📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বংশধরদের ভালবাসা ও মর্যাদা

📄 রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বংশধরদের ভালবাসা ও মর্যাদা


মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির অন্যতম বিষয় 'আহলুল বাইত' বা রাসূলুল্লাহ-এর বংশধরদের বিষয়ে উম্মাতের দায়িত্ব ও বিশ্বাসের পরিধি নিয়ে। আমরা ইতোপূর্বে তৃতীয় অধ্যায়ে রিসালাতের বিশ্বাসের আলোচনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ-এর আহলু বাইত ও সাহাবীগণের বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা দেখেছি। এ সকল নিদের্শের আলোকে সাহাবীগণ ও তাঁদের অনুসারী মূলধারার তাবিয়ীগণ রাসূলুল্লাহ-এর বংশের মানুষদের সম্মান করেছেন, ভালবেসেছেন ও ভক্তি করেছেন। পাশাপাশি দীন বুঝা ও পালনের ক্ষেত্রে কুরআন কারীম ও সুন্নাতের নববীর উপর নির্ভর করেছেন। নবী-বংশের জন্য কোনো বিশেষ 'পবিত্রতা' বা অধিকার প্রদান করেন নি। নবী-বংশের মানুষেরাও কখনোই এরূপ কিছু দাবি করেন নি। উসমান (রা)-এর খিলাফতের সময় থেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তি প্রচারিত হতে থাকে, যা পরবর্তীকালে বিভক্তিতে রূপান্তরিত হয়। উসমান (রা)-এর খিলাফাতকালে আব্দুল্লাহ ইবনু সাবা নামক একজন ইহুদী ইসলাম গ্রহণের দাবি করে। এ ব্যক্তি ও তার অনুসারীগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বংশধরদের মর্যাদা, ক্ষমতা, বিশেষত আলী ইবনু আবী তালিব (রা)-এর মর্যাদা, বিশেষ জ্ঞান, বিশেষ ক্ষমতা, অলৌকিকত্ব, তাকে ক্ষমতায় বসানোর প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয়ে ও উসমান ইবনু আফফান (রা)-এর নিন্দায় অগণিত কথা বলতে থাকে। এ সব বিষয়ে অধিকাংশ কথা তারা বলতো যুক্তিতর্কের মাধ্যমে। আবার কিছু কথা তারা আকারে-ইঙ্গিতে রাসূলুল্লাহ ()-এর নামেও বানিয়ে বলতে থাকে। ৩য়-৪র্থ হিজরী শতকের অন্যতম ফকীহ, মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু জারীর তাবারী (৩১০ হি) ৩৫ হিজরীর ঘটনা আলোচনা কালে বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু সাবা ইয়ামানের ইহুদী ছিল। উসমান (রা) এর সময়ে সে ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর বিভিন্ন শহরে ও জনপদে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক কথা প্রচার করতে থাকে। হিজাজ, বসরা, কূফা ও সিরিয়ায় তেমন সুবিধা করতে পারে না। তখন সে মিশরে গমন করে। সে প্রচার করতে থাকে: অবাক লাগে তার কথা ভাবতে যে ঈসা (আ) পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন বলে বিশ্বাস করে, অথচ মুহাম্মাদ (ﷺ) পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন বলে বিশ্বাস করে না।.... হাজারো নবী চলে গিয়েছেন। প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মতের একজনকে ওসীয়তের মাধ্যমে দায়িত্ব প্রদান করে গিয়েছেন। মুহাম্মাদ-এর প্রদত্ত ওসীয়ত ও দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তি আলী ইবনু আবী তালিব।... মুহাম্মাদ শেষ নবী এবং আলী শেষ ওসীয়ত প্রাপ্ত দায়িত্বশীল ।... যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ -এর ওসীয়ত ও দায়িত্ব প্রদানকে মেনে নিল না, বরং নিজেই ক্ষমতা নিয়ে নিল, তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে।...' ৯৭৫ এ সকল মিথ্যাচারের ভিত্তিতে 'আহলু বাইত'-এর ভালবাসা ও অধিকারের নামে শীয়াগণের বিভক্তি প্রকাশ পায়। তারা দাবি করে যে, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনক্ষমতা রাসূলুল্লাহ-এর বংশধর হিসেবে আলী (রা) ও তাঁর বংশধরদের পাওনা এবং তাঁদের ক্ষমতা ও অধিকারে বিশ্বাস, তাঁদের নিষ্পাপত্বে বিশ্বাস, তাঁদের অলৌকিক ক্ষমতা, গাইবী জ্ঞান ও অপার্থিব অধিকারে বিশ্বাস ইসলামী আকীদার অংশ।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 ঈমানের সংজ্ঞা ও পাপীর ঈমান

📄 ঈমানের সংজ্ঞা ও পাপীর ঈমান


আমরা ইতোপূর্বে বিভিন্ন আলোচনা থেকে দেখেছি যে, কুরআনে পাপ, জুলম, কুফর ইত্যাদি শব্দ কঠিন নিন্দা ও বিভ্রান্তির অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহর বিধান অমান্যকারীদেরকে কাফির বলা হয়েছে। পাপীদের অনন্ত জাহান্নাম বাসের কথা বলা হয়েছে। এ সকল আয়াত থেকে বাহ্যত বুঝা যেতে পারে যে, পাপ, ফিস্ক, জুলম ও কুফরের একই পরিণতি, তা হলো অনন্ত জাহান্নাম বাস। এ থেকে কেউ দাবি করতে পারেন যে, কর্ম ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বাস যতই ঠিক থাক, যদি কর্মের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি দেখা দেয় তবে তা ঈমানের ঘাটতি বলে বিবেচিত হবে এবং এরূপ ব্যক্তি কাফির বলে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে কুরআন কারীমে বারংবার বলা হয়েছে যে, শিরক ছাড়া সকল পাপ আল্লাহ ইচ্ছা করলে ক্ষমা করেন। কঠিন কবীরা গোনাহে লিপ্ত মানুষদেরকে কুরআনে 'মুমিন' বলে অভিহিত করা হয়েছে। অগণিত সহীহ হাদীসে পাপী মুমিনের শাস্তিভোগের পরে জান্নাতে গমনের কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ-এর শাফা'আতের কারণে কবীরা গোনাহকারী মুমিন ব্যক্তি মুক্তিলাভ করবে বলে বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সকল আয়াত ও হাদীস থেকে বাহ্যত বুঝা যায় যে, আমল বা কর্মের সাথে ঈমান বা বিশ্বাস অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত নয়। বিশ্বাস বা ঈমান ঠিক থাকলে কবীরা গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তিও জান্নাতে যাবে। সাহাবীগণ এ সকল আয়াত ও হাদীসের নির্দেশ সর্বান্তকরণে মেনে নিয়েছেন ও বিশ্বাস করেছেন। উভয় প্রকারের আয়াত ও হাদীসের মধ্যে যে কোনোরূপ বৈপরীত্য আছে সে কথা তাঁরা কখনো কল্পনা করেন নি। এ বিষয়ে তাঁরা কোনো প্রশ্নও করেন নি। কারণ উভয় অর্থের মধ্যে সরাসরি কোনো সংঘর্ষ নেই এবং উভয় অর্থই মানবিক বুদ্ধি ও জ্ঞানে গ্রহণযোগ্য। কাজেই এ বিষয় নিয়ে প্রশ্ন না করে মুমিন নিজের দায়িত্ব পালন করে যাবে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্মের কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির অন্যতম প্রশ্ন ছিল এটি। প্রাথমিক শীয়াগণের পরে মুসলিম উম্মাহর প্রথম ফিরকা খারিজীগণ কুরআনের কিছু আয়াতের বাহ্যিক অর্থের ভিত্তিতে দাবি করে যে, মুসলিম পাপে লিপ্ত হলে সে কাফির বা ঈমান হারা হয়ে যায়। তাদের মতে ইসলামের অনুশাসন অনুসরণ করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজেই যে ব্যক্তি ইসলামের কোনো অনুশাসন লঙ্ঘন করে সে ঈমানহারা বা কাফিরে পরিণত হয়। ঈমান ও কুফরের মাঝে আর কোনো মধ্যম অবস্থা নেই। কাজেই যার ঈমানের পূর্ণতা নষ্ট হবে সে কাফিরে পরিণত হবে। ১৭৬ আলী (রা)-এর খিলাফতকালে ৩৭ হিজরী সাল থেকে খারিজী বিভ্রান্তি ও বিভক্তির উন্মেষ ঘটে এবং ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়। পরবর্তীকালে মুতাযিলাগণও খারিজীদের অনুরূপ মত গ্রহণ করে। এর বিপরীতে মুরজিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়, তারা দাবি করে যে, ঈমান ও ইসলাম সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়। ঈমান বা বিশ্বাস যদি ঠিক থাকে তাহলে কোনো গোনাহের কারণেই কোনো অসুবিধা হবে না। ইসলামের অনুশাসন মানুক অথবা নাই মানুক, সকল মুমিনই সরাসরি জান্নাতী হবে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও ইমামত

📄 রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও ইমামত


খারিজীদের মতামতের একটি বিশেষ দিক ছিল 'রাষ্ট্র ব্যবস্থা' ও রাষ্ট্র প্রধান। ইসলামে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় 'ইমামত' বা নেতৃত্ব একসূত্রে বাঁধা। রাষ্ট্রপ্রধানই সালাতের ইমামতি করেন, ইমাম নির্ধারণ করেন এবং জিহাদ ও অন্যান্য ধর্মীয় বিষয়ে নেতৃত্ব দেন। যেহেতু পাপী ব্যক্তি মুমিন নয়, সেহেতু সে ইমাম হতে পারে না বা রাষ্ট্র-প্রধানও হতে পারে না। এ কারণে তারা পাপী রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তাকে অপসারণ ও সে জন্য যুদ্ধ ও অস্ত্রধারণ করাকে ঈমানী দায়িত্ব বলে গণ্য করে। এ দায়িত্বে অবহেলা করা বা পাপী রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্বের স্বীকৃতিকে তারা কুফরী বলে গণ্য করে। শীয়াগণও খারিজীদের অনুরূপ মত গ্রহণ করে। সর্বোচ্চ তাকওয়া সম্পন্ন নিষ্পাপ ব্যক্তিকে তথা আলী (রা)-এর বংশের ইমামদেরকে ইমাম বা রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নেতা নিয়োগ করা বা রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসানোকে ইসলামী আকীদার অংশ মনে করে। সাহাবীগণ ও তাঁদের অনুসারী সাধারণ মুসলিমগণের সাথে এ বিষয়ে তাদের মৌলিক মতভেদ ও বিভক্তি সৃষ্টি হয়।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাকদীর বনাম মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা

📄 তাকদীর বনাম মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা


ইসলামের তাকদীরে বিশ্বাস সম্পর্কে আমরা চতুর্থ অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে সংক্ষেপে আমরা বলতে পারি যে, কুরআন কারীমে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে মহান আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ। কোনো সৃষ্টির জ্ঞানের সাথে আল্লাহর জ্ঞানের তুলনা হয়না। সৃষ্টির আগেই তিনি বিশ্বের সকল বিষয় কোথায় কিভাবে সংঘটিত হবে সবই জানেন। কুরআন কারীমে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ তাঁর অনাদি, অনন্ত, অসীম ও সর্বব্যাপী জ্ঞান 'কিতাবে মুবীন' (সুস্পষ্ট কিতাব) বা 'লাওহে মাহফুজে' (সংরক্ষিত পত্রে) লিখে রেখেছেন। কুরআন কারীম বারংবার ঘোষণা করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ সবকিছু নির্ধারণ করে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর মহান ইচ্ছার বাইরে কিছুই ঘটে না। আবার কুরআন থেকে আমরা মানুষের নিজের কর্মের জন্য দায়বদ্ধতার কথা জানতে পারি। ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিই যে, মানুষ তার নিজের কর্মফলের জন্য দায়ী। মহান আল্লাহ করুণাময় ও ন্যায়বিচারক, তিনি কারো উপর জুলুম করবেন না। বরং প্রত্যেককে তার কর্মের পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করবেন। সাহাবীগণ এ সকল আয়াত ও এ বিষয়ক সকল হাদীস সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করেছেন। এগুলির মধ্যে কোনো বৈপরীত্য তাঁরা কল্পনা করেন নি। কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্ম থেকে কিছু মানুষ এ বিষয়ে বৈপরীত্য কল্পনা করতে শুরু করে। প্রথম হিজরী শতকের শেষভাগ থেকে কিছু মানুষ বলতে শুরু করে যে, তাকদীর বা আল্লাহর ইলম, লিখনী বা নির্ধারণ বলে কিছু নেই। তাদের মতে তাকদীরের বিশ্বাস আল্লাহর ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার বিরোধী। ক্রমান্বয়ে এ মতটি একটি 'দল' বা ফিরকায় পরিণত হয়। এদের 'কাদরীয়া' বলা হয়। পরবর্তীকালে মুতাযিলাগণও অনুরূপ মত গ্রহণ করে। এ মতের বিপরীতে একদল মানুষ বলতে থাকে যে, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা বলে কিছু নেই। কলের পুতুলের মতই সে কর্ম করে। এদের 'জাবারিয়‍্যাহ' বলা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00