📄 আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূলগণকে কিতাব দিয়েছেন
মানব জাতির ইহলৌকিক ও পরলৌকিক মঙ্গলের পথ প্রদর্শনের জন্য মহান আল্লাহ যুগে-যুগে তাঁর নবী রাসূলদের কাছে ওহী বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে কিতাব নাযিল করেছেন। আল্লাহর প্রেরিত গ্রন্থসমূহে ছিল সংশ্লিষ্ট জাতি বা সমাজের জন্য সত্য ও সৎ পথের দিশা। আমরা তাই সাধারণভাবে বিশ্বাস করি যে, যুগে-যুগে নবী রাসূলগণের কাছে আল্লাহ তাঁর বাণী গ্রন্থ আকারে প্রেরণ করেছেন, যার মধ্যে তিনি তৎকালীন মানব সমাজের জন্য সত্য, সৎ কল্যাণ ও মঙ্গলের পথের নির্দেশনা দান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন:
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَأَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ "সকল মানুষ ছিল একই উম্মতভূক্ত। অত:পর আল্লাহ সুসংবাদাতা ও সতর্ককারীরূপে নবীগণকে প্রেরণ করেন এবং মানুষের মাঝে যে সকল বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল সে সকল বিষয়ে বিধান দানের জন্য তাদের সাথে সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেন।"
এ থেকে আমরা জানতে পারি যে, আল্লাহ যুগে-যুগে মানব জাতির পথ প্রদর্শনের জন্য নবীদেরকে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁদের সাথে সত্যসহ গ্রন্থ নাযিল করেছেন, যে সকল গ্রন্থে মানব সমাজের সকল সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। এ সকল গ্রন্থের নাম ও বিবরণ বিস্তারিতভাবে আমরা জানতে পারি না। অন্যত্র আল্লাহ কতিপয় নবীর (আ) নাম উল্লেখ করে তাঁদের উপর অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহে বিশ্বাস করার নির্দেশ দিয়েছেন। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন:
قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِنْ رَبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ "তোমরা বল আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহতে, এবং আমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাঁর বংশধরগণের উপররে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, এবং মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে তাঁদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা দেওয়া হয়েছে, সবকিছুর উপরে আমরা বিশ্বাস আনয়ন করেছি। আমরা তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করিনা এবং আমরা তাঁর (আল্লাহ) নিকট আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)।" অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
إِنَّ هَذَا لَفِي الصُّحُفِ الْأُولَى صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى "এ তো আছে পূর্ববর্তী 'সাহীফা'গুলিতে; ইবরাহীম ও মূসার 'সহীফা'গুলিতে। 'সাহীফা' অর্থ 'লিখিত পৃষ্ঠাসমূহ', 'পুস্তিকা' বা গ্রন্থ। এ সকল আয়াত থেকে আমরা জানতে পারি যে, ইবরাহীম ও মূসাকেও সাহীফা বা গ্রন্থ প্রদান করা হয়েছিল।
📄 আল্লাহর গ্রন্থসমূহে বিশ্বাস
ঈমানের অন্যতম রুকন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত গ্রন্থসমূহে বিশ্বাস করা। আমরা দেখেছি যে, কুরআন ও হাদীসে বিভিন্ন স্থানে 'আল্লাহর গ্রন্থসমূহে' বিশ্বাস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং যারা তাতে বিশ্বাস করে না তাদের ভয়ঙ্কর বিভ্রান্তির কথা বলা হয়েছে।
আল্লাহর কিতাবসমূহে বিশ্বাস করার সাধারণ প্রকাশ এই যে, মুমিন সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূলদের নিকট ওহীর মাধ্যমে 'কিতাব' প্রেরণ করেছেন, যেগুলি সন্দেহাতীতভাবে আল্লাহর বাণী, আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য হেদায়াত, মানবজাতির পথনির্দেশক নূর। তবে সেগুলি বিকৃত বা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তাই আল্লাহ সর্বশেষ কিতাব 'আল-কুরআন' নাযিল করেছেন পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থের সত্যতা ঘোষণা করতে, সেগুলির স্থান পূরণ করতে এবং পূর্ববর্তী সকল কিতাবকে রহিত করতে। এই সর্বশেষ কিতাব কুরআনের মধ্যেই সকল কিতাবের নির্যাস ও মানব জাতির মুক্তির পথ রয়েছে।
আল্লাহর কিতাবসমূহের ঈমানের বিস্তারিত দিকগুলি নিম্নরূপ:
📄 আল্লাহর প্রেরিত গ্রন্থসমূহে বিশ্বাসের কল্যাণ
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আল্লাহর প্রেরিত গ্রন্থসমূহে বিশ্বাস করা আমাদের জীবনের জন্য অফুন্ত কল্যাণের উৎস। প্রথমত: এই বিশ্বাস আমাদের প্রতিপালক স্রষ্টার সাথে আমাদের মনের সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করে এবং তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতায় আমাদের মন ভরে উঠে। আমরা মানুষের জন্য আল্লাহর অনন্ত ভালবাসা ও করুণা অনুভব করতে পারি। আমরা দেখতে পাই যে, তিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করে এবং বিবেক ও বিচার জ্ঞান দান করেই ছেড়ে দেনননি। উপরন্তু আমাদেরকে কল্যাণ ও মঙ্গলের পথের দিশা দানের জন্য তাঁর মনোনীত নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে তাঁর গ্রন্থ প্রেরণ করেছেন। বিশেষত মানবীয় জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষ যে সকল বিষয় বুঝতে পারে না বা শুধু মানবীয় জ্ঞানের উপর নির্ভর করে বুঝতে গেলে বিভ্রান্তির মধ্যে নিপতিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং যে সকল বিষয়ে মানুষ ভালমন্দ বুঝলেও পার্থিব স্বার্থ বা কামনা-বাসনার বশবর্তী হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল মত দান করতে পারে সেসকল বিষয়ে সঠিক পথের ও সঠিক মতের জ্ঞান দানের জন্য আল্লাহর তাঁর বাণী প্রেরণ করেছেন, যেন মানুষ সর্বদা কল্যাণ ও মঙ্গলের পথে থাকতে পারে। মানুষের প্রতি স্রষ্টার এ এক অপরীসীম করুশা। এ করুণার উপলব্ধি তাঁর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার অনুভূতি গভীর করে। আমরা জানি যে, স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসার অনুভব আমাদের মনের সকল প্রশান্তি ও শক্তির উৎস। এই অনুভব যত গভীর হবে, আমাদের মনের প্রশান্তি এবং শক্তিও তত প্রগাঢ় হবে।
উপরন্তু এই বিশ্বাস আমাদেরকে আল্লাহর প্রেরিত গ্রন্থের অনুসরণ এবং তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী জীবণ পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করে। আর আমরা দেখেছি যে, আল্লাহর বাণীর অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে আমাদের জীবনের সকল কল্যাণ, মঙ্গল, উন্নতি ও সফলতা। এছাড়া আল্লাহর প্রেরিত গ্রন্থে বিশ্বাসের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন সমাজে বিরাজিত ধর্মীয় আচার আচরণে বিভিন্নতার কারণ জানতে পারি। আমরা বুঝতে পারি যে, আল্লাহ বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন সমাজের মানুষদেরকে বিভিন্ন ধরণের বিধান দান করেছেন। এসকল ধর্মের বিশ্বাস ও নৈতিক বিধান মূলত এক। তবে ব্যবহারিক বিধানবলী সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন ছিল। সর্বশেষ গ্রন্থ আল-কুরআন প্রেরণ করে আল্লাহর সকল বিধানের সমন্বয় সাধন করেছেন।
📄 জানা ও অজানা কিতাব
এভাবে আমরা বিশ্বাস করি যে, নবীগণের প্রতি প্রদত্ত আল্লাহর সকল গ্রন্থই ছিল সত্য ও কল্যাণের পথের দিশারী। কিন্তু আমরা এ সকল গ্রন্থের অধিকাংশেরই কোনো নাম বা বিষয়বস্তু জানি না। আমরা কেবল আল্লাহর অপার করুশা, মানব জাতির হেদায়াতের জন্য গ্রন্থ নাযিলের ধারায় বিশ্বাস করি। এবং বিশ্বাস করি যে, তিনি যে যুগে যা কিছু নাযিল করেছেন সব কিছুই সংশ্লিষ্ট মানুষদের জন্য সুনিশ্চিত সত্য ও কল্যাণের দিশারী ছিল।