📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 নবী-রাসূলগণের জীবন-বৃত্তান্ত

📄 নবী-রাসূলগণের জীবন-বৃত্তান্ত


কুরআনে বর্ণিত ২৫জন নবীর মধ্যে কারো-কারো বিষয়ে আল্লাহ বিস্তারিত কিছু বর্ণনা দান করেছেন। যেমন, নূহ, ইব্রাহিম, মূসা, ইউসূফ, ঈসা, হুদ, সালেহ, ও লুত। আর কারো কারো সম্পর্কে শুধুমাত্র নবৃয়তের উল্লেখ করেছেন, যেমন যুলকিফল, ইলইয়াস, ইলইয়াসা' (আলাইহিমুস সালাম)।
সকল নবীর ক্ষেত্রে কুরআনের বর্ণনা ও বিবরণ থেকে আমরা লক্ষ্য করি যে, কখনোই তাদের ব্যপারে ঐতিহাসিক বা ভৌগলিক তথ্য প্রদানের বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাদের বংশ বিবরণ, দেশ, যুগ, বয়স, ভাষা ইত্যাদি সম্পর্কে সাধারণভাবে কোনো কিছুই বলা হয়নি।
কুরআন কারীমে নূহ (আ)-এর বিষয়ে বলা হয়েছে যে, তিনি ৯৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন। এছাড়া অন্য কোনো নবীর আয়ুষ্কাল কুরআন কারীমে উল্লেখ করা হয় নি। আদম (আ) এর আয়ুষ্কাল ১ হাজার বৎসর বলে একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ক আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
মূলত কুরআন কারীমে নবী-রাসূলগণের বর্ণনার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র আলোচনা করা হয়েছে তাঁদের প্রতি আল্লাহর করুণা, সাহায্য, তাঁদের দাওয়াত বা তাঁদের জাতির প্রতি তাঁদের শিক্ষা ও আহবান কি ছিল, তাঁদের আহবানে তাদের জাতির প্রতিক্রিয়া কিরূপ ছিল, তাঁদের ডাকে যারা সাড়া দিয়েছেন এবং যারা অবিশ্বাস করেছেন তাঁদের প্রতি তাদের কি বক্তব্য ছিল, বিশ্বাসী অবিশ্বাসীদের মধ্যের বিরোধ ও দ্বন্ধ, তাদের কর্মের ফলাফল কি হয়েছিল ইত্যাদি সম্পর্কে। এ সকল বিষয়ের প্রয়োজনে কখনো কখনো কোনো কোনো নবীর পিতা বা মাতার নাম বা জন্মবৃত্তান্ত বা জীবনের কিছু ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, অন্যথায় এসকল বিষয় সম্পূর্নরূপে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। যেমন: ঈসা (আ)-এর জন্মবৃত্তান্ত ও তাঁর মাতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মুসা (আ)-এর জন্মবৃত্তান্ত ও দেশের উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ নবী, যেমন নূহ, লুত, হুদ, সালেহ, আইয়ূব, মূল-কিফ্ল ইলইয়াস প্রমুখ নবীর (আ) ক্ষেত্রে তাঁদের পিতা, মাতা, যুগ বা দেশের কোনো উল্লেখ করা হয়নি।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 নবী-রাসূলগণ আল্লাহর বান্দা, মানুষ ও পুরুষ ছিলেন

📄 নবী-রাসূলগণ আল্লাহর বান্দা, মানুষ ও পুরুষ ছিলেন


কুরআন কারীম বারংবার উল্লেখ করেছে যে, নবী-রাসূলগণ সকলেই আল্লাহর বান্দা ও মানুষ ছিলেন। তাঁরা সকলেই পুরুষ ছিলেন। আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, পূর্ববর্তী নবীগণের নুবুওয়াত অস্বীকার করার ক্ষেত্রে কাফিরগণের বড় 'দলিল' ছিল যে, নবীগণ তাদের মতই মানুষ, কাজেই তাঁরা নবী হতে পারেন না। অপরদিকে কোনো কোনো বিভ্রান্ত সম্প্রদায় তাদের নবীদের অলৌকিক কর্মকাণ্ড, আয়াত বা মুজিযাকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে তাঁদেরকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত বা উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং আল্লাহর বিশেষ বান্দা হওয়ার কারণে তাদেরকে 'আল্লাহর পুত্র' বা 'আল্লাহর সন্তান' বলে আখ্যায়িত করেছে। কুরআন কারীমে সকল
বিভ্রান্তির অপনোদন করে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবীগণ মানুষ ছিলেন, তবে তাঁর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত ও ওহীপ্রাপ্ত মানুষ ছিলেন। তাঁরা কোনো 'ঐশ্বরিক ক্ষমতা' বা কারো কল্যাণ বা অকল্যাণ করার অধিকারী ছিলেন না। তাঁদের মর্যাদা আল্লাহর প্রিয়তম বান্দা ও রাসূল হওয়ায়; আল্লাহর ক্ষমতা, গুণাবলি বা ইবাদত পাওয়ার বিষয়ে আল্লাহর শরীক হওয়ায় নয়।
তাঁদের মানবত্ব প্রমাণের জন্য মহান আল্লাহ মাঝে মাঝে তাঁদের মানবীয় দিকগুলি উল্লেখ করেছেন, যেমন তাঁদের খাদ্যগ্রহণ, বাজার করা, বিবাহ-শাদি, সন্তান গ্রহণ, মৃত্যুবরণ, মানবীয় সীমাবদ্ধতা, কল্যাণ-অকল্যাণে অক্ষমতা, আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশের বাইরে কোনো অলৌকিক কর্ম করতে না পারা ইত্যাদি। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
قَالُوا إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا تُرِيدُونَ أَنْ تَصُدُّونَا عَمَّا كَانَ يَعْبُدُ آبَاؤُنَا فَأْتُونَا بِسُلْطَانٍ مُبِينٍ. قَالَتْ لَهُمْ رُسُلُهُمْ إِنْ نَحْنُ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَمُنُّ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَمَا كَانَ لَنَا أَنْ نَأْتِيَكُمْ بِسُلْطَانٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ "তারা (কাফিরগণ) বলত: 'তোমরা (নবীগণ) তো আমাদেরই মত মানুষ। আমাদের পিতৃপুরুষগণ যাদের ইবাদত করত তোমরা তাদের ইবাদত থেকে আমাদেরকে বিরত রাখতে চাও। অতএব তোমরা আমাদের নিকট কোনো অকাট্য প্রমাণ (অলৌকিক চিহ্ন বা মুজিযা) উপস্থিত কর। তাদের রাসূলগণ তাদেরকে বলতেন: সত্য বটে আমরা তোমাদের মত মানুষই, কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত তোমাদের নিকট প্রমাণ (মুজিযা) উপস্থিত করা আমাদের কাজ নয়। মুমিনগণের আল্লাহরই উপর নির্ভর করা উচিত।" অন্যত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى "আপনার পূর্বে জনপদবাসীদের মধ্য থেকে পুরুষ মানুষগণকে ছাড়া কাউকে প্রেরণ করি নি (রিসালাত-নুবওয়াতের দায়িত্ব প্রদান করি নি), যাদেরকে আমি ওহী প্রদান করেছিলাম।" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ فَيُضِلُّ اللَّهُ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ "আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য; অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।" অর্থাৎ নবী-রাসূলগণের দায়িত্ব তাদের সম্প্রদায়ের বোধগম্য ভাষায় দীনের কথা প্রচার ও ব্যাখ্যা করা। হেদায়াত করা বা না করা তাদের দায়িত্ব নয়, বরং তা আল্লাহর দায়িত্ব। আল্লাহ আরো বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنَ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا إِنَّهُمْ لَيَأْكُلُونَ الطَّعَامَ وَيَمْشُونَ فِي الْأَسْوَاقِ "তোমার পূর্বে আমি যে সব রাসূল প্রেরণ করেছি তার সকলেই তো আহার করত এবং হাটে বাজারে চলাফেরা করত।" মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন:
مَا الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ كَانَا يَأْكُلَانِ الطَّعَامَ "মারয়াম তনয় মসীহ তো একজন রাসূল মাত্র, তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে, এবং তার মাতা সত্যনিষ্ঠ ছিল। তারা উভয়ে খাদ্যাহার করত।" অন্যত্র তিনি বলেন:
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ "মুহাম্মাদ একজন রাসূল মাত্র; তার পূর্বে রাসূলগণ গত হয়েছে। সুতরাং যদি সে মৃত্যু বরণ করে অথবা নিহত হয় তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে?" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً وَمَا كَانَ لِرَسُولٍ أَنْ يَأْتِيَ بِآيَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ لِكُلِّ أَجَلٍ كِتَابٌ "তোমার পূর্বেও অনেক রাসূল প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছিলাম। আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত
কোনো নিদর্শন (মুজিযা) উপস্থিত করা কোনো রাসূলের কাজ নয়। প্রক্যেক বিষয়ে নির্ধারিত কাল লিপিবদ্ধ।" অন্যত্র বলা হয়েছে:
إِلَّا قَوْلَ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ لأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَا أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ "তবে ইবরাহীম তার পিতাকে বলেছিল: আমি নিশ্চয় তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব এবং আমি তোমার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট কোনো অধিকার রাখি না।" ইতোপূর্বে তৃতীয় অধ্যায়ে রাসূলুল্লাহ-এর ইলম ও ক্ষমতা বিষয়ক আলোচনায় আমরা এ অর্থে কয়েকটি আয়াত দেখতে পেয়েছি।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 সকল নবী-রাসূলের দাও‘আত এক

📄 সকল নবী-রাসূলের দাও‘আত এক


নবী রাসূলদের বিষয়ে কুরআন কারীমের বিবরণের আলোকে আমরা বুঝতে পারি যে, তাঁদের সকলের দা'ওয়াত এর বিষয় মূলত: এক ছিল। তাঁরা সবাই মানুষদেরকে তাওহীদ বা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে আহবান করেছেন এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করতে নিষেধ করছেন। মানুষদেরকে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর শিখানো পথে চলতে এবং সকল মানুষের জন্য কল্যাণময় সামাজিক জীবনে বাস করতে পথ নির্দেশ দিয়েছেন। যে কর্ম বা আচরণ মানুষের অকল্যাণ করে বা মানুষের কাছে তার মহান স্রষ্টার সম্পর্কে ক্ষতি করে তা থেকে তারা মানুষদের কে নিষেধ করেছেন। তাদের মূল দাওয়াত ও ধর্ম ছিল এক ও অভিন্ন ইসলাম, তবে তাদের বিস্তারিত শরীয়াত বা বিধানাবলী ছিল যুগ ও সমাজ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন। মানুষদেরকে কল্যাণের পথে আহবান করা, পথের নির্দেশ দেওয়াই ছিল তাদের দায়িত্ব। তাদের আহবানে সাড়া দেওয়া বা না দেওয়া ছিল মানুষের এখতিয়ার।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 ইসমাতুল আম্বিয়া

📄 ইসমাতুল আম্বিয়া


ইসমাত (العصمة) শব্দটি 'আসামা' (عصم) ক্রিয়ামূল থেকে গৃহীত, যার অর্থ নিষেধ করা, সংরক্ষন করা বা হেফাযত করা (to hold back, restrain, curb, check, prevent, guard, safeguard, protect)। আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ "হে রাসূল, আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা আপনি প্রচার করুন। যদি আপনি তা না করেন তাহলে আপনি আল্লাহর বার্তা প্রচার করলেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষদের থেকে রক্ষা করবেন।"
ইসমাতুল আম্বিয়া বলতে নবীগণের অভ্রান্ততা বা নিষ্পপত্ব (sinlessness, infallibility) বুঝানো হয়। নবীগণকে আল্লাহ সংরক্ষণ করেন বা হেফাযত করেন, ফলে তাঁরা বিভ্রান্তি বা পাপের মধ্যে নিপতিত হন না। কুরআন ও হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, সকল নবী-রাসূলই আল্লাহর মনোনীত নিষ্কলুষ নিষ্পাপ প্রিয় বান্দা ছিলেন। কুরআন কারীমে মহান আল্লাহ বারংবার ঘোষণা করেছেন যে, নবীগণ বিশেষভাবে আল্লাহর রহমত, হেদায়াত ও মনোনয়ন প্রাপ্ত। মহান আল্লাহ বলেন:
اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ "আল্লাহ উত্তম জানেন কোথায় তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব অর্পন করবেন।" এ থেকে বুঝা যায় যে, বিশেষ মনোনীত ও নিষ্কলুষ নিষ্পাপ ব্যক্তি ছাড়া কাউকে আল্লাহ এ দায়িত্ব প্রদান করেন না। অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
أُولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ مِنْ ذُرِّيَّةِ آدَمَ وَمِمَّنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ وَمِنْ ذُرِّيَّةِ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْرَائِيلَ وَمِمَّنْ هَدَيْنَا وَاجْتَبَيْنَا "এরা নবীগণের অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে আল্লাহ অনুগ্রহ প্রদান করেছেন, তারা আদমের ও যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম তাদের বংশোদ্ভূত, ইবরাহীম ও ইসরাঈলের বংশোদ্ভূত ও যাদেরকে আমি পথ-নির্দেশ করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম।" আল্লাহ বারংবার নবীগণকে পবিত্র, একনিষ্ঠ, সৎ ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করেছেন। সর্বোপরি মহান আল্লাহ মানব জাতিকে নবী-রাসূলদের 'ইত্তিবা' বা অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশও প্রমাণ করে যে, তাঁরা 'নিষ্পাপ' ছিলেন। কারণ যার থেকে পাপ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাকে নিঃশর্ত 'ইত্তিবা' করার নির্দেশ আল্লাহ দিবেন না। কুরআন ও হাদীসের এ সকল নিদের্শনার আলোকে মুসলিম উম্মাহর বিশ্বাস এই যে, নবীগণ সকলেই আল্লাহর বিশেষ করুণাপ্রাপ্ত ও প্রিয় বান্দা ছিলেন। তারা সবাই পবিত্র ও নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তারা সবাই নিষ্পাপ ছিলেন সকল প্রকার পাপ বা অন্যায় থেকে মুক্ত ছিলেন। মানবীয় ভুলত্রুটি ছাড়া কোনো পাপে তারা কখনও লিপ্ত হননি। ইসমাতুল আম্বিয়া বিষয়ে ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেন:
الْأَنْبِيَاءُ كُلُّهُمْ مُنَزَّهُونَ عَنِ الصَّغَائِرِ وَالْكَبَائِرِ وَالْكُفْرِ وَالْقَبَائِحِ، وَقَدْ كَانَتْ مِنْهُمْ زَلَّاتٌ وَخَطِيئَاتٌ. وَمُحَمَّدٌ نَبِيُّهُ، وَعَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، وَصَفِيُّهُ وَنَقِيُّهُ، وَلَمْ يَعْبُدِ الصَّنَمَ وَلَمْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ تَعَالَى طَرْفَةَ عَيْنٍ قَطُّ، وَلَمْ يَرْتَكِبْ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً قَطُّ. "নবীগণ সকলেই সগীরা গোনাহ, কবীরা গোনাহ, কুফ্র ও অশালীন কর্ম থেকে পবিত্র ও বিমুক্ত ছিলেন। তবে কখনো কখনো সামান্য পদস্খলন ও ভুলত্রুটি তাদের ঘটেছে। এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর নবী, তাঁর বান্দা, তাঁর রাসূল, তাঁর মনোনিত নির্বাচিত, তাঁর বাছাইকৃত। তিনি কখনো মুর্তির ইবাদত করেন নি এবং কখনোই এক পলকের জন্যও আল্লাহর সাথে শিরক করেন নি। তিনি কখনোই কোনো সগীরা বা কবীরা কোনো প্রকারের পাপে লিপ্ত হন নি।" 'আল-আকাইদ আন-নাসাফিয়্যাহ'-এর লেখক আল্লামা উমর ইবনু মুহাম্মাদ আন-নাসাফী (৫৩৭হি.) নবীগণের (আ)-এর বিষয়ে বলেন:
كُلُّهُمْ كَانُوا مُخْبِرِينَ مُبَلِّغِينَ عَنِ اللَّهِ تَعَالَى صَادِقِينَ نَاصِحِينَ لِلْخَلْقِ "তাঁরা সকলেই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ প্রদান করেছেন এবং প্রচার করেছেন, সত্যবাদী ছিলেন, সৃষ্টির উপদেশদাতা ও কল্যাণকামী ছিলেন।"
এ কথার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা সা'দ উদ্দীন তাফতাযানী (৭৯১হি), শারহুল আকাইদ আন নাসাফিয়্যাহ গ্রন্থে বলেন:
فِي هَذَا إِشَارَةٌ إِلَى أَنَّ الْأَنْبِيَاءَ مَعْصُومُونَ عَنِ الْكَذِبِ خُصُوصًا فِيمَا يَتَعَلَّقُ بِأَمْرِ الشَّرَائِعِ وَتَبْلِيغِ الْأَحْكَامِ وَإِرْشَادِ الْأُمَّةِ. أَمَّا عَمْدًا فَبِالإِجْمَاعِ. وَأَمَّا سَهْوًا فَعِنْدَ الأَكْثَرِينَ. وَفِي عِصْمَتِهِمْ عَنْ سَائِرِ الذُّنُوبِ تَفْصِيلٌ. وَهُوَ أَنَّهُمْ مَعْصُومُونَ عَنِ الْكُفْرِ قَبْلَ الْوَحْيِ وَبَعْدَهُ بِالإِجْمَاعِ. وَكَذَا عَنْ تَعَمُّدِ الْكَبَائِرِ عِنْدَ الْجُمْهُورِ، خِلَافًا لِلْحَشْوِيَّةِ ... وَأَمَّا سَهْوًا فَجَوَّزَهُ الأَكْثَرُونَ. أَمَّا الصَّغَائِرُ فَيَجُوزُ عَمْدًا عِنْدَ الْجُمْهُورِ خِلَافًا لِلْجُبَّائِيِّ وَأَتْبَاعِهِ، وَيَجُوزُ سَهْوًا بِالاتِّفَاقِ، إِلَّا مَا يَدُلُّ عَلَى الْخِسَّةِ، كَسَرِقَةِ لُقْمَةٍ، وَالتَّطْفِيفِ بِحَبَّةٍ. لَكِنَّ الْمُحَقِّقُونَ اشْتَرَطُوا أَنْ يُنَبَّهُوا عَلَيْهِ فَيَنْتَهُوا عَنْهُ. وَهَذَا كُلُّهُ بَعْدَ الْوَحْيِ، وَأَمَّا قَبْلَهُ فَلَا دَلِيلَ عَلَى امْتِنَاعِ صُدُورِ الْكَبِيرَةِ. وَذَهَبَتِ الْمُعْتَزِلَةُ إِلَى امْتِنَاعِهَا لِأَنَّهَا تُوجِبُ النُّفْرَةَ الْمَانِعَةَ عَنِ اتِّبَاعِهِمْ فَتَفُوتُ مَصْلَحَةُ الْبِعْثَةِ. وَالْحَقُّ مَنْعُ مَا يُوجِبُ النُّفْرَةَ، كَعَهْرِ الْأُمَّهَاتِ وَالْفُجُورِ، وَالصَّغَائِرِ الدَّالَّةِ عَلَى الْخِسَّةِ. وَمَنَعَتِ الشِّيعَةُ صُدُورَ الصَّغِيرَةِ وَالْكَبِيرَةِ قَبْلَ الْوَحْيِ وَبَعْدَهُ، لَكِنَّهُمْ جَوَّزُوا إِظْهَارَ الْكُفْرِ تَقِيَّةً. وَإِذَا تَقَرَّرَ هَذَا فَمَا نُقِلَ عَنِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ مِمَّا يُشْعِرُ بِكَذِبٍ أَوْ مَعْصِيَةٍ فَمَا كَانَ مَنْقُولًا عَنْ طَرِيقِ الْآحَادِ فَمَرْدُودٌ، وَمَا كَانَ بِطَرِيقِ التَّوَاتُرِ فَمَصْرُوفٌ عَنْ ظَاهِرِهِ إِنْ أَمْكَنَ، وَإِلَّا فَمَحْمُولٌ عَلَى تَرْكِ الْأَوْلَى، أَوْ كَوْنِهِ قَبْلَ الْبِعْثَةِ. "এতে ইশারা করা হয়েছে যে, নবীগণ বিশেষভাবে শরীয়তের বিষয়ে, দীনের আহকাম প্রচারের বিষয়ে ও উম্মাতকে নির্দেশনা প্রদানের বিষয়ে মা'সূম বা নির্ভুল ও সংরক্ষিত। এক্ষেত্রে তাঁরা ইচ্ছাকৃত কোনো ভুল করেন না সে বিষয়ে সকলেই একমত এবং অধিকাংশের মতে এক্ষেত্রে তাঁরা অনিচ্ছাকৃত বা বেখেয়ালেও কোনো ভুল করতে পারেন না। অন্যান্য সকল পাপ থেকে তাদের মা'সূম বা নিষ্পাপ হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। বিস্তারিত আলোচনা নিম্নরূপ: মুসলিম উম্মাহর ইজমা বা ঐকমত্য এই যে, নবীগণ ওহী বা নুবুওয়াত লাভের পূর্বে ও পরে কুফ্রী থেকে সংরক্ষিত বা মা'সূম। অনুরূপভাবে অধিকাংশের মতে তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে কবীরা গোনাহে লিপ্ত হওয়া থেকেও মা'সূম। হাশাবিয়া সম্প্রদায় এ বিষয়ে মতভেদ করেছে (তারা নবীগণ কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে কবীরা গোনাহে লিপ্ত হওয়া সম্ভব বলেছে।) আর ইচ্ছাকৃত সগীরা গোনাহে লিপ্ত হওয়ার বিষয়ে অধিকাংশের মত এই যে, তা সম্ভব। তবে মুতযিলী নেতা আল-জুবাঈ ও তাঁর অনুসারীরা এ বিষয়ে মতভেদ করেছে (তাদের মতে নবীগণের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে সগীরা গোনাহে লিপ্ত হওয়া সম্ভব নয়)। আর নবীগণের জন্য অনিচ্ছাকৃত বা ভুলক্রমে সগীরা গোনাহে লিপ্ত হওয়া সকলের মতেই সম্ভব, তবে যে সকল সগীরা গোনাহ নীচতা প্রমান করে তা তাঁদের দ্বারা সম্ভব নয়, যেমন এক লোকমা খাদ্য চুরি করা, একটি দানা ওযনে কম দেওয়া, ইত্যাদি। এক্ষেত্রে (সগীরা গোনাহের ক্ষেত্রে) মুহাক্কিক আলিমগণ শর্ত করেছেন যে, নবীগণকে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তাঁরা তা বর্জন করেন। এ সবই ওহী বা নুবুওয়াত প্রাপ্তির পরের বিষয় (তাঁরা কবীরা বা সগীরা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে করতে পারেন বা পারেন না বিষয়ক উপরের মতভেদ সবই নবীগণের নুবুওয়াত প্রাপ্তির পরের পর্যায়ের ক্ষেত্রে।)
নুবুওয়াত প্রপ্তির পূর্বে নবীগণ থেকে কবীরা গোনাহ প্রকাশ পাওয়া অসম্ভব বলে কোনো দলীল নেই। মু'তাযিলাগণ মতপ্রকাশ করেছেন যে, নুবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বেও নবীগণ কর্তৃক কবীরা গোনাহ সংঘটিত হতে পারে না; কারণ এর ফলে জনগণের মধ্যে তাঁর প্রতি অভক্তি সৃষ্টি হয়, যা তাঁর অনুসরণের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, ফলে নবী প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। সত্য কথা এই যে, যে কর্ম তাঁদের প্রতি অভক্তি সৃষ্টি করে তা তাঁরা করতে পারেন না, যেমন, মাতৃগণের সাথে অনাচার, অশ্লীলতা ও নীচতা জ্ঞাপক সগীরা গোনাহ। শীয়াগণ মনে করেন যে, নবীগণ থেকে নুবুওয়াতের পূর্বে ও পরে কখনোই কোনো সগীরা বা কবীরা গোনাহ প্রকাশিত বা সংঘটিত হতে পারে না। তবে তাঁরা তাকিয়‍্যাহ বা আত্মরক্ষামূলকভাবে কুফ্র প্রকাশ করা সম্ভব বলে মতপ্রকাশ করেছে।
উপরের আলোচনার ভিত্তিতে আমরা বুঝতে পারি যে, নবীগণের (আ) বিষয়ে যদি এমন কিছু বর্ণিত হয় যা থেকে বুঝা যায় যে, তাঁরা কেউ মিথ্যা বলেছেন বা পাপ করেছেন, তবে সেক্ষেত্রে নিম্নের মূলনীতি অনুসরণ করতে হবে: যদি এরূপ বিষয় খাবারুল
ওয়াহিদ পর্যায়ে বর্ণিত হয় তবে তা প্রত্যাখ্যাত। আর এ জাতীয় যা কিছু মুতাওয়াতির পর্যায়ে বর্ণিত তা সম্ভব হলে ব্যাখ্যা সাপেক্ষ গ্রহণ করতে হবে, অথবা মনে করতে হবে যে, তাঁরা সেক্ষেত্রে অধিকতর উত্তম বিষয় পরিত্যাগ করে বৈধ বিষয় গ্রহণ করেছেন অথবা তা নুবুওয়াতের পূর্বে ঘটেছিল।"
মোল্লা আলী কারী বলেন, ইবনুল হুমাম বলেছেন: আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অধিকাংশ আলিমের কাছে গ্রহণযোগ্য মত এই যে, নবীগণ কবীরা গোনাহ থেকে সংরক্ষিত, ভুলক্রমে বা অনিচ্ছকৃতভাবে একক সগীরা গোনাহ করে ফেলা থেকে সংরক্ষিত নন। আহলুস সুন্নাতের কেউ কেউ নবীদের ক্ষেত্রে ভুল করাও অসম্ভব বলে উল্লেখ করেছেন। সঠিকতর বা সহীহ কথা এই যে, কর্মের মধ্যে ভুল হওয়া সম্ভব। সার কথা এই যে, আহলুস সুন্নাতের সকলেই একমত যে, নবীগণ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো নিষিদ্ধ কর্ম করতে পারেন না। তবে অসতর্কতা বা ভুলের কারণে যা ঘটে তা পদস্খলন বলে অভিহিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00