📄 কুরআন কারীমে শাফা‘আত
শাফা'আত (الشفاعة) অর্থ সুপারিশ করা বা কারো দাবি বা আব্দারকে সমর্থন করা। শব্দটি 'আশ-শাফউ (الشفع) থেকে গৃহীত, যার অর্থ জোড়া বা জোড়া বানানো। শাফা'আতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনুল আসীর (৬০৬ হি) বলেন: “হাদীসে বিভিন্ন স্থানে শাফা'আত শব্দটি এসেছে জাগতিক বা আখিরাতের বিষয়ে। এর অর্থ পাপ বা অপরাধের শাস্তি না দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করা।"
আমরা দেখেছি যে, আরবের মুশরিকগণ, খৃস্টানগণ ও অন্যান্য বিভ্রান্ত জাতি ফিরিশতা ও নবী-ওলীগণের শাফা'আতকে তাঁদের অধিকার ও ক্ষমতা বলে বিশ্বাস করে বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা মনে করত যে, মহান আল্লাহ তাঁদেরকে শাফা'আত করার জন্য নিঃশর্ত ও উন্মুক্ত অনুমতি, অধিকার বা ক্ষমতা প্রদান করেছেন। কাজেই তাঁরা তাঁদের ইচ্ছামত যে কাউকে সুপারিশ করে জান্নাতে নিতে পারবেন। এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে তারা তাঁদের শাফা'আত লাভের আশায় অতিভক্তি বা শিরকে লিপ্ত হতো।
পক্ষান্তরে মুসলিম উম্মাহর খারিজী, মু'তাযিলা ও অন্যান্য কতিপয় ফিরকা পাপীদের জন্য নবীগণের বা অন্যদের শাফা'আত অস্বীকার করে। এক্ষেত্রে তাদের দলিলগুলি মূলত দু প্রকারের: (১) কুরআন কারীমের শাফা'আত অস্বীকার বিষয়ক আয়াতগুলি এবং (২) তাদের মতবাদ ভিত্তিক যুক্তি। তাদের মতে পাপী মুসলিমের শাস্তি না দেওয়া আল্লাহর ন্যায়বিচারের পরিপন্থী, কাজেই আল্লাহ নিজের রহমতে বা অন্য কারো শাফা'আতে কোনো পাপীকে ক্ষমা করতে পারেন না। আমরা কুরআন-হাদীসের আলোকে শাফা'আত বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ ব্যাখ্যা করব।
কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন কোনো শাফা'আত কবুল করা হবে না, আল্লাহ ছাড়া কেউ শাফা'আতের অধিকার রাখবে না এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো শাফা'আতকারীও থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন:
وَاتَّقُوا يَوْمًا لَا تَجْزِي نَفْسٌ عَنْ نَفْسٍ شَيْئًا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا شَفَاعَةٌ وَلَا يُؤْخَذُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا هُمْ يُنْصَرُونَ "তোমরা সে দিনকে ভয় কর যে দিন কেউ কারো কাজে আসবেনা এবং কারো সুপারিশ স্বীকৃত হবেনা এবং কারো নিকট হতে ক্ষতিপূরণ গৃহীত হবে না এবং তারা কোন প্রকার সাহায্য পাবে না।"
তিনি আরো বলেন:
وَاتَّقُوا يَوْمًا لَا تَجْزِي نَفْسٌ عَنْ نَفْسٍ شَيْئًا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا تَنْفَعُهَا شَفَاعَةٌ وَلَا هُمْ يُنْصَرُونَ "তোমরা সে দিনকে ভয় কর যে দিন কেউ কারো কোন উপকারে আসবে না এবং কারো নিকট হতে কোন ক্ষতিপূরণ গৃহীত হবে না এবং কোন সুপারিশ কারো পক্ষে লাভজনক হবে না এবং তারা কোন সাহায্য ও পাবে না।"
অন্যত্র ঘোষণা করা হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِمَّا رَزَقْنَاكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَ يَوْمٌ لَا بَيْعٌ فِيهِ وَلَا خُلَّةٌ وَلَا شَفَاعَةٌ وَالْكَافِرُونَ هُمُ
الظَّالِمُونَ "হে মু'মিনগণ, আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি তা হতে তোমরা ব্যয় কর সেই দিন আসার পূর্বে- যে দিন ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধুত্ব এবং সুপারিশ থাকবে না।" অন্যত্র আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন:
أَأَتَّخِذُ مِنْ دُونِهِ آلِهَةً إِنْ يُرِدْنِ الرَّحْمَنُ بِضُرٍّ لَا تُغْنِ عَنِّي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا وَلَا يُنْقِذُونِ "আমি কি তাঁর পরিবর্তে অন্য ইলাহ গ্রহণ করব? দয়াময় আল্লাহ আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইলে তাদের সুপারিশ আমার কোন কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে উদ্ধার করতে পারবে না।" তিনি আরো বলেন:
وَأَنْذِرْ بِهِ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَنْ يُحْشَرُوا إِلَى رَبِّهِمْ لَيْسَ لَهُمْ مِنْ دُونِهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ "তুমি এ দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করে দাও যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট সমবেত করা হবে এমন অবস্থায় যে, তিনি ব্যতীত তাদের কোনো অভিভাবক থাকবে না এবং কোনো সুপারিশকারীও থাকবে না; হয়ত তারা সাবধান হবে।" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَذَكِّرْ بِهِ أَنْ تُبْسَلَ نَفْسٌ بِمَا كَسَبَتْ لَيْسَ لَهَا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ "এ দ্বারা তাদেরকে উপদেশ দাও, যাতে কেউ নিজ কৃত কর্মের জন্য ধ্বংস না হয়, যখন আল্লাহ ব্যতীত তার কোনো অভিভাবক থাকবে না এবং কোনো সুপারিশকারীও থাকবে না।" অন্যত্র ঘোষণা করা হয়েছে:
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ مَا لَكُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا شَفِيعٍ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ "আল্লাহ তিনি আকাশ মন্ডলী, পৃথিবী ও তার অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন অভিভাবক নেই এবং সুপারিশকারীও নেই; তবু ও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না।" অন্যত্র বলা হয়েছে:
وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ "তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করে তারা তাদের ক্ষতিও করে না উপকারও করে না। তারা বলে এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। বল, তোমরা কি আল্লাহকে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিবে যা তিনি জানেন না? তিনি মহান পবিত্র এবং তাদের শির্ক করা থেকে তিনি উর্দ্ধে।" অন্যত্র বলা হয়েছে:
قُلْ لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ "বল, সকল সুপারিশ আল্লাহরই ইখতিয়ারে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই; অতঃপর তারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তন করবে।" উপরের আয়াতগুলিতে বাহ্যত শাফা'আত অস্বীকার করা হয়েছে। এ সকল আয়াত থেকে মু'তাযিলা ও অন্যান্য ফিরকা দাবি করে যে, কিয়ামতের দিন কারো শাফা'আতে কোনো পাপীর ক্ষমালাভের ধারণা বাতিল ও ভিত্তিহীন। বস্তুত এ সকল আয়াতে মূলত শাফা'আত বিষয়ে মুশরিকদের বিশ্বাস খণ্ডন করা হয়েছে। আমার ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ওহীর জ্ঞানের সাথে কিছু কল্পনা যোগ করে আরবের কাফিরগণ ও অন্যান্য কাফির সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিশ্বাস করত যে, আল্লাহর ফিরিশতাগণ, নবীগণ বা প্রিয়পাত্রগণ শাফা'আতের ক্ষমতা ও অধিকার সংরক্ষণ করেন। তারা তাদের ইচ্ছামত যাকে ইচ্ছা সুপারিশ করে মুক্তি দিতে পারবেন। মহান আল্লাহ তাদেরকে এ ধরনের ক্ষমতা ও অধিকার দিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তাদের এ ভ্রান্ত বিশ্বাস খণ্ডন করে জানিয়েছেন যে, শাফা'আতের মালিকানা, অধিকার ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। অন্যান্য আয়াতে শাফা'আতের স্বীকৃতি উল্লেখ করা
হয়েছে। যিনি শাফা'আত করবেন তিনি যদি শাফা'আত করার জন্য মহান আল্লার অনুমতি গ্রহণ করেন এবং যার জন্য শাফা'আত করবেন তার প্রতি যদি মহান আল্লহ সন্তুষ্ট থাকেন তবে সেক্ষেত্রে শাফা'আত করার সুযোগ আল্লাহ প্রদান করবেন। যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট নন তার জন্য কেউই শাফা'আত করবে না। সর্বাবস্থায় শাফা'আত গ্রহণ করা বা না করা মহান আল্লাহর ইচ্ছা। মহান আল্লাহ বলেন:
"কে সে যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করবে?" অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ "তিনি সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর অনুমতি লাভ না করে সুপারিশ করার কেউ নেই। তিনিই আল্লাহ তোমাদের প্রতিপালক; সুতরাং তাঁর 'ইবাদত কর। তবু ও কি তোমরা অনুধাবন করবে না?" তিনি আরো বলেন:
لَا يَمْلِكُونَ الشَّفَاعَةَ إِلَّا مَنِ اتَّخَذَ عِنْدَ الرَّحْمَنِ عَهْدًا "যে দয়াময়ের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছে সে ব্যতীত অন্য কারো সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকবে না।"
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
يَوْمَئِذٍ لَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا "দয়াময় আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন ও যার কথা তিনি পছন্দ করবেন সে ব্যতীত কারো সুপারিশ সে দিন কোন কাজে আসবে না।"
আল্লাহ তাবারাকা ও তা'আলা আরো বলেন:
وَلَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَهُ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ "যাকে অনুমতি দেয়া হয় সে ব্যতীত আল্লাহর নিকট কারো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না।"
অন্যত্র তিনি বলেন:
وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى وَهُمْ مِنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ. وَكَمْ مِنْ مَلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى "তিনি যাদের প্রতি সন্তুষ্ট তাদের ছাড়া আর কারো জন্য তারা সুপারিশ করে না এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত।"
"আকাশে কত ফিরিস্তা রয়েছে! তাদের কোনো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন।"
উপরের আয়াতগুলি থেকে আমরা নিম্নের বিষয়গুলি বুঝতে পারি: (১) শাফা'আতের মালিকানা একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো শাফা'আতের কোনো ক্ষমতা বা অধিকার নেই। (২) আল্লাহ অনুমতি দিলে কেউ শাফ'আত করতে পারবেন। (৩) যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট শুধু তাকেই অনুমতি প্রদান করবেন। (৪) আল্লাহর অনুমতিক্রমে ফিরিশতাগণ সুপারিশ করবেন বলে কুরআনে স্পষ্টত বলা হয়েছে। এছাড়া অন্য কারা তাঁর অনুমতিক্রমে সুপারিশ করতে পারবেন তা স্পষ্টত উল্লেখ করা হয় নি। হাদীস শরীফে এ বিষয়ক বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। (৫) যে ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করা হবে তার জন্যও আল্লাহর অনুমোদন পূর্বশর্ত। (৬) যে ব্যক্তির প্রতি স্বয়ং আল্লাহ সন্তুষ্ট রয়েছেন সে ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো জন্য কেউ সুপারিশ করবেন না।
📄 শাফা‘আত
শাফা'আত (الشفاعة) অর্থ সুপারিশ করা বা কারো দাবি বা আব্দারকে সমর্থন করা। শব্দটি 'আশ-শাফউ (الشفع) থেকে গৃহীত, যার অর্থ জোড়া বা জোড়া বানানো। শাফা'আতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনুল আসীর (৬০৬ হি) বলেন: “হাদীসে বিভিন্ন স্থানে শাফা'আত শব্দটি এসেছে জাগতিক বা আখিরাতের বিষয়ে। এর অর্থ পাপ বা অপরাধের শাস্তি না দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করা।
আমরা দেখেছি যে, আরবের মুশরিকগণ, খৃস্টানগণ ও অন্যান্য বিভ্রান্ত জাতি ফিরিশতা ও নবী-ওলীগণের শাফা'আতকে তাঁদের অধিকার ও ক্ষমতা বলে বিশ্বাস করে বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা মনে করত যে, মহান আল্লাহ তাঁদেরকে শাফা'আত করার জন্য নিঃশর্ত ও উন্মুক্ত অনুমতি, অধিকার বা ক্ষমতা প্রদান করেছেন। কাজেই তাঁরা তাঁদের ইচ্ছামত যে কাউকে সুপারিশ করে জান্নাতে নিতে পারবেন। এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে তারা তাঁদের শাফা'আত লাভের আশায় অতিভক্তি বা শিরকে লিপ্ত হতো।
পক্ষান্তরে মুসলিম উম্মাহর খারিজী, মু'তাযিলা ও অন্যান্য কতিপয় ফিরকা পাপীদের জন্য নবীগণের বা অন্যদের শাফা'আত অস্বীকার করে। এক্ষেত্রে তাদের দলিলগুলি মূলত দু প্রকারের: (১) কুরআন কারীমের শাফা'আত অস্বীকার বিষয়ক আয়াতগুলি এবং (২) তাদের মতবাদ ভিত্তিক যুক্তি। তাদের মতে পাপী মুসলিমের শাস্তি না দেওয়া আল্লাহর ন্যায়বিচারের পরিপন্থী, কাজেই আল্লাহ নিজের রহমতে বা অন্য কারো শাফা'আতে কোনো পাপীকে ক্ষমা করতে পারেন না। আমরা কুরআন-হাদীসের আলোকে শাফা'আত বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ ব্যাখ্যা করব।
📄 হাদীস শরীফে শাফা‘আত
অগণিত হাদীসে কিয়ামতের দিন নবীগণ ও অন্যান্য মানুষ এবং মানুষের বিভিন্ন আমল শাফা'আত করবে এবং তাদের শাফা'আত কবুল করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সকল হাদীসের বিস্তারিত আলোচনার জন্য বৃহৎ পরিসরের প্রয়োজন। হাদীসে বর্ণিত শাফা'আতের পর্যায়গুলি নিম্নরূপে ভাগ করা যায়:
(১) শাফা'আতে উযমা (الشفاعة العظمى) বা মহোত্তম শাফা'আত। এদ্বারা বিচার শুরুর জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করা
বুঝানো হয়। বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, কিয়ামতের দিন মানুষ বিভিন্ন নবী-রাসূলের নিকট গমন করে ব্যর্থ হয়ে সর্বশেষ মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকট গমন করবেন। তিনি সমগ্র মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে শাফা'আত করবেন, মানুষের বিচার শেষ করে দেওয়ার জন্য।
(২) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শাফা'আতে মহান আল্লাহ তাঁর উম্মাতের অনেক গোনাহগারকে ক্ষমা করবেন। (৩) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শাফা'আতে অনেক পাপী মুসলিম জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। (৪) উম্মাতে মুহাম্মাদীর অনেক নেককার মানুষ শাফা'আত করবেন। (৫) সন্তানগণ তাদের পিতামাতাদের জন্য শাফা'আত করবে। (৬) কুরআন তার তিলাওয়াতকারী ও অনুসারীদের জন্য শাফা'আত করবে। (৭) সিয়াম ও অন্যান্য ইবাদত শাফা'আত করবে এবং তা কবুল করা হবে।
উপরের আয়াত ও হাদীসগুলি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, শাফা'আতের অর্থ এই নয় যে, ফিরিশতাগণ বা অন্য কোনো বান্দা ইচ্ছামত কোনো মানুষকে সুপারিশ করবেন। কেউ যদি কোনো ফিরিশতা বা আল্লাহর কোনো সম্মানিত বান্দার নামে মানত করে, তাঁকে সাজদা করে, তাঁকে ডাকে বা তাকে 'চূড়ান্ত ভক্তি' করে এবং আশা করে যে, এরূপ করাতে উক্ত ফিরিশতা বা সম্মানিত বান্দা তার জন্য সুপারিশ করবেন তবে তার এরূপ আশা কুরআনের আলোতে মরিচিকার পিছে ছোটা ছাড়া কিছুই নয়। এ ব্যক্তির শাফা'আত লাভ তো দূরের কথা তার মানত, সাজদা, ডাক বা চূড়ান্ত বা অলৌকিক ভক্তিতে' যদি কোনো ফিরিশতা বা আল্লাহর সম্মানিত বান্দা সন্তুষ্টি বোধ করেন তবে তাকেও আল্লাহ জাহান্নামে শাস্তি দিবেন বলে ঘোষণা করেছেন।
অনুরূপভাবে কেউ যদি আল্লাহ থেকে বিমুখ থাকে বা ঈমান বিশুদ্ধ না করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা না করে কিন্তু কোনো ফিরিশতা বা আল্লাহর কোনো সম্মানিত বান্দাকে বিশেষভাবে ভালবাসে, তাকে ভক্তি-সম্মান করে বা সর্বদা তার জন্য দু'আ করে এবং আশা করে যে, উক্ত ফিরিশতা বা সম্মানিত বান্দা তাকে সুপারিশ করে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে রক্ষা করবেন তবে বাতুল আশা ছাড়া কিছুই নয়।
পক্ষান্তরে কেউ যদি ঈমান ও তাওহীদ বিশুদ্ধ করেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন, কিন্তু মানবীয় দুর্বলতায় বা শয়তানের প্ররোচনায় কবীরা গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়েন তবে মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলে তাঁর কোনো সম্মানিত বান্দাকে তাঁর জন্য শাফা'আত করার অনুমতি প্রদান করবেন। মূল বিষয় আল্লাহর সন্তুষ্টি। মহান আল্লাহ কোনো পাপী বান্দার তাওহীদ ও ঈমানে সন্তুষ্ট হলে তিনি নিজেই তাঁকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। অথবা তাঁর কোনো সম্মানিত বান্দাকে সম্মান করে তার জন্য শাফা'আতের অনুমতি দিতে পারেন।
মু'তাযিলাগণ শাফা'আতে উযমা স্বীকার করে; কারণ তা তাদের মূলনীতির পরিপন্থী নয়। পাপী মুমিনের জন্য শাফা'আত বিষয়ক অন্যান্য আয়াত ও হাদীসকে তারা শাফা'আতে উযমা বলে ব্যাখ্যা করে বা বাতিল করে দেয়। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অনুসারীগণ সহীহ হাদীসে প্রমাণিত সকল প্রকারের শাফা'আতেই বিশ্বাস করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, শাফা'আতের মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহরই। তিনি যার উপর সন্তুষ্ট হবেন তার জন্য তিনি দয়া করে শাফা'আতের ব্যবস্থা করে দিবেন। তিনি যার উপর সন্তুষ্ট থাকবেন তার জন্য তাঁর অনুমতিপ্রাপ্ত কেউ শাফা'আত করলে তিনি ইচ্ছা করলে তা কবুল করে গোনাহগার মুমিনকে ক্ষমা করতে পারেন। ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদা ব্যাখ্যা করে বলেন:
ثَابِتٌ وَشَفَاعَةُ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ حَقٌّ، وَشَفَاعَةُ نَبِيِّنَا لِلْمُؤْمِنِينَ الْمُذْنِبِينَ وَلِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْهُمُ الْمُسْتَوْجِبِينَ الْعِقَابَ حَقٌّ "নবীগণের শাফা'আত সত্য। পাপী মুমিনগণ এবং কবীরা গোনাহকারিগণের জন্য, পাপের কারণে যাদের জাহান্নাম পাওনা হয়েছিল তাদের জন্য কিয়ামতের দিন আমাদের নবী (ﷺ)-র শাফা'আতও সত্য।"