📄 গাইরুল্লাহর জন্য সাজদা
আমরা দেখেছি যে, কুরআন কারীমে সুস্পষ্টত আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাজদা করতে নিষেধ করা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর প্রায় সকল আলিম একমত যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সাজদা করাই শিক। কারণ, ইবাদত ছাড়া বা চূড়ান্ত ভক্তির প্রকাশ ছাড়া কেউ কাউকে সাজদা করে না। জাগতিক ভয়, ভীতি, সম্মান ইত্যাদির জন্য একজন আরেকজনের পা জড়িয়ে ধরতে পারে, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে একমাত্র অলৌকিক ও অপার্থিব ভক্তি ও বিনয়ের অর্ঘ্য ছাড়া কেউ কারো জন্য সাজদা করে না। আল্লামা ইবনু আবেদীন বলেন: والسجود أصل لانه شرع عبادة بلا قيام كسجدة التلاوة، والقيام لم يشرع عبادة وحده، حتى لو سجد لغير الله تعالى يكفر بخلاف القيام. "সাজদাই হলো মূল; কারণ সাজদা কেবলমাত্র ইবাদত হিসেবেই শরীয়তে নির্ধারিত, কিয়াম বা দণ্ডায়মান হওয়া তদ্রূপ নয়, দাঁড়ানো কেবলমাত্র ইবাদত হিসেবে শরীয়তে নির্ধারিত নয়। এজন্য যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া কারো জন্য সাজদা করে তবে সে কাফির বলে গণ্য হবে, দাঁড়ানোর বিষয়টি তদ্রূপ নয়।"৮৬৪ প্রসিদ্ধ হানাফী ফকীহ আল্লামা যাইলায়ী বলেন: "ইমাম মুহাম্মাদের 'যিয়াদাত' গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সালাতের মধ্যে সাজদাই মুল, কিয়াম বা দাঁড়ানো হলো দাঁড়ানো থেকে সাজদায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে।... এর কারণ সাজদাই হলো মাটির উপর কপাল রেখে আল্লাহর জন্য চূড়ান্ত ভক্তি-বিনয় প্রকাশ করা। এজন্য যদি কেউ মাটিতে কপাল রেখে আল্লাহ ছাড়া কারো সাজদা করে তবে সে কাফির হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ ছাড়া কারো জন্য দাঁড়ালে বা রুকু করলে কাফির বলে গণ্য হবে না।"৮৬৫ হানাফী ফিকহের অন্যতম ইমাম আল্লামা সারাখসী তাঁর মাবসূত গ্রন্থে বলেন: "...এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ ছাড়া কাউকে তাযীম বা সম্মান প্রদর্শনের জন্য সাজদা করা কুফ্রী।"৮৬৬ মুসলিম উম্মাহর অনেক আলিম সাজদাকে দুভাগে ভাগ করেছেন: (১) সুজুদু তাহিয়্যাহ )سجود تحية বা সালামের সাজদা এবং (২) সুজুদু ইবাদাত )سجود عبادة( বা ইবাদতের সাজদা। তাঁরা বলেছেন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইবাদতের সাজদা করা সরাসরি শির্ক। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সালাম-জ্ঞাপক সাজদা করা হারাম ও কঠিন গোনাহের কাজ, তবে তা সরাসরি শিরক বলে গণ্য হবে না। যদি কেউ এরূপ হারাম কাজকে বৈধ বলে বিশ্বাস করে তবে তা কুষ্ণ বলে গণ্য হবে। কুরআন থেকে জানা যায় যে, ফিরিশতাগণ আদমকে সাজদা করেন এবং ইউসুফ (আ)-এর পিতামাতা ও ভ্রাতৃগণ তাঁকে সাজদা করেন। তাদের এ সাজদা কিরূপ ছিল তা নিয়ে মুফাস্সিরগণের মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন তারা মাটিতে মাথা রেখে পরিপূর্ণ সাজদা করেন এবং কেউ বলেছেন যে, তারা রুকুর মত মাথা ঝুকিয়ে সালাম করেন, আর রুকু করাকেও কুরআন কারীমে সাজদা বলা হয়েছে। ৮৬৭ সর্বাবস্থায় এরূপ সালাম জ্ঞাপক সাজদা বা 'প্রণাম' করা পূর্ববর্তী শরীয়তে বৈধ ছিল, তবে ইসলামে তা হারাম করা হয়েছে, যেমন ভাইবোনে বিবাহ, দুবোনকে একত্রে বিবাহ, মদপান ইত্যাদি বিষয় পূর্ববর্তী কোনো কোনো শরীয়তে বৈধ ছিল কিন্তু ইসলামী শরীয়তে হারাম করা হয়েছে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সম্মান জ্ঞাপক বা সালাম জ্ঞাপক সাজদা করার নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক হাদীসগুলি মুতাওয়াতির পর্যায়ের। আবূ হুরাইরা, মু'আয ইবনু জাবাল, সুহাইব, যাইদ ইবনু আরকাম, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস, সুরাকা ইবনু মালিক, আয়েশা, ইসমাহ, আনাস ইবনু মালিক, আব্দুল্লাহ ইবনু আবী আওফা, কাইস ইবনু সা'দ (এ) প্রমুখ সাহাবী থেকে বিভিন্ন সনদে এ বিষয়ে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে।৮৬৮ এক হাদীসে আয়েশা (রা) বলেন, إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ كَانَ فِي نَفَرٍ مِنْ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ فَجَاءَ بَعِيرٌ فَسَجَدَ لَهُ فَقَالَ أَصْحَابُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ تَسْجُدُ لَكَ الْبَهَائِمُ وَالشَّجَرُ فَنَحْنُ أَحَقُّ أَنْ نَسْجُدَ لَكَ فَقَالَ اعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَأَكْرِمُوا أَخَاكُمْ وَلَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لزوجها, وفي حديث آخر : لَا يَنْبَغِي لَأَحَدٍ أَنْ يَسْجُدَ لأَحَدٍ ... وفي حديث آخر : لَا يَصْلُحُ لِبَشَرٍ أَنْ يَسْجُدَ لبَشَرٍ وَلَوْ صَلَحَ لِبَشَرٍ أَنْ يَسْجُدَ لِبَشَرِ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا "রাসূলুল্লাহ তাঁর কতিপয় মুহাজির ও আনসার সাহাবীর সাথে অবস্থান করছিলেন। এমতাবস্থায় একটি উট এসে তাঁকে সাজদা করেন। তখন সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এ সকল অবলা জীব-জানোয়ার ও বৃক্ষলতা আপনাকে সাজদা করে, কাজেই আমাদেরই অধিকার বেশি যে আমরা আপনাকে সাজদা করব। তখন তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর এবং তোমাদের ভ্রাতাকে সম্মান কর। আমি যদি কাউকে অন্যের সাজদা করতে বলতাম তবে স্ত্রীকে বলতাম তার স্বামীকে সাজদা করতে। অন্য হাদীসের বর্ণনায় তিনি বলেন: "কারো জন্য বৈধ নয় অন্যকে সাজদা করা”, অন্য হাদীসে: কোনো মানুষের জন্য বৈধ নয় অন্য মানুষকে সাজদা করা; যদি কোনো মানুষের জন্য অন্য মানুষকে সাজদা করা বৈধ হতো, তবে আমি স্ত্রীকে আদেশ করতাম তার স্বামীকে সাজদা করতে। ৮৬৯ অন্য হাদীসে মু'আয ইবনু জাবাল (রা) বলেন: إِنَّهُ أَتَى الشَّامَ فَرَأَى النَّصَارَى يَسْجُدُونَ لِأَحْبَارِهِمْ وَعُلَمَائِهِمْ وَفُقَهَائِهِمْ فَقَالَ لِأَيِّ شَيْءٍ تَفْعَلُونَ هَذَا قَالُوا هَذِهِ تَحِيَّةُ الْأَنْبِيَاءِ قُلْنَا فَنَحْنُ أَحَقُّ أَنْ نَصْنَعَ بِنَبِيِّنَا ﷺ سَجَدَ فَقَالَ: مَا هَذا يَا مُعَاذُ؟ قَالَ: إِنِّي أَتَيْتُ الشَّامَ فَرَأَيْتُ النَّصَارَى يَسْجُدُونَ لأَسَاقِفَتِهِمْ وَقِسَيْسِهِمْ وَرُهْبَانِهِمْ وَبَطَارِقَتِهِمْ وَرَأَيْتُ الْيَهُودَ يَسْجُدُونَ لَأَحْبَارِهِمْ وَفُقَهَائِهِمْ وَعُلَمَائِهِمْ فَقُلْتُ لأَيِّ شَيْءٍ تَصْنَعُونَ هذا وتَفْعَلُونَ هذا قَالُوا هذه تَحِيَّةُ الأَنْبِيَاءِ قُلْتُ فَنَحْنُ أَحَق أَنْ نَصْنَعَ بِنَبِيِّنَا فَقَالَ نَبِيُّ الله ﷺ : إنهم كَذَبُوا عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ كَمَا حَرَّفُوا كِتَابَهُمْ، في روياة ابن ماحه : لا تَفْعَلُوا لَوْ أَمَرْتُ أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا "তিনি সিরিয়া গমন করেন। তথায় তিনি দেখেন যে, খৃস্টানগণ তাদের নেককার বুজুর্গগণ ও আলিমদেরকে সাজদা করে। তিনি বলেন, তোমরা কেন এরূপ কর? তারা উত্তরে বলে: এ হলো নবীগণের তাহিয্যাহ বা সালাম। আমরা বললাম: আমাদের নবীকে এরূপ করার অধিকার আমাদের বেশি। তিনি যখন নবী (ﷺ)-এর নিকট প্রত্যাগমন করলেন তখন তিনি তাঁকে সাজদা করলেন। তিনি বলেন: হে মু'আয, এ কি? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গমন করে দেখলাম যে, খৃস্টানগণ তাদের পাদরি, দরবেশ ও বিশপদের সাজদা করে এবং ইহুদীগণ তাদের আলিম ও বুজুর্গ ও ফকীহদের সাজদা করে। আমি বললাম, তোমরা এ কি কর? তারা বলে বলে, এ হলো নবীগণের সালাম। আমি বললাম: আমাদের নবীকে এরূপ করার অধিকার তো আমাদের বেশি। তখন নবীউল্লাহ (ﷺ) বলেন, ওরা ওদের নবীগণের নামে মিথ্যা বলেছে, যেমন ওরা নবীগণের কিতাব বিকৃত করেছে। তোমরা এরূপ করো না। আমি যদি কোনো মানুষকে অন্য মানুষের সাজদা করার নির্দেশ দিতাম তবে আমি স্ত্রীকে তার স্বামীর সাজদা করতে নির্দেশ দিতাম। ৮৭০ অন্য হাদীসে কাইস ইবনু সা'দ (রা) বলেন: أَتَيْتُ الْحِيْرَةَ فَرَأَيْتُهُمْ يَسْجُدُونَ لِمَرْزُبَانِ لَهُمْ فَقُلْتُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحَقُّ أَنْ يُسْجَدَ لَهُ فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ فَقُلْتُ أَنِّي أَتَيْتُ الْحِيْرَةَ فَرَأَيْتُهُمْ يَسْجُدُونَ لِمَرْزَبَانِ لَهُمْ، فَأَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحَقُّ أَنْ يُسْجَدَ لَكَ قَالَ أَرَأَيْتَ لَوْ مَرَرْتَ بِقَبْرِي أكُنتَ تَسْجُدَ لَهُ قُلْتُ لَا قَالَ فَلَا تَفْعَلُوا لَوْ كُنْتُ آمراً أَحَداً أَنْ يَسْجُدَ لأَحَدٍ لَأَمَرْتُ النِّسَاءَ أَنْ يَسْجُدْنَ لَأَزْوَاجِهِنَّ "আমি (পারস্যের সীমান্তবর্তী) হীরা নামক স্থানে গমন করি। আমি দেখলাম যে, তারা তাদের একজন নেতাকে সাজদা করছে। তখন আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ-এর অধিকার বেশি যে তাঁর জন্য সাজদা করা হবে। তখন আমি রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আগমন করে বলি, 'আমি হীরা গমন করে দেখলাম যে, তারা তাদের একজন নেতাকে সাজদা করছে। আপনি আল্লাহর রাসূল, আপনারই অধিকার বেশি যে আপনার জন্য সাজদা করা হবে। তিনি বলেন, তুমি বলতো, তুমি যদি আমার কবরের নিকট গমন কর, তখন কি তুমি কবরকে সাজদা করবে? আমি বললাম: না। তিনি বলেন, তোমরা এরূপ করবে না, আমি যদি কোনো মানুষকে অন্য মানুষের সাজদা করতে অনুমতি দিতাম তবে স্ত্রীগণকে অনুমতি দিতাম তাদের স্বামিগণকে সাজদা করতে।"৮৭১ উপরের হাদীসগুলি আলোচনা করে আল্লামা কুরতুবী বলেন: وهذا السجود المنهي عنه قد أتخذه جهال المتصوفة عادة في سماعهم وعند دخولهم على مشايخهم وأستغفارهم فيرى الواحد منهم إذا أخذه الحال بزعمه يسجد للأقدام لجهله سواء أكان للقبلة أم غيرها جهالة منه ضل سعيهم وخاب أملهم "এ সকল হাদীসে যে সাজদা নিষেধ করা হয়েছে সে সাজদা জাহিল সূফীগণ তাদের রীতিতে পরিণত করেছে তাদের সামার মাজলিসে এবং তাদেরর পীর-মাশাইখের নিকট প্রবেশের সময়ে এবং তাদের দু'আ-ইসতিগফারের সময়ে। তাদেরকে আপনি দেখবেন যে, তাদের দাবিমত যখন তাদের কারো হাল এসে যায় তখন পায়ের কাছে সাজদায় পড়ে যায় কিবলামুখি অথবা অন্যমুখি হয়ে। তাদের মুর্খতার কারণেই তা তারা করে। তাদের কর্ম বিভ্রান্ত হয়েছে এবং তাদের আশা বিনষ্ট হয়েছে।"৮৭২ ইবাদতের বা 'তাযীমের' সাজদা ও তাহিয়্যাহ বা সালাম-সম্ভাষণমূলক সাজদার মধ্যে পার্থক্য এই যে, তাহিয়্যা বা সালামের সাজদা জাগতিক, লৌকিক ও মানবীয় সাধারণ কর্মের অন্তর্ভুক্ত। তা চূড়ান্ত বা অলৌকিক ভক্তি নয়, বর সাধারণ ও লৌকিক ভক্তি। অলৌকিক ভয়, ভালবাসা বা ভক্তির কারণে মানুষ তা করে না, বরং লৌকিক শিষ্টাচারের অংশ হিসেবে তা করে। এর প্রচলন যে সমাজে রয়েছে সে সমাজের বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, সকল মানুষই তার পিতা, মাতা, শিক্ষক, সমাজপতি বা রাজাকে এভাবে সম্মান প্রদর্শন করে। যেমন অন্য সমাজে দাঁড়িয়ে, মাথা ঝুকিয়ে বা স্যালুট দিয়ে এরূপ শিষ্টাচার প্রদর্শন করা হয়। এরূপ সাজদা পূর্ববর্তী কোনো কোনো শরীয়তে বৈধ ছিল এবং ইসলামে তা সুস্পষ্টরূপে নিষিদ্ধ ও হারাম বলে ঘোষণা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ইবাদতের সাজদা হলো চূড়ান্ত ও অলৌকিক ভক্তি। মানুষ যাকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে বিশ্বাস করে তার কাছে নিজের চূড়ান্ত সমর্পন, অসহায়ত্ব ও অলৌকিক ভক্তি প্রদর্শনের জন্য এরূপ সাজদা করে। পিতা, মাতা, সমাজপতি, রাজা বা সাধারণ মানবীয় ক্ষমতা বা মর্যাদার অধিকারীকে কেউ এরূপ সাজদা করে না, বরং স্রষ্টা, স্রষ্টার সাথে সম্পর্কিত কোনো অলৌকিক ক্ষমতা বা সম্পর্কযুক্ত দ্রব্য, ব্যক্তি বা ব্যক্তির স্মৃতিবিজড়িত স্থানেই সে এরূপ সাজদা করে। সকল শরীয়তেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে এরূপ সাজদা করা সরাসরি শিরক ও কুফ্র। আল্লামা শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু হুসাইন ইবনু আলী আত-তূরী আল-কাদেরী আল-হানাফী (মৃ. ১১৩৮ হি) 'তাকমিলাতুল বাহরির রায়িক' গ্রন্থে বলেন: “রাজা-বাদশার সামনে যে সাজদা করা হয় তা হারাম। যে করে এবং যে এরূপ কর্মে রাযি থাকে উভয়েই পাপী। কারণ এ কর্ম মুর্তিপূজকদের অনুকরণ। সাদর শহীদ উল্লেখ করেছেন যে, এরূপ সাজদার কারণে কাফির বলে গণ্য হবে না, কারণ সে শুধু সালাম বা সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এরূপ করেছে। শামসুল আয়িম্মা সারাখসী বলেন: তাযীম বা সম্মানপ্রদর্শনের জন্য আল্লাহ ছাড়া কারো সাজদা করা কুফ্রী।"৮৭৩ আল্লামা শামী তাঁর 'হাশিয়াতু রাদ্দিল মুহতার গ্রন্থে বলেন: تَقْبِيلِ الْأَرْضِ بَيْنَ يَدَيِ الْعُلَمَاءِ وَالْعُظَمَاءِ فَحَرَامٌ وَالْفَاعِلُ وَالرَّاضِي بِهِ آثِمَانِ لأَنَّهُ يُشْبِهُ عِبَادَةَ الْوَثَنِ وَهَلْ يَكْفُرَانِ: عَلَى وَجْهِ الْعِبَادَةِ وَالتَّعْظِيمِ كَفْرٌ وَإِنْ عَلَى وَجْهِ التَّحِيَّةِ لا وَصَارَ آثِمًا مُرْتَكِبًا لِلْكَبِيرَةِ "আলিম ও সম্মানিত ব্যক্তিদের সামনে ভূমি-চুম্বন বা জমিন-বুসী করা হারাম। যে ব্যক্তি তা করে এবং যে তাতে রাজি থাকে উভয়েই পাপী; কারণ তা মূর্তিপূজার অনুকরণ। এখন প্রশ্ন হলো: এরূপ ভূমি-চুম্বন-কারী এবং তাতে সন্তুষ্ট ব্যক্তি কাফির বলে গণ্য হবে কিনা? যদি ইবাদত ও সম্মান প্রদর্শনের জন্য তা করে তবে তা কুফর বলে গণ্য। আর যদি সালাম বা সম্ভাষণ প্রদানের জন্য করে তাবে কুফর হবে না, তবে এরূপ ব্যক্তি কবীরা গোনাহে লিপ্ত বলে গণ্য হবে।"৮৭৪ লক্ষণীয় যে, পিতা, মাতা, সমাজপতি, রাজা ও অন্যান্য জাগতিক ব্যক্তিবর্গের ক্ষেত্রে তাহিয়্যার সাজদা বা সম্মান প্রদর্শনের জন্য সালাম জ্ঞাপক সাজদার কল্পনা করা গেলেও নবী, ওলী বা অলৌকিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত কারো ক্ষেত্রে বা কারো কবর-মাযারের ক্ষেত্রে তাহিয়্যার সাজদা কল্পনা করা যায় না। কারণ মানুষ যখন তার মাতা, পিতা, শিক্ষক বা রাজাকে সাজদা করে তখন সে কোনো অলৌকিক বা অপার্থিব ভয় বা ভক্তি নিয়ে তা করে না, বরং একান্তই জাগতিক ভয়, ভক্তি বা শিষ্টাচার হিসেবে তা করে। পক্ষান্তরে অলৌকিক ব্যক্তিত্বদেরকে কখনোই কেউ লৌকিক শিষ্টাচার হিসেবে সাজদা করে না, বরং অলৌকিক ও চূড়ান্ত ভক্তি হিসেবেই সাজদা করে। এজন্য চাঁদ, সূর্য, কবর, স্মৃতিস্তম্ভ, স্মৃতিচিহ্ন, প্রতিকৃতি, মূর্তি, পূজনীয় ব্যক্তি বা দ্রব্যকে সাজদা করলে তা ব্যাখ্যতীতভাবে শিরক বলে গণ্য হবে। আরো লক্ষণীয় যে, তাহিয়্যাহ বা শিষ্টাচারের সাজদার অস্তিত্ব মূলত ইসলামের আগমনের মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায়। মুসলিম সমাজে ইবাদত হিসেবে আল্লাহকে সাজদা করা ছাড়া অন্য কোনোরূপ সাজদার প্রচলন থাকে না। অনুরূপভাবে অন্যান্য ধর্মে ও সমাজেও মূলত অলৌকিক ব্যক্তিত্ব, মূর্তি, বস্তু ইত্যাদিরই সাজদা করা হয়ে থাকে। এজন্যই মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশ আলিম উভয় প্রকারের সাজদার মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য না করেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাজদা করা সরাসরি কুফর বা শিরক বলে গণ্য করেছেন। আর যারা পার্থক্য করেছেন তাঁরা একমত যে, আল্লাহ ছাড়া কাউকে তাহিয়্যার সাজদা করা হারাম এবং এরূপ হারাম কর্মকে বৈধ বলে মনে করা কুফ্র।
📄 গাইরুল্লাহর জন্য তাওয়াফ
কোনো কিছুর চারিদিকে আবর্তন করাকে তাওয়াফ বলা হয়। সাজদা ও সালাতের মতই তাওয়াফ একটি ইবাদত। সালাত- সাজদা ও তাওয়াফের মধ্যে পার্থক্য এই যে, বিশ্বের যে কোনো স্থানে থেকে কাবা ঘরের দিকে মুখ করে আল্লাহর জন্য সালাত ও সাজদার ইবাদত আদায় করা যায়। পক্ষান্তরে আবর্তন বা তাওয়াফের ইবাদত একমাত্র কাবা গৃহের চারিদিকে আবর্তনের মাধ্যমে আল্লাহর জন্য এ ইবাদত পালন করা যায়। মহান আল্লাহ বলেন: “এবং তারা তাওয়াফ করুক প্রাচীন গৃহের।"৮৭৫ কাবা ঘর ছাড়া অন্য কোথাও তাওয়াফ করা দুভাবে হতে পারে: وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ প্রথমত, মহান আল্লাহর প্রতি চূড়ান্ত ভালবাসা ও ভয়ের সাথে একমাত্র তাঁরই প্রতি চূড়ান্ত ভক্তি প্রকাশের জন্য, অর্থাৎ একমাত্র তাঁরই ইবাদতের উদ্দেশ্যে কাবা ঘর ছাড়া অন্য কোথাও তাওয়াফ করা। এরূপ করা কঠিন হারাম ও নিষিদ্ধ, যেমন মহান আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে কাবা ঘর ছাড়া অন্য কোনো কিছুর দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম। কেউ যদি কাবা ঘর ছাড়া অন্য কোনো দিকে মুখ করে সালাত আদায় অথবা কাবা ঘর ছাড়া অন্য কোনো কিছুকে আল্লাহর ইবাদত হিসেবে তাওয়াফ করা বৈধ মনে করে তবে তা শিরক ও কুফর বলে গণ্য। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি ভক্তি প্রকাশের জন্য কোথাও তাওয়াফ করা। এরূপ করা সুস্পষ্টতই শিরক, যেমন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো তা'যীম বা সম্মান প্রদর্শনের জন্য তাকে সামনে রেখে তার উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করা। লক্ষণীয় যে, শুধু আল্লাহকে খুশি করতে এবং তাঁরই প্রতি ভক্তি জানাতে কাবা ঘর ছাড়া অন্য কোনো বস্তুকে কেউই তাওয়াফ করে না। যারা কোনো কবর, স্মৃতিবিজড়িত স্থান বা অন্য কিছুর তাওয়াফ করেন তারা আল্লাহর ইবাদতের কথা বললেও পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতি ভক্তি প্রদর্শন ও তাঁর নেক-নজর লাভেরও উদ্দেশ্য তাদের থাকে। নইলে কাবা ঘর বাদ দিয়ে অন্যত্র তাওয়াফ করবেন কেন?
📄 গাইরুল্লাহকে ডাকা বা অলৌকিক প্রার্থনা
আমরা ইতোপূর্বে দু'আ, সাহায্য প্রার্থনা, ত্রাণ প্রার্থনা ইত্যাদির লৌকিক ও অলৌকিক পর্যায়গুলি আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি যে, দৃশ্যমান বা অদৃশ্য উপস্থিত কোনো মানুষ, জিন্ন বা ফিরিশতার কাছে লৌকিক ও জাগতিক সাহায্য ও ত্রাণ প্রার্থনা করা যায়। কিন্তু অলৌকিক ত্রাণ একমাত্র মহান আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে চাওয়া যায় না। দূরে অবস্থিত বা অনুপস্থিত কারো কাছে লৌকিক বা অলৌকিক সাহায্য চাওয়া এবং উপস্থিত বা অনুপস্থিত কারো কাছে অলৌকিক সাহায্য চাওয়া শিরক। আমরা আরো দেখেছি যে, ইহুদী, খৃস্টান ও আরবের মুশরিকগণের অন্যতম শিরক ছিল সাধারণ বিপদে আপদে ফিরিশতাগণ, নবীগণ, জিন্নগণ, ওলীগণ বা অন্যান্য কাল্পনিক দেব দেবীদের ডাকা ও তাদের কাছে সাহায্য ও ত্রাণ প্রার্থনা করা। তারা সকলেই বিশ্বাস করত যে, একমাত্র আল্লাহই সর্বশক্তিমান প্রতিপালক এবং তাঁর ইচ্ছার বাইরে কারো কিছু করার নেই। তবে তারা বিশ্বাস করত যে, এ সকল বান্দাকে আল্লাহ কিছু ক্ষমতা প্রদান করেছেন। আল্লাহ এদের সুপারিশ শুনেন এবং এদের ডাকলে তিনি খুশি হন। অবিকল একইরূপ বিভ্রান্তির কারণে মুসলিম সমাজেও এ ধরনের শিরক প্রসার লাভ করেছে। শাহ ওয়ালি উল্লাহর বক্তব্যে আমরা তা দেখেছি। অগণিত মিথ্যা কল্প-কাহিনী, জনশ্রুতি ও শেষ যুগের কোনো কোনো আলিম নামধারী ব্যক্তির মতামতই এরূপ শিরকে লিপ্ত মানুষদের একমাত্র দলীল। এগুলির বিপরীতে একমাত্র আল্লাহকে ডাকার জন্য কুরআন ও হাদীসের অগণিত নির্দেশনার কোনো মূল্যই তারা দেন না। এ প্রসঙ্গে শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী বলেন: "কবর পূজারিগণ যে সমস্ত কারণে কবর পূজা করিয়া থাকে উহাদের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ হইল নিজেদের কুকর্মের সমর্থনে মিথ্যা হাদীস সৃষ্টি করা নিজেদের মনগড়া এই জাতীয় হাদীস প্রচার করিয়া সরল প্রাণ মুসলমানদিগকে ধোকা দিয়া আল্লাহর পথ হইতে দূরে সরাইয়া লইয়া যায়।..... কবর পূজারী সম্প্রদায় তাহাদের কুকর্মের সমর্থনে যে সমস্ত অলীক ও মনগড়া কাহিনীর অবতারণা করিয়া জনসাধারণকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করিয়া থাকে উহা সত্যিই প্রণিধানযোগ্য। যেমন তাহারা বলিয়া থাকে যে, অমুক ব্যক্তি কঠিন বিপদে পড়িয়া একেবারে দিশাহারা হইয়া পড়ে। মুক্তির কোন পথ দেখিতে না পাইয়া অমুক দরবেশের মাজারে গিয়া বিপদমুক্ত হওয়ার জন্য প্রার্থনা জানায়। কি আশ্চর্য! সেই দরবেশ তাহাকে দুই-একদিনের মধ্যে সমস্ত বিপদাপদ দূর করিয়া দেয়। অমুক ব্যক্তি আসমানী বালায় নিপতিত হইলে অনোন্যপায় হইয়া অমুক কবরের দরবেশকে একাগ্রতার সাথে স্মরণ করিতে থাকে। দেখিতে দেখিতে আসমানী বালা দূর হইয়া যায়। এমনকি কেহ কেহ নিজের কথাও বলিয়া থাকে যে, আমি অমুক বিপদে পতিত হইয়া শেষ চেষ্টা স্বরূপ অমুক পীরের মাজারে নযর-নেওয়াজ লইয়া গিয়া তাহার সকল বিপদ দূর করিয়া দেয় নাউযুবিল্লাহ! আল্লাহ আমদের সকলকে এই শিরক ও বিদআত হইতে নিরাপদ রাখুন।... ঘর হইতে পা বাড়াইলেই যে আল্লাহর খালেছ ইবাদতখানা মসজিদ সেখানে যাওয়ার কষ্টটুকু ইহারা স্বীকার করিতে চায় না। অথচ মাইলের পর মাইল, দিনের পর দিন হাঁটিয়া গিয়া কবরের নিকট ধর্ণা দিয়া পড়িয়া থাকাকেই শ্রেয় মনে করে।... ইহারা যদি কবরে না গিয়া রাস্তাঘাট, হাট-বাজর অথবা গোসলখানায় বসিয়াও এমন কাকুতি-মিনতি ও একাগ্রতার সাথে কান্নাকাটি করিয়া মুক্তি লাভের জন্য প্রার্থনা করিত তবুও আল্লাহ তাদের দোআ কবুল করিতেন, তাহাদের দু'আ ব্যর্থ হইত না। সুতরাং এই অবস্থায় কবরের বুযর্গী ও প্রভাব মনে করা অজ্ঞতা ও কুসংস্কার ব্যতীত কিছই নহে। আল্লাহ বিপদাপন্নের দোআ যে সকল সময়ই কবুল করিয়া থাকেন ইহা এই অজ্ঞেরা বুঝিতে চায় না। এমন কি কাফেরও যদি আল্লাহর নিকট একাগ্রতার সাথে দোআ করে আল্লাহ তাহাও কবুল করিয়া থাকেন।...।"৯৮৭৬ কেউ কেউ এরূপ শিরককে 'ওসীলা ধরা' বলে চালাতে চান। তারা বলেন যে, যারা বিপদে আপদে ওলীগণের নাম ধরে ডাকেন ও সাহায্য চান, তাঁরা মনে করেন না যে, ওলীগণের নিজস্ব ক্ষমতা আছে, বরং সকলেই জানে যে, একমাত্র আল্লাহই সর্বশক্তিমান। তবে তারা আল্লাহর কাছে ওসীলা হিসেবে এদের ডাকেন। আমরা দেখেছি যে আরবের মুশরিকগণও ঠিক একইরূপ যুক্তি পেশ করত। কারো ওসীলা দিয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া আর অনুপস্থিত কারো কাছে গাইবী বা অলৌকিক সাহায্য চাওয়ার মধ্যে আসমান ও যমীনের পার্থক্য। প্রথম কর্ম শিরক নয়, কিন্তু দ্বিতীয়টি সুস্পষ্ট শিরক। প্রসিদ্ধ তাফসীর-গ্রন্থ 'রূহুল মা'আনী'র প্রণেতা আল্লামা শিহাব উদ্দীন মাহমূদ আল আলুসী আল-হানাফী (১২৭০ হি) তাঁর তাফসীরের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের শিরকের বিষয়টি আলোচনা করেছেন। আল্লাহ বলেন: هُوَ الَّذِي يُسَيِّرُكُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ حَتَّى إِذَا كُنْتُمْ فِي الْفُلْكِ وَجَرَيْنَ بِهِمْ بِرِيحٍ طَيِّبَةٍ وَفَرِحُوا بِهَا جَاءَتْهَا رِيحٌ عَاصِفٌ وَجَاءَهُمُ الْمَوْجُ مِنْ كُلِّ مَكَانٍ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ أُحِيطَ بِهِمْ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ لَئِنْ أَنْجَيْتَنَا مِنْ هَذِهِ لَنَكُونَنَّ من الشاكرين "তিনিই তোমাদের জলে-স্থলে ভ্রমন করান এবং তোমরা যখন নৌকারোহী হও এবং এগুলি আরোহী লয়ে অনুকূল বাতাসে বয়ে যায় এবং তারা তাতে আনন্দিত হয়, অতঃপর এগুলি বাত্যাহত এবং সর্বদিক হতে তরংগাহত হয় এবং তারা তা দ্বারা পরিবেশিষ্টত হয়ে পড়েছে বলে মনে করে, তখন তারা আনুগত্যে বিশুদ্ধ-চিত্ত হয়ে আল্লাহকে ডেকে বলে: তুমি আমাদেরকে ত্রাণ করলে আমরা অবশ্য কৃতজ্ঞদের অন্ত র্ভুক্ত হবো।"৮৭৭ এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে আল্লামা আলুসী (রাহ) বলেন: "এ আয়াত প্রমাণ করে যে, এরূপ অবস্থায় মুশরিকগণ মহান আল্লাহ ছাড়া কাউকে ডাকত না। আর আপনি ভালই অবগত আছেন যে, আজকাল মানুষেরা কি করে! জলে বা স্থলে যখন কোনো কঠিন বিপদ বা বড় কোনো সমস্যার মধ্যে তারা নিপতিত হয় তখন তারা এমন ব্যক্তিদেরকে ডাকে যারা কোনো ক্ষতি করেন না এবং উপকারও করেন না, যারা দেখেনও না এবং শুনেনও না। তাদের কেউ খিযির এবং ইলিয়াসকে ডাকে। আর কেউ আবুল খামীস এবং আব্বাস (আ)-কে ডাকে। কেউ বা কোনো একজন ইমামকে ডাকে। কেউ বা উম্মাতের বুজুর্গ-মাশাইখের মধ্য থেকে কারো কাছে আকুতি আবেদন পেশ করে। তাদের মধ্যে একজনকে দেখবেন না যে শুধু তার মালিক-মাওলাকে ডাকছে এবং শুধু তাঁর কাছেই আকুতি আবেদন পেশ করছে। সম্ভবত তার মনের কোনে একবারও এ চিন্তা উকি দেয় না যে, যদি সে একমাত্র আল্লাহকে ডাকত তবে এ সকল বিপদ থেকে রক্ষা পেত। হে পাঠক, আল্লাহর কসম দিয়ে আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, বলুন তো, এ দিক থেকে মক্কার মুশরিকগণ এবং বর্তমানের মানুষদের মধ্যে কোন দল অধিকতর হেদায়াত প্রাপ্ত? উভয় প্রার্থনাকারী ও আহ্বানকারীর মধ্যে কার প্রার্থনা অধিকতর সত্য? আল্লাহর নিকটেই মনোবেদনা জ্ঞাপন করছি এমন এক যুগে, যে যুগে অজ্ঞতার প্রবল ঘূর্ণিঝড় সকলকে আচ্ছন্ন করেছে, বিভ্রান্তির প্রবল ঢেউ বিশাল আকৃতি নিয়ে আছড়ে পড়ছে, শরীয়তের নৌকার রশি ছিন্ন হয়েছে গাইরুল্লাহর নিকট সাহায্য ও ত্রাণ প্রার্থনাকেই মুক্তির ওসীলা রূপে গণ্য করা হয়েছে, জ্ঞানীদের জন্য সৎকাজে আদেশ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করার ক্ষেত্রে নানপ্রকারের বিপদ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।"৮৭৮
📄 গাইরুল্লাহর জন্য মানত-নযর বা উৎসর্গ
আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য মানত, উৎসর্গ, জবাই, কুরবানী ইত্যাদি শিরক। জীবিত বা মৃত কোনো পীরের নামে, বাবার নামে, ওলীর নামে, তাঁর মাযারের নামে মানত করা, জবাই করা, মানত বা উৎসর্গের মাধ্যমে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য পোষণ করা এ পর্যায়ের শিরক। প্রসিদ্ধ হানাফী ফকীহ মুহাম্মাদ ইবনু আলী আলাউদ্দীন আল-হাসকাফী (১০৮৮ হি) আদ-দুররুল মুখতার গ্রন্থে বলেন: وَاعْلَمْ أَنَّ النَّذْرَ الَّذِي يَقَعُ لِلأَمْوَاتِ مِنْ أَكْثَرِ الْعَوَّامِ وَمَا يُؤْخَذُ مِنْ الدَّرَاهِمِ وَالشَّمْعِ وَالزَّيْتِ وَنَحْوِهَا إِلَى ضَرَائِحِ الْأَوْلِيَاءِ الْكِرَامِ تَقَرُّبًا إِلَيْهِمْ فَهُوَ بِالإِجْمَاعِ بَاطِلٌ وَحَرَامٌ مَا لَمْ يَقْصِدُوا صَرْفَهَا لِفُقَرَاءِ الأَنَامِ وَقَدْ ابْتُلِيَ النَّاسُ بِذَلِكَ ، وَلَا سِيِّمَا فِي هَذِهِ الْأَعْصَارِ "জেনে রাখ, মৃতদের জন্য নযর-মানত যা অধিকাংশ সাধারণ মানুষ করে থাকে এবং আওলিয়ায়ে কেরামের মাযার-কবরের জন্য যে সব টাকাপয়সা, মোমবাতি, তেল ও অনুরূপ দ্রব্য গ্রহণ করা হয় তাদের নৈকট্য বা নেক-নজর লাভের জন্য তা সবই বাতিল ও হারাম বলে ইজমা হয়েছে। যদি না তারা দরিদ্র অসহায় মানুষদের জন্য তা ব্যয় করার মানত করে। মানুষেরা এরূপ নিষিদ্ধ নযর-মানতের মধে নিপতিত হয়েছে, বিশেষত বর্তমান যুগে।"৮৭৯ এর ব্যাখ্যায় আল্লমা ইবনু আবেদীন শামী (১২৫২ হি) "হাশিয়াতু রাদ্দিল মুহতার" গ্রন্থে বলেন: قَوْلُهُ تَقَرُّبًا إِلَيْهِمْ ) كَأَنْ يَقُولَ يَا سَيِّدِي فُلانٌ إِنْ رُدَّ غَائِبِي أَوْ عُوفِي مَرِيضِي أَوْ قُضِيَتْ حَاجَتِي فَلَكَ مِنَ الذَّهَبِ أَوْ الْفِضَّةِ أَوْ مِنَ الطَّعَامِ أَو الشمع أَو الزَّيْتِ ... ( قَولَهُ بَاطِلَ وَحَرَامٌ ( لِوُجُوهِ : مِنْهَا أَنَّهُ نَذَرَ المخلوق والنذر للمخلوق لَا يَجُوزُ لَأَنَّهُ عِبَادَةً وَالْعِبَادَةُ لَا تَكُونُ لِمَخْلُوقِ. وَمِنْهَا أَنَّ الْمَنْذُورَ لَهُ مَيِّتٌ وَالْمَيِّتُ لا يَمْلِكُ. وَمِنْهُ أَنَّهُ إِنْ ظَنَّ أَنَّ الْمَيِّتَ يَتَصَرَّفُ فِي الْأُمُورِ دُونَ اللَّهِ تَعَالَى وَاعْتِقَادَهُ ذَلِكَ كُفْرٌ "আওলিয়া কেরামের মাযারে তাদের নৈকট্য বা নেক-নজর লাভের জন্য মানত করার ধরন এই যে, মানতকারী বলবে, হে অমুক হুজুর বা অমুক বাবা, যদি আমার হারানো ব্যক্তি ফিরে আসে বা আমার অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হয় বা আমার হাজত পূর্ণ হয় তবে তোমার জন্য অমুক পরিমান স্বর্ণ, রৌপ্য, খাদ্য, মোমবাতি বা তেল দেব। এ প্রকারের মানত বাতিল ও হারাম হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে: প্রথমত, তা মাখলুক বা সৃষ্টির জন্য নযর-মানত করা, আর কোনো সৃষ্টির জন্য মানত-নযর জায়েয নয়। কারণ মানত-নযর ইবাদত এবং কোনো মাখলুকের বা সৃষ্টির ইবাদত করা যায় না। দ্বিতীয়ত, যার জন্য মানত করা হয়েছে তিনি মৃত। আর মৃত ব্যক্তি কোনো মালিকানা লাভ করতে পারে না। তৃতীয়ত, এরূপ মানতকারী ধারণা করেছে যে, আল্লাহ ছাড়া মৃত মানুষও কাজে কর্মে বা দুনিয়ার পরিচালনায় কিছু করতে পারেন, আর তার এ আকীদা কুফ্র।" ৮৮০ আল্লামা ইবনু নুজাইম (৯৭০ হি) 'আল-বাহরুর রায়িক' গ্রন্থেও একই কথা বলেছেন।৮৮১ যারা কবরে, মযারে আউলিয়ায়ে কেরামের নামে মানত বা জবাই করেন তাদের অনেকে মনে করেন যে, আমরা তো একমাত্র আল্লাহর নাম নিয়েই জবাই করছি এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যেই মানত করছি, কেবলমাত্র পশুটাকে বাবার বা ওলীর মাযারে এনে জবাই করছি, যেন তিনি সাওয়াব পান। এখানে প্রশ্ন হলো, যদি একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই মানত বা জবাই করা হয় তাহলে পৃথিবীর যে কোনো স্থানে জবাই করেই তো নিয়্যাত করা যেত যে, আল্লাহ এ সাদকার সাওয়াবটি অমুককে পৌঁছে দিন, এত কষ্ট করে পশুটি মাযারে নিয়ে যাওয়া হলো কেন? মাজার ময়লা করতে? বাহ্যত এ কষ্টের কারণ হলো, পৃথিবীর যে কোনো স্থানে জবাই করলে তো আল্লাহ পাবেন, কবরস্থ ওলী বা 'বাবা' সরাসরি পাবেন না, আল্লাহর মাধ্যমে পাবেন। আর মাযারে নিয়ে জবাই করলে এক ঢিলে দু পাখি মারা হবে, আল্লাহর প্রতি ভক্তিও প্রকাশ করা হবে এবং কবরস্থ 'বাবার' প্রতি ভক্তিও প্রকাশ করা হবে। যদিও দ্বিতীয়টিই মূল উদ্দেশ্য এবং সে জন্যই এত কষ্ট করা, তবে আল্লাহকে শরীক রাখলে অসুবিধা নেই, এতে 'বাবা' নারায হবেন না!! এ প্রসঙ্গে আল্লামা আলুসী বলেন: “মহান্ আল্লাহ বলেছেন: "তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না...।" যারা আল্লাহর ওলীগণের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করে এখানে তাদের নিন্দার প্রতি ইশারা করা হয়েছে; কারণ তারা বিপদে আপদে তাদের নিকট ত্রাণপ্রার্থনা করে এবং মহান আল্লাহর নিকট ত্রাণ প্রার্থনা করা থেকে গাফিল থাকে এবং এ সকল ওলীর জন্য তারা নযর-মানত করে। তাদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান তারা বলে, এ সকল ওলীরা হলেন আল্লাহর নিকট আমাদের ওসীলা। এবং বলে যে, আমরা আল্লাহর জন্যই নযর-মানত করি এবং এর সাওয়াব ওলীর জন্য প্রদান করি। এ কথা সুস্পষ্ট যে, তাদের প্রথম দাবির বিষয়ে তারা মূর্তিপূজকদের সবচেয়ে নিকটবর্তী ও মূর্তিপূজকদের মতই, যারা বলত৮৮: আমরা এদের ইবাদত করি তো এজন্যই যে এরা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করিয়ে দেবে।' তাদের দ্বিতীয় দাবিটি আপত্তিকর হবে না, যদি তারা এরূপ মানতের মাধ্যমে ওলীগণের নিকট থেকে তাদের অসুস্থব্যক্তিদের সুস্থতা, তাদের হারানো মানুষের প্রত্যাবর্তন বা অনুরূপ কোনো হাজত প্রার্থনা না করে। কিন্তু তাদের বাহ্যিক অবস্থা প্রমাণ করে যে, তারা এদের নিকট মানতের দ্বারা এরূপ কিছুই প্রার্থনা করে। এর প্রমাণ এই যে, তাদেরকে যদি বলা হয় যে, তোমরা আল্লাহর জন্য মানত কর এবং এর সাওয়াব তোমাদের পিতামাতার জন্য দান কর, কারণ এ সকল ওলী-আওলিয়ার চেয়ে তোমাদের পিতামাতগণেরই সাওয়াবের প্রয়োজন বেশি, তবে তারা তা করবে না। আমি এদের অনেককে দেখেছি যে, তারা ওলীগণের কবরের পাথরের বেদিমূলে সাজদা করছে। এদের অনেকে দাবি করে যে, সকল ওলীই তাদের কবরে বসে দুনিয়া পরিচালনায় অংশগ্রহণ করেন, তবে তাদের বেলায়াতের মর্তবা অনুসারে তাদের ক্ষমতার কমবেশি রয়েছে। তাদের মধ্যে যারা আলিম তারা বিশ্ব পরিচালনা এরূপ ক্ষমতা ৪ বা ৫ জন কবরবাসীর জন্য সীমাবদ্ধ করেন। তাদের নিকট যদি প্রমাণ চাওয়া হয় তবে তারা বলেন, কাশফ দ্বারা তা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন! এরা কত বড় জাহিল!! আর এদের মিথ্যাচার ও জালিয়াতি কত ব্যাপক!!! তাদের মধ্যে অনেকে দাবি করে যে, এ সকল ওলী-আউলিয়া তাদের কবর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করেন। তাদের মধ্যে যারা আলিম তারা বলে, এ সকল ওলীর রূহ প্রকাশিত হয়ে যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়ায় এবং কখনো কখনো তারা বাঘ, সিংহ, হরিন বা অনুরূপ প্রাণীর আকৃতি ধারণ করে। এ সবই ভিত্তিহীন বাতিল কথা। কুরআন, সুন্নাহ এবং উম্মাতের প্রথম যুগে ইমামগণের কথার মধ্যে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। এ সকল মিথ্যাচারী মানুষে দীন-ধর্ম নষ্ট করে দিয়েছে। ইহুদী, খৃস্টান ও অন্যান্য বাতিল ও বিকৃত ধর্মের মানুষদের নিকটেও এরা হাসি-মস্করার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমনকি বাতিল মতবাদ ও নাস্তিকতার অনুসারীরাও এদের নিয়ে হাস্যকৌতুক করে। আমরা আল্লার নিকট ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করি।"৮৮৪ শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলবী তাঁর 'আল-বালাগুল মুবীন' গ্রন্থে বলেন: “কবর পূজারীদেরকে পীর পুরস্ত বা পীর পূজারীও বলা হয়। কবর পূজারী সম্প্রদায় কবর পূজাকে ফরয ইবাদত তথা নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি হইতেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। সুন্নত ইবাদত ও অযীফা করার চেয়ে কবর পূজাকে অধিক ফযীলতপূর্ণ ও সাওয়াবের কাজ মনে করে। তাই তাহারা কবর পূজাকে যে কোন প্রকার ইবাদতের পরিবর্তে করিয়া থাকে এবং ইহাকেই যথেষ্ট মনে করে। বস্তুত তারা কিন্তু কবর পূজার পরিবর্তে আল্লাহর কোন ইবাদতকে গুরুত্ব দেয় না এবং উহাকে যথেষ্ট মনে করে না। যখন কোন বুর্গের উরশ বা মেলা ইত্যাদি হয় তখন সেখানে বহু দূর দূরান্ত হইতে বহু লোকের সমাগম হয়। এই ক্ষেত্রে কবর পূজারীরা সেই মেলায় উপস্থিত হওয়া ফরয ইবাদত মনে করে এবং অন্যান্য ফরয অর্জনকরার চেয়ে এটাকেই অধিক প্রয়োজন মনে করিয়া থাকে। কবর পূজারীদের আমলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জঘন্যময় কাজ হইল যাবতীয় পাথিব বিপদাপদ ও সঙ্কটময় কাজের সমাধান হওয়ার জন্য কবরের নিকট গিয়া এমন বিনয়তা, একাগ্রতা ও আন্তরিকতার সাথে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে যে, মসজিদে বা অন্য কোথাও আল্লাহকে হাযির নাযির মনে করিয়া উহার শত ভাগের এক ভাগও করে না। কবরে শায়িত বুর্গের নাম ধরিয়া তাহাকে ডাকে এবং দোআ করে এবং তাহার নিকট জীবিকা ও সন্তানাদি কামনা করে। অত্যন্ত বিনয় ও মনযোগের সহিত মাথানত (করিয়া) কাপড়ের গেলাফ এবং চাদর লাগায়; কবরের উপর সুগন্ধি ছড়ায়। পূণ্যের কাজ মনে করিয়া লোবান, আগর বাতি জ্বালায় এবং কবরকে সুন্দরভাবে সজ্জিত করে। এই অযথা কাজে পীরের আত্মাকে খুশী করার নিয়তে তাহার সানিধ্য লাভের চেষ্টা করে। আপাতঃদৃষ্টে দেখা যায় যে হিন্দু ও মুশরিক সম্প্রদায় তাহাদের প্রতিমার জন্য যেভাবে অর্চনা করিয়া থাকে ঠিক সেই ভাবেই এই কবর পূজারিগণও সেই সমস্ত কাজকে পুণ্যময় মনে করিয়া সম্পাদন করিয়া থাকে।"৮৮৫