📄 প্রথম হিজরত এবং ইয়াহুদি যাজনায় অবস্থান
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. বর্ণনা করেন; আমি চোখ খুলে পিতাকে ইসলামে অটল দেখতে পাই। নবিজি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা আমাদের বাড়ি আসতেন। যখন মুসলমানদের ওপর বিপর্যয়কাল অতিক্রান্ত হচ্ছিল, তখন পিতাজি হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে 'বারকুল গিমাদ' পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন। সেখানে কারাহ গোত্রের সরদার ইবনুদ দাগানার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।
ইবনুদ দাগানা তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'আবু বকর, কোথায় যাচ্ছেন?' পিতা জি বলেন, 'আমার জাতি আমাকে নিরুদ্দেশ হতে বাধ্য করেছে। আমি চাই বিশ্বব্যাপী পরিভ্রমণ করব এবং স্বাধীনভাবে আপন রবের ইবাদত করব।' ইবনুদ দাগানা বলেন, 'আবু বকর, আপনার মতো মানুষকে এখান থেকে যেতে দেওয়া যায় না। আপনি তো অভাবীদের সাহায্য করেন। আত্মীয়দের খেয়াল রাখেন। মানুষের ঋণভার নিজের কাঁধে তুলে নেন। মেহমানদের আতিথেয়তা করান। বিপদগ্রস্তদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। আমি আপনাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি। চলুন, আপনি আপনার শহরে থেকে আপন প্রতিপালকের ইবাদত করবেন।'
আবু বকর তখন ইবনুদ দাগানার সঙ্গে আবার মক্কায় ফিরে আসেন। বিকেলে ইবনুদ দাগানা কুরাইশের নেতৃবর্গের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তাদের বলেন, 'আবু বকরের মতো বিরল গুণধর ব্যক্তি এখান থেকে চলে যেতে পারেন না। তাঁকে চলে যেতে বাধ্য করা ঠিক হচ্ছে না। তোমরা কি এমন ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দিচ্ছ, যিনি অভাবীদের সাহায্য করেন? আত্মীয়স্বজনের খেয়াল রাখেন? অন্যের ঋণভার নিজের কাঁধে উঠিয়ে নেন? বিপদগ্রস্তদের সর্বস্ব দিয়ে সহায়তা করেন?'
কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ইবনুদ দাগানার কোনো কথাই অস্বীকার করতে পারেনি। তারা বলে, 'ঠিক আছে; তবে তাঁকে বলেন, তিনি যেন তাঁর ঘরের ভেতর ইবাদত-বন্দেগি, সালাত আদায় ও কুরআন তিলাওয়াত করেন। তাঁর ইবাদত ও তিলাওয়াত যেন আমাদের সমস্যায় না ফেলে। সকলের সামনে প্রকাশ্যে যেন ইসলামের দাওয়াত দিয়ে না বেড়ান। কারণ, আমরা আমাদের নারী ও যুবকদের বিভ্রান্ত হয়ে পড়ার ভয় করছি।'
ইবনুদ দাগানা কুরাইশ নেতৃবৃন্দের এ কথাগুলো আবু বকরের কাছে পৌঁছে দেন। আবু বকর তখন নিজের ঘরেই ইবাদত করতে থাকেন। কিছু দিন পর তিনি একটি কৌশল অবলম্বন করেন। সেটি হচ্ছে, ঘরের আঙিনায় একটি মসজিদ বানিয়ে নেন। সেখানেই সালাত ও কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি তিলাওয়াত শুরু করলে কুরাইশের নারী ও যুবকরা সেখানে ভিড় জমাত। তাদের কাছে তা অস্বাভাবিক আকর্ষণীয় লাগত। তারা কান পেতে শুনত। আবু বকর ছিলেন স্বভাবজাত নম্র। তিলাওয়াত শুরু করলে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে কান্না শুরু করে দিতেন। এতে তিলাওয়াতের প্রভাব আরও বেড়ে যেত।
কুরাইশ নেতৃবৃন্দ এ অবস্থা দেখে ভীত হয়ে ওঠে। তারা ইবনুদ দাগানাকে ডেকে পাঠায়। তিনি এলে তাকে বলে, 'আমরা আপনার কারণে আবু বকরকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। শর্ত ছিল তিনি ঘরে সালাত পড়বেন, সেখানেই কুরআন তিলাওয়াত করবেন; কিন্তু তিনি শর্ত লঙ্ঘন করে ঘরের আঙিনায় একটি মসজিদ নির্মাণ করে নিয়েছেন। সেখানে প্রকাশ্যে সালাত পড়েন, কুরআন তিলাওয়াত করেন। আমরা আশঙ্কা করছি, তাঁর কারণে আমাদের নারী ও যুবকরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। আপনি তাকে বলুন, তিনি যেন পূর্বশর্ত অনুযায়ী ঘরের ভেতরে সালাত পড়েন ও তিলাওয়াত করেন। নয়তো আপনি আপনার নিরাপত্তার জিম্মাদারি উঠিয়ে নেন। আমরা আপনাকে লজ্জা দিতে চাই না। আবু বকরকে আমরা এভাবে চলতে দিতে পারি না।'
ইবনুদ দাগানা আবু বকরের কাছে এসে বলেন, 'আমার এবং আপনার মধ্যে যে কথা হয়েছিল, আশা করি সেটা আপনার স্মরণ আছে। অতএব হয় আপনি আগের সিদ্ধান্তের ওপর চলুন, নতুবা আমার জিম্মা আমার কাছে ফিরিয়ে দেন। আমি চাই না আরবরা বলাবলি করুক; ইবনুদ দাগানা একজনকে আশ্রয় দিয়েছিল; কিন্তু সে তার শর্ত লঙ্ঘন করেছে।'
উত্তরে আবু বকর বলেন, 'ঠিক আছে, আমি আপনার জিম্মা আপনার হাতে ফিরিয়ে দিলাম। আমি আল্লাহর জিম্মার ওপরই সন্তুষ্ট।'
ইবনুদ দাগানার জিম্মা থেকে মুক্ত হওয়ার পর একদিন তিনি কাবাপ্রাঙ্গণে যাওয়ার সময় কুরাইশের এক নির্বোধ ব্যক্তির মুখোমুখি হন। সে তাঁর এই পেরেশানির অবস্থার সুযোগ নিয়ে তাঁর মাথায় মাটি ঢেলে দেয়। তখন তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন ওয়ালিদ ইবনু মুগিরা কিংবা আস ইবনু ওয়ায়িল। তিনি তাকে বলেন, 'দেখুন, এই নির্বোধটা আমার সঙ্গে কী আচরণ করছে?' সে জবাবে বলে, 'তুমি তো নিজেই নিজের ওপর অত্যাচার করেছ।' আবু বকর তখন এ কথা বলে চলে যেতে থাকেন— 'আমার রব, তুমি কতই-না ধৈর্যশীল। আমার রব, তুমি কতই-না ধৈর্যশীল। আমার রব, তুমি কতই-না ধৈর্যশীল।'
শিক্ষা ও তাৎপর্য এ ঘটনার মধ্যে অনেকগুলো শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছ। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: ১. নবিজির আবির্ভাবের পূর্বে সমাজে তাঁর মর্যাদার আসন অনেক উপরে ছিল। মানুষের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন অনেক বিপুল সম্মানের অধিকারী।
ইবনুদ দাগানার মতো গোত্রপতি এই সাক্ষ্য দিতে বাধ্য ছিলেন যে, 'আপনার মতো মহান মানুষ এখান থেকে এভাবে যেতে পারেন না। আপনার মতো মানুষকে যেতে দেওয়া উচিত হবে না। আপনি অসহায়দের সহায়তা করেন। আত্মীয়স্বজনের খেয়াল রাখেন। অন্যের ঋণভার নিজের কাঁধে উঠিয়ে নেন। আতিথ্যেও আপনি অতুলনীয়। বিপদগ্রস্তদের সাহায্যে আপনি সতত তৎপর থাকেন।'
ইবনুদ দাগানার কথা থেকে স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়, আবু বকর কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসায় ইসলামগ্রহণ করেছিলেন। সম্মান কিংবা প্রতিপত্তি অর্জন তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। আল্লাহর সন্তুষ্টিই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য, যে কারণে তাঁকে অসংখ্য বিপদ মোকাবিলা করতে হয়েছে। আল্লাহর জন্য পরিবার- পরিজন এবং জন্মভূমিকে তাঁর বিদায় জানাতে হয়েছে। কেননা, মাতৃভূমিতে তাঁকে স্বাধীনভাবে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিরত রাখা হচ্ছিল।
২. দাওয়াতি জীবনে তাঁর একমাত্র পাথেয় ছিল কুরআনুল কারিম। এই জন্য কুরআন মুখস্থ করা, উপলব্ধি করা, এর ফিকহ অনুধাবন এবং তদনুযায়ী আমল করার প্রতি মনোযোগ দেন। কুরআনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই তিনি দাওয়াতি কাজে দক্ষতা, পদ্ধতিতে চমৎকারিত্ব, চিন্তায় গভীরতা, আলোচ্যবিষয় উপস্থাপনে বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাবাহিকতা, শ্রোতাকে মনোযোগী ও বিমোহিত করে তোলার যোগ্যতা, উপস্থাপনাকে দলিল- প্রমাণের সহযোগে দৃঢ়ীকরণের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে নিয়েছিলেন।
কুরআন তিলাওয়াতের সময় তিনি অনেকটা আত্মহারা হয়ে পড়তেন। খুব কান্নাকাটি করতেন। এ থেকে তাঁর বিশ্বাসের দৃঢ়তা, আল্লাহর প্রতি একাগ্রতার প্রমাণ পাওয়া যায়। বেশি চিন্তা অথবা গভীর আনন্দ থেকে কান্নার ক্ষমতা তৈরি হয়ে থাকে। প্রকৃত মুমিন সিরাতুল মুসতাকিমের দিকে আল্লাহর দেওয়া হিদায়াত পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হয়। অপরদিকে এ থেকে সামান্য বিচ্যুতির কারণে ভয়ে কেঁপে ওঠে। আর সে যদি হয় আবু বকরের মতো জীবন্ত, তীব্র অনুভূতিপ্রবণ ও জাগ্রত চেতনাধারী, তখন কুরআন ওই ব্যক্তিকে পরকালের জীবন এবং সেখানে সংঘটিতব্য হিসাব- কিতাব, শাস্তি ও সাওয়াবের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে, যার প্রতিক্রিয়ায় তার শরীরে কম্পন শুরু হবে। চক্ষুযুগল সজল হয়ে উঠবে। আর দৃশ্যটি প্রত্যক্ষকারীদের মধ্যেও এ মানসিকতা সংক্রমিত হয়ে পড়বে। এ কারনেই মুশরিকরা আবু বকরের এই অবস্থাকে ভীষণ ভয় করত। তাদের মনে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শঙ্কা কাজ করত; কী জানি ওরা প্রভাবিত হয়ে ইসলামগ্রহণ করে নেয়।
রাসুলের তত্ত্বাবধানে তাঁর দীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি কুরআন মুখস্থ করে নিয়েছিলেন। নিজের জীবনে কুরআনকে পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়িত করেছিলেন। এ নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করেছেন। তিনি ইলম ছাড়া কোনো কথা বলতেন না। একবার তাঁকে একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, যা তাঁর জানা ছিল না, তখন প্রতি-উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘কোন জমিন আমাকে জায়গা দেবে, কোন আকাশ আমাকে ছায়া দেবে, যখন আমি আল্লাহর কালাম সম্পর্কে এমন কথা বলব, যা আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়!’
কুরআন নিয়ে তাঁর চিন্তা-গবেষণা কেমন ছিল, তা তাঁর এ কথা থেকেই স্পষ্ট অনুমান করা যায়—‘আল্লাহ যখন জান্নাতবাসীর আলোচনা করেছেন, তখন তাদের সৎকর্মের কথাও আলোচনা করেছেন। তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। বান্দা বলে, আমরা এমন লোকদের মধ্যে কীভাবে গণ্য হতে পারি? তখন বক্তা বলেন, আমি তো তাদের মধ্য থেকে নই; অথচ তিনি ওদের মধ্যে গণ্য।
কুরআনের যে আয়াত সম্পর্কে তাঁর খটকা লাগত, অত্যন্ত বিনয় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে রাসুলের কাছে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে নিতেন। যখন কুরআনের আয়াত— ‘তোমাদের ও কিতাবিদের খেয়ালখুশিমতো কাজ হবে না। কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে পাবে এবং আল্লাহ ব্যতীত তার জন্য কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।’ [সুরা নিসা: ১২৩] অবতীর্ণ হয়, তখন আবু বকর রাসুলকে বলেন, ‘এ আয়াত তো কোমর ভেঙে দেওয়ার মতো। আমাদের মধ্যে তো এমন কেউ নেই, যে গুনাহের কাজ করে না।’ নবিজি তখন তাঁকে বলেন, ‘আবু বকর, তুমি কি কষ্টে নিপতিত হও না? তোমাকে কি চিন্তা ও মর্মযাতনায় পেয়ে বসে না? তুমি কি কষ্টকর পরিস্থিতির শিকার হও না? এভাবেই তুমি সাজা ভোগ করে থাকো।’
আবু বকর কুরআনের অনেক আয়াতের ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছেন। যেমন:
যারা বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, এরপর অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা এসে বলে, তোমরা ভীত ও চিন্তিত হয়ো না এবং যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছিল, তার জন্য আনন্দিত হও। [সুরা হা-মিম সাজদা: ৩০]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আবু বকর রা. বলেন, ইমান থেকে তারা তাদের মস্তক ডান-বাম কোনো দিকে সরায়নি। মনে মনেও গায়রুল্লাহর অভিমুখী হয়নি-না ভালোবাসার সঙ্গে, না ভয়ের সঙ্গে। না আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে, না প্রশ্ন কিংবা নির্ভরতার মাধ্যমে; বরং তারা আল্লাহকেই ভালোবাসে। এ যেমন পার্থিব কোনো উপকারের জন্য নয়, তেমনই কোনো ক্ষতি দূর করার জন্যও নয়। যে-ই হোক না কেন, আল্লাহ ছাড়া তারা কাউকে ভয় করে না। তিনি ছাড়া কারও সামনে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে না, অন্তর থেকেও তিনি ছাড়া অন্য কারও দিকে ধাবিত হয় না। এভাবে আরও কিছু আয়াতের ব্যাখ্যা তাঁর থেকে বর্ণিত আছে।
আলিম ও দায়িদের সর্বক্ষণ কুরআনের সাহচর্যে থাকা দরকার। সর্বদা কুরআন তিলাওয়াত করা, কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা, কুরআনের জ্ঞান, শিক্ষা, হিকমাহ ও সূক্ষ্ম সব বিষয় বের করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা উচিত। কুরআনের মধ্যে ইলমি, শরয়ি ও বর্ণনাগত যত অলৌকিকত্ব রয়েছে, তা তুলে ধরাসহ যুদ্ধ ও বিপদে জড়িত মানুষের জন্য আল্লাহ তাঁর কিতাবে যে রাস্তা বলে দিয়েছেন, তা সমকালের উপযোগী করে উপস্থাপন করা, অনুরূপ সমকালের উন্নত মাধ্যমগুলো ধারণ করে দাওয়াতের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার। আবু বকর এ বিষয়টি জানতেন যে, কুরাইশের সামনে কুরআনের তিলাওয়াত আল্লাহর দিকে দাওয়াতের ভূমিকা পালন করে।
টিকাঃ
১২০ ফাতহুল বারি: ৭/২৭৪।
১২১ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৯৫।
১২২ ইসতিখলাফ আবি বাকরিনিস সিদ্দিক রা.: ১৩৪।
১২৩ তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম ফি আহদিল খুলাফায়ির রাশিদিন: ৮৮।
১২৪ আত-তারিখুল ইসলামি: হুমায়দি: ১৯, ২০/২০৯।
১২৫ তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি: ১১৭। এই বর্ণনার মধ্যে সনদের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন।
১২৬ আল-ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়া: ৬/২১২।
১২৭ মুসনাদু আহমাদ: ১/১১ আল্লামা আহমাদ শাকির রাহ. বলেন, এই বর্ণনার সব সনদ দুর্বল। তবে অধিক সমর্থন থাকায় সহিহের পর্যায়ভুক্ত হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। দেখুন মুসনাদু আহমাদ : ৬৮।
১২৮ মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৮/২২।
১২৯ তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম ফি আহদিল খুলাফায়ির রাশিদিন: ৯৫।
📄 বাজারে আরব গোত্রসমূহের কাছে দাওয়াত কার্যক্রম
আমরা আগেই জেনেছি যে, আবু বকর ছিলেন কুলপঞ্জি বা বংশপরিক্রমা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ। এই শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞান ছিল অগাধ। আল্লামা সুয়ুতি বলেন, আমি ইমাম জাহাবির হাতে লেখা পান্ডুলিপি দেখেছি, তিনি তাতে এই শাস্ত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কথা উল্লেখপূর্বক লিখেছেন, 'আবু বকর রা. কুলপঞ্জিশাস্ত্রে ছিলেন বিরল যোগ্যতার অধিকারী। '
আবু বকর সিদ্দিক ওই শাস্ত্রে তাঁর অভিজ্ঞতাকে ইসলামের দাওয়াতি কাজে ব্যবহার করছিলেন, যাতে প্রত্যেক শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি বুঝতে পারে-চিন্তা, পেশা কিংবা অভিজ্ঞতাজাত যেকোনো প্রকারের ইলম হোক না কেন-কীভাবে তারা সেসব জ্ঞান ও শাস্ত্রকে দাওয়াতি কাজে ব্যবহার করবে।
শীঘ্রই আমরা দেখতে পাব, নবিজি আরব গোত্রগুলোর সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতে গেলে তিনি কী দক্ষতায় এ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বিশুদ্ধভাষী বক্তা। মানুষের কাছে তাঁর উদ্দেশ্যপূর্ণ কথাগুলো গুছিয়ে সুন্দর আঙ্গিকে উপস্থাপনের বিরল যোগ্যতা রাখতেন। নবিজির উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতিতে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দিতেন। নবিজি হজের মৌসুমে দাওয়াতের উদ্দেশ্যে বের হলে তিনিই তাঁর আগে সূচনাবক্তব্য দেন। মানুষ যাতে নবিজির কথা কান লাগিয়ে শুনে, এ জন্য প্রাঞ্জল ভাষায় বক্তৃতার মাধ্যমে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলেন। কুলপঞ্জির জ্ঞান থাকায় কোন গোত্রের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হয়, তা তাঁর ভালো জানা ছিল।
আলি রা. থেকে বর্ণিত; যখন রাসুল ‘আপনি নিজেকে আরব গোত্রগুলোর সাহায্য-সহায়তালাভের জন্য পেশ করুন’ মর্মে প্রত্যাদিষ্ট হন, তখন আবু বকরকে সঙ্গে নিয়ে বের হন। আমিও তাঁদের সঙ্গে ছিলাম। আমরা তখন বেশ গাম্ভীর্যপূর্ণ ও শান্ত একটি জনসমাবেশের পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলাম। আবু বকর তাদের সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনারা কারা?' তারা বলেন, 'আমরা শায়বান ইবনু সালাবার লোক।' আবু বকর তখন রাসুলের দিকে মনোযোগী হয়ে বলেন, 'আমার মাতা-পিতা আপনার ওপর উৎসর্গ হোন, এরা খুবই ভদ্র।'
উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন মাফরুক ইবনু আমর, হানি ইবনু কাবিসা, মুসান্না ইবনুল হারিসা এবং নুমান ইবনু শারিকের মতো শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এদের মধ্যে মাফরুক ছিলেন ভাষার বিশুদ্ধতা ও সৌন্দর্যে সবার শীর্ষে। তার চুলগুলো দুভাগ হয়ে একেবারে সিনায় এসে ঠেকেছিল। তিনি তখন আবু বকরের একেবারে কাছে ছিলেন। আবু বকর তাদের জিজ্ঞেস করেন, 'আপনারা কতজন?' মাফরুক বলেন, 'হাজারের অধিক; আর হাজারসংখ্যককে অল্প মনে হলেও পরাজিত হয় না!'
আবু বকর পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, 'আপনাদের প্রতিরোধব্যবস্থা কেমন?' মাফরুক বলেন, 'আমরা শত্রুর মুখোমুখি হলে খুবই ক্রোধান্বিত হয়ে উঠি। এরপর যুদ্ধে জড়িয়ে যাই। ঘোড়াগুলোকে সন্তানের চেয়ে এবং অস্ত্রগুলোকে দুধদানকারী উটের চেয়ে বেশি ভালোবাসি। যুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করি। আল্লাহ কখনো শত্রুর ওপর আমাদের; আবার কখনো শত্রুকে আমাদের ওপর বিজয় দান করেন। আপনারা সম্ভবত কুরাইশি?' আবু বকর বলেন, 'আপনারা যদি আল্লাহর রাসুলের কথা শুনে থাকেন, তাহলে তিনিই আল্লাহর রাসুল!'
মাফবুক তখন রাসুলের দিকে মনোযোগী হয়ে বলেন, 'হে কুরাইশি ভাই, আপনি আমাদের কীসের দাওয়াত দেবেন?' রাসুল বলেন, 'আমি তোমাদের এ কথার দিকে দাওয়াত দিই যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই; আর আমি আল্লাহর বান্দা এবং রাসুল। তোমাদের কাছে আমাদের আবেদন হচ্ছে, তোমরা আমাদের আশ্রয় দেবে এবং সাহায্য করবে। কেননা, কুরাইশরা আল্লাহর দীনের শত্রুতায় কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। তারা তাঁর রাসুলকে মিথ্যা প্রতিপাদন করছে। বাতিলের সঙ্গে মিলে হক থেকে বিমুখ রয়েছে; অথচ আল্লাহই অমুখাপেক্ষী এবং প্রশংসার যোগ্য।' মাফরুক বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আপনি সুন্দর কথাই শুনিয়েছেন। বলুন, আপনি আর কীসের দাওয়াত দিতে চান?'
রাসুল তখন তিলাওয়াত করেন, قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَ بِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ مِّنْ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ذُلِكُمْ وَضَّكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ)
বলো, এসো, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা পড়ে শোনাই। তা এই, তোমরা তাঁর কোনো অংশীদার স্থির করবে না, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না। আমিই তোমাদের ও তাদের জীবিকা দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে, অশ্লীল কাজের ধার ঘেঁষবে না। আল্লাহ যে প্রাণের হত্যা হারাম করেছেন, তা ন্যায়সংগত কারণ ছাড়া হত্যা করবে না। তোমাদের তিনি এই নির্দেশ দেন, যেন তোমরা অনুধাবন করো। [সুরা আনআম: ১৫১]
আয়াতটি শুনে মাফবুক বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আপনি উত্তম চরিত্র এবং শ্রেষ্ঠতম কাজের দিকে দাওয়াত দিচ্ছেন। যারা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপাদন করছে, নিঃসন্দেহে তারা বোকা।' এরপর হানি ইবনু কাবিসাকে সুযোগ দিয়ে বলেন, 'তিনি আমাদের শায়খ এবং ধর্মীয় নেতা।' হানি বলেন, 'হে কুরাইশি ভাই, আমি আপনার কথা শুনেছি। আমার ধারণা, মাত্র একটি বৈঠকেই আমাদের দীন ছেড়ে আপনাদের দীন গ্রহণ করা হবে আমাদের সিদ্ধান্তের দুর্বলতা এবং সংকীর্ণ জ্ঞানের পরিচায়ক। তাড়াহুড়োর মধ্যে ভুল হয়ে থাকে। আমরা চাই না, যারা আমাদের পেছনে আছে, তাদের রেখে কোনো অঙ্গীকারে আবদ্ধ হই। আসুন, আমরা উভয়পক্ষ এ ব্যাপারে আরও চিন্তাভাবনা করি।'
এরপর তিনি মুসান্না ইবনুল হারিসাকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে বলেন, 'এ হচ্ছে মুসান্না ইবনুল হারিসা। আমাদের শায়খ এবং সামরিক নেতা।' তখন মুসান্না বলেন, (পরবর্তী সময়ে তিনি ইসলামগ্রহণ করেছিলেন) 'হে কুরাইশি ভাইয়েরা, আপনাদের কথা শুনেছি। এ ব্যাপারে আমি হানি ইবনু কাবিসার সঙ্গে একমত। আমরা দুটি সীমান্তে বসবাস করছি। একটি ইয়ামামা, অপরটি সুমামা।' রাসুল জিজ্ঞেস করেন, 'দুটি সীমান্ত দ্বারা উদ্দেশ্য কী?' তিনি বলেন, 'আমরা আরব ও পারস্যবাসীদের প্রতিবেশী এবং তাদের সঙ্গে এই ব্যাপারে অঙ্গীকারে আবদ্ধ যে, আমাদের ভূখণ্ডে আমরা কোনো নতুন মতবাদের প্রশ্রয় দেবো না। আপনি যেদিকে আহ্বান করছেন, সম্ভবত তারা এটা ভালোভাবে নেবে না। আরবের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে হলে ব্যাপারটি কিছুটা হালকাভাবে নিতে পারে; কিন্তু পারস্য-সীমান্তে হলে তারা সেটা হালকাভাবে নেবে না। আপনি যদি আরবের সীমান্ত-এলাকায় আমাদের সাহায্য চেয়ে থাকেন, তাহলে আমরা সেটা মেনে নিতে রাজি।'
নবিজি তখন বলেন, 'আপনারা সত্য কথাটি স্পষ্টভাবে বলে দিয়ে ভালো কাজ করেছেন। আল্লাহর দীনকে তারাই সাহায্য করতে পারে, যারা সর্বাবস্থায় এর সঙ্গ দেবে। আপনারা কী বলেন, যদি অল্প কিছুদিনের ভেতর আল্লাহ তাদের ভূখণ্ড আপনাদের দিয়ে দেন, তাদের দেশ, সম্পদ এবং স্ত্রী-সন্তান আপনাদের হাতে চলে আসে, তখন কি আপনারা আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করবেন?' এ কথা শুনে নুমান ইবনু শারিক বলেন, 'আমরা এর জন্য প্রস্তুত আছি।'
শিক্ষা ও তাৎপর্য
এই ঘটনার মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো শিক্ষা ও উপদেশ:
১. সিদ্দিক রা. সর্বক্ষণ রাসুলের খিদমতে থাকতেন বিধায় ইসলামকে তিনি সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পেরেছিলেন। আল্লাহ তাআলা সাহাবিদের মধ্যে তাঁকে সবচেয়ে বেশি ইলম দান করেছিলেন। তিনি সরাসরি নবিজির কাছ থেকে ইসলামের বাস্তবতা ও গভীরতার জ্ঞান লাভ করেছিলেন। দাওয়াতের বাস্তবতা এবং পরিস্থিতি আত্মস্থ করেছিলেন। এর বিভিন্ন স্তর পাড়ি দিয়েছিলেন। সরাসরি নবিজি থেকে শিক্ষার বদৌলতে রাব্বানি নীতি ও আদর্শ তাঁর ভেতরে প্রবিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এর আলোকে তিনি জীবন ও সৃষ্টিজগতের অস্তিত্বের মধ্যকার গূঢ় রহস্য সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন। শিখে নিয়েছিলেন জীবনের পর মৃত্যু, বিচারদিবসের বাস্তবতা এবং তাকদিরের মূল অবস্থা। বুঝে নিয়েছিলেন আদম ও ইবলিসের ঘটনার সারমর্ম। আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন হক-বাতিল, হিদায়াত ও ভ্রষ্টতা এবং ইমান ও কুফরের মধ্যকার দ্বন্দ্বের স্বরূপ। ইবাদত, রাতজাগা, আল্লাহর জিকির এবং কুরআনের তিলাওয়াত তাঁর কাছে খুব পছন্দনীয় হয়ে উঠেছিল, যার মাধ্যমে তাঁর চরিত্রও হয়েছিল উন্নত। অন্তর হয়েছিল যাবতীয় পঙ্কিলতামুক্ত।
২. আরবের বিভিন্ন গোত্রে দাওয়াত প্রদানকালে নবিজির সঙ্গদান থেকে আবু বকর রা. অনেক উপকৃত হয়েছিলেন। দাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসুলের সঙ্গদান থেকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হবে, তারা অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে এমন কোনো অঙ্গীকারে আবদ্ধ থাকতে পারবে না, যা ইসলামের দাওয়াতের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারে। যে অঙ্গীকারে আবদ্ধ থাকার কারণে তারা স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কেননা, এমতাবস্থায় তাদের হাতে যদি ইসলামি দাওয়াতের দায়িত্বভার ন্যস্ত করা হয়, তাহলে এটা দাওয়াতের জন্য উপকারী না হয়ে বরং অপকারী হবে। যেসব দেশের সঙ্গে তাদের অঙ্গীকার রয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে ইসলামের দাওয়াতকে ধ্বংস করে দেওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। এসব রাষ্ট্র ইসলামি দাওয়াতকে তাদের জন্য আশঙ্কাজনক এবং তাদের স্বার্থের পরিপন্থি ও চ্যালেঞ্জ মনে করবে।
শর্তযুক্ত সহায়তার মাধ্যমে কখনো উদ্দেশ্য হাসিল হয় না। কেননা, এমতাবস্থায় কিসরা যদি রাসুল-কে গ্রেপ্তার করতে চাইত: কিংবা রাসুল এবং মুসলমানদের ওপর হামলা করতে চাইত, তাহলে বনু শায়বানের লোকেরা রাসুলের সহায়তায় কিসরার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারত না। তাই এই আলাপ-আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
৩. মুসান্না ইবনুল হারিসা নবিজিকে শর্তযুক্ত সহায়তার প্রস্তাব দিলে নবিজি তাকে বলেছিলেন, 'আল্লাহর দীনের সহায়তা কেবল সে-ই করতে পারে, যে সর্বাবস্থায় ইসলামের সঙ্গ দেবে।' এটি ছিল নবিজির দূরদর্শিতা এবং সিদ্ধান্তের চরম উৎকর্ষের দলিল।
৪. বনু শায়বানের অবস্থানের মাধ্যমে তাদের বীরত্ব, প্রশংসিত চরিত্র, উত্তম আচরণের পরিচয় ফুটে উঠেছিল। নবিজির কথা থেকে বোঝা যায়, তারা কোনো প্রকার লুকোচুরি না করে অন্তরের কথাটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিল। এর মধ্যে কোনো ধরনের অভিসন্ধি ছিল না। তারা নবিজিকে যে পরিমাণ সহায়তা দিতে পারবে, কেবল সেটুকুই বলেছিল। এতৎসঙ্গে বলেছিল, পারস্যের নেতৃবর্গ ইসলামের দাওয়াতকে খারাপ চোখে দেখতে পারে। এর ১০ বছর পর আল্লাহ যখন তাদের অন্তরে ইমান ঢেলে দেন, তখন তারা পারস্যের বাদশাহ এবং নেতাদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে। তাদের জাতীয় বীর মুসান্না ইবনুল হারিসা আবু বকরের খিলাফতকালে ইসলামি বিজয়ধারার এক মহান বিজেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তাঁর জাতি ইসলামগ্রহণের পর তিনি তাদের নিয়ে পারস্যবিরোধী যুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। তাঁরা সেই পরাশক্তিকে নাকানিচুবানি খাওয়ান; অথচ কিছুদিন আগেও তাঁরা ছিলেন জাহিলিয়াতের অন্ধকারে। তখন, ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কল্পনা করবেন দূরে থাক; নাম শুনলেই কেঁপে উঠতেন। এমনকি নবিজির দাওয়াতের বাস্তবতা ও কল্যাণ উপলব্ধির পরও পারস্যের ভয়ে তাঁরা পেছনে সরে গিয়েছিলেন। ভয় ছিল, কী জানি পারস্যবাসীর রোষের শিকার হতে হয়; কিন্তু ইসলামগ্রহণের পর সেই ভীতু বনু শায়বানিদের হাতে পরাশক্তি পারস্য মারাত্মকভাবে পর্যুদস্ত হয়। তারা দুনিয়াবি নেতৃত্ব ও সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি পরকালীন নিয়ামত দ্বারা ধন্য হন। এর দ্বারাই ইসলামের বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়।
টিকাঃ
১৩০ তারিখুল খুলাফা, ১০০; সূত্রসহ তারিখুদ দাওয়া: ৯৫।
১০১ তারিখুদ দাওয়া: ৯৬।
১০২ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, মুহাম্মাদ আবদুল রহমান কাসিম: ৯২।
১০০ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/১৪২, ১৪৩-১৪৫; এর মধ্যে কিছু অতিরিক্ত কথা রয়েছে, যা সালিহির সাবিলুর রাশাদ গ্রন্থে নেই।: ২/৫৯৬, ৫৯৭।
১০৪ আল-জিহাদু ওয়াল কিতালু ফিস সিয়াসাতিশ শারয়িয়াহ, মুহাম্মাদ হায়কাল: ১/৪১২।
১০০ আত-তাহালুফুস সিয়াসি ফিল ইসলাম, মুনির আল-গাজবান: ৫৩।
১০৬ আত-তাহালুফুস সিয়াসি ফিল ইসলাম, মুনির আল-গাজবান: ৬৪।
১০১ আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৩/৬৯; আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ২/২০।