📄 অর্থ ও পরিচিতি
ইতোপূর্বে দ্বিতীয় অধ্যায়ে তাওহীদের প্রসঙ্গে আমরা 'শিরক' শব্দটির অর্থ আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি যে, আরবীতে শিরক (شرك) অর্থ অংশীদার হওয়া (to share, participate, be partner, associate)। ইশরাক (إشراك) ও
তাশ্রীক (تشريك) অর্থ অংশীদার করা বা বানানো। সাধারণভাবে 'শিক' শব্দটিকেও আরবীতে 'অংশীদার করা' বা 'সহযোগী বানানো' অর্থে ব্যবহার করা হয়। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আল্লাহর কোনো বিষয়ে আল্লার সমকক্ষ মনে করা বা আল্লাহর প্রাপ্য কোনো ইবাদত আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য পালন করা বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকাকে শিরক বলা হয়। এক কথায় 'আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিষয় অন্য কাউকে অংশী বানানোই শিরক।' কুরআনের ভাষায় শিরক হলো কাউকে 'আল্লাহর সমতূল্য' করা। মহান আল্লাহ বলেন:
فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ অতএব তোমরা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বানাবে না।" অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
وَجَعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا لِيُضِلُّوا عَنْ سَبِيلِهِ "এবং তারা আল্লাহর সমতুল্য উদ্ভাবন করে তাঁর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য।" আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা) বলেন:
سَأَلْتُ أَوْ سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَيُّ الذَّنْبِ عِنْدَ اللَّهِ أَكْبَرُ قَالَ أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ "আমি রাসূলুল্লাহ-কে প্রশ্ন করলাম, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে কঠিন পাপ কী? তিনি বলেন: সবচেয়ে কঠিন পাপ এই যে, তুমি আল্লাহর সমকক্ষ বানাবে অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।" এভাবে আমরা দেখছি যে কাউকে মহান আল্লাহর 'নিদ্দ' মনে করাই শিরক। আরবীতে 'নিদ্দ" (i) অর্থ সমতুল্য, মত, সমকক্ষ, তুলনীয় ইত্যাদি। কাউকে মহান আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, আসমা, সিফাত বা ইলাহিয়্যাত-এর ক্ষেত্রে তাঁর সমতুল্য মনে করা, অথবা আল্লাহকে যে ভক্তি প্রদর্শন করা হয় বা আল্লাহর জন্য যে ইবাদত করা হয় তা অন্য কাউকে প্রদান করাই শিরক। এখানে কয়েকটি বিষয় প্রনিধানযোগ্য: প্রথমত, কুফর ও শিরক পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কাউকে কোনোভাবে কোনো বিষয়ে মহান আল্লাহর সমকক্ষ বা তুলনীয় মনে করার অর্থই তাঁর একত্বে অবিশ্বাস বা কুফরী করা। আল্লাহর তাওহীদ ও রাসূলগণের দাও'আতে অবিশ্বাস না করে কেউ শির্ক করতে পারে না। কাজেই শ্রিকের অর্থই তাওহীদ ও রিসালাতে অবিশ্বাস করা। অপরদিকে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ না মেনে ঈমানের কোনো রুকন অবিশ্বাস করলে তা শুধু কুফর বলে গণ্য। যেমন যদি কেউ আল্লাহর অস্তিত্বে বা তাঁর প্রতিপালনের একত্বে অবিস্বাস করেন বা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর রিসালাত, খাতমুন নুবুওয়াত ইত্যাদি অস্বীকার করেন তবে তা কুফর হলেও বাহ্যত তা শিরক নয়। কারণ এরূপ ব্যক্তি সুস্পষ্ট কাউকে আল্লাহর সাথে তুলনীয় বলে দাবি করছে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরূপ কুফরের সাথেও শিরক জড়িত। কারণ এরূপ ব্যক্তি কোনো না কোনোভাবে এ ক্ষয়িষ্ণু জড় বিশ্বকে মহান আল্লাহ মত অনাদি-অনন্ত বলে বিশ্বাস করছে, বিশ্ব পরিচালনায় প্রকৃতি বা অন্য কোনো শক্তিকে বিশ্বাস করছে। দ্বিতীয়ত, কুফর বা অবিশ্বাসের অন্যতম প্রকাশ শিরক। সাধারণভাবে যুগে যুগে অবিশ্বাসীগণ মহান আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর গুণাবালি বা তাঁর মা'বুদিয়্যাত বা উপাস্যত্ব অস্বীকার করে কুফরী করে নি, বরং এগুলিতে তার সাথে অন্য কাউকে শরীক বা অংশীদার বলে বিশ্বাস করেই কুফরী করেছে। এজন্য কুরআন ও হাদীসে কুফরের বর্ণনায় শিরকের কথাই বেশি বলা হয়েছে। তৃতীয়ত, মহান আল্লাহর কোনো সমকক্ষ কল্পনা করা বা শিরকের বিভিন্ন প্রকার ও প্রকরণের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা বুঝতে পারি যে, দুভাবে শিরক হয়ে থাকে: (১) মহান আল্লাহর কোনো সৃষ্টির প্রতি অতি-সুধারণা অথবা (২) মহান আল্লাহর প্রতি কু-ধারণা বা অব-ধারণা। শিরকে নিপতিত মানুষেরা কখনো ফিরিশতা, নবী, ওলী, নেককার মানুষ, কারামত-প্রাপ্ত মানুষ, তাদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, পাহাড়, সূর্য, চন্দ্র ইত্যাদি কোনো সৃষ্টির বিষয়ে ভক্তি ও মর্যাদা প্রদানে অতিরঞ্জন করে তাদের মধ্যে 'অলৌকিক শক্তি' বা ঐশ্বরিক ক্ষমতা কল্পনা করেছে। অথবা মহান আল্লাহর পূর্ণতার গুণের প্রতি কু-ধারণা পোষণ করে তাকে সৃষ্টির মত কল্পনা করেছে এবং তাঁর সন্তান, পরিষদ, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি কল্পনা করেছে। কুরআন-হাদীসে উল্লিখিত শিরক এবং বিশ্বের বিভিন্ন জাতির শিরক পর্যালোচনা করলে আমরা মূলত এ দুটি বিষয়ই দেখতে পাই। এবং এদুটি বিষয়ও পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কারো প্রতি ভক্তির অতিরঞ্জর অর্থই আল্লাহর ক্ষমতা, রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের প্রতি কু-ধারণা পোষণ করা।
📄 শিরকের হাকীকত
আল্লাহ ছাড়া কাউকে ক্ষমতায় ও সৃষ্টিতে বা সকল দিক থেকে আল্লাহর সমতুল্য মনে করা যেমন শিরক, তেমনি মহান আল্লাহ কাউকে নিজের শরীক বানিয়ে নিয়েছেন, বা কাউকে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা, 'উলুহিয়্যাত' বা ঐশ্বরিক ক্ষমতা ও ইবাদত পাওয়ার যোগ্যতা প্রদান করেছেন বলে বিশ্বাস করাও শিরক। তবে সাধারণত কোনো মুশরিকই কাউকে সকল দিক থেকে বা স্বকীয় ভাবে আল্লাহর সমতুল্য বলে শিরক করে নি, বরং দ্বিতীয় পর্যায়ের শিরকই সর্বদা ব্যাপক।
ইতোপূর্বে প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ে কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে দেখেছি যে, আরবের মুশরিকগণ কাউকে আল্লহর মত বা আল্লাহর সমতুল্য স্রষ্টা, প্রতিপালক, সর্বশক্তিমান বা স্বকীয় ক্ষমতায় ইলাহ বা মাবুদ হিসেবে আল্লাহর সমকক্ষ বা সমতুল্য বলে মনে করত না। বরং মহান আল্লাহকেই একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, সর্বশক্তিমান, মহাবিশ্বের একমাত্র সার্বভৌম মালিক, রিষ্কদাতা, মৃত্যুদাতা ও সকল কিছুর পরিচালক বলে বিশ্বাস করত। তারা বিশ্বাস করত যে সকলেই আল্লাহর বান্দা। তবে তারা বিশ্বাস করত যে, আল্লাহর কিছু বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে সাধারণ বান্দাদের চেয়ে উর্ধ্বে উঠেন, যাদেরকে আল্লাহ খুশি হয়ে নিজের কর্মে ও ক্ষমতায় শরীক করেছেন। এদের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য ও এদের শাফা'আত দ্বারা উপকৃত হওয়ার জন্য তারা এদের ইবাদত করত। এভাবে আমরা দেখি যে, কিছু "অলৌকিক ক্ষমতায়" এবং "ইবাদত পাওয়ার যোগ্যতায়" তারা আল্লাহর কিছু বান্দাকে আল্লাহর সমকক্ষ বা সমতুল্য বলে বিশ্বাস করত। আর এরূপ করাকেই কুরআন ও হাদীসে 'আল্লাহর সমকক্ষ বা সমতুল্য নির্ধারণ করা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রাহ) বলেন: "শিরকের হাকীকত এই যে, কোনো মানুষ কোনো কোনো সম্মানিত মানুষের ক্ষেত্রে ধারণা করবে যে, উক্ত ব্যক্তি দ্বারা যে সকল অলৌকিক কার্য সংঘটিত বা প্রকাশিত হয় তা উক্ত ব্যক্তির পূর্ণতার গুণে গুণান্বিত হওয়ার কারণে। এ সকল অলৌকিক কার্য প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে পাওয়া যায় না এরূপ কিছু বিশেষ গুণ উক্ত ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান। এরূপ গুণ মূলত একমাত্র আল্লাহরই আছে। আল্লাহ যাকে 'উলুহিয়্যাত' বা এরূপ বিশেষত্ব প্রদান করেন, অথবা 'আল্লাহ' যে ব্যক্তির সত্তার সাথে সংমিশ্রিত হন, অথবা যে ব্যক্তি আল্লাহর যাত বা সত্তার মধ্যে 'ফানা' বা বিলুপ্তি লাভ করে এবং আল্লাহ সত্তার সাথে 'বাকা' বা অস্তিত্ব লাভ করেন, বা অনুরূপ কোনো ভাবে যে ব্যক্তিকে আল্লাহ এরূপ ক্ষমতা বা পূর্ণতা প্রদান করেন তিনিই কেবল তা প্রাপ্ত হন। এভাবে মানুষের উলুহিয়্যাত বা ঐশ্বরিক ক্ষমতা বা গুণ লাভের পদ্ধতি ও প্রকার সম্পর্কে মুশরিকদের মধ্যে অনেক ভিত্তিহীন কুসংস্কার বিদ্যমান। এ বিষয়ে হাদীস শরীফে বলা হয়েছে যে, আরবের কাফিরগণ হজ্জের 'তালবিয়া'র মধ্যে ও কাবাঘর তাওয়াফের সময় বলত:
لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ إِلَّا شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُهُ وَمَا مَلَكَ লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক.... আপনার কোনো শরীক নেই, তবে আপনি নিজে যাকে আপনার শরীক বানিয়েছেন সে ছাড়া। এরূপ শরীকও আপনারই মালিকানাধীন, আপনারই বান্দা, উক্ত শরীক ও তার সকল কর্তৃত্ব ও রাজত্ব আপনারই অধীন।" অন্যত্র তিনি আরবের মুশরিকদের ইবরাহীম (আ)-এর দীন থেকে বিচ্যুতি ও শিরকের মধ্যে নিপতিত হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে তাদের শিরকের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করে বলেন: “এ সকল মুশরিক বিশ্বসৃষ্টির ব্যাপারে এবং বিশ্বের বৃিহৎ বিষয়গুলি পরিচালনার ব্যপারে আল্লাহর কোনো শরীক আছে বলে বিশ্বাস করত না। তারা একথাও স্বীকার করত যে, আল্লাহ যদি কোনো কিছুর সিদ্ধান্ত নেন বা কোনো বিষয় নির্ধারণ করেন তবে তা পরিবর্তন বা রোধ করার ক্ষমতাও কারোরই নেই। তারা কেবলমাত্র বিশেষ কিছু বিষয়ে কিছু বান্দাকে শরীক করত। কারণ তারা মনে করত যে, একজন মহারাজ তার দাসদেরকে এবং তার নিকটবর্তী প্রিয় মানুষদেরকে তার রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় কিছু ছোটখাট দায়িত্ব পালনের জন্য প্রেরণ করেন এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এসকল ছোটখাট বিষয় নিজেদের ইচ্ছামত পরিচালনা করার ক্ষমতা তাদেরকে প্রদান করেন। তারা আরো ধারণা করত যে, একজন মহারাজ তার প্রজাগণের খুটিনাটি বিষয় নিজে সম্পন্ন বা পরিচালনা করেন না, বরং অধীনস্থ প্রশাসক ও কর্মকর্তাদেরকে এ সকল বিষয় পরিচালনার দায়িত্ব দেন। এ সকল কর্মকর্তার অধীনে যারা কর্ম করেন বা তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখেন তাদের বিষয়ে এ সকল কর্মকর্তার সুপারিশ তিনি গ্রহণ করেন। সকল রাজার মহারাজা রাজাধিরাজ মহান আল্লাহও অনুরূপভাবে তাঁর কিছু নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাকে উলূহ্যিায়ের উপঢৌকন প্রদান করেছেন এবং এদের বিরক্তি ও সন্তুষ্টিকে তার অন্যান্য বান্দাদের ক্ষেত্রে প্রভাবময় করে দিয়েছেন।
এ জন্য তারা মনে করত যে, এ সকল নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দার নৈকট্যলাভের চেষ্টা করা জরুরী, যেন তা প্রকৃত মহারাজের নিকট তাদের কবুলিয়্যাতের ওসীলা হতে পারে। আর হিসাব ও প্রতিফলের সময় এদের শাফা'আত মহান আল্লাহর দরবারে কবুলিয়াত ও গ্রহণযোগ্যতা পাবে। এ ধারণা তাদের মনের মধ্যে গভীরভাবে প্রেথিত হয়ে যায়। এজন্য তাদের মন বলে যে, এ সকল নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের সামনে সাজদা কর, তাদের জন্য জবাই-উৎসর্গ কর, তাদের নামে কসম কর, তাদের অলৌকিক ক্ষমতার কারণে তাদের কাছে ত্রান ও সাহায্য প্রার্থনা কর, পাথরে, তামায়, পিতলে বা অন্য কিছুতে তাদের ছবি ও প্রতিকৃতি একে রাখ, এদের এ সকল প্রতৃিকতি সামনে রেখে এদের রূহের (আত্মার) প্রতি মুতাওয়াজ্জাহ হও। ক্রমান্বয়ে পরবর্তী প্রজন্মগুলির মানুষেরা মুর্খতার কারণে এদের এ সকল মুর্তি ও প্রতিকৃতিকেই প্রকৃত ইলাহ বা মা'বূদ বলে বিশ্বাস করতে থাকে।"