📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 আল্লাহর নাম ও বিশেষণ বিষয়ে মূলনীতি

📄 আল্লাহর নাম ও বিশেষণ বিষয়ে মূলনীতি


এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মূলনীতি এই যে, কুরআন ও সহীহ হাদীসে আল্লাহর নাম ও সিফাতের বিষয়ে যা কিছু বলা হয়েছে তা সরল ও স্বাভাবিক অর্থে বিশ্বাস করা, আল্লাহর কোনো নাম, কর্ম বা বিশেষণকে সৃষ্টির নাম, কর্ম বা বিশেষণের সাথে তুলনা করা পরিহার করা এবং সাথেসাথে আল্লাহর নাম, কর্ম বা বিশেষণের সরল ও স্বাভাবিক অর্থের বাইরে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করা বর্জন করা। যেমন কুরআন ও হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ কোনো সৃষ্টির সাথে তুলনীয় নন। আবার পাশাপাশি মহান আল্লাহর শ্রবণ, দর্শন, কথোপকথন, হস্ত, মুখমণ্ডল, আরশের উপর সমাসীন হওয়া, ক্রোধান্বিত হওয়া, সন্তুষ্ট হওয়া ইত্যাদি বিশেষণ ও কর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মুজাক্সিমা বা মুশাবিবহা ফিরকা আল্লাহর এ সকল বিশেষণ সৃষ্টির বিশেষণের মত বলে কল্পনা করেছে। পক্ষান্তরে মু'তাযিলী, জাহমী, কাদারী ও অন্যান্য বিভ্রান্ত ফিরকা মহান আল্লাহ সৃষ্টির সাথে তুলনীয় নন যুক্তিতে মহান আল্লাহর অন্যান্য সকল বিশেষণ ও কর্ম অস্বীকার করেছে। তারা বলে, মহান আল্লাহকে শ্রবণ, দর্শন, হস্ত, মুখমণ্ডল, আরশের উপর সমাসীন হওয়া, ক্রোধান্বিত হওয়া, কথা বলা ইত্যাদি বিশেষণ বা কর্মে বিশেষিত করার অর্থই হলো তাকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা। কারণ সৃষ্টি শ্রবণ করে, কথা বলে, সমাসীন হয়, সৃষ্টির হস্ত আছে, মুখমণ্ডল আছে....। কাজেই কখনোই বলা যাবে না যে, মহান আল্লাহ এ সকল বিশেষণের অধিকারী। বরং তিনি এ সকল বিশেষণ থেকে পবিত্র। কুরআন ও হাদীসে ব্যবহৃত এ সকল বিশেষণকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করতে হবে। যেমন তাঁর হস্ত অর্থ তাঁর ক্ষমতা বা করুণা, আরশের উপর সমাসীন হওয়ার অর্থ আধিপত্য লাভ করা। ক্রোধান্বিত হওয়ার অর্থ শাস্তি প্রদানের ইচ্ছা করা, ইত্যাদি। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এ বিষয়ে ওহীর নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পন করেন। তাঁরা সকল সিফাত বা বিশেষণ তার প্রকৃত অর্থে বিশ্বাস করেন এবং বিশেষণের ধরণ ও পূকৃতির বিষয় মহান আল্লাহর উপর ছেড়ে দেন। সাথে সাথে তাঁরা দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, তাঁর এ সকল সিফাত বা বিশেষণ কোনোভাবেই সৃষ্টির বিশেষণের মত নয়। এ বিষয়ে ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেন: لا يشبه شيئا من الأشياء من خلقه، ولا يشبهه شيء من خلقه لم يزل ولا يزال بأسمائه وصفاته الذاتية والفعلية. أما الذاتية فالحياة والقدرة والعلم والكلام والسمع والبصر والإرادة، وأما الفعلية فالتخليق والترزيق والإنشاء والإبداع والصنع وصفانه كلها بخلاف صفات وغير ذلك من صفات الفعل. لم يزل ولم يزال بصفاته وأسمائه لم يحدث له صفة ولا اسم. المخلوقين. يعلم لا تعلمنا، ويقدر لا كقدرتنا، ويري لا كرؤيتنا، ويتكلم لا ككلامنا، ويسمع لا كسمعنا .... وله يد ووجه ونفس كما ذكره الله تعالي في القرآن. فما ذكره الله تعالي في القرآن من ذكر الوجه واليد والنفس فهو له صفات بلا كيف. ولا يقال: إن يده قدرته أو نعمته؛ لأن فيه إبطال الصفة. وهو قول أهل القدر والاعتزال، ولكن يده صفته بلا كيف، وغضبه ورضاه صفتان من صفات الله تعالي بلا كيف. "তাঁর সৃষ্টির মধ্যে কোনো কিছুই তাঁর সাথে তুলনীয় নয়। তিনি তাঁর সৃষ্টির কোনো কিছুর মত নয়। তিনি অনাদি কাল থেকে অনন্ত কাল বিদ্যমান রয়েছেন তাঁর নামসমূহ এবং তাঁর যাতী (সত্ত্বার সাথে সংশ্লিষ্ট) ও ফি'লী (কর্মমূলক) সিফাতসমূহ-সহ। তাঁর যাতী বা সত্ত্বাগত সিফাতসমূহ: হায়াত (জীবন), কুদরাত (ক্ষমতা), ইলম (জ্ঞান), কালাম (কথা), সাম' (শ্রবণ), বাসার (দর্শন) ও ইরাদা (ইচ্ছা)। আর তাঁর ফি'লী বা কর্মবাচক সিফাতসমূহের মধ্যে রয়েছে: সৃষ্টি করা, রিস্ক প্রদান করা, নবসৃষ্টি করা, উদ্ভাবন করা, তৈরি করা এবং অন্যান্য কর্মমূলক সিফাত বা বিশেষণ। তিনি তাঁর গুণাবলি এবং নামসমূহ-সহ তিনি অনাদি-অনন্তরূপে বিদ্যমান। তাঁর নাম ও বিশেষণের মধ্যে কোনো নতুনত্ব বা পরিবর্তন ঘটে নি।... তাঁর সকল বিশেষণই মাখলুকদের বা সৃষ্টপ্রাণীদের বিশেষণের বিপরীত বা ব্যতিক্রম। তিনি জানেন, তবে তাঁর জানা আমাদের জানার মত নয়। তিনি ক্ষমতা রাখেন, তবে তাঁর ক্ষমতা আমাদের ক্ষমতার মত নয়। তিনি দেখেন, তবে তাঁর দেখা আমাদের দেখার মত নয়। তিনি কথা বলেন, তবে তাঁর কথা বলা আমাদের কথার মত নয়। তিনি শুনেন, তবে তাঁর শোনা আমাদের শোনার মত নয়। ... তাঁর ইয়াদ (হস্ত) আছে, ওয়াজহ (মুখমণ্ডল) আছে, নফস (সত্তা) আছে, কারণ আল্লাহ কুরআনে এগুলি উল্লেখ করেছেন। কুরআন কারীমে আল্লাহ যা কিছু উল্লেখ করেছেন, যেমন মুখমণ্ডল, হাত, নফস ইত্যাদি সবই তার বিশেষণ কোনোরূপ 'স্বরূপ', কিরূপ, প্রকৃতি বা কিভাবে তা নির্ণয় ব্যতিরেকে। এ কথা বলা যাবে না যে, তাঁর হাত অর্থ তাঁর ক্ষমতা অথবা তাঁর নিয়ামত। কারণ এরূপ ব্যাখ্যা করার অর্থ আল্লাহর সিফাত বা বিশেষণ বাতিল করে দেওয়া। এরূপ ব্যাখ্যা করা কাদারীয়া ও মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের মানুষদের রীতি। বরং তাঁর হাত তাঁর বিশেষণ (সিফাত), কোনো স্বরূপ নির্ণয় ব্যতিরেকে। তাঁর ক্রোধ এবং তাঁর সন্তুষ্টি তাঁর দুটি বিশেষণ (সিফাত), আল্লাহর অন্যান্য বিশেষণের মতই, কোনোরূপ কিরূপ, কিভাবে বা কেমন করে প্রশ্ন করা ছাড়াই।"১০০০ মোল্লা আলী কারী বলেন: وقال الإمام الأعظم رحمه الله في كتابه الوصية : نقر بأن الله على العرش استوى، من غير أن يكون له حاجة إليه واستقرار عليه، وهو الحافظ للعرش وغير العرش، فلو كان محتاجا إليه لما قدر على إيجاد العالم وتدبيره كالمخلوق، ولو صار محتاجا إلى الجلوس والقرار فقبل خلق العرش أين كان الله تعالى؟ فهو منزه عن ذلك علوا كبيراً ، انتهى. ونعم ما قال الإمام مالك رحمه الله حيث سئل عن ذلك الاستواء، فقال: الاستواء معلوم، والكيف مجهول، والسؤال عنه بدعة، والإيمان به واجب "ইমাম আ'যম (রাহ) তাঁর 'ওসীয়াত' নামক পুস্তকে বলেছেন: "আমরা স্বীকার ও বিশ্বাস করি যে, মহান আল্লাহ আরশের উপর সমাসীন, আরশের প্রতি তাঁর কোনোরূপ প্রয়োজন ব্যতিরেকে এবং আরশের উপরে স্থিরতার প্রয়োজন ব্যতিরেকে। তিনি আরশ ও অন্য সবকিছুর সংরক্ষক। তিনি যদি আরশের মুখাপেক্ষী হতেন তাহলে বিশ্ব সৃষ্টি করতে ও পরিচালনা করতে পারতেন না, বরং তিনি মাখলুকের মত পরমুখাপেক্ষী হয়ে যেতেন। আর যদি তার আরশের উপরে উপবেশন করার বা স্থির হওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকে তবে আরশ সৃষ্টির পূর্বে তিনি কোথায় ছিলেন? কাজেই আল্লাহ এ সকল বিষয় থেকে পবিত্র ও অনেক অনেক ঊর্ধ্বে।" এ বিষয়ে ইমাম মালিক (রাহ) খুবই ভাল কথা বলেছেন। তাঁকে আল্লাহর আরশের উপরে সমাসীন হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: “সমাসীন হওয়ার বিষয়টি পরিজ্ঞাত, এর পদ্ধতি বা স্বরূপ অজ্ঞাত, এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদ'আত এবং এ বিষয় বিশ্বাস করা জরুরী। "১০০১ ইমাম তাহাবী (রাহ) বলেন: وتعالى عن الحدود والغايات، الأركان والأعضاء الأدوات، لا تحويه الجهات الست كسائر المبتدعات.. والعرش والكرسي حق. وهو مستغن عن العرش وما دونه محيط بكل شيء وفوقه، وقد أعجز عن الإحاطة خلقه. "আল্লাহ্ সীমা-পরিধি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও উপাদান-উপকরণের বহু উর্ধে। যাবতীয় উদ্ভাবিত সৃষ্ট বস্তুর ন্যায় তাঁকে ষষ্ঠ দিক পরিবেষ্টন করতে পারে না। আল্লাহর আরশ ও কুরসী (আসন) সত্য। প্রতিটি বস্তু তাঁর পরিবেষ্টনে রয়েছে এবং তিনি সবকিছুর উর্ধে। সৃষ্টিজগত তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না।"১০০২ আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, ইফতিরাকের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মতভেদীয় বিষয়ই মহান আল্লাহর তাওহীদুল আসমা ও সিফাত বিষয়ক। আর এ জাতীয় সকল বিষয়েই তাঁরা এ মুলনীতি অনুসরণ করেছেন।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 রিসালাত ও বিলায়াত বিষয়ে মূলনীতি

📄 রিসালাত ও বিলায়াত বিষয়ে মূলনীতি


এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মূলনীতি কুরআন ও হাদীসের সর্বজনীনতায় বিশ্বাস করা। রাসূলুল্লাহ-এর পরে কোনো ব্যক্তির নিষ্পাপত্ব, অভ্রান্ততা বা বিশেষ জ্ঞানে বিশ্বাস না করা। তাঁরা কাশফ, ইলহাম, ইলকা ইত্যাদির অস্তিত্ব বিশ্বাস করেন এবং এগুলিকে ব্যক্তি মুমিনের জন্য 'কারামত' বা মর্যাদা ও নিয়ামত বলে গণ্য করেন। কিন্তু এগুলিকে আকীদার উৎস হিসেবে বা কুরআন- সুন্নাহর ব্যাখ্যার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন না। আলিম বা বজুর্গ ব্যক্তি যতই বড় হোন, তিনি কখনোই ইসমাত বা অভ্রান্ততার পদমর্যাদা পাবেন না। তার অনেক সঠিক মতের পাশাপাশি কিছু ভুল মত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। শুধু স্বাভাবিকই নয়, বরং সুনিশ্চিত। এ বিষয়ে ইমাম মালিক (রাহ) বলেন: كل أحد يؤخذ من قوله ويترك الا صاحب هذا القبر صلى الله عليه وسلم "প্রত্যেক ব্যক্তিরই কিছু মত গ্রহণ করা হয় এবং কিছু মত বাদ দেওয়া হয়, একমাত্র ব্যতিক্রম এ কবরে যিনি শায়িত আছেন তিনিই, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ।"১০০০ এভাবে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামগণের নিকট রাসূলুল্লাহ )ﷺ(-এর পরে আর কারো কথাই নির্বিচারে গ্রহণ করা হয় না। কুরআন ও সুন্নাতের মানদণ্ডে যাচাই করেই সকল কথা গ্রহণ করতে হবে। কারো কথা দিয়ে কুরআন বা সুন্নাত বিচার করা যায় না, বরং কুরআন ও সুন্নাত দিয়ে প্রত্যেকের কথা যাচাই করে গ্রহণ করতে হবে। অমুক বলেছেন কাজেই তা দীনের প্রমাণ বা আকীদার দলীল এরূপ চিন্তা করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। আল্লামা উমর ইবনু মুহাম্মাদ আন-নাসাফী (৫৩৭ হি.) তাঁর "আল-আকাইদ আন নাসাফিয়‍্যাহ” ও অষ্টম শতকের প্রখ্যাত শাফেয়ী ইমাম আল্লামা সা'দ উদ্দীন মাসউদ ইবনু উমর আত-তাফতাযানী (৭৯১ হি) তাঁর "শারহুল আকাইদ আন নাসাফিয়‍্যাহ” -তে লিখেছেন: الإلهام المفسر بإلقاء معنى في القلب بطريق الفيض ليس من أسباب المعرفة بصحة الشيء عند أهل الحق "হক্কপন্থীগণের নিকট ইলহাম বা ইলকা কোনো কিছুর সঠিকত্ব জানার কোনো মাধ্যম নয়।"১০০৪ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত সাহাবীগণ, নবী-বংশ এবং নেককার মানুষদের ভক্তি ও ভালবাসায় তাঁরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তাঁরা নেককার মানুষদেরকে ভালবাসেন, কিন্তু কারো ভালবাসায় বাড়াবাড়ি করেন না। তাঁরা সকল মুমিনকে আল্লাহর ওলী বলে গণ্য করেন, যার তাকওয়া ও কুরআন-সুন্নাতের আনুগত্য যত বেশি সে তত বেশি কামিল ওলী বলে বিশ্বাস করেন। তবে কুরআন কারীমে বা হাদীস শরীফে যাদের বিষয়ে জান্নাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাঁরা ছাড়া অন্য কাউকে সুনিশ্চিত 'ওলী' বলা তো দূরের কথা, সুনিশ্চিত জান্নাতী বলেও সাক্ষ্য দেন না। বরং তাদের বিষয়ে ভাল ধারণা পোষণ করেন এবং তাদের জান্নাতের আশা করেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেন: وأفضل الناس بعد النبين عليهم الصلاة والسلام أبو بكر الصديق ثم عمر بن الخطاب الفاروق ثم عثمان بن عفان ذو النورين ثم علي بن أبي طالب المرتضي رضوان الله تعالي أجمعين، عابدين ثابتين علي الحق ومع الحق، نتولاهم جميعا ولا نذكر أحدا من أصحاب رسول الله ﷺ إلا بخير. "নবীগণের (আ) পরে মানব জাতির মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন আবূ বাক্স সিদ্দীক, তাঁর পরে উমার ইবনুল খাত্তাব আল-ফারুক, তাঁর পরে যুন্নুরাইন উসমান ইবনু আফ্ফান, তাঁর পরে আলী ইবনু আবী তালিব আল-মুরতাযা, রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন, আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হন। তাঁর আজীবন আল্লাহর ইবাদতের থেকেছেন এবং সত্যের উপরে ও সত্যের সাথে সুপ্রতিষ্ঠিত থেকেছেন। আমরা তাঁদের সকলকেই ভালবাসি ও ওলী হিসেবে গ্রহণ করি। আমরা রাসূলুল্লাহ )ﷺ(-এর কোনো একজন সাহাবীর বিষয়েও ভাল কথা ছাড়া কিছু বলি না।"১০০৫ এ বিষয়ে ইমাম তাহাবী (রাহ) বলেন: نحب أصحاب رسول الله ﷺ، ولا نفرط في حب أحد منهم. ولا نتبرأ من أحد منهم، ونبغض من يبغضهم وبغير الخير يذكرهم. ولا نذكر هم إلا بخير . ... وإن العشرة الذين سماهم رسول الله ﷺ وبشرهم بالجنة نشهد لهم بالجنة على ما شهد لهم رسول الله ﷺ وقوله الحق ... ومن أحسن القول في أصحاب رسول الله ﷺ، وأزواجه الطاهرات من كل دنس وذرياته المقدسين من كل رجس فقد برئ من النفاق. وعلماء السلف من السابقين، ومن بعدهم من التابعين، أهل الخير الأثر، وأهل الفقه والنظر، لا يذكرون إلا بالجميل، ومن ذكرهم بسوء فهو على السبيل. "আমরা রাসূলুল্লাহ-এর সাহাবীগণকে ভালবাসি। তাঁদের কারো ভালবাসায় বাড়াবাড়ি করি না এবং তাঁদের কারো প্রতি অভক্তি বা সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করি না। যারা সাহাবীগণকে বিদ্বেষ করে বা ঘৃণা করে বা ভালভাবে ছাড়া তাদের উল্লেখ করে আমারা তাদেরকে ঘৃণা করি। আমরা তাঁদেরকে ভাল কথা ছাড়া উল্লেখ করি না।... রাসূলুল্লাহ )ﷺ( যে দশজন সাহাবীর নাম উল্লেখ করে তাদের জান্নাতবাসী হওয়ার সুসংবাদ দান করেছেন আমার তাঁর এই সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তাদের জান্নাতবাসী হওয়ার সাক্ষ্য প্রদান করি। কেননা, তাঁর উক্তি সত্য।... যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ )ﷺ(-এর সাহাবীগণ, তাঁর নিষ্কলুষ সহধর্মিনী ও পুত-পবিত্র নির্মল বংশধরগণ সম্পর্কে উত্তম মন্তব্য করলো সে নেফাক থেকে মুক্ত হলো। প্রথম যুগের সালফে সালেহীন ও তাঁদের সঠিক অনুসারী পরবর্তীকালের আলেমগণ যারা হলেন কল্যাণ ও ঐতিহ্যের প্রতীক এবং ধর্ম জ্ঞানে পারদর্শী চিন্তাবিদ, যথাযোগ্য কৃতজ্ঞতা ও সম্মানের সাথে তাঁদের উল্লেখ করতে হয়। আর যে তাঁদের সম্পর্কে কটুক্তি বা বিরূপ মন্তব্য করে সে ভ্রান্ত পথের অনুসারী।"১০০৬ চতুর্থ অধ্যায়ে কারামাতুল আউলিয়া প্রসঙ্গে আমরা দেখেছি, উম্মাতের ওলীগণের পরিচয়ে ইমাম তাহাবী বলেছেন: "সকল মুমিন করশাময় আল্লাহর ওলী। তাঁদের মধ্য থেকে যে যত বেশি আল্লাহর অনুগত ও কুরআনের অনুসরণকারী সে ততবেশি আল্লাহর নিকট সম্মানিত।" আমরা আরো দেখেছি যে, ইমাম আবূ হানীফা (রাহ), ইমাম তাহাবী (রাহ) প্রমুখ ইমাম উল্লেখ করেছেন যে, ঈমান ও মা'রিফাতের দিক থেকে সকল মুমিনই সমান, কাজেই বেলায়াতের কমবেশি তাকওয়া ও আনুগত্য অনুসরণের ভিত্তিতেই হয়, কোনো ব্যক্তির বিশেষ সম্পর্ক, বংশ, ইত্যাদির কারণে নয়। মুমিনদের বিষয়ে ও ওলীগণের বিষয়ে এ হলো আহলুস সুন্নাতের সাধারণ আকীদা। শীয়া বা অন্যান্য বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের মত তাঁরা ওলীগণের মর্যাদা বিষয়ক সাধারণ আয়াত ও হাদীসকে পুঁজি করে নির্দিষ্ট কাউকে ওলী বলে নিশ্চিত করেন না বা তাকে অভ্রান্ত বলে দাবি করে তার মতামতকে কুরআন বা হাদীসের একমাত্র ব্যাখ্যা বা আকীদার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন না। কেবলমাত্র কুরআন বা হাদীসে যাদেরর জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে তাঁদেরকেই জান্নাতী বলে সাক্ষ্য দেন। আর তাঁদের জান্নাত ও বিলায়াতের সাক্ষ্যকে তাঁরা অভ্রান্ততার সাক্ষ্য বলে গণ্য করেন না। বরং তাঁরা রাসূলুল্লাহ-এর পরে কাউকে মা'সূম বা নিষ্পাপ, নিভুল বা অভ্রান্ত বলে বিশ্বাস করেন না। ইমাম তাহাবী বলেন: ونرجو للمحسنين من المؤمنين أن يعفو عنهم ويدخلهم الجنة برحمته، ولا نأمن عليهم، ولا نشهد لهم بالجنة، ونستغفر لمسيئهم، ونخاف عليهم، ولا نقنطهم "নেককার বা ইহসান অর্জনকারী মুমিনদের বিষয়ে আমরা আশা পোষণ করি যে, মহান আল্লাহ দয়া করে তাদের ক্ষমা করবেন এবং জান্নাত প্রদান করবেন, তবে আমরা তাদের বিষয়ে নিশ্চিত নিরাপত্তা অনুভব করি না এবং তাদের জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য প্রদান করি না। আর আমার পাপী মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাদের বিষয়ে ভীতি অনুভব করি। তবে তাদেরকে নিরাশ করি না।"১০০৭ এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনু আবিল ইয্য বলেন: "বিষয়টি যেহেতু এরূপ সেহেতু রাসূলুল্লাহ যার বিষয়ে জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি ছাড়া উম্মাতের কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে তাকে জান্নাতী বলে নিশ্চিত হওয়া যাবে না, বরং আমরা নেককার বা ইহসানের পর্যায়ে পৌঁছানো মুমিনদের জন্য আশাবোধ করি এবং তাদের বিষয়ে ভীতিও বোধ করি। "১০০৮ ইমাম তাহাবী অন্যত্র বলেন: وَلَا تُنْزِلُ أَحَدًا مِنْهُمْ جَنَّةً وَلَا نَارًا "আমরা মুমিনদের কাউকে জান্নাতে বা জাহান্নামে অবতরণ কারই না।"১০০৯ এর ব্যাখ্যায় ইবনু আবিল ইয্য বলেন: “ইমাম তাহাবী বলছেন যে, আমরা আহলু কিবলার মধ্য থেকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে বলি না যে, সে জান্নাতী অথবা জাহান্নামী। কেবলমাত্র রাসূলুল্লাহ যার বিষয়ে জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদেরকেই আমরা জান্নাতী বলি, যেমন আশারায়ে মুবাশারা। আমরা যদিও বলি যে, কবীরা গোনাহে লিপ্ত মুমিনদের যাকে চান আল্লাহ জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন এবং এরপর শাফা'আতকারীদের শাফা'আতে তাদেরকে সেখান থেকে বের করবেন, তবে আমরা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিষয়ে নিশ্চিত মতামত প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকি। ওহীর জ্ঞান ছাড়া আমরা তার জান্নাতের সাক্ষ্য দেই না, জাহান্নামের সাক্ষ্যও দেই না। কারণ প্রকৃত বিষয় তো গুপ্ত রয়েছে। কে কিভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং মৃত্যুর সময় তার কি অবস্থা ছিল তা আমরা কেউ জানি না। তবে আমরা নেককার বা ইহসান অর্জনকারীদের সম্পর্কে ভাল আশা করি এবং পাপীদের বিষয়ে ভয় পোষণ করি।"১০১০

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 পাপী মুমিন বিষয়ক মূলনীতি

📄 পাপী মুমিন বিষয়ক মূলনীতি


পূর্ববর্তী অধ্যায়ে তাকফীর বিষয়ক মূলনীতি আলোচনা কালে আমরা দেখেছি যে, পাপী মুসলিমের বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তাদেরকে সুনিশ্চিত জাহান্নামী বা জান্নাতী বলেন নি। বরং শাস্তি, ক্ষমা বা শাস্তি পূর্বক ক্ষমার পর তাদের জান্নাতের আশা পোষণ করেছেন। এ বিষয়ে কুরআন, হাদীস ও সাহাবীগণের মতামতের আলোকে ইমামগণের বক্তব্য আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে দেখেছি।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 রাষ্ট্র ও নাগরিক বিষয়ক মুলনীতি

📄 রাষ্ট্র ও নাগরিক বিষয়ক মুলনীতি


ইসলামের প্রথম দুটি ফিরকা: শীয়া ও খারিজী ফিরকার উদ্ভব ও উন্মেষ ঘটেছিল রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে। রাজনৈতিক বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিভক্তি ঘটে। বিশেষত খারিজীগণ এ বিষয়ে দুটি আকীদার উদ্ভাবন করে: (১) পাপী ব্যক্তির ইমামতের অবৈধতা এবং (২) পাপী ইমামের অপসারণের আবশ্যকতা। তাদের দাবি ছিল যে, পাপী ব্যক্তি কাফির, আর কাফির ব্যক্তি সালাতের বা রাষ্ট্রের ইমামতি করতে পারে না। বরং মুমিনের জন্য ফরয যে, এরূপ ইমামের বিরুদ্ধে সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের অংশ হিসেবে বিদ্রোহ করবে এবং জিহাদ করে একে অপসারণ করবে। এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের সকল নির্দেশনা গ্রহণ করার মূলনীতির আলোকে সাহাবীগণ ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতে আলিমগণ মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তাঁদের মতে অন্যান্য মুমিনের ন্যায় পাপী শাসকের ক্ষেত্রেও পাপের কারণে তাকে কাফির বলা যায় না, যতক্ষণ না সুনিশ্চিত কুফরী বা শিরকে সে নিপতিত হয়। পাপী শাসক-প্রশাসকের পাপ যেমন সমর্থন করা যাবে না, তেমানি তার পাপের কারণে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা নষ্ট বা বিদ্রোহ করা যাবে না। মধ্যপন্থা অবলম্বন করে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও শান্তি বজায় রাখতে হবে। ইবনু আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন: مَنْ رَأَى مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا يَكْرَهُهُ فَلْيَصْبِرْ عَلَيْهِ فَإِنَّهُ مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ وفي لفظ : خَرَجَ مِنَ السُّلْطَانِ شَبْرًا فَمَاتَ إِلَّا مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً "কেউ তার শাসক বা প্রশাসক থেকে কোন অপছন্দনীয় বিষয় দেখলে তাকে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। কারণ যদি কেউ জামা'আতের (সমাজ বা রাষ্টের ঐক্যের বা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সিদ্ধান্তের) বাইরে, দ্বিতীয় বর্ণনায়: রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের বাইরে এক বিঘতও বের হয়ে যায় এবং এই অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে, তাহলে সে জাহিলী মৃত্যু বরণ করল। "১০১১ উম্মু সালামা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, إِنَّهُ يُسْتَعْمَلُ عَلَيْكُمْ أَمَرَاءُ فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ فَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ بَرِئَ وَمَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَا نُقَاتِلُهُمْ قَالَ لَا مَا صَلَّوْا "অচিরেই তোমাদের উপর অনেক শাসক প্রশাসক আসবে যারা ন্যায় ও অন্যায় উভয় প্রকারের কাজ করবে। যে ব্যক্তি তাদের অন্যায়কে ঘৃণা করবে সে অন্যায়ের অপরাধ থেকে মুক্ত হবে। আর যে ব্যক্তি আপত্তি করবে সে (আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে) নিরাপত্তা পাবে। কিন্তু যে এ সকল অন্যায় কাজ মেনে নেবে বা তাদের অনুসরণ করবে (সে বাঁচতে পারবে না।)" সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? তিনি বলেন, "না, যতক্ষণ তারা সালাত আদায় করবে।"১০১২ আউফ ইবনু মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, ألا مَنْ وَلِيَ عَلَيْهِ وَال فَرَآهُ يَأْتِي شَيْئًا مِنْ مَعْصِيَةِ اللهِ فَلْيَكْرَهُ مَا يَأْتِي مِنْ مَعْصِيَةِ اللهِ وَلَا يَنْزِعَنَّ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ "তোমরা হুশিয়ার থাকবে! তোমাদের কারো উপরে যদি কোনো শাসক-প্রশাসক নিযুক্ত হয় এবং সে দেখতে পায় যে, উক্ত শাসক বা প্রশাসক আল্লাহর অবাধ্যতার কোনো কাজে লিপ্ত হচ্ছে, তবে সে যেন আল্লাহর অবাধ্যতার উক্ত কর্মকে ঘৃণা করে, কিন্তু আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নেবে না।"১০১৩ ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেন: والصلاة خلف كل بر وفاجر من المؤمنين حائزة. "এবং সকল নেককার ও বদকার মুমিনের পিছনে সালাত আদায় বৈধ। "১০১৪ ইমাম তাহাবী (রাহ) বলেন: ونرى الصلاة خلف كل بر وفاجر من أهل القبلة ... ولا نري الخروج على أئمتنا وولاة أمورنا وإن جاروا، ولا ندعو عليهم ولا ننزع يدا من طاعتهم. ونرى طاعتهم من طاعة الله عز وجل فريضة ما لم يأمروا بمعصية. وندعو لهم بالصلاح والمعافاة ... ونحب أهل العدل والأمانة، ونبغض أهل الجور والخيانة. والحج والجهاد ما ضيان مع أولي الأمر من المسلمين برهم وفاجرهم، إلى قيام الساعة، لا يبطلهما شيء ولا ينقضهما. "আমরা কিবলাপন্থী প্রত্যেক নেককার ও বদকার মুসলিমের পিছনে সালাত কায়েম করা... বৈধ মনে করি।... আমাদের ইমাম বা শাসকবর্গ অত্যাচার করলেও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বৈধ মনে করি না। আমরা তাদেরকে অভিশাপ প্রদান করি না এবং তাদের আনুগত্যও বর্জন করি না। আমরা তাদের প্রতি আনুগত্যকে আল্লাহরই আনুগত্যের অংশ হিসেবে ফরয মনে করি যতক্ষণ না তারা কোনো পাপ কর্মের নির্দেশ দেয়। আর তাদের সংশোধন ও সংরক্ষণের জন্য দু'আ করি। আমরা ন্যায়বিচারক ও দায়িত্ববান-আমানত আদায়কারী শাসকদের ভালবাসি এবং জালিম, দুর্নীতিবাজ বা দায়িত্বে খিয়ানতকারীদের ঘৃণা করি। মুসলিম শাসকের অধীনে- সে নেককার হোক আর পাপী-বদকার হোক- হজ্জ্ব এবং জিহাদ কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কোনো কিছুই এ দুটিকে বাতিল বা ব্যাহত করতে পারে না।"১০১৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00