📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 হাযির-নাযির প্রসঙ্গ

📄 হাযির-নাযির প্রসঙ্গ


রাসূলুল্লাহ-এর ইলমুল গাইবের দাবির আরেকটি পরিভাষা তাঁকে 'হাযির-নাযির' বলে দাবি করা। হাযির-নাযির দুইটি আরবী শব্দ। (حاضر) হাযির অর্থ উপস্থিত। (ناظر) নাযির অর্থ দর্শক, পর্যবেক্ষক বা সংরক্ষক। 'হাযির-নাযির' বলতে বোঝান হয় 'সদাবিরাজমান ও সর্বজ্ঞ বা সবকিছুর দর্শক'। অর্থাৎ তিনি সদা-সর্বদা সবত্র উপস্থিত বা বিরাজমান এবং তিনি সদা সর্বদা সবকিছুর দর্শক। স্বভাবতই যিনি সদাসর্বত্র বিরাজমান ও সবকিছুর দর্শক তিনি সর্বজ্ঞ ও সকল যুগের সকল স্থানের সকল গাইবী জ্ঞানের অধিকারী। কাজেই যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে 'হাযির-নাযির' দাবি করেন, তাঁরা দাবি করেন যে, তিনি শুধু সর্বজ্ঞই নন, উপরন্তু তিনি সর্বত্র বিরাজমান।
এখানেও কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়: প্রথমত, এই গুণটি শুধুমাত্র আল্লাহর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ আল্লাহ বারংবার এরশাদ করেছেন যে, বান্দা যেখানেই থাক্ তিনি তার সাথে আছেন, তিনি বান্দার নিকটে আছেন... ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সম্পর্কে কখনোই ঘুনাক্ষরেও কুরআন বা হাদীসে বলা হয় নি যে, তিনি সর্বদা উম্মাতের সাথে আছেন, অথবা সকল মানুষের সাথে আছেন, অথবা কাছে আছেন, অথবা সর্বত্র উপস্থিত আছেন, অথবা সবকিছু দেখছেন। কুরআনের আয়াত তো দূরের কথা একটি যয়ীফ হাদীসও দ্ব্যর্থহীনভাবে এই অর্থে কোথাও বর্ণিত হয় নি। কোনো একটি সহীহ, যয়ীফ বা মাউযূ হাদীসেও বর্ণিত হয় নি যে, তিনি বলেছেন 'আমি হাযির-নাযির'। অথচ তাঁর নামে এ মিথ্যা কথাটি বলা হচ্ছে। এমনকি কোনো সাহাবী, তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ী বা ইমাম কখনোই বলেন নি যে, 'রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাযির-নাযির'।
দ্বিতীয়ত, কুরআন-হাদীসে বারংবার অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) গোপন জ্ঞানের অধিকারী নন। রাসূলুল্লাহ (স)-কে 'হাযির-নাযির' বলে দাবি করা উক্ত সকল স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন আয়াত ও হাদীসের সুস্পষ্ট
বিরোধিতা করা।
তৃতীয়ত, বিভিন্ন হাদীসে তিনি বলেছেন, উম্মাতের দরুদ-সালাম তাঁর কবরে উপস্থিত করা হয়। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে হাযির-নাযির বলে দাবি করার অর্থ হলো, এ সকল হাদীস সবই মিথ্যা। উম্মাতের দরুদ-সালাম তাঁর কাছে উপস্থিত হয় না, বরং তিনিই উম্মাতের কাছে উপস্থিত হন!! কাজেই যারা এ দাবিটি করছেন, তাঁর শুধু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নামে মিথ্যা বলেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না। উপরন্তু তাঁরা স্বয় স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মিথ্যাবাদী বলে দাবি করেন, নাউযু বিল্লাহ!
চতুর্থত, যারা রাসূলুল্লাহ-এর ইলমুল গাইব ও সদাসর্বদা সর্বত্র বিরাজমান হওয়ার মত পোষণ করেছেন, তারা একে রাসূলুল্লাহ-এর ফযীলত বা মর্যাদা বিষয়ক মতামত হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেন নি, বরং একে মুমিনের ঈমানের অংশ বলে দাবি করেছেন।
ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, দশাধিক সাহাবী থেকে বর্ণিত বিভিন্ন হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, ওফাতের পরে মহাবিশ্বের সর্বত্র বা সকল উম্মাতের কাছে 'হাযির-নাযির' থেকে তাদের সকল পরিবর্তন বা অন্যায়-অপকর্ম অবলোকন করার ঝামেলা মহান আল্লাহ তাঁকে দেন নি। অনুরূপভাবে কুরআনে বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ বারংবার বলেছেন যে, অতীত উম্মাতগুলির নিকটও তিনি উপস্থিত বা হাযির-নাযির ছিলেন না। আল্লাহ বলেন:
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُونَ أَقْلَامَهُمْ أَيُّهُمْ يَكْفُلُ مَرْيَمَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يَخْتَصِمُونَ "এ গাইবের সংবাদ যা আমি ওহীর মাধ্যমে তোমাকে অবহিত করছি। মায়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাদের মধ্যে কে গ্রহণ করবে তার জন্য যখন তারা কলম নিক্ষেপ করছিল তখন তুমি তাদের নিকট ছিলে না এবং তারা যখন বাদানুবাদ করছিল তখনও তুমি তাদের নিকট ছিলে না।" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِيِّ إِذْ قَضَيْنَا إِلَى مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنْتَ مِنَ الشَّاهِدِينَ ... وَمَا كُنْتَ ثَاوِيًا فِي أَهْلِ مَدْيَنَ تَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا وَلَكِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا "মূসাকে যখন আমি বিধান দিয়েছিলাম তখন পশ্চিম প্রান্তে তুমি উপস্থিত ছিলে না এবং তুমির শাহিদ বা প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না। তুমি তো মাদয়নবাসীদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলে না তাদের নিকট আমার আয়াত আবৃত্তি করার জন্য। আমিই তো ছিলাম রাসূল প্রেরণকারী। মূসাকে যখন আমি আহবান করেছিলাম তখন তুমি তূর পর্বতের পার্শে উপস্থিত ছিলে না...।"
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ أَجْمَعُوا أَمْرَهُمْ وَهُمْ يَمْكُرُونَ "এ গাইবের সংবাদ যা তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করছি। ষড়যন্ত্রকালে যখন তারা মতৈক্যে পৌছেছিল তখন তুমি তাদের সংগে ছিলে না।"
আর রাসূলুল্লাহ-এর জীবনী, সীরাত, সাহাবীগণের কর্ম, মতামত ইত্যাদি সম্পর্কে যার সামান্য জ্ঞান আছে তিনিও বুঝতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় তিনি নিজে কখনো কোনোভাবে দাবি করেন নি যে, তিনি সদা সর্বদা সর্বত্র বা সকল উম্মাতের কাছে 'হাযির-নাযির' বা তাদের কাছে উপস্থিত থেকে তাদের সব কিছু দেখছেন। অনুরূপভাবে সাহাবীগণও কখনোই এরূপ কোনো কথা কল্পনা করেন নি।
তাদের এ মতের পক্ষে পেশকৃত দলিলগুলি নিম্নরূপ: স্বভাবতই কুরআন কারীম বা হাদীস শরীফ থেকে কোনো একটি সুস্পষ্ট বা দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যও তাঁরা প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন না। বিভিন্ন আয়াত বা হাদীসের ব্যাখ্যা বা ব্যাখ্যা-ভিত্তিক যুক্তি-তর্কই তাদের দলিল। তাঁদের এ জাতীয় দলিল-প্রমাণাদির মধ্যে রয়েছে:
প্রথম দলীল: কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে 'শাহিদ' ও 'শাহীদ' (شاهد و شهید) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই শব্দ দুইটির অর্থ 'সাক্ষী', 'প্রমাণ', 'উপস্থিত' (witness, evidence, present) ইত্যাদি। সাহাবীগণের যুগ থেকে পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মুফাসসিরগণ এই শব্দের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে (ﷺ) দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব দিয়ে ও সাক্ষীরূপে প্রেরণ করেছেন। যারা তাঁর প্রচারিত দ্বীন গ্রহণ করবেন, তিনি তাঁদের পক্ষে সাক্ষ্য দিবেন। এছাড়া পূর্ববর্তী নবীগণ যে তাদের দীন প্রচার করেছেন সে বিষয়েও তিনি এবং তাঁর উম্মাত সাক্ষ্য দিবেন। অনেকে বলেছেন, তাঁকে আল্লাহ তাঁর একত্বের বা ওয়াহদানিয়তের সাক্ষী ও প্রমাণ-রূপে প্রেরণ করেছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, অনেক স্থানে মুমিনগণকেও মানব জাতির জন্য 'শাহীদ' বলা হয়েছে। অনেক স্থানে আল্লাহকে 'শাহীদ'
বলা হয়েছে। যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে 'সকল অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী' বা 'হাযির-নাযির' বলে দাবি করেন তাঁরা এই 'দ্ব্যর্থবোধক' শব্দটির একটি বিশেষ অর্থ গ্রহণ করেন। এরপর সেই অর্থের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে কুরআনের সকল সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বাণী বাতিল করে দেন। তাঁরা বলেন, 'শাহিদ' অর্থ উপস্থিত। কাজেই তিনি সর্বত্র উপস্থিত। অথবা 'শাহিদ' অর্থ যদি সাক্ষী হয় তাহলেও তাঁকে সর্বত্র উপস্থিত থাকতে হবে। কারণ না দেখে তো সাক্ষ্য দেওয়া যায় না। আর এভাবে তিনি সদা সর্বদা সর্বত্র বিরাজমান বা হাযির-নাযির ও সকল স্থানের সকল গোপন ও গাইবী জ্ঞানের অধিকারী।
তাঁদের এই ব্যাখ্যা ও দাবির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়: প্রথমত, তাঁরা এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবী, তাবিয়ী ও পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের মতামত গ্রহণ না করে নিজেদের মর্জি মাফিক ব্যাখ্যা করেন এবং সাহাবী-তাবিয়ীদের ব্যাখ্যা বাতিল করে দেন। দ্বিতীয়ত, তাঁরা একটি দ্ব্যর্থবোধক শব্দের ব্যাখ্যাকে মূল আকীদা হিসাবে গ্রহণ করে তার ভিত্তিতে কুরআন ও হাদীসের অগণিত দ্ব্যর্থহীন নির্দেশনা নিজেদের মর্জিমাফিক বাতিল করে দিলেন। তাঁরা এমন একটি অর্থ গ্রহণ করলেন, যে অর্থে একটি দ্ব্যর্থহীন আয়াত বা হাদীসও নেই। সাহাবী, তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ী বা কোনো ইমামও কখনো এ কথা বলেন নি। তৃতীয়ত, তাঁদের এ ব্যাখ্যা ও দাবি মূলতই বাতিল। তাদের ব্যাখ্যা অনুসারে প্রত্যেক মুসলমানকেই 'ইলমে গাইবের অধিকারী' ও হাযির-নাযির বলে দাবি করতে হবে। কারণ মুমিনগণকেও কুরআনে 'শাহীদ' অর্থাৎ 'সাক্ষী' বা 'উপস্থিত' বলা হয়েছে এবং বারংবার বলা হয়েছে যে, তাঁরা পূর্ববর্তী সকল উম্মাত সহ পুরো মানব জাতি সম্পর্কে কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য দিবেন। আর উপস্থিত না হলে তো সাক্ষ্য দেওয়া যায় না। কাজেই তাঁদের ব্যাখ্যা ও দাবি অনুসারে বলতে হবে যে, প্রত্যেক মুমিন সৃষ্টির শুরু থেকে বিশ্বের সর্বত্র সর্বদা বিরাজমান এবং সবকিছু দেখছেন ও শুনছেন। কারণ না দেখে তাঁরা কিভাবে মানবজাতির পক্ষে বা বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবেন?!
দ্বিতীয় দলীল: কুরআন কারীমে অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ "নবী মু'মিনগণের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর (closer) এবং তাঁর স্ত্রী তাদের মাতা। এবং আল্লাহর কিতাবে আত্মীয়গণ পরস্পর পরস্পরের ঘনিষ্ঠতর।" এখানে 'আউলা' (أولى) শব্দটির মূল হলো 'বেলায়াত' (الولاية), অর্থাৎ বন্ধুত্ব, নৈকট্য, অভিভাবকত্ব ইত্যাদি। "বেলায়েত” অর্জনকারীকে "ওলী” (الولي), অর্থাৎ বন্ধু, নিকটবর্তী বা অভিভাবক বলা হয়। ওলী অর্থ নিকটবর্তী, বন্ধু, সাহায্যকারী, অভিভাবক ইত্যাদি। বেলায়াত ধাতু থেকে নির্গত 'ওলী' অর্থেরই আরেকটি সুপরিচিত শব্দ 'মাওলা' (المولى)। 'মাওলা' অর্থও অভিভাবক, বন্ধু, সঙ্গী ইত্যাদি (master, protector, friend, companion)। ইসলামী পরিভাষায় 'বেলায়াত' 'ওলী' ও 'মাওলা' শব্দের বিভিন্ন প্রকারের ব্যবহার রয়েছে। উত্তরাধিকার আইনের পরিভাষায় ও রাজনৈতিক পরিভাষায় এ সকল শব্দ বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত। তবে বেলায়াত বা ওলী শব্দদ্বয় সর্বাধিক ব্যবহৃত (ولاية الله) 'আল্লাহর বন্ধুত্ব' ও (ولي الله) 'আল্লাহর বন্ধু' অর্থে। আল্লাহর বন্ধুদের পরিচয় দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ "জেনে রাখ! নিশ্চয় আল্লাহর ওলীগণের কোনো ভয় নেই এবং তরা চিন্তাগ্রস্তও হবে না- যারা ঈমান এনেছে এবং যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করে চলে বা তাকওয়া অবলম্বন করে।" ঈমান অর্থ তাওহীদ ও রিসালাতের প্রতি বিশুদ্ধ, শিরক ও কুফর মুক্ত বিশ্বাস। "তাকওয়া” শব্দের অর্থ আত্মরক্ষা করা। যে কর্ম বা চিন্তা করলে মহান আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন সেই কর্ম বা চিন্তা বর্জনের নাম তাকওয়া। মূলত সকল হারাম, নিষিদ্ধ ও পাপ বর্জনকে তাকওয়া বলা হয়। এখানে আমরা দেখছি যে, দুটি গুণের মধ্যে ওলীর পরিচয় সীমাবদ্ধ। ঈমান ও তাকওয়া। এই দু'টি গুণ যার মধ্যে যত বেশি ও যত পরিপূর্ণ হবে তিনি বেলায়াতের পথে তত বেশি অগ্রসর ও আল্লাহর তত বেশি ওলী বা প্রিয় বলে বিবেচিত হবেন। এথেকে আমরা বুঝতে পারি যে, প্রত্যেক মুসলিমই আল্লাহর ওলী। ইমান ও তাকওয়ার গুণ যার মধ্যে যত বেশি থাকবে তিনি তত বেশি ওলী।
ইমাম আবূ হানীফা (রাহ), ইমাম তাহাবী (রাহ) ও অন্যান্য আলিম উল্লেখ করেছেন যে, ঈমান ও মা'রিফাতের দিক থেকে সকল মুমিনই সমান। এজন্য বেলায়াতের কমবেশি হয় মূলত নেক আমলে। যার নেক আমল ও সুন্নাতের ইত্তিবা যত বেশি তিনি তত বেশি ওলী। ইমাম তাহাবী বলেন:
الْمُؤْمِنُونَ كُلُّهُمْ أَوْلِيَاءُ الرَّحْمَنِ، وَأَكْرَمُهُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَطْوَعُهُمْ وَأَتْبَعُهُمْ لِلْقُرْآنِ "সকল মুমিন করুণাময় আল্লাহর ওলী। তাঁদের মধ্য থেকে যে যত বেশি আল্লাহর অনুগত ও কুরআনের অনুসরণকারী সে ততবেশি আল্লাহর নিকট সম্মানিত (ততবেশি বেলায়াতের অধিকারী)।" ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেন:
وَيَسْتَوِي الْمُؤْمِنُونَ كُلُّهُمْ فِي الْمَعْرِفَةِ وَالْيَقِينِ وَالتَّوَكُّلِ وَالْمَحَبَّةِ وَالرِّضَا وَالْخَوْفِ وَالرَّجَاءِ وَالإِيمَانِ فِي ذَلِكَ وَيَتَفَاوَتُونَ فِيمَا دُونَ الإِيمَانِ فِي ذَلِكَ كُلِّهِ. "মারিফাত (পরিচয় লাভ), ইয়াকীন (বিশ্বাস), তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা), মাহাব্বাত (ভালবাসা), রিযা (সন্তুষ্টি), খাওফ (ভয়), রাজা (আশা) এবং এ সকল বিষয়ের ঈমান-এর ক্ষেত্রে মুমিনগণ সকলেই সমান। তাদের মর্যাদার কমবেশি হয় মূল ঈমান বা বিশ্বাসের অতিরিক্ত যা কিছু আছে তার সবকিছুতে।" ইমাম তাহাবী (রাহ) বলেন:
الإِيمَانُ وَاحِدٌ وَأَهْلُهُ فِي أَصْلِهِ سَوَاءٌ وَالتَّفَاضُلُ بَيْنَهُمْ بِالْخَشْيَةِ وَالتَّقِيِّ، وَمُخَالَفَةِ الْهَوَى وَمُلَازَمَةِ الْأَوْلَى "ঈমান একই, এবং ঈমানদারগণ এর মূলে সবাই সমান। তবে, আল্লাহর ভয়, তাক্বওয়া, কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচারণ এবং সর্বদা উত্তম কর্ম সম্পাদনের অনুপাতে তাদের মধ্যে স্তর ও মর্যাদাগত প্রভেদ হয়ে থাকে।" রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বেলায়াতের পথের কর্মকে দুভাগে ভাগ করেছেন: ফরয ও নফল। সকল ফরয পালনের সাথেসাথে অনবরত
নফল ইবাদত পালনের মাধমে বান্দা বেলায়াত অর্জন করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ বলেছেন:
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا وَإِنْ سَأَلَنِي لأُعْطِيَنَّهُ وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيدَنَّهُ. "যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা করে আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার নৈকট্য অর্জন বা ওলী হওয়ার জন্য বান্দা যত কাজ করে তন্মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসি যে কাজ আমি ফরয করেছি। (ফরয পালন করাই আমার নৈকট্যে অর্জনের জন্য সবচেয়ে প্রিয় কাজ)। এবং বান্দা যখন সর্বদা নফল ইবাদত পালনের মাধ্যমে আমার বেলায়তের পথে অগ্রসর হতে থাকে তখন আমি তাকে ভালবাসি। আর যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার শ্রবণযন্ত্রে পরিণত হই, যা দিয়ে সে শুনতে পায়, আমি তার দর্শনেন্দ্রিয় হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখতে পায়, আমি তার হাত হয়ে যাই, যদ্দ্বার সে ধরে বা আঘাত করে এবং আমি তার পা হয়ে যাই, যদ্দ্বারা সে হাঁটে। সে যদি আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করে তাহলে আমি অবশ্যই তাকে তা প্রদান করি। সে যদি আমার কাছে আশ্রয় চায় তাহলে আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় প্রদান করি।"
কারামত (الكرامة) শব্দটির অর্থ 'ভদ্রতা', 'সম্মান', 'সম্মাননা', 'সম্মান-চিহ্ন' (nobility, dignity, respect, mark of honour, token of esteem)। ঈমান ও তাকওয়ার অধিকারী ফরয ও নফল ইবাদত পালনকারী কোনো ব্যক্তি থেকে যদি কোনো অলৌকিক কর্ম প্রকাশিত হয় তবে তাকে ইসলামী পরিভাষায় 'কারামাত' বলা হয়। কুরআন কারীমে এরূপ অলৌকিক কর্মকেও আয়াত বলা হয়েছে। পূর্ববর্তী যুগের একজন 'ওলী'-র পদস্খলন সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغَاوِينَ "তাদেরকে সেই ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শুনাও যাকে আমি 'আয়াত' বা অলৌকিক নির্দশন দিয়েছিলাম, অতঃপর সে তা থেকে বিচ্যুত হয় এবং শয়তান তার পিছনে লাগে, আর সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।" এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাস্স্সিরগণ পূর্ববর্তী যুগের বিভিন্ন ওলীর কথা উল্লেখ করেছেন যাদের বেলায়াতের কারণে মহান আল্লাহ তাদেরকে 'কারামাত' বা অলৌকিক কর্ম প্রদান করেছিলেন, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশের বিরোধিতা করায় পরে তিনি বিপথগামী হয়ে যান। এ আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, বেলায়াত কোনো পদমর্যাদা নয় এবং কারামত স্থায়ী পদমর্যাদার দলিল নয়। একজন নেককার মানুষ বেলায়াত ও কারামাত লাভের পরেও বিভ্রান্ত হতে পারেন। 'কারামত' প্রকাশিত হওয়া ওলী হওয়ার প্রমাণ নয়, বরং ঈমান ও তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকাই ওলী হওয়ার প্রমান। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য, অনুসরণ ও তাকওয়ার উপর টিকে থাকা ও অনবরত ফরয ও নফল ইবাদত পালন করতে থাকই বেলায়াতের একমাত্র চিহ্ন। দ্বিতীয়-তৃতীয় হিজরী শতাব্দী থেকে মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ নবীগণেরর অলৌকিক কর্মকে 'মুজিযা' বলে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ নুবুওয়াতের চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাফিরদের অক্ষমতা প্রকাশ করার জন্য আল্লাহ তাদের মাধ্যমে তা প্রকাশ করবেন। অনুরূপভাবে তাঁরা ওলীদের অলৌকিক কর্মকে 'কারামত' নামে আখ্যায়িত করেছেন, যেন মানুষ বুঝতে পারে যে, এরূপ অলৌকিক কর্ম ওলীর কোনো ক্ষমতা বা শক্তি নয়, বরং একান্তই আল্লাহর পক্ষ থেকে 'ইকরাম' বা সম্মাননা মাত্র।
ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেছেন: "ওলীগণের কারামত সত্য।" এ কথা অর্থ ওলীগণ থেকে অলৌকিক কর্ম প্রকাশ পাওয়া সম্ভব। যদি কোনো বাহ্যত নেককার মুমিন মুত্তাকী মানুষ থেকে কোনো অলৌকিক কার্য প্রকাশ পায় তাহলে তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত সম্মাননা বা কারামত বলে বুঝতে হবে। অনুরূপভাবে যদি কোনো নেককার বুযুর্গ মানুষ থেকে কোনো অলৌকিক কার্য প্রকাশিত হয়েছে বলে বিশুদ্ধ সূত্রে জানা যায় তবে তা সত্য বলে বিশ্বাস করতে হবে। তা অস্বীকার করা বা অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেওয়া মু'তাযিলী ও অন্যান্য বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের আকীদা। কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে নবী ছাড়াও অন্যান্য মুমিন মুত্তাকী মানুষের অলৌকিক কর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন হাদীসে এরূপ অনেক কারামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইমাম তাহাবী (রাহ) বলেন:
لَا نُفَضِّلُ أَحَدًا مِنَ الْأَوْلِيَاءِ عَلَى أَحَدٍ مِنَ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ، وَنَقُولُ نَبِيٌّ وَاحِدٌ أَفْضَلُ مِنْ جَمِيعِ الْأَوْلِيَاءِ. وَنُؤْمِنُ بِمَا جَاءَ مِنْ كَرَامَاتِهِمْ وَصَحَّ عَنِ الثِّقَاتِ مِنْ رِوَايَاتِهِمْ. "আমরা কোনো ওলীকে কোনো নবীর উপর প্রাধান্য দেই না। বরং আমরা বলি: একজন নবী সকল ওলী থেকে শ্রেষ্ঠ। তাদের যে সকল কারামত নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত রাবীদের মাধ্যমে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে তা আমরা বিশ্বাস করি।" ৪. ৪. ৯. ৩. ইসতিদরাজ 'ইসতিদরাজ' শব্দটি আরবী 'দারাজ' (درج) ক্রিয়ামূল থেকে গৃহীত, যার অর্থ চলা, হাঁটা, অগ্রসর হওয়া, ক্রমান্বয়ে এগোনো ইত্যাদি। 'দারাজাহ' (الدرجة) অর্থ ধাপ বা পর্যায়। ইসতিদরাজ (الاستدراج) অর্থ ক্রমান্বয়ে এগিয়ে নেওয়া, ক্রমান্বয়ে উপরে তোলা বা নিচে নামান, ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি (To make advance gradually, promote
gradually, to entice, tempt, lure into destruction)।
কোনো পাপী বা অবিশ্বাসী ব্যক্তি থেকে কোনো অলৌকিক কর্ম প্রকাশিত হলে তাকে ইসলামের পরিভাষায় 'ইসতিদরাজ' বলা হয়। আমরা দেখেছি যে, ইসতিদরাজের ব্যাখ্যায় ইমাম আবূ হানীফা বলেছেন: "বরং এগুলিকে আমরা তাদের কাযায়ে হাজাত বা প্রয়োজন মেটানো বলি। কারণ আল্লাহ তাঁর দুশমনদের প্রয়োজন মিটিয়ে দেন তাদেরকে ক্রমান্বয়ে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং তাদের শাস্তি হিসেবে।"
মোল্লা আলী কারী বলেন: "ফিরাসাত তিন প্রকার। (১) ঈমানী ফিরাসাত। এর কারণ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত নূর যা আল্লাহ তার বান্দার অন্তরে নিক্ষেপ করেন। হঠাৎ অনুভূতি হিসেবে তা মানুষের অন্তরে হামলা করে, যেমন সিংহ তার শিকারের উপরে হামলা করে। .... (২) রিয়াজত বা অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জিত ফিরাসাত। এ প্রকারের ফিরাসাত অর্জিত হয় ক্ষুধা, রাত্রি-জাগরণ, নির্জনবাস ইত্যাদির মাধ্যমে। কারণ মানুষের নফস যখন জাগতিক সম্পর্ক ও সৃষ্টির সাথে যোগাযোগ থেকে বিমুক্ত হয় তখন তার বিমুক্তির মাত্রা অনুসারে তার মধ্যে অন্তর্দিষ্টি ও কাশফ সৃষ্টি হয়। এ প্রকার ফিরাসাত কাফির ও মুমিন উভয়েরই হতে পারে। এ প্রকার কাশফ বা ফিরাসাত ঈমান বা বেলায়াত প্রমাণ করে না। এর দ্বারা কোনো কল্যাণ বা সঠিক পথও জানা যায় না।... (৩) সৃষ্টিগত ফিরাসাত। এ হলো চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশার মানুষের ফিরাসাত যারা সৃষ্টিগত আকৃতি থেকে প্রকৃতি ও আভ্যন্তরীন অবস্থা অনুমান করতে পারেন।"
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, সকল অলৌকিক কর্মই কারামত নয় এবং কোনো অলৌকিক কর্ম কারো বেলায়াতের প্রমাণ নয়, কারণ একই প্রকার অলৌকিক কর্ম মুত্তাকী মুমিন থেকেও প্রকাশিত হতে পারে এবং ফাসিক বা কাফির থেকেও প্রকাশিত হতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো অলৌকিক কর্ম কোনো মানুষের বেলায়াত তো দূরের কথা, ঈমানেরও প্রমাণ নয়। বরং মানুষের ঈমান, তাকওয়া, আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) আনুগত্য ও সদা সর্বদা ফরয ও নফল ইবাদত পালন করাই বেলায়াতের প্রমাণ। যদি এরূপ ব্যক্তি থেকে কোনো অলৌকিক কর্ম প্রকাশিত হয় তবে তাকে কারামত বলা হবে। আর যদি কোনো ব্যক্তির ঈমান, তাকওয়া বা ইত্তিবায়ে সুন্নাত না থাকে কিন্তু তিনি বিভিন্ন অলৌকিক কর্ম সম্পাদন করেন তবে তাকে ইসতিদরাজ বলা হবে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাঁর ওফাত বিষয়ক বিতর্ক

📄 তাঁর ওফাত বিষয়ক বিতর্ক


কুরআনে রাসূলুল্লাহ-এর মৃত্যুর বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ
"তুমি তো মরণশীল এবং তারাও মরণশীল” তিনি আরো বলেন:
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ
"মুহাম্মাদ একজন রাসূল মাত্র; তার পূর্বে রাসূলগণ গত হয়েছে। সুতরাং যদি সে মারা যায় অথবা নিহত হয় তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখনো আল্লাহর ক্ষতি করবে না, বরং আল্লাহ শীঘ্রই কৃতজ্ঞদিগকে পুরস্কৃত করবেন।"
وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ أَفَإِنْ مِتَّ فَهُمُ الْخَالِدُونَ
"আমি তোমার পূর্বে কোনো মানুষকে অমরত্ব বা অনন্ত জীবন প্রদান করি নি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কী চিরজীবী হয়ে থাকবে?” কুরআনে অনেক আয়াতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, শহীদগণ মৃত নন, তারা জীবিত ও রিস্ক প্রাপ্ত হন। নবীগণের বিষয়ে কুরআন কারীমে কিছু না বলা হলেও সহীহ হাদীসে তাঁদের মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বলা হয়েছে। আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
الأَنْبِيَاءُ أَحْيَاءُ فِي قُبُورِهِمْ يُصَلُّون
"নবীগণ তাঁদের কবরের মধ্যে জীবিত, তাঁরা সালাত আদায় করেন।" হাদীসটির সনদ সহীহ। অন্য একটি যয়ীফ সনদের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
إِنَّ الْأَنْبِيَاءُ لَا يُتْرَكُونَ فِي قُبُورِهِمْ بَعْدَ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ولكنهم يُصَلُّون بين يدي الله عز وجل حتى ينفخ في الصور
"নবীগণকে ৪০ রাতের পরে তাঁদের কবরের মধ্যে রাখা হয় না; কিন্তু তারা মহান আল্লাহর সম্মুখে সালাতে রত থাকেন; শিংগায় ফুঁক দেওয়া পর্যন্ত।” হাদীসটির বর্ণনাকারী আহমদ ইবনু আলী আল-হাসনবী মিথ্যাবাদী ও জালিয়াত বলে পরিচিত। এজন্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস একে মাউযূ বলে গণ্য করেছেন। অন্যান্য মুহাদ্দিস এই অর্থের অন্যান্য হাদীসের সমন্বয়ে একে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (স) মি'রাজের রাত্রিতে মূসা (আ)-কে নিজ কবরে সালাত আদায় করতে দেখেছেন এবং ঈসা (আ)-কেও দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে দেখেছেন। আল্লামা বাইহাকী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস এই দর্শনকে উপরের হাদীসের সমর্থনকারী বলে গণ্য করেছেন। হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি কোনো কোনো পূর্ববর্তী নবীকে হজ্জ পালনরত অবস্থায় দেখেছেন। এ সকল হাদীসকেও কোনো কোনো আলিম নবীগণের মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের নিদর্শন বলে গণ্য করেছেন। ইবনু হাজার আসকালানী বলেন, এই দর্শনের বিষয়ে কাযী ইয়ায বলেন, এই দর্শনের ব্যাখ্যায় বিভিন্ন কথা বলা হয়েছে। একটি ব্যাখ্যা হলো, নবীগণ শহীদগণের চেয়েও মর্যাদাবান। কাজেই নবীগণের জন্য ইন্তিকালের পরেও এইরূপ ইবাদতের সুযোগ পাওয়া দূরবর্তী কিছু নয়। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো, তাঁরা জীবিত অবস্থায় যেভাবে হজ্জ করেছেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে তার সূরাত দেখানো হয়েছে। কেউ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে ওহীর মাধ্যমে যা জানানো হয়েছে তাকে তিনি দর্শনের সাথে তুলনা করেছেন। রাসূলুল্লাহর (ﷺ) ওফাত পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বিশেষভাবে কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
مَا مِنْ أَحَدٍ يُسَلِّمُ عَلَيَّ إِلا رَدَّ اللَّهُ عَلَيَّ رُوحِي حَتَّى أَرُدَّ عَلَيْهِ السَّلَامَ
"যখনই কোনো মানুষ আমাকে সালাম করে তখনই আল্লাহ আমার রূহকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেন, যেন আমি তার সালামের প্রতিউত্তর দিতে পারি।" অন্য হাদীসে আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
من صلى علي عند قبري سمعته، ومن صلى علي من بعيد أعلمته
"কেউ আমার কবরের নিকট থেকে আমার উপর দরুদ পাঠ করলে আমি শুনতে পাই। আর যদি কেউ দূর থেকে আমার উপর দরুদ পাঠ করে তাহলে আমাকে জানান হয়।” হাদীসটির একটি সনদ খুবই দুর্বল হলেও অন্য আরেকটি গ্রহণযোগ্য সনদের কারণে ইবনু হাজার, সাখাবী, সুয়ূতী প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। আউস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন:
إِنَّ مِنْ أَفْضَلٍ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ ..... فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلاةِ فَإِنَّ صَلَاتُكُمْ مَعْرُوضَةٌ عَلَيَّ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ تُعْرَضُ صَلاتُنَا عَلَيْكَ وَقَدْ أَرَمْتَ أَي يَقُولُونَ قَدْ بَلِيتَ قَالَ إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلٌ قَدْ حَرَّمَ عَلَى الْأَرْضِ أَنْ تَأْكُلَ أَجْسَادَ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ السَّلام
"তোমাদের দিনগুলির মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো শুক্রবার।... কাজেই, এই দিনে তোমরা আমার উপর বেশি করে দরুদ পাঠ করবে, কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হবে।" সাহাবীগণ বলেন: “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি তো (কবরের মাটিতে) বিলুপ্ত হয়ে যাবেন, মিশে যাবেন, কী-ভাবে তখন আমাদের দরুদ আপনার নিকট পেশ করা হবে? তিনি বলেন: “মহান আল্লাহ মাটির জন্য নিষিদ্ধ করেছেন নবীদের দেহ ভক্ষণ করা। আরো অনেক সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে, মুমিন বিশ্বের যেখানে থেকেই দরুদ ও সালাম পাঠ করবেন, ফিরিশতাগণ সেই সালাত ও সালাম রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রাওযা মুবারাকায় পৌঁছিয়ে দেবেন।
উপরের হাদীসগুলি থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ইন্তেকালের পরে তাঁকে এক প্রকারের জীবন দান করা হয়েছে। এই জীবন বারযাখী জীবন, যা একটি বিশেষ সম্মান ও গায়েবী জগতের একটি অবস্থা। এ বিষয়ে হাদীসে যতটুকু বলা হয়েছে ততটুকুই বলতে হবে। হাদীসের আলোকে আমরা বলব, এই অপার্থিব ও অলৌকিক জীবনে তাঁর সালাত আদায়ের সুযোগ রয়েছে। কেউ সালাম দিলে আল্লাহ তাঁর রূহ মুবারাককে ফিরিয়ে দেন সালামের জবাব দেওয়ার জন্য। রাওযার পাশে কেউ দরুদ বা সালাত পাঠ করলে তিনি তা শুনেন, আর দূর থেকে পাঠ করলে তা তাঁর নিকট পৌঁছানো হয়। এর বেশি কিছুই বলা যাবে না। বাকি বিষয় আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হবে। বুঝতে হবে যে, উম্মাতের জানার প্রয়োজন নেই বলেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাকি বিষয়গুলি বলেন নি।
কিন্তু বর্তমান যুগে কেউ কেউ এ বিষয়ে ওহীর অতিরিক্ত কথা বলেন, এবং সেগুলিকে 'আকীদা' বা বিশ্বাসের অংশ বলে গণ্য করেন। এরূপ বিষয়গুলির অন্যতম হলো, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও নবীগণের ইন্তিকাল পরবর্তী এই বারযাখী জীবনকে পার্থিব বা জাগতিক জীবনের মতই মনে করা। এ বিষয়ে তাঁরা যা কিছু বলেন সবই ওহীর বক্তব্যের ব্যাখ্যা বা যুক্তি মাত্র, এবং তাদের এ সকল ব্যাখ্যা ও যুক্তি সাহাবীগণের মতামত ও কর্মধারার বিপরীত।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ইন্তেকালের পরের ঘটনাগুলি বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে পাঠ করলেই আমরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কখনোই জাগতিক জীবনের অধিকারী বলে মনে করেন নি। খলীফা নির্বাচনের বিষয়, গোসলের বিষয়, দাফনের বিষয়, পরবর্তী সকল ঘটনার মধ্যেই আমরা তা দেখতে পাই। রাসূলুল্লাহর (ﷺ) জীবদ্দশায় তাঁর পরামর্শ, দোয়া ও অনুমতি ছাড়া তাঁরা কিছুই করতেন না। কিন্তু তাঁর ইন্তেকালের পরে কখনো কোনো সাহাবী তাঁর রাওযায় দোয়া, পরামর্শ বা অনুমতি গ্রহণের জন্য আসেন নি। সাহাবীগণ বিভিন্ন সমস্যায় পড়েছেন, যুদ্ধবিগ্রহ করেছেন বা বিপদগ্রস্ত হয়েছেন। কখনোই খুলাফায়ে রাশেদীন বা সাহাবীগণ দলবেঁধে বা একাকী রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রাওযা মুবারাকে যেয়ে তাঁর কাছে দোয়া-পরামর্শ চাননি।
আবু বকরের (রা) খিলাফত গ্রহণের পরেই কঠিনতম বিপদে নিপতিত হয় মুসলিম উম্মাহ। একদিকে বাইরের শত্রু, অপরদিকে মুসলিম সমাজের মধ্যে বিদ্রোহ, সর্বোপরি প্রায় আধা ডজন ভণ্ড নবী। মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্বের সংকট। কিন্তু একটি দিনের জন্যও আবু বকর (রা) সাহাবীগণকে নিয়ে বা নিজে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রাওযায় যেয়ে তাঁর কাছে দোয়া চাননি। এমনকি আল্লাহর কাছে দোয়া করার জন্যেও রাওযা শরীফে সমবেত হয়ে কোনো অনুষ্ঠান করেননি। কী কঠিন বিপদ ও যুদ্ধের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন আলী (রা)। অথচ তাঁর সবচেয়ে আপনজন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রাওযায় যেয়ে তাঁর কাছে দোয়া চাননি বা আল্লাহর কাছে দোয়ার জন্য রাওযা শরীফে কোনো অনুষ্ঠান করেন নি।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ইন্তেকালের পরে ফাতিমা, আলী ও আব্বাস (রা) খলীফা আবূ বাক্ (রা)-এর নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার চেয়েছেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে অনেক মতভেদ ও মনোমালিন্য হয়েছে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশার (রা) সাথে আমীরুল মুমিনীন আলীর (রা) কঠিন যুদ্ধ হয়েছে, আমীর মুয়াবিয়ার (রা) সাথেও তাঁর যুদ্ধ হয়েছে। এসকল যুদ্ধে অনেক সাহাবী সহ অসংখ্য মুসলিম নিহত হয়েছেন। কিন্তু এসকল কঠিন সময়ে তাঁদের কেউ কখনো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে পরামর্শ চান নি। তিনি নিজেও কখনো এসকল কঠিন মুহুর্তে তাঁর কন্যা, জামাতা, চাচা, খলীফা কাউকে কোনো পরামর্শ দেন নি। এমনকি কারো কাছে রূহানীভাবেও প্রকাশিত হয়ে কিছু বলেন নি। আরো লক্ষণীয় যে, প্রথম শতাব্দীগুলির জালিয়াতগণ এ সকল মহান সাহাবীর পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক জাল হাদীস বানিয়েছে, কিন্তু কোনো জালিয়াতও প্রচার করে নি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তিকালের পরে রাওযা শরীফ থেকে বা সাহাবীগণের মাজলিসে এসে অমুক সাহাবীর পক্ষে বা বিপক্ষে যুদ্ধ করতে বা কর্ম করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় সর্বদা বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর নিকট দু'আ চাইতেন। কুরআন বা হাদীসে কোথাও ঘুনাক্ষরেও নির্দেশ দেওয়া হয় নি যে, তোমরা বিপদে পড়লে রাওযা শরীফে যেয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট দু'আ চাইবে। সাহাবীগণও কখনো এরূপ করেন নি।
মহান আল্লাহ কুরাআন কারীমে বলেছেন
وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَحِيمًا
"যদি তারা পাপে লিপ্ত হওয়ার পরে আপনার কাছে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইতেন তাহলে তারা আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী করশাময় হিসাবে পেত।" এখানে পাপী মুমিনকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট এসে তাঁকে তার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে অনুরোধ করতে। সাহাবীগণ তাঁর জীবদ্দশায় এরূপ করতেন। কিন্তু তাঁর ওফাতের পরে একটি ঘটনাতে একজন সাহাবীও তাঁর রাওযায় যেয়ে বলেন নি যে, হে আল্লাহর রাসূল আমি পাপ করেছি, তাওবা করছি আপনি আমার জন্য ক্ষমা চান। সাহাবীগণের যুগের অনেক পরে কোনো কোনো মানুষের মধ্যে এরূপ কর্ম প্রকাশ পেয়েছে। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ-এর ওফাত পরবতী জীবনকে কখনোই সাহাবীগণ জাগতিক জীবনের মত মনে করেন নি।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাঁর দায়িত্ব ও ক্ষমতা বিষয়ক বিতর্ক

📄 তাঁর দায়িত্ব ও ক্ষমতা বিষয়ক বিতর্ক


উপরে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে আমরা দেখেছি যে, মহান আল্লাহ নবী-রাসূলগণকে সাধারণভাবে এবং মহানবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে বিশেষভাবে অনেক মর্যাদা, অলৌকিক বৈশিষ্ট্য ও মুজিযা দান করেছেন। পরবর্তী বিভিন্ন পরিচ্ছেদে এবং বিশেষত শিরক-কুফর বিষয়ক অধ্যায়ে আমরা দেখব যে, নবী-রাসূলগণের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য ও মুজিযাকে 'ক্ষমতা' ও অধিকার ধারণা করে পূর্ববর্তী উম্মাতের মানুষেরা শিরকে নিপতিত হয়। এ জন্য কুরআন কারীমে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে মুজিযা, শাফা'আত বা অন্য কোনো কিছুই নবী-রাসূলগণের ইচ্ছাধীন বা ক্ষমতাধীন নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছাধীন ও ক্ষমতাধীন। বিশ্ব পরিচালনা বা কারো মঙ্গল অমঙ্গলের ক্ষমতা বা দায়িত্ব মহান আল্লাহ নবী-রাসূলগণকে দেন নি। এ বিষয়ে অনেক আয়াত আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি। মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ
"বল, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার নিজের ভাল-মন্দের উপরেও আমার কোনো অধিকার নেই।” অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي ضَرًّا وَلَا نَفْعًا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ
"বল, আল্লাহ যা ইচ্ছা করে তা ব্যতীত আমার নিজের ভালমন্দের উপর আমার কোনো অধিকার নেই।" অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا قُلْ إِنِّي لَنْ يُجِيرَنِي مِنَ اللَّهِ أَحَدٌ وَلَنْ أَجِدَ مِنْ دُونِهِ مُلْتَحَدًا إِلَّا بَلاغًا مِنَ اللَّهِ ওয়ারাসালাতুহু
"বল, আমি তোমাদের ইষ্ট-অনিষ্টের ক্ষমতা বা মালিকানা আমার নেই। বল: আল্লাহ থেকে কেউই আমাকে রক্ষা করতে পরবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত আমি কোনো আশ্রয়ও পাব না, কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে পৌঁছানো এবং তাঁর বাণী প্রচার (আমাকে রক্ষা করবে)।"
কুরআন ও হাদীসে বারংবার দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, একমাত্র আল্লাহই মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারেন। তিনি ছাড়া আর কেউই কোনো মানুষকে বিপদ-কষ্ট থেকে উদ্ধার করতে পারে না। এর বিপরীতে কখনোই কোনোভাবে কুরআন ও হাদীসে একটি স্থানেও বলা হয় নি যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বা অন্য কোনো নবী বা ওলী কোনোভাবে কাউকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা রাখেন বা আল্লাহ কাউকে এরূপ কোনো ক্ষমতা প্রদান করেছেন। এ অর্থের আয়াত ও হাদীস অনেক। একস্থানে আল্লাহ বলেন:
قُلْ مَنْ يُنَجِّيكُمْ مِنْ ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ تَدْعُونَهُ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً لَئِنْ أَنْجَانَا مِنْ هَذِهِ لَنَكُونَنَّ مِنَ الشَّاكِرِينَ قُلِ اللَّهُ يُنَجِّيكُمْ مِنْهَا وَمِنْ كُلِّ كَرْبٍ ثُمَّ أَنْتُمْ تُشْرِكُونَ
"বল, কে তোমাদের ত্রাণ করে স্থলভাগের এবং সমূদ্রের অন্ধকার হতে যখন তোমরা কাতরভাবে এবং গোপনে তার নিকট অনুনয় কর: 'আমাদেরকে এ থেকে ত্রাণ করলে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদিগের অন্তর্ভুক্ত হব'? বল, 'আল্লাহই তোমারেদকে তা থেকে এবং সমস্ত দুঃখ-কষ্ট বিপদ-আপদ থেকে ত্রাণ করেন। এতদসত্ত্বেও তোমরা তার শরীক কর।" অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
أَمْ مَنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الأَرْضِ أَإِلَهٌ مَعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ
"তিনিই আর্তের আহবানে সাড়া দেন যখন সে তাকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীত (পূর্ববর্তীদের) স্থলাভিষিক্ত করেন। আল্লাহর সাথে কি কোনো ইলাহ আছে? তোমরা উপদেশ অতি সামান্যই গ্রহণ করে থাক।" অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلا كَاشِفَ لَهُ إِلا هُوَ وَإِنْ يَمْسَسْكَ بِخَيْرٍ فَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
"আল্লাহ তোমাকে বিপদ-কষ্ট দিলে তিনি ব্যতীত তা মোচনকারী আর কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ করেন তবে তিনিই তো সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لَفَضْلِهِ
"এবং আল্লাহ তোমাকে বিপদ-আপদ দিলে তিনি ব্যতীত তা মোচনকারী কেউ নেই এবং আল্লাহ যদি তোমার মজ্ঞল চান তবে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই।"
এরূপ বহুসংখ্যক সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন আয়াতের বিপরীতে একটি আয়াতেও মহান আল্লাহ বলেন নি যে, আমি বিপদ ত্রানের বা কষ্টদুঃখ দূর করার দায়িত্ব, অধিকার বা ক্ষমতা মুহাম্মাদ ()ﷺ বা অন্য কোনো নবী, নবী বংশের ইমাম বা কোনো ওলীকে প্রদান করেছি। উপন্তু বারংবার বলা হয়েছে যে, এরূপ কোনো অধিকার, সুযোগ বা ক্ষমতা আল্লাহ কাউকে কখনোই প্রদান করেন নি। উপরে উল্লিখিত অনেক আয়াত ও হাদীসে তা আমরা দেখেছি।
মহান আল্লাহ তাঁর নবী-রাসূলগণের এবং বিশেষত মহানবী মুহাম্মাদ ()ﷺ(-এর দু'আ কবুল করতেন। তবে দু'আ কবুল করা বা না করা পুরোপুরিই আল্লাহর এখতিয়ারে। তিনি আল্লাহর প্রিয়তম বান্দা। তার অনেক দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন। আবার কখনো কখনো কবুল করেন নি। আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ফজরের শেষ রাকাতের রুকু থেকে ওঠার পরে কতিপয় কাফিরের জন্য বদদোয়া করে বলতেন: হে আল্লাহ, আপনি অমুক, অমুককে লানত করুন। তখন আল্লাহ তাঁকে নিষেধ করেন এবং বলেন:
لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ
"এ বিষয়ে আপনার কোনো অধিকার নেই, আল্লাহ চাইলে তাদেরকে ক্ষমা করবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন, কারণ তারা জালিম।" কুরআনে আল্লাহ বারংবার জানিয়েছেন যে, তিনি তাঁর প্রিয়তম হাবীব ও খলীল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-কে মানুষের হিসাব, শাস্তি, কল্যাণ, অকল্যাণ ইত্যাদির ঝামেলায় ফেলেন নি। এগুলি সবই মহান আল্লাহর একক দয়িত্ব। মহান আল্লাহ যদি অপারগ হতেন বা তাঁর কারো সহযোগিতার প্রয়োজন হতো তবে অবশ্যই তিনি সর্বাগ্রে সর্বোচ্চ সহযোগিতা গ্রহণ করতেন তাঁর প্রিয়তম রাসূল থেকে। কিন্তু তিনি যেহেতু কারো সহযোগিতার মুখাপেক্ষী নন, সেহেতু তিনি তাঁর প্রিয়তমকে এ সকল বিড়ম্বনার মধ্যে ফেলেন নি।
وَإِنْ مَا نُرِيَنَّكَ بَعْضَ الَّذِي نَعِدُهُمْ أَوْ نَتَوَفَّيَنَّكَ فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلَغُ وَعَلَيْنَا الْحِسَابُ
"তাদেরকে যে (শান্তির) প্রতিশ্রুতি প্রদান করি তার কিছু যদি তোমাকে দেখিয়ে দিই অথবা (তার পূর্বেই) তোমার মৃত্যু ঘটিয়ে দিই, তবে তোমার কর্তব্য তো কেবল প্রচার করা এবং হিসাব-নিকাশ তো আমার কাজ।" তাঁর দু'আয় আল্লাহ অসংখ্য মানুষকে মাফ করেছেন। তাঁর শাফায়াতে অসংখ্য পাপী মুসলিমকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। তবে তাঁর দু'আ ও শাফায়াত কবুল করা আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহর রহমত ও তাঁর রাসূলের দু'আর কল্যাণ পাওয়ার যোগ্য কে তা আল্লাহই ভাল জানেন। আল্লাহ বলেছেন:
اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ذَلكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ
"আপনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন অথবা ক্ষমা প্রার্থনা না করুন একই কথা। আপনি সত্তর বার তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, যখন আল্লাহ আয়াত নাযিল করলেন: "তোমার নিকট আত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও” তখন তিনি তাঁর নিকট আত্মীয়দের একত্রিত করে বলেন:
يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ ... اشْتَرُوا أَنْفُسَكُمْ لا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنْ اللَّهِ شَيْئًا يَا بَنِي عَبْدِ مَنَافِ لَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا يَا عَبَّاسُ بْن عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لا أُغْنِي عَنْكَ مِنْ اللَّهِ شَيْئًا وَيَا صَفِيَّةُ عَمَّةَ رَسُولِ اللهِ لا أُغْنِي عَنْكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَيَا فَاطِمَةُ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَلِينِي مَا شِئْتِ مِنْ مَالِي لَا أُغْنِي عَنْكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا
"হে কুরাইশ বংশের লোকেরা, তোমরা (নিজের ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে) নিজেদেরকে ক্রয় কর; আমি আল্লাহর পরিবর্তে তোমাদের কোনোই উপকারে আসব না। হে আবদ মানাফ গোত্রের মানুষেরা, আমি আল্লাহর পরিবর্তে তোমাদের কোনোই উপকারে আসব না। হে আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিব, আমি আল্লাহর পরিবর্তে আপনার কোনোই উপকারে আসব না। হে রাসূলুল্লাহর ফুফু সাফিয়া, আমি আল্লাহর পরিবর্তে আপনার কোনোই উপকারে আসব না। হে মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতিমা, আমার সম্পদ থেকে তুমি যা ইচ্ছা চেয়ে নাও, আমি আল্লাহর পরিবর্তে তোমার কোনোই উপকারে আসব না।" আবূ হুরাইরা (রা) বলেন,
قَامَ فِينَا النَّبِيُّ ﷺ فَذَكَرَ الْغُلُولَ فَعَظَمَهُ وَعَظَمَ أَمْرَهُ قَالَ لا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى رَقَبَتِهِ شَاةٌ لَهَا تُغَاء عَلَى رَقَبَتِهِ فَرَسٌ لَهُ حَمْحَمَةٌ يَقُولُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَعْتْنِي فَأَقُولُ لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ وَعَلَى رَقَبَتِهِ بَعِيرٌ لَهُ رُغَاءٌ يَقُولُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَعْتُنِي فَأَقُولُ لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ وَعَلَى رَقَبَتِهِ صَامِتٌ فَيَقُولُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَعْتْنِي فَأَقُولُ لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ أَوْ عَلَى رَقَبَتِهِ رِقَاعٌ تَخْفِقُ فَيَقُولُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَعْثْنِي فَأَقُولُ لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ
"নবী )ﷺ( আমাদের মধ্যে দণ্ডায়মান হয়ে যাকাত বা সরকারী সম্পদ অবৈধভাবে ভোগ করার বা মালিকানায় নেওয়ার বিষয়ে কথা বললেন। তিনি এর কঠিন পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করলেন। তিনি বললেন, তোমাদের কাউকে যেন কিয়ামতের দিন এমন না পাই যে, তার কাঁধে একটি চিৎকার রত মেষ অথবা ঘোড়া রয়েছে, সে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে উদ্ধার করুন। তখন আমি বলব: তোমার জন্য কোনো কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি তো তোমাকে জানিয়েছিলাম। অথবা তাঁর কাঁধে চিৎকার রত উট থাকবে, সে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে উদ্ধার করুন, আমি বলব, তোমার জন্য কোনো কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি তো তোমাকে জানিয়েছিলাম। অথবা তার কাঁধে নীরব (জড়) সম্পদ থাকবে এবং সে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে উদ্ধার করুন, আমি বলব, তোমার জন্য কোনো কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি তো তোমাকে জানিয়েছিলাম। উবাদা ইবনুস সামিত (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন মুনাফিক মুসলমানদের খুব কষ্ট দিত। তখন আবূ বাকর (রা) বলেন, চল, আমরা এ মুনাফিক থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ এর নিকট আবেদন করি। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন:
إنَّهُ لَا يُسْتَعاتُ بِي، وَإِنَّمَا يُسْتَغاتُ بِالله
"আমার কাছে ত্রাণ প্রার্থনা করতে হয় না, একমাত্র আল্লাহর কাছেই ত্রাণ প্রার্থনা করতে হয়।"

টিকাঃ
৩৬৪. সূরা (৩৯) যুমার: ৩০ আয়াত।
৩৬৫. সূরা (৩) আল-ইমরান: ১৪৪ আয়াত।
৩৬৬. সূরা (২১) আম্বিয়া: ৩৪ আয়াত।
৩৬৭. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৬/৪৮৩।
৩৬৮. বাইহাকী, হায়াতুল আনবিয়া, পৃ. ১১০।
৩৬৯. মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৪১; ৪/১৮৪৫; বাইহাকী, হায়াতুল আনবিয়া, পৃ. ১২৭-১৩২।
৩৭০. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৬/৫৬৯।
৩৭১. আবূ দাউদ, আস-সুনান ২/২১৮; আহমদ, আল-মুসনাদ ২/৫২৭; আলবানী হাদীসটির সনদ হাসান বলেছেন। আলবানী, সহীহুত তারগীব ২/১২১।
৩৭২. হাদীসটির সনদ দুর্বল। আলবানী, সিলসিলা যায়ীফাহ নং ২০৩।
৩৭৩. সাখাবী, ফাতহুল মুগীস ৪/১৮।
৩৭৪. আবূ দাউদ, আস-সুনান ১/৩৮২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৫২৪।
৩৭৫. এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন, ইবনু তাইমিয়া, যিয়ারাতুল কুবূর ওয়াল ইসতিআনাতু বিল মাকবূর, পৃ. ৩৬-৩৭।
৩৭৬. সূরা (৪) নিসা: ৬৪ আয়াত।
৩৭৭. ইবনু কাসীর, তাফসীর ১/৫২২-৫২৩।
৩৭৮. সূরা (৭) আ'রাফ: ১৮৮ আয়াত।
৩৭৯. সূরা (১০) ইউনূস: ৪৯ আয়াত।
৩৮০. সূরা (৭২) জিন্ন: ২১-২৩ আয়াত।
৩৮১. সূরা (৬) আনআম: ৬৩-৬৪ আয়াত।
৩৮২. সূরা (২৭) নামল: ৬২ আয়াত।
৩৮৩. সূরা (৬) আনআম: ১৭ আয়াত।
৩৮৪. সূরা (১০) ইউনূস: ১০৭ আয়াত।
৩৮৬. বুখারী, আস-সহীহ ৪/১৫৮৩; মুসলিম, আস-সহীহ ৫/১৭৯১।
৩৮৭. সূরা (১৩) রা'দ: ৪০ আয়াত।
৩৮৮. সূরা (৯) তাওবা: ৮০ আয়াত।
৩৮৯. সূরা (২৬) শু'আরা: ২১৪ আয়াত।
৩৯০. বুখারী, আস-সহীহ ২/৯৮২; মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৯২।
৩৯১. বুখারী, আস-সহীহ ২/৮৩১; মুসলিম, আস-সহীহ ৫/১৭৮৫।
৩৯২. তাবারানী, মু'জামুল কাবীর ১৭/১৮৬; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১০/১৫১; হাইসামী বলেন, হাদীসটির সনদ হাসান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00