📄 অর্থ ও পরিচিতি
আরবী 'কুফ্র' (الكفر) শব্দটি অবিশ্বাস, অস্বীকার, অকৃতজ্ঞতা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। শব্দটির মূল অর্থ 'আবৃত করা'। ৪র্থ হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ ভাষাবিদ ও অভিধান প্রণেতা আবুল হুসাইন আহমদ ইবনু ফারিস (৩৯৫হি) বলেন: "(কাফ, রা ও ফা) তিন অক্ষরের ক্রিয়ামূলটি একটি বিশুদ্ধ অর্থ প্রকাশ করে, তা হলো: 'আবৃত করা বা গোপন করা'। কোনো ব্যক্তি যদি তার পরিহিত বর্মকে তার কাপড় দিয়ে আবৃত করেন তবে বলা হয় তিনি তার বর্ম 'কুফ্র' করেছেন। চাষীকে 'কাফির' (আবৃতকারী) বলা হয়, কারণ তিনি শষ্যদানাকে মাটি দ্বারা আবৃত করেন। ঈমান বা বিশ্বাসের বিপরীত অবিশ্বাসকে 'কুফ্র' বলা হয়; কারণ অবিশ্বাস অর্থ সত্যকে অবৃত করা। অকৃতজ্ঞতা বা নিয়ামত অস্বীকার করাকে কুফ্র বলা হয়; কারণ এতে নিয়ামত লুকানো হয় এবং আবৃত করা হয়।"
ইসলামী পরিভাষায় বিশ্বাসের অবিদ্যমানতাই কুফ্র বা অবিশ্বাস। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের উপর এবং ঈমানের রুকনগুলিতে বিশ্বাস না থাকাকেই ইসলামের পরিভাষায় 'কুফ্র' বলে গণ্য। অস্বীকার, সন্দেহ, দ্বিধা, হিংসা, অহঙ্কার, ইত্যাদি যে কোনো কারণে যদি কারো মধ্যে 'ঈমান' বা দৃঢ় প্রত্যয়ের বিশ্বাস অনুপস্থিত থাকে তবে তাকে ইসলামী পরিভাষায় 'কুফ্র' বলে গণ্য করা হয়। অনুরূপভাবে মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে কোনো বিষয়ে তাঁর সমতুল্য বা সমকক্ষ বা তাঁর সাথে তুলনীয় বলে বিশ্বাস করার মাধ্যমে আল্লাহর একত্ব ও অতুলনীয়ত্ব অস্বীকার করাও কুফর। তবে এ পর্যায়ের কুফরকে ইসলামী পরিভাষায় শির্ক বলা হয়।
📄 কুফর আকবার ও কুফর আসগার
কুরআন ও হাদীসের আলোকে কুফ্রকে দু ভাগে ভাগ করা হয়: (১) কুফ্র আকবার বা বৃহত্তর কুফ্র এবং (২) কুফ্র আসগার বা ক্ষুদ্রতর কুফ্র। কুফ্র আকবার বলতে প্রকৃত অবিশ্বাস বঝানো হয় যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় এবং প্রকৃত অবিশ্বাসী বা কাফিরে পরিণত করে। এর পরিণতি চিরস্থায়ী জাহান্নামের শাস্তিভোগ। আর কুফ্র আসগার বলতে বুঝানো হয় কঠিন পাপসমূহকে যা অবিশ্বাসেরই নামান্তর, তবে এরূপ পাপে লিপ্ত মানুষদেরকে ইসলাম ত্যাগকারী বা প্রকৃত কাফির বলে গণ্য করা হয় না। তাদেরকে অনন্ত জাহান্নামবাসী বলেও বিশ্বাস করা হয় না। বরং তাদেরকে পাপী ও শাস্তিযোগ্য মুসলিম বলে গণ্য করা হয়। কুফর আসগারকে কুফর মাজাযী বা রূপক কুফরও বলা হয়।
📄 কুফর আসগার বা ক্ষুদ্রতর অবিশ্বাস
কুফর মূলত হৃদয়ের অবিশ্বাসের নাম, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কর্মের নাম নয়। এজন্য কুরআন ও হাদীসে যে সকল 'পাপ কর্ম'-কে কুফর বলা হয়েছে কিন্তু যেগুলির সাথে হৃদয়ের অবিশ্বাস জড়িত নয় সেগুলিকে 'কুফর আসগার' বা 'কুফরুন নি'মাহ (كفر النعمة) অর্থাৎ নিয়ামতের অস্বীকার বা কুফর মাজাযী (الكفر المجازي) বা রূপকার্থে কুফর বলে অভিহিত করা হয়। কুরআনে অবিশ্বাসের পাশাপাশি অকৃতজ্ঞতাকেও কুফ্র বলা হয়েছে। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন:
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِنْ كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ "আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিত, যেথায় আসত সর্বদিক থেকে তার প্রচুর রিস্ক, অতঃপর তা আল্লাহর নিয়ামতের কুফরী করল, ফলে তারা যা করত তজ্জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছদনের।" এছাড়া আমরা বুঝতে পারি যে, প্রকৃত ও পরিপূর্ণ ঈমানের সাথে পাপ ও অবাধ্যতার সহ-অবস্থান না হওয়াই ঈমানের দাবি। বস্তুত বিশ্বাসের ঘাটতি ছাড়া কেউ পাপে লিপ্ত হতে পারে না। আল্লাহর প্রতি, তাঁর সিফাতসমূহের প্রতি, আখিরাতের প্রতি ও আখিরাতের শাস্তি ও পুরস্কারের প্রতি বিশ্বাস পরিপূর্ণ থাকলে কেউ পাপে লিপ্ত হতে পারে না। এজন্য পাপে লিপ্ত হওয়া বিশ্বাসের ঘাটতি বা অপূর্ণতা নির্দেশ করে। তবে যতক্ষণ এরূপ অপূর্ণতা পূর্ণ অবিশ্বাসে পরিণত না হয় ততক্ষণ একে 'কুফর আসগার' বা কুফর মাজাযী (রূপক কুফর) বলে অভিহিত করা হয়।
কুরআন ও হাদীসে অনেক কঠিন পাপকে কুফ্র বলে অভিহিত করা হয়েছে, আবার অন্যত্র এ সকল 'কুফ্রী'তে লিপ্ত মানুষদেরকে মুমিন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সকল আয়াত ও হাদীসের সমন্বয়ে সাহাবীগণ ও পরবর্তী যুগের আলিমগণ মত প্রকাশ করেছেন যে, এ সকল অপরাধ 'কুফ্র আসগার' বা ক্ষুদ্রতর কুফ্র বলে গণ্য। এগুলি কঠিন পাপ, তবে যদি কেউ এগুলিকে পাপ ও নিষিদ্ধ জেনে, নিজেকে অপরাধী বলে বিশ্বাস করে শয়তানের প্ররোচনায় বা জাগতিক কোনো স্বার্থে এরূপ পাপে লিপ্ত হয় তবে সে পাপী মুমিন বলে গণ্য হবে, ইসলাম ত্যাগকারী বা পারিভাষিক কাফির বলে গণ্য হবে না। পক্ষান্তরে যদি কেউ এরূপ কর্ম বৈধ মনে করে, অথবা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করা ঐচ্ছিক মনে করে, বা আল্লাহর এ সকল নির্দেশ বা যে কোনো নির্দেশ মান্য করা তার নিজের জন্য বা অন্য কারো জন্য বা কোনো যুগের জন্য অনাবশ্যক বা অপ্রয়োজনীয় মনে করে বা অন্য কোনো ধর্মের বা সমাজের বিধান অধিকতর উপযোগী বলে মনে করে তবে সে ধর্মত্যাগী ও কাফির বলে গণ্য হবে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ "আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারাই কাফির।" এখানে বাহ্যত বুঝা যায় যে আল্লাহর বিধানের বাইরে চলা বা যে কোনো পাপ করাই কুফরী, কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধানের বাইরে চলে বা পাপে লিপ্ত হয় সে মূলত তার নিজের জন্য বা অন্যের জন্য আল্লাহর বিধানের বাইরে বাইরে ফয়সালা করল। আর আল্লার নাযিলকৃত বিধানাবলির অন্যতম যে, মুসলিম অন্য মুসলিমের সাথে হানাহানি বা যুদ্ধে রত হবে না। ইবনু আব্বাস (রা), আবূ বাক্রাহ সাকাফী (রা), ইবনু উমার (রা), ইবনু মাসউদ (রা) প্রমুখ সাহাবী থেকে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত প্রায় মুতাওয়াতির হাদীসে তাঁরা বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজ্জে বলেন:
لَا تَرْجِعُوا بَعْدِي كُفَّارًا يَضْرِبُ بَعْضُكُمْ رِقَابَ بَعْضٍ "তোমরা আমার পরে কাফির হয়ে যেও না, যে একে অপরকে হত্যা করবে।" এখানে স্পষ্টতই পরস্পরে যুদ্ধ করাকে কুফরী বলা হয়েছে। অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ "মুসলিমকে গালি দেওয়া পাপ এবং তার সাথে যুদ্ধ করা কুফরী।" কিন্তু অন্য আয়াতে এরূপ কর্মে রত মানুষদেরকে মুমিন বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ "মুমিনগণের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর তাদের একদল অপর দলের উপর অত্যাচার বা সীমলঙ্ঘন করলে তোমরা জুলুমকারী দলের সাথে যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফয়সালা করবে এবং সুবিচার করবে। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন। মুমিনগণ পরস্পর ভাই; সুতরাং তোমরা ভ্রাতৃগণের মধ্যে শান্তি স্থাপন কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হও।" এখানে আমরা দেখছি যে, পরস্পরের যুদ্ধে রত মানুষদেরকে সুস্পষ্টভাবেই মুমিন বলা হয়েছে। কারণ এরূপ কর্ম কুফর আসগার বা কুফর মাজাযী হওয়ার কারণে তা ঈমানের সাথে একত্রিত হতে পারে।