📄 ভূমিকা
হে আমার রব, তোমার মহীয়ান সত্তা ও বিশাল সাম্রাজ্যের মর্যাদাতুল্য প্রশংসা। তোমার প্রশংসা, যাবৎ-না তুমি সন্তুষ্ট হচ্ছ। তোমার প্রশংসা, যতক্ষণ-না তুমি রাজি হচ্ছ।
বাল্যকাল থেকেই সিরাতে আবু বকরের সঙ্গে ছিল আমার হার্দিক সম্পর্ক। আগ্রহ ছিল তাঁর চিত্তাকর্ষক সৌরভপ্রবাহী সিরাত পড়ার, শোনার। এই আবহের মধ্য দিয়েই কেটে যাচ্ছিল দিন-রাত, বছরের পর বছর। এরই মধ্যে আল্লাহ তাঁর অপার অনুগ্রহে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে জ্ঞানার্জনের তাওফিক দান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি ইতিহাসে আমার পাঠ্যতালিকায় ছিল খুলাফায়ে রাশিদার ইতিহাস। আমার প্রিয়তম শিক্ষক এ ক্ষেত্রে কেবল শায়খ মাহমুদ শাকিরের আত-তারিখুল ইসলামির ওপর নির্ভর না করে আল্লামা ইবনু কাসিরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া এবং ইবনু আসিরের আল-কামিল অধ্যয়নের ওপর জোর দেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কৃপা এবং উসতাজের দিকনির্দেশনার ফলে গ্রন্থগুলো আবু বকর সিদ্দিকের ব্যক্তিত্ব, তাঁর সময়ের বাস্তবতা বুঝতে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
এরপর আমি জামিয়া উম্মু দুরমানে ডক্টরেট করতে নাম তালিকাভুক্ত করলে আমার নিবন্ধের শিরোনাম দেওয়া হয় ফিকহুত তামকিন ফিল কুরআনিল কারিম ওয়া আসরুহু ফি তারিখিল উম্মাহ। নিবন্ধটি তিনটি অধ্যায়ভুক্ত হওয়ার কথা নির্ধারিত হয়। যথা:
১. ফিকহুত তামকিন ফিল কুরআনিল কারিম।
২. ফিকহুত তামকিন ফিস সিরাতিন নাবাবিয়া।
৩. ফিকহুত তামকিন ইনদাল খুলাফায়ির রাশিদিন।
এভাবে লিখতে গিয়ে নিবন্ধটি ১২০০ পৃষ্ঠা অতিক্রম করে। এ কারণে নিরীক্ষকের সিদ্ধান্ত ছিল-আমরা শুধু ফিকহৃত তামকিন ফিল কুরআনিল কারিমকেই যথেষ্ট মনে করব এবং শেষে এর ভিত্তিতেই নিবন্ধটি পরিমার্জন করা হয়। এরপর সিদ্ধান্তটি কমিটির সামনে উপস্থাপন করে সবার মতামতও নেওয়া হয়। তাদের পারস্পরিক আলোচনা শেষে আমাকে বলা হয়- 'এবার তুমি ফিকহুত তামকিন ফিস সিরাতিন নাবাবিয়াহ এবং ফিকহুত তামকিন ইনদাল খুলাফায়ির রাশিদিন অধ্যায় দুটি মুসলমানদের উপকারের লক্ষ্যে গ্রন্থাকারে ছাপাতে পারো।'
আল্লাহর অনুগ্রহে ফিকহুত তামকিন ফিল কুরআনিল কারিমের মধ্যে বিবর্তন আসে; আর আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ বিস্তৃত উপস্থাপনা ও বিশ্লেষণের রূপ ধারণ করে এবং তা দাবুত তাওজি ওয়ান নাশরিল ইসলামিয়া থেকে প্রকাশিত হয়।
আবু বাকরিনিস সিদ্দিক শাখসিয়াতুহু ওয়া আসরুহ গ্রন্থটি আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের ফল। এর কৃতিত্ব সেই মহান নিরীক্ষক এবং আলিম, শায়খ ও দায়িদের, যাঁরা এ ব্যাপারে আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। তাঁদের একজনের কথা আমার অন্তরে বেশ দাগ কাটে। তিনি আমাকে বলেন, 'মুসলমানদের নতুন প্রজন্ম এবং খুলাফায়ে রাশিদার যুগের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জীবনী আলোচনার ক্ষেত্রে কাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে, সে ব্যাপারে নতুন প্রজন্ম বেশ দ্বিধায় ভোগে।
বর্তমান প্রজন্ম খুলাফায়ে রাশিদিনের জীবনী আলোচনার চেয়ে উম্মাহর মহান আলিম এবং যুগ-সংস্কারকদের জীবনীর সঙ্গে বেশি সম্পর্ক রাখছে; অথচ খুলাফায়ে রাশিদিনের শাসনকাল রাজনৈতিক, তথ্য আদান-প্রদানকেন্দ্রিক, চারিত্রিক, অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, জিহাদি এবং ফিকহি বিষয়াদিতে ভরপুর। এগুলোর চর্চা আজ আমাদের বেশি প্রয়োজন। প্রয়োজন একটি মুসলিম রাষ্ট্রে কী ধরনের দপ্তরাদি থাকবে, তা অন্বেষণ করা। লক্ষ করি, কালপরিক্রমায় মুসলিম উম্মাহ যখন পারস্য ও রোমানসভ্যতার সংস্পর্শে এসেছিল, তখন এসব দাপ্তরিক বিষয়ে কী বিবর্তন এসেছিল। কী পরিবর্তন এসেছিল আকাশনীতি, অর্থনীতি, খিলাফত-ব্যবস্থাপনা, সমরবিভাগ এবং আমলাদের নিয়োগ-সংক্রান্ত দাপ্তরিক বিভিন্ন কার্যক্রমে। তারা এতে কী নতুনত্ব নিয়ে এসেছিলেন। তখন ইসলামি বিজয়াভিযানসমূহের চরিত্রই-বা কেমন ছিল।
সুচিন্তিতভাবেই এ গ্রন্থটি লেখা শুরু হয় এবং আল্লাহ এ ইচ্ছাকে বাস্তবতায় রূপায়িত করার তাওফিক দিয়েছেন। সব জটিলতা সহজ করে দিয়েছেন। উৎস এবং উদ্ধৃতিগুলো সংগ্রহের পথ মসৃণ করে দিয়েছেন। সর্বোপরি আমার চেতনায়, মস্তিষ্কে এর সমাপ্তি টানার এক অদম্য তাড়না ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আমি গ্রন্থটিকে আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হিসেবে স্থির করি। ক্রমাগত রাতজাগা শুরু করি। জটিলতা এবং বাধাবিপত্তির কোনো তোয়াক্কা করিনি। আল্লাহর সীমাহীন অনুগ্রহ যে, এ ক্ষেত্রে তিনি আমাকে পদে পদে সাহায্য করেছেন। কবির ভাষায়,
ঢুকতে চেয়েছিল আমার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যখানে ভীতি কিন্তু অস্থিরতা ছাড়াই আমি লেগে থাকি নিতি। হইনি শিকার কোনো হীনম্মন্যতার কিংবা নিরাশ, সন্দিহান প্রভুর অনুগ্রহ থেকে। মৃত্যুর ব্যাপারে আমার ভয় নেই কোনো আল্লাহ যে আমার উদ্দেশ্য সম্পাদনকারী।
নিঃসন্দেহে খুলাফায়ে রাশিদার জীবনকাল শিক্ষাদীক্ষায় পরিপূর্ণ, যা ছড়িয়ে- ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস, হাদিস, ফিকহ, সাহিত্য, তাফসিরের বিভিন্ন কিতাব ও উৎসগ্রন্থে। আমাদের জন্য জরুরি হচ্ছে, এগুলো সংকলন করা, বিন্যস্ত করা, সত্যায়ন করা এবং এর মধ্যকার জটিলতার সমাধান বের করা। খিলাফাহর ইতিহাস সুন্দর আঙ্গিকে উপস্থাপন করা গেলে এগুলো হতে পারে আত্মার খোরাক, অন্তরের প্রশান্তি এবং চিন্তার পরিশুদ্ধায়ক। এগুলোর মাধ্যমে জ্ঞানবুদ্ধি হতে পারে শানিত, সাহস হতে পারে উন্নত। পাওয়া যেতে পারে শিক্ষা ও উপদেশ। চেতনায় আসতে পারে অপার্থিব দৃঢ়তা। এর মাধ্যমে পেতে পারি নতুন প্রজন্মকে 'মিনহাজুন নুবুওয়াহ' তথা নববি পথে পরিচালনার দিকনির্দেশনা। সঠিক ধারণা লাভ করতে পারি সেই আলোকসত্তা ও তাঁদের সময় সম্পর্কে, যাঁদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, যেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। এটিই মহাসাফল্য। [সুরা তাওবা: ১০০]
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল; তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেরা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টিকামনায় তুমি তাদের রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবে। তাদের লক্ষণ হচ্ছে, তাদের মুখমন্ডলে সিজদার প্রভাব পরিস্ফুট থাকবে; তাওরাতে তাদের বর্ণনা এরূপ এবং ইনজিলেও তাদের বর্ণনা এরূপ।
তাদের দৃষ্টান্ত একটি চারাগাছের মতো, যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়, এর পর তা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কান্ডের ওপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে, যা চাষির জন্য আনন্দদায়ক। এভাবে আল্লাহ মুমিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন। যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের। [সুরা ফাতহ : ২৯]
যাঁদের ব্যাপারে রাসুল বলেছেন, আমার উম্মাহর সর্বোত্তম ব্যক্তি তারা, যাদের কাছে আমি প্রেরিত হয়েছি।¹
যাঁদের সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের বর্ণনা হচ্ছে, 'যারা অনুসরণ করবে, তারা যেন কালজয়ী সাহাবিগণের অনুসরণ করে। জীবিতদের অনুসরণের ক্ষেত্রে ফিতনার আশঙ্কা থাকে। অনুসরণীয় কেবল মুহাম্মাদ-এর সাথিগণই। আল্লাহর শপথ, তাঁরাই ছিলেন এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তাঁদের অন্তর ছিল পুণ্য অর্জনে অস্থিরপ্রায়। তাঁদের মধ্যে ছিল না কোনো লৌকিকতা। তাঁরা ছিলেন এমন, আল্লাহ যাঁদের তাঁর দীন ও রাসুলের সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। তাই তোমরা তাঁদের মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে অবগত হও। তাঁদের অনুসরণ করো। যথাসম্ভব তাঁদের চরিত্র ও দীনদারি ধারণে নিবেদিত হও। নিঃসন্দেহে তাঁরা ছিলেন সরলপথের পথিক এবং হিদায়াতের ওপর অধিষ্ঠিত।'²
সাহাবিগণই সমাজের সব ক্ষেত্রে ইসলামি বিধিবিধানের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন করে গেছেন-সব যুগের জন্য, পূর্ব থেকে পশ্চিমে। কেননা, তাঁদের সময় ছিল শ্রেষ্ঠ সময়। তাঁরাই উম্মাহকে শিখিয়েছেন কুরআন। তাঁরাই শিক্ষা দিয়ে গেছেন রাসুলের সুন্নাহ ও সিরাত। তাই তাঁদের ইতিহাস এমন এক অমূল্য রত্নাগার, যেখানে বিদ্যমান রয়েছে চিন্তাচেতনা, সভ্যতা, প্রজ্ঞা, জিহাদ, বিজয় এবং জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে আচরণের শিক্ষা। তাঁদের এই আলোকিত ইতিহাস ও সত্য-সরল নীতি সহায়ক হতে পারে সেই অনাগত স্বপ্নচারী মানুষের জন্য, যারা এর আলোকে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে চায় অন্যদের কাছে। তুলে ধরতে চায় তাঁদের সময়ের গুরুত্ব।
ইসলামের শত্রু-বিশেষ করে ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান, সেকুলার, কমিউনিস্ট এবং রাফিজিরা সেই আলোকোজ্জ্বল ইতিহাসের গুরুত্ব ও শক্তির ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরেছিল। এ জন্য তাদের সেই ইতিহাস কলঙ্কিত করা, কুৎসিত আকারে তুলে ধরা, তাতে বিকৃতিসাধন এবং নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে সংশয়ী করার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে দেখা যায়। অতীতে এ ক্ষেত্রে ওদের কালোহাত জঘন্যতার স্বাক্ষর রেখেছে; আর বর্তমানে সেই কাজ আনজাম দিচ্ছে ইয়াহুদি-খ্রিষ্টানদের মদদপুষ্ট প্রাচ্যবিদ নামের জ্ঞানপাপীর দল।
ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান, অগ্নিপূজারি ও রাফিজিদের হাতে আমাদের ইতিহাস কম বিকৃত হয়নি। এরা বাহ্যত নিজেদের মুসলিম হিসেবে প্রকাশ করছিল; কিন্তু তাদের অন্তরে ছিল কুটিল কুফরি। যখন দেখতে পাচ্ছিল, ইসলামের ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রার মোকাবিলায় নিজেরা ব্যর্থ ও কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন তারা গোটা ইসলামকেই ধ্বংস করে দেওয়া, ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে ছিন্নভিন্ন করা এবং মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করার তৎপরতায় লেগে যায়।
এ ধারাবাহিকতায় তারা সত্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন এবং মিথ্যা প্রচারণা শুরু করে। একপর্যায়ে তারা খলিফায়ে রাশিদ উসমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে সমাজে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করতে থাকে। আবদুল্লাহ ইবনু সাবা এবং তার দাজ্জাল সঙ্গীরা এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এদের মিথ্যা প্রচারণার ফলেই উসমান রা. শাহাদাতবরণ করেন। একইভাবে উটের যুদ্ধে যখন উভয় পক্ষের ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়, তাঁদের মধ্যে সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়, তখন ওই চক্রান্তকারীরা যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এ ছাড়া তাদের আরও কিছু চক্রান্ত ও অপতৎপরতা ছিল, যেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম এবং মুসলিমদের ধ্বংস করা। তা ছাড়া তারা ইসলামি ইতিহাসে মিথ্যা কাহিনি ও বর্ণনা ঢুকিয়ে সাহাবিদের নির্মল চরিত্র কলঙ্কিত করার প্রয়াস পায়। যেমন: তাহকিমের ঘটনা-যেখানে কতিপয় সাহাবিকে ধোঁকাবাজ এবং দুনিয়ালোভী হিসেবে চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে। অনেককে মূর্খ, অশিক্ষিত, অসভ্য হিসেবে চিত্রিত করার ঘৃণ্য চেষ্টা করা হয়েছে। অনুরূপ মনগড়া বর্ণনার মাধ্যমে ইসলামকে অভিযুক্ত করা এবং সমালোচনার পাত্র বানানো ছিল ওই কুচক্রীদের অন্যতম লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। কারণ, ইসলাম তো আমাদের কাছে সাহাবিদের মাধ্যমেই এসেছে। তাই সাহাবিদের বিশ্বস্ততা ও ন্যায়পরায়ণতাকে কলঙ্কিত করা গেলে ইসলামকে আলাদাভাবে কলঙ্কিত করার প্রয়োজন থাকবে না। তখন এমনিতেই ইসলামের সত্যতা ও অকাট্যতায় সন্দেহ দানা বেঁধে উঠবে। প্রাচ্যবিদ ও আমাদের মধ্যকার একশ্রেণির আধুনিক ইতিহাসবিদ এসব মনগড়া বক্তব্যকে পুঁজি করে সাহাবিদের ওপর জিহ্বা লম্বা করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। তারা তাদের দৃষ্টি কেবল এ দিকেই নিবন্ধ রাখছে। ওইগুলোকেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে নিয়ে আসছে। সাহাবিদের মধ্যকার মানবিক যৎসামান্য দুর্বলতাকে গনিমত মনে করছে। এগুলো সংগ্রহ ও প্রচারে কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে, সেই প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা এমনসব বিষয় তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়ায়, যার মাধ্যমে কোনো-না কোনোভাবে সাহাবিগণকে দোষারোপ কারা যায়, তাঁদের কলঙ্কিত করা যায়।
ইসলামের শত্রুরা ইসলামের ইতিহাসকে তাদের মতো করে উপস্থাপনের প্রয়াস চালায়। আমাদের কতিপয় মুসলিম ইতিহাসবিদ ওদের দ্বারা বেশ প্রভাবিত হন। গত কয়েক দশকের ইতিহাসবিদদের প্রতি তাকালে দেখা যাবে তারা প্রাচ্যবিদ, কমিউনিস্ট, রাফিজি এবং ইয়াহুদিদের 'হ্যাঁ'-তে 'হ্যাঁ' করছেন, 'না'-তে 'না' করছেন। ইসলামি ইতিহাসের সঠিক জ্ঞান তাদের মধ্যে ছিল অনুপস্থিত; অথচ ইসলামি ইতিহাস সম্পর্কে কলম ধরার পূর্বশর্ত হচ্ছে, লেখককে ইসলামি চিন্তাচেতনার বাস্তবতা এবং ইসলামি জীবনধারা ও ঘটনাবলির ব্যাপারে পূর্ণ ধারণা রাখতে হবে। মানুষের পোষণকৃত সাধারণ ধ্যানধারণার সঙ্গে ইসলামকে তুলনা করা যাবে না। ইসলামকে মনে করতে হবে আত্মা ও চেতনাগঠনের প্রভাবক শক্তি। সঠিক জ্ঞান রাখতে হবে ইসলামি ব্যক্তিদের জীবনাচার সম্পর্কে। অবহিত হতে হবে তাদের মনমানসিকতা সম্পর্কে। এসবের অবহিতিই মানুষের মানসগঠনে বড় ভূমিকা রাখে। ওই শ্রেণির সংকলক ও ইতিহাসবিদ ইসলামের সত্যিকার রূপ তুলে ধরার সামর্থ্য রাখেন, যারা অন্তরের গভীর থেকে ইসলাম গ্রহণ করে থাকেন, যাদের বোধ ও কথা হয় তাদের অন্তরের আওয়াজ।
প্রাচ্যবিদদের অনুসরণের ফলে সমকালের কতিপয় ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক ও লেখককে সালাফদের চরিত্র বিকৃত করতে দেখা যায়। এরা তাঁদের এমনভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস পায়, যেন তাঁরা দুনিয়ার লোভে অন্ধ হয়ে পড়েছিলেন। ক্ষমতার মোহে রক্তপাতে এবং একে অন্যকে নীচু করে ক্ষমতাপ্রদর্শনে মেতে উঠেছিলেন। এরা মূলত নববি শিক্ষায়তনে শিক্ষাপ্রাপ্ত সাহাবিদের বাস্তব অবস্থান অনুধাবনই করতে পারেনি। এরা নিজেদের ইসলামের বিশ্বাস এবং সংস্কৃতিতে উত্তীর্ণ না করেই কলম ধরার দুঃসাহস দেখিয়েছে। এদের এসব লেখালেখির কারণেই এমন এক প্রজন্ম গড়ে উঠছে, যারা নিজেদের সঠিক ইতিহাস কী, তা জানে না। ইতিহাসের নাম শুনলেই তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র, যেখানে দেখতে পায় কেবল ক্ষমতাপ্রদর্শনের* বহুমাত্রিক রূপ। এভাবে তাদের দৃষ্টিতে সাহাবিদের মর্যাদা সমুন্নত থাকে না। এর জঘন্য প্রভাব এতটাই সক্রিয় যে, মুসলিম যুবশ্রেণি না বুঝেই এসব বানোয়াট ও মনগড়া বর্ণনাগুলো কেবল এ জন্য বিশ্বাস করে থাকে যে, এগুলো 'জায়েদ- আমরের' মতো কতিপয় গবেষক তাদের গ্রন্থে লিখেছেন।
ইসলামি ইতিহাসকে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের নীতির আলোকে পুনর্বিন্যাস করা এখন জরুরি। আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ক্ষেত্রে এই প্রয়াস শুরু হয়ে গেছে। কাজটি কিন্তু এমনিতেই শুরু হয়নি। আল্লাহ তো তাঁর দীনরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই তিনিই এমনকিছু মানুষ তৈরি করেছেন, যারা এসব ঘটনা অনুসন্ধান করে সত্যকে আলাদা করে দিচ্ছেন। মনগড়া বর্ণনাকারীদের চেহারা তুলে ধরছেন। এই যে গবেষণাকর্ম, প্রথমত এটা আল্লাহর বিশাল অনুগ্রহ। দ্বিতীয়ত এর কৃতিত্ব মুহাদ্দিস ও ফকিহদের। তাঁদের রচনাবলিতে এতৎসংক্রান্ত প্রচুর সত্য বর্ণনা বিদ্যমান, যেগুলোর মাধ্যমে মনগড়া বর্ণনাকারীদের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া সম্ভব।
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের গবেষণাপদ্ধতি অনুসরণ করে আমি নতুন- পুরাতন উৎসসমূহ ঘাঁটতে থাকি। খিলাফতে রাশিদার যুগ সম্পর্কে জানতে কেবল তাবারি, ইবনু আসির, জাহাবিসহ প্রসিদ্ধ ইতিহাসগ্রন্থের ওপরই নির্ভর করিনি; বরং তাফসির, হাদিস, হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ, জারাহ-তাদিলের কিতাবসহ ফিকহের কিতাব অধ্যয়নও নিজের ওপর বাধ্যতামূলক করে নিই। এসব কিতাবে এ বিষয়ে প্রচুর প্রমাণপঞ্জি পাই, যেগুলো সচরাচর ইতিহাসগ্রন্থে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি আবু বকরের জীবনী ও তাঁর সময়কে আলোচ্যবিষয় নির্ধারণ করে এ সম্পর্কে লিখতে শুরু করেছি।
তিনি ছিলেন খুলাফায়ে রাশিদার অগ্রপথিক, যাঁদের সুন্নাহ অনুসরণ করতে খোদ নবিজি আমাদের নির্দেশ ও উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমরা আমার এবং আমার পরে হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদার সুন্নাত অনুসরণ করো।'* আবু বকর রা. ছিলেন নবিদের পর মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তিনি সিদ্দিকদের নেতা, সালিহিনদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সাহাবিদের মধ্যে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে বেশি প্রাজ্ঞ। তাঁর সম্পর্কে রাসুলের বক্তব্য হচ্ছে, 'আমি মানুষের মধ্যে কাউকে বন্ধু বানালে আবু বকরকেই বানাতাম; কিন্তু সে আমার ভাই ও সাথি।* অনুরূপ তাঁর এবং উমর রা. সম্পর্কে রাসুলের বক্তব্য হচ্ছে, 'আমার পরে আবু বকর এবং উমরের অনুসরণ করো।’
উমর রা. তাঁর সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেন, 'আপনি আমাদের নেতা, আমাদের সবার মধ্যে উত্তম, নবিজির কাছে সবচেয়ে প্রিয়তম।'¹⁰
মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া তাঁর পিতা আলিকে প্রশ্ন করেন, 'নবিজির পর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি কে?' জবাবে আলি রা. বলেন, 'আবু বকর।'¹¹
আবু বকরের জীবন ইসলামি ইতিহাসের এমন এক হিরণ্ময় অধ্যায়, যা সকল ইতিহাসের ওপর মহিমাময়। যে সম্মান, মর্যাদা, উচ্চতা, উন্নত নীতি, জিহাদ ও দাওয়াতের ওপর এ ইতিহাসের ভিত্তি, পুরো মানবসভ্যতার ইতিহাস তা থেকে শূন্য। এ জন্য আমি তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি, সংবাদ, জীবনাচার ও সময়কে আলোচ্যবিষয় নির্ধারণ করে উৎসগ্রন্থের সাগরে ডুব দিয়ে মণিমাণিক্য তুলে আনার চেষ্টা করেছি। এগুলো পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ ও সমন্বয় করে বিন্যস্ত, সত্যায়িত ও সহজ করার চেষ্টা করেছি, যাতে ইসলামের দায়ি, আলিম-উলামা, খতিব, বক্তা, রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিসহ উসতাজ-ছাত্র সকলেই অবগত হতে পারেন, উপকৃত হতে পারেন। দুনিয়া ও আখিরাত আলোকোজ্জ্বল করার লক্ষ্যে নিজেদের জীবনে তাঁর সুন্নাহ প্রতিষ্ঠিত করে নিতে পারেন।
আমি আবু বকরের মর্যাদা ও গুণাবলি, রাসুলের সঙ্গে তাঁর জিহাদে উপস্থিতি এবং নবিজির ইনতিকালের পর মদিনার সমাজব্যবস্থায় তাঁর সুমহান কৃতিত্ব প্রভৃতি বিষয়গুলো তন্নতন্ন করে খুঁজে বের করে সংকলিত করেছি। সাকিফায়ে বনি সায়িদায় আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যকার আলাপ-আলোচনার চিত্র তুলে ধরে এর ওপর আলোকপাত করেছি। এ ধারাবাহিকতায় প্রাচ্যবিদ, রাফিজি এবং তাদের অনুসারীরা যেসব সংশয় জাগানোর অপচেষ্টা করেছে, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে, সেগুলোর ভ্রান্তি তুলে ধরেছি। সংশয়গুলোর নড়বড়ে ভিত্তি প্রকাশ করে দিয়েছি।
উসামা-বাহিনীকে পাঠানোর সময় সিদ্দিকে আকবরের অবস্থান বর্ণনাপ্রসঙ্গে ওই মহান ঘটনায় শূরাব্যবস্থাপনা, দাওয়াত, সৎসাহস, দৃঢ়তা, রাসুলের পূর্ণ আনুগত্য, অনুসরণ, কিতাব-সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তন, জিহাদের আদাব, এতৎসংক্রান্ত শিক্ষা ও উপদেশ যা আছে, সবই উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। ইরতিদাদি ফিতনার প্রসঙ্গ বিশ্লেষণসহ আলোচনায় এনেছি। এর কারণ ও প্রকার উল্লেখ করেছি। বলার চেষ্টা করেছি, কীভাবে নবিজীবনের শেষ দিকে এই ফিতনার আবির্ভাব ঘটেছিল। সেটা দমনে আবু বকর কী অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন? এই কালো ফিতনা দমনে তিনি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যেসব পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন, যুদ্ধে যেসব নীতি অবলম্বন করেছিলেন, তা-ও বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সিদ্দিকে আকবরের সেসব যোগ্যতার কথা স্পষ্ট করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, যেগুলো তাঁর ব্যক্তিসত্তায় নিহিত ছিল এবং যে যোগ্যতার বলে আল্লাহর তাওফিক আর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইরতিদাদি ফিতনা তিনি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আলোচনার চেষ্টা করেছি তাঁর সময়ে বিজয় ও আধিপত্যের শর্ত, উপাদান এবং কারণসমূহ কী পরিমাণ বিদ্যমান ছিল, তা নিয়ে। সেই প্রজন্মের কথাও বলেছি, যাঁদের নিয়ে তিনি এই বিশাল ফিতনার মোকাবিলা করেছিলেন। আলোচনা করেছি কীভাবে তিনি বহিরাগত হস্তক্ষেপ বন্ধ করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক কৌশলও স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। ইরতিদাদি ফিতনার পরিণাম সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। যেমন : বলেছি, ইসলাম অপরাপর চিন্তাচেতনা, বোধ, আচার-আচরণ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামি সমাজব্যবস্থার ভিত ছিল সুদৃঢ়। আরব উপদ্বীপকে গড়ে তোলা হয়েছিল ইসলামের কেন্দ্র। তৈরি করা হয়েছিল বিজয়ের জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব।
আলোচনা করেছি ইরতিদাদি ফিতনা থেকে উদ্ভূত উপলব্ধি, চক্রান্তকারীদের তাদেরই চক্রান্তজালে জড়িয়ে ফেলার ঐশী সুন্নাহ এবং আরব উপদ্বীপে ইসলামি হুকুমত স্থিতিশীল করার কথা। একইভাবে সিদ্দিকি শাসনামলের বিজয়াভিযানের ওপরও আলোকপাত করেছি। ইরাক-যুদ্ধের ব্যাপারে তাঁর উন্নত পরিকল্পনা এবং কার্যপদ্ধতিও আলোচনা থেকে বাদ দিইনি। আলোচনা করেছি তাঁর নিযুক্ত দিগ্বিজয়ী মহান সাহাবি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের বিজয়গাথা। জিহাদের মাধ্যমে কীভাবে তিনি ইরাকের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল ইসলামি হুকুমতের আওতায় নিয়ে এসেছিলেন, সে বিষয়ও ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। মুসান্না ইবনুল হারিসা, কা'কা ইবনু আমর এবং খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কৃতিত্ব, তাঁদের অধীন মুজাহিদদের অকল্পনীয় বাহাদুরি ও আত্মত্যাগের বিষয়ও বাদ যায়নি। বলার চেষ্টা করেছি, সিদ্দিকি শাসনামলই ছিল পরবর্তী বিজয়সমূহের প্রথম পদক্ষেপ, যে বিজয়গুলো অন্ধকার দূর করে বিশ্বকে করে তুলেছিল আলোকিত; আর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকে তুলে ধরেছিল উজ্জ্বলতম অধ্যায় হিসেবে।
কবি কতই-না সুন্দর বলেছেন,
জ্বলজ্বল করছে পবিত্র রঙে কাদিসিয়ার ঘটনা পরতে পরতে যার নিরন্তর শিক্ষা ও উপদেশ। যা তুলে ধরে আমাদের গৌরবজনক অবস্থান পরবর্তী সময়ে হিত্তিন-প্রান্তর হয়েছিল এমন ঘটনার সাক্ষী। সম্মান ও বীরত্বের এ পাতাগুলো থাকবে চিরঞ্জীব হয়ে মানুষ দ্বিধা ছাড়াই এগুলোর অনুসরণ করবে আমি দেখতে পাচ্ছি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এবং তাঁর সেনাদের হাতে থাকা চোখধাঁধানো বর্শা। উড়তে দেখেছি বিজয়-পতাকা ফিলিস্তিন-ভূমে, যিনি পবিত্র পর্বতগুলো তাঁর ছায়া দ্বারা ঢেকে দিয়েছিলেন। ডান দিক থেকে আবু উবায়দা প্রকাশ পেলে, বাম থেকে আবির্ভাব ঘটে মহান গাজি সালাহুদ্দিন আইয়ুবির। তাঁরাই ওদের দিকে এগিয়ে যায়, যাঁরা জিহাদে প্রতিযোগিতা করে যারা নিজেদের রুহকে আল্লাহর হাওয়ালা করে থাকে। আল্লাহর কিতাবে তাঁদের সম্মানী বলা হয়েছে আল্লাহর আদেশের পর আর কারও আদেশের প্রয়োজন নেই।
আবু বকর সিদ্দিক, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এবং ইয়াজ ইবনু গানাম রাজিআল্লাহু আনহুমের মধ্যকার যেসব পত্র আদান-প্রদান হয়েছে, গুরুত্বসহকারে সেগুলোও আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। সেই বিষয়টিও বিস্তারিত তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, শাম বিজয়ের সময় আবু বকর রা. যা আমলে নিয়েছিলেন। যেমন: জিহাদের ব্যাপারে শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের পরামর্শগ্রহণ, ইয়ামেনবাসীকে জিহাদের প্রতি আহ্বান, সেনা পাঠানোর ক্ষেত্রে তাঁর কর্মপদ্ধতি, সেনাপ্রধানদের উপদেশ, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে ইরাকের রণপ্রান্তর থেকে সরিয়ে এনে শামের যুদ্ধে নিযুক্তি এবং আজনাদায়ন ও ইয়ারমুকের ঘটনাবলি।
এ ছাড়া এসব বিজয় থেকে পররাষ্ট্রনীতিতে আবু বকরের বৈশিষ্ট্য কী ছিল, তা-ও তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। যেমন: ভিনদেশের অধিবাসীদের মধ্যে ইসলামি রাষ্ট্রের ভয় ধরিয়ে দেওয়া, নবিনির্দেশিত জিহাদ চলমান রাখা, বিজিত অঞ্চলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে নম্র ব্যবহার, জোরজবরদস্তি ও বাড়াবাড়ি পরিহার, সাধারণ মানুষ, দায়ি এবং উম্মাহর সংস্কারবাদীদের মধ্যকার আড়াল ও বাধা অপসারণ ইত্যাদি। অনুরূপ আমি সিদ্দিকে আকবরের রণকৌশলের ব্যাপারটিও স্পষ্ট করেছি। যেমন: শত্রুরাষ্ট্র যতক্ষণ-না আনুগত্য স্বীকার করবে, ততক্ষণ এর ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না। রণপ্রস্তুতি ও সৈন্যসমাবেশ ঘটানোর সক্ষমতা, অব্যাহতভাবে সামরিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ পরিষ্কার করা, যুদ্ধের উদ্দেশ্য নির্ধারণ, ময়দানের পরিস্থিতিকে অগ্রাধিকার প্রদান, নেতৃত্ব থেকে অপসারণ, যুদ্ধনীতির মধ্যে ক্রমাগত পরিবর্তনসাধন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও অধিনায়কদের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় করা ইত্যাদি। আবু বকর রা. তাঁর অধিনায়কদের যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন, সেগুলোর আলোকে সৈনিক ও সেনানায়কদের অধিকার নিয়েও আলোচনা করেছি। জীবনের শেষ মুহূর্তে খলিফা হিসেবে উমর রা.-কে নিযুক্তকরণ সম্পর্কে তাঁর উক্তিগুলোও উল্লেখ করেছি। তাঁর জীবনের সর্বশেষ কথা ছিল, 'আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দান করো এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করো।'
আবু বকর রা. ইসলাম কীভাবে বুঝলেন এবং কীভাবে তা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করলেন, যুদ্ধে প্রকাশমান সমস্যাগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করলেন-এই গ্রন্থে এগুলোও আলোচনার চেষ্টা করেছি। আলোচনা করেছি তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিকসমূহ। যেমন: রাজনীতি, সামরিক বিষয়াদি, দাপ্তরিক কর্মযজ্ঞ এবং ইসলামি সমাজব্যবস্থায় তিনি কেমন ছিলেন, কেমন ছিল তাঁর ইসলামপূর্ব জীবন, এটাও আলোচনায় এনেছি। বলেছি, তিনি একজন বিরল শাসক হিসেবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক রাজনৈতিক বিষয়গুলো কীভাবে পর্যালোচনা করতেন। আলোচনায় এনেছি তাঁর যুগে কীভাবে আদালতস্থাপনার সূচনা হয়েছিল, তা-ও যাতে আমরা জানতে পারি তাঁর শাসনামলসহ খিলাফতে রাশিদার যুগে ইসলামি ইতিহাস কেমন উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছিল।
এই গ্রন্থ আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্বের দলিল। এটি পাঠকদের কাছে প্রমাণিত করবে যে, তিনি ইমানে, প্রজ্ঞায়, চিন্তায়, কথাবার্তায়, চরিত্রে, কর্মপরাকাষ্ঠায়—এককথায় সব দিক দিয়ে ছিলেন সবার চেয়ে এগিয়ে। তাঁর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের যাবতীয় গুণের সমাহার ঘটেছিল। এগুলো অর্জিত হয়েছিল ইসলামকে পূর্ণভাবে অনুধাবন, কাজে পরিণত করা, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও রাসুলের সত্য-সঠিক অনুসরণের ফলে। নিঃসন্দেহে আবু বকর রা. সেই ইমামদের অন্যতম, যাঁরা মানুষের কল্যাণের পথ বিনির্মাণ করে গেছেন, যাঁদের কথা ও কাজ মানুষ দুনিয়াবি জীবনে অনুসরণ করে থাকে। তাঁর সিরাত—ইমান, ইসলামি প্রেরণা এবং দীনের বিশুদ্ধতম বোধশক্তির উৎস। এ জন্য তাঁর ব্যক্তিত্ব ও সময়-অধ্যয়নে প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়েছি; কিন্তু আমি তো নিষ্পাপ নই, ভুলের ঊর্ধ্বে নই, তাই ভুলভ্রান্তি অস্বীকার করতে পারি না। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই আমার এ প্রচেষ্টা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর সমীপেই আমার সাহায্যের আবেদন। নিঃসন্দেহে তিনি পবিত্র নামসমূহের অধিকারী এবং প্রার্থনা শ্রবণকারী। এই গ্রন্থে রয়েছে একটি ভূমিকা, চারটি অধ্যায় এবং একটি পরিশিষ্ট।
ভূমিকা
প্রথম অধ্যায় মক্কায় আবু বকর রা.। এই অধ্যায়ে রয়েছে পাঁচটি পরিচ্ছেদ:
১. নাম, বংশতালিকা, উপনাম, উপাধি, গুণ, পরিবার, জাহিলি যুগের জীবন।
২. ইসলাম, দাওয়াত, পরীক্ষা, প্রথম হিজরত।
৩. রাসুলের সঙ্গে মদিনায় হিজরত।
৪. জিহাদের ময়দানে আবু বকর।
৫. মদিনার সমাজে আবু বকর: তাঁর বিশেষ গুণাবলি এবং মর্যাদা।
দ্বিতীয় অধ্যায় নবিজির ইনতিকাল এবং সাকিফায়ে বনু সায়িদা। এই অধ্যায়ে রয়েছে দুটি পরিচ্ছেদ :
১. নবিজির ইনতিকাল এবং সাকিফায়ে বনু সায়িদা।
২. সাধারণ বায়আত এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতি।
তৃতীয় অধ্যায় উসামা-বাহিনী এবং মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এই অধ্যায়ে রয়েছে পাঁচটি পরিচ্ছেদ :
১. উসামা-বাহিনী।
২. মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
৩. মুরতাদদের ওপর সাধারণ আক্রমণ।
৪. মুসায়লিমাতুল কাজ্জাব এবং বনু হানিফা।
৫. মুরতাদবিরোধী যুদ্ধ থেকে অর্জিত শিক্ষা ও উপদেশ।
চতুর্থ অধ্যায় আবু বকরের বিজয়াভিযানসমূহ, খিলাফতের জন্য উমরকে নির্ধারণ এবং ইনতিকাল।
এই অধ্যায়ে রয়েছে চারটি পরিচ্ছেদ: ১. ইরাক বিজয়াভিযান। ২. শাম বিজয়াভিযান। ৩. গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও উপদেশ। ৪. খিলাফতের জন্য উমরকে নির্ধারণ এবং ইনতিকাল।
আল্লাহর অনুগ্রহে আমি এই গ্রন্থ রচনা থেকে ১৪২২ হিজরির ৫ মুহাররাম, শুক্রবার ইশার সালাতের পর (মোতাবিক ৩০ মার্চ ২০০১) অবসর হয়েছি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছুই আল্লাহর অনুগ্রহের ফসল। তাঁর কাছে প্রার্থনা— তিনি যেন কাজটি কবুল করেন। নবি, সিদ্দিক, শহিদ এবং পুণ্যবানদের সঙ্গ দান করেন আমাদের। আল্লাহ বলেন,
আল্লাহ কারও প্রতি কোনো অনুগ্রহ করলে কেউ তার প্রতিরোধকারী হতে পারে না এবং তিনি কিছু নিরুদ্ধ করতে চাইলে তৎপর কেউ তার উন্মুক্তকারী নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [সুরা ফাতির: ২]
ভূমিকার শেষ দিকে আমার ওপর আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ, দয়া ও বদান্যতার স্বীকৃতি প্রদান ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। আমার উচিত, আমি যেন বিনীত অন্তরে তাঁর দরবারে হাজিরা দিই। তিনিই তো অনুগ্রহকারী। তিনিই তো সাহায্যকারী ও তাওফিকদাতা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কেবল তাঁর কৃতজ্ঞতা, তাঁরই প্রশংসা। তিনিই আমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন। আমি মহান আল্লাহ সমীপে তাঁর মহান নামসমূহ এবং গুণাবলির মাধ্যমে আবেদন করছি; আমার কাজটি যেন কেবল তাঁর সন্তুষ্টি হিসেবে কবুল করেন। তাঁর বান্দাদের জন্য উপকারী করেন। প্রতিটি বর্ণে বর্ণে যেন আমাকে সাওয়াব দান করেন। এটিকে আমার আমলনামায় তুলেন; আর যে-সকল ভাই-বন্ধু কাজটি পূর্ণতায় পৌঁছাতে সাধ্যানুসারে সহায়তা করেছেন, তাদের উত্তম প্রতিদান দেন। আমি এই গ্রন্থের প্রত্যেক পাঠকের কাছে আশা করব, তারা যেন আমাকে তাদের নেক দুআয় শরিক রাখতে না ভুলেন।
প্রতিপালক, তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও, যাতে আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারি। আমার ও আমার পিতা-মাতার প্রতি তুমি যে অনুগ্রহ করেছ, তার জন্য এবং যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি, যা তুমি পছন্দ করো এবং তোমার অনুগ্রহে আমাকে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অর্ন্তভুক্ত করো। [সুরা নামাল: ১৯]
হে আল্লাহ, তোমার সত্তা পবিত্র। সকল প্রশংসা তোমার জন্য। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই। তোমার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন। আমিন।
আলি মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ আস সাল্লাবি ৫ মুহাররাম ১৪২২
টিকাঃ
১ সহিহ মুসলিম: ৪/১৯৬৩-১৯৬৪।
২ শারহুস সুন্নাহ, বাগাবি: ১/২১৪-২১৫।
* শায়খ সাদিক আরজুনের গ্রন্থ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ওপর সাইয়িদ কুতুবের মুকাদ্দিমা দ্রষ্টব্য: ৫।
* আবু বাকার, মালুল্লাহ: ১৫-১৬।
* আল-মানহাজুল ইসলামি লি কিতাবাতিত তারিখ, ড. মুহাম্মাদ মাখজুন: ৪।
* জারাহ ওয়াত তাদিল হাদিসের একটি শাখাশাস্ত্র। ওই শাস্ত্রে রাবি তথা বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত না অবিশ্বস্ত, তাঁর সামাজিক চালচলন, স্মৃতিশক্তি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর নিরিখে তাঁর বর্ণিত বর্ণনা গ্রহণ করা হবে কি হবে না মর্মে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।- অনুবাদক।
* সুনানু আবি দাউদ: ৪/২০১; সুনানুত তিরমিজি: ৫/৪৪; হাদিসটি হাসান-সহিহ।
* সহিহ বুখারি, ফাজায়িলুস সাহাবা: ৩৬৫৬।
• সহিহ সুনানুত তিরমিজি, আলবানি: ৩/২০০।
১০ সহিহ বুখারি, ফাজায়িলুস সাহাবা: ৩৬৬৮।
১১ সহিহ বুখারি, ফাজায়িলুস সাহাবা: ৩৬৭১।