📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা 📄 জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদ

📄 জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদ


আমরা দেখেছি যে, এ পর্যায়ের তাওহীদকে তাওহীদুল ইসবাত ওয়াল মা'রিফাহ বা জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদ বলা হয়। কখনো বা (التوحيد العلمي الخبري) অর্থাৎ 'জ্ঞান ও সংবাদের একত্ব' বলা হয়।১১৫ জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদের দুইটি মূল বিষয় রয়েছে: ১) সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একত্ব, ও ২) নাম ও গুণাবলীর একত্ব।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা 📄 তাওহীদের প্রকারভেদ

📄 তাওহীদের প্রকারভেদ


আকীদার উৎসের বিচ্যুতির কারণে, অর্থাৎ কুরআন-হাদীসের গভীর অধ্যয়ন পরিত্যাগ করে, আভিধানিক অর্থ, নিজের বুদ্ধি-বিবেক, দর্শন ইত্যাদির উপর নির্ভর করে তাওহীদের ব্যাখ্যা করতে যেয়ে অনেক পণ্ডিত মনে করেছেন যে, 'তাওহীদ' অর্থ মহান আল্লাহকে একমাত্র অনাদি সত্তা বা একামত্র স্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান হিসেবে বিশ্বাস করা। তাদের এ চিন্তা কুরআন ও হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক। কুরআনের অগণিত বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, আরবের ও অন্যান্য জাতির কাফিরগণ আল্লাহর অস্তিত্বের একত্বে বিশ্বাস করত এবং তাঁকেই একমাত্র স্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান প্রতিপালন হিসেবে বিশ্বাস করত। এতটুকুতেই যদি তাওহীদ পরিপূর্ণ হয়, তবে তো আর তাদেরকে কাফির বলার বা তাদের হেদায়াতের জন্য নবী-রাসূলগণের আগমনের প্রয়োজন থাকত না।
কুরআন ও হাদীসের অগণিত বিবরণের আলোকে আমরা বুঝতে পারি যে, তাওহীদ বা আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসের একাধিক পর্যায় বা স্তর রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ
"তাদের অধিকাংশ আল্লাহতে বিশ্বাস করে, কিন্তু তাঁর সাথে শরীক করে। "
এ আয়াত থেকে স্পষ্টতই জানা যায় যে, আল্লাহর প্রতি ঈমানের পর্যায় রয়েছে, যে কারণে ঈমানের সাথে সাথে শিরক্ একত্রিত হতে পারে। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবী ইবনু আব্বাস (রা) বলেন,
من إيمانهم إذا قيل لهم من خلق السماء ومن خلق الأرض ومن خلق الجبال قالوا الله وهم مشركون .... وهم مع ذلك يشركون به ويعبدون غيره ويسجدون للأنداد dونه
"তাদের ঈমান হলো, যদি তাদের বলা হয়, আকাশ কে সৃষ্টি করেছে? পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছে? পাহাড় কে সৃষ্টি করেছে? তারা বলে: আল্লাহ, অথচ তারা শিরক করে এরপরও তারা আল্লাহর সাথে শিরক করে, আল্লাহকে ছাড়া অন্যের ইবাদত করে, আল্লাহ ব্যতীরেকে অন্যদের সাজদা করে।”
প্রসিদ্ধ তাবিয়ী মুফাস্সির মুজাহিদ ইবনু জাবর (১০৪ হি) বলেন:
إيمانهم قولهم الله خالقنا ويرزقنا ويميتنا فهذا إيمان مع شرك عبادتهم غيره
"তাদের ঈমান হলো তারা বলে, (একমাত্র) আল্লাহই আমাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনিই আমাদের রিযক দেন এবং তিনিই আমাদের মৃত্যদেন। এ হলো তাদের ঈমান, এর সাথে তারা তাদের ইবাদতে গাইরুল্লাহর ইবাদত করে শিরক করে।”
অনুরূপভাবে সাঈদ ইবনু জুবাইর (৯৫হি), আমির ইবনু শারাহীল শা'বী (১০৪ হি), ইকরিমাহ মাওলা ইবনু আব্বাস (১০৫ হি), আতা ইবনু আবী রাবাহ (১১৫ হি), কাতাদাহ ইবনু দি'আমাহ (১১৭ হি), আব্দুর রাহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম (১৭০ হি) ও অন্যান্য তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ী মুফাস্সির বারংবার উল্লেখ করেছেন যে, সকল কাফিরই আল্লাহকে একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, রিষ্কদাতা ও সর্বশক্তিমান বলে বিশ্বাস করতো, কিন্তু তারা ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করতো।
এ ভাবে আমরা দেখছি যে, তাওহীদের অন্তত দুটি পর্যায় রয়েছে এবং কাফিরগণ একটি বিশ্বাস করতো এবং একটি অস্বীকার করত। কুরআন কারীমের এজাতীয় অগণিত নির্দেশনা ও সাহাবী-তাবিয়গণের এ সকল তাফসীরের আলোকে পরবর্তী যুগের আলিমগণ 'তাওহীদ'-কে দুভাগে ভাগ করেছেন। কেউ কেউ দুটি পর্যায়কে আরো বিস্তারিতভাবে তিনটি বা চারটি পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন।
হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ইমাম আল্লামা সাদরুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনু আলাউদ্দীন আলী ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবিল ইয্য দিমাশকী (৭৩১-৭৯২ হি) তাঁর রচিত 'শরাহুল আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ' পুস্তকে তাওহীদকে প্রথমত দু পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন: (১) তাওহীদুল ইসবাত ওয়াল মারিফাহ (توحيد الإثبات والمعرفة) বা জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদ এবং (২) তাওহীদুত তালাবি ওয়াল কাসদি (توحيد الطلب والقصد) বা কর্ম পর্যায়ের তাওহীদ। অন্যত্র তিনি উক্ত প্রথম পর্যায়ের তাওহীদকে দুটি পর্যায়ে বিভক্ত করে তাওহীদকে তিন পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন: (১) তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত, (২) তাওহীদুর রুবুবিয়‍্যাত ও (৩) তাওহীদুল ইলাহিয়্যাহ।
প্রসিদ্ধ আলিম ও সংস্কারক শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (১১৭৬হি) প্রথম পর্যায়ের তাওহীদকে তিন পর্যায়ে বিভক্ত করেন এবং এভাবে তিনি তাওহীদকে চার পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন: (১) আল্লাহকে একমাত্র অনাদি অনন্ত সত্তা বলে বিশ্বাস করা (২) আল্লাহকে মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বাস করা (৩) আল্লাহকে মহাবিশ্বের একমাত্র পরিচালক হিসেবে বিশ্বাস করা। (৪) আল্লাহকে একমাত্র মা'বুদ বা উপাস্য হিসেবে বিশ্বাস করা।
এভাবে আমরা দেখছি যে, তাওহীদের মূলত দুটি পর্যায় রয়েছে এবং প্রথম পর্যায়টির একাধিক পর্যায় রয়েছে। এখানে আমরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে তাওহীদের প্রকারভেদ ব্যাখ্যা করব।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা 📄 উভয় পর্যায়ের তাওহীদ অবিচ্ছেদ্য

📄 উভয় পর্যায়ের তাওহীদ অবিচ্ছেদ্য


তাওহীদের এ দুটি পর্যায় একে অপরের সম্পূরক ও পরস্পরে অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িত। এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়কে পৃথক করা যায় না বা একটিকে ছেড়ে অন্যটির উপর ঈমান এনে মুসলিম হওয়া যায় না। তবে এখানে প্রথমোক্ত তাওহীদ অর্থাৎ ‘শাহাদাতাইন (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)’ বলে শেষ পর্যায় বা ‘তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ’-এর ঘোষণা দেওয়া হয় নি। কালিমায়ে তাওহীদ “লা খালিক ইল্লাল্লাহ: আল্লাহ ছাড়া কোনো স্রষ্টা নেই”, “লা রাযিকা ইল্লাল্লাহ: আল্লাহ ছাড়া কোনো রিযিকদাতা নেই”, “লা মালিক ইল্লাল্লাহ: আল্লাহ ছাড়া কোনো মালিক নেই”, “লা রাব্বা ইল্লাল্লাহ: আল্লাহ ছাড়া কোনো রব বা প্রতিপালক নেই”, বা অনুরূপ বাক্য বলা হয় নি। বরং ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ বা মাবুদ নেই’ বলে সাক্ষ্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর দ্বিবিধ কারণ রয়েছে: (১) তাওহীদুল ইবাদাত তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ’র ফসল (২) কাফিরদের বিরোধিতা ও অস্বীকৃতি।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা 📄 তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহর দাবি তাওহীদুল ইবাদাত

📄 তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহর দাবি তাওহীদুল ইবাদাত


প্রথম কারণ হলো দ্বিতীয় পর্যায়ের তাওহীদ, অর্থাৎ ইবাদতের তাওহীদ (তাওহীদুল উলুহিয়া) প্রথম পর্যায়ের তাওহীদ বা জ্ঞানের তাওহীদের ফসল ও ফলাফাল। যেহেতু আল্লাহ একামাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, রিযিকদাতা ও সর্বশক্তিমান কাজেই একমাত্র তাঁরই ইবাদত উপাসনা করা দরকার। যেহেতু সকল ক্ষমতা তাঁর সেইহেতু তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে উপাসনা করা নিতান্তই অর্থহীন ও জঘন্য অন্যায়। এজন্য পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একত্বের (তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ) কথা আহ্বান জানিয়েছেন।

বস্তুত, ‘ইলাহ’ (উপাস্য) এবং ‘রাব্ব’ (প্রতিপালক)-এর মধ্যে অর্থগত পার্থক্য সহজেই অনুমেয়। তাওহীদ পন্থী মুমিন আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে কারো ‘ইলাহ’ বলতে পারেন না; কারণ মহান আল্লাহ্ ছাড়া কেউ কোনোভাবে কোনো মুমিনের ‘ইলাহ’ বা উপাস্য হতে পারে না। পক্ষান্তরে মুমিন আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে কারো পালনকর্তা বা মালিক হিসেবে ‘রাব্ব’ বলতে পারেন। প্রসিদ্ধ দাঊদ ইসমাঈল ইবনু হাম্মাদ জাহিরী (ওহী) বলেন:

رَبٌّ كُلُّ شَيْءٍ مَالِكُهُ، وَالرَّبُ: اِسْمٌ مِنْ أَسْمَاءِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَلَا يُقَالُ فِي غَيْرِهِ إِلَّا بِالإِضَافَةِ “রাব্ব অর্থ মালিক বা স্বত্বাধিকারী, যে কোনো কিছুর রাব্ব অর্থ তাঁর মালিক বা স্বত্বাধিকারী। ‘আর-রাব্ব’ মহান আল্লাহর একটি নাম। মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে এ নামটি ব্যবহার করা যায় শুধু সম্পর্কের সাথে (অমুকের রাব্ব)। ইঊসুফ (আ)-এর কারাবাসের ঘটনায় আল্লাহ বলেন:

وَقَالَ لِلَّذِي ظَنَّ أَنَّهُ نَاجٍ مِنْهُمَا اذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ فَأَنْسَاهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ "উভয়ের মধ্যে যে মুক্তি পাবে বলে ইউসুফ ধারণা করেছিল তাকে সে বলল, তোমার রবের (হুযুর) নিকট আমার কথা বলো; কিন্তু শয়তান তাকে তার রবের (হুযুর) নিকট তাঁর বিষয় বলার কথা ভুলিয়ে দেয়।"১৫১ এখানে রাব্বুকা ও রাব্বুহ বলতে বাদশাহকে বুঝানো হয়েছে।

আরবের কাফিরগণ এবং অন্যান্য কাফির-মুশরিকগণ মহান আল্লাহকে মহাবিশ্বের একমাত্র প্রতিপালক ও সর্বভৌম মানত, অথচ তাঁকে একমাত্র ‘ইলাহ’ হিসেবে মানত না। বিষয়টি ছিল একান্তে অযৌক্তিক ও হাস্যকর। কারণ যিনি একমাত্র প্রতিপালক তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কারো নিকট ‘ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভয় ও আশা-সহায়তা’ প্রকাশ করতে যাব কেন?

এভাবে আমরা বুঝতে পারি যে, ইলাহ এবং রাব্ব-এর মধ্যে অর্থগত পার্থক্য থাকলেও, ব্যবহার দু’টি শব্দ একই সত্তার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়া উচিৎ। যিনিই রাব্ব তিনিই ইলাহ হবেন। আর যিনি রাব্ব নন তাঁর ইলাহ হওয়ার যোগ্যতা থাকতে পারে না। এজন্য অনেক সময় ইলাহ অর্থে রাব্ব ও রাব্ব অর্থে ইলাহ ব্যবহার করা হয়।

এ কারণে কুরআনে কারীমে বারবার কাফিরদের কর্ম ও বিশ্বাসের এ অযৌক্তিকতা তুলে ধরে বারংবার মহান আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁকে বারবার রাব্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, যেহেতু তিনিই একমাত্র রাব্ব বলে তোমরাও স্বীকার করছ, তবে কেন তাঁকে ছাড়া অন্যর ইবাদত করছ?

আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি যে, আল্লাহ তা‘আলা কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে রাসূলুল্লাহ -কে নির্দেশ দিয়েছেন ‘তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ’ সম্পর্কে কাফিরদেরকে প্রশ্ন করতে। এ সকল প্রশ্নের উদ্দেশ্য জ্ঞানের তাওহীদ থেকে কর্মের তাওহীদের দাওয়াত দেওয়া। যেহেতু তোমরাই স্বীকার করছ যে, আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক ও সর্বশক্তিমান, সেহেতু তাঁকে ছাড়া অন্য কারও উপাসনা, প্রার্থনা করা, সাহায্য চাওয়া, জবাই, মানত বা উৎসর্গ করা সুস্পষ্ঠ বিজাতিয় ছাড়া কিছুই নয়। এভাবে কাফিরদেরকে

তাদের শিকের অসারতা সুস্পষ্টভাবে বুঝানো হয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের কর্মের অসারতা স্বীকার করে নিয়েছে। এ ছাড়াও কুরআন করীমে বিভিন্ন স্থানে আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একত্বের কথা উল্লেখ করে একমাত্র তারই ইবাদত করার নির্দেশ দেওয় হয়েছে। এখানে দুটি উদাহরণ উল্লেখ করছি। আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ. "হে মানব জাতি, তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। যিনি পুথিবীকে তোমাদের জন্য বিছানা এবং আকাশকে ছাদ করে দিয়েছেন এবং আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তা দিয়ে তোমাদের জীবিকা হিসাবে বিভিন্ন প্রকারের ফল ফসল উৎপাদন করেছেন। অতএব তোমরা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বানাবে না।"১৫২

অন্যত্র বলা হয়েছে: وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ اللَّهُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ اللَّيْلَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَالنَّهَارَ مُبْصِرًا إِنَّ اللَّهَ لَذُو فَضْلٍ عَلَى النَّاسِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ. ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ خَالِقَ كُلِّ شَيْءٍ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُؤْفَكُونَ. كَذَلِكَ يُؤْفَكُ الَّذِينَ كَانُوا بِآيَاتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ اللَّهُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ قَرَارًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَصَوَّرَكُمْ فَأَحْسَنَ صُوَرَكُمْ وَرَزَقَكُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَتَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ. هُوَ الْحَيُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ . قُلْ إِنِّي نُهِيتُ أَنْ أَعْبُدَ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَمَّا جَاءَنِيَ الْبَيِّنَاتُ مِنْ رَبِّي وَأُمِرْتُ أَنْ أُسْلِمَ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ. "তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। যারা অহঙ্কারে আমার ইবাদতে বিমুখ হয় তারা অবশ্যই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আল্লাহই তোমাদের বিশ্রামের জন্য রাত সৃষ্টি করেছেন এবং দিনকে আলোকজ্জ্বল করেছেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষদের প্রতি অনুগ্রহশীল, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক, সব কিছুর স্রষ্টা, তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ (মাবুদ বা উপাস্য) নেই। তাহলে তোমরা কিভাবে বিপথে যাচ্ছ? এইভাবেই বিপথগামী হয় তারা যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে অস্বীকার করে। আল্লাহই তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বসোপযোগী করেছেন এবং আকাশকে করেছেন ছাদ। তিনি তোমাদের আকৃতি গঠন করেছেন এবং তোমাদেরকে উত্তম আকৃতি দান করেছেন এবং তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন উৎকৃষ্ট রিযক। এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ, কত মহান তিনি! তিনি চিরজ্ঞীর, তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ বা উপাস্য নেই, সুতরাং তোমরা তারই আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে তাকেই ডাক। জগৎসমুহের প্রতিপালক আল্লাহর নিমিত্ত সকল প্রশংসা। বল, আমার প্রতিপালকের নিকট থেকে আমার কাছে সুষ্পষ্ট নির্দশন আসার পর আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে তোমর ডাক তাদের ইবাদত করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে এবং আমাকে জগৎসমূহের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দেওয়া হয়েছে।"১৫৩

আমরা দেখেছি যে, 'ডাকা' বা প্রার্থনা করাই ইবাদতের মূল। এখানে মহান আল্লাহ প্রথমে আল্লাহকে ডাকতে বা তাঁর কাছেই প্রার্থনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর 'অহঙ্কারবশত' যারা আল্লাহর ইবাদত করে না, অর্থাৎ আল্লাকে ছেড়ে অন্য কাউকে ডাকে তাদের পরিণতি উল্লেখ করেছেন। এরপর আল্লাহর রূবুবিয়‍্যাতের তাওহীদের বিভিন্ন দিক উল্লেখ করে তাদেরকে ইবাদতের তাওহীদের দিকে আহবান করেছেন।

এভাবে আমরা দেখছি যে, কর্ম পর্যায়ের বা ইবাদতের তাওহীদ জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদের স্বাভাবিক প্রকাশ ও ফলাফল। যিনি একমাত্র স্রষ্টা ও প্রতিপালক একমাত্র তাঁরই ইবাদত উপাসনা করা উচিৎ। আর তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে যদি উপাসনা করা হয় তাহলে তাঁকে একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, সব কিছুর মালিক বা সর্বশক্তিমান বলে বিশ্বাস করা অর্থহীন হয়ে যায়। এজন্যই ইসলামী বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কর্ম পর্যায়ের বা ইবাদতের তাওহীদের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:

إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ "যারা বলে, 'আমাদের রাব্ব (প্রতিপালক) তো আল্লাহ' এবং এতে অবিচলিত থাকে তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।"১৫৪

কাফিরগণ স্বীকার ও বিশ্বাস করত এবং বলত যে 'রাব্বুনাল্লাহ' বা 'আমাদের রব্ব তো আল্লাহ'। তারা মহান আল্লাহকে 'আল্লাহ' ও 'আল্লাহুম্মা' এবং 'রাব্বানা' বা 'রাব্বী' বলেই ডাকত। তবে তাদের এ ডাক ও বিশ্বাস ছিল অর্থহীন। কারণ আল্লাহকে রাব্ব হিসেবে বিশ্বাস করার পর আবার অন্য কারো ইবাদত করার অর্থ 'রাব্বুনাল্লাহ' বিশ্বাসে অবিচলিত না থেকে তা থেকে বিচ্যুত হওয়া। কাফিরদের এ বিচ্যুতির দিকে বারংবার ইঙ্গিত করে কুরআন কারীমে সর্বদা আল্লাহর রুবুবিয়‍্যাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px