📄 রাষ্ট্র ও নাগরিক বিষয়ক মুলনীতি
ইসলামের প্রথম দুটি ফিরকা: শীয়া ও খারিজী ফিরকার উদ্ভব ও উন্মেষ ঘটেছিল রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে। রাজনৈতিক বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিভক্তি ঘটে। বিশেষত খারিজীগণ এ বিষয়ে দুটি আকীদার উদ্ভাবন করে: (১) পাপী ব্যক্তির ইমামতের অবৈধতা এবং (২) পাপী ইমামের অপসারণের আবশ্যকতা। তাদের দাবি ছিল যে, পাপী ব্যক্তি কাফির, আর কাফির ব্যক্তি সালাতের বা রাষ্ট্রের ইমামতি করতে পারে না। বরং মুমিনের জন্য ফরয যে, এরূপ ইমামের বিরুদ্ধে সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের অংশ হিসেবে বিদ্রোহ করবে এবং জিহাদ করে একে অপসারণ করবে। এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের সকল নির্দেশনা গ্রহণ করার মূলনীতির আলোকে সাহাবীগণ ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতে আলিমগণ মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তাঁদের মতে অন্যান্য মুমিনের ন্যায় পাপী শাসকের ক্ষেত্রেও পাপের কারণে তাকে কাফির বলা যায় না, যতক্ষণ না সুনিশ্চিত কুফরী বা শিরকে সে নিপতিত হয়। পাপী শাসক-প্রশাসকের পাপ যেমন সমর্থন করা যাবে না, তেমানি তার পাপের কারণে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা নষ্ট বা বিদ্রোহ করা যাবে না। মধ্যপন্থা অবলম্বন করে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও শান্তি বজায় রাখতে হবে। ইবনু আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন: مَنْ رَأَى مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا يَكْرَهُهُ فَلْيَصْبِرْ عَلَيْهِ فَإِنَّهُ مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ وفي لفظ : خَرَجَ مِنَ السُّلْطَانِ شَبْرًا فَمَاتَ إِلَّا مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً "কেউ তার শাসক বা প্রশাসক থেকে কোন অপছন্দনীয় বিষয় দেখলে তাকে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। কারণ যদি কেউ জামা'আতের (সমাজ বা রাষ্টের ঐক্যের বা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সিদ্ধান্তের) বাইরে, দ্বিতীয় বর্ণনায়: রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের বাইরে এক বিঘতও বের হয়ে যায় এবং এই অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে, তাহলে সে জাহিলী মৃত্যু বরণ করল। "১০১১ উম্মু সালামা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, إِنَّهُ يُسْتَعْمَلُ عَلَيْكُمْ أَمَرَاءُ فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ فَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ بَرِئَ وَمَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَا نُقَاتِلُهُمْ قَالَ لَا مَا صَلَّوْا "অচিরেই তোমাদের উপর অনেক শাসক প্রশাসক আসবে যারা ন্যায় ও অন্যায় উভয় প্রকারের কাজ করবে। যে ব্যক্তি তাদের অন্যায়কে ঘৃণা করবে সে অন্যায়ের অপরাধ থেকে মুক্ত হবে। আর যে ব্যক্তি আপত্তি করবে সে (আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে) নিরাপত্তা পাবে। কিন্তু যে এ সকল অন্যায় কাজ মেনে নেবে বা তাদের অনুসরণ করবে (সে বাঁচতে পারবে না।)" সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? তিনি বলেন, "না, যতক্ষণ তারা সালাত আদায় করবে।"১০১২ আউফ ইবনু মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, ألا مَنْ وَلِيَ عَلَيْهِ وَال فَرَآهُ يَأْتِي شَيْئًا مِنْ مَعْصِيَةِ اللهِ فَلْيَكْرَهُ مَا يَأْتِي مِنْ مَعْصِيَةِ اللهِ وَلَا يَنْزِعَنَّ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ "তোমরা হুশিয়ার থাকবে! তোমাদের কারো উপরে যদি কোনো শাসক-প্রশাসক নিযুক্ত হয় এবং সে দেখতে পায় যে, উক্ত শাসক বা প্রশাসক আল্লাহর অবাধ্যতার কোনো কাজে লিপ্ত হচ্ছে, তবে সে যেন আল্লাহর অবাধ্যতার উক্ত কর্মকে ঘৃণা করে, কিন্তু আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নেবে না।"১০১৩ ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেন: والصلاة خلف كل بر وفاجر من المؤمنين حائزة. "এবং সকল নেককার ও বদকার মুমিনের পিছনে সালাত আদায় বৈধ। "১০১৪ ইমাম তাহাবী (রাহ) বলেন: ونرى الصلاة خلف كل بر وفاجر من أهل القبلة ... ولا نري الخروج على أئمتنا وولاة أمورنا وإن جاروا، ولا ندعو عليهم ولا ننزع يدا من طاعتهم. ونرى طاعتهم من طاعة الله عز وجل فريضة ما لم يأمروا بمعصية. وندعو لهم بالصلاح والمعافاة ... ونحب أهل العدل والأمانة، ونبغض أهل الجور والخيانة. والحج والجهاد ما ضيان مع أولي الأمر من المسلمين برهم وفاجرهم، إلى قيام الساعة، لا يبطلهما شيء ولا ينقضهما. "আমরা কিবলাপন্থী প্রত্যেক নেককার ও বদকার মুসলিমের পিছনে সালাত কায়েম করা... বৈধ মনে করি।... আমাদের ইমাম বা শাসকবর্গ অত্যাচার করলেও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বৈধ মনে করি না। আমরা তাদেরকে অভিশাপ প্রদান করি না এবং তাদের আনুগত্যও বর্জন করি না। আমরা তাদের প্রতি আনুগত্যকে আল্লাহরই আনুগত্যের অংশ হিসেবে ফরয মনে করি যতক্ষণ না তারা কোনো পাপ কর্মের নির্দেশ দেয়। আর তাদের সংশোধন ও সংরক্ষণের জন্য দু'আ করি। আমরা ন্যায়বিচারক ও দায়িত্ববান-আমানত আদায়কারী শাসকদের ভালবাসি এবং জালিম, দুর্নীতিবাজ বা দায়িত্বে খিয়ানতকারীদের ঘৃণা করি। মুসলিম শাসকের অধীনে- সে নেককার হোক আর পাপী-বদকার হোক- হজ্জ্ব এবং জিহাদ কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কোনো কিছুই এ দুটিকে বাতিল বা ব্যাহত করতে পারে না।"১০১৫
📄 ঐক্য ও বিভক্তি বিষয়ক মুলনীতি
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অন্যতম মূলনীতি 'ঐক্য ও সংহতি'। বিভ্রান্ত দলগুলির সাথে এ বিষয়ে তাদের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, আকীদার উৎস এক হওয়ার কারণে আহলুস সুন্নাতের আলিমগণের আভ্যন্তরীন মতভেদ সীমিত এবং ব্যাখ্যা বা পরিভাষাগত মতভেদ তারা সহজে গ্রহণ করেন এবং এজন্য একে অপরকে বিভ্রান্ত বলে গণ্য করেন না। পক্ষান্তরে বিভ্রান্ত দলগুলির আকীদার উৎস অনেক হওয়াতে তাদের মধ্যকার বিভক্তিও খুবই বেশি। মানবীয় বুদ্ধি, আকল, যুক্তি ইত্যাদির মতপার্থক্যই স্বাভাবিক। এছাড়া রাসূলুল্লাহ-এর পরে কাউকে 'মা'সূম' 'অভ্রান্ত' বা কারো মতকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করলেও এরূপ অভ্রান্তদের একজনের মতের সাথে অন্যজনের মতের মিল হয় না। আর এ সকল বিষয় যেহেতু তাদের মতে আকীদার মূল সেহেতু তারা একে অপরকে কাফির বা বিভ্রান্ত বলে ঘোষণা করে। দ্বিতীয়ত, আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামগণ সকল মুমিনকে যথাসম্ভব মুমিন বলে গণ্য করতে চেষ্টা করেন। এমনকি সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে লিপ্ত ফিরকাগুলিকেও তাঁরা কাফির বলে গণ্য না করে বিভ্রান্ত মুমিন বলে গণ্য করতে চেষ্টা করেন। পক্ষান্তরে বিভ্রান্ত সম্প্রদায়গুলি একমাত্র নিজেদেরকে ছাড়া অন্য সকলকেই ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেন। এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাতের মূলনীতি হলো, যে ব্যক্তি কুরআন বা হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কথা বলেছে বা বিশ্বাস পোষণ করেছে তার কথার ওযর খোঁজার চেষ্টা করা। আর আহলুল বিদ'আতের মূলনীতি হলো তাদের মতের বিরোধী ব্যক্তি যা বলেছে তা সরাসরি কুরআন ও হাদীসের বিরোধী না হলেও তার মধ্যে বিরোধিতা সন্ধান করা বা ব্যাখ্যার মাধ্যমে তার বক্তব্যকে আকীদা বিরোধী বলে প্রমাণ করা এবং এরূপ ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তাকে কাফির বা বিভ্রান্ত বলা। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত বিশ্বাস করেন যে, আখিরাতে মুমিনগণ আল্লাহর দর্শন লাভ করবেন, তবে এ দেখার অর্থ কোনো মাখলুকের দেখার মত নয়, সৃষ্টির সাথে সকল তুলনার উদ্ধে এ দর্শনের প্রকৃতি মহান আল্লাহই জানেন। এ কথাটি কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন সুস্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত এবং কোনো বক্তব্যেরই সরাসরি বিপরীত নয়। তবে মুতাযিলী ও সমমনা ফিরকাগুলি আহলুস সুন্নাতের এ আকীদাকে ব্যাখ্যার মাধ্যমে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বলে গণ্য করেছেন। তারা বলেন, আল্লাহ বলেছেন 'কোনো কিছুই তাঁর সাথে তুলনীয় নয়'। আহলুস সুন্নাতের আকীদা এ আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক, কারণ আল্লাহকে দেখা যাবে বলে বিশ্বাস করার অর্থই হলো মহান আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা। কাজেই কুরআন অস্বীকার করার কারণে 'আহলুস সুন্নাত' কাফির!! পক্ষান্তরে মুতাযিলীদের আকীদা সুস্পষ্টভাবেই কুরআন ও হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক। আহলুস সুন্নাতের ইমামগণ মু'তাযিলীদের এ আকীদার কঠিন প্রতিবাদ করলেও এজন্য তাদেরকে কাফির বলে গণ্য করেন নি; কারণ তারা সরাসরি আয়াত ও হাদীস অস্বীকার করে না, বরং ব্যাখ্যা করে। শীয়াগণ নবী-বংশের ভালবাসার নামে সাহাবীগণকে ঘৃণা করে এবং তাদেরকে মুরতাদ বলে গণ্য করে। তাদের এ বিশ্বাস কুরআনের অনেক আয়াত ও অগণিত হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক। তা সত্ত্বেও আহলুস সুন্নাতের আলিমগণ তাদের এ বিশ্বাসের যথাসাধ্য ওজর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। পক্ষান্তরে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অনুসারিগণ সাহাবীগণ ও নবী-বংশকে সমানভাবে ভালবাসেন। তাদের এ আকীদা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। তা সত্ত্বেও শীয়াগণ প্রায়শ তাদেরকে কাফির বলে ঘোষণা করেছেন এ যুক্তিতে যে তাঁরা নবী-বংশকে ভালবাসেন না। এ বিষয়ে ইমামগণের বিভিন্ন বক্তব্য আমরা উপরের অনুচ্ছেদগুলিতে ও তাকফীর অধ্যায়ে দেখেছি। ইমাম তাহাবী বলেন: وَتَرَى الْجَمَاعَةَ حَقًّا وَصَوَابًا، وَالْفُرْقَةَ زَيْعًا وَعَذَابًا "আমরা দলাদলিমুক্ত বা ঐক্যবদ্ধ থাকাকে সত্য ও সঠিক বলে মনে করি এবং বিভক্তি ও দলাদলিকে বিভ্রান্তি ও শাস্তি বলে মনে করি। "১০১৬ এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনু আবিল ইয্য বলেন: “মহান আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আহলু কিতাব বা ইহুদী-নাসারাদের সাথেও উত্তমভাবে ছাড়া বিতর্ক না করতে, শুধু তাদের মধ্যে যারা জুলুম করেছে তাদের সাথে ছাড়া। ১০১৭ তাহলে আহলু কিবলার সাথে বিতর্কের আদব কেমন হতে পারে? আহলু কিবলা তো অন্তত আহলু কিতাবের চেয়ে উত্তম। কাজেই তাদের মধ্যে যারা জুলুম করেছে তারা ছাড়া কারো সাথে উত্তম পন্থা ছাড়া বিতর্ক করা যাবে না। এরূপ কেউ ভুল করলে বলা যাবে না যে, সে কাফির। রাসূলুল্লাহ যা পরিত্যাগ করাকে কুফরী বলে বিধান প্রদান করেছেন তা সে পরিত্যাগ করেছে বলে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত করার পরে তার কুফরীর বিধান দেওয়া যায়। মহান আল্লাহ এ উম্মাতের ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করেছেন। "১০১৮