📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 অভিধানে বিদ‘আত

📄 অভিধানে বিদ‘আত


বিদ'আত শব্দটি আরবী 'বাদা'আ' (بدع) ক্রিয়া থেকে গৃহীত ইসম। বাদ'আ অর্থ নব-উদ্ভাবন বা অনাস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব প্রদান (Innovation)। বিদ'আত অর্থ নব-উদ্ভাবিত বিষয়। ১১৫ ৪র্থ হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ ভাষাবিদ ইবনু দুরাইদ (৩২১ হি) বলেন, "বাদা'আ অর্থ কোনো কিছু শুরু করা বা উদ্ভাবন করা। আল্লাহর আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর 'বাদী', অর্থাৎ উদ্ভাবক ও অনাস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব-দাতা বা সৃষ্টিকর্তা। যে ব্যক্তি কোনো বিষয় নতুন উদ্ভাবন বা আবিষ্কার করে সে তার বিদ'আত-কারী বা উদ্ভাবক। ইসম 'বিদ'আত'।" ১১৬ প্রসিদ্ধ ভাষাবিদ ইসমাঈল ইবনু হাম্মাদ আল-জাওহারী (৩৯৩ হি) বলেন: "আল-বিদ'আত অর্থ পূর্ণতার পরে দীনের মধ্যে নব-উদ্ভাবন।"১১৭ ফাইরোয-আবাদী (৮১৭ হি) বলেন: والبدعة : الحدث في الدين بعد الإكمال. والبدعة بالكسر : الحدث في الدين بعد الإكمال ، أو ما استحدث بعد النبي ﷺ من الأهواء والأعمال 'বিদ'আত: পূর্ণতার পরে দীনের মধ্যে নব-উদ্ভাবন, অথবা রাসূলুল্লাহ-এর পরে যে মতবাদ বা কর্ম উদ্ভাবিত হয়েছে।"১১৮ ইবনু মানযূরও অনুরূপ বলেছেন। ১১৯ আল্লামা ইবনু নুজাইম (৯৭০ হি) আল-বাহরুর রায়েক গ্রন্থে বলেন: البدعة وهي كما في المغرب اسم من ابتدع الأمر إذا ابتدأه وأحدثه ثم غلبت على ما هو زيادة في الدين أو نقصان منه. وعرفها الشمني بأنها ما أحدث على خلاف الحق المتلقى عن رسول الله ﷺ من علم أو عمل أو حال بنوع شبهة واستحسان وجعل دينا قويما وصراطا مستقيما. "আল-মুগরিব গ্রন্থে বলা হয়েছে, 'বিদ'আত শব্দটি 'ইবতাদ'আ' ফি'ল থেকে গৃহীত ইসম। ফি'লটির অর্থ শুরু করা বা উদ্ভাবন করা। অতঃপর দীনের মধ্যে সংযোজন বা বিয়োজন অর্থে বিদ'আত শব্দটির ব্যবহার প্রাধান্য লাভ করে।' শুম্মানী বিদ'আতের সংজ্ঞায় বলেন: 'রাসূলুল্লাহ থেকে গৃহীত সত্যের ব্যতিক্রম যে জ্ঞান-মত, কর্ম বা অবস্থা কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্য ভুল বুঝার কারণে এবং ভাল মনে করে উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং যাকে সঠিক দীন ও সিরাতে মুস্তাকীম বানিয়ে দেওয়া হয়েছে তাই বিদ'আত'।""৯২০ আল্লামা ইবরাহীম ইবনু মূসা আশ-শাতিবী (৭৯০ হি) বলেন: فالبدعة إذا عبارة عن طريقة في الدين مُختَرَعَةٍ تُضاهي الشرعية، يقصد بالسلوك عليها البمالغة في التعبد الله سبحانه "বিদ'আত বলতে বুঝায় দীনের মধ্যে শরীয়তের পদ্ধতির তুল্য কোনো নব-আবিষ্কৃত- উদ্ভাবিত তরীকা বা পদ্ধতি মহান আল্লাহর অতিরিক্ত ইবাদতের আশায় যে পদ্ধতির অনুসরণ করা হয়।"১২২ আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু আলী আলাউদ্দীন হাসকাফী (১০৮৮ হি) তাঁর আদ-দুরুল মুখতার গ্রন্থে বিদ'আতের পরিচয়ে বলেন: وَهِيَ اعْتِقَادُ خِلَافِ الْمَعْرُوفِ عَن الرَّسُولِ لا بِمُعَائِدَةٍ بَلْ بِنَوْعٍ شَبَهَةٍ "বিদ'আত হলো, রাসূলুল্লাহ থেকে সুপরিজ্ঞাত বিষয়ের ব্যতিক্রম কোনো বিশ্বাস, যে ব্যতিক্রমের কারণ ইচ্ছাকৃত বিরোধিতা নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহর প্রমাণ বুঝতে অস্পষ্টতা বা ভুল বুঝা।"১২২

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 কুরআন কারীমে বিদ‘আত

📄 কুরআন কারীমে বিদ‘আত


কুরআন কারীম থেকে আমরা জানতে পারি যে, বিদ'আত হচ্ছে এরূপ কর্ম যা করতে আল্লাহ নির্দেশ দেন নি, তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধার্মিক মানুষ তা উদ্ভাবন করে। আর বিদ'আতের প্রকৃতি এই যে, মানুষ যদিও ইবাদতের আগ্রহ নিয়েই তা উদ্ভাবন করে, কিন্তু তা সঠিকভাবে পালন করতে পারে না। কারণ কোন কর্ম কতটুকু মানুষ সহজে পালন করতে পারবে তা মহান আল্লাহই ভাল জানেন। তিনি সেভাবেই বিধান দেন। ধার্মিক মানুষ ধর্মের সাধারণ নির্দেশনার আলোকে আরো বেশি ভাল কাজ করার আগ্রহে কিছু নতুন কর্ম বা রীতি বানিয়ে নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা পালন করতে পারেন না। মহান আল্লাহ খৃস্টানদের বিষয়ে বলেন: وَرَهْبَانِيَةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا "কিন্তু সন্ন্যাসবাদ- এতো তারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য উদ্ভাবন করেছিল, আমি তাদেরকে এর বিধান দেই নি, অথচ তাও তারা যথাযথভাবে পালন করে নি।"৯২৩ খৃস্টধর্মে ও অন্যান্য সকল আসমানী ধর্মেই পার্থিব লোভ, লালসা ও ভোগবিলাস ত্যাগ করে আখিরাতমুখি হওয়ার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ ভোগবিলাস বাদ দিতে বলেছেন, তবে সন্ন্যাসী হতে বলেন নি। আবার খৃস্টধর্মে সন্ন্যাসী হতে বা বিবাহশাদি না করে সংসার-বিরাগী হতে কোনো নিষেধও ছিল না। ধার্মিক খৃস্টানগণ অনুভব করেন যে, বিবাহ ও ঘর সংসার করে দুনিয়া মুখিতা ও ভোগবিলাস থেকে পরিপূর্ণ মুক্ত হওয়া যায় না। এজন্য তারা বেশি আখেরাতমুখিতা অর্জন করার জন্য তারা 'রাহবানিয়‍্যাহ' বা সন্ন্যাসবাদ (monasticism, to become a monk) রীতি উদ্ভাবন করে। তবে তা ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের জন্য মানবীয় বুদ্ধি বিবেক খাটিয়ে রীতি আবিষ্কার করা। ফলে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিপরীত ফল দিয়েছে। মধ্যযুগের খৃস্টান মঠগুলির ইতিহাস পড়লেই আমরা তা জানতে পারি।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 হাদীসে নববীতে বিদ‘আত

📄 হাদীসে নববীতে বিদ‘আত


আমরা দেখেছি যে, আভিধানিক অর্থে বিদ'আত অর্থ খারাপ কিছু নয়; নব-উদ্ভাবিত বিষয় ভাল বা খারপ হতে পারে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ধর্মের বিষয়ে নব-উদ্ভাবন বা বিদ'আত নিন্দনীয় বলে জানিয়েছেন। আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, মানুষ প্রকৃতিগতভাবে মানবীয় বিবেক, বুদ্ধি ও জ্ঞানের মাধ্যমেই মহান স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে। কিন্তু শুধু মানবীয় জ্ঞানের উপর নির্ভর করে মহান স্রষ্টার কর্ম ও বিশেষণের প্রকৃতি, তাঁর সন্তুষ্টির পথ, তাঁর ইবাদতের পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এজন্য এ সকল বিষয়ে ওহীর উপর নির্ভর করতে হয়। আর এ জন্যই মহান আল্লাহ নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করেন এবং তাঁদেরকে কিতাব প্রদান করেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ওহীর বাইরে কোনো ধর্মীয় মতামত তৈরি করা, ধর্মীয় আচার, অনুষ্ঠান বা কর্ম উদ্ভাবন করা ধার্মিক মানুষের জন্য শয়তানের প্রবঞ্চনার দরজা খুলে দেয়। এজন্য বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ উম্মাতকে বিদ'আত থেকে সতর্ক করেছেন। ইতোপূর্বে একাধিক হাদীসে আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ বিদ'আতকে সুন্নাতের বিপরীতে উল্লেখ করেছেন এবং তা ধবংসের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। এ অর্থে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা)-এর হাদীসে দেখেছি যে, আব্দুল্লাহ (রা) দুটি নেককর্মে পদ্ধতিগতভাবে রাসূলুল্লাহ-এর ব্যতিক্রম করতেন। রাসূলুল্লাহ রাতের কিছু অংশ তাহাজ্জুদ আদায় করতেন এবং মাসের কিছু দিনে সিয়াম পালন করতেন, পক্ষান্তরে আব্দুল্লাহ সারারাত তাহাজ্জুদ আদায় এবং সারামাস নফল সিয়াম আদায় করতেন। বিষয়টির প্রতি আপত্তি প্রকাশ করে রাসূলুল্লাহ বলেন: "যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করল আমার সাথে তার সম্পর্ক থাকবে না।... এরপর তিনি বলেন: প্রত্যেক আবেদের কর্মের উদ্দীপনার জোয়ার ভাটা আছে। ইবাদতের উদ্দীপনা কখনো তীব্র হয় আবার এই তীব্রতা এক সময় থেমে যায়, কখনো সুন্নাতের দিকে, কখনো বিদ'আতের দিকে। যার প্রশান্তি সুন্নাতের প্রতি হবে সে হেদায়েত প্রাপ্ত হবে। আর যার প্রশান্তি অন্য কিছুর দিকে হবে সে ধবংসপ্রাপ্ত হবে।" ৯২৪ এখানে আমরা কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করছি: (১) তাহাজ্জুদ ও নফল সিয়াম ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বিভিন্ন হাদীসে এ ইবাদত বেশি বেশি পালন করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এ সকল হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, এ ইবাদত যত বেশি পালন করা যাবে তত বেশি সাওয়াব হবে। কাজেই অর্ধেক রাতের চেয়ে সারারাত তাহাজ্জুদে সাওয়াব বেশি হওয়ার কথা। অনুরূপভাবে মাসের কয়েকদিন সিয়াম পালনের চেয়ে পুরো মাস সিয়াম পালনে বেশি সাওয়াব হওয়ার কথা। (২) সারারাত তাহাজ্জুদ বা নিষিদ্ধ দিনগুলি বাদ দিয়ে সারা মাস সিয়াম পালন মূলত নিষিদ্ধ নয়। তবে তা রাসূলুল্লাহ-এর পদ্ধতির বাইরে। (৩) এরূপ করাকে রাসূলুল্লাহ তাঁর সুন্নাত বা পদ্ধতি অপছন্দ করার নামান্তর বলে বারংবার উল্লেখ করেছেন। (৪) তিনি আরো বলেছেন যে, কোনো আবিদ যদি কর্মের উদ্দীপনায় সাময়িকভাবে অতিরিক্ত কিছু করে তবে তা ধবংসাত্মক নয়। তবে তার স্থিতি যদি সুন্নাতের ব্যতিক্রম হয় তবে তা ধ্বংসাত্মক হবে। (৫) তিনি তাঁর সুন্নাতের ব্যতিক্রম ইবাদতকে বিদ'আত বলেছেন। অন্যান্য অনেক হাদীসে এভাবে বিদ'আতকে সুন্নাতের বিপরীতে উল্লেখ করা হয়েছে এবং 'নব-উদ্ভাবন' বলে অভিহিত করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে আকীদার বিষয়ে সাহাবীগণের মতামত ও ব্যাখ্যার গুরুত্ব আলোচনাকালে এ অর্থের অন্য হাদীসে আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন: "আমার পরে তোমরা যারা বেঁচে থাকবে তাঁরা অনেক মতবিরোধ ও দলাদলি দেখতে পাবে। কাজেই তোমার দৃঢ়ভাবে আমার সুন্নাত এবং আমার পরের খুলাফায়ে রাশেদীনদের সুন্নাত আঁকড়ে ধরে থাকবে, অনুসরণ করবে। আর খবরদার! নব উদ্ভাবিত কর্মাদি থেকে সাবধান থাকবে; কারণ সকল নব উদ্ভাবিত বিষয়ই "বিদ'আত” এবং সকল "বিদ'আত”-ই পথভ্রষ্ঠতা বা গোমরাহী।" অন্য হাদীসে জাবির (রা) বলেন, নবী করীম বলেছেন: إِنَّ أَصْدَقَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلالَةٌ وَكُلِّ ضَلالَةٍ فِي النَّار. "সত্যতম বাণী আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম আদর্শ মুহম্মদের (ﷺ) আদর্শ, সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো নতুন উদ্ভাবিত বিষয়, প্রতিটি নতুন উদ্ভাবিত বিষয়ই "বিদ'আত” আর প্রতিটি "বিদ'আত”-ই পথভ্রষ্ঠতা এবং সকল পথভ্রষ্ঠতা জাহান্নামের মধ্যে।"৯২৪ আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা) বলেন: রাসূলুল্লাহ বলেন: إِنَّمَا هُمَا اثْنَتَانِ الْكَلَامُ وَالْهَدْيِ فَأَحْسَنُ الْكَلَامِ كَلَامُ اللَّهِ وَأَحْسَنُ الْهَدْيِ هَدْي مُحَمَّدٍ أَلَا وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ شَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلالَةٌ "বিষয় শুধুমাত্র দুটি: বাণী ও আদর্শ। সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর বাণী এবং সর্বোত্তম আদর্শ ও পথ হলো মুহম্মদ-এর আদর্শ ও পথ। সাবধান! তোমরা নব উদ্ভাবিত বিষয়াবলী থেকে সতর্ক ও সাবধান থাকবে; কারণ সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নবউদ্ভাবিত বিষয়। আর সকল নবউদ্ভাবিত বিষয়ই "বিদ'আত” এবং সকল "বিদ'আত”ই বিভ্রান্তি বা পথভ্রষ্টতা।"৯২৫ আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন: مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدُّ "আমাদের (রাসূলুল্লাহ ও তাঁর যুগের মুসলমানদের: সাহাবীদের) এ কাজের (ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের) মধ্যে যে নতুন কোনো বিষয় উদ্ভাবন করবে তার নতুন উদ্ভাবিত কাজটি প্রত্যাখ্যান করা হবে।" সহীহ মুসলিমের দ্বিতীয় বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন: مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ "আমাদের কর্ম যা নয় এমন কোনো কর্ম যদি কোনো মানুষ করে তাহলে তার কর্ম প্রত্যাখ্যাত হবে (আল্লাহর নিকট কবুল হবে না)। "১২৬ তাবেয়ী হাসান বসরী (রাহ.) বলেন: রাসূলুল্লাহ বলেছেন: عَمَلٌ قَلِيلٌ فِي سُنَّةٍ خَيْرٌ مِنْ عَمَلٍ كَثِيرٍ فِي بِدْعَةٍ وَمَن اسْتَنَّ بِي فَهُوَ مِنِّي وَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي "সুন্নাতের মধ্যে অল্প আমল করা বিদ'আতের মধ্যে অনেক আমল করার চেয়ে উত্তম। যে আমার পদ্ধতির অনুসরণ করবে সে আমার উম্মত, আমার সাথে সম্পর্কিত। আর যে আমার পদ্ধতি (সুন্নাত) অপছন্দ করবে তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। ১৯২৭ বিদ'আত বিষয়ক রাসূলুল্লাহ-এর হাদীসগুলি পর্যালোচনা করলে আমরা নিম্নের বিষয়গুলি দেখতে পাই: (১) আভিধানিকভাবে সকল নতুন উদ্ভাবিত বিষয়কেই বিদ'আত বলা হয়, তবে হাদীসে নববীতে 'আমাদের কর্মের মধ্যে' বা 'দীনের মধ্যে' 'নব উদ্ভাবিত বিষয়'-কে বিদ'আত বলা হয়েছে। (২) বিদ'আতকে 'সুন্নাতের' বিপরীতে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাকওয়া, আল্লাহর ভয় ও ইবাদতে রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাতকেই সর্বোচ্চ আদর্শ বলে গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ-এর ব্যতিক্রম বা অতিরিক্ত কোনো মত, কথা, কর্ম বা রীতিকে তাকওয়া, বুজুর্গী বা ইবাদত বলে গণ্য করাই বিদ'আত। (৩) বিদ'আত মূলত বর্জনের সুন্নাতের সাথেই সংশ্লিষ্ট। রাসূলুল্লাহ যা করেন নি বা বলেন নি, অর্থাৎ তিনি যা করা বা বলা বর্জন করেছেন তা ইবাদতের উদ্দীপনায় করা বা বলা বা তাকে ইবাদত, কামালাত বা বুজুর্গি মনে করাকে বিদ'আত বলা হয়েছে। (৪) ইবাদতের উদ্দীপনাতেই বিদ'আতের উৎপত্তি। ইবাদতের উদ্দীপনায় নেককার ব্যক্তি ইবাদতের ক্ষেত্রে কোনো পদ্ধতি, প্রকার বা রীতিতে সুন্নাতের ব্যতিক্রম করলে তা বিদ'আতে পরিণত হয়। (৫) কবুলিয়‍্যাত বা সাওয়াবের আশাতেই বিদ'আত করা হয়, এজন্য বিদ'আত কবুল হবে না বলে বারংবার হাদীসে বলা হয়েছে এবং বিদ'আত পদ্ধতিতে বেশি ইবাদতের চেয়ে সুন্নাত পদ্ধতিতে অল্প ইবাদত বেশি গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (৬) আভিধানিকভাবে বিদ'আত নিন্দনীয় নয়, বরং তা ভাল বা মন্দ হতে পারে। তবে হাদীসে নববীতে বিদ'আত সর্বদা নিন্দনীয় এবং সকল বিদ'আতই পথভ্রষ্টতা। এর কারণ যেখানে অপূর্ণতা আছে সেখানে নতুনত্ব প্রশংসনীয়। আর যেখানে পরিপূর্ণ পূর্ণতা বিদ্যমান সেখানে পূর্ণতার অতিরিক্ত কোনো সংযোজনীর প্রয়োজন আছে মনে করার অর্থই পূর্ণকে অপূর্ণ মনে করা।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 সাহাবী-তাবিয়ীগণের বক্তব্যে বিদ‘আত

📄 সাহাবী-তাবিয়ীগণের বক্তব্যে বিদ‘আত


তাবিয়ী আব্দুর রাহমান ইবনু আব্দ আলকারী বলেন: خَرَجْتُ مَعَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ لَيْلَةً فِي رَمَضَانَ إِلَى الْمَسْجِدِ فَإِذَا النَّاسُ أَوْزَاعٌ مُتَفَرِّقُونَ يُصَلِّي الرَّجُلُ لِنَفْسِهِ وَيُصَلِّي الرَّجُلُ فَيُصَلِّي بِصَلَاتِهِ الرَّهْطُ فَقَالَ عُمَرُ إِنِّي أَرَى لَوْ جَمَعْتُ هَؤُلَاءِ عَلَى قَارِئ وَاحِدٍ لَكَانَ أَمْثَلَ ثُمَّ عَزَمَ فَجَمَعَهُمْ عَلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ ثُمَّ خَرَجْتُ مَعَهُ لَيْلَةً أُخْرَى وَالنَّاسُ يُصَلُّونَ بِصَلاةِ قَارِئِهِمْ قَالَ عُمَرُ نِعْمَ الْبَدْعَةُ هَذِهِ وَالَّتِي يَنَامُونَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنَ الَّتِي يَقُومُونَ يُرِيدُ آخِرَ اللَّيْلِ وَكَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ أَوَّلَهُ. "একদিন আমি উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সাথে রমযান মাসে মসজিদে গেলাম। সেখানে দেখলাম মানুষেরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত। কোথাও একব্যক্তি একা (তারাবীহ বা রাতের) সালাত আদায় করছে। কোথাও কয়েকজনে মিলে ছোট্ট একটি জামাতে সালাত আদায় করছে। এ দেখে উমার বললেন: আমার মনে হয় এ সকল মানুষের জন্য একজন ইমাম নিযুক্ত করে দেওয়া ভালো হবে। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। তিনি উবাই ইবনু কা'বকে ইমাম নিযুক্ত করে একত্রে (তারবীহের) সালাতের ব্যবস্থা করে দিলেন। এরপর অন্য এক রাতে যখন আমি তাঁর সাথে বের হয়েছি তখন আমরা দেখলাম সকল মানুষ একত্রে ইমামের পিছে জামাতে সালাত (তারাবীহ) আদায় করছে। এ দৃশ্য দেখে উমার বললেন: এটি একটি ভালো বিদ'আত, তবে যা থেকে এরা ঘুমিয়ে থাকে তা বেশি উত্তম। তিনি বুঝালেন যে, এ সকল মানুষ প্রথম রাতে তারাবীহ আদায় করছে, শেষ রাতে ঘুমিয়ে পড়ছে, কিন্তু শেষ রাতে তারাবীহ পড়লে তা বেশি ভালো হতো।"৯২৮ কিয়ামুল্লাইল অর্থাৎ রাতের সালাত বা তারাবীহের নিয়মিত জামাত রাসূলুল্লাহ-এর যুগে না থাকতে উমার তাকে 'বিদ'আত' বলেছেন। স্বভাবতই একান্তই আভিধানিক অর্থে তা 'বিদ'আত' বা নতুন বিষয়, কারণ দীনের মধ্যে তা নতুন নয়। এখানে আমরা কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করি: (১) রামাদানের রত্রিতে কিয়ামুল্লাইল গুরুত্বপূর্ণ মাসনূন ইবাদত। (২) কিয়ামুল্লাইলে কুরআন পাঠ ও খতম সুন্নাত-সম্মত ইবাদত। (৩) এ জন্য জামা'আত সুন্নাত-সম্মত। রাসূলুল্লাহ () কয়েকবার জামা'আতে তা আদায় করেছেন। তবে ফরয হওয়ার আশংকায় নিয়মিত জামাতে আদায় করেন নি। (৪) রামাদানের কিয়ামুল্লাইল, কিয়ামুল্লাইলে কুরআন খতম ও মাঝে মাঝে জামাতে আদায় রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাত। তা নিয়মিত জামাতে আদায়ের রীতি তাঁর সময়ে ছিল না। এজন্য উমার (রা) একে বিদ'আত বলেছেন। তিনি একে ভাল বিদ'আত বলেছেন। এখানে এ প্রশ্ন হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ সকল বিদ'আতকে বিভ্রান্তি বললেন, অথচ উমার কিভাবে একটি বিদ'আতকে ভাল বিদ'আত বললেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি আভিধানিক অর্থেই এ কর্মকে বিদ'আত বলেছেন এবং সে অর্থে একে ভাল বিদ'আত বলেছেন। পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখব যে, সুন্নাতের ব্যাখ্যা ও প্রায়োগিক ব্যতিক্রমের অধিকার রাসূলুল্লাহ খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবীগণকে দিয়েছেন এবং এরূপ কর্মকে তাঁদের সুন্নাত বলে আখ্যায়িত করেছেন। বস্তুত তাঁরা রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাত সবচেয়ে ভাল বুঝেছেন। কোন্ কাজটি রাসূলুল্লাহ বিশেষ কারণে করেন নি, তবে তাঁর পরে করা যেতে পারে, তাও তাঁরা সঠিকভাবে বুঝতেন। এ জ্ঞানের আলোকেই উমার (রা) নিয়মিত কিয়ামুল্লাইলের জামা'আতকে 'ভাল বিদ'আত' বলেছেন। সুন্নাতের আলোকে খুলাফায়ে রাশেদীনের এরূপ কর্ম এবং জাগতিক, সাংসারিক, প্রশাসনিক ইত্যাদি বিষয়ের ক্ষেত্রে নতুনত্ব ছাড়া ইবাদত বন্দেগির ক্ষেত্রে সাহাবীগণ সুন্নাতের সামান্যতম ব্যতিক্রমকে বিদ'আত বলে নিন্দা করেছেন। তাঁদের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে আমরা জানতে পারি যে, সুন্নাতের ব্যতিক্রম সকল প্রকার ইবাদত, বন্দেগি, নেককর্ম, মতামত, বিশ্বাস সবই বিদ'আত। তাঁরা সর্বদা 'সুন্নাতে'র বিপরীতে 'বিদ'আত' এবং 'ইত্তিবা' বা অনুসরণের বিপরীতে 'ইবতিদা' বা উদ্ভাবন উল্লেখ করেছেন। ইতোপূর্বে এ অর্থে কয়েকটি হাদীস আমরা দেখেছি। এক হাদীসে ইবনু মাসউদ (রা) বলেন: فَعَلَيْكُمْ بِالْعِلْمِ وَإِيَّاكُمْ وَالتَّبَعَ وَإِيَّاكُمْ وَالتَّنَطَّعَ وَإِيَّاكُمْ وَالتَّعَمُّقَ وَعَلَيْكُمْ بِالْعَتِيقِ "তোমরা অবশ্যই ইল্ম শিক্ষা করবে। আর খবরদার! তোমর কখনো বিদ'আতের মধ্যে লিপ্ত হবে না, খবরদার! তোমরা বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হবে না। খবরদার! তোমরা অতি গভীরতার চেষ্টা করবে না। বরং তোমরা প্রাচীনকে আঁকড়ে ধরে থাকবে।"৯২৯ তিনি আরো বলেন: اتَّبِعُوا وَلا تَبْتَدِعُوا فَقَدْ كُفِيتُمْ "তোমরা অনুসরণ কর, উদ্ভাবন করো না, কারণ দীনের মধ্যে যা আছে তা-ই তোমাদের জন্য যথেষ্ঠ।"৯৩০ অন্য হাদীসে তিনি বলেন: الْاقْتِصَادُ فِي السُّنَّةِ أَحْسَنُ مِنَ الْاجْتِهَادِ فِي الْبِدْعَةِ "বিদ'আত পদ্ধতিতে বেশি আমল করার চেয়ে সুন্নাতের উপর অল্প আমল করা উত্তম।"৯৩১ উসমান বিন হাদির বলেন: আমি ইবনু আব্বাস (রা)-এর নিকট গমন করি এবং তাঁকে বলি: আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বলেন: نَعَمْ، عَلَيْكَ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالاسْتِقَامَةِ، اتَّبِعْ وَلَا تَبْتَدِعْ “হাঁ, তুমি আল্লাহকে ভয় করবে, ইসলামের বিধিবিধান সুদৃঢ়ভাবে পালন করবে। তুমি অনুসরণ বা ইত্তিবা করবে, বিদ'আত উদ্ভাবন করবে না।"৯৩২ অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা) বলেন: مَا أَتَى عَلَى النَّاسِ عَامٌ إِلَّا أَحْدَثُوا فِيهِ بِدْعَةً وَأَمَاتُوا فِيهِ سُنَّةً، حَتَّى تَحْيَا الْبَدَعُ وَتَمُوْتَ السُّنَنُ "প্রতি বৎসরই মানুষ কিছু বিদ'আত উদ্ভাবন করতে থাকবে এবং সুন্নাত মেরে ফেলবে, এক পর্যায়ে শুধু বিদ'আতই বেঁচে থাকবে আর সুন্নাতসমূহ বিলীন হয়ে যাবে।"৩৩ ইমাম সূয়ূতী (রাহ) বর্ণনা করেছেন, হুযাইফা (রা) বলেন: كُلُّ عِبَادَةٍ لَمْ يَتَعَبَّدْ بِهَا أَصْحَابُ رَسُول الله ﷺ فَلَا تَتَعَبَّدُوا بِهَا، فَإِنَّ الأَوَّلَ لَمْ يَدَعْ للآخِرِ مَقَالاً، فَاتَّقُوا اللَّهَ يَا مَعْشَرَ الْقُرَّاءِ، خُذُوا طَرِيقَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ "সাহাবায়ে কেরামগণ যে ইবাদত করেননি, তোমরা কখনো সে ইবাদত করবে না। কারণ পূর্ববর্তীরা পরবর্তীদের জন্য কথা বলার (কোনো নতুন কথা বলার বা নতুন কর্ম উদ্ভাবন করার) কোনো সুযোগ রেখে যাননি। হে আল্লাহর পথের পথিকগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চল এবং তোমাদের পূর্ববর্তীগণের পথ অবলম্বন করে চল।"৯৩৪ হুযাইফাহ (রা.) দুটি পাথর নিয়ে একটিকে অপরটির উপরে রাখেন এবং সহচর তাবেয়ীগণকে প্রশ্ন করেন: তোমরা কি দুটি পাথরের মাঝখানে কোনো আলো দেখতে পাচ্ছ? তাঁরা বলেন: খুব সামান্য আলোই পাথর দুটির মধ্য থেকে দেখা যাচ্ছে। তখন তিনি বলেন: وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَتَظْهَرَنَّ الْبِدَعْ، حَتَّى لَا يُرَى مِنَ الْحَقِّ إِلَّا قَدْرُ مَا بَيْنَ هَذَيْنِ الْحَجَرَيْنِ مِنَ النُّورِ، وَاللَّهِ لَتَفْشُونَ الْبِدَعُ حَتَّى إِذَا تُرِكَ مِنْهَا شَيْءٌ قَالُوا: تُرِكَتِ السُّنَّةُ "যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম করে বলছি: বিদ'আত এমনভাবে প্রসার লাভ করবে যে, সত্য ও সঠিক মত এই দুটি পাথরের মধ্য থেকে আসা আলোর মতো ক্ষীণ হয়ে যাবে। আল্লাহর কসম, বিদ'আত এমনভাবে প্রসার লাভ করবে যে, যদি কোনো বিদ'আত বর্জন করা হয়, তাহলে সবাই বলবে: সুন্নাত বর্জন করা হয়েছে (বিদ'আতকেই সুন্নাত মনে করা হবে বা বিদ'আত পালনই সুন্নী হওয়ার আলামত বলে গণ্য হবে)। ১৯৩৫ গুদাইফ ইবনুল হারিস আস-সিমালী (রা) বলেন: بَعَثَ إِلَيَّ عَبْدُ الْمَلِكِ بْنُ مَرْوَانَ فَقَالَ يَا أَبَا أَسْمَاءَ إِنَّا قَدْ أَجْمَعْنَا النَّاسَ عَلَى أَمْرَيْنِ قَالَ وَمَا هُمَا قَالَ رَفْعُ الْأَيْدِي عَلَى الْمَنَابِرِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، وَالْقَصَصَ بَعْدَ الصُّبْحِ وَالْعَصْرِ. فَقَالَ أَمَا إِنَّهُمَا أَمْثَلُ بِدْعَتِكُمْ عِنْدِي وَلَسْتُ مُجِيبَكَ إِلَى شَيْءٍ مِنْهُمَا. قَالَ لَمَ؟ قَالَ لأَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ مَا أَحْدَثَ قَوْمٌ بِدْعَةً إِلا رُفِعَ مِثْلُهَا مِنَ السُّنَّةِ فَتَمَسُّ بِسُنَةٍ خَيْرٌ مِنْ إِحْدَاثِ بِدْعَةٌ "উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ান (খিলাফাত ৬৫-৮৬ হি./ ৬৮৪-৭০৩ খ্রি.) আমার কাছে দূত প্রেরণ করে ডেকে পাঠান এবং বলেন যে, হে আবু আসমা, আমরা দুটি বিষয়ের উপর মানুষদেরকে সমবেত করেছি (এ বিষয়ে আপনার সহযোগিতা চাচ্ছি)। গুদাইফ বললেন: বিষয় দুটি কী কী? খলীফা বললেন: বিষয় দুটি হলো: (১). শুক্রবারের দিন (জুমআর খুত্বার মধ্যে) মিম্বরে ইমামের খুৎবা প্রদানের সময় হাত তুলে দু'আ করা এবং (২). ফজর এবং আসরের সালাতের পরে গল্প কাহিনীর মাধ্যমে ওয়াজ করা। তখন গুদাইফ বললেন: নিঃসন্দেহে এই দুটি বিষয় আমার মতে তোমাদের বিদ'আতগুলির মধ্য থেকে সবথেকে ভালো বিদ'আত, তবে আমি এ দুই বিদ'আতের একটি বিষয়েও আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে তাতে অংশগ্রহণ বা সহযোগিতা করব না। খলীফা বললেন: কেন আপনি আমার কথা রাখবেন না? গুদাইফ বলেন: কারণ নবীয়ে আকরাম বলেছেন: "যখনই কোনো সম্প্রদায় কোনো বিদ'আতের উদ্ভাবন ঘটায় তখনই সেই পরিমাণ সুন্নাত তাদের মধ্য থেকে বিদায় নেয়; কাজেই একটি সুন্নাত আঁকড়ে ধরে থাকা একটি বিদ'আত উদ্ভাবন করার থেকে উত্তম।"৯৩৬ এখানে লক্ষণীয় যে, যে দুটি বিষয় গুদাইফ বিদ'আত বলেছেন দু'টি বিষয়ই শরীয়ত-সম্মত। জুমআর খুৎবা প্রদানের সময় রাসূলুল্লাহ দু'আ করতেন বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। অন্যদিকে দু'আর সময় দু হাত তুলার কথাও প্রমাণিত। খুত্বা চলাকালীন সময়ে বৃষ্টির জন্য দু'আ করতে তিনি দুহাত উঠিয়েছেন বলেও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। কাজেই, যে কোনো যুক্তি তর্কে আমরা বলতে পারি খুৎবার সময় দু'আ করা জায়েয, দু'আর সময় দু'হাত তোলাও জায়েয এবং খুৎবা চলাকালীন সময়ে সমবেতভাবে দু'হাত তুলে দু'আ করাও জায়েয। কিন্তু সাহাবী একে বিদ'আত বললেন কেন? কারণ বৃষ্টির জন্য দু'আ ছাড়া খুৎবার মধ্যে অন্য কোনো দু'আতে তিনি দুহাত উঠাতেন না, বরং শাহাদত আঙ্গুলের ইশারা করে দু'আ করতেন। আর তিনি শুধু একাই হাত তুলতেন বা ইশারা করতেন, সমবেতভাবে তা করতেন এমন কোনো ঘটনা পাওয়া যায় না। তাই তিনি রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাতের উপরেই থাকতে চাচ্ছেন। তিনি যতটুকু করেছেন তাঁর একবিন্দু বাইরে যেতে চাচ্ছেন না। মুয়ায ইবনু জাবাল (রা.) একদিন বলেন: إِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ فِتَنَّا يَكْثُرُ فِيهَا الْمَالُ وَيُفْتَحُ فِيهَا الْقُرْآنُ حَتَّى يَأْخُذَهُ الْمُؤْمِنُ وَالْمُنَافِقُ وَالرَّجُلُ وَالْمَرْأَةُ وَالصَّغِيرُ وَالْكَبِيرُ وَالْعَبْدُ وَالْحُرُّ، فَيُوشِكُ قَائِلٌ أَنْ يَقُولَ: مَا لِلنَّاسِ لا يَتَّبِعُونِي وَقَدْ قَرَأْتُ الْقُرْآنَ مَا هُمْ بِمُتَبِّعِيَّ حَتَّى أَبْتَدِعَ لَهُمْ غَيْرَهُ، فَإِيَّاكُمْ وَمَا ابْتُدِعَ فَإِنَّ مَا ابْتُدِعَ ضَلَالَةٌ. "তোমাদের সামনে অনেক ফিতনা আসছে, যখন মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে এবং কুরআন শিক্ষার পথ খুলে যাবে। মুমিন-মুনাফিক, নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, মনিব-চাকর সবাই কুরআন শিখবে। তখন হয়ত কোনো ব্যক্তি বলবে: মানুষের কী হলো, আমি কুরআন শিক্ষা করলাম অথচ তারা আমার অনুসরণ করছে না? কুরআন ছাড়া কোনো নতুন মত বা কাজ উদ্ভাবন না করলে মানুষেরা আমার অনুসরণ করবে না। (আমি এত আলেম হলাম কিন্তু আমার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না, আমার ভক্তবৃন্দের সংখ্যা বাড়ছে না। কাজেই, মানুষের মধ্যে আমার সঠিক মূল্যায়নের উপায় হলো নতুন কোনো মতামত বা পদ্ধতি উদ্ভাবন করা) খবরদার! তোমরা বিদ'আতের কাছেও যাবে না। নিঃসন্দেহে যা কিছু বিদ'আত তাই পথভ্রষ্ঠতা।"৯৩৭ এ হাদীসের আলোচনায় আল্লামা শাতিবী উল্লেখ করেছেন যে, বিদ'আতের উদ্দেশ্যই আল্লাহর ইবাদতে আধিক্য অর্জন বিদ'আতী আল্লাহর ইবাদতের দিকেই মূল দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন, ইবাদতের জন্য রাসূলুল্লাহ )ﷺ(-এর পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা জরুরী মনে করেন না। এছাড়া মানবীয় প্রকৃতি পুরাতন ও নিয়মিত কর্মে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নতুন নিয়ম পদ্ধতির মধ্যে অতিরিক্ত উদ্দীপনা ও কর্মপ্রেরণা লাভ করা যায় যা পুরাতনের মধ্যে থাকে না। এজন্য বলা হয় 'প্রত্যেক নতুনের মধ্যেই মজা'। বিদ'আতীদের তত্ত্ব এই যে, মানুষের মধ্যে অপরাধ বেড়ে গেলে যেমন অপরাধ ধরা ও বিচার করার জন্য পদ্ধতিও বেড়ে যায়, অনুরূপভাবে মানুষের মধ্যে ইবাদতে অবহেলা প্রসার লাভ করলে তাদের অবহেলা কাটাতে নতুন নতুন নিয়ম পদ্ধতি উদ্ভাবন করা প্রয়োজন। মু'আয (রা) এ বিষয়েই সাবধান করেছেন। শাতিবী বলেন, এদ্বারা বুঝা যায় যে, ইবাদতের বাইরে জাগতিক বিষয়াদির ক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবনা শরীয়তের পরিভাষায় বিদ'আত বলে গণ্য নয়। ১৩৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00