📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 মুরজিয়্যাহ

📄 মুরজিয়্যাহ


মুরজিয়্যাহ )المرجئة( আরবী 'আরজাআ' )أرجاً( ফিল থেকে গৃহীত 'ইসমু ফাইল'। মূল শব্দ বা ধাতুমূল রা, জীম ও হামযা: 'রাজাআ )رجاً(। আরজাআ )أرجاً( অর্থ বিলম্বিত করা, পিছিয়ে দেওয়া, স্থগিত রাখা (To postpone, adjourn, defer, put off) ইত্যাদি। মুরজিউন )مرجئ( অর্থ বিলম্বিতকারী বা স্থগিতকারী। বহুবচন বা ফিরকা অথে মুরজিয়‍্যাহ বলা হয়, অর্থাৎ বিলম্বিতকারীগণ বা স্থগিতকারীগণ। আমরা দেখেছি যে, খারিজীগণ পাপী মুসলিমকে কাফির এবং অনন্তকাল জাহান্নামী বলে বিশ্বাস করে। তাদের মতে ইসলামের বিধান পালন ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কর্মের ঘাটতি মানেই ঈমানের ঘাটতি। আর ঈমানের ঘাটতি অর্থই কুফ্র। এর বিপরীতে আরেক দলের উদ্ভব হয়। তারা বলে, ঈমানের সাথে আমলের কোনো সম্পর্ক নেই। ঈমান বা বিশ্বাস থেকে আমল বা কর্ম সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও পৃথক। ঈমানের জন্য শুধু অন্তরের ভক্তি বা বিশ্বাসই যথেষ্ট। ইসলামের কোনো বিধিবিধান পালন না করেও একব্যক্তি ঈমানের পূর্ণতার শিখরে আরোহণ করতে পারে। আর এরূপ ঈমানদার ব্যক্তির কবীরা গোনাহ তার কোনো ক্ষতি করে না। যত গোনাহই করুক না কেন সে জান্নাতী হবে। এদের মূলনীতি হলো, لا يضر مع الإيمان معصية كما أنه لا ينفع مع الكفر طاعة "ঈমান থাকলে কোনো পাপই কোনো ক্ষতি করে না, যেমন কুফ্র থাকলে কোনো পুন্যই কাজে লাগে না।" দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রথম থেকেই এ মতটি বিশেষ প্রসার লাভ করে। এদেরকে মুরজিয়া কেন বলা হলো সে বিষয়ে দুটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ইবনুল আসীর বলেন, এরা যেহেতু বিশ্বাস করে যে, কবীরা গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকে আল্লাহ শাস্তি দিবেন না বা তার শাস্তি স্থগিত রাখবেন সেহেতু তাদেরকে মুরজিয়‍্যাহ বলা হয়। আর আব্দুল কাহির বাগদাদী বলেন, এরা যেহেতু আমল বা কর্মকে ঈমান থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে বা স্থগিত করেছে এজন্য এদেরকে মুরজিয়া বলা হয়। ১০৪৮ খারিজীগণ যেরূপ কুরআন ও হাদীসে কিছু বক্তব্য নিজেদের মতের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে এর বিপরীতে অন্য বক্তব্যগুলি ব্যাখ্যা করেছে, বা বাতিল করেছে, অনুরূপভাবে মুরজিয়াগণও তাদের বিপরীতে কুরআন ও হাদীসের ক্ষমা বিষয়ক ও তাওহীদের ফযীলত বিষয়ক বক্তব্যগুলিকে মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে বাকি আয়াত ও হাদীসগুলি ব্যাখ্যার মাধ্যমে বাতিল করেছে। সমন্বয় বা উভয় প্রকার শিক্ষা গ্রহণ করতে তারা সচেষ্ট হয় নি। এখানে লক্ষণীয় যে, খারিজী, মুতাযিলী এবং তাদের সংগে একমত বিভিন্ন ফিরকা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতকেও মুরজিয়াহ বলে আখ্যায়িত করে। কারণ এ সকল ফিরকা কবীরা গোনাহে লিপ্ত মুসলিমের বিধান তাৎক্ষণিক বলে দেয় যে, সে অনন্ত কাল জাহান্নামে বাস করবে। আর আহলুস সুন্নাত কবীরা গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকে অনন্ত জাহান্নামবাসী না বলে তার বিষয়টি আল্লাহর হাতে বলে বিশ্বাস করেন এবং আল্লাহ তাকে ইচ্ছা করলে শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করতে পারেন বলে বিশ্বাস করেন। এভাবে তাঁরা পাপী মুসলিমের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি পিছিয়ে দেন।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 কাদারিয়্যাহ

📄 কাদারিয়্যাহ


কাদারিয়‍্যাহ (القدرية) শব্দটি 'কাদার' (القدر) শব্দ থেকে গৃহীত। 'কাদার' অর্থ নির্ধারণ। ইসলামের পরিভাষায় 'কাদার' অর্থ আল্লাহর নির্ধারণ, পূর্ব নির্ধারণ বা তাকদীর। 'কাদারী' অর্থ তাকদীরের সাথে সম্পর্কিত। দল বা ফিরকা অর্থে 'কাদারিয়‍্যাহ' বলা হয়। অর্থাৎ তাকদীরের সাথে সম্পর্কিত দল বা তাকদীরের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিগণ। যারা আল্লাহর পূর্ব নির্ধারণ বা তাকদীর অস্বীকার করেন তাদেরকে 'কাদারিয়‍্যাহ' বলা হয়। প্রথম হিজরী শতকের শেষভাগ থেকে এ মতের উদ্ভব হয়। দ্বিতীয় শতাব্দীতে তা প্রসার লাভ করে। আমরা দেখেছি যে, তাকদীরে বিশ্বাসের অর্থ আল্লাহর অনাদি-অনন্ত সর্বব্যাপী ইলম বা জ্ঞানে বিশ্বাস। অর্থাৎ এ কথা বিশ্বাস করা যে, অনাদি কাল থেকে মহান আল্লাহ বিশ্বের কে, কখন, কোথায়, কিভাবে কি করবে, কি ঘটবে সবই জানেন। তাকদীরে অবিশ্বাস করলে আল্লাহর জ্ঞানেও অবিশ্বাস করতে হয়। এজন্য কাদারিয়‍্যাহ সম্প্রদায় বিশ্বাস করে যে, মহান আল্লাহ পূর্ব থেকে কিছু জানেন না, বরং যখন যা ঘটে তখন তিনি তা জানেন। উল্লেখ্য যে, মুতাযিলাগণ কাদারিয়‍্যাহ ফিরকার সকল মূলনীতি গ্রহণ করে। এজন্য অনেকেই মু'তাযিলা ও কাদারিয়‍্যাহ এক ফিরকা বলেই গণ্য করেছেন। পরে আমরা মু'তাযিলাদের বিষয়ে আলোচনা করব, ইনশা আল্লাহ।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 জাবারিয়াহ

📄 জাবারিয়াহ


জাবার (الجبر) শব্দের অর্থ 'জবরদস্তি', বাধ্য করা, ক্ষমতা প্রয়োগ ইত্যাদি। জাবারিয়‍্যাহ সম্প্রদায় কাদারিয়‍্যাহ সম্প্রদায়ের বিপরীত বিশ্বাস পোষণ করে। এরা বিশ্বাস করে যে, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বা কর্মশক্তি বলে কিছুই নেই। মানুষ যা করে তা করতে সে বাধ্য। মানুষ চাবি দেওয়া কলের পুতুলের মতই। কাদারিয়‍্যাহগণ বিশ্বাস করে যে, ভাগ্য বলে কিছুই নেই, কর্মই সব। আর জাবারিয়‍্যাহগণ বিশ্বাস করে যে, কর্ম বলে কিছু নেই ভাগ্যই সব। আমরা দেখেছি যে, আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের সকল শিক্ষা সমানভাবে গ্রহণ করেছেন। তাঁরা বলেন, ভাগ্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে কর্ম। আল্লাহ যেহেতু দুটি বিষয়ই উল্লেখ করেছেন সেহেতু দুটি বিষয়ই সত্য। এদুটির সমন্বয়ে আশা ও ভয়ের মধ্যে ঈমান। জাহমিয়‍্যাহ সম্প্রদায়ের গুরু জাহমই জাবারিয়‍্যা আকীদার প্রথম প্রবক্ত বলে গণ্য।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 জাহমিয়্যাহ

📄 জাহমিয়্যাহ


জাহমিয়‍্যাহ অর্থ 'জাহমের সাথে সম্পর্কিত। জাহম ইবনু সাফওয়ান (মৃত্যু ১২৮ হি.) পারস্যের অধিবাসী ছিলেন। এ ব্যক্তি ইসলামী বিশ্বাসের মধ্যে গ্রীক দর্শন, পারসিক ধর্ম ইত্যাদির মধ্য থেকে অনেক কিছু ঢুকিয়ে দেয়। সে একদিকে 'জাবারিয়া' মতে প্রচারক ও প্রবর্তক ছিল। সে প্রচার করত যে, মানুষের কোনোরূপ ক্ষমতা নেই। চাঁদ, সূর্য ইত্যাদি যেমন ইচ্ছাহীনভাবে আবর্তন করে, মানুষও তেমনি ইচ্ছাহীন ক্ষমতাহীনভাবে কলের পুতুলের মত চলমান। পাশাপাশি সে মুরজিয়া মতের প্রচারক ছিল। সে বলত যে, হৃদয়ের জ্ঞান বা মারিফাতই ঈমান এবং অজ্ঞতাই কুফ্র। সে আরো প্রচার করত যে, জান্নাত ও জাহান্নাম এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এছাড়া সে আল্লাহর বিশেষণগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্বীকার বা ব্যাখ্যা করত। সে বলত, যে বিশেষণে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বিশেষিত করা যায় সে বিশেষণ আমি আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে রাযি নই। কাজেই আল্লাহকে বিদ্যমান, জ্ঞানী, ইচ্ছাকারী ইত্যাদি কিছুই বলা যাবে না। তবে যে বিশেষণগুলি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, সেগুলি তাঁর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে, যেমন স্রষ্টা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা... ইত্যাদি। সে আল্লাহর কালাম বা কথার অনাদিত্ব অস্বীকার করত। সে দাবি করত যে, আল্লাহর কালাম আল্লাহর সৃষ্টি। কাজেই কখনোই বলা যাবে না যে আল্লাহ বলেছেন বা কথা বলেছেন, বরং বলতে হবে যে, আল্লাহ কথা সৃষ্টি করেছেন। এরূপ সকল প্রকারের বিভ্রান্তি সে একত্রিত করে। সে এত বেশি সুস্পষ্টভাবে যুক্তির নামে কুরআনের আয়াতসমূহ অস্বীকার করত যে, তেমন কোনো ব্যাখ্যারও ধার ধারত না। এজন্য ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) ও অন্যান্য অনেক ইমাম জাহম ও তার অনুসারীদেরকে সুস্পষ্টরূপে কাফির বলে গণ্য করেছেন। তাঁরা জাহমিয়াদেরকে 'মুসলিম ফিরকা' বলে গণ্য না করে 'অমুসলিম' বলে গণ্য করেছেন। ১০০২ পরবর্তীকালে আল্লাহর বিশেষণকে বিকৃত করা বা ব্যাখ্যা করার প্রবণতাকে সাধারণভাবে 'জাহমিয়্যা' মতবাদ বলে গণ্য করা হয়।১০০৩ উল্লেখ্য যে, মু'তাযিলা সম্প্রদায় আল্লাহর সিফাত বা বিশেষণ বিষয়ে জাহমী মতবাদের অনুসারী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00