📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 একজন শীয়া আলিমের অভিব্যক্তি

📄 একজন শীয়া আলিমের অভিব্যক্তি


যুগে যুগে শীয়াগণের মধ্যে, বিশেষত মূলধারার দ্বাদশ ইমাম পন্থী শীয়াগণের মধ্যে অনেক আলিমের আবির্ভাব ঘটেছে যারা কুরআন কারীমের উপর নির্ভর করে শীয়াদের বিভিন্ন বিভ্রান্তি সংশোধন করতে চেয়েছেন। কিন্তু স্বভাবতই সাধারণ মানুষদের অতিভক্তি, অজ্ঞতা, পেটপূজারী আলিমদের বিরোধিতা ইত্যাদি কারণে তাদের চেষ্টা সফল হয় নি। আধুনিক যুগের এমন একজন সুপ্রসিদ্ধ শীয়া আলিম ইমাম ড. মূসা আল-মূসাবী। তিনি তার লেখা 'আশ-শীয়াতু ওয়াত তাসহীহ' অর্থাৎ 'শীয়াগণ ও সংস্কার' নামক গ্রন্থে শীয়াদের মধ্যে প্রচলিত অতিভক্তি ও শিরক সম্পর্কে কিছু আলোচনা করেছেন। 'আল-গুলু' বা অতিভক্তি শীর্ষক অধ্যায়ে তিনি বলেন:
অতিভক্তি বা সীমালঙ্ঘন শুরু হয় বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে এবং শেষ হয় কর্মের মধ্য দিয়ে। বিশ্বাসের সীমালঙ্ঘন হলো একজন মানুষ অন্য কোনো মানুষের বিষয়ে ধারণা করবে যে, সাধারণ মানুষ যা পারে না এমন কারামত, মুজিযা বা অলৌকিক কাজ সে করতে সক্ষম। যেমন জীবিত বা মৃত কোনো মানুষের বিষয়ে বিশ্বাস করা যে, তিনি অন্য কোনো মানুষের জীবনে দুনিয়াতে বা আখিরাতে মঙ্গল বা অমঙ্গল এনে দিতে পারেন অথবা ভাল বা মন্দ কোনো প্রভাব রাখতে পারেন।
বিশ্বাসের সীমালঙ্ঘনের মূল সূত্র আমাদের শীয়া মতাবলম্বীদের হাদীসের গ্রন্থাবলি এবং জীবনী ও গল্পমূলক গ্রন্থাবলির মধ্যে উল্লেখ কৃত গল্প-কাহিনীসমূহ। এ সকল গল্পে আমাদের ইমামগণ, আওলিয়ায়ে কেরাম ও পীর-মাশাইখের নামে অদ্ভুৎ অদ্ভুত অলৌকিক কর্ম সম্পাদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলিই কর্মের সীমালঙ্ঘনের প্রবণতা তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষেরা ইমামগণ, ওলীগণ ও পীর-মাশাইখের কবর-মাযারে যেয়ে তাদের সামনে নিজেদের দাসত্ব, অসহায়ত্ব ও ভক্তি প্রকাশ করে এবং তাদের নামে নযর-মানত পেশ করে, সরাসরি তাদের নিকট হাজত মেটানোর আবদার পেশ করে এবং আরো অগণিত এ জাতীয় কর্ম করে। এ সকল কর্মের কারণ ও উৎস এ সকল গল্প-কাহিনী।
অতিভক্তি বা সীমালঙ্ঘনের মানবীয় প্রবণতা অমুসলিমদের মধ্যেও রয়েছে। শীয়া ছাড়া অন্যান্য মুসলিম ফিরকা ও জনগোষ্ঠীর মধ্যেও তাদের ইমাম ও ওলীগণের ক্ষেত্রে এরূপ অতিভক্তি ও সীমালঙ্ঘন বিদ্যমান।... তবে এ ক্ষেত্রে শীয়াগণই অগ্রগামী এবং তারাই এ সব কিছুর সূচনা করেছে। এর কারণ হলো আমাদের পুস্তকগুলিতে যাচাই বাছাই না করে সব গল্প-কাহিনী সংকলন করা হয়েছে এবং আমাদের আলিম ও ফকীহগণ এগুলির বিষয়ে কোনো সমালোচনা বা যাচাই বাছাই মূলক কথা বলেন না।... এ সকল গল্প-কাহিনী বিশুদ্ধ না বানোয়াট সে বিতর্কে না যেয়েও সুনিশ্চিত বলা যায় যে, এগুলি সবই বুদ্ধি, বিবেক ও যুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক।....
ইমামগণ ও ওলীগণের নামে যে সকল উদ্ভট কাহিনী বানানো হয়েছে সেগুলি শুনে সন্তানহারা মায়েরও হাসি পায়। ইমাম ও ওলীদের মর্যাদা বাড়ানোর জন্য এগুলি বানানো হলেও এগুলি মূলত তাদের মর্যা হ্রাস করে।... আমাদের আলিমগণ ইমামদের ইসমাত বা নিষ্পাপত্ব ও নির্ভুলত্ব দাবি করেন। তাঁরা তাঁদের ইলম লাদুন্নী দাবি করে। আমি বুঝি না এগুলির মাধ্যমে কিভাবে মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়? একজন মানুষ কোনো পাপ করার বা ভুল করার ক্ষমতাই রাখে না। অথবা বিনা কষ্টে ইলম লাদুন্নী লাভে কিভাবে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়? মানুষের মর্যাদ তো বাড়ে নিজের চেষ্টায় পাপ থেকে বেঁচে থাকা এবং নিজের চেষ্টায় ইলম অর্জন করায়। উপরন্তু তাঁরা দাবি করেন যে ইমামগণ সকল গাইবী বিষয় জানেন। যে কুরআন মুমিনদের জন্য নূর ও জ্যোতিরূপে নাযিল হয়েছে সে কুরআনে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-এর বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি গাইব জানতেন না। তাহলে আমাদের মনগুলি কিভাবে সায় দেয় যে, আমাদের ইমামদের জন্য এমন বিশেষণ দাবি করব যা রাসূলুল্লাহ-এর বিশেষণের চেয়েও বড়?
ইমাম ড. মুসাবী বলেন: শীয়াদের মধ্যে ইমামগণ ও ওলীগণের বিষয়ে যে অতিভক্তি ও সীমালঙ্ঘন বিদ্যমান তার অন্যতম দিগগুলি নিম্নরূপ: (১) তাঁদের ইসমাত (عصمة) বা নিষ্পাপত্ব ও নির্ভুলত্ব দাবি করা (২) তাদের ইলম লাদুন্নী দাবি করা (৩) তাদের ইলহাম-ইলকা দাবি করা (৪) তাদের মুজিযা ও কারামত বা অলৌকিক ক্ষমতা দাবি করা (৫) তাদের গাইবী ইলম দাবি করা (৬) মাযারে চুমু খাওয়া এবং প্রয়োজন মেটানোর আব্দার করা
তিনি বলেন, সর্বশেষ বিষয়টি অতিভক্তি ও সীমালঙ্ঘনের ব্যবহারিক ও কর্মগত প্রকাশ। এরা ইমামগণ, ওলীগণ ও পীর-মাশাইখের কবরে যেয়ে তাদের নিকট দুনিয়া ও আখিরাতের হাজত-প্রয়োজন পেশ করছে এবং তা মেটানোর আব্দার করছে, সরাসরি তাদের নিকট ত্রাণ প্রার্থনা করছে। এছাড়া এ সকল মাজারে চুমু খাওয়ার বিষয়টিও খুবই ব্যাপক। মাজারে চুমু খাওয়ার বিষয়ে আমাদের ফকীহ ও আলিমগণের সাথে আলোচনা ও তর্ক করতে করতে আমি সত্যই বিরক্ত হয়ে গিয়েছি। তারা একই কথা বারবার বলে এরূপ কর্মের ওজর পেশ করেন। রাসূলুল্লাহ কর্তৃক হাজার আসওয়াদ বা কাবাগৃহের কাল পাথরে চুমু খাওয়ার সাথে তারা কবর চুমু খাওয়ার তুলনা করেন। অথচ রাসূলুল্লাহ-এর হাজারে আসওয়াদে চুমু খাওয়া হলো বিশেষ স্থানে ও বিশেষ ইবাদতের সুন্নাত, এটি কোনো সাধারণ অনুমোদন বা কর্ম নয়। এ বিষয়ে খলীফা উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) বক্তব্য প্রণিধান যোগ্য। তিনি হাজারে আসওয়াদের সামনে দাড়িয়ে বলেন: “হে পাথর, আমি জানি যে, তুমি পাথর ছাড়া কিছু নও, তুমি কোনো ক্ষতিও করতে পার না এবং উপকারও করতে পার না। শুধু রাসূলুল্লাহ তোমাকে চুম্বন করেছেন তাই তোমাকে চুম্বন করছি।"
এছাড়া রাসূলুল্লাহ কাউকে তাঁর হস্ত চুম্বন করতে দেন নি। বরং তিনি মুসাফাহা করতেন। এছাড়া আমরা কোথাও পড়ি নি যে, ইমাম আলী (রা) কাউকে তাঁর হস্ত বা পরিধেয় চুম্বন করতে দিয়েছেন। একব্যক্তি ইমাম জাফর সাদিকের লাঠি চুম্বন করে; কারণ লাঠিটি ছিল স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-এর। এতে রাগন্বিত হয়ে ইমাম জাফর সাদিক বলেন: "... যা তোমার কোনো ক্ষতিও করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না কেন তাকে চুম্বন করছ?"
ইমাম মুসাবী বলেন: আমি অনেক মুসলিম দেশে আওলিয়ায়ে কেরামের মাযারে গিয়েছি। সেখানে দেখেছি যে, আমাদের দেশের শীয়াগণ ইমামগণের মাযারে যা করে তারাও তথায় একই কর্ম করে। আমি বিশ্বের অনেক দেশে খৃস্টানদের গীর্জায় গিয়েছি। সেখানেও দেখেছি যে তারা একইরূপ কর্ম করে। অবিকল একইভাবে তারা ঈসা মাসীহের (আ) প্রতিকৃতি স্পর্শ করে বা মরিয়ম (আ)-এর পায়ের কাছে বসে বরকত গ্রহণ করছে। এরা মহান আল্লাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে ঈসা মসীহ ও মরিয়ম (আ) এর নিকট দুনিয়া ও আখিরাতের হাজত পেশ করছে এবং সাহায্য প্রার্থনা করছে। আমি বৌদ্ধদের, শিনটোদের, হিন্দুদের এবং শিখদের মন্দির বা ধর্মালয়ে গিয়েছি। মুসলিম সমাজের মাযারে এবং খৃস্টানদের গীর্জায় যা দেখেছি এ সকল মন্দিরে বা ধর্মালয়েও তাই দেখেছি। এরা সকলেই একই ভাবে মাযার বা প্রতিকৃতির সামনে নযর-মানত বা উৎসর্গ পেশ করছে এবং নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে দেওয়ার আব্দার করছে। মাযার-প্রতিকৃতিতে চুম্বন করছে, মাথা ঝুকিয়ে প্রণাম জানাচ্ছে এবং এগুলির সামনে বিনয়, ভক্তি ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে। এভাবে আমি দেখেছি যে, অলীক কল্পনা ও মিথ্যা ধারণার মধ্যে সাতার কাটছে মানবতা।... অথচ কুরআন এ বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে দিক নির্দেশনা প্রদান করেছে। একদিকে বারংবার উল্লেখ করেছে যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-ও কোনো গাইবী ইলম বা ক্ষমতার মালিক নন, অপরদিকে বারংবার বলা হয়েছে যে, একমাত্র মহান আল্লাহই সব জানেন এবং সব ক্ষমতার মালিক এবং কেবলমাত্র তাঁর কাছেই তোমরা সাহায্য চাও। আল্লাহ বলেছেন:
(১) "বল, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার নিজের কোনো মঙ্গল বা অমঙ্গল করার ক্ষমতাও আমার নেই। আমি যদি গাইব জানতাম তাহলে প্রভূত কল্যাণই লাভ করতাম, আর কোন অমঙ্গল আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না। আমি তো কেবলমাত্র ভয়পপ্রদর্শনকারী এবং সুসংবাদদাতা বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য।"৮২৩
(২) "বল, আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভাণ্ডারসমূহ রয়েছে, অদৃশ্য (গায়েব) সম্বন্ধেও আমি অবগত নই, আর আমি তোমাদেরকে একথাও বলি না য, আমি ফিরিশতা। আমি তো শুধুমাত্র আমার প্রতি যে ওহী প্রেরণ করা হয় তারই অনুসরণ করি।"৮২৪
(৩) “বল: আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেউই অদৃশ্য (গাইব) বিষয়ের জ্ঞান রাখে না।"৮২৫
(৪) "আমার বান্দাগণ যখন আমর সম্বন্ধে তোমাকে প্রশ্ন করে, আমি তো নিকটেই। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে তখন আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই।"৮২৬
(৫) "আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর।"৮২৭
ড. মূসাবী বলেন, এ ঘৃণ্য অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের জন্য আমাদের (শীয়া সম্প্রদায়ের) আলিমদেরই পদক্ষেপ নিতে হবে এবং আমাদের পুস্তকগুলিকে যাচাই বাছাই করে অশুদ্ধ ও জাল কাহিনীগুলি বাদ দিয়ে প্রকাশ করতে হবে। তিনি এ বিষয়ক বিভিন্ন মূলনীতি উল্লেখ করেছেন। ৮২৮

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 শিরককে বৈধতা দানের প্রবণতা

📄 শিরককে বৈধতা দানের প্রবণতা


আমরা দেখেছি যে, ইহুদী, খৃস্টান এবং মুশরিকগণ ফিরিশতাগণ, নবীগণ, জিন্নগণ ও প্রকৃত বা কাল্পনিক ওলীগণের ইবাদত করত। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এ সকল বান্দাকে মহান আল্লাহ কিছু 'ক্ষমতা' প্রদান করেছেন। এদের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে হয়। এদের সুপারিশ আল্লাহ শুনেন। এরূপ রুবুবিয়‍্যাতের শিরকের ভিত্তিতে তারা ইবাদতের শিরক করত। তারা সাধারণ বিপদ আপদ ও প্রয়োজনে এদেরকে ডাকত, এদের কাছে সাহায্য ও ত্রাণ প্রার্থনা করত, এদের নামে মানত, নযর, উৎসর্গ, কুরবানী ইত্যাদি করত, এদের মুর্তি বা স্মৃতিবিজড়িত স্থানে সাজদা করত, এদের উপর তাওয়াক্কুল করত, ভয়, ভালবাসা, আনুগত্য ইত্যাদি বিষয়ে তারা শিরক করত। ইহুদী ষড়যন্ত্রকারী এবং তাদের অনুসারী এ সকল বিভ্রান্ত শীয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা অবিকল একই যুক্তিতে এবং একই প্রকারের শিরক মুসলিম সমাজে প্রচলন করে। তবে স্বভাবতই তারা তাদের অনুসারীদের বুঝান যে, এ সকল বিষয় কখনোই শিরক নয়। বরং এগুলি নবী, নবী বংশের মানুষদের ও ওলীদের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন মাত্র। আর যারা এভাবে নবী-পরিবার, ইমামগণ বা ওলীগণের বিষয়ে 'শুভধারণা' পোষণ করে না, তাদের ডাকে না বা তাদের মাধ্যমে ছাড়া সরাসরি আল্লাহকে ডাকে তারা বেয়াদব ও নবী-বংশের অবমাননাকারী। ক্রমান্বয়ে সাধারণ মুসলিম সমাজেও এদের যুক্তিগুলি প্রচার ও প্রসার লাভ করতে থাকে। সাধারণত শিরকের দ্বারা যারা জাগতিক ভাবে লাভবান হন সে সকল মানুষেরা এবং অনেক সরলপ্রাণ নেককার মানুষ ও আলিম বিভিন্ন বিভ্রান্তির শিকার হয়ে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে এ সকল শিরককে বৈধতা প্রদান করতে থাকেন। তাদের অনেকেই দাবি করেন যে, মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাতকে প্রশংসা করেছেন এবং সর্বোত্তম উম্মাত বলেছেন। রাসূলুল্লাহ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, এ উম্মাত কিয়ামত পর্যন্ত হক্কের উপর থাকবে। এ সকল আয়াত ও হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, এ উম্মাতের মধ্যে শিরক-কুফর প্রবেশ করবে না। তৃতীয় অধ্যায়ে একটি হাদীসে আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন: “আমাকে পৃথিবীর ভাণ্ডারসমূহের চাবিগুলি অথবা তিনি বলেন, আমাকে পৃথিবীর চাবিগুলি প্রদান করা হয়েছে এবং আল্লাহর কসম, আমি এ ভয় পাই না যে, আমার পরে তোমরা শিরক করবে, বরং ভয় পাই যে, তোমরা পৃথিবীর ভাণ্ডারসমূহ নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে।" অন্য হাদীসে জাবির (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন: إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ أَيسَ أَنْ يَعْبُدَهُ الْمُصَلُّونَ فِي جَزِيرَةِ الْعَرَبِ وَلَكِنْ فِي التَّحْرِيشِ بَيْنَهُمْ "শয়তান নিরাশ হয়েছে যে, আরব উপদ্বীপে মুসাল্লীগণ তার ইবাদত করবে। তবে তাদের মধ্যে শত্রুতা ও হানাহানি থাকবে।"৮২৯ তারা দাবি করেন যে, এ সকল হাদীস প্রমাণ করে যে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে শিরক প্রবেশ করবে না। বস্তুত এসকল সাধারণ ফযীলত জ্ঞাপক আয়াত বা হাদীসের অর্থ সাধারণভাবে উম্মাতের মর্যাদা প্রকাশ করা। উম্মাতের মধ্যে কোনো কাফির, মুশরিক বা মুনাফিক থাকবে না, কেউ কুফরী, শিরক বা নিফাকে লিপ্ত হবে না এরূপ কথা এ সকল হাদীস থেকে প্রমাণ করা একান্তই বিভ্রান্তি ছাড়া কিছুই নয়। অন্যান্য অগণিত হাদীসে বিভ্রান্তির কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া ইতিহাস ও বাস্তবতা সাক্ষ্য দেয় যে, ভণ্ড নবীগণ, মুরতাদগণ ও বিভিন্ন বিভ্রান্ত সম্প্রদায় আরব উপদ্বীপে ও মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সুস্পষ্টভাবেই শয়তানের ইবাদত করেছে এবং শিরক-কুফরে লিপ্ত হয়েছে। শিরকী কর্মগুলির পক্ষে তাদের কেউ বলতে থাকেন যে, আল্লাহকে যতক্ষণ রাব্বুল আলামীন বা একমাত্র স্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান বলে বিশ্বাস করছে ততক্ষণ তাকে মুশরিক বলা যায় না। কেউ বলেন, নবী-বংশের ইমামগণ বা ওলীগণকে তো এরা স্রষ্টা বা প্রতিপালক বলে বিশ্বাস করে না, এরা স্বয়ং কোনো ক্ষমতা রাখেন তাও বলে না। বরং তারা বিশ্বাস করে যে, মহান আল্লাহর ক্ষমতাতেই তারা ক্ষমতাবান এবং আল্লাহই তাদের এরূপ ক্ষমতা দিয়েছেন। কাজেই এ বিশ্বাস শিরক নয়। আমরা দেখেছি যে, এগুলি যদি শিরক না হয় তবে ইহুদী, খৃস্টান ও আরবের মুশরিকদেরকেও মুশরিক বলা যায় না। তারা সুস্পষ্টভাবেই মহান আল্লাহকে একমাত্র প্রতিপালক ও সর্বশক্তিমান বলে বিশ্বাস করত এবং শরীকগণকে আল্লাহই ক্ষমতা দিয়েছেন বলে দাবি করত। কিন্তু কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং প্রচলিত বিভিন্ন মতামতের প্রাধান্যের কারণে অনেকেই এরূপ মত প্রকাশ করেছেন। অনেকে বলেছেন যে, এরা যখন ইমামগণ বা ওলীগণকে ডাকে বা তাদের কাছে গাইবী সাহায্য চায় তখন মূলত আল্লাহর কাছেই চায়, এ সকল নেক মানুষের নাম নিয়ে মূলত এদের ওসীলা দিয়ে তারা আল্লাহর কাছে চায়। আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, কারো ওসীলা দিয়ে আল্লাহর কাছে চাওয়া আর কারো কাছে চাওয়ার মধ্যে আসমান ও জমিনের পার্থক্য। কেউ যদি বলে, হে আল্লাহ, আলী (রা) বা অমুকের ওসীলায় আপনি আমার প্রয়োজন মিটিয়ে দিন, তবে সে মূলত আল্লাহর নিকটেই চাচ্ছে, ওসীলা পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা পরে আলোচনা করব। আর যে বলছে, হে আলী, হে আবুল খামীস, হে আব্বাস, হে অমুক আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করুন, সে মূলত তার আহবানকৃত ব্যক্তিকে গাইবী জ্ঞান ও ক্ষমতার অধিকারী বলে বিশ্বাস করছে তার ইবাদত করছে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 সুন্নাতই নাজাতের একমাত্র সুনিশ্চিত পথ

📄 সুন্নাতই নাজাতের একমাত্র সুনিশ্চিত পথ


সবচেয়ে বড় কথা যে, এ সকল বিশ্বাস ও কর্মের প্রয়োজন কী? কুরআনে কি এরূপ বিশ্বাস বা কর্মের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে? রাসূলুল্লাহ কি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন? কুরআনে ও হাদীসে যতটুকু আছে তার অতিরিক্ত কিছু বলার দরকার কী? সাহাবীগণ কি এরূপ করতেন? নবী, ওলী, কারামত, আহলু বাইত ইত্যাদির বিষয়ে সাহাবীগণ কি বলতেন? কি করতেন? কিভাবে তাঁরা ভক্তি প্রকাশ করতেন? অবিকল তাঁদের মত বিশ্বাস ও কর্ম নিয়ে কি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সকল কল্যাণ লাভ সম্ভব নয়? যদি সম্ভব হয় তবে অন্য কিছুর প্রয়োজন কী?
বস্তুত, মুমিনের নাজাতের একটিই পথ, তা হলো, কুরআন ও সুন্নাতের পথে ফিরে আসা। বিশ্বাসে, কর্মে ও কথায় সুন্নাত ও সাহাবীগণের হুবহু অনুসরণই নাজাতের একামত্র সুনিশ্চিত পথ। সুন্নাতের পরিচয়, গুরুত্ব ও প্রকারভেদ সম্পর্কে আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করব, ইনশা আল্লাহ।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবীর অভিমত

📄 শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবীর অভিমত


শীয় সমাজগুলিতে এবং অন্যান্য সমাজে প্রচলিত শিরকী বিশ্বাস ও কর্ম সম্পর্কে শীয়া ইমাম ড. মূসা আল-মুসাবীর বক্তব্য আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি। 'সুন্নী' সমাজগুলির মধ্যে প্রচলিত শিরকের উন্মেষ ও প্রচলন সম্পর্কে শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভীর (রাহ) কিছু বক্তব্য আমরা আলোচনা করব।
তিনি তাঁরা 'আল-ফাওযুল কাবীর' গ্রন্থে তিনি আরবের মুশরিকদের শিরক বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: "শিরক হলো আল্লাহর জন্য নির্ধারিত কোনো বিশেষণ বা গুণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো মধ্যে বিদ্যমান বলে বিশ্বাস করা। যেমন নিজের ইচ্ছায় সৃষ্টিজগতের পরিচালনার ক্ষমতা, যে ক্ষমতাকে 'হও বললে হয়ে যাওয়া' বলা হয়, অথবা নিজস্ব ইলম বা জ্ঞান, যে জ্ঞান চেষ্টা করে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অর্জিত নয়, জ্ঞানবুদ্ধির প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত নয়, বা স্বপ্ন বা ইলহামের মাধ্যমেও প্রাপ্ত নয়, বা অনুরূপ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা আত্মীক কোনো সূত্র বা মাধ্যম ছাড়া নিজস্ব সত্তাগত জ্ঞান, অথবা অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করার ক্ষমতা, অথবা কারো উপর অলৌকিক ক্রোধ বা অভিশাপের ক্ষমতা, যে ক্রোধ বা অভিশাপের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দরিদ্র, অসুস্থ বা হতভাগ্য হয়ে যাবে, অথবা কোনো ব্যক্তিকে করুণা করার বা তার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার ক্ষমতা যে করুশা বা সন্তুষ্টির কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ধনী, সুস্থ বা সৌভাগ্যবান ও নিরাপদ হয়ে যাবে। এ সকল মুশরিক বিশ্বসৃষ্টির ব্যাপারে এবং বিশ্বের বৃিহৎ বিষয়গুলি পরিচালনার ব্যপারে আল্লাহর কোনো শরীক আছে বলে বিশ্বাস করত না। তারা একথাও স্বীকার করত যে, আল্লাহ যদি কোনো কিছুর সিদ্ধান্ত নেন বা কোনো বিষয় নির্ধারণ করেন তবে তা পরিবর্তন বা রোধ করার ক্ষমতাও কারোরই নেই। তারা কেবলমাত্র বিশেষ কিছু বিষয়ে কিছু বান্দাকে শরীক করত। কারণ তারা মনে করত যে, একজন মহারাজ তার দাসদেরকে এবং তার নিকটবর্তী প্রিয় মানুষদেরকে তার রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় কিছু ছোটখাট দায়িত্ব পালনের জন্য প্রেরণ করেন এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এসকল ছোটখাট বিষয় নিজেদের ইচ্ছামত পরিচালনা করার ক্ষমতা তাদেরকে প্রদান করেন। এ জন্য তারা মনে করত যে, এ সকল নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের নৈকট্যলাভের চেষ্টা করা জরুরী, যেন তা প্রকৃত মহারাজের নিকট তাদের কবুলিয়‍্যাতের ওসীলা হতে পারে। আর হিসাব ও প্রতিফলের সময় এদের শাফা'আত মহান আল্লাহর দরবারে কবুলিয়াত ও গ্রহণযোগ্যতা পাবে। ..... হে পাঠক, মুশরিকদের আকীদা ও কর্ম সম্পর্কে এ সকল বিবরণের সত্যতা সম্পর্কে যদি আপনি নিশ্চিত হতে চান তবে এ যুগের কুসংস্কারগ্রস্ত ও বিভ্রান্ত মানুষদের দিকে দৃষ্টিপাত করুন। বিশেষ করে যার মুসলিম দেশের প্রান্তে বা সীমান্তে বসবাস করে। লক্ষ্য করে দেখুন যে, ওলী বা বেলায়াত সম্পর্কে তাদের ধারণা কি? তারা প্রাচীন ওলীগণের বেলায়াতের স্বীকৃতি দেয় কিন্তু বর্তমানে আর এভাবে ওলী হওয়া তারা সম্ভব বলে মনে করে না। তারা কবর ও ওলীদের দরজায় যেয়ে পড়ে থাকে এবং বিভিন্ন প্রকারের শিরক, বিদ'আত ও ভিত্তিহীন কুসংস্কারের মধ্যে তারা নিমগ্ন। আরবের মুশরিকগণ যেভাবে ইবরাহীম (আ)-এর দীনকে বিকৃত করেছিল এবং মহান আল্লাহকে মানুষের সাথে তুলনা করেছিল অনুরূপ বিকৃতি ও তুলনার মধ্যে এরা আকণ্ঠ নিমজ্জিত। রাসূলুল্লাহ বলেছেন: "তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতি অনুসরণ করবে।"৮৩০ এ হাদীসটি এদের বিষয়ে পুরোপুরিই খাটে। পূর্ববর্তী মুশরিকগণ যত প্রকারের বিভ্রান্তি বা ফিতনায় নিপতিত হয়েছিল সেগুলির সবই মুসলিম নামধারী কোনো না কোনা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান। তারা এসকল শিরকের গভীরে নিমজ্জিত রয়েছে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন।"৮৩১ এরপর তিনি কুরআনের আলোকে ইহুদীদের বিভ্রান্তি আলোচনার পর বলেন: “সর্বাবস্থায়, পাঠক যদি ইহুদীদের এ সকল বিভ্রান্তির নমুনা মুসলিম উম্মাহর মধ্য দেখতে চান তবে অসৎ আলিমগণ এবং দুনিয়ার স্বার্থের অনুসন্ধানকারীদের দিকে তাকান। পিতা-পিতামহদের অন্ধ অনুকরণ এদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়কর্ম। মহান আল্লাহর কিতাব ও তাঁর মহান রাসূলের সুন্নাত এরা ততটা গুরুত্ব দেয় না। আলিমগণ নিজস্ব মতামত, যুক্তিতর্ক, অকারণ বাড়াবাড়ি ও গভীরতার নামে সে সকল মতামত প্রকাশ করেছেন সেগুলিই তাদের দলিল, অথচ কুরআন ও সুন্নাতে এ সকল মতামতের কোনোরূপ সূত্র বা ভিত্তি পাওয়া যায় না। এরা রাসূলুল্লাহ-এর প্রমাণিত ও সহীহ বাণী বাদ দিয়ে জাল, বানোয়াট বা মাউযূ হাদীসের উপর নির্ভর করে এবং ভিত্তিহীন বাজে ব্যাখ্যা ও তাফসীরের পিছনে দৌড়ায়। ৮৩২ এরপর তিনি কুরআনের আলোকে খৃস্টানদের বিভ্রান্তি আলোচনা করে বলেন: "আপনি যদি এ সকল বিভ্রান্ত পথভ্রষ্টদের নমুনা নিজের কাওমের মধ্যে দেখতে চান তবে আপনার সমাজের 'ওলী-আল্লাহ'দের সন্তানদের অনেকের দিকে তাকান। তাদের বিষয়ে এদের ধারণা ও আকীদা পর্যালোচনা করুন। তাহলে বুঝতে পারবেন যে, কোন্ পর্যায়ে এরা পৌঁছেছে। 'আর অচিরেই জালিমগণ জানবে যে, তাদের কি পরিণতি হবে ৮৩৩।৮৩৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00