📄 যিনি একমাত্র রাবব তিনিই একমাত্র ইলাহ
কুরআন কারীমের প্রায় প্রতি পৃষ্ঠাতেই বিভিন্নভাবে মুশরিকদের বিভ্রান্তি খণ্ডন করা হয়েছে এবং তাদের কর্মের অযৌক্তিকতা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এ সকল যুক্তি ও আলোচনা বিস্তারিত জানতে হলে অর্থ অনুধাবন-সহ কুরআন পাঠই আমাদের মূল করণীয়। এখানে অতি সংক্ষেপে কুরআনের এ বিষয়ক আলোচনার কয়েকটি দিক উল্লেখ করব। আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, কুরআনে অধিকাংশক্ষেত্রে দু শ্রেণীর মুশরিকের আকীদা খণ্ডন করা হয়েছে: (১) আরবের মুশরিকগণ এবং (২) ইহুদী-খৃস্টানগণ।
আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, প্রথম দলের মুশরিকগণ একবাক্যে স্বীকার করত যে, মহান আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান ও সার্বভৌম মালিক এবং তিনি কল্যাণ বা অকল্যাণের কোনো ফয়সালা দিলে তা রোধ করার ক্ষমতা কোনো উপাস্যেরই নেই। তবে সাধারণ অবস্থাতে এরা কিছু কল্যাণের ক্ষমতা রাখে যে ক্ষমতা তাদেরকে আল্লাহই ভালবেসে দিয়েছেন। এদের ডাকলে আল্লাহ খুশি হন এবং এদের সুপারিশ আল্লাহ ফেলেন না।
এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে তারা ফিরিশতা, জিন্ন, পূর্ববর্তী কোনো কোনো নবী-রাসূল এবং অনেক প্রতিমা-মুর্তি ও প্রতিকৃতির ইবাদত করত।
দ্বিতীয় দলের মানুষেরাও আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস করত। খৃস্টানগণ ঈসা (আ)-এর বিষয়ে বিভিন্ন অতিভক্তিমূলক বিশ্বাসের কারণে শিরক করত। এছাড়া মরিয়ম (আ)-এর ও ইবাদত করত। উপরন্তু অনেক সাধু, সেন্ট বা সান্তার ভক্তির নামে তারা তাদের ইবাদত করত।
১৯৭
এদের শিরকের অযৌক্তিকতা বর্ণনায় কুরআনের যুক্তির মধ্যে রয়েছে: রুবুবিয়্যাত যেহেতু একমাত্র আল্লাহর সেহেতু অন্যের ইবাদত একেবারেই অযৌক্তিক। যার মধ্যে চূড়ান্ত রুবুবিয়্যাতের বা প্রতিপালন, সংহার, সংরক্ষণ ইত্যাদির ক্ষমতা নেই তার নিকট চূড়ান্ত ভক্তি বা বিনয় প্রকাশের মত পাগলামি আর কি হতে পারে। আমরা কুরআনের এ বিষয়ক কিছু যুক্তি ও আলোচনা ইতোপূর্বে দেখেছি। মুশরিকদের সকল উপাস্যের ক্ষেত্রেই এ বিষয়টি সমভাবে প্রযোজ্য। মুর্তি, প্রতিমা, ফিরিশতা, নবী, ওলী, জিন্ন বা অন্য সকলের ক্ষেত্রেই মুশরিকগণ একবাক্যে স্বীকার করত যে, এরা কেউ স্রষ্টা নন, একটি মাছিও এদের কেউ সৃষ্টি করেন নি এবং সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একক ক্ষমতা আল্লাহরই।
📄 মানুষ তার দাসকে ক্ষমতার শরীক বানায় না
কোথাও কোথাও মানবীয় যুক্তিতেই তাদের দাবির অসারতা ফুটিয়ে তুলা হয়েছে। মুশরিকগণও স্বীকার করে এবং করত যে, যাদের তারা ডাকে তারা আল্লাহর বান্দা ও আল্লাহর মালিকানাধীন, তবে আল্লাহ তাদের ভালবাসেন, ফলে তারা আল্লাহর মাহবুব, প্রিয় বা ওলী। কাজেই মহান আল্লাহ তাঁর অলৌকিক বিশ্বপরিচালনা শক্তি তাদেরকে দান করেছেন। মহান আল্লাহ জানিয়েছেন, তাদের এ চিন্তাটিই মূলত অসার, অলীক ও অযৌক্তিক। আল্লাহর প্রিয়গণ বা মাহবূবগণ তার চাকর। একজন মানুষ বন্ধুর সাথে অন্য মানুষ বন্ধুর যে সম্পর্ক এখানে সেরূপ সম্পর্ক নয়। বরং একজন ভাল চাকরের সাথে একজন মালিকের যে সম্পর্ক এখানে সেরূপ সম্পর্ক। মালিক চাকরকে ভালবাসতে পারে, কিন্তু নিজের সম্পদের মালিকানা বা অধিকার দিবে কেন?
وَاللَّهُ فَضَّلَ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ فِي الرِّزْقِ فَمَا الَّذِينَ فُضِّلُوا بِرَادِّي رِزْقِهِمْ عَلَى مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَهُمْ فِيهِ سَوَاءٌ أَفَبِنِعْمَةِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ "আল্লাহ রিযকের ক্ষেত্রে তোমাদের কাউকে কারো উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে তারা তাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদেরকে নিজেদের রিস্ক বণ্টন করে দেয় না যে তারা তাতে সমান হয়ে যাবে। তবে কি তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করে?" অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
ضَرَبَ لَكُمْ مَثَلًا مِنْ أَنْفُسِكُمْ هَلْ لَكُمْ مِنْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ مِنْ شُرَكَاءَ فِي مَا رَزَقْنَاكُمْ فَأَنْتُمْ فِيهِ سَوَاءٌ تَخَافُونَهُمْ كَخِيفَتِكُمْ أَنْفُسَكُمْ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ "আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে একটি দৃষ্টান্ত প্রদান করছেন: তোমাদের আমি যে রিস্ক দিয়েছি তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের কেউ কি তাতে অংশীদার? ফলে তোমরা কি এ ব্যাপারে সমান? তোমরা কি তাদেরকে সেরূপ ভয় কর যেরূপ তোমরা নিজেদেরকে ভয় কর? এভাবেই আমি বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের নিকট নিদর্শনাবলি বিবৃত করি।" মানুষ নিজেই যখন নিজের কোনো ক্রীতদাসকে নিজের সম্পত্তির বা ক্ষমতার শরীক করে না, তখন কেন আল্লাহ সর্বশক্তিমান তার কোনো সৃষ্ট দাসকে তার শরীক বানাবেন? যাদেরকে আল্লাহর বদলে ডাকা হয় তাদের ক্ষমতা ও অধিকার যদি আল্লাহর ইচ্ছাধীনই হয় তবে আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের ডাকার দরকার কি?
📄 ক্ষমতা আল্লাহর কাজেই অন্যের ইবাদত কেন?
যদি যুক্তির খাতিরে ধরে নেওয়া হতো যে, মহান আল্লাহ প্রতিপালনক ও সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান হলেও অন্য কারো কারো অল্প সল্প কিছু ক্ষমতা আছে তবুও যুক্তির দাবি হত যে, তাদেরকে বাদ দিয়ে একমাত্র আল্লাহকেই ডাকতে হবে। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা এই যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কোনোরূপ অলৌকিক ক্ষমতা নেই। আর যাদের কোনো ক্ষমতা নেই তাদের ইবাদত করা বা তাদের কাছে ভয়-ভক্তি মিশ্রিত চূড়ান্ত অসহায়ত্ব ও বিনয় প্রকাশ করার চেয়ে পাগলামি আর কিছুই হতে পারে না। এ বিষয়ক অনেক আয়াত আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি। এক আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
مَا يَفْتَحِ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا وَمَا يُمْسِكْ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِنْ بَعْدِهِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ "আল্লাহ মানুষের প্রতি কোনো অনুগ্রহ অবারিত করলে কেউ তা নিবারণ করতে পারে না এবং তিনি কিছু নিরুদ্ধ করতে চাইলে তা উন্মুক্ত করার মতও কেউ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।"
📄 আল্লাহ কোনো বান্দাকে ক্ষমতা দিয়েছেন তার প্রমাণ কি?
আমরা দেখেছি যে, কাফিরগণ সবকিছু স্বীকার করার পরেও দাবি করত যে, মহান আল্লাহ এদেরকে কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন। এদের ইবাদতে খুশি হয়ে তিনি এদেরকে কিছু ক্ষমতা-অধিকার দিয়েছেন, যেমন রাজা-মহারাজা তার প্রিয় খাদেম বা দাসকে অনেক সময় খুশি
১৯৮
হয়ে আঞ্চলিক শাসক বানিয়ে দেন বা কিছু ক্ষমতা দিয়ে দেন। কুরআন কারীমের বিভিন্নভাবে কাফিরদের এ দাবির অসারতা প্রমাণ করা হয়েছে।
কোথাও তাদের কাছে দলিল চাওয়া হয়েছে, তোমরা ওহীর আয়াত থেকে প্রমাণ দেখাও, কবে, কোথায় কোন্ ফিরিশতা, নবী, ওলী বা ব্যক্তিকে আল্লাহ কোনো ক্ষমতা দিয়েছেন? এ বিষয়ক কিছু আয়াত আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি। এ অর্থের এক আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ أَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَرُونِي مَاذَا خَلَقُوا مِنَ الْأَرْضِ أَمْ لَهُمْ شِرْكٌ فِي السَّمَاوَاتِ ائْتُونِي بِكِتَابٍ مِنْ قَبْلِ هَذَا أَوْ أَثَارَةٍ مِنْ عِلْمٍ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ "বল, 'তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তাদের কথা ভেবে দেখেছ কি? তারা পৃথিবীতে কী সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও, অথবা আকাশমণ্ডলীতে তাদের কোনো অংশীদারিত্ব আছে কি? পূর্ববর্তী কোনো কিতাব অথবা পরম্পরগত কোনো জ্ঞান থাকলে তা তোমরা আমার নিকট উপস্থিত কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।"
স্বভাবতই তারা এরূপ কোনো দলিল উপস্থাপনের অক্ষম ছিল। এক্ষেত্রে তারা অমুক বলেছেন, সমাজের সকলেই বলে, সকলেই করে, পিতাপিতামহগণ করেছেন ইত্যাদিকে দলিল হিসেবে পেশ করত। এমনকি খৃস্টানগণও কখনো তাদের প্রচলিত বাইবেল থেকে একটি দ্ব্যর্থহীন দলিলও পেশ করতে পারে নি, যাতে ঈসা মসীহ (আ) বলেছেন যে, তোমরা আমার ইবাদত করবে, বা আল্লাহকে পেতে হলে আমার ইবাদত করতে হবে, অথবা আমার মধ্যকার যে পুত্রসত্তা আছে তোমরা তার ইবাদত করবে। তিনি সর্বদা একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের কথা বলেছেন।