📄 মীযান
হিসাবের একটি বিশেষ দিক যে, মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন মানুষের কর্ম ওজন করবেন এবং ওজনের জন্য মীযান বা তুলাদণ্ড স্থাপন করবেন। মহান আল্লাহ বলেন:
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ "এবং কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায় বিচারের পাল্লা বা তুলাদন্ড। সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না এবং কর্ম যদি তিল পরিমাণ ওজনেরও হয় তবুও আমি তা উপস্থিত করব; হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট।" অন্যত্র আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন:
وَالْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ فَمَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ بِمَا كَانُوا بِآيَاتِنَا يَظْلِمُونَ "সে দিন ওজন ঠিক করা হবে, যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে; আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজদের ক্ষতি করেছে, যেহেতু তারা আমার নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করত।" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
فَأَمَّا مَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَاضِيَةٍ وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُمُّهُ هَاوِيَةٌ وَمَا أَدْرَاكَ مَا هِيَهْ نَارٌ حَامِيَةٌ "তখন যার পাল্লা ভারী হবে সে তো লাভ করবে সন্তোষজনক জীবন, কিন্তু যার পাল্লা হালকা হবে তার স্থান হবে 'হাবিয়া' (গভীর গর্ত); তুমি কি জান তা কী? তা অতি উত্তপ্ত অগ্নি।"
📄 সিরাত
সিরাত (الصراط) অর্থ রাস্তা বা পথ। আখিরাতের বিশ্বাসে সিরাত বলতে জাহান্নামের উপরে স্থাপিত রাস্তা বা সেতুকে বুঝানো হয়। মুমিনগণ বিশ্বাস করেন যে, আখিরাতে জাহান্নামের উপর দিয়ে একটি রাস্তা বা পথ স্থাপন করা হবে এবং সকল মানুষকেই সে রাস্তা দিয়ে জাহান্নাম অতিক্রম করে জান্নাতের দিকে যেতে হবে। নবীগণ, সিদ্দীকগণ, মুমিনগণ, কাফিরগণ, হিসাবকৃতগণ, হিসাব-মুক্তগণ সকলেই এ সেতু অতিক্রম করবেন। পৃথিবীতে আল্লাহর রাস্তায় যে যেভাবে চলেছেন আখিরাতের রাস্তা বা সেতুও তিনি সেভাবেই অতিক্রম করবেন। এ বিষয়ে কুরআন কারীমে ইঙ্গিত রয়েছে এবং বিভিন্ন হাদীসে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। আবূ হুরাইরা (রা) বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেন:
فَيُضْرَبُ الصِّرَاطَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْ جَهَنَّمَ فَأَكُونَ أَوَّلَ مَنْ يَجُوزُ مِنَ الرُّسُلِ بِأُمَّتِهِ وَلَا يَتَكَلَّمُ يَوْمَئِذٍ أَحَدٌ إِلَّا الرُّسُلُ وَكَلَامُ الرُّسُلِ يَوْمَئِذٍ اللَّهُمَّ سَلَّمْ سَلَّمْ وَفِي جَهَنَّمَ كَلَالِيبُ مِثْلُ شَوْكِ السَّعْدَانِ ... غَيْرَ أَنَّهُ لَا يَعْلَمُ قَدْرَ عِظَمِهَا إِلَّا اللَّهُ تَخْطَفُ النَّاسَ بِأَعْمَالِهِمْ فَمِنْهُمْ مَنْ يُوبَقُ بِعَمَلِهِ وَمِنْهُمْ مَنْ يُخَرَّدَلُ ثُمَّ يَنْجُو "অতঃপর জাহান্নামের মধ্য দিয়ে রাস্তা বসানো হবে। তখন রাসূলগেণর মধ্য থেকে আমিই প্রথম আমার উম্মাত নিয়ে তা অতিক্রম করব। সেদিন রাসূলগণ ছাড়া কেউ কথা বলবেন না। আর রাসনৃগণের কথা হবে: নিরাপত্তা দিন, নিরাপত্তা দিন। জাহান্নামের মধ্যে মরুভূমির 'সা'দান' বৃক্ষের কাটার মত দেখতে অতিকায় বিশাল বিশাল আংটা বা হুক থাকবে... যেগুলির আকৃতির বিশালত্ব আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। সেগুলি মানুষদেরকে তাদের কর্মের অনুপাতে টেনে নিবে। তাদের মধ্যে কেউ তার কর্মের কারণে ধ্বংসগ্রস্ত হবে এবং কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হবে এবং এরপর মুক্তিলাভ করবে।....." অন্য হাদীসে আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
ثُمَّ يُؤْتَى بِالْجَسْرِ فَيُجْعَلُ بَيْنَ ظَهْرَيْ جَهَنَّمَ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا الْجَسْرُ قَالَ مَدْحَضَةٌ مَزِلَّةٌ عَلَيْهِ خَطَاطِيفُ وَكَلَالِيبُ وَحَسَكَةٌ مُفَلَّطَحَةٌ لَهَا شَوْكَةٌ عُقَيْفَاءُ تَكُونُ بِنَجْدٍ يُقَالُ لَهَا السَّعْدَانُ الْمُؤْمِنُ عَلَيْهَا كَالطَّرْفِ وَكَالْبَرْقِ وَكَالرِّيحِ وَكَأَجَاوِيدِ الْخَيْلِ وَالرِّكَابِ فَنَاجٍ مُسَلَّمٌ وَنَاجٍ مَحْدُوشٌ وَمَكْدُوسٌ فِي نَارِ جَهَنَّمَ حَتَّى يَمُرَّ آخِرُهُمْ يُسْحَبُ سَحْبًا "অতঃপর সেতু আনয়ন করা হবে এবং জাহান্নামের উপরে তা স্থাপন করা হবে। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, সেতুটি কী? তিনি বললেন: অতিপিচ্ছিল ও পতনের স্থান, যার উপরে রয়েছে টেনে নেওয়ার জন্য আংটা এবং বিশালাকৃতির বক্র কাঁটা রয়েছে সেগুলি দেখতে নাজদের সা'দান বৃক্ষের কাঁটার ন্যায়। মুমিন সে সেতুর উপর দিয়ে দৃষ্টির দ্রুততায়, কেউ বিদ্যুতের গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ শক্তিশালী ঘোড়ার ন্যায়, কেউ উষ্ট্রের গতিতে পার হবে, কেউ নিরাপদে অতিক্রম করবে, কেউ আগুনের মধ্যে আহত ও কেউ আগুনের মধ্যে জমাকৃত, এভাবে সর্বশেষ ব্যক্তিকে টেনে হিচড়ে পার করা হবে।"
মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে বলেন:
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا ثُمَّ تُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا "তোমাদের প্রত্যেকেই তথায় আগমন করবে (তা অতিক্রম করবে), এ তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। পরে আমি মুত্তাকীদেরকে উদ্ধার করব এবং জালিমদেরকে সেথায় নতজানু অবস্থায় রেখে দিব।" সাহাবী-তাবিয়ী মুফাস্সিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, এখানে সিরাত অতিক্রম করার বিষয়টিই উল্লেখ করা হয়েছে।
📄 হাউয
হাউয (الحوض) অর্থ চৌবাচ্চা, পুকুর বা জলাশয়। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম নবী মুহাম্মাদ -কে একটি পবিত্র 'হাউয' দান করেছেন যেখান থেকে তাঁর উম্মাত কিয়ামতের দিন পানি পান করবে। ত্রিশেরও অধিক সাহাবী থেকে মুতাওয়াতির পর্যায়ে এ বিষয়ে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আল্লামা ইবনু আবিল ইয্য হানাফী শারহুল আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ গ্রন্থে বলেন:
الأَحَادِيثُ الْوَارِدَةُ فِي ذِكْرِ الْحَوْضِ تَبْلُغُ حَدَّ التَّوَاتُرِ رَوَاهَا مِنَ الصَّحَابَةِ بِضْعٌ وَثَلَاثُونَ صَحَابِيًّا، وَلَقَدِ اسْتَقْصَى طُرُقَهَا شَيْخُنَا الْعَلَّامَةُ عِمَادُ الدِّينِ ابْنُ كَثِيرٍ تَغَمَّدَهُ اللَّهُ بِرَحْمَتِهِ فِي آخِرِ تَارِيخِهِ الْكَبِيرِ الْمُسَمَّى الْبِدَايَةُ وَالنِّهَايَةُ "হাউযের বিষয়ে বর্ণিত হাদীসগুলি মুতাওয়াতির পর্যায়ের। প্রায় ৩৫ জন সাহাবী থেকে এ বিষয়ক হাদীসগুলি বর্ণিত। আমাদের উস্তাদ আল্লামা ইমাদুদ্দীন ইবনু কাসীর (রাহ) 'আল-বিদয়া ওয়ান নিহায়া' নামক তার বৃহৎ ইতিহাসগ্রন্থের শেষে এ বিষয়ক হাদীসগুলি একত্রিত করেছেন।" এক হাদীসে আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ قَدْرَ حَوْضِي كَمَا بَيْنَ أَيْلَةَ وَصَنْعَاءَ مِنَ الْيَمَنِ وَإِنَّ فِيهِ مِنَ الْأَبَارِيقِ كَعَدَدِ نُجُومِ السَّمَاءِ "ফিলিস্তিন থেকে ইয়ামানের সান'আ পর্যন্ত যে দূরত্ব আমার হাউযের পরিমান তদ্রূপ। তথায় পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির ন্যায়।" অন্য হাদীসে আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ حَوْضِي أَبْعَدُ مِنْ أَيْلَةَ مِنْ عَدَنَ لَهُوَ أَشَدُّ بَيَاضًا مِنَ الثَّلْجِ وَأَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ بِاللَّبَنِ وَلِآنِيَتِهِ أَكْثَرُ مِنْ عَدَدِ النُّجُومِ وَإِنِّي لَأَصُدُّ النَّاسَ عَنْهُ كَمَا يَصُدُّ الرَّجُلُ إِيلَ النَّاسِ عَنْ حَوْضِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَتَعْرِفُنَا يَوْمَئِذٍ قَالَ نَعَمْ لَكُمْ سِيمَا لَيْسَتْ لأَحَدٍ مِنَ الْأُمَمِ تَرِدُونَ عَلَيَّ غُرًّا مُحَجَّلِينَ مِنْ أَثَرِ الْوُضُوءِ "আদান (ইয়ামান) থেকে আইলা (ফিলিস্তিন)-এর যে দূরত্ব তার চেয়ে বেশি প্রশস্ততা আমার হাউযের। তার পানি বরফের চেয়েও বেশি শুভ্র এবং মধু মিশ্রিত দুগ্ধের চেয়েও বেশি মিষ্ট। তার পানপাত্রগুলি সংখ্যা আকাশের তারকারাজির চেয়েও বেশি। একজন মানুষ যেমন তার হাউয থেকে অন্য মানুষদের উট ঠেকিয়ে রাখে আমি তেমন ভাবে আমার উম্মাত ছাড়া অন্য মানুষদের ঠেকিয়ে রাখব। সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি আমাদেরকে চিনবেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ, তোমদের এমন একটি চিহ্ন রয়েছে যা অন্য কোনো উম্মাতের নেই, তোমরা আমার নিকট যখন আগমন করবে তখন ওযুর কারণে তোমাদের ওযুর অঙ্গগুলি শুভ্রতায় উদ্ভাসিত থাকবে।" সাহল ইবনু সা'দ, আবু সাইদ খুদরী ও আবু হুরাইরা (এ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেছেন:
إِنِّي فَرَطْكُمْ عَلَى الْحَوْضِ مَنْ مَرَّ عَلَيَّ شَرِبَ وَمَنْ شَرِبَ لَمْ يَظْمَأْ أَبَدًا لَيَرِدَنَّ عَلَيَّ أَقْوَامٌ أَعْرِفُهُمْ وَيَعْرِفُونِي ثُمَّ يُحَالُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ، فَأَقُولُ: إِنَّهُمْ مِنِّي فَيُقَالُ إِنَّكَ لَا تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ في رواية : إِنَّكَ لَا تَدْرِي مَا عَمِلُوا بَعْدَكَ، فَأَقُولُ سُحْقًا سُحْقًا لِمَنْ غَيَّرَ بَعْدِي. "আমি আগে হাউযে গিয়ে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করব। যে আমার কাছে যাবে সে (হাউয) থেকে পান করবে, আর যে পান করবে সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না। অনেক মানুষ আমার কাছে (হাউযে পানি পানের জন্য) আসবে, যাদেরকে আমি চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে, কিন্তু তাদেরকে আমার কাছে আসতে দেওয়া হবে না, বাধা দেওয়া হবে। আমি বলব: এরা তো আমারই উম্মত। তখন উত্তরে বলা হবে: আপনি জানেন না, এরা আপনার পরে কী-সব নব উদ্ভাবন করেছিল। (দ্বিতীয় বর্ণনায়: আপনার পরে তারা কী আমল করেছে তা আপনি জানেন না।) তখন আমি বলব: যারা আমার পরে পরিবর্তন করেছে তারা দূর হয়ে যাক! তারা দূর হয়ে যাক!!" আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন:
بَيْنَمَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ يَوْمٍ بَيْنَ أَظْهُرِنَا إِذْ أَغْفَى إِغْفَاءَةً ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ مُتَبَسِّمًا فَقُلْنَا مَا أَضْحَكَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ ( ...، ثُمَّ قَالَ أَتَدْرُونَ مَا الْكَوْثَرُ؟ فَقُلْنَا اللَّهُ أُنزِلَتْ عَلَيَّ آنِفًا سُورَةٌ فَقَرَأَ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ . قَالَ : فَإِنَّهُ نَهْرٌ وَعَدَنِيهِ (أعطانيه) رَبِّي عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْهِ خَيْرٌ كَثِيرٌ هُوَ حَوْضٌ تَرِدُ عَلَيْهِ أُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ آنِيَتُهُ عَدَدُ النُّجُومِ فَيُخْتَلَجُ الْعَبْدُ مِنْهُمْ فَأَقُولُ رَبِّ إِنَّهُ مِنْ أُمَّتِي فَيَقُولُ مَا تَدْرِي مَا أَحْدَثَتْ بَعْدَكَ "একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝে ছিলেন। তিনি একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হন। এরপর তিনি হাঁসিমখে মাথা উঠান। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি হাঁসছেন কেন? তিনি বলেন, এখন আমার উপরে একটি সূরা নাযিল করা হলো। অতঃপর তিনি সূরা কাউসার পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেন, তোমরা কি জান কাউসার কী? আমরা বললাম: আল্লাহ এবং তার রাসূলই অধিক অবগত। তিনি বলেন: কাউসার হলো একটি নদী যা মহান আল্লাহ আমাকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন (অন্য বর্ণনায়: যা তিনি আমাকে প্রদান করেছেন)। তাতে রয়েছে অনেক কল্যাণ। এ হলো হাউয, যেখানে আমার উম্মাত কিয়ামতের দিন আমার নিকট আগমন করবে। তার পানপাত্রগুলি তারকারাজির ন্যায়। কোনো কোনো বান্দাকে সেখান থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক, এ তো আমার উম্মাতের একজন। তখন তিনি বলবেন, আপনি জানেন না, আপনার পরে এরা কি নব-উদ্ভাবন করেছিল।" অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ وَزَوَايَاهُ سَوَاءٌ وَمَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ الْوَرِقِ (مِنَ اللَّبَنِ) وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ الْمِسْكِ وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَا يَظْمَأُ بَعْدَهُ أَبَدًا "আমার হাউযের প্রশস্ততা একমাসের পথ। এর সকল কোণ সমান। এর পানি দুধের চেয়েও (অন্য বর্ণনায় রৌপ্যের চেয়েও) শুভ্র এবং মেশকের চেয়েও অধিক সুগন্ধ। তার পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির ন্যায়। যে ব্যক্তি এ থেকে পান করবে সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।"
📄 জান্নাত ও জাহান্নাম
জান্নাত ও জাহান্নম মানুষের চূড়ান্ত ঠিকানা ও গন্তব্যস্থল। কুরআন ও হাদীসে জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ রয়েছে। আমরা ইতোপূর্বে বলেছি যে, কুরআন কারীমের প্রায় প্রতি পৃষ্ঠাতেই আখিরাত ও জান্নাত-জাহান্নাম বিষয়ক কিছু কথা রয়েছে। এখানে দু-একটি আয়াত উল্লেখ করছি। মহান আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ "হে মু'মিনগণ, তোমরা নিজদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর অগ্নি হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মমহৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফিরিস্তাগণ, যারা অমান্য করে না আল্লাহ তাদেরকে যা আদেশ করেন, আর তারা যা করতে আদিষ্ট হয় তাই করে।" অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
يَوْمَ نَقُولُ لِجَهَنَّمَ هَلِ امْتَلَأْتِ وَتَقُولُ هَلْ مِنْ مَزِيدٍ وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ غَيْرَ بَعِيدٍ هَذَا مَا تُوعَدُونَ لِكُلِّ أَوَّابٍ
حَفِيظٌ مَنْ خَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ وَجَاءَ بِقَلْبٍ مُنِيبٍ ادْخُلُوهَا بِسَلَامٍ ذَلِكَ يَوْمُ الْخُلُودِ لَهُمْ مَا يَشَاءُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ "সে দিন আমি জাহান্নামকে জিজ্ঞাসা করব, 'তুমি কি পূর্ণ হয়ে গিয়েছ?' জাহান্নাম বলবে: 'আরও আছে কি?' আর জান্নাতকে নিকটস্থ করা হবে মুত্তাকীগণের, কোনো দূরত্ব থাকবে না। এরই প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল প্রত্যেক আল্লাহ অভিমুখী হিফাযতকারীর জন্য। যারা না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে এবং বিনীতচিত্তে উপস্থিত হয়। তাদেরকে বলা হবে, 'শান্তির সাথে তোমরা এতে প্রবেশ কর; তা অনন্ত জীবনের দিন।' সেথায় তারা যা কামনা করবে তাই পাবে এবং আমার নিকট রয়েছে আরো অধিক।" তিনি আরো বলেন:
أَذَلِكَ خَيْرٌ نُزُلًا أَمْ شَجَرَةُ الزَّقُّومِ إِنَّا جَعَلْنَاهَا فِتْنَةً لِلظَّالِمِينَ إِنَّهَا شَجَرَةٌ تَخْرُجُ فِي أَصْلِ الْجَحِيمِ طَلْعُهَا كَأَنَّهُ رُءُوسُ الشَّيَاطِينِ فَإِنَّهُمْ لَآكِلُونَ مِنْهَا فَمَالِئُونَ مِنْهَا الْبُطُونَ ثُمَّ إِنَّ لَهُمْ عَلَيْهَا لَشَوْبًا مِنْ حَمِيمٍ "আপ্যায়নের জন্য এ-ই শ্রেয় না যাক্কুম বৃক্ষ? জালিমদের জন্য আমি তা সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ। এ বৃক্ষ উদগত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে, এর মোচা যেন শয়তানের মাথা তারা তা হতে ভক্ষণ করিবে, এবং উদর পূর্ণ করবে এর দ্বারা। তদুপরি তাদের জন্য ফুটন্ত পানির মিশ্রণ।" অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامِ أَمِينٍ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ يَلْبَسُونَ مِنْ سُنْدُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَقَابِلِينَ كَذَلِكَ وَزَوَّجْنَاهُمْ بِحُورٍ عِينٍ يَدْعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فَاكِهَةٍ آمِنِينَ لَا يَذُوقُونَ فِيهَا الْمَوْتَ إِلَّا الْمَوْتَةَ الْأُولَى وَوَقَاهُمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ فَضْلًا مِنْ رَبِّكَ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ "মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে, উদ্যান ও ঝর্ণার মাঝে, তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং মুখামুখী হয়ে বসবে। এইরূপ ঘটবে; তাদেরকে সঙ্গিনী দিব আয়তলোচনা হুর, সেথায় তারা প্রশান্ত চিত্তে বিবিধ ফল মূল আনতে বলবে। প্রথম মৃত্যুর পর তারা সেথায় আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না। তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করিবেন, তোমার প্রতিপালক নিজ অনুগ্রহে। এ-ই তো মহা সাফল্য।" ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেন:
وَالْجَنَّةُ وَالنَّارُ مَخْلُوقَتَانِ الْيَوْمَ لَا تَفْنِيَانِ أَبَدًا، وَلَا تَمُوتُ الْحُورُ الْعِينُ أَبَدًا، وَلَا يَفْنِي عِقَابُ اللَّهِ تَعَالَى وَثَوَابُهُ سَرْمَدًا. "জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমানে সৃষ্ট অবস্থায় রয়েছে (পূর্বেই তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে।) জান্নাত ও জাহান্নাম কখনোই বিলুপ্ত হবে না। আয়তলোচনা হুরগণ কখনোই মৃত্যুবরণ করবে না। মহান আল্লাহর অনন্ত-চিরস্থায়ী শাস্তি ও পুরস্কার কখনোই বিলুপ্ত হবে না।"