📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 ইসলাম

📄 ইসলাম


আবু বকরের ইসলাম ছিল সত্য অন্বেষার দীর্ঘ সফরের সুমহান প্রাপ্তি। শুরু থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল সত্যের অন্বেষা। এ ছিল তাঁর বিশুদ্ধ স্বভাব, দূরদর্শিতা এবং গভীর প্রজ্ঞার পরিচায়ক। ব্যবসায়ী হওয়ায় তাঁকে প্রচুর সফর করতে হতো। আরব উপদ্বীপের অধিকাংশ শহর, বস্তি ও মরুভূমি ছিল তাঁর সফরসমূহের সাক্ষী। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিমে নিরন্তর সফর করতেন। বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী, বিশেষ করে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী যারা একত্ববাদের পতাকা উঁচিয়ে সত্য দীনের অনুসন্ধান করত, তাদের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর সখ্য। তাদের কথা তিনি গভীর মনোযোগে শুনতেন।
তিনি বলেন, একবার আমি কাবার আঙিনায় বসা ছিলাম। পাশে ছিলেন জায়েদ ইবনু আমর ইবনু নুফায়েল। আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন উমাইয়া ইবনু আবিস সালত। তিনি আমাদের বলেন, 'হে কল্যাণের অন্বেষক, সকালটা কেমন কাটল?' জায়েদ জবাব দেন, 'কল্যাণ এবং সুস্থতার সঙ্গে।' তিনি বলেন, 'কল্যাণ কি পেয়ে গেছ?' জায়েদ বলেন, 'না।' তখন উমাইয়া বলে ওঠেন, 'কিয়ামত দিবসে দীনে ইবরাহিমি ব্যতীত সকল দীন হবে ধ্বংসের কারণ।' বাকি এ কথা—প্রতীক্ষিত নবি আমাদের মধ্য থেকে হবেন, না তোমাদের থেকে।
আবু বকর রা. বলেন, ইতিপূর্বে আমি কোনো নবির আবির্ভাব হওয়া অথবা তাঁর অপেক্ষা সম্পর্কে কিছু শুনিনি। ইবনু আবিস সালত থেকে এ কথা শুনে আমি ওয়ারাকা ইবনু নাওফালের কাছে যাই, যিনি অধিকাংশ সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে চিন্তায় বিভোর থাকতেন এবং প্রায়ই ক্ষীণ আওয়াজে স্বগতোক্তি করতেন। আমি বিষয়টি তাঁর সামনে তুলে ধরি। তিনি বলেন, 'হ্যাঁ বেটা, আমরা কিতাবের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ধারণ করি। জেনে রেখো, যে নবির অপেক্ষা করা হচ্ছে, তিনি আরবের শ্রেষ্ঠ বংশে আবির্ভূত হবেন। আমি আরবের বংশতালিকা সম্পর্কে অভিজ্ঞজন হিসেবে জানি, তোমাদের কুরাইশ বংশই হচ্ছে আরবের শ্রেষ্ঠতম বংশ।' আমি বলি, 'চাচা, সেই নবি কী বলবেন?' ওয়ারাকা বলেন, 'তিনি তা-ই বলবেন যা তাঁকে আল্লাহ নির্দেশ দেবেন। তিনি জুলুম করবেন না এবং পরস্পর জুলুমে লিপ্ত হতেও বলবেন না।' সুতরাং যখন রাসুলের ওপর ওহি অবতীর্ণ হয়, তখন আবু বকরই তাৎক্ষণিক তাঁর ওপর ইমান নিয়ে আসেন। সবার আগে তিনিই তাঁকে সত্যায়ন করেন। তিনি উমাইয়া ইবনু আবিস সালতের কথা গভীর মনোযোগে শুনতেন। যেমন: তাঁর এই বাণী,
জেনে রেখো, আমাদের থেকে একজন নবি আবির্ভূত হবেন, যিনি আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংবাদ দেবেন। সেই সত্তার আশ্রয় চাই, যার জন্য হাজিরা হজ করেন; আর আল্লাহর দীনের রুকনগুলো সুউচ্চ করেন।
আবু বকর সিদ্দিক রা. বিস্ময়কর দূরদর্শিতা, দীপ্ত বুদ্ধি, প্রভাব-বিস্তারক চিন্তা, ধারালো মেধা এবং গম্ভীর চিন্তাচেতনা নিয়ে জীবনযাপন করছিলেন। আরব কবিদের অনেক কবিতা ও ঘটনা তাঁর মুখস্থ ছিল। একবার রাসুল সাহাবিগণকে প্রশ্ন করছিলেন, সেখানে তিনিও উপস্থিত ছিলেন। নবিজি বলেছিলেন, 'তোমাদের কেউ কি কিস ইবনু সায়িদার সেই কথাটা জানো, যা তিনি উকাজের বাজারে বলেছিলেন?' আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমার স্মরণ আছে। আমি সে দিন উকাজে ছিলাম।'
কিস তার মেটে রঙের উটে আরোহী অবস্থায় বলছিলেন, 'হে লোকজন শুনো এবং মুখস্থ করে নাও, তাহলে অবশ্যই উপকৃত হবে পারবে। নিঃসন্দেহে আজ যারা পৃথিবীতে জীবিত আছে, তারা একদিন মারা যাবে। যে মারা গেছে, সে তো হারিয়ে গেছে। দিনে দিনে কেবল নতুন বিষয় সামনে আসবে। নিঃসন্দেহে আসমানে রয়েছে সংবাদ, জমিনে রয়েছে শিক্ষা ও উপদেশ। জমিনের উপর রয়েছে গালিচা বিছানো আর আকাশের ছাদ উঁচু। তারকারাজি চক্রাকারে ঘুরছে, সমুদ্রগুলো নিচে নামবে না (জলাশয়ে পরিণত হবে না।) রাত হয়ে থাকে অন্ধকার। আকাশ হয়ে থাকে বুরুজসমৃদ্ধ।'
কিস আরও বলেন, 'নিঃসন্দেহে আল্লাহর রয়েছে একটি দীন। তোমরা যে দীনের ওপর আছ, তার চেয়ে আল্লাহর কাছে তাঁর দীন খুবই প্রিয়। আমার কী হলো! আমি দেখতে পাচ্ছি লোকজন চলে যাচ্ছে। কেউ ফিরে আসছে না। নতুন জায়গাটি কি তাদের এমনই পছন্দ হয়েছে যে, সেখানেই বসবাস করতে হবে; অথবা তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তাই তারা চলে গেছে?' এরপর তিনি এই পঙক্তিগুলো বলতে থাকেন,
অতীত আর অতীত হয়ে যাওয়া মানুষের মধ্যে আমাদের জন্য রয়েছে শিক্ষা ও উপদেশের উপাদান। যখন আমি মৃত্যুর একটি ঘাট দেখতে পাই যেখান থেকে ফিরে আসা আদৌ সম্ভব নয়; আর দেখি আমার কওমের ছোটবড় সবাই সেদিকেই ধেয়ে যাচ্ছে। তখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে— তারা যেখানে যাচ্ছে, আমাকেও সেখানেই যেতে হবে।
কিস ইবনু সায়িদা যা বলেছিলেন, আবু বকর রা. তাঁর তীক্ষ্ণ মেধার জোরে সেগুলো মুখস্থ করেছিলেন এবং পরে রাসুল ও সাহাবিগণকে তা শোনান। এ থেকে প্রমাণিত হয়, তাঁর মেধা এর অর্থগুলো ভালোভাবে উপলব্ধি করে নিতে পেরেছিল।
একবার শামে অবস্থানকালে তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। পরে সেটি তিনি পাদরি বুহায়রার কাছে বর্ণনা করলে বুহায়রা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনার বাড়ি কোথায়?' আবু বকর জবাব দেন, 'মক্কায়।' বুহায়রা বলেন, 'মক্কার কোন গোত্রে?' আবু বকর বলেন, 'কুরাইশ গোত্রে।' বুহায়রা আবার জিজ্ঞেস করেন, 'আপনি কী করেন?' তিনি বলেন, 'ব্যবসা।' এবার বুহায়রা বলেন, 'আপনার বক্তব্য সঠিক হয়ে থাকলে আপনার গোত্রে একজন নবি আসবেন। সেই নবির জীবদ্দশায় আপনি তাঁর প্রধান সহচর এবং তাঁর ইনতিকালের পর তাঁর খলিফা হবেন। আর শুনুন, বিষয়টি কাউকে বলবেন না, গোপন করে রাখবেন।
তাঁর ইসলামগ্রহণ ছিল অনেক তত্ত্ব-তালাশ এবং দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতিফল। জাহিলি যুগে নবিজির সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক এবং তাঁকে ভালো করে চেনা-জানা তাঁর ইসলামগ্রহণের পথে সহায়ক হয়েছিল। যখন নবিজির ওপর ওহি অবতীর্ণ হতে থাকে এবং তিনি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতে শুরু করেন, তখন নবিজি দাওয়াত পৌঁছানোর কাজে যাঁকে চয়ন করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন আবু বকর। কেননা, নবিজি তাঁর উত্তম চরিত্র ও মার্জিত আচরণ সম্পর্কে অন্যদের চেয়ে বেশি অবহিত ছিলেন। একইভাবে আবু বকরও রাসুলের সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও চরিত্রমাধুর্যের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতেন। তিনি চিন্তা করেছিলেন—যে ব্যক্তি জীবনে কখনো মিথ্যা বলেননি, সে আল্লাহ সম্পর্কে কীভাবে মিথ্যা বলবেন?
রাসুল আবু বকরকে দিয়ে দীনের দাওয়াতের কাজ শুরু করেন এভাবে, ‘আমি আল্লাহর নবি। আমাকে আল্লাহ এই দাওয়াত দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, কেবল আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। তিনি ব্যতীত কারও ইবাদত করো না, তাঁর আনুগত্যের ওপর ভালোবাসা স্থাপন করো। তখন আবু বকর রা. রাসুলের মুখনিঃসৃত এসব কথা শুনে কোনো দ্বিধা ছাড়াই তৎক্ষণাৎ ইসলামগ্রহণ করেন। রাসুলকে সমর্থন ও সাহায্যের অঙ্গীকার করেন। এরপর তিনি আজীবন এই অঙ্গীকার পরিপূর্ণভাবে আদায় করে যান। এ জন্যই রাসুল তাঁর সম্পর্কে সাহাবিদের বলেছিলেন, 'আল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। প্রথমে তোমরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলে; কিন্তু আবু বকর সত্যায়ন করেছিল। সে তাঁর জানমাল দিয়ে আমার সঙ্গ দিয়েছিল। তোমরা আমার খাতিরে আমার সঙ্গীকে ছেড়ে রেখো, তোমরা আমার খাতিরে আমার সঙ্গীকে ছেড়ে রেখো। শেষ বাক্যটি তিনি দুবার বলেছিলেন।'
এভাবে স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে আবু বকরই ছিলেন প্রথম মুসলমান। ইমাম ইবরাহিম নাখায়ি, হাসসান ইবনু সাবিত, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস, আসমা বিনতু আবি বকর রা. বলেছেন, পুরুষদের মধ্যে প্রথম ইসলামগ্রহণকারী ব্যক্তি ছিলেন আবু বকর। ইউসুফ ইবনু ইয়াকুব মাজিশুন বলেন, আমার পিতা ও উসতাজ মুহাম্মাদ ইবনু মুনকাদির, রাবিআ ইবনু আবদির রাহমান, সালিহ ইবনু কায়সান, সাআদ ইবনু ইবরাহিম এবং উসমান ইবনু মুহাম্মাদ আখনাসের এ ব্যাপারে ন্যূনতম সন্দেহ ছিল না যে, আবু বকরই ছিলেন সর্বাগ্রে ইসলামগ্রহণকারী।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. বলেন, সর্বাগ্রে ইসলামগ্রহণকারী হচ্ছেন আবু বকর। তিনি হাসসানের এই পঙ্ক্তি দ্বারা দলিল দেন,
যখন তুমি কোনো বিশ্বস্ত ভাইয়ের কথা স্মরণ করবে, তখন তোমার ভাই আবু বকর ও তাঁর কর্মপরাকাষ্ঠা স্মরণ করবে। নবিজির পর সৃষ্টিজগতে সর্বাপেক্ষা মুত্তাকি, সবচেয়ে বড় ন্যায়বিচারক ও সবচেয়ে বেশি দায়িত্বসচেতন। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় স্থানে, তাঁর অবস্থান ছিল প্রশংসিত তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে রাসুলকে সর্বাগ্রে সত্যায়নকারী। সুউচ্চ পর্বতগুহায় তিনি ছিল দুইয়ের দ্বিতীয়জন যখন শত্রুরা পাহাড়ে চড়ে ঘুরঘুর করছিল। আল্লাহর নির্দেশের প্রশংসা করতেন; আর অতীত-বর্তমানে প্রিয়তম সাথির অনুসরণে জীবন পার করেছেন। তিনি ছিলেন নবিজির প্রিয়, মানুষ জানে- নবিজির কাছে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না।
আলিমগণ আবু বকরের ইসলামগ্রহণকে আলোচনা-গবেষণার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সত্যিই তিনি ছিলেন সর্বাগ্রে ইসলামগ্রহণকারী? আলিমদের বড় একটি অংশ এ মতই পোষণ করে থাকেন। কেউ কেউ অবশ্য আলি রা.-কে সর্বাগ্রে ইসলামগ্রহণকারী আখ্যা দিয়েছেন। কেউ বলেছেন জায়েদ ইবনু হারিসার কথা।
আল্লামা ইবনু কাসির এই ভিন্নমতগুলোর মধ্যে সুন্দর সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই ভিন্নমতগুলোর সমাধান হচ্ছে, মহিলাদের মধ্যে সর্বাগ্রে ইসলামগ্রহণকারী ছিলেন খাদিজাতুল কুবরা। অনেকে বলেছেন, তাঁর ইসলামগ্রহণ ছিল পুরুষদেরও আগে। গোলামদের মধ্যে জায়েদ ইবনু হারিসা। প্রসিদ্ধ মতানুসারে তখন তিনি বয়সে ছোট ছিলেন। তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়সে উপনীত হয়েছিলেন। আর স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে আবু বকর রা.। এঁদের মধ্যে আবু বকরের ইসলামগ্রহণই ছিল সবচেয়ে বেশি উপকারী। কেননা, সমাজে তাঁর অবস্থান ছিল সুসংহত। তিনি ছিলেন কুরাইশের কাছে নেতৃপর্যায়ের সম্মানিত ব্যক্তি। সম্পদের দিক দিয়েও ছিলেন ভালো অবস্থানে। প্রথম দিন থেকেই তিনি ইসলামের দায়ি হয়ে ওঠেন। নবিজিকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। তাঁর আনুগত্যে অকুণ্ঠচিত্তে সম্পদ ব্যয় করতেন।
ইমাম আবু হানিফা রাহ. এই বক্তব্যগুলোয় সমন্বয় করতে গিয়ে বলেন, স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে সর্বাগ্রে আবু বকর, মহিলাদের মধ্যে খাদিজা, গোলামদের মধ্যে জায়েদ ইবনু হারিসা এবং বালকদের মধ্যে আলি রা. ইসলামগ্রহণে ধন্য হয়েছিলেন।
আবু বকরের ইসলামগ্রহণের ফলে রাসুল অত্যন্ত প্রীত হন। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা বলেন, 'নবিজি কথা বলা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই আবু বকর ইসলামগ্রহণ করেন। যখন তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন মক্কার পাহাড়গুলোর মধ্যখানে আবু বকরের ইসলামগ্রহণের ফলে নবিজির চেয়ে অন্য কেউ এত খুশি ছিল না।
তাঁর সত্তা ছিল মহামূল্যবান এক রত্নভান্ডার, যা আল্লাহ তাঁর নবির জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। কুরাইশদের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয়তম ব্যক্তি। পবিত্র ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহই তাঁর মধ্যে এসব গুণের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। মানুষ তাঁর দিকে চুম্বকের মতো আকর্ষিত হতো। তাঁর আপনজনে পরিণত হয়ে যেত। মহান কৃতিত্ব আর উন্নত চরিত্র এমন এক শক্তি, যা মানুষকে নিজের অনুরক্তে পরিণত করতে যথেষ্ট। তাঁর সম্পর্কে নবিজির বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, 'আমার উম্মতের মধ্যে তাদের ওপর সবচেয়ে বেশি দয়ালু হচ্ছেন আবু বকর।
আরবদের কাছে বংশজ্ঞান এবং ইতিহাস ছিল গুরুত্বপূর্ণ দুটি শাস্ত্র। আবু বকর রা. এই দুই শাস্ত্রেই অভিজ্ঞ ছিলেন। কুরাইশের লোকজন দ্বিধা ছাড়াই স্বীকার করত যে, আবু বকর ছিলেন শাস্ত্র দুটিতে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত। এ জন্যই গোত্রের অভিজাত ও বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ সব সময় তাঁর পাশে আসতেন। তাঁর প্রজ্ঞা থেকে উপকৃত হতেন। তাঁর কাছে এমনকিছু পেতেন, যা অন্য কারও কাছে পেতেন না। বুদ্ধিদীপ্ত ও ধীমান যুবকরা সব সময় তাঁকে ঘিরে থাকত। তাঁর চিন্তাচেতনা দ্বারা উপকৃত হতো। এটিও ছিল তাঁর মহত্ত্বের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। একইভাবে ব্যবসায়ী এবং সম্পদশালীরাও তাঁর সমাবেশে যোগ দিতেন। তিনি শীর্ষ ব্যবসায়ী না হলেও মক্কার নামকরা একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। অন্যান্য শ্রেণিপেশার মানুষও তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে তাঁর কাছে উপস্থিত হতো। তাঁর উন্নত চরিত্রের কারণেই মানুষ তাঁর কাছে উপস্থিত হতো। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অতিথিপ্রিয়। অতিথি এলে খুব প্রীত হতেন। এককথায়, সকল শ্রেণিপেশার মানুষ তাঁর থেকে বিভিন্নভাবে উপকৃত হতো, কেউ বঞ্চিত থাকত না।
তাঁর কাছে প্রজ্ঞা, সাহিত্য এবং সমাজ-পরিচালনার পূর্ণ পুঁজি ছিল। ফলে দেখা যায়, তাঁর দাওয়াতে ইসলামের ছায়াতলে আসা বেশির ভাগই ছিলেন সমাজের উঁচুস্তরের লোক।

টিকাঃ
* মাওয়াকিফুস সিদ্দিক রা. মাআন্নাবি বি মাক্কাতা, ড. আতিফ লিমাজা: ৬।
" তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি: ৫২।
* তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি: ৫২।
* মাওকিফুস সিদ্দিক মাআন্নাবি বি মাক্কাতা: ৮, ৯।
** আল-খুলাফাউর রাশিদুন, মাহমুদ শাকির: ৩৪।
৮১ তারিখুদ দাওয়াতিল ইসলাম ফি আহদিল খুলাফায়ির রাশিদিন : ৪৪১
৮২ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু হিশাম : ১/২৮৬; আস-সিরাতুল হালাবিয়াহ : ১/৪৪০; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৩/৩১।
৮৩ সহিহ বুখারি : ফাজায়িলু আসহাবিন নাবি : ৩৬৬১।
৮৪ সিফাতুস সাফওয়াহ : ১/২৩৭; ফাজায়িলুস সাহাবা, ইমাম আহমাদ রাহ. : ৩/২০৬।
** দিওয়ানু হাসান ইবনু সাবিত রা., তাহকিক-ওয়ালিদ আরাফাত: ১/১৭।
৮৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/২৯।
৮৭ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/২৬-২৮।
৮৮ সহিহ আল-জামিউস সাগির, আলবানি: ৩/২-৮।

📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 দাওয়াত

📄 দাওয়াত


আবু বকর রা. ইসলামগ্রহণের পরই দাওয়াতের পতাকা নিয়ে রাসুলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যান। তিনি রাসুলের কাছে শিক্ষা পেয়েছিলেন—ইসলাম হচ্ছে আমল, দাওয়াত এবং জিহাদের ধর্ম। যতক্ষণ-না মানুষ তাঁর আত্মা, সম্পদ সবকিছু আল্লাহর জন্য বিসর্জন না দিচ্ছে, ততক্ষণ তার ইমান পূর্ণ হতে পারে না। আল্লাহ বলেন,
বলো, আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ, জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশেই। তাঁর কোনো শরিক নেই এবং আমি এ জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম। [সুরা আনআম: ১৬২-১৬৩]
তিনি ছিলেন ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর দাওয়াতের মধ্যে আল্লাহ বিপুল বরকত রেখেছিলেন। যেখানেই যেতেন সেখানেই প্রভাব রেখে আসতেন। তাঁর মাধ্যমে ইসলামের প্রভূত উপকার সাধিত হয়। তিনি ছিলেন আল্লাহ তাআলার বর্ণনার জীবন্ত নমুনা। আল্লাহ বলেন,
আপনি মানুষকে আপনার প্রতিপালকের দিকে আহ্বান করুন হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করবেন উত্তম পন্থায়। আপনার প্রতিপালক—তাঁর পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়, সে সম্বন্ধে তিনি সবিশেষ অবহিত; আর কারা সৎপথে আছে, সে বিষয়েও তিনি সবিশেষ অবহিত। [সুরা নাহল: ১২৫]
আল্লাহর পথে দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্ব, দীনের ওপর বিশ্বাস এবং আল্লাহর রাসুলের আনুগত্য ইত্যাদি বিষয়ে তিনি এমন এক খাঁটি মুমিনের চিত্র উপস্থাপন করেছিলেন যে, তাঁর আত্মা ততক্ষণ শান্তি পেত না, যতক্ষণ-না মানুষকে ইমান ও আমলের ওপর আস্থাশীল করে তুলতে পেরেছে। এ জজবা এমন কোনো সাময়িক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, যা দ্রুত মিইয়ে যাবে; বরং ইসলামের জন্য তাঁর প্রয়াস জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল সমান গতিময়। এতে যেমন ক্লান্ত হননি, তেমনই বিরক্তিও অনুভব করেননি; অথবা অক্ষম হয়ে যাননি।”
আবু বকরের দাওয়াতের প্রথম সাফল্যই ছিল কতিপয় মহান ব্যক্তির ইসলামগ্রহণ। যেমন : জুবায়ের ইবনুল আওয়াম, উসমান ইবনু আফফান, তালহা ইবনু উবায়দিল্লাহ, সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস, উসমান ইবনু মাজউন, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, আবদুর রাহমান ইবনু আউফ, আবু সালমা ইবনু আবদিল আসাদ, আরকাম ইবনু আবিল আরকাম রা.।
তিনি তাঁদের প্রত্যেককে আলাদাভাবে সঙ্গে নিয়ে নবিজির দরবারে হাজির হন। তাঁরা আল্লাহর রাসুলের হাতে ইসলাম কবুল করেন। তাঁরাই ছিলেন সেই প্রথম স্তম্ভ, যাঁদের ওপর ইসলামি দাওয়াহ-প্রাসাদের ভিত গড়ে উঠেছিল। তাঁরা ছিলেন রাসুলের প্রাথমিক শক্তির মাধ্যম। এই পবিত্রাত্মাগুলোর মাধ্যমেই আল্লাহ তাঁকে নির্ভরতা জুগিয়েছিলেন। নারী-পুরুষ দলে দলে ইসলামগ্রহণ শুরু করেছিলেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন ইসলামের দায়ি। তাঁদের সঙ্গে 'আস-সাবিকুনাল আউয়ালুন' বা প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারীদের কাফেলা এগিয়ে যাচ্ছিলেন। একজন একজন, দুইজন দুইজন-এভাবে ছোট ছোট জামাআতে তাঁরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা ছিলেন রিসালাতের দুর্গস্বরূপ। ইসলামি ইতিহাসের কোনো মহান সত্তাই তাঁদের সমমর্যাদায় উন্নীত হতে পারেননি।
ইসলামি দাওয়াতের ক্ষেত্রে আবু বকর রা. তাঁর পরিবারের প্রতিও গুরুত্ব দেন। ফলে তাঁর কন্যা আসমা, আয়েশা, স্ত্রী উম্মু রুমান, ছেলে আবদুল্লাহ, খাদিম আমির ইবনু ফুহায়রা ইসলামগ্রহণ করেন। উন্নত গুণ ও সুন্দর আচরণ তাঁর সত্তার অংশে পরিণত হয়েছিল বিধায় তা দাওয়াতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। জাতির কাছে তাঁর আভিজাত্যের একটা মূল্য ছিল। তারা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট ছিল। অন্তর থেকে তাঁকে ভালোবাসত। তিনি ছিলেন স্বভাব-কোমল ব্যক্তি। মক্কায় তিনি মেহমানদারির দুর্লভ আয়োজন করতেন। এ ছাড়া তিনি ছিলেন অত্যন্ত উঁচুমানের বিশুদ্ধভাষী। অলংকারশাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল ঈর্ষণীয়।
এই যে উন্নত রুচিবোধ এবং চারিত্রিক মাধুর্য, প্রত্যেক দায়ির মধ্যেই তা থাকা দরকার। অন্যথায় তাদের দাওয়াত হবে মরুভূমিতে চিৎকার করার মতো অর্থহীন; অথবা ছাইয়ের গাদায় ফুঁক দেওয়ার মতো। আবু বকরের পবিত্র জীবনচরিত ও মেধা ছিল ইসলামের সচিত্র ব্যাখ্যা। তাঁর যাপিত জীবন ছিল ইসলামের দর্পণস্বরূপ। তাঁর সিরাত অবশ্যই সর্বকালের আলিম এবং দায়িদের জন্য দাওয়াত ও তাবলিগি কাজের উজ্জ্বল আদর্শ।

টিকাঃ
** আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া, গাজবান: ১/১১৫, ১১৬।
১০ তারিখুদ দাওয়া ফি আহদিল খুলাফায়ির রাশিদিন: ৮৭।
১১ আল-ওয়াহি ওয়া তাবলিগুর রিসালাহ, ড. ইয়াহইয়া আল-ইয়াহইয়া : ৬২।
১২ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ, আরজুন : ১/৫৩৩।
১৩ আস-সিরাতুল হালাবিয়াহ : ১/৪৪২।

📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 ভোগান্তি

📄 ভোগান্তি


ব্যক্তি, দল, সম্প্রদায়, জাতি এবং রাষ্ট্রসমূহের ইতিহাসে বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ ও পরীক্ষার কুদরতি সুন্নাহ চলে আসছে। সাহাবিগণকেও এই সুন্নাহর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। তাঁরা এত কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন যে, যদি কোনো বিশালকায় পাহাড়ের এমন পরীক্ষা নেওয়া হতো, তাহলে পাহাড়ও ধসে যেত; কিন্তু ওই পবিত্রাত্মাগণ তাঁদের জানমাল আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করে দেন। তাঁরা প্রশান্তচিত্তে সব দুর্ভোগ মেনে নেন। ওই পরীক্ষা থেকে উঁচু মর্যাধাধারী কোনো পরিবারও বাদ যায়নি। আবু বকরের মতো মহান ব্যক্তিকেও সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সামলে উঠতে হয়েছে। তাঁর মাথায় মাটি দেওয়া হয়েছে। মসজিদুল হারামে জুতো দিয়ে পেটানো হয়েছে। এই পরিমাণ আহত করা হয়েছিল যে, তাঁকে চেনা দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। অর্ধমৃত অবস্থায় কাপড়ে শুইয়ে তাঁকে ঘরে নিয়ে আসা হয়েছিল।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. বর্ণনা করেন; যখন নবিজির সাহাবিদের সংখ্যা ৩৮ জনের মতো, তখন আবু বকর এই মর্মে পীড়াপীড়ি করতে থাকেন—এবার জনগণকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া হোক। নবিজি বলছিলেন, 'আমরা তো সংখ্যায় এখনো অল্প।' কিন্তু আবু বকর তবু আবেদন করতে থাকেন। তাঁর পীড়াপীড়িতে একদিন রাসুল সাহাবিদের নিয়ে মসজিদুল হারামে যান। ভেতরে প্রবেশ করে তাঁরা স্ব স্ব গোত্রের লোকদের কাছে বসেন। আবু বকর তখন দাঁড়িয়ে ভাষণ শুরু করেন। নবিজি তখন বসা ছিলেন। তিনিই ছিলেন প্রথম বক্তা, যিনি বক্তৃতা দিচ্ছিলেন আর নবিজি তা শুনে যাচ্ছিলেন। বক্তব্যে তিনি মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকছিলেন। মুশরিকরা তখন ক্ষিপ্ত হয়ে আবু বকর ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মসজিদের পাশে তাঁদের প্রচন্ড মারধর করে। বিশেষ করে আবু বকরকে পদদলিত করে। অভিশপ্ত উতবা ইবনু রাবিয়া কাঁটাদার তলাবিশিষ্ট জুতো দ্বারা তাঁকে সজোরে দলতে থাকে। ফলে তাঁর নাকের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
তখন বনু তায়িমের লোকজন এগিয়ে এলে অত্যাচারীরা পালিয়ে যায়। এরপর তায়িমের লোকজন তাঁকে কাপড়ে জড়িয়ে ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে আসে।
সে দিন আবু বকর রা. এতটাই আহত হয়েছিলেন, তিনি যে মারা যাচ্ছেন—এ ব্যাপারে কারও সংশয় ছিল না। এ অবস্থা দেখে বনু তায়িমের লোকদের রক্ত মাথায় চড়ে যায়। তারা পুনরায় মসজিদুল হারামে এসে শপথ করে দীপ্তকণ্ঠে বলে, 'আল্লাহর শপথ, যদি আবু বকর মারা যান, তাহলে অবশ্যই আমরা উতবাকে হত্যা করব।' এরপর তারা পুনরায় আবু বকরের কাছে যায়। তাঁর পিতা আবু কুহাফাসহ বনু তায়িমের প্রতিটি মানুষ তখন তাঁর মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েন। বিকেলের দিকে তিনি কথা বলতে সক্ষম হন। হুঁশ ফেরার পর তাঁর প্রথম জিজ্ঞাসাই ছিল— 'রাসুলের অবস্থা কী?'
তাঁর এমন কথায় গোত্রের লোকজন তাঁকে দোষারোপ করতে থাকে। তাঁর মা বলেন, 'আগে ওকে কিছু খেতে দাও।' তারা চলে গেলে মা তাঁর পাশে এসে বসেন। তিনি তাঁকে কিছু খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। তিনি বার বার জিজ্ঞেস করছিলেন, 'রাসুলের অবস্থা কী?' মা জবাবে বলেন, 'শপথ আল্লাহর, তোমার সাথির সংবাদ আমার জানা নেই।' তিনি বলেন, 'মা, দয়া করে উম্মু জামিল বিনতু খাত্তাবের কাছে গিয়ে রাসুল সম্পর্কে জেনে আসুন।' মা বলেন, 'ঠিক আছে যাচ্ছি।'
উম্মুল খায়ের তখন উম্মু জামিলের কাছে গিয়ে বলেন, 'আমার ছেলে আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে। আপনি কি জানেন, তিনি বর্তমানে কোথায় কোন অবস্থায় আছেন?' উম্মু জামিল বলেন, 'আমি আবু বকর বা মুহাম্মাদ কাউকেই চিনি না। তবে আপনি চাইলে আমি আপনার ছেলের কাছে যেতে পারি।' উম্মুল খায়ের বলেন, 'চলুন।'
উম্মু জামিল আবু বকরকে এই অবস্থায় দেখতে পেয়ে বলেন, 'যে আপনার সঙ্গে এমন আচরণ করেছে, সে অবশ্যই জঘন্য কাফির। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আল্লাহ তার থেকে এ জুলুমের শোধ নেবেনই।' আবু বকর রা. তাঁকে বলেন, 'আগে বলুন, নবিজির অবস্থা কী?' উম্মু জামিল বলেন, 'কিন্তু কথাগুলো তো আপনার মাতা-পিতা শুনতে পাচ্ছেন।' তিনি বলেন, 'কোনো সমস্যা নেই।' উম্মু জামিল বলেন, 'তিনি সুস্থই আছেন।' আবু বকর জিজ্ঞেস করেন, 'এখন কোথায় আছেন?' উম্মু জামিল জানান, 'আরকামের বাড়িতে অবস্থান করছেন।' কথাটি শুনে তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, যতক্ষণ-না আমি তাঁর দরবারে উপস্থিত হচ্ছি, ততক্ষণ আহার করছি না।'
এরপর যখন মানুষের চলাফেরা কমে আসে, পরিবেশও অনেকটা শান্ত হয়ে যায়, তখন উম্মু জামিল এবং উম্মুল খায়ের তাঁকে নবিজির কাছে নিয়ে যান। তাঁকে ওই অবস্থায় দেখে রাসুল বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু দেন। অন্য সাহাবিগণও তাঁকে তখন জড়িয়ে ধরেন। তাঁর অবস্থা দেখে রাসুলের আবেগ যেন বাঁধনহারা হয়ে ওঠে। নবিজির অস্থিরতা দেখে আবু বকর রা. বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, পেরেশানির দরকার নেই। আফসোস কেবল এটাই যে, হারামিটা আমার চেহারার এই অবস্থা করল। এই হচ্ছেন আমার মা। আমাকে অন্তহীন ভালোবাসেন। আপনি তো বরকতময় সত্তা। আপনি মাকে ইসলামের দাওয়াত দিন, আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য দুআ করুন। আমার বিশ্বাস, আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাঁকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত রাখবেন।' রাসুল তাঁর জন্য দুআ করেন। তাঁকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানান। উম্মুল খায়ের তখনই ইসলামগ্রহণ করেন।
এই মহান ঘটনা ওই লোকদের জন্য শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যারা সাহাবিদের অনুসরণ করতে চায়। আমরা এখানে সে শিক্ষা ও উপদেশের কিঞ্চিৎ তুলে ধরছি: ১. আবু বকর রা. ইসলামের প্রচার এবং কাফিরদের সামনে সত্য দীন তুলে ধরার প্রবল আগ্রহ লালন করতেন। এর মাধ্যমে তাঁর ইমানি শক্তি এবং বাহাদুরির পরিচয় মেলে। দীনের খাতিরে তিনি অন্তহীন কষ্ট স্বীকার করেছেন। জাতি তাঁকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁর অন্তরে আপন সত্তার চেয়ে রাসুলের ভালোবাসা ছিল অনেকগুণ বেশি। ইসলামগ্রহণের পর তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল, কীভাবে দীনের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরা যায়। কীভাবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর বাণী ব্যাপ্ত করা যায়। এতে প্রাণ দিতে হলেও তাঁর কোনো পরোয়া ছিল না। তাই দেখা যায়, ইসলামের ইতিহাসে তিনিই প্রথম মারাত্মক আহত হয়েছিলেন।
২. জাহিলিয়াতের সর্বধ্বংসী তুফানের প্রবল ঝাপটার মুখে দাঁড়িয়ে ইসলামের প্রচার-প্রসারে আবু বকরের দৃঢ় অবস্থান ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার আকুলতা তাঁর অন্তরের গভীরে ঢুকে পড়েছিল। এর মধ্যেই তিনি প্রশান্তি লাভ করতেন। অথচ তিনি জানতেন, এ পথে তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের কী পরিমাণ বিপদে পড়তে হবে। এগুলো তো স্পষ্ট প্রমাণ যে, তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তার অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছিলেন।
৩. আল্লাহ ও রাসুলপ্রেম তাঁর আত্মপ্রেমের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে নিয়েছিল। এর স্পষ্ট দলিল তো তা-ই যে, লোকজন যখন তাঁর জীবনের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল, তখন জ্ঞান ফিরলে তাঁর প্রথম কথা ছিল— 'আল্লাহর রাসুল কেমন আছেন? কোথায় আছেন?' সর্বোপরি তাঁর শপথ ছিল, যতক্ষণ-না রাসুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি খাবার গ্রহণ করবেন না। প্রত্যেক খাঁটি মুমিনের অন্তরে এমন রাসুলপ্রেম থাকা দরকার, যদিও এর জন্য তাকে জানমাল বিসর্জন দিতে হয়।
৪. মতাদর্শ ভিন্ন হয়ে থাকলেও ব্যক্তির সঙ্গে ব্যবহার, নানামুখী ঘটনাপ্রবাহ এবং সংকটময় পরিস্থিতিতে আসাবিয়া তথা গোত্রপ্রীতি বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। যদিও আমরা দেখতে পাই, আবু বকরের আকিদা-বিশ্বাস তাঁর গোত্রের লোকজনের বিশ্বাসের বিপরীত ছিল, তথাপি রক্তের টানে তাঁর গোত্র ঘাতক উতবাকে এই চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছিল—যদি আবু বকর মারা যান, তাহলে অবশ্যই তারা এর প্রতিশোধ নেবে। উতবাকে হত্যা করে ফেলবে।
৫. এ ঘটনা থেকে উম্মু জামিলের সতর্কতা অবলম্বনের সুন্দর দিকটিও ফুটে ওঠে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, প্রথম থেকেই রাসুল তাঁর অনুসারীদের দীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে আগ্রহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি প্রশিক্ষণও দিয়ে রেখেছিলেন। আবু বকরের মা তাঁকে নবিজি সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন, 'আমি আবু বকর বা মুহাম্মাদ কাউকে জানি না, চিনি না। পরিস্থিতি কিন্তু এমন সতর্কতার দাবি জানাচ্ছিল। কারণ, তখনো উম্মুল খায়ের মুসলমান ছিলেন না। আর উম্মু জামিল তাঁর মুসলিম পরিচয় গোপন রাখতে চাচ্ছিলেন। তাই সতর্কতা হিসেবে উম্মুল খায়েরকে রাসুলের অবস্থানস্থলের সন্ধান দিতে চাচ্ছিলেন না। তিনি সন্দেহ করছিলেন, হতে পারে উম্মুল খায়ের কুরাইশের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছেন। তবে আবু বকরের অবস্থা জানা এবং তাঁর ব্যাপারে প্রশান্তিদায়ক সংবাদ পাওয়ার তীব্র একটা আকাঙ্ক্ষাও তাঁর অন্তরে কাজ করছিল। ফলে তিনি উম্মুল খায়েরের কাছে তাঁর ছেলের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা বলেন। এরপর যখন তিনি আবু বকরের কাছে পৌঁছান, তখনো কথাবার্তায় পূর্ণ সচেতন থাকেন, যেন তাঁর থেকে রাসুলের অবস্থানস্থলের বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে না যায়। সবশেষে মানুষের চলাচল কমে এলে এবং পরিবেশ কিছুটা শান্ত হয়ে এলে রাসুলের দরবারে তাঁদের উপস্থিতি পূর্ণ সাবধানতার পরিচয় বহন করে। কারণ, তখন মানুষকে ইসলামে প্রতিষ্ঠিত দেখতে পেলে তাদের ওপর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসত। নির্মম-নিষ্ঠুর আচরণে তাদের বিপর্যস্ত করা হতো।
৬. এ ঘটনা থেকে মায়ের জন্য আবু বকরের আত্মিক টান কেমন ছিল, তা অনুভব করা যায়। তিনি মায়ের হিদায়াতের প্রচণ্ড আগ্রহী ছিলেন বিধায় নবিজির কাছে আবেদন করেন, 'এই হচ্ছেন আমার মা। আমাকে অন্তহীন ভালোবাসেন। আপনি তো বরকতময় সত্তা। মাকে ইসলামের দাওয়াত দিন, আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য দুআ করুন। আমার বিশ্বাস, আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাঁকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত রাখবেন।' নবিজি তখন তাঁর জন্য দুআ করেন। তাঁকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানান। ফলে তখনই তিনি ইসলামগ্রহণ করে মুমিনদের সেই দলভুক্ত হয়ে যান, যাঁরা ছিলেন আল্লাহর দীনপ্রচারের কাজে নিয়োজিত। এ ছাড়া ঘটনাটি থেকে জানা যায়, আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি কতটা দয়ালু। অনুরূপ এখানে 'অনুগ্রহের ওপর অনুগ্রহ' দৃষ্টিগোচর হয়।
৭. নবিজির পর সাহাবিদের মধ্যে আবু বকরই সবচেয়ে বেশি কঠিন পরীক্ষার শিকার হয়েছিলেন। কারণ, তিনি সর্বক্ষণ রাসুলের ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকতেন। যেখানে মানুষ তাঁকে কষ্ট দিত, সেখানে তিনি উপস্থিত থাকতেন। নিজের সর্বস্ব দিয়ে রাসুলের পক্ষে প্রতিরোধ চালিয়ে আত্মোৎসর্গের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতেন। এর ফলে তিনি মুশরিকদের উগ্রতা ও অমানুষিক আচরণের শিকার হতেন। যদিও তিনি ছিলেন কুরাইশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় এবং জ্ঞান-বুদ্ধিতে বিখ্যাত একজন ব্যক্তি।

টিকাঃ
* আত-তামকিন লিল উম্মাতিল ইসলামিয়াহ: ২৪৩।
* আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু কাসির ১/৪৩৯-৪৪১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৩০।
* ইসতিখলাফু আবি বাকরিনিস সিদ্দিক, ড. জামাল আবদুল হাদি: ১৩১-১৩২।
** মিহনাতুল মুসলিমিন ফি আহদিল মাক্কি, ড. সুলায়মান সুয়াইকিত: ৭৯।
* আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ কিরাআতুন লি জাওয়ানিবিল হাজরি ওয়াল হিমায়া: ৫০, ৫১।
* ইসতিখলাফু আবি বাকরিনিস সিদ্দিক, ড. জামাল আবদুল হাদি: ১৩২।
১০০ মিহনাতুল মুসলিমিন ফি আহদিল মাক্কি, ড. সুলায়মান সুয়াইকিত: ৭৫।

📘 আবু বকর সিদ্দিক রাঃ > 📄 রাসুলের পক্ষে প্রতিরোধ

📄 রাসুলের পক্ষে প্রতিরোধ


বীরত্ব ও বাহাদুরিতে আবু বকর ছিলেন অনুপম, অনন্য। সত্য তুলে ধরতে কোনো দ্বিধা করতেন না। দীনের সাহায্য, দীনের ওপর আমল, রাসুলের পক্ষ থেকে প্রতিরোধের প্রশ্নে তিনি কোনো সমালোচকের সমালোচনার পাত্তা দিতেন না। উরওয়া ইবনু জুবায়ের রা. বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আসকে প্রশ্ন করি, 'রাসুলের সঙ্গে মুশরিকদের সবচেয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ অসদাচরণ কী ছিল?'
জবাবে তিনি বলেন, 'একবার রাসুল কাবাপ্রাঙ্গণে সালাত পড়ছিলেন। এ সময় উকবা ইবনু আবি মুয়িত সেখানে পৌঁছায়। সে তার কাপড় রাসুলের গলায় প্যাচিয়ে অত্যন্ত কঠিনভাবে টেনে ধরে। ইতিমধ্যে আবু বকরও সেখানে পৌঁছান। তিনি উকবার উভয় কাঁধ ধরে রাসুল থেকে দূরে সরিয়ে দেন; আর তিলাওয়াত করেন-
أَتَقْتُلُوْنَ رَجُلًا أَنْ يَقُوْلَ رَبِّيَ اللَّهُ
তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ। [সুরা মুমিন: ২৮]
আনাস রা. থেকে বর্ণিত; একবার মুশরিকরা রাসুল-কে এত জঘন্যভাবে প্রহার করে যে, তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন। তখন আবু বকর রা. দাঁড়িয়ে উঁচু আওয়াজে বলতে থাকেন, 'তোমরা ধ্বংস হয়ে যাও, "তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ।"' [সুরা মুমিন: ২৮]
আসমা থেকে বর্ণিত; জনৈক সংবাদদাতা আবু বকরের কাছে এসে বলে, 'দ্রুত তোমার সাথির কাছে যাও।' আবু বকর কথাটি শুনে পত্রপাঠ বেরিয়ে পড়েন। তাঁর চুলগুলো ছিল চারটি বেণিতে বাঁধা। তিনি তখন এই বলে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, 'তোমরা ধ্বংস হও। "তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ।”” তিনি সেখানে গেলে তারা নবিজিকে ছেড়ে তাঁর উপর হামলে পড়ে। এরপর তিনি বাড়িতে এমন করুণ অবস্থায় ফেরেন যে, চুলের যে বেণিতেই হাত দিতেন তা হাতে চলে আসত।
আলির বর্ণনা; একবার তিনি ভাষণে বলেন, 'লোকসকল, বলো তো দেখি, মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বাহাদুর কে?' লোকজন বলল, 'আমিরুল মুমিনিন, আপনি।' তিনি বলেন, 'যে আমার মোকাবিলায় এসেছে, আমি তার থেকে পাওনা আদায় করে নিয়েছি। তবে সবচেয়ে বড় বাহাদুর হচ্ছেন আবু বকর। আমরা বদরযুদ্ধে নবিজির জন্য শামিয়ানা বানিয়েছিলাম। তখন প্রশ্ন উঠে, তাঁর পাশে কে থাকবেন? তাঁর ওপর হামলা হলে কে তা প্রতিহত করবেন? আল্লাহর শপথ, তখন কেবল আবু বকরই তরবারি হাতে নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। যে শত্রুই নবিজির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তিনি তার সামনে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন। অতএব নিঃসন্দেহে বলা যায়, তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বড় বাহাদুর। আমরা দেখেছি, কুরাইশরা রাসুলের পেছনে আঠার মতো লেগে গিয়েছিল। কেউ তাঁর ওপর ক্রোধ ঝাড়ত। কেউ তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিত। বলত, তুমি এতসকল মাবুদকে বাদ দিয়ে এক মাবুদ গ্রহণ করেছ। আল্লাহর শপথ, যে-ই তাঁর পাশে যেত, আবু বকর তাকে আক্রমণ করতেন এবং পালিয়ে যেতে বাধ্য করতেন। অনেককে ভালোমন্দ বলে দূর করে দিতেন। বলতেন, 'তোমরা ধ্বংস হও। "তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ।""
এরপর আলি রা. তাঁর চাদর সরিয়ে এ পরিমাণ কাঁদেন যে, অশ্রুতে তাঁর দাড়ি ভিজে যায়। তখন বলেন, 'আমি আল্লাহর শপথ দিয়ে তোমাদের জিজ্ঞেস করছি, 'বলো তো দেখি, ফিরআউন-পরিবারের (যে মুসা আ.-কে সাহায্য করেছিল) লোকটি উত্তম, নাকি আবু বকর?' প্রশ্নটি শুনে লোকজন নীরব হয়ে যায়। আলি রা. তখন বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আবু বকরের এক ঘণ্টার পুণ্য ফিরআউন- পরিবারের মুমিন ব্যক্তির সারা জীবনের পুণ্যের চেয়েও উত্তম। কেননা, ফিরআউন- পরিবারের ওই মুমিন তার ইমান লুকিয়ে রেখেছিল; আর আবু বকর তাঁর ইমান প্রকাশ করে বেড়াচ্ছিলেন।
আলির এই বর্ণনা হক-বাতিল এবং ইমান ও ভ্রষ্টতার মধ্যকার লড়াইয়ের চিত্র প্রদর্শন করে। আবু বকর এসব লড়াইয়ে যেসব কষ্ট ও বিপদ মোকাবিলা করেছেন, এর দ্বারা এসব লড়াইয়ের গুরুত্ব প্রকাশ পায়। আমাদের সামনে তাঁর ব্যক্তিত্ব উজ্জ্বল হয়ে ধরা দেয়। অনেক দিন গত হয়ে গেলেও আলি রা. সেই সত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন এবং তা বলতে গিয়ে নিজে এবং উপস্থিত জনতা এতটাই প্রভাবিত হন যে, সকলেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।
নবিজির পর আবু বকরই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যাঁকে দীনের জন্য কষ্ট দেওয়া হয়েছে। তিনিই ছিলেন প্রথম নির্ভীক বীর, যিনি আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ চালিয়ে গেছেন। অনুরূপ তিনিই ছিলেন সেই প্রথম মুবাল্লিগ, যিনি মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকেছিলেন।
তিনি ছিলেন নবিজির ডান বাহু; যিনি দীনের দাওয়াতে, তাঁর সঙ্গদানে, নতুন মুসলমানদের শিক্ষাদীক্ষা প্রদানে, তাদের সম্মান প্রদর্শন এবং রাসুলের সহায়তায় নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। আবু জার গিফারি রা. তাঁর ইসলামগ্রহণের কাহিনি বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, আবু বকর নবিজির কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আজ আবু জারকে পানাহার করানোর জিম্মাদারি আমাকে দিয়ে দিন।' নবিজি তাঁর আবেদন গ্রহণ করলে তিনি খাবারে তায়েফের মনক্কা পরিবেশন করেছিলেন।
তিনি যখন নবিজিকে সঙ্গ দিতেন, তখন নিজের ব্যাপারে কোনো শঙ্কাকে গুরুত্ব দিতেন না। তখন মূল চিন্তা থাকত রাসুল যেন কষ্ট না পান। স্বল্প হোক বা বেশি—যেখানেই নবিজির বিপদ দেখতেন, সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করতেন। মানুষ তাঁকে ঘেরাও করেছে দেখতে পেলেই তিনি তাঁর হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। নিঃশঙ্কচিত্তে তাদের ভেতর ঢুকে তাদের তাড়িয়ে দিতেন এবং চিৎকার দিয়ে বলতেন, 'তোমরা ধ্বংস হও। "তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ।” লোকজন তখন নবিজিকে ছেড়ে তাঁর ওপর হামলে পড়ত। ভীষণ মারধর করত। চুল ছিঁড়ে ফেলত তাঁর। অবস্থা করুণ না হওয়া পর্যন্ত পেটাতেই থাকত।

টিকাঃ
১০১ সহিহ বুখারি: ৩৮৫৬।
১০২ আস সাহিহুল মুসনাদ ফি ফাজায়িলিস সাহাবা, আদাবি: ৩৭।
১০০ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৩/৪; ফাতহুল বারি: ৭/১৬৯।
১০৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/২৭১, ২৭২।
১০০ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., মুহাম্মাদ আবদুর রহমান কাসিম: ২৯, ৩০, ৩২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00