📄 প্রসিদ্ধ তিন কিতাব
কুরআন ও হাদীসে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের মধ্য থেকে 'তাওরাত', 'যাবূর' ও 'ইনজীল'- এই তিনটি পুস্তকের কথা বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। এ তিনটি গ্রন্থ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের আলোকে আমরা নিম্নের বিষয়গুলি জানতে পারি: প্রথমত: আল্লাহ তিনজন প্রসিদ্ধ নবীকে গ্রন্থত্রয় প্রদান করেছিলেন (১) তাওরাত: কুরআন ও হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, আল্লাহ তাঁর নবী মূসা (আ)-এর কাছে তাওরাত নামক গ্রন্থ ওহীর মাধ্যমে প্রেরণ করেন। কুরআনে এ বিষয়ে অনেক আয়াত রয়েছে। আল্লাহ বলেন:
ثُمَّ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ تَمَامًا عَلَى الَّذِي أَحْسَنَ وَتَفْصِيلًا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لَعَلَّهُمْ بِلِقَاءِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُونَ "এবং মূসাকে দিয়েছিলাম কিতাব যা সৎকর্মপরায়ণের জন্য সম্পূর্ণ, যা সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, পথ-নির্দেশ এবং দয়া-স্বরূপ, যাতে তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বিশ্বাস করে।" অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا وَالرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُوا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ وَكَانُوا عَلَيْهِ شُهَدَاءَ فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ "নিশ্চয় আমি তাওরাত নাযিল করেছিলাম, তাতে ছিল পথ-নির্দেশ ও নূর (আলো)। নবীগণ যারা আল্লাহ অনুগত ছিল তারা ইয়াহুদীদেরকে তদনুসারে বিধান দিত, আরও বিধান দিত রাব্বানীগণ (আল্লাহওয়ালাগণ) এবং বিদ্যানগণ, কারণ তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের রক্ষক করা হয়েছিল এবং তারা ছিল তার সাক্ষী। সতরাং মানুষকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় কর এবং আমার আয়াত তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করো না। আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারাই কাফির।" (২) যাবুর: মহান আল্লাহ তাঁর নবী দাউদ (আ)-কে যাবূর গ্রন্থ প্রদান করেন। মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَى بَعْضٍ وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا "আমি নবীগণকে কারো উপরে কারো অতিরিক্ত মর্যাদা দিয়েছি; এবং দাউদকে আমি যাবুর প্রদান করি।" (৩) ইনজীল: কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, আল্লাহ তাঁর নবী ঈসা (আ)-কে যে গ্রন্থ প্রদান করেন তার নাম ছিল "ইনজীল"। আল্লাহ বলেন:
وَقَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَأَتَيْنَاهُ الإِنجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ وَمُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِّلْمُتَّقِينَ "মারয়াম-তনয় ঈসাকে তার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে তাদের পশ্চাতে প্রেরণ করেছিলাম এবং তাকে ইনজীল দিয়েছিলাম তার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে এবং মুত্তাকীদের জন্য পথের নির্দেশ ও উপদেশরূপে; তাতে ছিল পথের নির্দেশ ও নূর (আলো)।"
দ্বিতীয়ত: তাঁদের অনুসারীগণ গ্রন্থগুলি বিকৃত করেছে। কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা অনুসারে আমরা সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বিশ্বাস করি যে, উপর্যুক্ত তিনটি গ্রন্থকেই তাদের অনুসারীগণ বিকৃত করেছে। 'বনী ইসরাঈল' বা 'আহলু কিতাব' তাদের উপর অবতীর্ণ কিতাবগুলি সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্তন, ইচ্ছাকৃত গোপন করা, ভুলে যাওয়া, হারিয়ে ফেলা ইত্যাদি কর্মের মাধ্যমে বিকৃত করে বলে কুরআন ও হাদীসে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেন:
أَفَتَطْمَعُونَ أَن يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ "তোমরা কি এ আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? অথচ তাদের অবস্থা তো এই যে, তাদের একদল আল্লাহর বাণী শ্রবন করত এবং বুঝার পর জেনে শুনে তা বিকৃত করত।" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ "সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে, 'এ আল্লাহর নিকট হতে'। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য দুর্ভোগ তাদের এবং যা তারা উপার্জন করে তার জন্য দুর্ভোগ তাদের।"
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
فَبِمَا نَقْضِهِمْ مِيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ وَنَسُوا حَظًّا مِمَّا ذُكِّرُوا بِهِ "তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্য তাদেরকে লানত করেছি এবং তাদের হৃদয় কঠিন করেছি, তারা শব্দগুলিকে স্বস্থান থেকে বিকৃত করে এবং তাদেরকে যা শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল তার এক অংশ ভুলে গিয়েছে।" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَمِنَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصَارَى أَخَذْنَا مِيثَاقَهُمْ فَنَسُوا حَظًّا مِمَّا ذُكِّرُوا بِهِ فَأَغْرَيْنَا بَيْنَهُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَسَوْفَ يُنَبِّئُهُمُ اللَّهُ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ "যারা বলে 'আমরা খৃস্টান' তাদেরও অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম; কিন্তু তাদেরকে যা শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল তার এক অংশ তার ভুলে গিয়েছে।"
ইহুদী-খৃস্টানগণ কোনো কোনো নবীর ক্ষেত্রে 'ঈশ্বরত্ব' দাবি করে এবং তাদের ইবাদত করে। বিশেষত খৃস্টানগণ দবি করে যে, ঈসা (আ) নিজেকে 'আল্লাহ' বলে দাবি করেছেন। মহান আল্লাহ এ বিষয়ে জানিয়েছেন যে, এ সকল বক্তব্য যা কিছু তাদের কিতাবে রয়েছে সবই বিকৃতি ও সংযোজন। কোনো নবী কখনোই আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকে ইবাদত করতে বলতে পারেন না। মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقًا يَلْوُونَ أَلْسِنَتَهُمْ بِالْكِتَابِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ الْكِتَابِ وَمَا هُوَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُؤْتِيَهُ اللَّهُ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادًا لِي مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلَكِنْ كُونُوا رَبَّانِيِّينَ بِمَا كُنْتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَابَ وَبِمَا كُنْتُمْ تَدْرُسُونَ "তাদের মধ্যে একদল লোক আছেই যারা কিতাবকে জিহ্বা দ্বারা বিকৃত করে, যাতে তোমরা তাকে আল্লাহর কিতাবের অংশ মনে কর; কিন্তু তা কিতাবের অংশ নয়, এবং তারা বলে: 'তা আল্লাহর পক্ষ হতে', কিন্তু তা আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত নয়। তারা জেনে শুনে আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা বলে। কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহ কিতাব, হিম্মত ও নুবুওয়াত দান করার পর সে মানুষকে বলবে, 'আল্লাহর পরিবর্তে তোমার আমার বান্দা হয়ে যাও'- তা তার জন্য শোভন নয়; বরং সে বলবে, তোমরা রাব্বানী (আল্লাহওয়ালা) হয়ে যাও, যেহেতু তোমরা কিতাব শিক্ষা দান কর এবং যেহেতু তোমরা অধ্যয়ন কর।"
তৃতীয়ত: বিকৃত অবস্থায় সেগুলির অস্তিত্ব আছে এবং সেগুলির মধ্যে আল্লাহর বাণী ও শরীয়তের অনেক বিধান রয়েছে। কুরআন-হাদীসের আলোকে আমরা সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বিশ্বাস করি যে, মূল তাওরাত, যাবুর ও ইনজীলের অনেক অংশ তারা ভুলে, অবহেলায় ও ইচ্ছাকৃত বিকৃতি, সংযোজন বা বিয়োজনের মাধ্যমে বিলুপ্ত করেছে। আবার কিছু পুস্তক তারা নিজেরা লিখে ওহী বলে চালিয়েছে। তবে অন্যান্য গ্রন্থের মত তা একেবারে হারিয়ে যায় নি। বিকৃতি, সংযোজন, বিয়োজন, বিলুপ্তি, ভুয়ে যাওয়া, গোপন করা ইত্যাদির পরেও 'আহলু কিতাব' বা ইহুদী-খৃস্টানগণের নিকট তাওরাত, যাবুর ও ইনজীল নামে কিছু কিতাব রয়েছে, যেগুলির মধ্যে আল্লাহর বাণী ও মানবীয় বিকৃতি সংমিশ্রিত হয়ে রয়েছে। এগুলির মধ্যে পূর্ববর্তী নবীগণের বিষয়ে, তাওহীদ ও রিসালাতের বিষয়ে, শরীয়ত বা ব্যবস্থার বিষয়ে এবং শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আগমন ও তার উপর বিশ্বাস স্থাপনের বিষয়ে অনেক সঠিক শিক্ষা এখনো বিদ্যমান। এ সব বিষয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে আল্লাহ 'আহলু কিতাব'-দেরকে আহবান করেছেন। কখনো কখনো তাদের বিকৃত বিশ্বাস বা কর্মের ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করতে তাদের কিতাব থেকে প্রমাণ পেশ করতে আহ্বান করেছেন; কারণ অনেক বিকৃতি তারা তাওরাত, যাবূর বা ইনজীলের মূল পাঠে সংযোগ করেছিল এবং কিছু বিষয় তার অর্থ ও তাফসীরের নামে বিকৃতি করলে মূল পাঠের মধ্যে তা ছিল না। মহান
আল্লাহ বলেন:
يَهُودٌ لَيْسَتِ النَّصَارَى عَلَى شَيْءٍ وَقَالَتِ النَّصَارَى لَيْسَتِ الْيَهُودُ عَلَى شَيْءٍ وَهُمْ يَتْلُونَ الْكِتَابَ كَذَلِكَ قَالَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ مِثْلَ قَوْلِهِمْ فَاللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ "ইহুদীরা বলে, 'খৃস্টানদের কোনো ভিত্তি নেই', এবং খৃস্টানগণ বলে, 'ইহুদীদের কোনো ভিত্তি নেই'; অথচ তারা কিতাব পাঠ করে! এভাবে যারা কিছুই জানে না তারাও অনুরূপ কথা বলে। সুতরাং যে বিষয়ে তাদের মতভেদ আছে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার মিমাংসা করবেন।"
অর্থাৎ তাদের গ্রন্থাবলি বিকৃত করার পরেও যা তাদের কাছে অবশিষ্ট রয়েছে তাও সুস্পষ্ট বা আক্ষরিকভাবে তাদের এই দাবি প্রমাণ করে না। বরং তাদের নিকট বিদ্যমান কিতাব প্রমাণ করে যে, উভয় ধর্মেরই ভিত্তি আছে এবং উভয় সম্প্রদায়ই বিভিন্ন বিভ্রান্তি ও সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত। যাদের কোনোই কিতাব নেই তারা যেমন আন্দাযে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে কথা বলে এরাও তেমনি কথা বলে। ইহুদীরা রাসূলুল্লাহ-কে বিব্রত করার জন্য তাঁর কাছে বিচার প্রার্থনা করে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
وَكَيْفَ يُحَكِّمُونَكَ وَعِنْدَهُمُ التَّوْرَاةُ فِيهَا حُكْمُ اللَّهِ ثُمَّ يَتَوَلَّوْنَ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَمَا أُولَئِكَ بِالْمُؤْمِنِينَ "তারা কিভাবে তোমার উপর বিচারভার ন্যস্ত করবে যখন তাদের নিকট রয়েছে তাওরাত, যার মধ্যে আল্লাহর আদেশ বিদ্যমান? তার পরও তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তারা মুমিন নয়।"
অর্থাৎ যে বিষয়ে তারা বিচার প্রার্থনা করছে সে বিষয়ক বিধান তাওরাতেই বিদ্যমান। অথচ তদানুসারে বিচার না করে রাসূলুল্লাহ- এর নিকট বিচার চাওয়া প্রমাণ করে যে, তারা অবিশ্বাস ও প্রতারণার জন্যই এরূপ করেছে। ইহুদীরা দাবি করত যে, উটের গোশত হারাম। বিষয়টি তাদের বানোয়াট ব্যাখ্যা মাত্র, তাওরাতে তা ছিল না। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
كُلُّ الطَّعَامِ كَانَ حِلًّا لِبَنِي إِسْرَائِيلَ إِلَّا مَا حَرَّمَ إِسْرَائِيلُ عَلَى نَفْسِهِ مِنْ قَبْلِ أَنْ تُنَزَّلَ التَّوْرَاةُ قُلْ فَأْتُوا بِالتَّوْرَاةِ فَاتْلُوهَا إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ "তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার ইসরাঈল (ইয়াকূব) নিজের জন্য যা হারাম করেছিলেন তা ব্যতীয় বনী ইসরাঈলের জন্য যাবতীয় খাদ্যই হালাল ছিল। বল: 'যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তওরাত আন এবং পাঠ কর।" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَسْتُمْ عَلَى شَيْءٍ حَتَّى تُقِيمُوا التَّوْرَاةَ وَالْإِنجِيلَ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ "বলুন, হে কিতাবীগণ, তাওরাত, ইন্জীল ও যা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে (আল- কুরআন) তোমরা তা প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত তোমাদের কোনো ভিত্তিই নেই।" অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
وَلْيَحْكُمْ أَهْلُ الإِنجِيلِ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فِيهِ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ "ইনজীল অনুসারিগণ যেন আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে বিধান দেয়। আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারা ফাসিক (সত্যত্যাগী)।"
চতুর্থত: ওহী ও বিকৃতির মধ্যে পার্থক্যের মাপাকাঠি কুরআন।
এভাবে আমরা দেখছি যে, মহান আল্লাহ তাঁর তিন নবীকে তাওরাত, যাবূর ও ইনজীল নামে তিনটি আসামানী গ্রন্থ প্রদান করেন, যেগুলিতে নূর ও হেদায়াত ছিল। রাসূলুল্লাহ-এর আগমনের পূর্বেই তাঁদের অনুসারীগণ বিভিন্নভাবে পুস্তকগুলির কিছু অংশ ভুলে যায় ও বিলুপ্ত করে এবং বিদ্যমান অংশ বিকৃত ও পরিবর্তিত করে। রাসূলুল্লাহ-এর যুগে এবং বর্তমানে এ নামে যে পুস্ত কগুলি বিদ্যমান সেগুলির মধ্যে কিছু ওহী এবং কিছু ওহীর নামে মানবীয় সংযোজন, পরিবর্তন বা বিকৃতি বিদ্যমান। এগুলির মধ্যে ঠিক কোন্ কথাটি সঠিক ওহী এবং কোন্ কথাটি বিকৃতি তা বুঝার বা যাচাই করার কোনো নিরপেক্ষ উপায় নেই। এজন্য আল- কুরআনই সত্যাসত্য যাচাইয়ের একমাত্র মাপকাঠি। মহান আল্লাহ বলেন:
وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ "এবং আপনার উপর সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, তার পূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সমর্থক (confirmer) ও পর্যবেক্ষক-
নিয়ন্ত্রক (watcher) রূপে।"
এভাবে আমরা জানছি, আল-কুরআন পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থের নিয়ন্ত্রক, পর্যবেক্ষক ও পরীক্ষক। এ সকল গ্রন্থের মধ্যে বিদ্যমান কোনো তথ্য যদি কুরআনের সাক্ষ্য সত্য বলে প্রমাণিত হয় তবে আমরা তা সত্য বলে বিশ্বাস করি। আর যে তথ্য কুরআনের সাক্ষ্য মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে আমরা মিথ্যা বলে বিশ্বাস করি। আর কুরআন যদি সে বিষয়ে নীরব থাকে, তবে আমরাও সে বিষয়ে নীরব থাকি; কারণ যা সত্যও হতে পারে আবার মিথ্যাও হতে পারে।
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ তাঁর উম্মতকে সহজ মূলনীতি শিখিয়েছেন। ইহুদী-খৃস্টানদের কিতাবে যা কিছু রয়েছে তা কুরআনের আলোকে বিচার করার সাধ্যসাধারণের সকলের জন্য হয়ত সহজ নয়। কাজেই এ সকল পুস্তকের কিছুই সঠিক বলে গ্রহণ করার বা মিথ্যা বলে ঘোষণা দেওয়া যাবে না। বরং বলতে হবে, আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা সঠিক। তোমাদের গ্রন্থে কোন্ কথাটি সঠিক এবং কোন্টি বিকৃতি তা তিনিই ভাল জানেন। (আবু হুরাইরা (রা) বলেন,
كَانَ أَهْلُ الْكِتَابِ يَقْرَءُونَ التَّوْرَاةَ بِالْعِبْرَانِيَّةِ وَيُفَسِّرُونَهَا بِالْعَرَبِيَّةِ لِأَهْلِ الإِسْلَامِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : لَا تُصَدِّقُوا أَهْلَ الْكِتَابِ وَلَا تُكَذِّبُوهُمْ وَقُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ ... الْآيَةَ. কিতাবীরা হিব্রু ভাষায় তাওরাত পাঠ করে আর আরবীতে অনুবাদ করে মুসলিমদের শুনাতো। তখন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেন: “তোমরা কিতাবীদেরকে সত্য বলেও বিশ্বাস করবে না এবং মিথ্যা বলেও ঘোষণা দিবে না। বরং বলবে: “আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহতে, এবং আমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরগণের উপরে আয়াত।"
এখানে উল্লেখ্য যে, কুরআন নাযিলের সময় এবং পরবর্তী প্রায় হাজার বৎসর যাবত ইহুদী-খৃস্টানগণ দাবী করত যে, তাদের নিকট বিদ্যমান তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জীল ইত্যাদি গ্রন্থ সবই অবিকৃতভাবে বিশুদ্ধ। এর মধ্যে কোনোরূপ বিকৃতি হয় নি। কিন্তু গত কয়েকশত বৎসরের গবেষণার মাধ্যমে পাশ্চাত্যের ইহুদী খৃস্টানগণই প্রমাণ করেছেন যে, বাইবেলের অনেক পুস্তিকা হারিয়ে গিয়েছে, হাজার হাজার বৎসরের গবেষণার আলোকে তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জীল নামক গ্রন্থগুলির বর্তমানে ‘বাইবেল’ নামে পরিচিত গ্রন্থটির মধ্যে বিদ্যমান ব্যাপক বিকৃতি, পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন, পরস্পর বিরোধিতার অসংখ্য নমুনা, ঐতিহাসিক প্রেক্সপট ও প্রামাণ্য জানার জন্য অন্য পাঠকে আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবী (১৮৯১ খৃ) রচিত ‘ইযহারুল হক্ক’ নামক কালজয়ী গ্রন্থটি পাঠ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। মহান আল্লাহর তাওফীকে আমি পুস্তকটি অনুবাদ করেছি এবং ইসলামিক ফাইন্ডেশন বাংলাদেশ তা প্রকাশ করেছে।