📄 জাহেলি সমাজব্যবস্থায় আবু বকরের চারিত্রিক পুঁজি
জাহিলি যুগেও আবু বকর রা. কুরাইশের গণ্যমান্য ও সম্ভ্রান্ত মানুষের মধ্যে গণ্য হতেন। ইসলামপূর্ব যুগে কুরাইশের নয়টি পরিবারের নয়জনকে মর্যাদা ও আভিজাত্যে পুরো আরবে শীর্ষস্থানের অধিকারী মনে করা হতো, তাঁরা হচ্ছেন:
১. বনু হাশিম থেকে আব্বাস ইবনু আবদিল মুত্তালিব রা.। জাহিলি যুগে হাজিদের পানি পান করানোর দায়িত্ব তাঁর অধীনে ছিল। ইসলামি যুগেও এই মর্যাদা তাঁর হাতে থেকে যায়।
২. বনু উমাইয়ার মধ্যে আবু সুফিয়ান ইবনু হারব রা.। কুরাইশদের জাতীয় পতাকা ‘উকাৰ’-ধারণের দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। কুরাইশদের নেতৃবৃন্দ। যখন কোনো বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারতেন না, তখন তাঁকে সামনে বাড়িয়ে দিতেন।
৩. বনু নাওফালের হারিস ইবনু আমির। রিফাদাহ অর্থাৎ, কুরাইশের জাতীয় সাহায্য-তহবিলের জন্য অর্থসংগ্রহ এবং তা দিয়ে মুসাফিরদের সাহায্য করা ছিল তাঁর দায়িত্বে।
৪. বনু আসাদ থেকে উসমান ইবনু তালহা ইবনু জামআ ইবনু আসওয়াদ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলিতে পরামর্শ প্রদানের জন্য তাঁকে ডাকা হতো। কুরাইশরা জরুরি বিষয়ে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ ব্যতীত কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতো না। এ ছাড়া তাঁর হাতে ছিল হিজাবা তথা কাবার চাবি সংরক্ষণের দায়িত্ব।
৫. বনু তায়িম থেকে আবু বকর রা.। তাঁর দায়িত্বে ছিল আশনাক অর্থাৎ, জরিমানা ও রক্তপণের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ। তিনি কারও জামিন হলে কুরাইশরা একবাক্যে তা মেনে নিত। তবে অন্য কেউ কারও জামানত গ্রহণ করলে কুরাইশরা তার স্বীকৃতি দিত না।
৬. বনু মাখজুম থেকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.। কুবাবাহ মানে সেনাক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা এবং আয়িনা অর্থাৎ, অশ্বারোহীবাহিনীর নেতৃত্বপ্রদান ছিল তাঁর দায়িত্ব। তাঁরই নেতৃত্বে কুরাইশরা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত।
৭. বনু আদি থেকে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। সাফারাত-কূটনীতি তথা অন্যান্য জাতির সঙ্গে-পত্রযোগাযোগ ও আলাপ-আলোচনা ছিল তাঁর দায়িত্বে।
৮. বনু জুমাহ থেকে সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া রা.। আজলাম বা ভাগ্যনির্ধারণী তির সংরক্ষণ ও বিতরণের দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর।
৯. বনু সাহাম থেকে হারিস ইবনু কায়েস। হুকুমত অর্থাৎ, মামলা-মোকাদ্দমায় ফায়সালা দেওয়া এবং প্রতিমা তৈরি ও সংস্কারের দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর।⁶¹
সেই জাহিলি যুগেই আবু বকর রা. অভিজাত একজন কুরাইশি নেতা হিসেবে গণ্য হয়ে আসছিলেন। লোকজন বিভিন্ন সমস্যায় তাঁর কাছে আসত। মক্কায় মেহমানদারিতে তিনি আলাদা সুখ্যাতির অধিকারী ছিলেন।⁶²
এ ছাড়া তিনি আরও কিছু বিষয়ে সুখ্যাতির অধিকারী ছিলেন, যেমন:
১. ইলমুল আনসাব (বংশতালিকার জ্ঞান)
আরবের ইতিহাস এবং বংশতালিকা সম্পর্কে তাঁকে বিশেষজ্ঞ গণ্য করা হতো। এ ব্যাপারে তাঁর জানাশোনা ছিল বিস্ময়কর। তিনি ছিলেন আকিল ইবনু আবি তালিবসহ অনেক বংশবিশেষজ্ঞের শিক্ষক। তাঁর মধ্যে এমন কিছু গুণ ছিল, যার ফলে তিনি আরবের সর্বসাধারণের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিলেন। অন্যদের মতো বংশতালিকা বর্ণনায় কাউকে তুচ্ছ বা হেয়প্রতিপন্ন করতেন না। কারও দোষ খুঁজে বেড়াতেন না। ⁶³ কুরাইশের মধ্যে কুরাইশের বংশতালিকা সম্পর্কে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ। তাদের ভালোমন্দ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত ছিলেন। ⁶⁴ এ সম্পর্কে আয়েশা রা. বলেন, 'নিঃসন্দেহে তিনি কুরাইশের মধ্যে তাদের বংশতালিকা সম্পর্কে সর্বাধিক বিজ্ঞ ছিলেন। '⁶⁵
২. তিজারত (ব্যবসাবাণিজ্য)
জাহিলি যুগে তিনি ছিলেন খ্যাতিমান একজন ব্যবসায়ী। শাম, বসরাসহ বিভিন্ন শহরে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফর করতেন। ব্যবসায় তাঁর মোট পুঁজি ছিল ৪০ হাজার দিরহাম। অত্যন্ত উদারচিত্তে সম্পদ ব্যয় করতেন। জাহিলি যুগ থেকেই দান- খয়রাত এবং মেহমানদারিতে ছিলেন প্রসিদ্ধ। ৬৬
৩. গোত্রবাসীর ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু
ইবনু ইসহাক তাঁর সিরাতগ্রন্থে লেখেন, মানুষ তাঁকে সীমাহীন ভালোবাসত। তাদের মধ্যে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা ছড়িয়ে পড়েছিল। লোকজন বিভিন্ন কারণে তাঁর কাছে আসত। যেমন: জ্ঞানার্জন, ব্যবসা এবং উত্তম সঙ্গলাভের উদ্দেশ্যে। ⁶⁷ হাবশায় হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে বের হলে পথে ইবনুদ দাগানার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সে তখন স্পষ্ট করে বলে, 'আপনি বংশের সৌন্দর্য ও গৌরব। বিপদে মানুষকে সাহায্য করেন। দরিদ্র ও অসহায়দের সম্পদ দান করেন। মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেন। '⁶⁸
হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানি রাহ. ইবনুদ দাগানার এই বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, 'আবু বকরের সুমহান মর্যাদার মধ্যে ইবনুদ দাগানার এ কথাটি প্রণিধানযোগ্য যে, এখানে ইবনুদ দাগানা আবু বকরের ওই সব গুণের কথা আলোচনা করেছেন, যেগুলো উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রা. নবিজির ওপর ওহি অবতরণের সময় বলেছিলেন। এটি এক বিস্ময়কর মিল। চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রশংসা। কেননা, রাসুলের গুণাবলি শুরু থেকেই ছিল পূর্ণাঙ্গ। '⁶⁹
৪. জাহিলি যুগেও মদপান না করা
জাহিলি যুগেও তিনি ছিলেন পবিত্রতা ও সততায় অদ্বিতীয়। ইসলাম-আবির্ভাবের পূর্বেই নিজের ওপর মদপান হারাম করে রেখেছিলেন। তিনি যেমন জাহিলি যুগেও মদপান করেননি, তেমনই ইসলাম-পরবর্তী জীবনেও মদপান করেননি। একবার তিনি কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে একব্যক্তিকে দেখেন, সে মাতাল অবস্থায় নিজের মল মুখের কাছে নিয়ে আসছে; পরক্ষণেই দুর্গন্ধে তা সরিয়ে নিচ্ছে। এ অবস্থা দেখে তিনি বলেন, 'লোকটি কী করছে, সে বুঝতেই পারছে না; কেবল দুর্গন্ধের কারণে বেঁচে যাচ্ছে। '⁷⁰
এক বর্ণনায় আছে, আয়েশা রা. বলেন, আবু বকর ও উসমান রা. জাহিলি যুগ থেকেই মদপান থেকে দূরে ছিলেন।
একব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'আপনি কি জাহিলি যুগে মদপান করেছিলেন?' উত্তরে তিনি বলেন, 'আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি।' লোকটি জিজ্ঞেস করে, 'কেন পান করেননি?' তিনি বলেন, 'নিজ সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার খাতিরেই আমি এ থেকে দূরে থেকেছি। যে ব্যক্তি মদপান করে, সে তার সম্মান-সম্ভ্রম হারিয়ে ফেলে।*
৫. কখনো কোনো প্রতিমাকে সিজদা করেননি
আবু বকর রা. জীবনে কখনো কোনো প্রতিমার পূজা করেননি। সাহাবিদের এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, 'আমি কখনো কোনো প্রতিমার পূজা করিনি। যৌবনে একবার পিতা আবু কুহাফা আমার হাত ধরে একটি দেবালয়ে নিয়ে আমাকে বলেন, 'এই উঁচু মর্যাদার অধিকারী প্রতিমা তোমার মাবুদ।' এরপর তিনি আমাকে সেখানে রেখে চলে যান। আমি মূর্তির কাছে গিয়ে বলি- 'আমি ক্ষুধার্ত, খাবার দাও!' সে কোনো সাড়া দেয়নি। আমি ফের বলি, 'আমি উলঙ্গ; আমাকে পোশাক দাও!' এবারও সে কোনো জবাব দেয় না। আমি তখন একটি পাথর উঠিয়ে তার দিকে ছুড়ে মারলে সেটা ভেঙে পড়ে।
এভাবে তাঁর উন্নত জ্ঞানবুদ্ধি, স্বভাবজাত পবিত্রতা ও উত্তম চরিত্র তাঁকে জাহিলি কার্যকলাপ থেকে নিরাপদ রাখে। ⁷² যাঁর চরিত্রের এই অবস্থান, সত্যের দাওয়াতের ধারকদের মধ্যে তাঁর গণ্য হওয়া এবং রাসুলের পর পুরো উম্মাহর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি বিস্ময়কর হতে পারে না। রাসুল বলেন, তোমাদের মধ্যে জাহিলি জীবনে যারা উত্তম ছিল, ইসলাম-পরবর্তী জীবনেও তারা উত্তম-যদি তারা ইসলামকে সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম হয়। ⁷³
জাহিলি যুগে আবু বকরের জীবনধারা কেমন ছিল, এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে উসতাজ রাফিকুল আজম বলেন, 'হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি দীনের ছায়া ব্যতীত মূর্তিপূজার পরিবেশে জীবনযাপন করেছে, তাঁর চরিত্র ও মর্যাদার অবস্থা যদি এমন হয়, তাঁর পবিত্রতা ও সততা যদি হয় এত উন্নত, তাহলে অবশ্যই তিনি হবেন ইসলামকে অন্তরের গভীর থেকে ধারণের উপযুক্ত। চিরন্তন সত্যের পথপ্রদর্শক মহানবির ওপর প্রথম ইমান আনয়নকারী। অহংকারী ও আত্মম্ভরিদের নাকের ডগায় থেকে ইসলামগ্রহণপূর্বক ওদের সমূলে ধ্বংসকারী। হিদায়াতের পথ মসৃণকারী। নবির পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্তরসমূহ থেকে চরিত্রহীনতা দূরকারী। মন্দ আচরণের সমূলে উৎপাটনকারী। '*
আবু বকর রা.-কে আল্লাহ কতই-না সুমহান মর্যাদা দিয়েছিলেন। ইসলামগ্রহণের পূর্বেই অন্ধকার সমাজে তিনি ছিলেন মানবিক সৌকর্যমণ্ডিত, সর্বোত্তম চরিত্রের ধারক। অভিজাত চালচলনের অধিকারী। মক্কাবাসীরা তাঁকে মানবিক গুণাবলি এবং উত্তম চরিত্রে অন্যদের ওপর এগিয়ে থাকার সনদ আগেই দিয়ে রেখেছিল। দুর্বল মুসলমানদের নিয়ে কুরাইশের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার অভ্যাস থাকলেও তাদের মধ্যে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত না, যে ছিল তাঁর সমালোচনাকারী। তাঁকে হেয় বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যকারী। তাদের কাছে তাঁর একটিমাত্র ত্রুটিই ছিল; আর সেটি হচ্ছে-তিনি ছিলেন মুহাম্মাদ-এর নিঃশর্ত আনুগত্যকারী। *
টিকাঃ
৬১ আশহারু মাশাহিরিল ইসলাম: ১/১০।
৬২ নিহায়াতুল আরব: ১৯/১০; সূত্র তারিখুদ দাওয়াহ, ইয়াসরি মুহাম্মাদ হানি: ৪২।
৬৩ আত-তাহজিব: ২/১৮৩।
৬৪ আল-ইসাবা: ৪/১৪৬।
৬৫ সহিহ মুসলিম: ২৪৯০; আত-তাবারানি ফিল কাবির: ৩৫৮২।
৬৬ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, আলি তানতাবি: ৬৬; আত-তারিখুল ইসলামি, আল-খুলাফাউর রাশিদুন, মাহমুদ শাকির: ৩০১।
৬৭ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু হিশাম: ১/৩৭১।
৬৮ সহিহ বুখারি: মানাকিবুল আনসার: ৩৯০৫।
৬৯ আল-ইসাবা: ৪/১৪৭।
* সিরাতু ওয়া হায়াতুস সিদ্দিক, মাজদি ফাতহি: ৩৪১।
১ তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি: ৪৯।
* আসহাবুর রাসুল, মাহমুদ আল মিসরি: ১/৫৮; আল-খুলাফা, মাহমুদ শাকির: ৩১।
* তারিখুদ দাওয়াতিল ইসলাম ফি আহদিল খুলাফায়ির রাশিদিন: ৪৩।
৭২ তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি: ৫৭।
৭৩ সহিহ বুখারি: ৩৩৮৩; সহিহ মুসলিম: ২৩৭৮।
* আশহাবু মাশাহিরিল ইসলাম: ১/১২১।
* মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়াহ, ইবনু তাইমিয়া ৪/২৮৮-২৮৯; কৃত আবু বাকরিনিস সিদ্দিক