📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 গাইরুল্লাহর সাজদা

📄 গাইরুল্লাহর সাজদা


৫. ৩. ২. ২. ইবাদতের শিরক
ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি যে, যুগে যুগে মুশরিকগণ মূলত ইবাদতের শিরকেরই বেশি লিপ্ত হয়েছে। বিভিন্ন ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করেছে। বস্তুত মানুষের মুর্খতা ও মানবীয় দুর্বলতা তাকে প্ররোচিত করে বিপদে আপদে 'মূর্ত', 'দৃশ্যমান' বা হাতের নাগালে পাওয়া কারো কাছে নিজের অসহায়ত্ব পেশ করে বিপদ থেকে উদ্ধারের আবেদন করা। মানুষ বিপদে-আপদে, দুঃখে-কষ্টে মহান আল্লাহর কাছে নিজের বিপদের কথা বলে আকুতি জানায়। কিন্তু অনেক সময় মানুষের দুর্বলতা ও অস্থিরচিত্ততা এভাবে অদৃশ্য প্রতিপালককে ডেকে তৃপ্ত হয় না। কি জানি তিনি শুনলেন তো! আমার সমস্যাটা দূর হবে তো! শয়তান এরূপ অস্থিরচিত্ততা ও দুর্বলতার সুযোগে মানুষকে প্ররেচিত করে মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত 'দৃশ্যমান', বা 'হাতের নাগালে পাওয়া যায়' এমন কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর কাছে নিজের চূড়ান্ত ভক্তি ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে। বান্দা ভাবে এতে হয়ত দ্রুত তার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে সে তার এরূপ কর্মকে বৈধ বলে প্রমাণ করতে চায়।
এরূপ ব্যক্তি কখনোই এ সকল ব্যক্তি বা বস্তুকে স্রষ্টা, প্রতিপালক বা ঈশ্বর বলে বিশ্বাস করে না, বরং মহান স্রষ্টার সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণেই এ সকল ব্যক্তি বা বস্তুর কাছে ভক্তির অর্ঘ্য, বিনয় ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। এভাবেই ইবাদতের শিরক যুগে যুগে বিভিন্ন আসমানী ধর্মের অনুসারী এবং অন্যান্যদের মধ্যে প্রসার লাভ করেছে।
আমরা ইতোপূর্বে ইবাদতের সংজ্ঞা এবং প্রকৃতি জেনেছি। কুরআন ও হাদীসে বিভিন্ন ইবাদতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলি মুশরিকগণ আল্লাহ ছাড়া অন্যদের জন্য পালন করত। কুরআন ও হাদীসে এগুলি একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য পালন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা এখানে এ সকল ইবাদতের বিষয়ে আলোচনা করব, ইনশা আল্লাহ।
সাজদা করা ইবাদতের একটি সর্বজনীন প্রকাশ। চূড়ান্ত ভক্তি বা অলৌকিক ভক্তির প্রকাশ হিসেবেই শুধু সাজদা করা হয়। চাঁদ, সূর্য, প্রতিমা, ইত্যাদি সকল উপাস্যকে সাজদার মাধ্যমে ইবাদত করে মুশরিকগণ। কুরআন কারীমে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্যকে সাজদা করতে নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
لَا تَسْجُدُوا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَهُنَّ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ "তোমরা সূর্যকে সাজদা করো না, চন্দ্রকেও নয়, সাজদা কর আল্লাহকে, যিনি এগুলি সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদত কর।" আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখব যে, সাজদা, উৎসর্গ ইত্যাদি ইবাদতের উদ্দেশ্যও 'দু'আ' বা 'ডাকা'। যাকে ডাকা হচ্ছে বা যার কাছে অলৌকিক প্রর্থনা করা হচ্ছে তিনি যেন খুশি হয়ে তাড়াতাড়ি সাড়া দেন সেজন্যই সাজদা। এজন্য মহান আল্লাহ বলেন:
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا "এবং এই যে, সাজদা করার কর্মসগুলি বা সাজদার স্থানসমূহ আল্লাহরই জন্য; সুতরাং তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না।"

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 গাইরুল্লাহর জন্য উৎসর্গ জবাই মানত

📄 গাইরুল্লাহর জন্য উৎসর্গ জবাই মানত


উৎসর্গ করা (sacrifice) ইবাদতের একটি সর্বজনীন প্রকাশ। জীব জানোয়ার উৎসর্গ করা হলে আমরা সাধারণত কুরবাণী দেওয়া, বলি দেওয়া বা জবাই করা বলি। খাদ্য, ফসল, ফুল ইত্যাদী উৎসর্গ করা হলে সাধারণ ভাবে বাংলাদেশের মুসলিম পরিভাষায় মান্নত, সদকা ইত্যাদি বলা হয়। যুগে যুগে বিভিন্ন সমাজের মানুষেরা আল্লাহকে বা তাদের অন্যান্য উপাস্যকে খুশী করার জন্য, তাদের বর, আশীর্বাদ বা করুণা পাওয়ার জন্য বা তাদের প্রতি অন্তরের ভক্তি প্রকাশের জন্য জীব জানোয়ার, ফল-ফসল, ফুল-ফল খাদ্য ইত্যাদী
১৮-৪
উৎসর্গ করেছেন, বলি দিয়েছেন বা ভেট দিয়েছেন এবং এখনো দেন। উৎসর্গ কখনোও সাধারণভাবে করা হয়, কোন রকম শর্ত (precondition) ছাড়াই একজন ভক্ত তার ভক্তির প্রকাশ হিসাবে উৎসর্গ দান করেন। কখনো বা তা মানত হিসাবে পেশ করা হয়, অর্থাৎ একজন ভক্ত উপাসক সিদ্ধান্ত নেন যে তার নির্দিষ্টমনোবাসনাপূর্ণ হলে তিনি তার উপাস্যর জন্য কিছু উৎসর্গ করবেন।
সর্ব যুগের মুশরিকদের মত আরবের মুশরিকরাও জীব জানোয়ার, ফসল খাদ্য ইত্যাদি আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করতো এবং তাদের অন্য সকল উপাস্যের জন্যও উৎসর্গ করত। এ শিরকের বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَجَعَلُوا لِلَّهِ مِمَّا ذَرَأَ مِنَ الْحَرْثِ وَالْأَنْعَامِ نَصِيبًا فَقَالُوا هَذَا لِلَّهِ بِزَعْمِهِمْ وَهَذَا لِشُرَكَائِنَا فَمَا كَانَ لِشُرَكَائِهِمْ فَلَا يَصِلُ إِلَى اللَّهِ وَمَا كَانَ لِلَّهِ فَهُوَ يَصِلُ إِلَى شُرَكَائِهِمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ "আল্লাহ যে শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করেছেন তন্মধ্য হতে তারা আল্লাহর জন্য এক অংশ নির্দিষ্ট করে এবং নিজেদের ধারণা অনুযায়ী বলে, 'এটি আল্লাহর জন্য এবং এটি আমাদের অন্যান্য উপাস্যের জন্য। যা তাদের দেবতাদের অংশ তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এবং যা আল্লাহর অংশ তা তাদের দেবতাদের কাছে পেঁছে; তারা যা মিমাংসা করে তা নিকৃষ্ট।" উৎসর্গ বিষয়ক শিরকের বিষয়ে অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
وَيَجْعَلُونَ لِمَا لَا يَعْلَمُونَ نَصِيبًا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ تَاللَّهِ لَتُسْأَلُنَّ عَمَّا كُنْتُمْ تَفْتَرُونَ "আমি তাদেরকে যে রিস্ক দান করি তারা তার এক অংশ নির্ধারিত করে তাদের জন্য যাদের সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। শপথ আল্লাহর, তোমরা যে মিথ্যা উদ্ভাবন কর সে সম্বন্ধে তোমাদেরকে প্রশ্ন করা হবেই।" কুরবানী বা উৎসর্গ একমাত্র আল্লাহর জন্যই করার নির্দেশনা দিয়ে অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ "বল, নিশ্চয় আমার সালাত, আমার উৎসর্গ বা কুরবাণী, আমার জীবন, আমার মৃত্যু আল্লাহরই নিমিত্ত, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক, তার কোন শরীক নেই। এজন্যই আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি সর্বাগ্রে সমর্পণ করছি।" মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (ﷺ)-কে সম্বোধন করে বলেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ "তোমার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় কর এবং জবাই-কুরবানী কর।"
এ জাতীয় শিরক আলোচনা প্রসঙ্গে শাহ ওয়ালি উল্লাহ বলেন: মুশরিকগণ মুর্তি, প্রতিমা ও গ্রহ-নক্ষত্রের করুশা ও নৈকট্য লাভের জন্য তাদের উদ্দেশ্যে জবাই করত। এজন্য তারা জবাইদের সময় তাদের নাম নিয়ে জবাই করত। অথবা তাদের উদ্দেশ্যে বানানো বিশেষ বেদি বা স্মৃতি বিজড়িত স্থানে নিয়ে পশু জবাই করত। কুরআনে তাদের এরূপ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এছাড়া তারা তাদের উপাস্যদের করুণা লাভের উদ্দেশ্যে তাদের নামে পশু ছেড়ে দিত। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
مَا جَعَلَ اللَّهُ مِنْ بَحِيرَةٍ وَلَا سَائِبَةٍ وَلَا وَصِيلَةٍ وَلَا حَامٍ وَلَكِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَأَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ “বাহীরাহ, সায়িবা, ওয়সীলাহ ও হাম (উপাস্যদের নামে বিভিন্ন প্রকারের উৎসর্গকৃত পশু) আল্লাহ স্থির করেন নি; কিন্তু কাফিরগণ আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে এবং তাদের অধিকাংশ উপলব্ধি করে না।"

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 গাইরুল্লাহকে ডাকা বা ত্রাণ প্রার্থনা

📄 গাইরুল্লাহকে ডাকা বা ত্রাণ প্রার্থনা


দু'আ (الدعاء) অর্থ আহবান করা, ডাকা, প্রার্থনা করা (call, pray, invoke)। ডাকা বা আহবান করা এবং প্রার্থনা করা পরস্পর জড়িত। কারো কাছে প্রার্থন করতে হলে তাকে ডাকা হয় এবং সাধারণত কারো ডাকার উদ্দেশ্য তার সাহায্য প্রার্থনা করা।
দু'আ বা প্রার্থনার বিষয়বস্তুর দিক থেকে দু'আকে অনেক সময় 'ইসতি'আনাহ (الاستعانة) অর্থাৎ 'আওন' বা সাহায্য প্রার্থনা, 'ইসতিম্াদ' (الاستمداد), অর্থাৎ 'মদদ' বা সাহায্য প্রার্থনা, 'ইসতিগাসাহ' (الاستغاثة) অর্থাৎ 'গাউস' বা ত্রাণ বা উদ্ধার প্রার্থনা ইত্যাদি বলা হয়। সবকিছুরই মূল 'দু'আ'।
প্রার্থনা করা বা ডাকার বিষয়বস্তু দুই প্রকারের হতে পারে। এক প্রকার লৌকিক বা জাগতিক সাহায্য-সহযোগিতা যা মানুষ স্বাভাবিকভাবে করতে পারে। এ সকল বিষয় প্রকৃতিগতভাবে একজন মানুষ আরেকজনের নিকট চেয়ে থাকে এবং মানুষ জাগতিকভাবে তা প্রদান করতে পারে। যেমন, কারো কাছে টাকাপয়সা চাওয়া, সাহায্য চাওয়া, পানিতে পড়ে গেলে উঠানোর জন্য
১৮৫
সাহায্য চাওয়া, মাথার বোঝা পড়ে গেলে উঠাতে সাহায্য চাওয়া, ইত্যাদি, ইত্যাদি অগণিত। জাতি, ধর্ম, বিশ্বাস ও অবিশ্বাস নির্বিশেষে সকলেই এ ধরনের সাহায্য প্রার্থনা করে।
দ্বিতীয় প্রকার প্রার্থনা বা ডাকা অলৌকিক বা অপার্থিব। জাগতিক মাধ্যম ও উপকরণ ছাড়া অলৌকিক সাহায্য, ত্রাণ ইত্যাদি প্রার্থনা করা। এ জাতীয় প্রার্থনা শুধুমাত্র কোনো "ধর্মের অনুসারী" বা "বিশ্বাসী” করেন। "বিশ্বাসী” কেবলমাত্র 'আল্লাহ', 'ঈশ্বর' বা সর্বশক্তিমান বলে যাকে বিশ্বাস করেন, অথবা যার সাথে 'ইশ্বরের' বিশেষ সম্পর্ক ও যার মধ্যে 'ঐশ্বরিক' ক্ষমতা আছে, তার কাছেই এরূপ প্রার্থনা করেন বা তাকেই এভাবে ডাকেন।
দ্বিতীয় প্রকারের এ প্রার্থনা বা ডাকাই ইবাদত-এর সার্বজনীন প্রকাশ। সকল যুগে সকল ধর্মের মানুষই মূলত তার আরাধ্য বা উপাস্যকে ডাকে ও তার কাছে প্রার্থনা করে অপার্থিব ও অলৌকিক সাহায্য লাভের জন্য। উৎসর্গ, কুরবানি (sacrifice), নযর, মানত, ফুল, সাজদা, গড়াগড়ি ইত্যাদি সবই মূলত দু'আর জন্যই। যেন পূজিত ব্যক্তি বা বস্তু এ সকল ভেট বা উৎসর্গে খুশি হয়ে তাড়াতাড়ি প্রার্থনা পূরণ করেন বা হাজত মিটিয়ে দেন সে জন্যই বাকি সকল প্রকারের ইবাদত ও কর্ম। এভাবে আমরা দেখছি যে দু'আই হলো ইবাদত-এর সর্বজনীন ও সর্বপ্রধান প্রকাশ।
নু'মান ইবনু বাশীর (রা) বলেন, নবীজী ﷺ বলেন:
الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ "দু'আ বা প্রার্থনাই ইবাদত।" একথা বলে তিনি কুরআনের আয়াত পাঠ করলেন:
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ "তোমাদের প্রভু বলেন: তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব বা তোমাদের প্রার্থনা পূরণ করব। নিশ্চয় যারা আমার ইবাদত থেকে অহঙ্কার করে (আমার কাছে প্রার্থনা না করে) তারা শীঘ্রই লাঞ্ছিত অপমানিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।"
দু'আ, কেন্দ্রিক শিরকের বিষয়ে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রাহ) বলেন: “মুশরিকগণ আল্লাহ ছাড়া অন্যদের নিকট হাজত বা প্রয়োজন মেটানোর জন্য সাহায্য প্রার্থনা করত। অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থতা, দরিদ্র ব্যক্তির সচ্ছলতা ইত্যাদি প্রয়োজনে তারা তাদের নিকট প্রার্থনা করত। এ সকল উদ্দেশ্য পূরণ হওয়ার জন্য তারা তাদের নামে মানত করত। তারা আশা করত যে, এ সকল মানতের মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে এবং বিপদাপদ কেটে যাবে। তারা বরকত লাভের উদ্দেশ্যে এ সকল উপাস্যের নাম পাঠ করত। একারণে আল্লাহ তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, তারা সালাতের মধ্যে বলবে:
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ "আমরা শুধু তোমরই ইবাদত করি, শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।" মহান আল্লাহ বলেন:
فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا "সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেক না।" কোনো কোনো মুফাস্সির বলেছেন যে, এখানে 'ডাকা' অর্থ 'ইবাদত' করা। তাদের এ ব্যাখ্যা সঠিক নয়। স্পষ্টতই 'ডাকা' অর্থ সাহায্য প্রার্থনা করা। কারণ মহান আল্লাহ বলেছেন: بَلْ إِيَّاهُ تَدْعُونَ فَيَكْشِفُ مَا تَدْعُونَ إِلَيْهِ إِنْ شَاءَ وَتَنْسَوْنَ مَا تُشْرِكُونَ "(বল, তোমরা ভেবে দেখ যে, আল্লাহর শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হলে, অথবা তোমাদের নিকট কিয়ামত উপস্থিত হলে তোমরা কি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে? যদি তোমরা সত্যবাদী হও?) বরং তোমরা শুধু তাকেই ডাকবে। তিনি ইচ্ছা করলে যে বিপদের জন্য তাকে ডাকবে তোমাদের সে বিপদ তিনি দূর করবেন এবং যাদেরকে তোমরা শরীক করতে তাদেরকে তোমরা ভুলে যাবে।" যেহেতু দু'আই ইবাদতের মূল প্রকাশ এবং এক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি শিরকে লিপ্ত হয় মানুষ, সেহেতু কুরআনে এই ইবাদতের কথা সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও একমাত্র আল্লাহকে ডাকতে বা একমাত্র তাঁরই কাছে দু'আ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোথাও আল্লাহ ছাড়া আর অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করার অসারতা বর্ণনা করা হয়েছে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট প্রার্থনা করতে নিষেধ করা হয়েছে, কোথাও মুশরিকরা যে তাদের উপাস্যদের ডাকত বা তাদের কাছে দুআ করার মাধ্যমে শিরক করত তা বারংবার বলা হয়েছে। কুরআনে দু-শতাধিক স্থানে এ ব্যপারে বলা হয়েছে।
১৮৬
একটি উদাহরণ থেকে আমরা লৌকিক ত্রাণ প্রার্থনা বা ডাকা এবং শিরকী ত্রাণ প্রার্থনা বা ডাকার মধ্যে পার্থক্য বুঝার চেষ্টা করি। মনে করুন আমার গরুটি পালিয়ে যাচ্ছে। আমি সামনে কোনো মানুষ দেখে বা কোনো মানুষ থাকতে পারে মনে করে চিৎকার করে বললাম, ভাই, আমার গরুটি একটু ধরে দেবেন! অথবা আমি পথ চিনতে পারছি না, তাই কোনো মানুষকে দেখে অথবা কোনো বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ভিতরে মানুষ আছে অনুমান করে চিৎকার করে বলছি, ভাই অমুক স্থানে কোন দিক দিয়ে যাব একটু বলবেন!
এখানে আমি লৌকিক সাহায্য প্রার্থনা করছি। ঐ মানুষের মধ্যে কোনো অলৌকিকত্ব বা ঐশ্বরিক গুণ কল্পনা করছি না। ঐ ব্যক্তির ব্যক্তিগত পরিচয়ও আমার কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না। আমি জানি যে, স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষ একটি গরু ধরতে পারে বা উক্ত স্থানের একজন বাসিন্দা স্বাভাবিকভাবে পথটি চিনবে বলে আশা করা যায়। এজন্য আমি তার থেকে এই লৌকিক সাহায্য প্রার্থনা করছি।
যদি কোথাও এই প্রকারের জাগতিক সমস্যা হয় এবং সেখানে কোনো মানুষজন না থাকে তাহলে উপস্থিত অদৃশ্য ফিরিশতাগণের নিকটও সাহায্য চাওয়া যেতে পারে বলে একটি দুর্বল সনদের হাদীস থেকে জানা যায়। মুমিন জানেন যে, আল্লাহর অগণিত ফিরিশতাগণ পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছেন। এছাড়া অদৃশ্য সৃষ্টি জীনেরাও বিভিন্ন স্থানে চলাচল করে। উপরের পরিস্থিতিতে যদি কোনো দৃশ্যমান মানুষকে না দেখে তিনি অদৃশ্য ফিরিশতা বা জ্বিনের কাছে লৌকিক সাহায্য চান তাহলে তা জায়েয হবে। কারণ তিনি কোনো নির্দিষ্ট সৃষ্টির মধ্যে ঈশ্বরত্ব বা অলৌকিকত্ব কল্পনা করছেন না। তথায় কোন্ ফিরিশতা আছেন বা কোন্ জ্বিন রয়েছেন তাও তিনি জানেন না বা জানা তার কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না। তিনি জানেন যে, এখানে কোনো ফিরিশতা বা জ্বিন থাকতে পারেন। আল্লাহর অন্য কোনো বান্দাকে দেখছি না, কাজেই এখানে উপস্থিত আল্লাহর অদৃশ্য বান্দাদের কাছে একটু সাহায্য চেয়ে দেখি কী হয়। ইবনু মাসউদ (রা) থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন:
إِنَّ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مَلَائِكَةً سِوَى الْحَفَظَةِ يَكْتُبُونَ مَا سَقَطَ مِنْ وَرَقِ الشَّجَرِ فَإِذَا أَصَابَ أَحَدَكُمْ عَرْجَةً بِأَرْضِ فَلَاةٍ فَلْيُنَادِ أَعِينُوا عِبَادَ اللَّهِ يَرْحَمُكُمُ اللَّهُ تَعَالَى "বান্দার সাথে তার সংরক্ষণে নিয়োজিত ফিরিশতাগণ ছাড়াও আল্লাহর অনেক ফিরিশতা আছেন যারা সারা বিশ্বে কোথায় কোন গাছের পাতা পড়ছে তাও লিখেন। যদি তোমাদের কেউ কোনো নির্জন প্রান্তরে আটকে পড়ে বা অচল হয়ে পড়ে তাহলে সে ডেকে বলবে: হে আল্লাহর বান্দাগণ তোমরা সাহায্য কর, আল্লাহ তোমাদের রহমত করুন।"
এ প্রকার লৌকিক বা জাগতিক সাহায্য প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে যদি কেউ অনুপস্থিত কাউকে ডাকেন বা অনুপস্থিত কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন তাহলে তা শিরক হবে। যেমন, কারো রিকশা উল্টে গেছে বা গাড়িটি খাঁদে পড়েছে, তখন স্বাভাবিক লৌকিক কর্ম যে, সে কাউকে দেখতে পাক বা না পাক, সে চিৎকার করে সাহায্য চাইবে: কে আছ একটু সাহায্য কর। এখানে সে লৌকিক সাহায্য চাচ্ছে। কিন্তু যদি সে এ সময়ে সেখানে অনুপস্থিত কোনো জীবিত বা মৃত মানুষকে ডাকতে থাকে তাহলে সে শিরকে লিপ্ত হবে। কারণ সে মনে করছে, অনুপস্থিত অমুক ব্যক্তি সদা সর্বদা সবত্র বিরাজমান বা সদা সর্বদা সকল স্থানের সবকিছু তার গোচরিভূত। কাজেই, তিনি দূরবর্তী স্থান থেকে আমাকে দেখতে পাচ্ছেন বা আমার ডাক শুনতে পাচ্ছেন এবং দূর থেকে অলৌকিকভাবে আমার বিপদ কাটিয়ে দেওয়ার মতো "অলৌকিক" ক্ষমতা তার আছে। এভাবে সে একটি নির্দিষ্ট সৃষ্টির মধ্যে অলৌকেকত্ব, ঐশ্বরিক শক্তি বা মহান আল্লাহর গুণাবলী আরোপ করে শিরকে নিপতিত হয়েছে। এছাড়াও সে মহান আল্লাহর ক্ষমতাকে ছোট বলে মনে করেছে।
এ প্রার্থনাকারী বা আহবানকারী ঐ বিশেষ ব্যক্তির মধ্যে যে ক্ষমতা কল্পনা করেছে তা একান্তভাবেই মহান আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। এ প্রাথনাকারী এই গুণাবলীকে শুধুমাত্র আল্লাহর বলে মনে করে না। সে বিশ্বাস করে যে, এই ক্ষমতার মধ্যে আল্লাহর শরীক আছে। এই ক্ষমতাটি যেমন আল্লাহর আছে, তেমনি অমুক ব্যক্তিরও আছে। তবে সে সম্ভবত তার কল্পনার মানুষটির ক্ষমতাকে এ ক্ষেত্রে আল্লাহর ক্ষমতার চেয়ে বেশি বা দ্রুত বলে বিশ্বাস করে। এজন্যই সে আল্লাহকে না ডেকে তাকে ডেকেছে। এক্ষেত্রে মুশরিকদের দাবি যে, এ সকল খাজা বাবা, সাঁই বাবা, মা, সান্তা, সেন্ট, ফিরিশতা বা জ্বিনদেরকে আল্লাহই ক্ষমতা প্রদান করেছেন। ক্ষমতা মূলত আল্লাহরই, তিনি এদেরকে কিছু বা সকল ক্ষমতা প্রদান করেছেন। শিরকের হাকীকাত বিষয়ে শাহ ওয়ালি উল্লাহ (রাহ)-এর বক্তব্যে আমরা তা দেখেছি।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 গাইরুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতা

📄 গাইরুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতা


তাওয়াক্কুল অর্থ নির্ভরতা (to rely, depend, trust)। সাধারণভাবে বাংলায় নির্ভরতা বলতে আমরা যা বুঝি তা লৌকিক ও অলৌকিক দু প্রকারেরই হতে পারে। জাগতিকভাবে একজন মানুষ অন্যের শক্তি, ক্ষমতা, সহযোগিতা ইত্যাদির উপর নির্ভর করতে পারে। এক্ষেত্রে নির্ভরকারী ব্যক্তি নির্ভরকৃত ব্যক্তির মধ্যে কোনো অলৌকিকত্ব বা অপার্থিবত্ব কল্পনা করে না, বরং স্বাভাবিক মানবীয় আস্থা বা নির্ভরতা প্রকাশ করে। বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী সকলেই এরূপ নির্ভরতা প্রকাশ করে।
অলৌকিক নির্ভরতা কোনো অবিশ্বাসী বা নাস্তিক মানুষ করেন না। কেবলমাত্র বিশ্বাসী মানুষ যে ব্যক্তি বা সত্তার মধ্যে অলৌকিক ক্ষমতা বা জাগতিক উপকরণ ছাড়াই অপার্থিব বা অলৌকিকভাবে কল্যাণ বা অকল্যাণ করার বা তা রোধ করার ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করে তার অলৌকিক সাহায্য ও করুণার উপর নির্ভর করে। মনের এরূপ প্রগাঢ় নির্ভরতাকেই ইসলামী পরিভাষায় তাওয়াক্কুল বলা হয়।
মানুষ যার বা যাদের উপাসনা করে, অন্তরের গভীরে তার বা তাদের অতিপ্রাকৃতিক সাহায্য ও রক্ষণাবেক্ষণের আশা করে এবং এই সাহায্যের উপর তার নির্ভরতা থাকে। সে তার উপস্যের নাম নিয়ে বা তার উপাস্যের সাহায্যের উপর নির্ভর করে তার কর্ম শুরু করে।
১৮-৭
এই নির্ভরতা এক প্রকার ইবাদত। কেউ যদি কারো নাম নিয়ে বা কারো অতিপ্রাকৃতিক সাহায্য ও রক্ষণাবেক্ষণের উপর অন্তরের আস্থা বা নির্ভরতা নিয়ে কর্ম শুরু করেন, তাহলে তিনি তার উপাসক হিসাবে গণ্য হবেন। এজন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপর তাওয়াক্কুল করা, কারো নাম নিয়ে যাত্রা শুরু করা, কারো নামে পাড়ি জমানো... ইত্যাদি শিরক। কুরআন কারীমে একমাত্র আল্লাহর উপর নির্ভর করতে বা তাওয়াক্কুল করতে বার বার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
"আর মুমিনগণ একমাত্র আল্লাহর উপরেই নির্ভর করুক।" অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا إِنْ كُنْتُمْ آمَنْتُمْ بِاللَّهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُسْلِمِينَ "এবং আপনি আল্লাহর উপরে নির্ভর করুন, উকিল বা কর্মবিধায়ক হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।" অন্যত্র বলা হয়েছে:
"তোমরা যদি আল্লাহকে বিশ্বাস করে থাক, যদি তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী হও তবে শুধু তারই উপরে নির্ভর কর।" আল্লাহ আরো বলেছেন:
قُلْ هُوَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ مَتَابِ "বল, তিনিই আমার প্রতিপালক, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ বা উপাস্য নেই, আমি একমাত্র তার উপরেই নির্ভর (তাওয়াক্কুল) করেছি এবং তার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00