📄 মালাকগণের প্রতি ঈমানের মূলনীতি
মালাকগণ বা ফিরিশতাগণ আল্লাহর সৃষ্ট গাইব বা অদুশ্য জগতের অংশ। আল্লাহ অদৃশ্য জগতের শুধুমাত্র সে সকল বিষয় আমাদেরকে জানিয়েছেন এবং বিশ্বাস করতে নির্দেশ দিয়েছেন যে সকল বিষয়ে বিশ্বাস আমাদেরকে পার্থিব বা আধ্যাত্মিক ক্ষতি বা অকল্যাণ থেকে রক্ষা করে বা এক্ষেত্রে কল্যাণ বয়ে আনে। মালাকগণ সম্পর্কে আমরা ততটুকুই বিশ্বাস করি যতটুকু কুরআনুল করীমে বা হাদীস শরীফে বলা হয়েছে। এর অতিরিক্ত তথ্য জানা আমাদের প্রয়োজন নেই বলেই আল্লাহ আমাদের ওহীর মাধ্যমে জানান নি। কাজেই ওহীর অতিরিক্ত কিছু জানার চেষ্টা করলে, অতিরিক্ত কিছু কথা যুক্তি, তর্ক দিয়ে বললে বা কুরআন হাদীসের বিভিন্ন বক্তব্যের আলোকে
নিজেদের বিচারবুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে তাতে ভুল হওয়ার ও গাইবী বিষয়ে ওহীর বাইরে কথা বলার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাচীন যুগ থেকে অনেক জাতি ওহীর কথা বিকৃত হওয়ার কারণে, ওহীর নামে বানোয়াট কথা প্রচলন হওয়ার কারণে এবং ওহীর অতিরিক্ত মনগড়া ব্যাখ্যা ও মতামত প্রচলনের কারণে মালাকগণ সম্পর্কে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বিশ্বাসের মধ্যে নিপতিত হয়েছিলেন। কুরআন কারীমে তাদের কিছু বিভ্রান্তির বর্ণনা রয়েছে। আমরা প্রথমে মালাকগণ বা ফিরিশতাগণ সম্পর্কে কুরআন-হাদীসের আলোকে ইসলামী বিশ্বাসের বর্ণনা করব এবং এরপর এ বিষয়ে কিছু বিভ্রান্তির কথা উল্লেখ করব।
📄 মালাকগণের প্রতি ঈমানের সাধারণ অর্থ
আল্লাহর মালাইকা বা ফিরিশতাগণে বিশ্বাসের সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত অর্থ: "সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তা'আলা অনেক মালাইকা বা ফিরিশতা সৃষ্টি করেছেন, যাঁরা আল্লাহর সম্মানিত সৃষ্টি। তাঁরা মানবীয় দুর্বলতা ও কামনা বাসনা থেকে মুক্ত। তারা সর্বদা আল্লাহর আনুগত্য করেন এবং আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার কোনো অনুভূতি তাদের মধ্যে নেই। সর্বদা আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁর প্রশংসা ও মহত্ব বর্ণনা করা, তার নির্দেশ সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করা তাদের কর্ম।"
ঈমান বিল-মালাঈকা বা মালাকগণের প্রতি ঈমানের বিস্তারিত চারটি দিক রয়েছে: (১) মালাকগণের অস্তিত্বে বিশ্বাস, (২) তাঁদের নামে বিশ্বাস, (৩) তাঁদের আকৃতি-প্রকৃতিতে বিশ্বাস এবং (৪) তাঁদের কর্মে বিশ্বাস।
📄 মালাকগণের অস্তিত্বে বিশ্বাস
ফিরিশতাদের সম্পর্কে কাফিরদের বিভিন্ন কুসংস্কার ও বিভ্রান্তির প্রতিবাদ করার সাথে সাথে কুরআন ও হাদীসে তাঁদের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়েছে এবং তাঁদের অস্তিত্বে বিশ্বাস করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কাজেই প্রতিটি মুসলিম সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বিশ্বাস করেন যে, মালাকগণ আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি। তাঁরা অদৃশ্য জগতের অংশ। তাঁদের সৃষ্টি, আকৃতি, প্রকৃতি, গুণাবালি, কর্ম ও দায়িত্ব সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে যা কিছু প্রমাণিত তা সবই মুমিন আকক্ষরিক ও সরলভাবে বিশ্বাস করেন।
📄 মালাকগণের নামে বিশ্বাস
আল্লাহর সৃষ্ট মালাকগণের সংখ্যা অগণিত ও অবর্ণনীয়। তাঁদের সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। মালাকগণের সংখ্যাধিক্য সম্পর্কে ধারণা পাই আমরা বিভিন্ন হাদীস থেকে। মালিক ইবনু সা'সা'আ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ মি'রাজের ঘটনা বর্ণনায় বলেন:
رُفِعَ لِي الْبَيْتُ الْمَعْمُورُ فَقُلْتُ يَا جِبْرِيلُ مَا هَذَا قَالَ هَذَا الْبَيْتُ الْمَعْمُورُ يَدْخُلُهُ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكِ إِذَا خَرَجُوا مِنْهُ لَمْ يَعُودُوا فِيهِ آخِرُ مَا عَلَيْهِمْ "আমার সামনে বাইতুল মা'মূর উত্থিত হলো। আমি বললাম, হে জিবরীল, এটি কী? তিনি বললেন: 'এটি বাইতুল মা'মূর। প্রতিদিন এর মধ্যে ৭০ হাজার মালাক প্রবেশ করেন। যারা একবার বেরিয়ে যায় তারা আর কখনোই এখানে ফিরে আসে না।"
অন্য হাদীসে আবূ যার গিফারী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
أَطَّتْ السَّمَاءُ وَحُقَّ لَهَا أَنْ تُبِطَّ مَا فِيهَا مَوْضِعُ أَرْبَعٍ أَصَابِعَ إِلَّا وَمَلَكٌ وَاضِعٌ جَبْهَتَهُ سَاجِدًا لِلَّهِ "আকাশ (ভারাক্রান্ত হয়ে) শব্দ করছে এবং তার শব্দ করার অধিকার আছে, সেখানে এমন ৪ আঙ্গুল স্থানও খালি নেই যেখানে একজন মালাক (ফিরিশতা) তাঁর কপাল রেখে আল্লাহর জন্য সাজদাবনত নেই।"
এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ "তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না।"
এদের মধ্য থেকে সামান্য কয়েকজনের নাম আমরা ওহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছি। জিবরাঈল (জিবরীল), মীকাঈল (মীকাল), ও মালিক নামগুলি কুরআন কারীমে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন:
مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِلَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَرُسُلِهِ وَجِبْرِيلَ وَمِيكَالَ فَإِنَّ اللَّهَ عَدُوٌّ لِلْكَافِرِينَ "যে কেউ আল্লাহর, তাঁর মালাকগণের, তাঁর রাসূলগণের এবং জিবরীল ও মীকালের (মীকাঈলের) শত্রু, (সে জেনে রাখুক যে,) আল্লাহ নিশ্চয় কাফিরদের শত্রু।"
জিবরীল (আ)-কে কুরআন কারীমে বিশেষভাবে প্রশংসা করা হয়েছে। তাঁকে আর-রূহুল আমীন (الروح الأمين) বা বিশ্বস্ত আত্মা (পবিত্র আত্মা) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং তাঁর শক্তি-মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জিবরীল কর্তৃক রাসূলুল্লাহ-কে ওহী শিক্ষা দানের বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى ذُو مِرَّةٍ "তাকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী প্রজ্ঞাসম্পন্ন-সুন্দর।"
অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الأَمِينُ عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ "আল-কুরআন জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ হতে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত আত্মা (আর-রূহুল আমীন: জিবরীল) তা নিয়ে অবতরণ করেছেন। তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার।" জাহান্নামের প্রহরী বা অধিকর্তার নাম উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন:
وَنَادَوْا يَا مَالِكُ لِيَقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ قَالَ إِنَّكُمْ مَاكِثُونَ "তারা চিৎকার করে বলবে, হে মালিক, তোমার প্রতিপালক আমাদের নিঃশেষ করে দিন। সে বলবে: তোমরা এভাবেই থাকবে।" কোনো কোনো হাদীসে 'ইসরাফীল' নামটি এসেছে। আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ রাত্রিতে তাহাজ্জুদের সালাত শুরু করে শুরুর দু'আ বা 'সানা' পাঠে বলতেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ جَبْرَائِيلَ وَمِيكَائِيلَ وَإِسْرَافِيلَ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ اهْدِنِي لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ "হে আল্লাহ, জিবরাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীলের প্রতিপালক, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা, অপ্রকাশ্য ও প্রকাশ্য সকল জ্ঞানের অধিকারী, আপনি ফয়সালা করবেন আপনার বান্দাদের মধ্যে যে বিষয়ে তারা মতভেদ করত, যে বিষয়ে মতভেদ হয়েছে সে বিষয়ে আপনি আপনার অনুমোদন দিয়ে আমাকে সত্যের প্রতি পথপ্রদর্শন করুন।" এছাড়া কোনো কোনো হাদীসে জান্নাতের প্রহরী বা অধিকর্তা মালাকের নাম 'রিদওয়ান' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সিহাহ সিত্তা বা প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থগুলিতে সংকলিত হাদীসে নামটি বর্ণিত হয়েছে বলে জানতে পারি নি। তবে ৪র্থ-৫ম শতকের কোনো মুহাদ্দিসের সংকলিত দু-একটি হাদীসে এ নামটি উল্লেখ করা হয়েছে। 'মালাকুল মাওত' বা মৃত্যুর মালাকের নাম 'আযরাঈল' বলে কোনো কোনো মুফাস্সির উল্লেখ করেছেন। প্রথম ৪ জন মালাকের নামই শুধু মুতাওয়াতিররূপে বর্ণিত হয়েছে। কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াতে এবং অগণিত হাদীসে এদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু কিছু মালাককে আল্লাহ কর্মভিত্তিক নামে উল্লেখ করেছেন। যেমন 'মালাকুল মাওত', 'মুনকার-নাকির', 'কিরামান কাতিবীন' ইত্যাদি।