📄 ইফতিরাকের প্রেক্ষাপট
ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, সাহাবীগণের পরবর্তী প্রজন্মের মানুষদের মধ্যে ইফতিরাকের উন্মেষ ঘটে। বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ থেকে যা কিছু শুনেছেন কোনোরূপ দ্বিধা, প্রশ্ন, স্বরূপ নির্ণয় বা প্রকৃতি নির্ধারণ ব্যতিরেকে তা সবই সর্বান্ত করণে বিশ্বাস করেছেন। ইসলামের ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে ইরান, ইরাক, মিসর, সিরিয়া ইত্যাদি দেশের অগণিত মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এদের অনেকেই সাহাবীদের সাহচার্য লাভ করতে পারেন নি। ফলে ইসলামের মূল প্রেরণা ও বিশ্বাস অর্জনের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে দুর্বলতা বিদ্যমান থাকে। এছাড়া তাদের পূর্ববর্তী ধর্মের বিভিন্ন মতামত, বিতর্ক ও তাদের সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন যুক্তি, দার্শনিক মতামত ইত্যাদি তাদের মন-মগজকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এগুলির ভিত্তিতেই তারা ইসলামী বিশ্বাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিতর্ক ও পর্যালোচনা শুরু করেন এবং নতুন নতুন মতামত প্রকাশ করতে থাকেন। এগুলির পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক মতভেদও ইফতিরাকের একটি পেক্ষাপট রচনা করে। রাসূলুল্লাহ-এর পূর্বে আরব দেশে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল না। আরবের মানুষের বংশতান্ত্রিক কবীলা প্রথার অধীনে বসবাস কর। তিনিই প্রথম তথায় আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রচলন করেন। এ বিষয়ে তিনি অনেক নির্দেশনা প্রদান করেন। তবে বিষয়ের নতুনত্বের ও জটিলতার কারণে এ বিষয়ে সাহাবীগণের মধ্যে ইখতিলাফ বা মতভেদ সৃষ্টি হলেও তা ঐকমত্যের মাধ্যমে সমাধান হয়। রাসূলুল্লাহ -এর ওফাতের পরে আবূ বাকর (রা)-এর খলীফা নির্বাচন, উমরের (রা) নির্বাচন, উসমানের (রা) নির্বাচন, আলী (রা)-এর নির্বাচন ইত্যাদি সবই মতভেদের পর ঐক্যমতের মাধ্যমে সমাধান হয়। আমরা পরবর্তী আলোচনা থেকে দেখব যে, আলী (রা)-এর সময়ে রাজনৈতিক বিষয়ে কিছু মতভেদ যুদ্ধের পর্যায়ে গেলেও তা 'ইফতিরাক' বা বিভক্তির পর্যায়ে যায় নি। কিন্তু সাহাবীগণের পরবর্তী প্রজন্মের মানুষের জন্য এ সকল মতভেদ বিভক্তির অন্যতম কারণ ছিল। অজ্ঞতা, অপপ্রচার, পূর্ববর্তী ধর্মের প্রভাব ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে এ সকল রাজনৈতিক মতভেদ ইফতিরাক বা বিভক্তি সৃষ্টিকারীদের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এভাবে আমরা দেখছি যে, নতুন প্রজন্মের মুসিলমদের মধ্যে অজ্ঞতা, পূর্ববর্তী ধর্মের প্রভাব, প্রচলিত দর্শন বা আচার-আচরণের প্রভাব, রাজনৈতিক মতভেদ, অপপ্রচার ইত্যাদি ইফতিরাক বা ফিরকা ও দলাদলির প্রেক্ষাপট তৈরি করে। এ প্রেক্ষাপটে প্রথম হিজরী শতকের মাঝামাঝি থেকেই ফিরকাসমূহ প্রকাশ পেতে থাকে। আলী (রা)-এর সেনাবাহিনীর মধ্য থেকে দুটি দল এরূপ বিভক্তির ও বিভ্রান্তির শুরু করে (১) খারিজীগণ এবং (২) শীয়াগণ। সময়ের আবর্তনে ক্রমান্বয়ে এদের বিভ্রান্তি ও বিভক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এদের নিজেদের মধ্যেও বিভক্তি বাড়তে থাকে। প্রথম হিজরী শতাব্দীর শেষভাগ থেকে নতুন বিভ্রান্তি ও বিভক্তি প্রকাশ পেতে থাকে। কাদারীয়া, জাহমিয়্যাহ, মুরজিয়া, জাবারিয়া, মুতাযিলা ইত্যাদি মতবাদ আত্মপ্রকাশ করে।
📄 রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বংশধরদের ভালবাসা ও মর্যাদা
মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির অন্যতম বিষয় 'আহলুল বাইত' বা রাসূলুল্লাহ-এর বংশধরদের বিষয়ে উম্মাতের দায়িত্ব ও বিশ্বাসের পরিধি নিয়ে। আমরা ইতোপূর্বে তৃতীয় অধ্যায়ে রিসালাতের বিশ্বাসের আলোচনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ-এর আহলু বাইত ও সাহাবীগণের বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা দেখেছি। এ সকল নিদের্শের আলোকে সাহাবীগণ ও তাঁদের অনুসারী মূলধারার তাবিয়ীগণ রাসূলুল্লাহ-এর বংশের মানুষদের সম্মান করেছেন, ভালবেসেছেন ও ভক্তি করেছেন। পাশাপাশি দীন বুঝা ও পালনের ক্ষেত্রে কুরআন কারীম ও সুন্নাতের নববীর উপর নির্ভর করেছেন। নবী-বংশের জন্য কোনো বিশেষ 'পবিত্রতা' বা অধিকার প্রদান করেন নি। নবী-বংশের মানুষেরাও কখনোই এরূপ কিছু দাবি করেন নি। উসমান (রা)-এর খিলাফতের সময় থেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তি প্রচারিত হতে থাকে, যা পরবর্তীকালে বিভক্তিতে রূপান্তরিত হয়। উসমান (রা)-এর খিলাফাতকালে আব্দুল্লাহ ইবনু সাবা নামক একজন ইহুদী ইসলাম গ্রহণের দাবি করে। এ ব্যক্তি ও তার অনুসারীগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বংশধরদের মর্যাদা, ক্ষমতা, বিশেষত আলী ইবনু আবী তালিব (রা)-এর মর্যাদা, বিশেষ জ্ঞান, বিশেষ ক্ষমতা, অলৌকিকত্ব, তাকে ক্ষমতায় বসানোর প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয়ে ও উসমান ইবনু আফফান (রা)-এর নিন্দায় অগণিত কথা বলতে থাকে। এ সব বিষয়ে অধিকাংশ কথা তারা বলতো যুক্তিতর্কের মাধ্যমে। আবার কিছু কথা তারা আকারে-ইঙ্গিতে রাসূলুল্লাহ ()-এর নামেও বানিয়ে বলতে থাকে। ৩য়-৪র্থ হিজরী শতকের অন্যতম ফকীহ, মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু জারীর তাবারী (৩১০ হি) ৩৫ হিজরীর ঘটনা আলোচনা কালে বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু সাবা ইয়ামানের ইহুদী ছিল। উসমান (রা) এর সময়ে সে ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর বিভিন্ন শহরে ও জনপদে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক কথা প্রচার করতে থাকে। হিজাজ, বসরা, কূফা ও সিরিয়ায় তেমন সুবিধা করতে পারে না। তখন সে মিশরে গমন করে। সে প্রচার করতে থাকে: অবাক লাগে তার কথা ভাবতে যে ঈসা (আ) পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন বলে বিশ্বাস করে, অথচ মুহাম্মাদ (ﷺ) পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন বলে বিশ্বাস করে না।.... হাজারো নবী চলে গিয়েছেন। প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মতের একজনকে ওসীয়তের মাধ্যমে দায়িত্ব প্রদান করে গিয়েছেন। মুহাম্মাদ-এর প্রদত্ত ওসীয়ত ও দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তি আলী ইবনু আবী তালিব।... মুহাম্মাদ শেষ নবী এবং আলী শেষ ওসীয়ত প্রাপ্ত দায়িত্বশীল ।... যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ -এর ওসীয়ত ও দায়িত্ব প্রদানকে মেনে নিল না, বরং নিজেই ক্ষমতা নিয়ে নিল, তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে।...' ৯৭৫ এ সকল মিথ্যাচারের ভিত্তিতে 'আহলু বাইত'-এর ভালবাসা ও অধিকারের নামে শীয়াগণের বিভক্তি প্রকাশ পায়। তারা দাবি করে যে, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনক্ষমতা রাসূলুল্লাহ-এর বংশধর হিসেবে আলী (রা) ও তাঁর বংশধরদের পাওনা এবং তাঁদের ক্ষমতা ও অধিকারে বিশ্বাস, তাঁদের নিষ্পাপত্বে বিশ্বাস, তাঁদের অলৌকিক ক্ষমতা, গাইবী জ্ঞান ও অপার্থিব অধিকারে বিশ্বাস ইসলামী আকীদার অংশ।
📄 ঈমানের সংজ্ঞা ও পাপীর ঈমান
আমরা ইতোপূর্বে বিভিন্ন আলোচনা থেকে দেখেছি যে, কুরআনে পাপ, জুলম, কুফর ইত্যাদি শব্দ কঠিন নিন্দা ও বিভ্রান্তির অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহর বিধান অমান্যকারীদেরকে কাফির বলা হয়েছে। পাপীদের অনন্ত জাহান্নাম বাসের কথা বলা হয়েছে। এ সকল আয়াত থেকে বাহ্যত বুঝা যেতে পারে যে, পাপ, ফিস্ক, জুলম ও কুফরের একই পরিণতি, তা হলো অনন্ত জাহান্নাম বাস। এ থেকে কেউ দাবি করতে পারেন যে, কর্ম ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বাস যতই ঠিক থাক, যদি কর্মের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি দেখা দেয় তবে তা ঈমানের ঘাটতি বলে বিবেচিত হবে এবং এরূপ ব্যক্তি কাফির বলে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে কুরআন কারীমে বারংবার বলা হয়েছে যে, শিরক ছাড়া সকল পাপ আল্লাহ ইচ্ছা করলে ক্ষমা করেন। কঠিন কবীরা গোনাহে লিপ্ত মানুষদেরকে কুরআনে 'মুমিন' বলে অভিহিত করা হয়েছে। অগণিত সহীহ হাদীসে পাপী মুমিনের শাস্তিভোগের পরে জান্নাতে গমনের কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ-এর শাফা'আতের কারণে কবীরা গোনাহকারী মুমিন ব্যক্তি মুক্তিলাভ করবে বলে বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সকল আয়াত ও হাদীস থেকে বাহ্যত বুঝা যায় যে, আমল বা কর্মের সাথে ঈমান বা বিশ্বাস অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত নয়। বিশ্বাস বা ঈমান ঠিক থাকলে কবীরা গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তিও জান্নাতে যাবে। সাহাবীগণ এ সকল আয়াত ও হাদীসের নির্দেশ সর্বান্তকরণে মেনে নিয়েছেন ও বিশ্বাস করেছেন। উভয় প্রকারের আয়াত ও হাদীসের মধ্যে যে কোনোরূপ বৈপরীত্য আছে সে কথা তাঁরা কখনো কল্পনা করেন নি। এ বিষয়ে তাঁরা কোনো প্রশ্নও করেন নি। কারণ উভয় অর্থের মধ্যে সরাসরি কোনো সংঘর্ষ নেই এবং উভয় অর্থই মানবিক বুদ্ধি ও জ্ঞানে গ্রহণযোগ্য। কাজেই এ বিষয় নিয়ে প্রশ্ন না করে মুমিন নিজের দায়িত্ব পালন করে যাবে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্মের কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির অন্যতম প্রশ্ন ছিল এটি। প্রাথমিক শীয়াগণের পরে মুসলিম উম্মাহর প্রথম ফিরকা খারিজীগণ কুরআনের কিছু আয়াতের বাহ্যিক অর্থের ভিত্তিতে দাবি করে যে, মুসলিম পাপে লিপ্ত হলে সে কাফির বা ঈমান হারা হয়ে যায়। তাদের মতে ইসলামের অনুশাসন অনুসরণ করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজেই যে ব্যক্তি ইসলামের কোনো অনুশাসন লঙ্ঘন করে সে ঈমানহারা বা কাফিরে পরিণত হয়। ঈমান ও কুফরের মাঝে আর কোনো মধ্যম অবস্থা নেই। কাজেই যার ঈমানের পূর্ণতা নষ্ট হবে সে কাফিরে পরিণত হবে। ১৭৬ আলী (রা)-এর খিলাফতকালে ৩৭ হিজরী সাল থেকে খারিজী বিভ্রান্তি ও বিভক্তির উন্মেষ ঘটে এবং ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়। পরবর্তীকালে মুতাযিলাগণও খারিজীদের অনুরূপ মত গ্রহণ করে। এর বিপরীতে মুরজিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়, তারা দাবি করে যে, ঈমান ও ইসলাম সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়। ঈমান বা বিশ্বাস যদি ঠিক থাকে তাহলে কোনো গোনাহের কারণেই কোনো অসুবিধা হবে না। ইসলামের অনুশাসন মানুক অথবা নাই মানুক, সকল মুমিনই সরাসরি জান্নাতী হবে।
📄 রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও ইমামত
খারিজীদের মতামতের একটি বিশেষ দিক ছিল 'রাষ্ট্র ব্যবস্থা' ও রাষ্ট্র প্রধান। ইসলামে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় 'ইমামত' বা নেতৃত্ব একসূত্রে বাঁধা। রাষ্ট্রপ্রধানই সালাতের ইমামতি করেন, ইমাম নির্ধারণ করেন এবং জিহাদ ও অন্যান্য ধর্মীয় বিষয়ে নেতৃত্ব দেন। যেহেতু পাপী ব্যক্তি মুমিন নয়, সেহেতু সে ইমাম হতে পারে না বা রাষ্ট্র-প্রধানও হতে পারে না। এ কারণে তারা পাপী রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তাকে অপসারণ ও সে জন্য যুদ্ধ ও অস্ত্রধারণ করাকে ঈমানী দায়িত্ব বলে গণ্য করে। এ দায়িত্বে অবহেলা করা বা পাপী রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্বের স্বীকৃতিকে তারা কুফরী বলে গণ্য করে। শীয়াগণও খারিজীদের অনুরূপ মত গ্রহণ করে। সর্বোচ্চ তাকওয়া সম্পন্ন নিষ্পাপ ব্যক্তিকে তথা আলী (রা)-এর বংশের ইমামদেরকে ইমাম বা রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নেতা নিয়োগ করা বা রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসানোকে ইসলামী আকীদার অংশ মনে করে। সাহাবীগণ ও তাঁদের অনুসারী সাধারণ মুসলিমগণের সাথে এ বিষয়ে তাদের মৌলিক মতভেদ ও বিভক্তি সৃষ্টি হয়।