই দয়াবান রাসুলে আকরামের এই ফরমান لَا تَحْزَنُ 'চিন্তা করো না' কথাটিই প্রমাণ করে যে, আবু বকর নবিজিকে অন্তরের গভীর থেকে ভালোবাসতেন। তিনি সব সময় তাঁর কল্যাণচিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন। তাই সাওর পাহাড়ের গুহায় রাসুলের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। মানুষ তার প্রিয়জনের ওপর মন্দ কিছুর শঙ্কা অনুভব করলেই চিন্তিত হয়ে পড়ে। নবিজির ব্যাপারে তাঁর চিন্তার অন্যতম বিষয় ছিল-কী জানি কাফিররা তাঁকে হত্যা করে ফেলে, কী জানি ইসলামের ধারাবাহিকতাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ জন্য হিজরতের সফরে তিনি কখনো নবির সামনে দিয়ে, কখনো পেছন দিয়ে পথ চলতেন। নবিজি তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে আবু বকর বলেন, 'কেন জানি আমার মনে হয় শত্রুরা আপনাকে হত্যার জন্য ওত পেতে বসে আছে। যখন মনে হয় শত্রুরা সামনে, তখন আমি সামনের দিকে এগিয়ে যাই; আর যখন মনে হয় শত্রুরা পেছন থেকে আসছে, তখন আমি পেছন দিকে চলে যাই।
ফাজায়িলুস সাহাবা গ্রন্থে ইমাম আহমাদ রাহ. বলেন, আবু বকর রা. কখনো নবিজির সামনে দিয়ে, আবার কখনো পেছন দিয়ে চলতেন। রাসুল এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, যখন মনে হয় শত্রু সামনের দিক থেকে চলে আসছে, তখন আমি সামনের দিকে চলে যাই; আবার যখন মনে হয় পেছন দিক থেকে আসছে, তখন পেছন দিকে চলে যাই।' তাঁরা যখন গুহায় পৌঁছান, তখন আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি গুহার ভেতরটা পরিষ্কার করে নিই।' তিনি গুহায় প্রবেশ করে দেখতে পান এক জায়গায় ছোট্ট একটি ছিদ্র রয়েছে, তখন তিনি সেটা নিজ পা দ্বারা বন্ধ করে বলেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, হতে পারে এর মধ্যে কোনো সাপ অথবা বিচ্ছু আছে। ছোবল মারলে আমাকেই মারুক, আপনি নিরাপদ থাকুন।
তাঁর শরীরে প্রাণ থাকাবস্থায় নবিজির কষ্ট হোক, সেটা তিনি কল্পনাও করতে পারছিলেন না। তিনি জানমাল পরিবার-পরিজন সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। এটা সকল মুমিনের ওপরই ফরজ ছিল। তবে আবু বকর রা. এই ফরজ আদায়ে ছিলেন সকলের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে।
৬. বিশেষ সঙ্গদানে তিনি ছিলেন প্রিয় নবির অংশীদার আল্লাহর বাণী – إِنَّ اللهَ مَعَنَا ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন’ প্রমাণ করে যে, আবু বকর রা. রাসুলের সঙ্গধন্য হওয়ার এমন সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, যে সৌভাগ্যে অন্য কেউ অংশীদার ছিল না। এ থেকে এ বিষয়টিও প্রমাণিত হয় যে, শত্রুর মোকাবিলায় বিজয় এবং সাহায্যও তাঁর সঙ্গ দিচ্ছিল। নবিজি বলেছিলেন, 'আবু বকর, আল্লাহ আমাকে ও তোমাকে সাহায্য করবেন। আমরা শত্রুর ওপর বিজয়ী থাকব। আল্লাহ বলেন,
নিশ্চয় আমি আমার রাসুলদের ও মুমিনদের সাহায্য করব পার্থিব জীবনে এবং যে দিন সাক্ষীগণ দন্ডায়মান থাকবে।' [সুরা মুমিন : ৫১]
এ হচ্ছে আবু বকরের সর্বোচ্চ প্রশংসা। এ থেকে প্রমাণিত হয়, রাসুল যাঁর প্রশংসিত ইমানের সাক্ষ্য দেন, বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ তাঁর জন্য রাসুলের মতো সাহায্যের দ্বার অবারিত করে দেন। কারণ, বিপদের সময় যদি কাউকে আল্লাহর সাহায্য সঙ্গ না দেয়, তাহলে তো সে ব্যর্থ হিসেবে পরিগণিত হয়।
ড. আবদুল কারিম জায়দান এ আয়াতে উল্লিখিত সঙ্গদানের ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহর বাণী-إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا অর্থাৎ, 'আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন' থেকে যে সঙ্গদান উপলব্ধ হয়, তা ওই সঙ্গদানের চেয়ে মর্যাদায় অনেক ঊর্ধ্বে, যা মুত্তাকি ও সৎকর্মপরায়ণরা পেয়ে থাকেন। যে সঙ্গদানের কথা এই আয়াতে বর্ণিত-'আল্লাহ তাদেরই সঙ্গে আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মপরায়ণ।' [সুরা নাহল: ১২৮] কারণ, إِنَّ اللهَ مَعَنَا -এর মধ্যে যে সঙ্গদানের কথা বলা হয়েছে, তা কোনো গুণ বা কর্মের সঙ্গে শর্তায়িত নয়। পক্ষান্তরে 'সুরা নাহলে' উল্লিখিত সঙ্গদানের মধ্যে রয়েছে তাকওয়া এবং সৎকর্মের শর্ত। অধিকন্তু প্রথমে বর্ণিত সঙ্গদানটি কেবল রাসুল এবং আবু বকরের সত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত; আর ওই সঙ্গদানের বিষয়টি সমর্থন করা হয়েছিল চিরন্তন নীতির বিপরীতে মুজিজার মাধ্যমে।
৭. প্রশান্তি ও সাহায্য অবতীর্ণকালেও তিনি রাসুলের সাথি ছিলেন আল্লাহ ঘোষণা করেন,
এরপর আল্লাহ তাঁর ওপর প্রশান্তি বর্ষণ করেন এবং তাঁকে শক্তিশালী করেন এমন এক বাহিনী দ্বারা, যাদের তোমরা দেখোনি। [সুরা তাওবা: ৪০]
যখন ভীতি ও কঠিন সব পরিস্থিতিতে তিনি রাসুলের সঙ্গে ছিলেন, তখন প্রশান্তি ও সাহায্যের মুহূর্তেও যে তিনি রাসুলের সঙ্গী থাকবেন, তা বলাই বাহুল্য। বাচনভঙ্গি ও অবস্থার চাহিদাই প্রমাণ করে, এ ক্ষেত্রে সঙ্গদানের কথা উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। কেননা, যখন প্রমাণিত হয় দুঃসময়ে তিনি ছিলেন তাঁর ছায়াসঙ্গী, অতএব সুসময়ে যে থাকবেন এটা আর বলতে হয় না। এ জন্যই কুরআন এ বিষয়ে কথা বলেনি। এটা আসলে কুরআনের বিস্ময়কর সংক্ষেপণের একটি প্রক্রিয়া।
টিকাঃ
* সহিহ বুখারি, ফাজায়িলুস সাহাবা: ৩৬৫৩; সহিহ মুসলিম: ১৮৫৪।
১*৯ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৪/২৪০, ২৪১।
১৬০ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৪/২৪৫-২৫২।
১৯১ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা. আফজালুস সাহাবাতি ওয়া আহাক্কুহুম বিল খিলাফাতি: ৪০।
১৬২ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৪/২৬২, ২৬৩।
১৬৩ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৪/২৬৩।
১৬৪ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৪/২৪২-২৪৩।
১৬৫ আল-মুসতাফাদু মিন কিসাসিল কুরআন: ২/১০০।
১৬৬ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৪/২২৭।
📄 পরিকল্পনা ও ব্যস্ততার সহযোগে নবিজি এবং সিদ্দিকের
হিজরতের ঘটনাটি গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে যে-কারও সামনে এই সত্য উদ্ভাসিত হবে যে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাসুল অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজটি সম্পাদন করেছিলেন। এ ছাড়া ওহির আলোকে রাসুলের পুরো জীবনই তো একটি সুন্দর পরিকল্পনা। এটিই আল্লাহর রাসুলের সুন্নাত। মুসলমানরা এমনটি করতে নির্দেশিত। যারা মনে করে পরিকল্পনা ও রূপরেখা প্রণয়ন সুন্নাহ নয়, তারা ভুলের মধ্যে বাস করছে। তারা উম্মাহ এবং মুসলমানদের জন্য বড় এক সমস্যা। তাই নবির হিজরতের সময় আমরা সেগুলো বাস্তবায়নে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো লক্ষ করতে পারি।
হিজরতের জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছিল। ফলে বিপদের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরও সফরটি সফল হয়েছিল। হিজরতের জন্য যত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন, সবই অত্যন্ত সুন্দরভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল :
১. রাসুল প্রচণ্ড গরমের সময় আবু বকরের ঘরে আসেন। আরবরা সাধারণত ওই সময় তাদের ঘর থেকে বের হতো না। এমনটি করার কারণ ছিল, কুরাইশরা যেন তাঁকে দেখতে না পায়।
২. আবু বকরের বাড়িতে আসার সময় তিনি চেহারায় কাপড় ঝুলিয়ে দেন, যাতে লোকজন চিনতে না পারে কে যাচ্ছেন।
৩. নবিজি আবু বকরকে নির্দেশ দেন, এখানে যারা আছে, একটু দূরে তাদের সরিয়ে দিন। এর পর যখন কথা বলেন, তখন কেবল হিজরতের কথাই বলেন। কোথায় যাবেন, কোন দিক দিয়ে যাবেন, সে সম্পর্কে কিছুই বলেননি।
৪. বের হতে রাতকে নির্বাচন করেন; আর আবু বকরের ঘরের পেছন দিক দিয়ে বের হন।
৫. চূড়ান্ত সাবধানতা-স্বরূপ অপরিচিত পথ ধরে এগিয়ে যান। মরুভূমিতে পথচলায় অভিজ্ঞ ব্যক্তির সহায়তা নেন। যদিও লোকটি ছিল মুশরিক, তথাপি বিশ্বস্ততায় ছিল প্রশ্নাতীত। তার ওপর আস্থা রাখা যেত। সে ছিল সচ্চরিত্রের অধিকারী। বিষয়টি এ কথা প্রমাণ করে যে, তিনি অভিজ্ঞ ব্যক্তির অভিজ্ঞতা থেকে ফায়দা নিতে কোনো প্রকার দ্বিধা করতেন না-চাই সে যে-ই হোক।
শায়খ আবদুল করিম জায়দান বলেন, সাধারণত মূলনীতি হচ্ছে, কোনো বিষয়ে অমুসলিমদের সহায়তাগ্রহণ ঠিক নয়; কিন্তু এই মূলনীতি থেকে শর্তসাপেক্ষে কিছু বিষয় আলাদা করে দেখা যেতে পারে। সেগুলো হচ্ছে:
১. সাহায্যগ্রহণ দ্বারা কল্যাণচিন্তা দৃঢ়ীকরণের উদ্দেশ্য থাকতে হবে।
২. সাহায্যগ্রহণের মাধ্যমে ইসলামি দাওয়াতের মূল লক্ষ্য লঙ্ঘিত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারবে না।
৩. যার সাহায্য নেওয়া হচ্ছে, তার ব্যাপারে পূর্ণ আস্থা থাকতে হবে।
৪. এর ফলে মুসলমানদের মধ্যে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারবে না।
৫. সাহায্যগ্রহণের মূলে থাকতে হবে প্রয়োজনের বাধ্যবাধকতা।
এসব শর্ত পাওয়া না গেলে সাহায্যগ্রহণ জায়িজ হবে না। আবু বকর রা. তাঁর সন্তানদেরও ইসলামের দাওয়াত দেন এবং আল্লাহর অপার অনুগ্রহে তাঁর সন্তানগণও পিতার অনুসরণ করেন। হিজরতের সফর কাঁটামুক্ত রাখতে তিনি তাঁর পরিবারকে কাজে লাগান। তাঁরাও স্ব স্ব অবস্থান থেকে যথেষ্ট অবদান রাখেন। তিনি তাঁর সন্তানদের ওপর নিম্নোক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন:
১. আবদুল্লাহ ইবনু আবি বকরের কৃতিত্ব
তিনি শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সঠিক সংবাদ পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করেন। পিতা তাঁকে দীনের প্রতি ভালোবাসা ও সাহায্য-সহযোগিতায় বুদ্ধিদীপ্তভাবে কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে রেখেছিলেন। এ থেকে আবু বকরের দূরদর্শিতার ধারণা পাওয়া যায়। আবদুল্লাহকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, শতভাগ সাফল্যের সঙ্গে তিনি তা আদায় করেছিলেন। মক্কায় সংঘটিত প্রায় প্রতিটি সভায় উপস্থিত হয়ে নেতৃবৃন্দের কথা গভীর মনোযোগে শুনতেন। এরপর বিকেলে গুহায় গিয়ে নবিজি ও তাঁর পিতাকে এ ব্যাপারে অবহিত করতেন। দায়িত্বটি তিনি এমন সুচারুরূপে সম্পাদন করেছিলেন যে, মক্কাবাসীর কেউ ইঙ্গিতেও তা টের পায়নি। তিনি গুহার পাহারাদার হিসেবে সেখানেই রাত কাটাতেন; আবার ভোর হওয়ার আগেই মক্কায় চলে আসতেন। কেউ তাঁকে এতটুকু সন্দেহও করতে পারেনি।
২. আয়েশা ও আসমার কৃতিত্ব সঠিক দীক্ষার ফলে তাঁর উত্তম কৃতিত্ব উজ্জ্বল হয়ে সামনে আসে। হিজরতের রাতে রাসুল আবু বকরের ঘরে উপস্থিত হলে তিনি ও আসমা মিলে পাথেয় তৈরি করেন। আয়েশা বলেন, আমরা উভয়ে নবিজি ও পিতা আবু বকরের জন্য পাথেয় তৈরি করে নিই। আর আসমা এগুলো থলের ভেতর রাখেন। এরপর নিজের কোমরবন্ধ ছিঁড়ে থলের মুখ বেঁধে নেন। এ জন্য তাঁর উপাধি হয়ে যায় 'জাতুন নিতাকাইন'।
৩. গোপনীয়তা সংরক্ষণ এবং কষ্ট স্বীকারে আসমার ভূমিকা দীনি উপলব্ধি ও প্রজ্ঞার ধারক আসমা ছিলেন ইসলামের দাওয়াতি কাজের রহস্য সংরক্ষণকারিণী। এ পথে তিনি সীমাহীন কষ্ট স্বীকার করেছেন। আসমা নিজেই বলেন, নবিজি ও আবু বকর হিজরতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাওয়ার পর কুরাইশের কতিপয় ব্যক্তি আমার কাছে আসে। এদের মধ্যে আবু জাহল ইবনু হিশামও ছিল। তারা দরজায় এসে ডাক দিলে আমি দরজা খুলে দিই। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, 'তোমার পিতা কোন দিকে গেছেন?' আমি তাদের বলি 'আল্লাহর শপথ, জানি না, তিনি এখন কোথায় আছেন।' আবু জাহল ছিল নিম্নরুচির ও জঘন্যপ্রকৃতির লোক। সে হাত উঠিয়ে আমার গালে এমন এক থাপ্পড় মারে, তাতে আমার কানের দুল ছিঁড়ে যায়। এরপর তারা ফিরে যায়।
এখানে আসমা ভবিষ্যতের নারীদের জন্য এই শিক্ষা রেখে গেছেন যে, কীভাবে শত্রু থেকে মুসলমানদের গোপনীয়তা আবৃত রাখতে হয়। কীভাবে অত্যাচার ও অনাচারের মোকাবিলায় দৃঢ় পদে দাঁড়াতে হয়।
৪. ঘরে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় আসমার কৃতিত্ব আবু বকর রা. রাসুলের সঙ্গে হিজরতের উদ্দেশ্যে বেরোনোর সময় তাঁর যাবতীয় সম্পদ- পরিমাণে যা ছিল প্রায় ৫ অথবা ৬ হাজার দিরহাম-সব সঙ্গে করে নিয়ে যান। তাঁর দৃষ্টিশক্তিহীন পিতা তাঁর অবস্থা জানতেন বিধায় নাতি-নাতনিদের নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। নিশ্চিন্ত হতে ছেলের ঘরে উপস্থিত হয়ে বলেন, ‘মনে হচ্ছে আতিক সমুদয় মালসামানা তার সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। সে বোধহয় তোমাদের নিঃস্ব অবস্থায় রেখে গেছে।’ আসমা তখন কিছু পাথর একত্র করে বলেন, 'দাদু, ব্যাপার তা নয়। আপনি এগুলোর ওপর হাত দিয়ে দেখুন, তিনি আমাদের জন্য চলার মতো ব্যবস্থা রেখে গেছেন।' আবু কুহাফা তাতে হাত বুলানোর পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, 'এগুলো রেখে গিয়ে ভালো কাজ করেছে। তোমাদের জন্য এগুলো যথেষ্ট হবে বলে আশা রাখি।' আসমা বলেন, 'আল্লাহর শপথ, বাস্তবতা ছিল, পিতাজি কিছুই রেখে যাননি। আমি এভাবে কেবল বুড়ো দাদুকে সান্ত্বনা দিতে চাচ্ছিলাম।'
এমন বুদ্ধিমত্তা ও কর্মতৎপরতার মাধ্যমে আসমা আবু বকরের পিতার ওপর পর্দা ঢেলে রেখেছিলেন। তিনি তাঁর বৃদ্ধ অন্ধ দাদুকে সান্ত্বনা প্রদান করেছিলেন। আবু বকর রা. শুধু ইমানের সেই সম্পদই রেখে গিয়েছিলেন, যাকে না ভূমিকম্প নাড়াতে পারে, না ঝড় উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে; সম্পদের স্বল্পতা বা আধিক্যেও যা প্রভাবিত হওয়ার ছিল না। তিনি তাঁদের অকল্পনীয় বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুলের উত্তরাধিকারী বানিয়েছিলেন। তাঁদের ভেতরকার সাহস হয়ে উঠেছিল আকাশছোঁয়া, যারা ঊর্ধ্বারোহণকারী, সামান্য ঝাঁকুনিতে তাঁরা পড়ে যান না। এভাবেই আবু বকর মুসলিম পরিবারগুলোর সামনে এক বিরল উদাহরণ রেখে গেছেন।
আসমা তাঁর কাজের মাধ্যমে মুসলিম-নারীসমাজ এবং শিশু-কিশোরদের সামনে এমন দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, যার অনুসরণ অত্যন্ত জরুরি। আসমা তাঁর ভাইবোনদের নিয়ে মক্কায়ই বসবাস করতে থাকেন। তিনি যেমন কারও কাছে তাঁদের অভাবের কথা তুলে ধরেননি, তেমনি কাউকে বিষয়টি বুঝতেও দেননি। এরপর রাসুল • জায়েদ ইবনু হারিসা এবং স্বীয় গোলাম আবু রাফিকে তাঁর পরিজন নিয়ে মদিনায় চলে আসার জন্য দুটি উট ও ৫০০ দিরহাম দিয়ে মক্কায় পাঠিয়ে দেন। তাঁরা ফাতিমা, উম্মু কুলসুম, উম্মুল মুমিনিন সাওদা বিনতু জামআ, উসামা ইবনু জায়েদ, তাঁর মা উম্মু আয়মান এবং আবদুল্লাহ ইবনু আবি বকর ও তাঁর পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে মদিনায় রাসুলের খিদমতে পৌঁছান।
৫. আবু বকরের গোলাম আমির ইবনু ফুহায়রার কৃতিত্ব
সাধারণত অধিকাংশ মানুষ তাদের খাদিমদের ব্যাপারে গুরুত্ব প্রদান করে না; কিন্তু আল্লাহর প্রিয়পাত্ররা হয়ে থাকেন ভিন্ন চরিত্রের অধিকারী। তারা যার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন, তাঁর ব্যাপারগুলো নিয়ে সব সময় সচেতন ও চিন্তিত থাকেন। আবু বকর রা. তাঁর গোলাম আমির ইবনু ফুহায়রাকে ইলম ও আদব শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন যে, ইবনু ফুহায়রা দীনের খিদমতে নিজের প্রাণ উৎসর্গের জন্য প্রস্তুত থাকত।
হিজরতের ব্যাপারে আবু বকর তার ওপরও কিছু গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। সে মক্কার রাখালদের সঙ্গে দিনভর মাঠে বকরি চরাত। ভুলেও এদিক-ওদিক তাকাত না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে বকরিগুলো নিয়ে গুহার কাছে চলে যেত। সেখানে গিয়ে দুধেল বকরিগুলো দোহন করে তাঁদের তরতাজা দুধ পান করাত। ভোরে যখন আবদুল্লাহ রাতের পাহারা শেষে মক্কায় ফিরে আসতেন, তখন ইবনু ফুহায়রা আবদুল্লাহর পেছনে পেছনে বকরি নিয়ে তাঁর পায়ের ছাপ মুছে দিত। এভাবেই হিজরতের সফর সফল করতে সংশ্লিষ্ট সকলের ধারালো চিন্তা ও মেধার স্বাক্ষর দেখতে পাওয়া যায়।
এখানে আবু বকরের কৃতিত্ব থেকে উম্মাহ এই মহান শিক্ষা পায় যে, তারা যেন বিভিন্ন পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করা খাদিমদের প্রতি গুরুত্ব দেয়। তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করে। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা দেয়। আশা করা যায়, আল্লাহ এদের মধ্য থেকে দীনের নিরাপত্তারক্ষী বের করবেন।
আবু বকর রা. দীনের খিদমতের জন্য নিজের পরিবারকে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, তিনি সব বিষয় অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সঙ্গে সুন্দরভাবে সম্পাদন করেছিলেন। অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে ও কৌশলপূর্ণ উপায়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী সাবধানতার ওপর জোর দিতেন। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপযুক্ত জায়গায় নিযুক্ত করতেন। শঙ্কার সব পথ আগেই বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। যে কাজে যত মানুষ দরকার, তিনি ততজনই নিযুক্ত করতেন।
রাসুল তাঁর সামর্থ্যের ভেতরে থাকা প্রয়োজনীয় সামগ্রী গ্রহণ করতেন। এরপর তাঁর কাজে আল্লাহর অনুগ্রহ যোগ হতো।
পার্থিব মাধ্যম ব্যবহার করা জরুরি তথা ওয়াজিব; কিন্তু ফলাফল এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়া জরুরি নয়। ফলাফলের সম্পর্ক আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুগ্রহের সঙ্গে। এর জন্য আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখা অপরিহার্য। এটা বস্তুর পূর্ণতার অন্তর্ভুক্ত। নবিজি প্রয়োজনীয় বস্তুর সহায়তা নিতেন; কিন্তু তারপরও দুআ অব্যাহত রাখতেন, যেন আল্লাহ তাঁর প্রচেষ্টাকে সফলতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত করেন। এভাবেই তাঁর দুআ কবুল হতো এবং তিনি সফল হতেন।
টিকাঃ
১৬৭ আল-আসাসু ফিস সুন্নাহ: সায়িদ হাবি: ৩৫৭৮।
১৬৮ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ কিরাআতুন লি জাওয়ানিবিল হাজরি ওয়াল হিতা: ১৪১, সহিহ বুখারি, মানাকিবুল আনসার বাবু জিরাতিন নাবি: ৩৯০৬।
১৬৯ মুয়িনুস সিরাহ, শামি: ১৪৭।
১৭০ আল-হিজরাতু ফিল কুরআনিল কারিম: ৩৬১।
১৭১ আল-মুসতাফাদু মিন কিসাসিল কুরআন: ২/১৪৪, ১৪৫।
১৭৭ আস-সিরাতুল হালাবিয়াহ: ২/২১৩; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/১৮২।
১৯০ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/১৮৪।
১৩ আল-হিজরাতুন নাবাবিয়াহ আল-মুবারাকা: ১২৬।
১৭৫ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু হিশাম: ২/১০২। সনদ সহিহ।
১৭৬ তারিখুত তাবারি: ২/১০০; আল হিজরাতুন নাবাবিয়াতুল মুবারাকা: ১২৮।
১ তারিখুদ দাওয়া ফি আহদিল খুলাফায়ির রাশিদিন: ১১৫।
** আজওয়াউ আলাল হিজরাহ, তাওফিক মুহাম্মাদ: ৩৯৩, ৩৯৭।
১৭৯ মুয়িনুস সিরাহ: ১৪৮।
📄 আবু বকরের সামরিক দক্ষতা এবং আনন্দাশ্রু
নবিজির শিক্ষার প্রভাব সিদ্দিকের সামরিক যোগ্যতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। হিজরতের অভিপ্রায়ে নবিজির দরবারে উপস্থিত হলে তিনি যখন তাঁকে বলেন, 'তাড়াহুড়ো করো না, আল্লাহ তোমাকে সাথি দান করবেন', তখন থেকেই তিনি হিজরতের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিতে লেগে যান। দুটি কিনে লালনপালন শুরু করেন। সহিহ বুখারির বর্ণনামতে, 'চার মাস যাবৎ উট দুটিকে বাবলা পাতা খাইয়ে প্রতিপালন করছিলেন।' নবিজি তাঁকে নেতৃত্বদানের নিমিত্তে গড়ে তুলেছিলেন। আবু বকর রা. তাঁর দূরদর্শিতার মাধ্যমে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, হিজরত হবে কঠিন এবং মুহূর্তটি আচমকা উপস্থিত হবে। এ জন্য এর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে রাখেন। আপন পরিবারকে নবিজির খিদমতে সঁপে দিয়েছিলেন। এরপর রাসুল তাঁকে নিজের সঙ্গে হিজরতের সুসংবাদ শোনালে আনন্দে তিনি কেঁদে ফেলেন।
এ প্রসঙ্গে আয়েশা রা. বলেন, 'মানুষ যে আনন্দে কাঁদতে পারে, তা আমি ইতিপূর্বে জানতাম না। এটা মানুষের আনন্দের শেষ স্তর, যেখানে মানুষ আনন্দে কেঁদে বুক ভাসায়।' কবি কতই-না সুন্দর বলেছেন,
প্রিয়তমের বার্তা এসে গেছে, শীঘ্রই তিনি আমার সাক্ষাতে আসবেন।
এ সুসংবাদ শুনে আমার চোখ দুটি সজল হয়ে উঠেছে। আনন্দ আমার ওপর এতটাই উপচে পড়ছে যে, আনন্দের আতিশয্যে কেঁদে আমি বুক ভাসাচ্ছি। হে চোখ, অশ্রু ঝরানো তো তোমার অভ্যাস, আনন্দ ও বেদনা উভয় অবস্থায় তুমি অশ্রু ঝরাতে পারো।
সঙ্গদানের লক্ষ্য কী, আবু বকর তা ভালো করেই জানতেন। সম্পূর্ণ একা অবস্থায় কমপক্ষে ১৩ দিন নবিজির সঙ্গে অবস্থান করেন। জীবনটাকে তাঁর প্রিয়তম পথপ্রদর্শক ও নেতা মুহাম্মাদের কাছে উপহার হিসেবে দিয়ে দেন। জগতে এর চেয়ে বড় আর কী সফলতা থাকতে পারে যে, পুরো পৃথিবীর মানুষকে রেখে তিনিই সেই কঠিন দুঃসময়ে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব সাইয়িদুল খালকের জন্য নিজেকে নিবেদিত করতে পেরেছিলেন।
আল্লাহর ভালোবাসার বোধ তখনই স্পষ্ট হয়, যখন গুহার ভেতর আবু বকরের অন্তরে ভয় জন্ম নেয়-কী জানি শত্রু রাসুল -কে দেখে ফেলে। এখানেও কিন্তু তিনি ইসলামের দায়িদের সামনে আদর্শ রেখে গেছেন। অর্থাৎ, নেতা যখন বিপদে জড়িয়ে যাবেন, তখন অনুসারীদের জন্য যেকোনো মূল্যে তাঁকে সহায়তা দিয়ে যেতে হবে। আবু বকরের অন্তরে তখন তাঁর নিজের মারা যাওয়ার কোনো চিন্তা বা শঙ্কা ছিল না। তাঁর অস্তিত্বজুড়ে কেবল রাসুলের জীবনের নিরাপত্তা আর ইসলামের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার ব্যাপারটি কাজ করছিল। তিনি কেবল এটাই ভাবছিলেন, রাসুলের যদি কিছু একটা হয়ে যায়, তাহলে কী হবে? যদি তাঁর অন্তরে নিজের জীবনের ব্যাপারে সামান্যতম চিন্তা থাকত, তাহলে হিজরতের মতো কঠিন-বিপৎসংকুল সফরে বেরই হতেন না। তিনি তো ভালো করেই জানতেন, রাসুলের সঙ্গে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলে নিম্নতম শাস্তি হবে প্রাণদণ্ড।
হিজরতের ঘটনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে আবু বকরের শান্তি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বোধ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। যেমন: পথে একপর্যায়ে তাঁকে রাসুলের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে বলেন, 'তিনি আমার পথপ্রদর্শক। তিনি আমাকে পথ দেখান'। তৎকালের প্রথানুযায়ী প্রশ্নকর্তা বুঝে নিয়েছিল, লোকটি বোধহয় অর্থের বিনিময়ে তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সিদ্দিকের উদ্দেশ্য তো সাধারণ পথপ্রদর্শনকারী ছিল না; তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তিনি তাঁকে চিরসত্যের পথ দেখিয়ে থাকেন। এ থেকে অনুমান করা যায়, চরম বিপদের মুহূর্তেও তিনি মিথ্যা এড়িয়ে উদ্দেশ্যকে কৌশলী আঙ্গিকে উপস্থাপনে কতটা পারদর্শী ছিলেন। এখানে প্রশ্নকর্তার জবাবে কৌশলী জবাবের মাধ্যমে মূলত রাসুলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উদ্দেশ্য ছিল। কেননা, হিজরত বড় রহস্যপূর্ণভাবে সম্পাদিত হয়েছিল। তাঁর এ জবাবের দরুন রাসুল -ও তাঁকে বিরূপ কিছু বলেননি।
টিকাঃ
১৮০ আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া, ২/১৯১, ১৯২।
১৮১ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, দুরুসুন ওয়া ইবার, সিবায়ি: ৭১।
১৮২ আল-হিজরাতুন নাবাবিয়াহ আল-মুবারাকা: ২০৪।
১৮৩ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, দুরুসুন ওয়া ইবার, সিবায়ি: ৬৮।
📄 আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব এবং মানুষের সঙ্গে আচরণের নিয়ম
হিজরতের সফরের পরতে পরতে রাসুলের প্রতি সিদ্দিকের গভীর ভালোবাসার ব্যাপারটি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। অনুরূপ রাসুলের সিরাত অধ্যয়ন করলে তাঁর প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসার বিষয়টিও প্রতিভাত হয়। এই আন্তরিক মুহাব্বাত হৃদয়ের গভীর থেকেই উৎসারিত হতো। এ ছিল তাঁদের নিষ্ঠার প্রতিফলন। এর মধ্যে কোনো মুনাফিকি বা কৃত্রিমতা ছিল না। ছিল না পার্থিব স্বার্থ কিংবা কোনো প্রকার ভয়ভীতি। এর মূলে ছিল রাসুলের নেতৃত্বগুণ, যিনি মানুষকে ঘুম পাড়ানোর জন্য নিজে সজাগ থাকতেন। মানুষকে শান্তি দিতে নিজে শ্রান্ত হতেন। মানুষকে পরিতৃপ্ত করতে নিজে ক্ষুধার্ত থাকতেন। মানুষের আনন্দে আনন্দিত হতেন, দুঃখে পীড়িত হতেন। যে ব্যক্তিই নিজের সাথিদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে রাসুলের এই সুন্নাহ অনুসরণ করবে, সাথির আনন্দে আনন্দিত হবে; আর তার কাজটি হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে, সে তার সাথিদের আন্তরিক ভালোবাসা অর্জন করতে পারবে—চাই সে কেন্দ্রীয় নেতা হোক বা সাধারণ কোনো দায়িত্বশীল। কবি আল লিবি আহমাদ রফিক মাহদাবি সত্য বলেছেন,
যখন আল্লাহ তার কোনো বান্দার অন্তর পছন্দ করেন, তখন আল্লাহপ্রদত্ত যোগ্যতা তার মধ্যে প্রকাশ পায়। যখন কোনো সংস্কারবাদীর নিয়ত আল্লাহর জন্য নিবেদিত হয়, তখন অন্তরের গভীর থেকেই মানুষ তার অভিমুখী হয়।
সঠিক নেতৃত্ব সবকিছুর আগে মানুষের সঙ্গে আচরণ ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শনের যোগ্যতা নির্ণয় করে। নেতৃত্ব যত ভালো হবে, অনুসারীর আচরণ হবে তত ভালো। নেতৃত্বের পক্ষ থেকে অধীনদের প্রতি যত অনুগ্রহ থাকবে, নেতৃত্বের প্রতি অধীনদের ভালোবাসা হবে তত বেশি। রাসুল তাঁর অনুসারী ও সেনাদলের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত হিজরত করেননি, যতক্ষণ-না তাঁর অধিকাংশ অনুসারী হিজরত করেছিলেন। নবি যখন হিজরত করেন, তখন কেবল দুর্বল লোকজন—যাঁদের হিজরত করতে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল—থেকে গিয়েছিলেন।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, নবির সঙ্গে আবু বকরের যে ভালোবাসা ছিল, তা ছিল কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে। আবু তালিবও কিন্তু রাসুল-কে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন; কিন্তু তাঁর ও আবু বকরের ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্যর ধরন ছিল—আবু তালিবের ভালোবাসা ছিল আত্মীয়তার নিরিখে; আর আবু বকরের ভালোবাসা ছিল নিরেট আল্লাহর জন্য। এ জন্যই আবু বকরের ভালোবাসা হয়েছিল সফল এবং আবু তালিবের ভালোবাসা হয়েছিল ব্যর্থ। এই আয়াত তো তাদের শানেই নাজিল হয়েছিল,
আর তা থেকে দূরে রাখা হবে পরম মুত্তাকিকে, যে নিজের সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির জন্য এবং তার প্রতি কারও অনুগ্রহের প্রতিদানে নয়, কেবল তার মহান পালনকর্তার সন্তুষ্টির প্রত্যাশায়; সে তো অচিরেই প্রশান্তি লাভ করবে। [সুরা লাইল: ১৭-২১]
আবু তালিবের ভালোবাসা তার নিজের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনেনি; বরং প্রবল ভালোবাসা থাকার পরও তিনি হয়েছিলেন জাহান্নামি। যেহেতু তিনি ছিলেন মুশরিক। তার কাজকর্ম ছিল গায়রুল্লাহর জন্য। আবু বকর রা. সৃষ্টির কাছে কোনো কিছু চাইতেন না। এমনকি রাসুলের কাছেও না। তিনি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যেই রাসুলের ওপর ইমান এনেছিলেন। তাঁকে ভালোবেসেছিলেন, সহায়তা দিয়েছিলেন। তিনি প্রতিদান চাইতেন কেবল আল্লাহর কাছে। এ লক্ষ্যেই তিনি আল্লাহর ওয়াদা ও ভীতির কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন।
টিকাঃ
*আল-হিজরাতুন নাবাবিয়াহ, আবু ফারিস: ৫৪।
**আল-হারকাতুস সানুসিয়াহ, সাল্লাবি: ২/৭১।
***আল-হিজরাতুন নাবাবিয়াহ আল-মুবারাকা: ২০৫।
১৮৭ মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ১১/২৮৬।