📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাকদীর বনাম মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা

📄 তাকদীর বনাম মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা


ইসলামের তাকদীরে বিশ্বাস সম্পর্কে আমরা চতুর্থ অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে সংক্ষেপে আমরা বলতে পারি যে, কুরআন কারীমে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে মহান আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ। কোনো সৃষ্টির জ্ঞানের সাথে আল্লাহর জ্ঞানের তুলনা হয়না। সৃষ্টির আগেই তিনি বিশ্বের সকল বিষয় কোথায় কিভাবে সংঘটিত হবে সবই জানেন। কুরআন কারীমে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ তাঁর অনাদি, অনন্ত, অসীম ও সর্বব্যাপী জ্ঞান 'কিতাবে মুবীন' (সুস্পষ্ট কিতাব) বা 'লাওহে মাহফুজে' (সংরক্ষিত পত্রে) লিখে রেখেছেন। কুরআন কারীম বারংবার ঘোষণা করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ সবকিছু নির্ধারণ করে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর মহান ইচ্ছার বাইরে কিছুই ঘটে না। আবার কুরআন থেকে আমরা মানুষের নিজের কর্মের জন্য দায়বদ্ধতার কথা জানতে পারি। ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিই যে, মানুষ তার নিজের কর্মফলের জন্য দায়ী। মহান আল্লাহ করুণাময় ও ন্যায়বিচারক, তিনি কারো উপর জুলুম করবেন না। বরং প্রত্যেককে তার কর্মের পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করবেন। সাহাবীগণ এ সকল আয়াত ও এ বিষয়ক সকল হাদীস সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করেছেন। এগুলির মধ্যে কোনো বৈপরীত্য তাঁরা কল্পনা করেন নি। কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্ম থেকে কিছু মানুষ এ বিষয়ে বৈপরীত্য কল্পনা করতে শুরু করে। প্রথম হিজরী শতকের শেষভাগ থেকে কিছু মানুষ বলতে শুরু করে যে, তাকদীর বা আল্লাহর ইলম, লিখনী বা নির্ধারণ বলে কিছু নেই। তাদের মতে তাকদীরের বিশ্বাস আল্লাহর ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার বিরোধী। ক্রমান্বয়ে এ মতটি একটি 'দল' বা ফিরকায় পরিণত হয়। এদের 'কাদরীয়া' বলা হয়। পরবর্তীকালে মুতাযিলাগণও অনুরূপ মত গ্রহণ করে। এ মতের বিপরীতে একদল মানুষ বলতে থাকে যে, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা বলে কিছু নেই। কলের পুতুলের মতই সে কর্ম করে। এদের 'জাবারিয়‍্যাহ' বলা হয়।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 আল্লাহর বিশেষণ: বিশ্বাস, অবিশ্বাস ও ব্যাখ্যা

📄 আল্লাহর বিশেষণ: বিশ্বাস, অবিশ্বাস ও ব্যাখ্যা


ইফতিরাকের অন্যতম বিষয় ছিল মহান আল্লাহর সিফাত বা কর্ম ও বিশেষণ। প্রাচীন কাল থেকেই মহান আল্লাহর অস্তিত্ব এবং স্রষ্টা ও প্রতিপালক হিসেবে তাঁর একত্ব বা তাওহীদের বিষয়ে অধিকাংশ ধর্ম, সম্প্রদায় ও মানবগোষ্ঠী প্রায় একমত। প্রায় সকলেই স্বীকার ও বিশ্বাস করেছেন যে, অনাদি-অনন্ত সত্তা হিসেবে আল্লাহই একমাত্র সত্তা এবং এ বিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা ও প্রতিপালক মহান আল্লাহ। কিন্তু তাঁর সত্তার প্রকৃতি, তাঁর কর্ম, তাঁর বিশেষণ ইত্যাদি বিষয়ে অগণিত মতভেদ ও বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে। এ সকল মতের অনুসারীগণ স্বীকার করেছেন যে, মানুষ তার মানবীয় জ্ঞান, বিবেক, প্রজ্ঞা, দর্শন ও যুক্তি দিয়ে মহান আল্লাহর অস্তি ত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে। মানুষ বুঝতে পারে যে, নিখুত ও বৈজ্ঞানিক নিয়মে সৃষ্ট, পরিচালিত, পরিবর্তিত ও ক্ষয়শীল এ বিশ্বের একজন মহাজ্ঞানী, বৈজ্ঞানিক মহাক্ষমতাশীল স্রষ্টা আছেন। মানুষ এও বুঝতে পারে যে, স্রষ্টার প্রকৃতি, স্বরূপ, কর্ম, বিশেষণ মানবীয় ইন্দ্রিয়ের অগম্য, কারণ মানুষ যা কোনোভাবে ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করেনি বা যার তুলনীয় কিছুই তার ইন্দ্রিয় বা কল্পনার মধ্যে প্রবেশ করে নি তা সে ইন্দ্রিয় লব্ধ জ্ঞান বা কল্পনায় ধারণ করতে পারে না। এরপরও মহান স্রষ্টার প্রকৃতি, কর্ম ও বিশেষণাদি সম্পর্কে মানুষ দর্শন, কল্পনা ও যুক্তি দিয়ে অনেক কিছু বুঝতে চেষ্টা করেছে এবং এ বিষয়ে অনেকেই অনেক বিতর্ক ও মতামত প্রকাশ করেছে। এ সকল মতামত সবই 'অন্ধের হস্তি দর্শন'-এর মতই। এগুলি অন্তহীন বিতর্ক জন্ম দিয়েছে কিন্তু কোনো সমাধান দিতে পারে নি। কারণ কার মতটি সঠিক তা ইন্দ্রিয় বা মানবীয় জ্ঞানের গম্য কোনো বিষয় দিয়ে কোনোভাবে প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই। কুরআন কারীমে আল্লাহর আসমা ও সিফাত বা নাম ও বিশেষণ সম্পর্কে মক্কার কাফিরদের এ জাতীয় কিছু বিভ্রান্তির কথা আলোচনা করা হয়েছে। ওহীর সাথে মানবীয় 'আকল', জ্ঞান, বিবেক ও যুক্তির সম্পর্ক ও সমন্বয় বিষয়ে ইসলামের দিক নির্দেশনা আমরা প্রথম অধ্যায়ে আকীদার উৎস প্রসঙ্গে আলোচনা করেছি। মহান আল্লাহর যে সকল সিফাত বা কর্ম ও বিশেষণের কথা ওহীর মাধ্যমে জানা যায় তা মানবীয় জ্ঞান, বিবেক বা বুদ্ধির সাথে সাংঘর্ষিক নয়, অবোধ্য নয় বা অসম্ভব নয়। যেমন মহান স্রষ্টা মানুষকে তার পাপের জন্য শাস্তি দিবেন বা ক্ষমা করবেন। দুটি বিষয়ই মানবীয় বিবেক ও বুদ্ধিতে সম্ভব। তবে কোন্টি কিভাবে তিনি করবেন সে বিষয়ে মানবীয় বুদ্ধি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। একজন হয়ত বলবেন, মহান আল্লাহ দয়াময়, কাজেই তিনি তার প্রিয় সৃষ্টিকে শাস্তি দিতে পারে না, তিনি কাউকে কোনো শাস্তি দিবেন না। অন্য ব্যক্তি হয়ত বলবেন, মহান আল্লাহ ন্যায়বিচারক, তিনি যদি কোনো পাপীকে শাস্তি না দেন তবে তা তাঁর ন্যায় বিচারের মর্যাদা ক্ষুন্ন করে। তিনি কাউকে ক্ষমা করবেন না।.... মহান আল্লাহর প্রতিটি বুদ্ধিগম্য সিফাত বা কর্ম নিয়ে এরূপ বিতর্ক করা যায়। যেহেতু মহান আল্লাহর সিফাতগুলি গাইবী জগতের বিষয় সেহেতু সকল বিতর্কই অন্তহীন, চূড়ান্ত ও সুনিশ্চিত কোনো ফলাফলে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সাহাবীগণের রীতি ও পদ্ধতি ছিল এ সকল বিষয়ে ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান সর্বান্তকরণে বিশ্বাস ও গ্রহণ করা এবং এর স্বরূপ নির্ণয়ের জন্য চেষ্টা না করা। আমরা দেখেছি যে, গাইবী বিষয়ে যুক্তি, তর্ক বা দর্শন কোনো সমাধান দিতে পারে না। প্রথম হিজরী শতকের শেষাংশ থেকে দ্বিতীয় প্রজন্মে নও-মুসলিমদের মধ্যে এ বিষয়ক পুরাতন দার্শনিক ও ধর্মীয় বিতর্ক ও বিভ্রান্তি প্রবেশ করে। কেউ কেউ বলতে থাকে মহান আল্লাহর কোনো কর্ম বা বিশেষণ থাকতে পারে না। কারণ তাতে অমুক বা তমুক দিক থেকে তার অনাদিত্ব নষ্ট হয় বা সৃষ্টির সাথে তার তুলনা হয়ে যায়। কেউ বা অন্য দর্শন বা যুক্তি দিয়ে তাদের এমতের বিরোধিতা করেন। প্রত্যেকে তার মতের পক্ষে ও বিরোধী মতের বিপক্ষে অনেক 'যুক্তি' পেশ করতে থাকে। এভাবে মহান আল্লাহর সিফাত বা বিশেষণ স্বীকার, অস্বীকার, ব্যাখ্যা, সৃষ্টির কর্ম ও বিশেষণের সাথে তুলনা ইত্যাদি নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ব্যাপক বিভক্তি ও বিভ্রান্তি জন্ম নেয়। আমরা দেখেছি প্রথম হিজরী শতকের শেষ থেকেই 'কাদারিয়া' ফিরকার মানুষেরা তাকদীর অস্বীকার করার মাধ্যমে আল্লাহর ইলম বা জ্ঞান বিশেষণের অনাদিত্ব অস্বীকার করে। এ সময় থেকে কেউ কেউ মহান আল্লাহ কালাম বা কথা বলার বিশেষণ অস্বীকার করেন। কারণ কথা বলা সৃষ্টির কর্ম। মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে এ বিশেষণ আরোপ করলে তাঁকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা হয়। কাজেই তাঁর ক্ষেত্রে এ বিশেষণ আরোপ করা যায় না। বরং আল্লাহ কথা বলেছেন মর্মে যে সকল আয়াত কুরআনে রয়েছে সেগুলির ব্যাখ্যা করতে হবে যে, তিনি এই অর্থের জ্ঞান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে প্রদান করেছেন, অথবা তিনি কিছু কথা সৃষ্টি করে উক্ত ব্যক্তিকে শুনিয়েছেন... ইত্যাদি। দ্বিতীয় হিজরী শতকের শুরুর দিকে জাহ্‌ম ইবনু সাফওয়ান নামক এক ব্যক্তি ভারতীয়, গ্রীক ও মিসরীয় দর্শনের ভিত্তিতে মহান আল্লাহকে সকল প্রকার সিফাত বা বিশেষণ থেকে বিমুক্ত বা 'নির্গুণ' বলে দাবি করে। পরবতীকালে মু'তাযিলীগণও মহান আল্লাহর বিশেষণসমূহ অস্বীকার ও ব্যাখ্যা করে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 বিভ্রান্ত ফিরকাসমূহের বৈশিষ্ট্য

📄 বিভ্রান্ত ফিরকাসমূহের বৈশিষ্ট্য


সাধারণভাবে সকল বিভ্রান্ত ফিরকার মধ্যে নিম্নের বৈশিষ্ট্যগুলি কমবেশি বিদ্যমান: (১) আকীদা বা বিশ্বাস প্রমাণের জন্য ওহীর অতিরিক্ত বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করা। যেমন দর্শন, যুক্তি, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতামত, তাফসীর, ব্যাখ্যা ইত্যাদি। (২) ওহীর ব্যাখ্যা বা ওহীর অর্থ নির্ণয়ে নিজেদের মতামতকেই ওহী বলে মনে করা এবং তাকে আকীদার ভিত্তি বানানো। (৩) আকীদা বা বিশ্বাস প্রমাণের ক্ষেত্রে সুন্নাতকে গুরুত্ব না দেওয়া। (৪) আকীদা প্রমাণের ক্ষেত্রে সাহাবীগণের মতামত ও শিক্ষার গুরুত্ব না দেওয়া। (৫) কুরআন, হাদীস বা সাহাবীগণের বক্তব্যের মধ্যে যে সকল বিষয় পাওয়া যায় না সেগুলিকেও আকীদার বিষয়বস্তু বানানো। সাহাবীগণ যে কথা বলেন নি, বা যে আকীদা পোষণ করেন নি বা যে বিষয়ে কোনো কথাই বলেন নি সে সকল বিষয়কে আকীদার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। (৬) মানবীয় বুদ্ধি, যুক্তি বা পছন্দের ভিত্তিতে ওহীর মধ্যে যাচাই বাছাই করার চেষ্টা করা। ওহীর যে বিষয়গুলি নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সঠিক বলে মনে হয় সেগুলির উপর ভিত্তি করে ওহীর অন্যান্য শিক্ষা ব্যাখ্যা করে বাতিল করা। (৭) নিজেদের মত সমর্থন করতে ওহীর নামে মিথ্যা কথা বানানো। (৮) উগ্রতা, নিজের মতকেই চূড়ান্ত সত্য মনে করা ও অন্য মতের প্রতি অশ্রদ্ধা। (৯) মতবিরোধিতার কারণে অন্যদেরকে 'কাফির' বলা। সকল বিভ্রান্তফিরকার মধ্যেই মতবিরোধীয় বিষয়াদির কারণে মুসলিমকে কাফির বলার ক্ষেত্রে অতি আগ্রহ ও ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যায়। সকলেই চেষ্টা করেন কিভাবে ব্যাখ্যা ও যুক্তির মাধ্যমে বিরোধীদেরকে কাফির বলে প্রমাণ করা যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00