📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 মুর্তি, ছবি, কবর বা স্মৃতিময় দ্রব্য

📄 মুর্তি, ছবি, কবর বা স্মৃতিময় দ্রব্য


মানব ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি যে, যুগে যুগে সকল সমাজের মুশরিকদেরই ধারণা যে, নেককার মানুষ মৃত্যুর পরে আরো বেশি অলৌকিক ক্ষমতা ও অধিকার লাভ করে। তারা দেহের খোলস থেকে মুক্ত হয়ে পুরো আত্মিক আধিপত্য ও ক্ষমতা অর্জন করে। এজন্য জীবিত নেককারদের চেয়ে মৃত নেককারদের ইবাদত করা বা তাদেরকে আল্লাহর শরীক বাননোর প্রবণতা সব মুশরিকদের মধ্যেই বেশি।
আমরা দেখেছি যে, বিপদে আপদে মূর্ত কিছুকে আকড়ে ধরে নিজের মনের আবেগ জানানো এবং বিপদ থেকে ত্রাণ প্রার্থনা করার আগ্রহ শিরকের অন্যতম কারণ। দুর্বল চিত্ত মানুষ অদৃশ্য কোনো কিছুর কাছে প্রার্থনা করে পুরো তৃপ্তি পায় না। মূর্ত কিছুকে জড়িয়ে ধরতে চায়। এজন্য মৃত মৃত নেককার ব্যক্তির ইবাদত করা বা তার প্রতি চূড়ান্ত ভক্তি-বিনয় প্রকাশের জন্য মুশরিক ব্যক্তি একটি মূর্ত কিছু সন্ধান করে। এজন্য মূল বাহন (১) উক্ত ব্যক্তির সমাধি বা কবর, (২) উক্ত ব্যক্তির ছবি, মূর্তি বা প্রতিকৃতি এবং (২) উক্ত ব্যক্তির স্মৃতিবিজড়িত স্থান বা দ্রব্য। সাধারণত এগুলিকে কেন্দ্র করেই শিরক আবর্তিত হয়।
ইসলামে শিরকের এ সকল উপকরণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেন কোনোভাবে মানবীয় দুর্বলতা বা শয়তানের প্রবঞ্চনার কারণে কোনো মুমিন এগুলির প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করতে যেয়ে শিরকে নিপতিত না হয়। ছবি, প্রতিকৃতি, মুর্তি ইত্যাদি তৈরি, সংরক্ষণ ইত্যাদি কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। স্মৃতিবিজড়িত দ্রব্য বা স্থানের বিষয়ে ইসলামী নির্দেশনা ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি। কবর যেন মানুষের অতিভক্তির বিষয়ে পরিণত না হয় সে জন্য কবর কেন্দ্রিক মসজিদ ও ইবাদত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সর্বোপরি কবর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচু করা, পাকা করা, চুনকাম করা, কবরের উপরে কিছু লেখা ইত্যাদি নিষেধ করা হয়েছে। মুর্তি, ছবি ও প্রতিকৃতির পাশাপাশি উচু কবর ভেঙ্গে ফেলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য গ্রন্থে সংকলিত হাদীসে খলীফা আলীর (রা) পুলিশ বাহিনীর প্রধান আবুল হাইয়াজ আসাদী বলেন: قَالَ لِي عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ أَلا أَبْعَتُكَ عَلَى مَا بَعَثَنِي عَلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنْ لا تَدَعَ تِمْثَالَا إِلا طَمَسَتَهُ وَلَا قَبْرًا مُشْرِفًا إِلَّا سَوَّيْتَهُ ... ولا صُورَةٌ إِلا طَمَسْتَهَا "আলী (রা) আমাকে বলেন: আমি তোমাকে সেই দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করছি, যে দায়িত্ব দিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে প্রেরণ করেছিলেন: যত মূর্তি-প্রতিকৃতি দেখবে সব ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেবে, (স্বাভাবিক কবরের পরিচিতি জ্ঞাপক সামান্য উচ্চতার বেশি) কোনো উঁচু কবর দেখলে তা সব সমান করে দেবে এবং যত ছবি দেখবে সব মুছে ফেলবে।"৮১৪। আবূ মুহাম্মাদ আল-হুযালী আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন: كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي جَنَازَةٍ فَقَالَ أَيُّكُمْ يَنْطَلِقُ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلَا يَدَعُ بِهَا وَتَنَا إِلا كَسَرَهُ وَلَا قَبْرًا إِلَّا سَوَّاهُ وَلَا صُورَةٌ إِلَّا لَطَخَهَا فَقَالَ رَجُلٌ أَنَا يَا رَسُولَ اللهِ فَانْطَلَقَ فَهَابَ أَهْلَ الْمَدِينَةِ فَرَجَعَ فَقَالَ عَلِيٌّ أَنَا أَنْطَلِقُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ فَانْطَلِقَ فَانْطَلَقَ ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ لَمْ أَدَعْ بِهَا وَتَنَا إِلا كَسَرَتُهُ وَلا قَبْرًا إِلا سَوَّيْتُهُ وَلَا صُورَةً إِلَّا لَطَحْتُهَا ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مَنْ عَادَ لصَنْعَةِ شَيْءٍ مِنْ هَذَا فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزَلَ عَلَى مُحَمَّدٍ . "একদিন রাসূলুল্লাহ এক জানাযায় (মদীনার বাইরে) ছিলেন। তিনি বললেন: তোমাদের মধ্যে কে আছ যে মদীনার অভ্যন্তরে গিয়ে যত মূর্তি পাবে সব বিচূর্ণ করবে, যত কবর দেখবে সব সমান করে দেবে, এবং যত ছবি পাবে সব মুছে বা নষ্ট করে দেবে। তখন একজন সাহাবী বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি যাব। কিন্তু তিনি মদীনাবাসীকে ভয় পেয়ে ফিরে আসলেন। তখন আলী (রা) বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি যাব। রাসূলুল্লাহ বললেন: যাও। তখন আলী চলে গেলেন। পরে ফিরে এসে বললেন: আমি সকল মূর্তি ভেঙ্গে দিয়েছি, সকল কবর ভেঙ্গে সমান করে দিয়েছি এবং সকল ছবি মুছে নষ্ট করে দিয়েছি। এরপর রাসূলুল্লাহ বললেন: যদি কেউ পুনরায় এসকল কাজের কোনো একটি করে তবে সে মুহাম্মাদের (সা) উপর অবতীর্ণ ধর্মের সাথে কুফ্রী করল।" হাদীসটির সনদ হাসান।৮১৫ যাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنْ يُجَصَّصَ الْقَبْرُ وَأَنْ يُقْعَدَ عَلَيْهِ وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهِ “রাসুলুল্লাহ কবর চুনকাম করতে, কবরের উপর বসতে এবং কবরের উপর ইমারত বা ঘর বানাতে নিষেধ করেছেন। ৮১৬ অন্য হাদীসে আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেছেন: إِنَّ النَّبِيَّ ﷺ نَهَى أَنْ يُبْنَى عَلَى الْقَبْرِ রাসূলুল্লাহ কবরের উপর ঘর তৈরি করতে নিষেধ করেছেন।"৮১৭ এ অর্থে উম্মে সালামা (রা) থেকেও হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ৮১৮ বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায় মোট ৫টি বিষয় রাসূলুল্লাহ নিষেধ করেছেন: কবর চুনকাম করা, কবরের উপরে বসা, কবর বাঁধানো বা কবরের উপরে ঘর জাতীয় কিছু তৈরি করা, কবরের উপরে লেখা এবং অতিরিক্ত মাটি এনে কবর উঁচু করা।৮১৯

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 মহান আল্লাহর বিষয়ে অব-ধারণা রোধ করা

📄 মহান আল্লাহর বিষয়ে অব-ধারণা রোধ করা


কুরআন ও হাদীসের প্রথম, প্রধান ও অন্যতম আলোচ্য বিষয় মহান আল্লাহর মর্যাদা, ক্ষমতা ও তাঁর তাওহীদ। বারংবার বিভিন্নভাবে বলা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, একমাত্র প্রতিপালক, সর্বশক্তিমান, সকল কর্তৃত্বের অধিকারী, বিশ্ব পরিচালনার অধিকার, ক্ষমতা, কল্যাণ বা অকল্যাণের ক্ষমতা আর কারো নেই। কেউ কিছু করতে পারে না, দিতে পারে না। তিনি দিলে কেউ তা রোধ করতে পারে না। তাঁর ইচ্ছাই চূড়ান্ত। তাঁর ইচ্ছার বিপরীতে অন্য কারো কোনো ইচ্ছার কোনা মূল্য নেই। তিনি তাঁর নিজের ইচ্ছা, অনুমতি ও মর্ষির বাইরে কারো সুপারিশ, শাফা'আত বা দু'আ গ্রহণ করেন না। একমাত্র তাঁকেই ডাক, তাঁরই সাহায্য চাও, তিনিই তোমার ডাকে সাড়া দিবেন। আর তিনি না দিলে অন্য কেউ কোনোভাবে দিতে পারে না। এভাবে কুরআন ও হাদীসে আল্লাহর মহত্ব, মর্যাদা, ক্ষমতা ও শক্তি সম্পর্কে বারংবার ঘোষণা করা হয়েছে, যেন তাঁর মর্যদা ও মহত্বের প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস মুমিন অর্জন করতে পারেন। এ বিষয়ক অনেক আয়াত ও হাদীস ইতোপূর্বে বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করেছি।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 ফিরিশতাগণ সম্পর্কে অতিভক্তি রোধ করা

📄 ফিরিশতাগণ সম্পর্কে অতিভক্তি রোধ করা


কুরআন ও হাদীসের বিবরণ থেকে আমরা দেখি যে, মুশরিকগণ যে সকল বান্দার বিষয়ে অতিভক্তির কারণে শিরক করেছে তাদের অন্যতম ফিরিশতাগণ, নবীগণ এবং আল্লাহর প্রিয় নেককার বান্দাগণ। এ ছাড়া মুশরিকগণ অনেক বানোয়াট বা কল্পিত ব্যক্তিত্বকে 'আল্লাহর প্রিয়' বা 'আল্লাহর সন্তান' নাম দিয়ে শিরক করেছে। আরবের কাফিরগণ ফিরিশতাগণকে আল্লাহর সন্তান বা আল্লাহর কন্যা বলে আখ্যায়িত করত এবং তাদের সুপারিশ-শাফা'আত লাভের আশায় তাদের ইবাদত করত। কুরআন কারীমে তাদের এ অতিভক্তি রোধ করতে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁরা মহান আল্লাহর সম্মানিত বান্দা মাত্র। তাঁরা শাফা'আতের সুযোগ পাবেন বটে, তবে তা তাদের ইচ্ছাধীন নয়, বরং মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতির অধীন। কাজেই শাফা'আতের আশায় আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের ইবাদত ভয়ঙ্কর পথভ্রষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়। এ বিষয়ক বিভিন্ন আয়াত ইতোপূর্বে বিভিন্ন স্থানে আলোচনা করা হয়েছে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 নবী-রাসূলগণের বিষয়ে অতিভক্তি রোধ করা

📄 নবী-রাসূলগণের বিষয়ে অতিভক্তি রোধ করা


কুরআন ও হাদীস থেকে আমরা দেখি যে, ইহুদী, খৃস্টান ও আরবের মুশরিকগণ ইবরাহীম, ইসমাঈল, উযাইর, ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) প্রমুখ নবী-রাসূলের বিষয়ে অতিভক্তি ও বাড়াবাড়ি করে শিরকে নিপতিত হয়। এজন্য কুরআন কারীমের বারংবার নবী-রাসূলগণের আবদিয়‍্যাত বা বান্দাত্ব, বাশারিয়‍্যাত বা মানবত্ব, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো অলৌকিক নিদর্শন দেখানোর অক্ষমতা, গাইব সম্পর্কে অজ্ঞতা ইত্যাদি বিষয় বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। যেন তাঁদের অনুসারী ও মুমিনগণ তাঁদের প্রতি অবিচল ভক্তি, ভালবাসা ও আনুগত্যের পাশাপাশি তাঁদের তাদের বিষয়ে অতিভক্তি থেকে আত্মরক্ষা করতে পারেন। এ বিষয়ক অনেক আয়াত ও হাদীস ইতোপূর্বে বিভিন্ন। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি ভক্তি, ভালবাসা, মর্যাদা প্রদান ও পরিপূর্ণ আনুগত্যের পাশাপাশি তাঁর প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ওহীর অনুসরণের নির্দেশনাবলিও আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00