📄 নেতৃবৃন্দের অন্ধ আনুগত্য
অনেক সময় ব্যক্তি মানুষ নিজের বিবেক ও বুদ্ধি দিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু সমাজের নেতৃবৃন্দের অনুকরণ-প্রিয়তা বা তাদের বিরোধিতার অনাগ্রহ তাকে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে।
একজন সাধারণ মুশরিক যখন কুরআনের যুক্তিগুলি নিয়ে চিন্তা করে তখন শিরকের অসারতা ও তাওহীদের আবশ্যকতা বুঝতে পারে। মহান আল্লাহই একমাত্র প্রতিপালক ও সর্বশক্তিমান। তাঁর ইচ্ছার বাইরে কারো কিছু করার ক্ষমতা নেই। কাজেই তাকে ছাড়া অন্যকে ডাকার, সাজদা করার, মানত করার, নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করার দরকার টা কি? আমরা দাবি করছি যে, মহান আল্লাহ কোনো কোনো বান্দাকে কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন, কিন্তু এ দাবি আমরা ওহীর মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারছি না। তিনি কাউকে কোনো ক্ষমতা দিয়েছেন বলে কোথাও বলেন নি। তিনি তার কোনো নবী বা প্রিয় বক্তিত্বকে ডাকতেও নির্দেশ দেন। তিনি কোথাও বলেন নি যে, অমুক নবী, ফিরিশতা বা অমুক ব্যক্তিকে ডাক এবং তার কাছে সাহায্য চাও, মানত কর, ভেট দাও, তাহলে আমি খুশি হব। বরং তিনি বারংবার বলছেন যে, আমাকে ছাড়া কাউকে ডেক না। কেবল আমাকেই ডাক আমিই সব প্রয়োজন মেটাতে পারি। কাজেই আমি কেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকব বা তার ইবাদত করব? সকল যুক্তি ও বিবেকের দাবি তো এই যে, আমি শুধু মহান আল্লাহরই ইবাদত করব।
এভাবে একজন সাধারণ তার নিজের বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে শিরকের অসারতা বুঝতে পারে। কিন্তু সে তার এ চিন্তা ধর্মগুরু বা সমাজপতির মতামতের বিরুদ্ধে প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করে অথবা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। অথবা এরূপ ধর্মগুরু বা সমাজপতিদের কাছে তার চিন্তা প্রকাশ করলে তারা বলে, আরে বাদ দে ওসব কথা! যারা পিতাপিতামহদের ধর্ম পরিত্যাগ করে নতুন কথা বলছে তাদের মত বেয়াদবদের কথায় কান দিবি না। যুগ যুগ ধরে সকলেই করছে, কেউ কিছু বুঝল না আর তুমি বেশি বুঝলে। অমুক, অমুক, তমুক বুজুর্গ, পাদরি, যাজক, ধর্মগুরু এরূপ বলেছেন ও করেছেন, তাদের কথা তোমার ভাল লাগে না! এরূপ করে অমুক এত কিছু পেয়েছেন, বেয়াদবি করে অমুক অমুক শাস্তি পেয়েছে, কাজেই সাবধান!! ইত্যাদি বিভিন্ন যুক্তির কাছে দুর্বল চিত্ত মানুষের বিবেক খেই হারিয়ে ফেলে। সে নিজের বিবেকের ডাক প্রত্যাখ্যান করে সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে থাকে। এদের অবস্থা বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেন:
إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الأَسْبَابُ وَقَالَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُوا مِنَّا "যখন অনুসৃতগণ অনুসরণকারিগণ সম্বন্ধে দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকার করবে এবং তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে এবং তাদের মধ্যকার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। এবং যারা অনুসরণ করেছিল তারা বলবে, 'হায়! যদি একবার আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটত তবে আমরাও তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করতাম যেমন তারা আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন করল।" অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
১৯৬
وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ مَوْقُوفُونَ عِنْدَ رَبِّهِمْ يَرْجِعُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ الْقَوْلَ يَقُولُ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لَوْلَا أَنْتُمْ لَكُنَّا مُؤْمِنِينَ. قَالَ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لِلَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا أَنَحْنُ صَدَدْنَاكُمْ عَنِ الْهُدَى بَعْدَ إِذْ جَاءَكُمْ بَلْ كُنْتُمْ مُجْرِمِينَ. وَقَالَ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا بَلْ مَكْرُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِذْ تَأْمُرُونَنَا أَنْ نَكْفُرَ بِاللَّهِ وَنَجْعَلَ لَهُ أَنْدَادًا "তুমি যদি দেখতে জালিমদেরকে যখন তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে তাদেরকে দণ্ডায়মান করা হবে, তখন তারা পরস্পর বাদ-প্রতিবাদ করবে। যাদেরকে দুর্বল মনে করা হতো তারা ক্ষমতাদর্পীদেরকে বলবে, তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই মুমিন হতাম। যারা ক্ষমতাদর্পী ছিল তারা দুর্বলদেরকে বলবে, 'তোমাদের নিকট সৎপথের দিশা আসার পর কি আমরা তোমাদেরকে তা থেকে বিবৃত্ত করেছিলাম? বস্তুত তোমরাই ছিলে অপরাধী। দুর্বলরা ক্ষমতাদর্পীদেরকে বলবে, 'প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিবারাত্র চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে যেন আমরা আল্লাহকে অমান্য করি এবং তার শরীক স্থাপন করি।"
📄 ইবাদতের অর্থ সম্পর্কে বিভ্রান্তি
ইতোপূর্বে আমরা খৃস্টানদের শিরকের বিষয়েও কুরআনের বিশ্লেষণ আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি যে, ওহীর সাথে নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা সংযোগ করে ব্যাখ্যাকে বিশ্বাসে পরিণত করে তারা শিরকে নিমজ্জিত হয়। তাদের শিরকের ক্ষেত্রে কুরআন কারীমে অন্য একটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। ত্রিত্ববাদ ও ঈসা (আ)-এর ঈশ্বরত্ব ছাড়াও তারা ঈসা (আ)-এর মাতা মারিয়াম (আ)-কে মা'বুদ হিসেবে গ্রহণ করেছে বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ "আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারয়াম তনয় ঈসা, তুমি কি মানুষদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর?" খৃস্টান ধর্মগুরুগণ দাবি করেন যে, সাধারণ খৃস্টানগণ কখনোই মরিয়মকে ত্রিত্ববাদের অংশ বা ঈশ্বর হিসেবে বিশ্বাস করেন না। বরং তারা তাকে মানুষ ও যীশুর মাতা হিসেবে 'ভক্তি' করেন, তার নামে মানত করেন, ভক্তির প্রকাশ হিসেবে তার নামে উৎসর্গ করেন বা তার মুর্তি তৈরি করে রাখেন। কিন্তু কখনোই তারা তাকে 'ঈশ্বর' বলে মনে করেন না, ঈশ্বরের কোনো অংশ বলেও মনে করেন না।
বস্তুত 'ইবাদতের' ধারণা সম্পর্কে অজ্ঞতাই তাদের এ সকল প্রলাপের কারণ। প্রকৃতপক্ষে তারা 'ভক্তি', 'শ্রদ্ধা' ইত্যাদির নামে তারা 'মরিয়ম' (আ)-এর ইবাদত করত। আমরা ইতোপূর্বে ইবাদতের অর্থ আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি যে, অলৌকিক বা অপার্থিব প্রার্থনাই ইবাদতের মূল ও প্রধান প্রকাশ। আর প্রার্থনা বা দু'আর কবুলিয়্যাতের জন্য মানত, নযর, উৎসর্গ, সাজদা ইত্যাদি করা হয়। খৃস্টানগণ এভাবেই মারইয়াম (আ)-এর ইবাদত করে। তারা তাঁকে আল্লাহ বা স্রষ্টা বলে দাবি করে না। তবে 'ঈশ্বরের মাতা' বা 'আল্লাহর বিশেষ করুশা-প্রাপ্ত মানুষ হিসেবে' ফিলিস্তিনে তাঁর কবরে এবং সকল গীর্জায় তাঁর মুর্তি তৈরি করে মুর্তির সামনে তাদের হাজত বা প্রয়োজন মেটানোর জন্য অলৌকিক সাহায্যের আশায় তাঁরা কাছে প্রার্থনা করে। আর প্রার্থনা যেন 'মা-মেরী' তাড়াতাড়ি পূরণ করেন সে আশায় তার নিকট মানত, নযর ইত্যাদি পেশ করে বা সাজদা করে পড়ে থাকে।