📄 মালাকগণের নামে বিশ্বাস
আল্লাহর সৃষ্ট মালাকগণের সংখ্যা অগণিত ও অবর্ণনীয়। তাঁদের সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। মালাকগণের সংখ্যাধিক্য সম্পর্কে ধারণা পাই আমরা বিভিন্ন হাদীস থেকে। মালিক ইবনু সা'সা'আ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ মি'রাজের ঘটনা বর্ণনায় বলেন:
رُفِعَ لِي الْبَيْتُ الْمَعْمُورُ فَقُلْتُ يَا جِبْرِيلُ مَا هَذَا قَالَ هَذَا الْبَيْتُ الْمَعْمُورُ يَدْخُلُهُ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكِ إِذَا خَرَجُوا مِنْهُ لَمْ يَعُودُوا فِيهِ آخِرُ مَا عَلَيْهِمْ "আমার সামনে বাইতুল মা'মূর উত্থিত হলো। আমি বললাম, হে জিবরীল, এটি কী? তিনি বললেন: 'এটি বাইতুল মা'মূর। প্রতিদিন এর মধ্যে ৭০ হাজার মালাক প্রবেশ করেন। যারা একবার বেরিয়ে যায় তারা আর কখনোই এখানে ফিরে আসে না।"
অন্য হাদীসে আবূ যার গিফারী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
أَطَّتْ السَّمَاءُ وَحُقَّ لَهَا أَنْ تُبِطَّ مَا فِيهَا مَوْضِعُ أَرْبَعٍ أَصَابِعَ إِلَّا وَمَلَكٌ وَاضِعٌ جَبْهَتَهُ سَاجِدًا لِلَّهِ "আকাশ (ভারাক্রান্ত হয়ে) শব্দ করছে এবং তার শব্দ করার অধিকার আছে, সেখানে এমন ৪ আঙ্গুল স্থানও খালি নেই যেখানে একজন মালাক (ফিরিশতা) তাঁর কপাল রেখে আল্লাহর জন্য সাজদাবনত নেই।"
এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ "তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না।"
এদের মধ্য থেকে সামান্য কয়েকজনের নাম আমরা ওহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছি। জিবরাঈল (জিবরীল), মীকাঈল (মীকাল), ও মালিক নামগুলি কুরআন কারীমে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন:
مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِلَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَرُسُلِهِ وَجِبْرِيلَ وَمِيكَالَ فَإِنَّ اللَّهَ عَدُوٌّ لِلْكَافِرِينَ "যে কেউ আল্লাহর, তাঁর মালাকগণের, তাঁর রাসূলগণের এবং জিবরীল ও মীকালের (মীকাঈলের) শত্রু, (সে জেনে রাখুক যে,) আল্লাহ নিশ্চয় কাফিরদের শত্রু।"
জিবরীল (আ)-কে কুরআন কারীমে বিশেষভাবে প্রশংসা করা হয়েছে। তাঁকে আর-রূহুল আমীন (الروح الأمين) বা বিশ্বস্ত আত্মা (পবিত্র আত্মা) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং তাঁর শক্তি-মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জিবরীল কর্তৃক রাসূলুল্লাহ-কে ওহী শিক্ষা দানের বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى ذُو مِرَّةٍ "তাকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী প্রজ্ঞাসম্পন্ন-সুন্দর।"
অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الأَمِينُ عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ "আল-কুরআন জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ হতে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত আত্মা (আর-রূহুল আমীন: জিবরীল) তা নিয়ে অবতরণ করেছেন। তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার।" জাহান্নামের প্রহরী বা অধিকর্তার নাম উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন:
وَنَادَوْا يَا مَالِكُ لِيَقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ قَالَ إِنَّكُمْ مَاكِثُونَ "তারা চিৎকার করে বলবে, হে মালিক, তোমার প্রতিপালক আমাদের নিঃশেষ করে দিন। সে বলবে: তোমরা এভাবেই থাকবে।" কোনো কোনো হাদীসে 'ইসরাফীল' নামটি এসেছে। আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ রাত্রিতে তাহাজ্জুদের সালাত শুরু করে শুরুর দু'আ বা 'সানা' পাঠে বলতেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ جَبْرَائِيلَ وَمِيكَائِيلَ وَإِسْرَافِيلَ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ اهْدِنِي لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ "হে আল্লাহ, জিবরাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীলের প্রতিপালক, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা, অপ্রকাশ্য ও প্রকাশ্য সকল জ্ঞানের অধিকারী, আপনি ফয়সালা করবেন আপনার বান্দাদের মধ্যে যে বিষয়ে তারা মতভেদ করত, যে বিষয়ে মতভেদ হয়েছে সে বিষয়ে আপনি আপনার অনুমোদন দিয়ে আমাকে সত্যের প্রতি পথপ্রদর্শন করুন।" এছাড়া কোনো কোনো হাদীসে জান্নাতের প্রহরী বা অধিকর্তা মালাকের নাম 'রিদওয়ান' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সিহাহ সিত্তা বা প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থগুলিতে সংকলিত হাদীসে নামটি বর্ণিত হয়েছে বলে জানতে পারি নি। তবে ৪র্থ-৫ম শতকের কোনো মুহাদ্দিসের সংকলিত দু-একটি হাদীসে এ নামটি উল্লেখ করা হয়েছে। 'মালাকুল মাওত' বা মৃত্যুর মালাকের নাম 'আযরাঈল' বলে কোনো কোনো মুফাস্সির উল্লেখ করেছেন। প্রথম ৪ জন মালাকের নামই শুধু মুতাওয়াতিররূপে বর্ণিত হয়েছে। কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াতে এবং অগণিত হাদীসে এদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু কিছু মালাককে আল্লাহ কর্মভিত্তিক নামে উল্লেখ করেছেন। যেমন 'মালাকুল মাওত', 'মুনকার-নাকির', 'কিরামান কাতিবীন' ইত্যাদি।
📄 মালাকগণে বিশ্বাসের কল্যাণ
আমরা দেখেছি যে, অদৃশ্য জগতের বিষয়ে আল্লাহ আমাদেরকে কেবলমাত্র সে সকল বিষয়ই জানিয়েছেন এবং বিশ্বাস করতে
নির্দেশ দিয়েছেন যার বিশ্বাস আমাদের জীবনে কল্যাণ ও পূর্ণতা বয়ে আনে। আমরা একটু চিন্তা করলেই মালাকগণে বিশ্বাসের কল্যাণ অনুভব করতে পারব।
এই বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় কল্যাণ, আমরা আল্লাহর এই সম্মানিত বান্দাদের সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভ করি এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন সমাজে প্রচলিত নানা ধরণের কূসংস্কার, অলীক বিশ্বাস, অতিভক্তি, শিরক ইত্যাদি থেকে আমরা রক্ষা পাই, যে সকল কুসংস্কার মানুষের ইহলৌকিক জীবনকে অস্থিরচিত্ত, ভীত সন্ত্রস্থ করে তুলে, কল্যাণের কামনায় তারা এখানে সেখানে ছুটে বেড়ায়, তাদের ব্যক্তিত্ব হয়ে যায় বহুবিভক্ত। উপরন্তু এসকল কুসংস্কার তাদের জন্য বয়ে আনে পরলৌকিক ধ্বংস ও সর্বনাশ, কারণ আমরা জানি যে, শিরকের একমাত্র পরিণতি জাহান্নামের অনন্ত শাস্তি।
এছাড়া ফিরিশতাদের উপর বিশ্বাস আনার ফলে আমরা আল্লাহর সৃষ্টির মহত্ব জানতে পারি। এ বিশ্বাস আমাদের মনে শান্তি বয়ে আনে। একজন বিশ্বাসী কখনই নিজেকে অসহায় মনে করেনা। একাকিত্বের অনুভূতি কখনই তাকে গ্রাস করবে না। তিনি সর্বদা অনূভব করেন যে, আল্লাহর অগণিত ফিরিশতা তাকে ঘিরে রেখেছেন, তাঁদের দু'আ তাকে কল্যাণের পথে নিয়ে যাবে। সকল কষ্ট, সকল বেদনা উত্তরণে তিনি সাহস ও প্রেরণা পাবেন। ধৈর্য ও দৃঢ়তা নিয়ে তিনি সকল হতাশাকে জয় করতে পারবেন।
মালাকগণে বিশ্বাস মানুষকে কল্যাণ ও সততার পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি জানেন যে, কল্যাণ-কর্মে রত মানুষের জন্য প্রার্থনা করেন মালাকগণ। একজন মুসলিম অন্যান্য মুসলিমের কল্যাণের জন্য তাদের অনুপস্থিতে অন্তরের আকুতি দিয়ে দু'আ করেন, কারণ তিনি জানেন যে, এ দু'আর ফলে তিনিও লাভবান হবেন। আল্লাহর মালাকগণ তার জন্য দু'আ করেন। এমনিভাবে সকল ন্যায় ও কল্যাণের কাজে তিনি প্রেরণা ও উৎসাহবোধ করেন।
এ ছাড়া মালাকগণের ঈমান আমাদেরকে আল্লাহর সৃষ্টির মহত্ব, বিশালত্ব ও বৈচিত্র সম্পর্কে জ্ঞানদান করে। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অনুপ্রেরণা দেয়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সত্যিকারের ঈমান দান করুন।