📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 শৈশব ও কৈশর

📄 শৈশব ও কৈশর


জন্মের পরে তাঁর মাতা তাঁর নাম রাখেন “আহমাদ”, আর তার দাদা আব্দুল মুত্তালিব তার নাম রাখেন “মুহাম্মদ” । মক্কার অধিবাসীরা তাদের নবজাতক সন্তানদেরকে সাধারণত শহরের বাইরে বেদুইন গোত্রদের মধ্যে কিছুদিন লালন পালন করতেন, যেন তারা শহরের মিশ্র পরিবেশের বাইরে বেদুইনদের মাঝে পরিপূর্ণ মানসিক ও দৈহিক পূর্ণতা ও স্বাবলম্বিতা নিয়ে গড়ে ওঠে এবং তাদের ভাষা বিশুদ্ধ হয় । এ নিয়মে জন্মের কিছুদিন পরে মক্কার বাইরে, মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী এলাকার বেদুইন গোত্র বনূ সা’দের হালীমা বিনতু আবু যু'আইব নামক এক মহিলা শিশু মুহাম্মদ (ﷺ)-এর লালন পালনের ভার গ্রহণ করেন । তিনি সেখানে ৫ বৎসর কাটান ।
এরপর তিনি মক্কায় তাঁর মাতার কাছে ফিরে আসেন । প্রায় এক বৎসর পর তাঁর মাতা মৃত্যুবরণ করেন । তখন তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর লালন পালনের ভার গ্রহণ করেন । আব্দুল মুত্তালিব তাঁর এই এতিম পৌত্রকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন । ২ বৎসর পরে, ৮ বৎসর বয়সে রাসূলুল্লাহ তাঁর দাদাকেও হারান । মৃত্যুর সময় আব্দুল মুত্তালিব তাঁর পুত্র আবূ তালিবের উপর দায়িত্ব দেন এতিম বালক মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর লালন পালনের । পরবর্তী প্রায় ১৭ বৎসর তিনি তাঁর চাচা আবূ তালিবের পরিবারেই অবস্থান করেন ।
এসময়ে তিনি মাঝেমাঝে তাঁর চাচার ও অন্যান্য মক্কাবাসীদের ছাগল- ভেড়া চরাতেন মক্কার প্রান্তরে । কখনো চাচার সাথে ব্যবসায়ের ভ্রমণে অংশ নিয়েছেন । তিনি সাধারণ যুবকদের মত গল্পগুজব পছন্দ করতেন না । তিনি কখন কোনো মূর্তিকে স্পর্শ করেন নি । মক্কায় প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার ও সামাজিক অনাচারকে তিনি অত্যন্ত ঘৃণা করতেন । ৫৯১ খৃষ্টাব্দের দিকে, যখন তার বয়স প্রায় ২০ বৎসর, মক্কার কিছু সৎ ও সাহসী যুবক একত্রিত হয়ে শপথ গ্রহণ করেন যে, তারা সমাজের অত্যাচার রোধ করবেন । শক্তের অত্যাচার থেকে দুর্বলকে রক্ষা করবেন এবং দুর্বলের অধিকার আদায় করে দেবেন । যুবক মুহাম্মদ (ﷺ) এই শপথে অংশ গ্রহণ করেন ।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 বিবাহ ও নুবুওয়াত-পূর্ব জীবন

📄 বিবাহ ও নুবুওয়াত-পূর্ব জীবন


২৫ বৎসর বয়সে তিনি খাদীজা বিনতু খুয়াইলিদ নামক মক্কার একজন ধনী ব্যবসায়ী মহিলার ব্যবসায়ের সামগ্রী নিয়ে সিরিয়ায় গমন করেন । খাদীজা তাঁর সততা ও চারিত্রিক পবিত্রতায় খুবই মুগ্ধ হন । তিনি তাঁর সাথে বিবাহের আগ্রহ প্রকাশ করেন । উভয়পক্ষের অভিভাবকদের সম্মতি ও মধ্যস্থতায় বিবাহ সম্পন্ন হয় । এসময়ে খাদিজার বয়স ছিল প্রায় ৪০ বৎসর, এবং মহানবীর বয়স ছিল ২৫ বৎসর ।
বিবাহের পরে খাদিজা তাঁর সকল সম্পদ স্বামীর হাতে সমর্পণ করেন । রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সম্পদ বিভিন্ন জনহিতকর কাজে ব্যয় করতেন । তিনি অনাথদের লালন পালন, অসহায় ও দুস্থদের সেবা, মুসাফিরদের আতিথেয়তা, আত্মীয়-স্বজনের দেখাশুনা, বিপদগ্রস্তদের সাহায্য ইত্যাদি কর্মে ব্যস্ত থাকতেন । এ সময়ে তিনি তাঁর সেবা, সততা, অমায়িক ব্যবহার ও চারিত্রিক পবিত্রতার জন্য সমাজে এতই প্রসিদ্ধ হন যে, সমাজের লোকেরা তাঁকে আল আমীন (বিশ্বস্ত) ও আস সাদিক (সত্যবাদী) ইত্যাদী বিশেষণে আখ্যায়িত করত । বিভিন্ন সামাজিক বিরোধিতায় তারা তাঁর সিদ্ধান্ত ও মধ্যস্থতা মেনে নিত ।
এ বিষয়ে কাবাঘর নির্মাণকালে হাজার আসওয়াদ বা কাল পাথর পুনস্থাপন বিষয়ক ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য । কাবাঘরের সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের পরে পবিত্র হাজ্র আসওয়াদকে কাবাগৃহের দেওয়ালে নির্দিষ্ট স্থানে পুনস্থাপন করার বিষয়ে মক্কার প্রতিটি গোত্র নিজেদের অগ্রাধিকার দাবি করে । প্রত্যেকে তাঁর দাবিতে অনড় থাকে এবং অধিকার রক্ষার্থে যুদ্ধের প্রতিজ্ঞা করে । মক্কাবাসীরা এক ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয় । একপর্যায়ে নেতৃবৃন্দ একমত হন যে, প্রথম যে ব্যক্তি গিরিপথের মধ্য থেকে তাদের সামনে আগমন করবেন সকলেই তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নিবেন । এ সময়ে মুহাম্মাদ (ﷺ) তথায় উপস্থিত হন । তারা সকলেই আনন্দিত হয়ে বলে উঠেন, আল-আমিন এসেছেন! তখন তিনি নিজের চাদরটি বিছিয়ে নিজ হাতে পাথরটি তুলে চাদরের উপর রাখেন । এরপর বিবাদমান সকল গোত্রকে আহবান করেন চাদরটি চারিদিক থেকে ধরে পাথরটি কাবাগৃহের নিকটে নিয়ে যাওয়ার । এরপর তিনি নিজ হাতে পাথরটি কাবার প্রাচীরে পুনস্থাপন করেন । এভাবে মক্কাবাসী ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা পায় । এ ঘটনায় নবুয়তের পূর্বেই মক্কাবাসীর মধ্যে রাসূলুল্লাহ-এর গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বস্ততা ও তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায় । অধিকাংশ ঐতিহাসিক একমত যে, এ ঘটনাটি ঘটেছিল নুবুওয়াতের ৫ বৎসর পূবে, যখন রাসূলুল্লাহ-এর বয়স ছিল ৩৫ বৎসর । কোনো কোনো ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন যে, এ ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল ২৫ বৎসর । কেউ কেউ বলেছেন যে, তাঁর কিশোর বয়সে এ ঘটনাটি ঘটেছিল ।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 নুবুওয়াত ও মাক্কী জীবন

📄 নুবুওয়াত ও মাক্কী জীবন


৪০ বৎসর বয়সে তিনি ক্রমান্বয়ে আল্লাহর ইবাদত ও ধ্যানে আগ্রহী হয়ে পড়েন । তিনি মক্কার বাইরে হেরা পাহাড়ের গুহায় বসে রাতদিন আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকতেন । এ বছরেই, অর্থাৎ ৬১০ খৃষ্টাব্দে রমযান মাসে সোমবার (ইংরেজী আগস্ট মাসে), ৪০ বৎসর বয়সে তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হন । আল্লাহর পক্ষ থেকে ফিরিশতাগনের নেতা জিবরীল আল-আমীন (আ) ওহী নিয়ে হেরা পাহাড়ের গুহায় আসেন এবং তাঁকে কুরআন কারীমের সূরা ইকরার প্রথম কয়েক আয়াত শিক্ষা দান করেন ।
এর পরে তিনি আল্লাহর নির্দেশে গোপনে মানুষদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার জন্য এবং আল্লাহ ছাড়া সকল উপাস্যকে পরিত্যাগ করার জন্য আহবান জানাতে থাকেন । এভাবে তিন বৎসর তিনি গোপনে ইসলাম প্রচার করেন । এ সময়ে মক্কার কিছু সৎ ও নীতিবান যুবক ইসলাম গ্রহণ করেন ।
এর পর আল্লাহ তাঁকে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেন । তাঁর নবুয়ত প্রাপ্তির ৪র্থ বৎসর থেকে তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন । পরবর্তী প্রায় দশ বৎসর তিনি মক্কায় ইসলাম প্রচারে রত থাকেন ।
এসময়ে মূলত তিনি মূলত তাওহীদুল ইবাদাত বা ইবাদতের তাওহীদের দাওয়াত প্রচার করেন । পাশাপাশি সততা, নৈতিকতা, মানবতা, মানবসেবা ইত্যাদি মৌলিক বিষয় পালনের এবং শির্ক, হত্যা, হানাহানি অত্যাচার ইত্যাদি অমানবিক কর্ম বর্জনের জন্য আহবান করতেন । ইসলামের অন্যান্য বিধান যেমন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রমযানের সিয়াম, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি তখনো প্রবর্তিত হয়নি । এগুলি কিছু মক্কী জীবনের একেবারে শেষে এবং বাকি সকল বিধান মদীনায় হিজরতের পরে অবতীর্ণ হয় ।
কুরাইশ নেতৃবৃন্দ কঠোরভাবে তাঁর এ আহবান প্রত্যাখ্যান করে । আমরা দেখেছি যে, তারা আল্লাহকে একমাত্র স্রষ্টা, সর্বশক্তিমান ও প্রতিপালক হিসাবে বিশ্বাস করতেন এবং আল্লাহর ইবাদত করত । পাশাপাশি তারা আল্লাহর প্রিয় ও আল্লাহর সাথে বিশেষ সম্পর্কযুক্ত বান্দা হিসেবে ফিরিশতা, কোনো কোনো নবী, কোনো কোনো কল্পিত ব্যক্তিত্ব ও অন্যান্য দেবদেবীর ইবাদত করত । তারা এদের ইবাদত করাকে পিতাপিতামহদের মাধ্যমে প্রাপ্ত ইবরাহীম-ইসামাঈল (আ)-এর সঠিক ধর্ম বলে বিশ্বাস করত । এজন্য এদের ইবাদত পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে অস্বীকার করে । আল্লাহ ছাড়া কেউই ইবাদতের যোগ্য নন এ কথাকে তারা উদ্ভট ও অবন্তর কথা এবং যুগযুগ ধরে প্রচলিত পিতা পিতামহের আচরিত ধর্মের অবমাননা বলে মনে করে । তারা বিভিন্ন ভাবে মহানবী মুহাম্মদ (ﷺ)-কে অপমান ও অত্যাচার করতে থাকেন । তাঁর দাওয়াতের যৌক্তিকতা খণ্ডন করার কোনো ক্ষমতা তাদের ছিল না । তারা বুঝতে পারে যে, তাঁর বক্তব্য শুনলে যে কোনো বিবেকবান মানুষ তার বক্তব্য গ্রহণ করবেই । এজন্য তারা মানুষদেরকে তার থেকে দূরের রাখার জন্য চেষ্টা করে । তাঁকে ধর্মত্যাগী, ধর্মের অবমাননাকারী, যাদুকর, কবি ইত্যাদি বলে মানুষদের মনে তাঁর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির জন্য তারা সর্বতোভাবে চেষ্টা করে ।
তাদের শত অপপ্রচার ও বাধা সত্ত্বেও ক্রমে ইসলামের বাণী মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে । বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন । তখন কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে । তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ডাকে সাড়া দানকারী নও মুসলিমদের উপর অকথ্য অত্যাচার নির্যাতন শুরু করে । কোনো অত্যাচার নির্যাতন বা অপমান-লাঞ্ছনাই মহানবীকে সত্যের আহবান থেকে সরাতে পারে না । তিনি তাঁর সকল অত্যচারের মধ্যেও একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষদেরকে আহবান করতে থাকেন এবং মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে থাকে । কাফিরদের সীমাহীন অত্যাচারের কারণে শতাধিক মুসলিম নারী ও পুরুষ আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় হিজরত করেন । অবশিষ্ট অধিকাংশ মুসলিম তাওহীদ আকড়ে ধরে মক্কাবাসীদের অত্যাচার নীরবে সহ্য করতে থাকেন ।
এত অত্যাচারের মাধ্যমেও ইসলামের অগ্রযাত্রা রোধ করতে অক্ষম হয়ে মক্কার সকল গোত্র একত্রিত হয়ে সকল মুসলিম এবং রাসূলুল্লাহ-এর বংশের মানুষদের সামাজিকভাবে বয়কট ও অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । নুবুয়তের ৭ম থেকে ১০ম সন পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বৎসর রাসূলুল্লাহ তাঁর বংশের মানুষদের এবং মুসলিমদের নিয়ে পাহাড়ের উপত্যকায় অবরুদ্ধ হয়ে অবর্ণনীয় কষ্টে অবস্থান করেন । এ সময়েও তিনি সাধ্যমত দীনের দাওয়াত অব্যাহত রাখেন ।
নবুয়তের ১০ম বৎসরে অবরোধ থেকে মুক্তির কিছু দিন পরে, তাঁর চাচা আবু তালিব ও তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা কিছু দিনের ব্যবধানে ইন্তেকাল করেন । তাঁর জন্য এ ছিল খুবই বেদনাময় বৎসর । স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি তাঁর ব্যাখ্যা-বেদনার প্রিয়তম সাথীকে হারান । অপরদিকে চাচার মৃত্যুতে তিনি সামাজিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েন । কারণ আবু তালিব ছিলেন কুরাইশদের মধ্যে বিশেষ সম্মানিত নেতা । তিনি নিজে ইসলাম গ্রহণ না করলেও রাসূলুল্লাহ-কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং কুরাইশদের অত্যাচার থেকে তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা করতেন । তাঁর কারণে অনেক সময় কুরাইশ নেতারা মহানবীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে সাহস পেত না । আবু তালিবের মৃত্যুর পরে কুরাইশদের অত্যাচার শতগুণে বৃদ্ধি পায় । তারা তাঁকে কোনোভাবেই কথা বলতে দিত না । তেমনিভাবে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের প্রতিও অত্যাচার শতগুণে বৃদ্ধি পায় ।
এমতবস্থায় তিনি মক্কার বাইরে ইসলাম প্রচারের কথা চিন্তা করেন । তিনি এ বছরের শেষ দিকে (শাওয়াল মাসে, ৬১৯ খৃষ্টাব্দে মে/জুন মাসে) মক্কার প্রায় ১০০ কিলোমিটার পূর্বে তায়েফ শহরে গমন করেন । তিনি তাঁর প্রিয় খাদিম যায়িদ বিন হারিসাকে সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে তায়েফে গমন করেন । পথিমধ্যে যে সকল বেদুইন গোত্রকে তিনি দেখতে পান, তাদেরকে তিনি তাওহীদের আহবান জানান । তারা কেউই তাঁর আহবানে কর্ণপাত করে না । তিনি তায়েফে প্রায় দশদিন যাবৎ তাওহীদের আহ্বান জানান । তিনি তায়েফের সকল গোত্রপ্রধান ও সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের আহ্বান জানান । তারা কেউই তাঁর ডাকে সাড়া দেয় না । বরং তারা তায়েফের দুষ্টু ছেলেদেরকে তাঁর পিছনে লেলিয়ে দেয় । ছেলেরা তায়েফের পথে পথে গালাগালি করে তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় । উপরন্তু তারা তাঁকে পাথর ছুড়ে মারতে থাকে । তিনি রক্তাক্ত দেহে তায়েফ থেকে বেরিয়ে আসেন এবং ভগ্নহৃদয়ে মক্কায় ফিরে আসেন । সকল কষ্ট ও ব্যথা মেনে নিয়ে তিনি ইসলাম প্রচারের চেষ্টা করতে থাকেন, যদিও মক্কায় তাঁর অবস্থান বা ইসলাম প্রচার প্রায় অসম্ভব ছিল ।
ইব্রাহিম (আ)-এর সময় থেকে মক্কায় কাবাঘরের হজ্জ প্রচলিত হয় । তখন থেকে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষেরা যুলহাজ্জ মাসে মক্কায় এসে হজ্জ আদায় করত । যদিও পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে শিরক, মূর্তিপূজা ও বিভিন্ন সামাজিক অন্যায় অনাচার ছড়িয়ে পড়ে, তবুও হজ্জ ও হাজীদের সম্মান ছিল তাদের বিশ্বাসের অংশ । তারা হজ্জের সময়ে সকল প্রকার মারামারি, দৈহিক অত্যাচারকে নিষিদ্ধ মনে করত । রাসূলুল্লাহ হজ্জের এই সুযোগে গোপনে মক্কায় আগত বিভিন্ন এলাকার হাজীদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের চেষ্টা করতে থাকেন । নবুয়তের ১১শ বৎসরের হজ্জ মাওসুমে (৬২০ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে) মদীনা শহর থেকে আগত ৬ জন যুবক হাজী রাসূলুল্লাহ-এর ডাকে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন । তাঁরা হজ্জের পরে দেশে ফিরে গিয়ে সেখানে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন ।
পরবর্তী বৎসরে, নবুয়তের ১২শ বৎসরের হজ্জ মওসুমে (৬২১ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে) মদীনার আরো কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেন । রাসূলুল্লাহ তাঁদের সাথে তাঁর প্রিয় সাহাবী মুস'আব বিন উমাইরকে মদীনায় প্রচারক হিসেবে প্রেরণ করেন । তাঁর প্রচেষ্টায় মদীনার অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন । পরবর্তী হজ্জ মওসুমে (নবুয়তের ১৩শ বৎসরে, ৬২২ খৃষ্টাব্দে জুন মাসে) মদীনা থেকে হাজীদের যে কাফেলা আসে তার মধ্যে ৭০ জনেরও বেশি ছিলেন মুসলিম । তাঁরা গোপনে রাসূলুল্লাহ-এর সাথে মিলিত হয়ে তাঁকে মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় গিয়ে অবস্থান করার আহবান জানান । তাঁরা তাঁকে সার্বিক সহযোগিতা ও প্রাণের বিনিময়ে হলেও তাঁকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা করেন ।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 মদীনায় হিজরত ও মাদানী জীবন

📄 মদীনায় হিজরত ও মাদানী জীবন


এ ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ মক্কার নির্যাতিত মুসলিমদেরকে মদীনায় গমন করার (হিজরত করার) অনুমতি দেন । মক্কার কুরাইশ নেতাগণ মদীনায় ইসলামের সাফল্যে বিচলিত হন । তারা যে কোনো মূল্যে ইসলামের অগ্রগতি রোধ করার জন্য এক আলোচনায় মিলিত হন । আলোচনায় তারা রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন ।
এসময়ে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (ﷺ)-কে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দেন । কুরাইশদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে তিনি মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়েন । কাফিররা তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাঁকে খুজে বের করে হত্যা করার জন্য, কিন্তু তাঁর ব্যর্থ হয় । তিনি তাঁর সঙ্গী আবু বকরের সাথে তিন দিন সাওর পাহাড়ের চূড়ার গুহার মধ্যে লুকিয়ে থাকার পর মদীনায় রওয়ানা দেন । নুবুওয়তের ১৪শ বৎসরের সফর মাসের ২৭ তারিখে (১৩ই সেপ্টেম্বর ৬২২ খৃষ্টাব্দে) রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর মক্কা ত্যাগ করেন । প্রায় দশ দিন পথ চলার পরে রবিউল আউয়াল মাসের ৮ তারিখে (২৩শে সেপ্টেম্বর, ৬২২ খৃষ্টাব্দে) তিনি মদীনায় পৌঁছান ।
তিনি মদীনার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের সিদ্ধান্তে মদীনার প্রশাসনিক নেতৃত্ব বা মদীনা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন । মদীনার সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম জনগণ এবং অমুসলিম ও ইহুদীদের সাথে নাগরিক চুক্তির মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের শান্তি, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করেন । তিনি মদীনায় তিনি অত্যন্ত শান্তির সাথে মুসলমানদের ইসলাম শিক্ষা দিয়ে থকেন । এ সময় থেকে মহান আল্লাহ ইসলামের বিভিন্ন বিধিবিধান নাযিল করেন ।
মক্কার কাফিররা তাঁর সাথেও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে । তাঁরা বিভিন্ন ভাবে মদীনার মুসলিমদেরকে ধ্বংসের চেষ্টা করতে থাকে এবং মুসলিমদের উপর বিভিন্নভাবে আক্রমণ করতে থাকে । ফলে আল্লাহ্‌ মুসলিমদেরকে জিহাদের যা যুদ্ধ করার অনুমতি দান করেন । কাফিররা সবসময় অত্যাচার, অগ্রে ও ক্ষমতা নগন্য হওয়া সত্ত্বেও মহানবী তাঁর প্রিয় সাহাবীদেরকে নিয়ে কাফিরদের মুকাবিলা করেন । পরবর্তী ৬ বৎসরে উভয় পক্ষের মধ্যে কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় । কাফিররা পরাজিত হতে থাকে । সর্বশেষে ৬ষ্ঠ হিজরী সালে (৬২৬ খৃঃ) রামাদান মাসে রাসূলুল্লাহ্‌ মুসলিম বাহিনী নিয়ে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন । মক্কার কাফিরদেরকে তিনি ক্ষমা করে দেন । এরপর আরব উপদ্বীপের মানুষেরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে । তিনি আরবদেশের পারস্য, রোম, মিসর, আবিসিনিয়া ইত্যাদি দেশের শাসকদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানিয়ে চিঠি লেখেন ।
রাসূলুল্লাহ্‌-এর মদীনায় হিজরতের ১০ বৎসরের মধ্যে সমস্ত আরব উপদ্বীপ ইসলামের ছায়াতলে সমাগত করেন, আরবের বাইরের ইসলাম আলো ছড়াতে হিড়িক পড়ে । এই বৎসরে (৬৩২ খৃঃ) রাসূলুল্লাহ্‌ লকবীর নামে পরিচিত ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00