📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাঁর মানবত্ব বনাম অলৌকিকত্ব বিষয়ক বিতর্ক

📄 তাঁর মানবত্ব বনাম অলৌকিকত্ব বিষয়ক বিতর্ক


কুরআন-হাদীসে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ অন্যদের মতই মানুষ। আবার কুরআন-হাদীসে বিভিন্ন স্থানে তাঁর অনেক মুজিযা, অলৌকিক কর্ম, ও অলৌকিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। সাহাবীগণ ও তাঁদের অনুসারী তাবিয়-তাবিতাবিয়ী ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অনুসারিগণ এ সকল আয়াত ও হাদীসের মধ্যে কোনোরূপ বৈপরীত্য কল্পনা করেন নি। তাঁরা সর্বান্তকরণে সকল আয়াত ও হাদীসকে সরল ও স্বাভাবিক অর্থে বিশ্বাস করেছেন। তিনি মানুষ ছিলেন তা যেমন সত্য, তেমনি সত্য যে মহান আল্লাহ তাকে অনেক অলৌকিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এ বিষয়ে দুটি মতবাদ তৈরি হয়, যারা এক অর্থের আয়াত ও হাদীসকে অন্য অর্থের আয়াত ও হাদীসের বিপরীত বা সাংঘর্ষিক বলে কল্পনা করে এবং একটি অর্থকে বিশ্বাস করার নাম করে অন্য অর্থের সকল আয়াত ও হাদীস বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে বাতিল করে দেয়।
প্রথম মতটি দ্বিতীয় হিজরী শতকের মু'তাযিলা ও সমমনা ফিরকাসমূহের মধ্যে জন্মলাভ করে এবং পরবর্তীকালে দার্শনিক ও আধুনিক যুগে কোনো কোনো পাশ্চাত্যপন্থী পণ্ডিতের মধ্যে বিকাশ লাভ করে। তারা রাসূলুল্লাহ-এর বাশারিয়‍্যাত বা মানবত্ব বিষয়ক আয়াত ও হাদীসগুলিকে তাদের বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে এবং তাঁর অলৌকিকত্ব বিষয় আয়াত ও হাদীস বিভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে বাতিল করে দেন। তাদের আকীদার মূল এই যে, তিনি একান্তই অন্য সকলের মত মানুষ ছিলেন, তিনি কুরআন ছাড়া অন্য কোনো মুজিযা দেখান নি এবং তাঁর কোনো অলৌকিক বৈশিষ্ট্যও ছিল না। এ বিষয়ক যে সকল আয়াত ও হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার অমুক বা তমুক অর্থ রয়েছে। এভাবে তারা তাঁর মুজিযা বিষয়ক ও তাঁর অলৌকিক বৈশিষ্ট্য বিষয়ক আয়াত ও হাদীসগুলির এমন ব্যাখ্যা করেন যে তাতে প্রকৃত পক্ষে তা সবই অস্বীকার করা হয়।
অন্য মতটি অনেক পরে জন্মলাভ করে। ৭ম-৮ম হিজরী শতক থেকে কেউ কেউ রাসূলুল্লাহ-এর মুজিযা, অলৌকিক কর্ম ও অলৌকিক বৈশিষ্টাবলি বিষয়ক আয়াত ও হাদীসকে তাদের বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। এগুলির ভিত্তিতে তারা তাঁরা বাশারিয়‍্যাত বা মানবত্ব বিষয়ক সকল আয়াত ও হাদীসকে বিভিন্ন ব্যাখার মাধ্যমে বাতিল করে দেন। তাদের মতামতের মূল কথা এই যে, তিনি মূলত বাশার বা মানুষ ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে তিনি অলৌকিক সত্তা ও ব্যক্তিত্ব ছিলেন। একান্তই রূপক অর্থে বা দাওয়াতের প্রয়োজনে তাকে মানুষ বলা হয়েছে। তার মানবত্ব ও মানবীয় বৈশিষ্ট্য জ্ঞাপক আয়াত ও হাদীসগুলির অমুক বা তমুক অর্থ রয়েছে। এভাবে তারা তাঁর বাশারিয়‍্যাত বিষয়ক সকল আয়াত ও হাদীসের এমন ব্যাখ্যা করেন যে, সেগুলি মূলত সবই বাতিল হয়ে যায়।
আমরা এখানে এ বিষয়ক আয়াত ও হাদীসগুলি আলোচনা করব। 'বাশার' (بشر) অর্থ মানুষ, মানুষগণ বা মানুষজাতি (man, human being, men, mankind)। কুরআন কারীমে প্রায় ৪০ স্থানে 'বাশার' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এই একই অর্থে। একবচন ও বহুবচন উভয় অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
পরবর্তী অধ্যায়ে নবী-রাসূলগণের বৈশিষ্ট্য আলোচনাকালে আমরা দেখব যে, যুগে যুগে নবী-রাসূলদের দাও'আত অস্বীকার করার ক্ষেত্রে অবিশ্বাসীদের প্রধান দাবি ছিল যে, নবীগণ তো 'মানুষ' মাত্র, এরা আল্লাহর নবী হতে পারেন না। আল্লাহ যদি কাউকে পাঠাতেই চাইতেন তবে ফিরিশতা পাঠিয়ে দিতেন। যেহেতু এরা মানুষ সেহেতু এদের নুবুওয়াতের দাবি মিথ্যা। এদের কথার প্রতিবাদে নবীগণ তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, 'আমরা তোমাদের মত মানুষ' এ কথা ঠিক, তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ হলে আল্লাহর ওহী ও নুবুওয়াতের মর্যাদা লাভ করা যায় না। বরং আল্লাহ মানুষদের মধ্য থেকেই যাকে ইচ্ছ নবী বা রাসূল হিসেবে বেছে নেন এবং মানবত্বের সাথেই তাকে অলৌকিক বৈশিষ্ট্য ও ওহী প্রদান করেন।
রাসূলুল্লাহ-এর বিষয়েও কুরআনে একথা বলা হয়েছে। কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ 'বাশার' বা মানুষ। এছাড়া উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি 'অন্যদের মত মানুষ'। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
وَقَالُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنْبُوعًا أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِنْ نَخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَارَ خِلَالَهَا تَفْجِيرًا أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ قَبِيلًا أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِنْ زُخْرُفَ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ نُؤْمِنَ لِرَقِيِّكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتَابًا نَقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلَّا بَشَرًا رَسُولًا وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلَّا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَسُولًا
"এবং তারা বলে, 'কখনই আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনব না যতক্ষণ না আপনি আমাদের জন্য ভূমি হতে একটি ঝর্ণাধারা উৎসারিত করবেন। অথবা আপনার একটি খেজুরের ও আঙ্গুরের বাগান হবে যার ফাঁকে ফাঁকে আপনি নদী-নালা প্রবাহিত করে দেবেন। অথবা আপনি যেমন বলে থাকেন তদনুযায়ী আকাশকে খণ্ড-বিখণ্ড করে আমাদের উপর ফেলবেন, অথবা আল্লাহ ও ফিরিশতাগণকে আমাদের সামনে এনে উপস্থিত করবেন। অথবা আপনার একটি অলংকৃত স্বর্ণ নির্মিত গৃহ হবে। অথবা আপনি আকাশে আরোহণ করবেন, তবে আমরা আপনার আকাশ আরোহণে কখনো বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আপনি আমাদের (আসমান থেকে) একটি কিতাব অবতীর্ণ করবেন যা আমরা পাঠ করব।' বল, 'পবিত্র আমার প্রতিপালক (সুবহানাল্লাহ!)! আমি তো কেবলমাত্র একজন মানুষ, একজন রাসূল। আর মানুষের কাছে যখন হেদায়েতের বানী আসে তখন তো তারা শুধু একথা বলে ঈমান আনয়ন করা থেকে বিরত থাকে যে, আল্লাহ কি একজন মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন?!"
অর্থাৎ কাফিরদের দাবি যে, আল্লাহর রাসূল হওয়ার অর্থ আল্লাহর ক্ষমতার কিছু অংশ লাভ করা। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ জানালেন যে, রাসূল হওয়ার অর্থ আল্লাহর নিদের্শ অনুসারে প্রচারের দায়িত্ব লাভ, ক্ষমতা লাভ নয়; ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا "বল: 'আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ মাত্র আমার প্রতি ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তোমাদের মা'বুদ (উপাস্য) একমাত্র একই মা'বুদ। অতএব যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।" অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ وَوَيْلٌ لِلْمُشْرِكِينَ "বল, আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ মাত্র আমার প্রতি ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তোমাদের মা'বুদ একমাত্র একই মা'বুদ। অতএব তোমরা তারই পথ অবলম্বন কর এবং তারই নিকট ক্ষমা প্রর্থনা কর। যারা শিরকে লিপ্ত তাদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ।"
রাসূলুল্লাহ বারবার তাঁর উম্মতকে বিষয়টি শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি একদিকে যেমন আল্লাহ তাঁকে যে মর্যাদা দান করেছেন তা তাঁর উম্মতকে জানিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে বারবার তাঁর উম্মতকে শিখিয়েছেন যে, তিনি একজন মানুষ। এক হাদীসে নবী-পত্নী উম্মু সালামা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ وَإِنَّهُ يَأْتِينِي الْخَصْمُ فَلَعَلَّ بَعْضُكُمْ أَنْ يَكُونَ أَبْلَغَ مِنْ بَعْضٍ فَأَحْسِبُ أَنَّهُ صَدَقَ فَأَقْضِيَ لَهُ بِذَلِكَ فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِحَقِّ مُسْلِمٍ فَإِنَّمَا هِيَ قِطْعَةٌ مِنْ النَّارِ فَلْيَأْخُذْهَا أَوْ فَلْيَتْرُكْهَا "আমি একজন মানুষ মাত্র। আমার কাছে বিচার ফয়সালা নিয়ে মানুষেরা আসে। বাদী ও বিবাদীর মধ্য থেকে একজন হয়ত অধিকতর বাকপটু হয়, ফলে তাকে সত্যবাদী মনে করে হয়ত আমি তার পক্ষেই বিচার করি। যদি আমি ভুল করে একের সম্পদ অন্যের পক্ষে বিচার করে দিই, তবে সে সম্পদ তার জন্য হালাল হবে না। বরং তা হবে তার জন্য আগুনের একটি পিণ্ড, তার ইচ্ছা হলে সে তা গ্রহণ করুক, আর ইচ্ছা হলে তা পরিত্যাগ করুক।" অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সালাতের মধ্যে ভুল করেন। সালামের পরে সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসূল, সালাতের কি কোনো নতুন বিধান নাযিল হয়েছে? তিনি বলেন: তোমরা এ প্রশ্ন করছ কেন? তারা বলেন: আপনি এমন এমন করেছেন। তখন তিনি সালাত পূর্ণ করেন এবং বলেন:
إِنَّهُ لَوْ حَدَثَ فِي الصَّلَاةِ شَيْءٌ لَنَبَّأْتُكُمْ بِهِ وَلَكِنْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ فَإِذَا نَسِيتُ فَذَكِّرُونِي "সালাতের নিয়ম পরিবর্তন করা হলে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে জানাতাম। কিন্তু আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ মাত্র। তোমরা যেমন ভুল কর আমিও তেমনি ভুল করি। যদি আমি কখনো ভুল করি তবে তোমরা আমাকে মনে করিয়ে দেবে।"
রাফি ইবনু খাদীজ (রা) বলেন: যখন রাসূলুল্লাহ মদীনায় আসলেন তখন মদীনার মুসলমানেরা খেজুরের মাওসুমের শুরুতে পুরুষ খেজুরের রেণুর সাথে স্ত্রী খেজুরের রেণু মেলাতেন, উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য। তিনি তাদেরকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন: আমরা সবসময় এভাবে করে আসছি। তিনি বলেন: এ না করলেই বোধহয় ভাল হবে। তখন তারা তা ত্যাগ করেন, ফলে সে বৎসর খেজুরের উৎপাদন কম হয়। তখন তাঁকে বিষয়টি জানানো হয়। তিনি বলেন:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ دِينِكُمْ فَخُذُوا بِهِ وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ رَأْي فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ
"আমি তো একজন মানুষ মাত্র। যখন আমি তোমাদেরকে দীনের বিষয়ে কোনো নির্দেশ দান করব, তখন তোমরা তা গ্রহণ করবে। আর যদি আমি কোনো জাগতিক বিষয়ে আমার ধারণা বা মতামত বলি তবে তো আমি একজন মানুষ মাত্র।" অন্য হাদীসে আয়েশা (রা) বলেন:
دَخَلَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ رَجُلَانِ فَكَلَّمَاهُ بِشَيْءٍ لَا أَدْرِي مَا هُوَ فَأَغْضَبَاهُ فَلَعَنَهُمَا وَسَبَّهُمَا فَلَمَّا خَرَجًا قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَصَابَ مِنْ الْخَيْرِ شَيْئًا مَا أَصَابَهُ هَذَانِ قَالَ وَمَا ذَاكِ قَالَتْ قُلْتُ لَعَنْتَهُمَا وَسَبَبْتَهُمَا قَالَ أَوَ مَا عَلِمْتِ مَا شَارَطْتُ عَلَيْهِ رَبِّي قُلْتُ اللَّهُمَّ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ فَأَيُّ الْمُسْلِمِينَ لَعَنْتُهُ أَوْ سَبَبْتُهُ فَاجْعَلْهُ لَهُ زَكَاةً وَأَجْرًا "রাসূলুল্লাহ -এর কাছে দু'জন লোক আসেন। তারা কি বলেন আমি জানি না, তবে তাদের কথায় রাসূলুল্লাহ রাগান্বিত হন। তিনি তাদেরকে গালি দেন এবং বদ দোয়া করেন। তারা বেরিয়ে গেলে আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, এই দুইজন লোক কখনো কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না। তিনি বলেন: কেন? আমি বললাম: কারণ আপনি তাদেরকে গালি দিয়েছেন এবং বদদোয়া করেছেন। তিনি বলেন: তুমি কি জান না আমার প্রতিপালকের সাথে আমার কি চুক্তি হয়েছে? আমি তো আল্লাহকে বলেছি: 'হে আল্লাহ, আমি তো একজন মানুষ মাত্র, তাই যদি কোনো মুসলিমকে আমি কখনো বদদোয়া করি বা গালি দিই, তাহলে আপনি তা সেই ব্যক্তির জন্য পবিত্রতা ও সওয়াব বানিয়ে দেবেন।" উপরের অর্থে আবূ হুরাইরা, জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ, আনাস ইবনু মালিক, আবু বাক্কাহ ও অন্যান্য সাহাবী (৯) থেকে অনেক হাদীস সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সিহাহ সিত্তার অন্যান্য গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।
এ সকল আয়াত ও হাদীসের পাশাপাশি অন্যান্য আয়াত ও হাদীসে রাসূলুল্লাহ -এর অনেক মুজিযা ও বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মিরাজ, চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করা ও অন্যান্য মুজিযা বিষয়ক আয়াত ও হাদীস আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি। বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম রাসূলকে অনেক বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছিলেন যা কোনো মানুষের মধ্যে বিদ্যমান থাকা সম্ভব নয়। এগুলিকে আরবীতে 'খাসাইস' বা 'বৈশিষ্ট্যসমূহ' বলা হয। ইতোপূর্বে তার মর্যাদা বিষয়ক হাদীসগুলিতে তাঁর অনেক বৈশিষ্ট্য আমরা দেখেছি। বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, মানুষ যেভাবে সামনের দিকে দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তুসমূহ দেখে তিনি অনুরূপভাবে পিছনদিকেও দেখতেন, তাঁর চক্ষুদ্বয় ঘুমালেও তাঁর অন্তর জাগ্রত থাকত, সাধারণ মানুষের মত তার শরীরে ঘামে কোনো দুর্গন্ধ ছিলনা, বরং তার শরীরের ঘাম ছিল অত্যন্ত সুগন্ধ, সাহাবীগণ যা আতর হিসেবে ব্যবহার করতে অতীব আগ্রহী ছিলেন। এ ছাড়া আরো অনেক অলৌকিক বৈশিষ্ট্যের কথা বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায়। পরবর্তী অনুচ্ছেদগুলিতে আমরা কিছু বৈশিষ্ট্য আলোচনা করব।
রাসূলুল্লাহ -এর মহান মর্যাদার একটি দিক যে, মহান আল্লাহ তাকে 'সিরাজুম মুনীর': 'জ্যোতির্ময় প্রদীপ' বা 'নূর- প্রদানকারী প্রদীপ' বলে আখ্যায়িত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا "হে নবী, আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারীরূপে এবং আলোকোজ্জ্বল (নূর-প্রদানকারী) প্রদীপরূপে।"
আমরা কুরআন কারীমের বৈশিষ্ট্য বিষয়ক আলোচনায় দেখব যে, মহান আল্লাহ বারংবার কুরআন কারীমকে 'নূর' বা জ্যোতি বলে আখ্যায়িত করেছেন। কোনো কোনো স্থানে মহান আল্লাহ সাধারণভাবে 'নূর' বা 'আল্লাহর নূর' এর কথা বলেছেন। এর দ্বারা তিনি কি বুঝিয়েছেন সে বিষয়ে সাহাবী-তাবিয়ীগণের যুগ থেকে মুফাস্সিরগণ মতভেদ করেছেন। আল্লাহ বলেন:
يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ "তারা 'আল্লাহর নূর' ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে চায়; কিন্তু আল্লাহ 'তাঁর নূর' পূর্ণ করবেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।"
এখানে 'আল্লাহর নূর' বলতে কি বুঝানো হয়েছে সে বিষয়ে মুফাস্সিরগণের বিভিন্ন মত রয়েছে। আল্লামা কুরতুবী বলেন: এখানে 'আল্লাহর নূরের' ব্যাখ্যায় ৫টি মত রয়েছে: (১) আল্লাহর নূর অর্থ আল-কুরআন, কাফিররা কথার দ্বারা তা বাতিল করতে ও মিথ্যা প্রমাণ করতে চায়। ইবনু আব্বাস ও ইবনু যাইদ এ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। (২) আল্লাহর নূর অর্থ ইসলাম, কাফিররা কথাবার্তার মাধ্যমে তাকে প্রতিরোধ করতে চায়। সুদ্দী এ কথা বলেছেন। (৩) আল্লাহর নূর অর্থ মুহাম্মাদ (স), কাফিররা অপপ্রচার ও নিন্দাচারের মাধ্যমে তার ধবংস চায়। দাহহাক এ কথা বলেছেন। (৪) আল্লাহর নূর অর্থ আল্লাহর দলীল-প্রমাণাদি, কাফিররা সেগুলি অস্বীকার করে মিটিয়ে দিতে চায়। ইবনু বাহর এ কথা বলেছেন। (৫) আল্লাহর নূর অর্থ সূর্য। অর্থাৎ ফুৎকারে সূর্যকে নেভানোর চেষ্টা
করার মত বাতুল ও অসম্ভব কাজে তারা লিপ্ত। ইবনু ঈসা এ কথা বলেছেন।
অনুরূপভাবে অন্যান্য বিভিন্ন আয়াতে 'নূর' বা 'আল্লাহর নূর' বলা হয়েছে এবং সেখানে নূর অর্থ 'কুরআন', 'ইসলাম' 'মুহাম্মাদ (সঃ)' ইত্যাদি অর্থ গ্রহণ করেছেন মুফাস্সিরগণ। এরূপ এক আয়াতে আল্লাহ বলেন:
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ "হে কিতাবীগণ, আমার রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন, তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন এবং অনেক উপেক্ষা করে থাকেন। আল্লাহর নিকট হতে এক নূর ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের নিকট এসেছে।"
এই আয়াতে 'নূর' বা জ্যোতি বলতে কি বুঝানো হয়েছে সে বিষয়ে মুফাস্সিরগণ মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন, এখানে নূর অর্থ কুরআন, কেউ বলেছেন, ইসলাম, কেউ বলেছেন, মুহাম্মাদ (সঃ)।
এই তিন ব্যাখ্যার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। যারা 'নূর' অর্থ ইসলাম বলেছেন, তাঁরা দেখেছেন যে, এই আয়াতে প্রথমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কথা বলা হয়েছে এবং শেষে কিতাব বা কুরআনের কথা বলা হয়েছে। কাজেই মাঝে নূর বলতে ইসলামকে বুঝানোই স্বাভাবিক। এ ছাড়া কুরআন কারীমে অনেক স্থানে 'নূর' বলতে ইসলামকে বুঝানো হয়েছে।
যারা এখানে নূর অর্থ কুরআন বুঝিয়েছেন, তাঁরা দেখেছেন যে, এই আয়াতের প্রথমে যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথা বলা হয়েছে, সেহেতু শেষে 'নূর' ও 'স্পষ্ট কিতাব' বলতে 'কুরআন কারীমকে' বুঝানো হয়েছে। আর কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে এভাবে কুরআন কারীমকে 'নূর' বলা হয়েছে এবং 'স্পষ্ট কিতাব' বলা হয়েছে। এখানে দুটি বিশেষণ একত্রিত করা হয়েছে।
যারা এখানে 'নূর' অর্থ 'মুহাম্মাদ (সঃ)' বুঝিয়েছেন, তাঁরা দেখেছেন যে, 'স্পষ্ট কিতাব' বলতে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। কাজেই 'নূর' বলতে মুহাম্মাদ (সঃ)- কে বুঝানোই স্বাভাবিক। এ বিষয়ে ইমাম তাবারী বলেন:
يعني بالنور محمدا ﷺ الذي أنار الله به الحق وأظهر به الإسلام ومحق به الشرك فهو نور لمن استنار به يبين الحق ومن إنارته الحق تبيينه لليهود كثيرا مما كانوا يخفون من الكتاب. "নূর (আলো) বলতে এখানে 'মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে, যাঁর দ্বারা আল্লাহ হক্ক বা সত্যকে আলোকিত করেছেন, ইসলামকে বিজয়ী করেছেন এবং শির্ককে মিটিয়ে দিয়েছেন। কাজেই যে ব্যক্তি তাঁর দ্বারা আলোকিত হতে চায় তার জন্য তিনি আলো। তিনি হক্ক বা সত্য প্রকাশ করেন। তাঁর হক্ককে আলোকিত করার একটি দিক হলো যে, ইহুদীরা আল্লাহর কিতাবের যে সকল বিষয় গোপন করত তার অনেক কিছু তিনি প্রকাশ করেছেন।"
উপরের আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পেলাম যে, কুরআন কারীমে সত্যের দিশারী, হেদায়াতের আলো ও সঠিক পথের নির্দেশক হিসেবে কুরআন কারীমকে 'নূর' বলা হয়েছে। অনুরূপভাবে কোনো কোনো আয়াতে 'নূর' শব্দের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো মুফাস্সির রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বা ইসলামকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন।
কুরআন কারীমের এ সকল বর্ণনা থেকে বুঝা যায় না যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ), কুরআন বা ইসলাম নূরের তৈরী বা নূর থেকে সৃষ্ট। আমরা বুঝতে পারি যে, এখানে কোনো সৃষ্ট, জড় বা মূর্ত নূর বা আলো বুঝানো হয় নি। রাসূলুল্লাহ , ইসলাম ও কুরআন কোনো জাগতিক, 'জড়', ইন্দ্রিয়গাহ্য বা মূর্ত 'আলো' নয়। এ হলো বিমূর্ত, আত্মিক, আদর্শিক ও সত্যের আলোকবর্তিকা, যা মানুষের হৃদয়কে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের অন্ধকার থেকে বিশ্বাস, সত্য ও সুপথের আলোয় জ্যোতির্ময় করে।
কিন্তু ৭ম-৮ম হিজরী শতক থেকে কোনো কোনো আলিম দাবি করতে থাকেন যে, রাসূলুল্লাহ প্রকৃতপক্ষে মানুষ নন বা মাটির মানুষ নন; রবং প্রকৃতপক্ষে তিনি নূর এবং নূরেরই তৈরি। এরপর কেউ কেউ আরেকটু এগিয়ে বলেন, যদি কেউ তাঁর নূর থেকে তৈরি হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বা তাকে মানুষ বলে বা মাটির মানুষ বলে তবে সে কাফির বলে গণ্য হবে। তাঁরা উপরের আয়াতের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো মুফাস্সিরের বক্তব্যকে তাদের দাবির পক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করেন। এছাড়া আরো দু প্রকারের দলিল তারা পেশ করেন:
(১) নূর-মুহাম্মাদী (সঃ) বিষয়ক 'হাদীস' নামে প্রচারিত কিছ কথা রাসূলুল্লাহ-কে আল্লাহ 'নূর' থেকে বা 'আল্লাহর নূর' থেকে সৃষ্টি করেছেন অর্থে প্রচারিত কিছু সনদ-বিহীন ভিত্তিহীন বা জাল বানোয়াট কথা হাদীস নামে প্রচার করা হয়। যেমন বলা হয় যে, জাবির (রা) এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন:
أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ نُورَ نَبِيِّكَ مِنْ نُوره..... "সর্বপ্রথম আল্লাহ তোমার নবীর নূরকে তাঁর নূর থেকে সৃষ্টি করেন।"
এরপর এই লম্বা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই নূরকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে তা থেকে আরশ, কুরসী, লাওহ, কলম, ফিরিশতা, জিন, ইনসান এবং সমগ্র বিশ্বকে সৃষ্টি করা হয়।....
হাদীস নামে কথিত এ কথাগুলি কোনো একটি হাদীসের গ্রন্থেও সনদ-সহ পাওয়া যায় না। প্রসিদ্ধ ছয়টি হাদীসগ্রন্থ, বা অন্য কোনো প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ তো দূরের কথা পরবর্তী যুগগুলিতে সংকলিত দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য হাদীসের সংকলন-গ্রন্থগুলিতেও এর কোনো উল্লেখ নেই। সপ্তম হিজরী শতক পর্যন্ত কোনো হাদীস বা সীরাতের গ্রন্থে এর সামান্যতম উল্লেখ পাওয়া যায় না। "হাদীসের নামে জালিয়াতি” গ্রন্থে আমরা দেখেছি যে, দশম-একাদশ হিজরী শতকের কোনো কোনো আলিম উল্লেখ করেছেন যে, হাদীসটি আব্দুর রায্যাক সান'আনী তার মুসান্নাফ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং কেউ কেউ বলেছেন যে, বাইহাকী তা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এ দু আলিমের কোনো গ্রন্থের কোথাও এ হাদীসটির কোনোরূপ উল্লেখ পাওয়া যায় না। দশম হিজরী শতকের অন্যতম মুহাদ্দিস ইমাম সুয়ূতী স্পষ্টতই উল্লেখ করেছেন যে, হাদীসটির অপ্রমাণিত ও অনির্ভরযোগ্য।
আধুনিক যুগের অন্যতম প্রসিদ্ধ আরবীয় সূফী গবেষক মুহাদ্দিস আল্লামা আব্দুল্লাহ ইবনু সিদ্দীক আল-গুমারী সুয়ূতীর এ কথার প্রতিবাদ করে বলেছেন যে, সুয়ূতী এ হাদীসটিকে 'অনির্ভরযোগ্য' বলে এর অবস্থা সঠিকভাবে জানাতে পারেন নি, বরং তাঁর বলা দরকার ছিল যে, 'হাদীসটি সন্দেহাতীতভাবে জাল'। তিনি বলেন: "ইমাম সুয়ূতীর এ কথাটি আপত্তিকর অবহেলা। বরং হাদীসটি সুস্পষ্টতই জাল বা বানোয়াট। এর ভাষা ও অর্থ আপত্তিকর। হাদীসটি আব্দুর রায্যাক উদ্ধৃত করেছেন বলে সুয়ূতী উল্লেখ করেছেন। অথচ আব্দুর রায্যাক সান'আনী রচিত 'আল-মুসান্নাফ', 'তাফসীর' এবং 'আল-জামি' কোনো গ্রন্থেই হাদীসটির অস্তিত্ব নেই। এর চেয়েও অবাক বিষয় মরোক্কোর শানকীত এলাকার কোনো কোনো আলিম আব্দুর রায্যাকের নামে আব্দুর রায্যাক থেকে জাবির পর্যন্ত এর একটি সনদও বানিয়েছেন। আল্লাহ জানেন যে, এ সবই ভিত্তিহীন কথা। জাবির (রা) কখনোই এ হাদীস বর্ণনা করেন নি এবং আব্দুর রায্যাকও এ হাদীসটি কখনো শুনেন নি। প্রথম যে ব্যক্তি হাদীসটি প্রচার করেন তিনি হলেন ইবনু আরাবী হাতিমী (৬৩৮ হি)।... আমি জানি না তিনি কোথা থেকে হাদীসটি গ্রহণ করেছেন। অবশ্যই কোনো সূফী দরবেশ হাদীসটি বানিয়েছে।" এ 'হাদীস' এবং 'নূর মুহাম্মাদী' বিষয়ক অন্যান্য 'হাদীস'-এর সনদের অবস্থা আমি 'হাদীসের নামে জালিয়াতি' গ্রন্থে বিস্ত ারিত আলোচনা করেছি। যে কোনো বিবেকবান আলিম স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, রাসূলুল্লাহ-কে নূর দ্বারা তৈরি বিষয়ক একটি হাদীসও কোনো সহীহ বা হাসান সনদ তো দূরের কথা আলোচনা করার মত যয়ীফ সনদেও বর্ণিত হয় নি। হাদীসের কোনো প্রসিদ্ধ গ্রন্থে এ বিষয়ে কোনো হাদীস পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে যা কিছু বর্ণিত সবই হয় সনদবিহীন প্রচলিত কথা অথবা মুহাদ্দিসগনের ঐকমত্যে জাল ও বানোয়াট কথা।
(২) এ বিষয়ে গত কয়েক শতাব্দীর কোনো কোনো আলিমের মত এ বিষয়ে হাদীস নামে কথিত কথাগুলি ইসলামের প্রথম ৫/৬ শতক পর্যন্ত কোনো হাদীস গ্রন্থে সংকলিত হয় নি। গত কয়েক শতাব্দী যাবৎ হাদীস বলে কথিত বক্তব্যগুলি প্রচারিত হওয়ার পরে অনেক আলিম এগুলির সনদ সম্পর্কে খোঁজাখুজি না করে সাধারণভাবে এগুলির কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ সকল ব্যাখ্যা বা মতামতকে এ মতের স্বপক্ষে 'দলিল' হিসেবে পেশ করা হয়। উপরের আলোচনা থেকে আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারছি যে, রাসূলুল্লাহ-এর নূর থেকে সৃষ্ট হওয়ার বিষয়ে এ বিতর্কটি একেবারেই কৃত্রিমভাবে ইসলামী আকীদার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাহাবী-তাবিয়ীগণ ও ইসলামের প্রথম অর্ধ-সহস্র বৎসর যাবৎ বিষয়টি আকীদার অন্তর্ভূক্ত হওয়া তো দূরের কথা মুসলিম উম্মাহর সাধারণ আলোচনার বিষয়ও ছিল না। এখানে নিম্নের বিষয়গুলি লক্ষণীয়:
(১) আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহকে আল্লাহর "আব্দ" বা বান্দা হিসাবে বিশ্বাস করা এবং সাক্ষ্য দেওয়া রিসালাতের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং 'আল্লাহর বান্দা' বলতে মানুষকে বুঝানো হয়। তাই এই বিশ্বাসের সরল অর্থ এই যে, তিনি মানুষদেরই একজন। তিনি মানবতার পূর্ণতার শিখরে উঠেছিলেন, তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, তবে তিনি মানবতার ঊর্ধ্বে উঠেন নি।
(২) কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফে তাঁর আবদিয়‍্যাত (দাসত্ব) ও বাশারিয়‍্যাত (মানবত্ব)-এর কথা বারংবার সুস্পষ্টরূপে এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে কুরআন কারীমে বা হাদীস শরীফে এক স্থানেও বলা হয় নি যে, আপনি বলনু 'আমি নূর'। কোথাও বলা হয় নি যে, 'মুহাম্মাদ নূর'। শুধু কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো মুফাস্সির বলেছেন যে, তোমাদের কাছে 'নূর' এসেছে বলতে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বুঝানো হয়েছে। এই ব্যাখ্যাও রাসূলুল্লাহ (সা) বা কোনো সাহাবী থেকে প্রমাণিত নয়, বরং পরবর্তী কোনো কোনো মুফাস্সির একথা বলেছেন।
(৩) কুরআন-হাদীসের নির্দেশনাকে নিজের পছন্দ অপছন্দের ঊর্ধ্বে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করার নামই ইসলাম। সুপথপ্রাপ্ত মুসলিমের দায়িত্ব হলো, ওহীর মাধ্যমে যা জানা যাবে তা সর্বান্তকরণে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করা এবং নিজের পছন্দ ও মতামতকে ওহীর অনুগত করা। পক্ষান্তরে বিভ্রান্তদের চিহ্ন হলো, নিজের পছন্দ-অপছন্দ অনুসারে ওহীকে গ্রহণ করা বা বাদ দেওয়া। আদিয়‍্যারেত ও বাশারিয়‍্যাতের ওজুহাতে মুজিযা ও অলৌকিক বৈশিষ্ট্য অস্বীকার করা বা তাকে রূপক বলে ব্যাখ্যা করা নিঃসন্দেহে বিভ্রান্তি। অনুরূপভাবে অলৌকিক বৈশিষ্ট্য বিষয়ক আয়াত-হাদীস বা এ বিষযক বানোয়াট কথা বা আলিমদের মতামতের ভিত্তিতে আবদিয়‍্যাত বা বাশারিয়‍্যাত অস্বীকার করা বা তাকে রূপক বলে ব্যাখ্যা করা বা কুরআন-হাদীসে যে কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় নি সে কথাকে বিশ্বাসের অংশ বানানোও অনুরূপ বিভ্রান্তি।
(৪) এখন আমরা যদি কুরআন ও হাদীসের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাই তবে আমাদের করণীয় কী তা পাঠক খুব সহজেই
বুঝতে পারছেন। আমরা কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন নির্দেশকে দ্ব্যর্থহীনভাবেই গ্রহণ করব। আর মুফাস্সিরদের কথাকে তার স্থানেই রাখব।
আমরা বলতে পারি: কুরআন ও হাদীসের নির্দেশ অনুসারে নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মানুষ। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় নূর বলতে আমরা 'কুরআন'-কে বুঝাবো। কারণ কুরআনে স্পষ্টত 'কুরআন'কে নূর বলা হয়েছে, কিন্তু কুরআন-হাদীসের কোথাও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে স্পষ্টত নূর বলা হয় নি; কাজেই তাঁর বিষয়ে একথা বলা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
অথবা আমরা বলতে পারি: কুরআন-হাদীসের নির্দেশ অনুসারে নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ (স) মানুষ। তবে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মানব জাতির পথ প্রদর্শনের আলোক-বর্তিকা হিসেবে তাঁকে নূর বলা যেতে পারে বা বলা যেতে পারে যে, তাঁর মধ্যে নুবুওয়াতের নূর বিদ্যমান ছিল।
(৫) কিন্তু যদি কেউ বলেন যে, তিনি 'হাকীকতে' বা প্রকৃত অর্থে নূর ছিলেন, মানুষ ছিলেন না, শুধু মাজাযী বা রূপক অর্থেই তাঁকে মানুষ বলা যেতে পারে, তবে আমরা বুঝতে পারি যে, তিনি নিজের মন-মর্জি অনুসারে কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন নির্দেশনা বাতিল করে এমন একটি মত গ্রহণ করলেন, যার পক্ষে কুরআন ও হাদীসের একটিও দ্ব্যর্থহীন বাণী নেই।
(৬) 'রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-নূরের তৈরি' বলে বিশ্বাস করাকে ঈমানের অংশ বানানো, অথবা এ কথা অস্বীকার করাকে কুফরী বলে গণ্য করা নিঃসন্দেহে পূর্ববতী বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের পদ্ধতি অনুসরণ করা। যে কথা কুরআনে সুস্পষ্টত বলা হয় নি, যে কথা স্পষ্টভাবে কোনো মুতাওয়াতির হাদীস তো দূরের কথা কোনো সহীহ হাদীসেও বলা হয় নি, সে কথাকে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও যুক্তির ভিত্তিতে বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত করা এবং তার ভিত্তিতে সকল সুস্পষ্ট কুরআন ও হাদীসের বক্তব্য ব্যাখ্যা করে বাতিল করা এবং কুফরী ফাতওয়া দেওয়া বিভ্রান্ত সম্প্রদায়দের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে আমরা দেখব, ইনশা আল্লাহ।
(৭) বস্তুত নূরের তৈরি হওয়ার মধ্যে কোনো অতিরিক্ত মর্যাদা আছে বলে মনে করাই ইসলামী মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক। সৃষ্টির মর্যাদা তার সৃষ্টির উপাদানে নয়, বরং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মর্যাদায় এবং তার নিজের কর্মে। এজন্যই মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশ আলিম নূরের তৈরি ফিরিশতার চেয়ে মাটির তৈরি মানুষকে অধিক মর্যাদাশালী বলে গণ্য করেছেন।
এভাবে কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা অনুসারে প্রতিটি মুসলিম বিশ্বাস করেন যে, রাসূলুল্লাহ মানুষ ছিলেন। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। তবে সৃষ্টির উপাদানে, মানবীয় প্রকৃতিতে তিনি অন্য সবার মতই মানুষ। তার মূল বৈশিষ্ট্য তাঁর মহান কর্মে ও তাঁর মহোত্তম চরিত্রে। উপাদানে, সৃষ্টিাত প্রকৃতিতে অন্য সবার মত হয়েও যে তিনি সকল মানবীয় দুর্বলতা জয় করেছিলেন, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি, ভালবাসায় ও ইবাদতে অবিচল, অনন্য ও অসাধারণ ছিলেন, তাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াতের মহান দায়িত্ব ছাড়াও অনেক অলৌকিক বা বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। পবিত্র কুরআনে বা সহীহ হাদীসে তাঁর যে সকল অতিমানবীয় বা অলৌকিক বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে তা মুসলিমগণ বিশ্বাস করেন। এর বাইরে কোনো অতিমানবীয় গুণাবলী তারা তাঁর প্রতি আরোপ করেন না। তারা বিশ্বাস করেন যে, কুরআন ও হাদীসে যে কথা যতটুকু বলা হয়েছে সে কথা ততটুকু বললেই রাসূলুল্লাহ-এর সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রমাণ করা হয়। মানবীয় যুক্তি বা ব্যাখ্যা দিয়ে অতিরিক্ত কোনো কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাঁর মর্যাদার বিষয়ে ওহীর অনুসরণ

📄 তাঁর মর্যাদার বিষয়ে ওহীর অনুসরণ


মুসলিমর দায়িত্ব হলো রাসূলুল্লাহ-এর সঠিক মর্যাদা নিরূপনে এবং তাঁকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসের উপর নির্ভর করা। আমরা জানি যে, রাসূলুল্লাহ-এর সম্মান ও মর্যাদা অবগত হওয়া মুমিনের ঈমানের অংশ ও মৌলিক বিষয়। সকল মুমিনের দায়িত্ব এক্ষেত্রে সমান। কাজেই আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, বিষয়টি আল্লাহ কুরআন কারীমে সহজভাবে সকলের বোধগম্য করেই বর্ণনা করেছেন। এছাড়া রাসূলুল্লাহ বিষয়টি তাঁর সাহাবীগণকে জানিয়েছেন। তাঁরাও মুমিনের ঈমানের বিশুদ্ধতার জন্য এভাবেই গুরুত্বের সাথে তা তাবিয়ীগণকে শিখিয়েছেন। এভাবে বিষয়গুলি অবশ্যই কুরআনে বা মুতাওয়াতির-মাশহুর সহীহ হাদীস সমূহে স্পষ্ট ও সর্বজনবোধগম্যভাবে বর্ণিত হয়েছে। কুরআন ও হাদীসে তাঁর সম্মান, মর্যাদা, দায়িত্ব, ক্ষমতা, অধিকার ও আল্লাহর সাথে তাঁর সম্পর্কের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে শেখান হয়েছে। মুসলিমের দায়িত্ব হলো, তাঁর ব্যাপারে কুরআন কারীমে বা সহীহ হাদীসে যা বলা হয়েছে তা সবকিছু পরিপূর্ণভাবে সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করা। নিজের থেকে কোনো কিছু বাড়িয়ে বলা যাবে না। কারণ আমরা বা উম্মাতের আলিমগণ যা কিছুই বলেন না কেন সবই মানবীয় ইজতিহাদ। আর বিশ্বাস ও আকীদার ভিত্তি ওহী। মানবীয় কথাকে ওহীর সাথে সংমিশ্রণ করলে বা ওহীর মর্যাদা দিলে সীমালঙ্ঘন ঘটতে পারে।
পূর্ববর্তী নবীগণের উম্মাত এরূপ বাড়াবাড়ি বা সীমালঙ্ঘনের কারণে বিভ্রান্ত হয়েছে বলে আমরা কুরআন ও হাদীস থেকে জানতে পারি। নবীগণের প্রতি অবিশ্বাস যেমন মানুষদেরকে ধবংস করেছে, তেমনি ধবংস করেছে নবীগণের প্রতি ভক্তিতে সীমালঙ্ঘন। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর উম্মাতকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা) বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) মিম্বারের উপরে বক্তৃতায় বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন:
لا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ.
"খৃস্টানগণ যেরূপ ঈসা ইবনু মারিয়ামকে বাড়িয়ে প্রশংসা করেছে তোমরা সেভাবে আমার বাড়িয়ে প্রশংসা করবে না। আমি তো তাঁর বান্দা মাত্র। অতএব তোমরা বলবে: আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।”
এখানে রাসূলুল্লাহ তাঁর উম্মাতকে প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। বাড়াবাড়ির অর্থ হলো তাঁর বিষয়ে পবিত্র কুরআন ও হাদীসের শিক্ষার অতিরিক্ত কিছু বড়িয়ে বলা যা তিনি আমাদেরকে বলেন নি। তিনি খৃস্টানদের বাড়াবাড়ির দিকে উম্মাতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদেরকে সতর্ক করেছেন। কুরআন কারীমে মহান আল্লাহ খৃস্টানদের এই বাড়াবাড়ির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন:
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِنْهُ فَآمِنُوا بِاللهِ وَرُسُلِهِ وَلَا تَقُولُوا ثَلَاثَةٌ
“হে কিতাবীগণ, দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত বলো না। মরিয়ম তনয় ঈসা মাসীহ আল্লাহর রাসূল, এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মরিয়মের নিকট প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁর থেকে (আগত) আত্মা (আদেশ)। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে উপর ঈমান আন এবং বলিও না 'তিন'...।
ঈসা (আ)-এর বিষয়ে খৃস্টানদের বাড়াবাড়ির স্বরূপ ছিল তাঁর বিষয়ে আল্লাহর দেওয়া এ সকল বিশেষণকে বাড়িয়ে ব্যাখ্যা করে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির অপচেষ্টা করা। আল্লাহ তাঁর বিষয়ে বলেছেন যে, তিনি 'আল্লাহর কালিমা' এবং 'আল্লাহর পক্ষ থেকে রূহ'। 'কালিমাতুল্লাহ', 'রূহুল্লাহ' ইত্যাদি শব্দ শুনে কিছু ভক্তের মনে যে অতিভক্তির প্লাবন তৈরি হয়, সেগুলিই ক্রমান্বয়ে ভয়ানক শিরকে পরিণত হয়। তারা দাবি করেন যে, আল্লাহর কালিমা আল্লাহর সিফাত বা বিশেষণ যা তাঁর সত্তার অংশ ও তাঁরই মত অনাদি, সেহেতু 'ঈসা' (আ) আল্লাহর যাত বা সত্তার অংশ। আর আল্লাহর রূহ আল্লাহরই সত্তার অংশ। এভাবে তারা দাবি করে যে, ঈশ্বরের সত্তার তিনটি ব্যক্তিত্ব 'আল্লাহ বা 'পিতা', কালিমাতুল্লাহ বা ইবনুল্লাহ অর্থাৎ পুত্র এবং রূহুল্লাহ বা পবিত্রআত্মা। এ তিন ব্যক্তি সমন্বয়ে এক ঈশ্বর (নাউযু বিল্লাহ)।
তাদের এ ব্যাখ্যাভিত্তিক আকীদা বাইবেলের কোথাও সুস্পষ্টভাবে বলা হয় নি। বরং বাইবেলের অগণিত নির্দেশনা এর সাথে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। তারা তাদের এরূপ ব্যাখ্যাভিত্তিক মতামতকে মূল আক্বীদা হিসেবে গ্রহণ করে এর সাথে সাংঘর্ষিক তাওরাত ও ইঞ্জিলের তাওহীদ বিষয়ক ও ঈসা (আ)-এর মনুষ্যত্ব বিষয়ক অগণিত সুস্পষ্ট আয়াতকে অপব্যাখ্যা করে। এ সকল অপব্যাখ্যা গেলানোর জন্য অনেক দার্শনিক যুক্তি পেশ করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এভাবে ঈসা (আ)-এর মর্যাদা বৃদ্ধি করা।
এ দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লাহ বলেন, ঈসার (আ) বিষয়ে আল্লাহ যতটুকু বলেছেন তোমরা ততটুকুই বল, কারণ ততটুকুই হক্ক ও সত্য। তার অতিরিক্ত বলো না, কারণ ব্যাখ্যা তাফসীরের নামে তোমরা যা বলছ তা বাতিল ও অসত্য। তোমরা তাঁকে কালিমাতুল্লাহ এবং রূহুল্লাহ বল, তবে কালিমাতুল্লাহ বা রূহুল্লাহর ব্যাখ্যা করে বাড়িয়ে কিছু বলো না। অন্যত্র আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে, এ সকল বাড়াবাড়ির পিছনে রয়েছে কতিপয় 'পণ্ডিতের' প্রতি পরবর্তীদের অন্ধ ভক্তি ও তাদের অন্ধ অনুকরণ। আল্লাহ বলেন:
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِنْ قَبْلُ وَأَصْلُوا كَثِيرًا وَضَلُّوا عَنْ سواء السبيل
"বল, হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করো না এবং সে সম্প্রদায় ইতোপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে ও অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে তাদের মর্জিমাফিক মতামতের অনুসরণ করো না।”
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, খৃস্টানগণের অতিভক্তি ও বাড়াবাড়ির স্বরূপ ছিল ওহীর মধ্যকার কতিপয় দ্ব্যর্থবোধক শব্দের অতিভক্তিমূলক অর্থকে দীনের ও আকীদার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে ঈসা (আ)-এর বিষয়ে ওহীর বাইরে অতিরিক্ত গুণাবলি আরোপ করা এবং সেগুলির বিপরীতে অগণিত দ্ব্যর্থহীন ওহীর বাণীকে ব্যাখ্যা করা।
রাসূলুল্লাহ তাঁর উম্মাতকে এ বিষয়ে সতর্ক করে তাঁর বিষয়ে কি বলতে হবে তার নির্দেশনা প্রদান করলেন। তিনি বললেন, আমি আল্লাহর বান্দা। আমাকে আল্লাহ দুটি মূল বিশেষণে বিশেষিত করেছেন: আল্লাহর বান্দা এবং আল্লাহর রাসূল। তোমরা আমার বিষয়ে এরূপই বলবে। অর্থাৎ ওহীর মাধ্যমে কুরআনে বা হাদীসে তাঁর বিষয়ে যা বলা হয়েছে হুবহু তাই আমাদেরকে বলতে হবে। এগুলিকে ব্যাখ্যা করা বা বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে এগুলির সাথে আরো কিছু কথা যোগ করা আমাদেরকে বাড়াবাড়ির পথে নিয়ে যেতে পারে।
উপরের হাদীসের ন্যায় অন্যান্য অনেক হাদীসে রাসূলুল্লাহ তাঁর উম্মাতকে তাঁর প্রশংসা বা ভক্তির ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি পরিহার করতে এবং ওহীর ব্যবহৃত শব্দাবলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন,
إِنَّ رَجُلا قَالَ يَا مُحَمَّدُ يَا سَيِّدَنَا وَابْنَ سَيِّدِنَا وَخَيْرَنَا وَابْنَ خَيْرنَا ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ عَلَيْكُمْ بِتَقْوَاكُمْ وَلَا يَسْتَهْوِيَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ، أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ وَاللَّهِ مَا أُحِبُّ أَنْ تَرْفَعُونِي فَوْقَ مَنْزِلَتِي التي أَنزَلَنِي اللهُ عَزَّ وَجَل
"এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ-কে বলে, হে মুহাম্মাদ, হে আমাদের নেতা (সাইয়েদ), আমাদের নেতার পুত্র, আমাদের মধ্যে সর্বত্তোম, আমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তির পুত্র। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন: হে মানুষেরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চল। শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে। আমি আব্দুল্লাহর ছেলে মুহাম্মাদ, আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আল্লাহর কসম, আমি ভালবাসি না যে, আল্লাহ আমাকে যে মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন তোমরা আমাকে তার উর্ধ্বে ওঠাবে।”
অর্থাৎ শয়তান বিভিন্নভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। নবী-রাসূলগণকে অস্বীকার করার মাধ্যমে অনেককে সে বিভ্রান্ত করে। আবার তাঁদের ভক্তি ও প্রশংসায় সীমা লঙ্ঘন করিয়েও শয়তান অনেককে বিভ্রান্ত করে। কাজেই সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। শয়তান অনেক সময় কুমন্ত্রণা দিতে পারে যে, নবী-রাসূলকে বেশি প্রশংসা করলে বা ভক্তি করলে তিনি হয়ত খুশি হবেন। এজন্য রাসূলুল্লাহ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করলেন যে, এরূপ ভক্তি বা প্রশংসায় তিনি খুশি হন না। বরং ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত বিশেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই তিনি খুশি হন।
এখানে লক্ষণীয় যে, উপর্যুক্ত হাদীসে বক্তা সাহাবী রাসূলুল্লাহ-এর বিষয়ে যে বিশেষণগুলি ব্যবহার করেছেন সবই সত্য ও সেগুলি বলা ইসলামে কোনোভাবেই আপত্তিকর নয়। তবুও রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তাঁকে যে বিশেষ দুটি পদমর্যাদা প্রদান করেছেন তার বাইরে কিছু ব্যবহার করা অপছন্দ করছেন। বাহ্যত তিনি বাড়াবড়ির দরজা বন্দ করতে চেয়েছেন। এ অর্থের অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনুশ শিখীর (রা) বলেন,
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ فَقَالَ أَنْتَ سَيِّدُ قُرَيْشٍ فَقَالَ النَّبِيُّ : السَّيِّدُ اللَّهُ قَالَ أَنْتَ أَفْضَلُهَا فِيهَا قَوْلًا وَأَعْظَمُهَا فِيهَا طَوْلًا فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: لِيَقُلْ أَحَدُكُمْ بِقَوْلِهِ وَلَا يَسْتَجِرُّهُ الشَّيْطَانُ
“একব্যক্তি রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আগমন করে বলে, আপনি কুরাইশদের নেতা বা প্রধান (সাইয়েদ)। তিনি বলেন নেতা বা প্রধান (সাইয়েদ) তো আল্লাহ। লোকটি বলে: আমাদের মধ্যে কথায় আপনিই সর্বোত্তম এবং মহত্বে-মর্যাদায় আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন: তোমাদের মধ্যে কেউ কথা বলতে চাইলে বলুক, তবে শয়তান যেন তাকে টেনে নিয়ে না যায়।”
এখানে লক্ষণীয় যে, কোনো মানুষকে সাইয়েদ (নেতা বা প্রধান) বলা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। সাহাবীগণ একে অপরকে কখনো কখনো 'সাইয়েদুনা' (আমাদের নেতা) বলে উল্লেখ করেছেন। এহইয়াউস সুনান গ্রন্থে আমি এ বিষয়ক কিছু হাদীস উল্লেখ করেছি। পঞ্চম অধ্যায়ে শিরক আসগার বিষয়ক আলোচনায় আমরা দেখব যে, রাসূলুল্লাহ দাসদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন মনিব বা মালিককে রাব্ব (প্রভু) না বলে সাইয়েদ (নেতা) বলে ডাকতে। এতদসেত্ত্বও রাসূলুল্লাহ তাঁর নিজের বিষষে 'সাইয়েদ' শব্দ ব্যবহার করতে আপত্তি করছেন। বাহ্যত তিনি এ বিষয়ে বাড়াবাড়ির দরজা বন্ধ করতে চেয়েছেন এবং মহান আল্লাহ তাঁর বিষয়ে যে শব্দ ও উপাধি ব্যবহার করেছেন তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে উম্মাতকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ওহীর ব্যবহৃত শব্দ আর মানবীয় আবেগ-বিবেকের ভিত্তিতে ভাষাজ্ঞানের আলোকে ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে ঈমানের জগতে অনেক পার্থক্য। রাসূলুল্লাহ-এর দৌহিত্র হুসাইন ইবনু আলী (রা) বলেন,
أَحِبُّونَا بِحُبِّ الإِسْلَامِ فَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: لَا تَرْفَعُونِي فَوْقَ حَقَّيْ فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى اتَّخَذَنِي عَبْداً قَبْلَ أَنْ يَتَّخَذَنِي رَسُولاً
"তোমরা আমাদেরকে ইসলামের ভালবাসায় ভালবাসবে; কারণ রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আমাকে আমার প্রাপ্যের উপরে উঠাবে না; কারণ আল্লাহ আমাকে রাসূল হিসেবে গ্রহণ করার আগেই আমাকে বান্দা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।" উপরের হাদীসগুলির আলোকে আমরা বুঝতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ-এর ভক্তি ও মর্যাদা প্রদান আমাদের অন্যতম দায়িত্ব ও ঈমানের অন্যতম দাবি। তবে আমাদের বুঝতে হবে যে, শয়তান বিভিন্ন ভাবে মানুষকে অবিশ্বাসের ন্যায় অতিভক্তির মাধ্যমেও বিভ্রান্ত করতে পারে। এজন্য আমাদেরকে ওহীর হুবহু অনুসরণ করতে হবে।
এছাড়া আরো বুঝতে হবে যে, বিশ্বাসের ভিত্তি 'গাইবী' বিষয়ের উপরে। এ সকল বিষয়ে ওহীর নির্দেশনা ছাড়া কোনো ফয়সালা দেওয়া যায় না। কর্ম বিষয়ে কুরআন বা হাদীসে সুস্পষ্ট বিধান নেই এরূপ অনেক নতুন নতুন বিষয় উদ্ভাবিত হয়, এজন্য সেক্ষেত্রে কিয়াস ও ইজতিহাদের প্রয়োজন হয়। যেমন মাইক, ধুমপান ইত্যাদি বিষয়। কিন্তু বিশ্বাস বা আকীদার বিষয় সেরূপ নয়। এগুলিতে নতুন সংযোজন সম্ভব নয়। এজন্য এ বিষয়ে কিয়াস বা ইজতিহাদ অর্থহীন। আল্লাহর গুণাবলি, নবীগণের সংখ্যা, মর্যাদা, ফিরিশতাগণের সংখ্যা, সৃষ্টি, কর্ম, দায়িত্ব ইত্যাদি বিষয়ে ইজতিহাদের কোনো সুযোগ নেই। কুরআন ও হাদীসে যেভাবে যতটুকু বলা হয়েছে তাই বিশ্বাস করতে হবে। এ সকল ক্ষেত্রে আমরা ওহীর কথাকে যুক্তি দিয়ে সমর্থন করতে পারি, কিন্তু যুক্তি দিয়ে কোনো কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করতে পারি না।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে বিদ'আত ও বিভক্তির আলোচনায় আমরা দেখব যে, রাসূলুল্লাহ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, তাঁর উম্মাতের মধ্যেও পূর্ববর্তী উম্মাতদের মত বিভ্রান্তি প্রবেশ করবে। বাস্তবে আমরা দেখতে পাই যে, সাহাবী, তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ীদের যুগ এবং মুসলিম উম্মাহর সোনালী যুগগুলি অতিক্রান্ত হওয়ার পরে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে রাসূলুল্লাহ-এর মর্যাদা বিষয়ে ওহীর নির্দেশ লঙ্ঘন ও ওহীর সাথে বিভিন্ন ব্যাখ্যা যোগ করে আকীদা তৈরির প্রবণতা সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো আলিম মানবীয় বুদ্ধি দিয়ে ওহীর একটি বক্তব্যের নিজের পছন্দমত অর্থকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে অন্যান্য বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করে বিকৃত বা বাতিল করেন এবং ওহীর অতিরিক্ত এবং সাহাবীগণের বক্তব্যের ব্যতিক্রম অনেক বিষয়কে আকীদার অন্তর্ভুক্ত করেন। এখানে এ জাতীয় কয়েকটি বিষয় আলোচনা করছি:

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাঁর ইলম বিষয়ক বিতর্ক

📄 তাঁর ইলম বিষয়ক বিতর্ক


উপরের বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি বিষয় রাসূলুল্লাহ-এর গাইবী জ্ঞান সম্পর্কিত বিতর্ক। কুরআন ও হাদীসে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহই একমাত্র অদৃশ্য বা গাইবী ইলমের অধিকারী বা 'আলিমুল গাইব'। তিনি ছাড়া কেউ গাইবী ইলমের অধিকারী নয়। রাসূলুল্লাহ সম্পর্কেও বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি ইলমুল গাইব জানতেন না। কেবলমাত্র যে জ্ঞান ওহীর মাধ্যমে তাঁর নিকট আসত তিনি তাই অনুসরণ করতেন ও প্রচার করতেন। মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ "বল, আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেউই গাইব বিষয়ের জ্ঞান রাখে না।" অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ "অদৃশ্যের কুঞ্জি তাঁরই নিকট রয়েছে, তিনি ব্যতীত কেউ তা জানে না।" অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
لَهُ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَبْصِرْ بِهِ وَأَسْمِع "আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর গাইব তাঁরই। তিনি কত সুন্দর দ্রষ্টা ও শ্রোতা!" অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
وَلِلَّهِ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَإِلَيْهِ يُرْجَعُ الْأَمْرُ كُلُّهُ "আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহরই জন্য এবং তাঁরই নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে।"
إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ
অرضِ تَمُوتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ "কিয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকট রয়েছে, তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনি জানেন যা জরায়ুতে আছে। কোনো প্রাণীই জানে না আগামীকাল সে কি অর্জন করবে এবং কোনো প্রাণীই জানে না কোন্ স্থানে তার মৃত্যু ঘটবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত।"
এভাবে কুরআন কারীমে বহু স্থানে মহান আল্লাহ বারংবার ঘোষণা করেছেন যে গাইবের বিষয় ও ভবিষ্যতের বিষয় মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, কোনো প্রাণীই নয়। এ বিষয়ক কিছু আয়াত আমরা আখিরাতে বিশ্বাস সম্পর্কিত অনুচ্ছেদে উল্লেখ করব, ইনশা আল্লাহ।
কুরআন কারীমে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে যতটুকু জানিয়েছেন এর অতিরিক্ত কোনো গাইবী জ্ঞান নবীগণের ছিল না। ইবরাহীম (আ)-এর নিকট ফিরিশতাগণ এসেছেন তিনি চিনতে পারেন নি। অনুরূপভাবে নূত, দাউদ, সুলাইমান, মূসা, ইয়াকূব, ঈসা (আ) সকলের ক্ষেত্রেই বিষয়টি বিভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সকল নবী-রাসূলগণের বিষয়ে একত্রে কুরআন কারীমে বলা হয়েছে:
يَوْمَ يَجْمَعُ اللَّهُ الرُّسُلَ فَيَقُولُ مَاذَا أُجِبْتُمْ قَالُوا لَا عِلْمَ لَنَا إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ "যে দিন (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ রাসূলদেরকে একত্র করবেন এবং বলবেন, তোমারা কী উত্তর পেয়েছিলে? তারা বলবে, আমাদের তো কোনো জ্ঞান নেই, তুমিই তো অদৃশ্য সম্মন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।" রাসূলুল্লাহ গাইব জানতেন না বলে কুরআন কারীমে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَيَقُولُونَ لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ آيَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَقُلْ إِنَّمَا الْغَيْبُ لِلَّهِ فَانْتَظِرُوا إِنِّي مَعَكُمْ مِنَ الْمُنْتَظِرِينَ "তারা বলে, তার প্রতিপালকের নিকট থেকে তার নিকট কোনো নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না কেন? বল, 'অদৃশ্যের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহরই আছে। সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমি তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি।" অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:
قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكٌ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ "বল, আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভাণ্ডারসমূহ রয়েছে, অদৃশ্য (গায়েব) সম্বন্ধেও আমি অবগত নই, আর আমি তোমাদেরকে একথাও বলি না য, আমি ফিরিশতা। আমি তো শুধুমাত্র আমার প্রতি যে ওহী প্রেরণ করা হয় তারই অনুসরণ করি।" অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ "বল, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার নিজের কোনো মঙ্গল বা অমঙ্গল করার ক্ষমতাও আমার নেই। আমি যদি গাইব (গোপন জ্ঞান) জানতাম তাহলে প্রভূত কল্যাণই লাভ করতাম, আর কোনো অমঙ্গল আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না। আমি তো কেবলমাত্র ভয়প্রদর্শনকারী এবং সুসংবাদদাতা বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য।" অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ مَا كُنْتُ بِدْعًا مِنَ الرُّسُلِ وَمَا أَدْرِي مَا يُفْعَلُ بِي وَلا بِكُمْ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ وَمَا أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ مُبِينٌ "বল, আমি তো প্রথম রাসূল নই। আর আমি জানি না, আমার এবং তোমাদের ব্যাপারে কী করা হবে। আমি আমার প্রতি যা ওহী প্রেরণ করা হয় কেবলমাত্র তারই অনুসরণ করি। আমি তো একজন স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।" অন্য আয়াতে আল্লাহ জাল্লা শানুহু আরো বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ قُلْ إِنَّمَا يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَهَلْ أَنْتُمْ مُسْلِمُونَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُلْ أَذَنْتُكُمْ عَلَى سَوَاءٍ وَإِنْ أَدْرِي أَقَرِيبٌ أَمْ بَعِيدٌ مَا تُوعَدُونَ إِنَّهُ يَعْلَمُ الْجَهْرَ مِنَ الْقَوْلِ وَيَعْلَمُ مَا تَكْتُمُونَ وَإِنْ أَدْرِي لَعَلَّهُ فِتْنَةٌ لَكُمْ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ
"এবং আমি তো তোমাকে কেবল বিশ্ব-জগতের রহমত-রূপেই প্রেরণ করেছি। বল, আমার প্রতি ওহী প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের উপাস্য একমাত্র একজনই, অতএব তোমরা আসমর্পণকারী (মুসলিম) হয়ে যাও। আর যদি তারা (আপনার ডাকে সাড়া না দিয়ে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে বলে দাও, আমি তোমাদেরকে যথাযথভাবে জানিয়ে দিয়েছি। তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা শীঘ্রই আসবে না দেরী করে আসবে তা আমি জানি না। নিশ্চয় আল্লাহ যা কথায় ব্যক্ত করা হয় এবং যা তোমরা গোপন কর তা সব জানেন। আর আমি জানি না, হয়ত তা তোমাদের জন্য একটি পরীক্ষা এবং কিছু সময়ের জন্য উপভোগের বিষয়।" অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
وَمِمَّنْ حَوْلَكُمْ مِنَ الْأَعْرَابِ مُنَافِقُونَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ لَا تَعْلَمُهُمْ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ "মরুবাসীদের মধ্যে যারা তোমাদের আশপাশে আছে তাদের কেউ কেউ মুনাফিক এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কেউ কেউ, তারা কপটতায় সিদ্ধ। তুমি তাদেরকে জান না; আমি তাদেরকে জানি।" "তুমি জান না, হয়তো আল্লাহ এর পর কোনো উপায় করে দেবেন।" সাহাবী মাহমূদ ইবনু লাবীদ (রা) বলেন:
لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْرًا إِنَّ نَاقَةَ النَّبِيِّ ﷺ ضَلَّتْ فَقَالَ زَيْدُ بْنُ اللَّصِيتِ : يَزْعُمُ مُحَمَّدٌ أَنَّهُ نَبِيٌّ وَيُخْبِرُكُمْ عَنْ خَبَرُ السَّمَاءِ وَهُوَ لَا يَدْرِي أَيْنَ نَاقَتُهُ فَقَالَ النَّبِيُّ : إِنَّ رَجُلًا يَقُولُ كَذَا وَكَذَا ، وَإِنِّي وَاللَّهِ لَا أَعْلَمُ إِلَّا مَا عَلَمَنِي اللَّهُ وَقَدْ دَلَنِي اللَّهُ عَلَيْهَا وَهِيَ فِي شِعْبٍ كَذَا قَدْ حَبَسَتْهَا شَجَرَةٌ فَذَهَبُوا فَجَاءُوهُ بِهَا "রাসূলুল্লাহ-এর একটি উটনী হারিয়ে যায়। তখন যাইদ ইবনুল লাসীত নামক একব্যক্তি বলে, মুহাম্মাদ (ﷺ) দাবি করেন যে, তিনি নবী এবং তোমাদেরকে তিনি আকাশের খবর বলেন, অথচ তাঁর নিজের উটটি কোথায় আছে তা তিনি জানেন না! তখন রাসূলুল্লাহ বলেন: এক ব্যক্তি এমন এমন কথা বলেছে। আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে যা জানান তা ছাড়া আমি কিছুই জানি না। আল্লাহ আমাকে উটনীটির বিষয়ে জানিয়ে দিয়েছেন যে, সেটি অমুক প্রান্তরে অমুক গাছের সাথে আটকে আছে। তখন তারা তথায় যেয়ে উটনীটি নিয়ে আসেন।" এ হাদীস উল্লেখ করে ইবনু হাজার আসকালানী বলেন:
فَانَّ بَعْضَ مَنْ لَمْ يَرْسَخْ فِي الإِيمَانِ كَانَ يَظُنُّ ذَلِكَ حَتَّى كَانَ يَرَى أَنَّ صِحَّةَ النُّبُوَّةِ تَسْتَلْزِمُ اطِّلَاعَ النَّبِيِّ ﷺ عَلَى جَمِيعِ الْمُغَيَّبَاتِ ... فَأَعْلَمَ النَّبِيُّ ﷺ أَنَّهُ لَا يَعْلَمُ مِنَ الْغَيْبِ إِلَّا مَا عَلَّمَهُ اللَّهُ "যাদের ঈমান পূর্ণ হয় নি এরূপ কেউ কেউ ধারণা করত যে, রাসূলুল্লাহ ইলমুল গাইব জানেন। এমনকি তারা মনে করত যে, নুবুওয়াতের বিশুদ্ধতা প্রমাণ করার জন্য নবীকে সকল গাইব জানতে হবে। .... এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ জানিয়ে দিলেন যে, আল্লাহ যা জানান তা ছাড়া আর কিছুই তিনি জানেন না।" সাহাবীগণের মধ্যে অন্যতম প্রসিদ্ধ বুজুর্গ সাহাবী ছিলেন উসমান ইবনু মাযউন (রা)। তিনি রাসূলুল্লাহ-এর দুধ-ভাই ছিলেন এবং জাহিলী যুগেও তিনি মদপান বা মুর্তিপূজা করেন নি। তিনি প্রথম অগ্রবর্তী মুহাজিরদের অন্যতম ছিলেন। মহিলা সাহাবী উম্মুল আলা উসমান ইবনু মাযউনের (রা) ওফাতের পরের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন:
فَدَخَلَ عَلَيْنَا النَّبِيُّ ﷺ فَقُلْتُ رَحْمَةُ اللَّهِ عَلَيْكَ أَبَا السَّائِبِ شَهَادَتِي عَلَيْكَ لَقَدْ أَكْرَمَكَ اللَّهُ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ وَمَا يُدْرِيكِ أَنَّ اللَّهَ أَكْرَمَهُ قَالَتْ قُلْتُ لَا أَدْرِي بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَنْ يُكْرِمُهُ اللَّهِ؟ قَالَ أَمَّا هُوَ فَقَدْ جَاءَهُ وَاللَّهِ الْيَقِينُ وَاللَّهِ إِنِّي لَأَرْجُو لَهُ الْخَيْرَ وَمَا أَدْرِي وَاللَّهِ وَأَنَا رَسُولُ اللَّهِ مَا يُفْعَلُ بِي قَالَتْ فَوَاللَّهِ لَا أُزَكِّي أَحَدًا بَعْدَهُ "তখন রাসূলুল্লাহ আমাদের নিকট আসলেন। আমি বললাম, হে আবুস সাইব (উসমান ইবনু মাযউন) আমি আপনার বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন: তুমি কিভাবে জানলে যে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন? আমি বললাম, আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবানী হোন, আমি তো জানি না, তবে তাঁকে যদি আল্লাহ সম্মানিত না করেন তবে আর কাকে করবেন? তখন রাসূলুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহর কসম, তার কাছে একীন এসেছে, আল্লাহর কসম, আমি তার বিষয়ে ভাল আশা করি। আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহর রাসূল, আমিও জানি না যে, আমার বিষয়ে কি করা হবে।' উম্মুল আলা (রা) বলেন, আল্লাহর কসম! এরপর আমি আর কাউকে ভাল বলি না।" মহিলা সাহাবী রুবাই' বিনতু মু'আওয়িয বলেন:
দَخَلَ عَلَيَّ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ صَبِيحَةً عُرْسِي وَعِنْدِي جَارِيَتَانِ يَتَغَنَّيْتَانِ ... وَتَقُولَانِ فِيمَا تَقُولَانِ: وَفِينَا نَبِيٌّ يَعْلَمُ مَا فِي غَدٍ فَقَالَ أَمَّا هَذَا فَلَا تَقُولُوهُ، مَا يَعْلَمُ مَا فِي غَدٍ إِلَّا اللَّهُ "আমার বিবাহের দিন সকালে রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার ঘরে প্রবেশ করেন, তখন আমার কাছে দ'জন বালিকা বসে গীত গাচ্ছিল। তারা তাদের কথার মাঝে মাঝে বলছিল: 'আমাদের মধ্যে একজন নবী রয়েছেন যিনি আগামীকাল (অর্থাৎ ভবিষ্যতে) কি আছে তা জানেন।' তখন রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বলেন: 'এ কথা বলো না, আগামীতে (ভবিষ্যতে) কি আছে তা আল্লাহ ছাড়া কেউই জানে না।"
আয়েশা, উম্মু সালামা, আসমা বিনত আবী বাকর, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ, আনাস ইবনু মালিক, আবূ সাঈদ খুদরী, সাহল ইবনু সা'দ, আমর ইবনুল আস প্রমুখ প্রায় দশ জন সাহাবী (৯) থেকে অনেকগুলি সহীহ সনদে বর্ণিত 'মুতাওয়াতির' পর্যায়ের হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন যে, কেয়ামতের দিন অনেক মানুষ আমার কাছে (হাউযে পানি পানের জন্য) আসবে, যাদেরকে আমি চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে, কিন্তু তাদেরকে আমার কাছে আসতে দেওয়া হবে না, বাধা দেওয়া হবে। আমি বলব: এরা তো আমারই উম্মত। তখন উত্তরে বলা হবে:
إِنَّكَ لَا تَدْرِي مَا عَمِلُوا بَعْدَكَ "আপনার পরে তারা কী আমল করেছে তা আপনি জানেন না।" রাসূলুল্লাহ বলেন,
فَأَقُولُ كَمَا قَالَ الْعَبْدُ الصَّالِحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ : وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ "নেকবান্দা ঈসা ইবনু মারিয়াম (আ) যা বলেন আমি তখন তা-ই বলব: "যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের কার্যকলাপের শাহীদ-সাক্ষী। কিন্তু যখন আপনি আমাকে তুলে নিলেন তখন আপনিই তো ছিলেন তাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক এবং আপনিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী (শাহীদ)।"
এ সকল নির্দেশনার পাশাপাশি কুরআন ও হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ তাঁকে গাইব বা অদৃশ্য জ্ঞানের অনেক কিছু শিক্ষা দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنْ أَدْرِي أَقَرِيبٌ مَا تُوعَدُونَ أَمْ يَجْعَلُ لَهُ رَبِّي أَمَدًا عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا لِيَعْلَمَ أَنْ قَدْ أَبْلَغُوا رِسَالَاتِ رَبِّهِمْ وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ وَأَحْصَى كُلِّ شَيْءٍ عَدَدًا "বল, আমি জানি না তোমাদেরকে যে (শাস্তির) প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা কি আসন্ন, না আমার প্রতিপালক তার জন্য দীর্ঘ মেয়াদ স্থির করবেন। তিনি গায়েবের (অদৃশ্যের) জ্ঞানী, তিনি গায়েবের (অদৃশ্যের) জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না, তার মনোনীত রাসূল ব্যতীত, সেক্ষেত্রে আল্লাহ সেই রাসূলের আগে ও পিছে প্রহরী নিয়োগ করেন, যেন তিনি জানতে পারেন যে, রাসূলগণ তাদের প্রভুর রিসালাতের বাণী পৌঁছিয়েছেন কি না। তাদের কাছে যা আছে তা তাঁর জ্ঞানগোচর এবং তিনি সমস্ত কিছুর বিস্তারিত হিসাব রাখেন।"
এভাবে আমারা জানতে পারছি যে, রিসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহ তাঁর মনোনিত রাসূলদেরকে গায়েবের জ্ঞান প্রকাশ করেন। সাথে সাথে আমরা জানতে পারছি যে, সার্বিক গায়েব বা ভবিষ্যতের কথা তিনি রাসূলদেরকেও জানান না। কাফেরদেরকে যে শান্তির ওয়াদা করা হয়েছে তা কি শীঘ্রই আসবে না দেরী করে আসবে তা তিনি জানেন না। আসমা বিনতু আবী বাক্স (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সূর্যগ্রহণের সময় সালাত আদায়ের পরে বলেন:
مَا مِنْ شَيْءٍ لَمْ أَكُنْ أُرِيتُهُ إِلَّا رَأَيْتُهُ فِي مَقَامِي حَتَّى الْجَنَّةُ وَالنَّارُ "যা কিছু আমাকে ইতোপূর্বে দেখানো হয়েছিল না তা সবই আমি আমার এই অবস্থানে থেকে দেখেছি, এমনকি জান্নাত ও জাহান্নামও।" আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
أَتَانِي اللَّيْلَةَ رَبِّي تَبَارَكَ وَتَعَالَى فِي أَحْسَنِ صُورَةٍ قَالَ أَحْسَبُهُ قَالَ فِي الْمَنَامِ فَقَالَ يَا مُحَمَّدُ هَلْ تَدْرِي فِيمَ يَخْتَصِمُ الْمَلَأُ الْأَعْلَى قَالَ قُلْتُ لَا قَالَ فَوَضَعَ يَدَهُ بَيْنَ كَتِفَيَّ حَتَّى وَجَدْتُ بَرْدَهَا بَيْنَ ثَدْيَيَّ أَوْ قَالَ فِي نَحْرِي فَعَلِمْتُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ، وفي رواية : فَعَلِمْتُ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ، وفي رواية: حَتَّى تَجَلَّى لِي مَا فِي السَّمَوَاتِ
وَ مَا فِي الْأَرْضِ ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الْآيَةَ : وَكَذَلِكَ نُرِي إِبْرَاهِيمَ مَلَكُوتَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلِيَكُونَ مِنَ الْمُوقِنِينَ). قَالَ يَا مُحَمَّدُ هَلْ تَدْرِي فِيمَ يَخْتَصِمُ الْمَلَأُ الْأَعْلَى قُلْتُ نَعَمْ قَالَ فِي الْكَفَّارَاتِ وَالْكَفَّارَاتُ الْمُكْثُ فِي الْمَسَاجِدِ بَعْدَ الصَّلَوَاتِ وَالْمَشْيُ عَلَى الْأَقْدَامِ إِلَى الْجَمَاعَاتِ وَإِسْبَاغُ الْوُضُوءِ فِي الْمَكَارِهِ وَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ عَاشَ بِخَيْرٍ وَمَاتَ بِخَيْرٍ وَكَانَ مِنْ خَطِيئَتِهِ كَيَوْمٍ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ. "আজ রাতে আমার মহিমাময় প্রতিপালক সর্বোত্তম আকৃতিতে আমার নিকট আগমন করেন, তিনি বলেন, আমার মনে হয় তিনি বলেন: স্বপ্নের মধ্যে। তখন তিনি বলেন: হে মুহাম্মাদ, তুমি কি জান সর্বোচ্চ পরিষদ কোন্ বিষয়ে বিতর্ক করছে? আমি বললাম: না। তখন তিনি তাঁর হাত আমার দুই কাঁধের মধ্যে রাখলেন, এমনকি আমি তার শীতলতা আমার বক্ষের মধ্যে অনুভব করলাম। তখন আমি আকাশমণ্ডলীর মধ্যে যা আছে এবং যমিনের মধ্যে যা আছে তা জানলাম। অন্য বর্ণনায়: পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে যা আছে তা আমি জানলাম। তৃতীয় বর্ণনায়: তখন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা আছে তা আমার কাছে উদ্ভাসিত হলো। তখন তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন: "এভাবে আমি ইবরাহীমকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব বা পরিচালন-ব্যবস্থা দেখাই, আর যাতে সে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্ত র্ভুক্ত হয়।" তখন তিনি বলেন, হে মুহাম্মাদ, তুমি কি জান সর্বোচ্চ পরিষদ কোন্ বিষয়ে বিতর্ক করছে? আমি বললাম: হ্যাঁ। তিনি বলেন, তারা কাফ্ফারা বা পাপের ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে বিতর্ক করছেন। আর কাফ্ফারা হলো সালাত আদায়ের পরে মসজিদে অবস্থান করা, পায়ে হেটে জামাতে সালাত আদায়ের জন্য গমন করা এবং অসুবিধা সত্ত্বেও পরিপূর্ণরূপে ওযু করা। যে ব্যক্তি এগুলি করবে সে কল্যাণের সাথে জীবন যাপন করবে, কল্যাণের সাথেই মৃত্যুবরণ করবে এবং তার মাতৃগর্ভ থেকে জন্মের সময় তার পাপ যেরূপ ছিল তদ্রূপ হয়ে যাবে।"
এভাবে আমরা দেখছি যে, মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (ﷺ)-কে আসমান-যমিনের ও পূর্ব-পশ্চিমের অদৃশ্য বিষয়াদি জানিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন। এ দেখানোর অর্থ স্বভাবতই সকল গাইবী ইলম প্রদান করা নয়। রাসূলুল্লাহ এখানে তা স্পষ্টতই বুঝিয়েছেন। তিনি তাঁর এই দর্শনকে ইবরাহীম (আ)-এর দর্শনের সাথে তুলনা করেছেন। কুরআন কারীম থেকে আমরা জানি যে, মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আ)-কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী রাজত্ব বা পরিচালন-ব্যবস্থা দেখান। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, তাঁকে সকল গাইবী জ্ঞান প্রদান করেন। কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে আমরা দেখি যে, ইবরাহীম (আ)-এর শেষ জীবনে তাঁর দ্বিতীয় পুত্রের জন্মের সুসংবাদ নিয়ে এবং লুত (আ)-এর দেশের মানুষদের ধবংসের দায়িত্ব নিয়ে যখন ফিরিশতাগণ তাঁর কাছে আগমন করেন, তখন তিনি ফিরিশতাদেরকে চিনতে পারেন নি, তাদের দায়িত্ব সম্পর্কেও কিছু জানতে পারেন নি, তাঁর নিজের সন্তান হবে তাও তিনি জানতেন না এবং সন্তানের সুসংবাদ পেয়ে তিনি খুবই আশ্চর্যান্বিত হন। এ সকল বিষয় সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, এরূপ দর্শনের অর্থ গাইবী জগতের অনেক বিষয় দেখা, সকল বিষয়ের স্থায়ী জ্ঞান লাভ নয়।
প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের এ সকল আয়াত ও হাদীসের মধ্যে কোনোরূপ বৈপরীত্য কল্পনা করেন নি সাহাবীগণ এবং তাঁদের অনুসারী তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ী ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মুসলিমগণ। এ সকল নির্দেশ সবই সরল ও স্বাভাবিক অর্থে বিশ্বাস করেছেন তারা। আল্লাহ ছাড়া কেউ গাইব জানেন না- কুরআন ও হাদীসের এ নির্দেশনা সন্দেহাতীতভাবে সত্য। রাসূলুল্লাহ গাইব জানতেন না- কুরআন ও হাদীসের এ নির্দেশনাও সন্দেহাতীতভাবে সত্য। পাশাপাশি মহান আল্লাহ তাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হিসেবে নুবওয়াতের দায়িত্ব ও মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ গাইবের বিষয়াদি দেখিয়েছেন ও জানিয়েছেন- কুরআন ও হাদীসের এ নির্দেশনাও সন্দেহাতীতভাবে সত্য। যতটুকু জানিয়েছেন বা দেখিয়েছেন বলে কুরআন কারীম বা সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে তা সবই সরল অর্থে তারা বিশ্বাস করেছেন। এর বাইরে কিছু জানা বা না জানা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা-চিন্তা করা মুমিনের দায়িত্ব নয়।
৭ম-৮ম হিজরী শতক থেকে কোনো কোনো আলিম দাবি করতে থাকেন যে, রাসূলুল্লাহ সামগ্রিক ইলমুল গাইবের অধিকারী ছিলেন বা তিনি 'আলিমুল গাইব' ছিলেন। প্রসিদ্ধ ভারতীয় আলিম আব্দুল হাই লাখনবী বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সম্পর্কে যে সকল মিথ্যা কথা বলা হয় তার অন্যতম হলো:
إِنَّ النَّبِيَّ أُعْطِيَ عِلْمَ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ مُفَصَّلًا وَوُهِبَ لَهُ عِلْمُ كُلِّ مَا مَضَى وَمَا يَأْتِي كُلِّيًّا وَجُزْئِيًّا وَأَنَّهُ لَا فَرْقَ بَيْنَ عِلْمِهِ وَعِلْمِ رَبِّهِ مِنْ حَيْثُ الْإِحَاطَةُ وَالشُّمُولُ ، وَإِنَّمَا الْفَرْقُ بَيْنَهُمَا أَنَّ عِلْمَ اللَّهِ أَزَلِيٌّ أَبَدِيٌّ بِنَفْسِ ذَاتِهِ بِدُونِ تَعْلِيمِ غَيْرِهِ بِخِلَافِ عِلْمِ الرَّسُولِ فَإِنَّهُ حَصَلَ لَهُ بِتَعْلِيمِ رَبِّهِ "রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকলের ও সকল কিছুর বিস্তারিত জ্ঞান প্রদত্ত হয়েছিলেন। যা কিছু অতীত হয়েছে এবং যা কিছু ভবিষ্যতে ঘটবে সবকিছুরই বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি জ্ঞান তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। ব্যাপকতায় ও গভীরতায় রাসূলুল্লাহর জ্ঞান ও তাঁর প্রতিপালক মহান আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। শুধুমাত্র পার্থক্য হলো, আল্লাহর জ্ঞান অনাদি ও স্বয়জ্ঞাত, কেউ তাঁকে শেখান নি। পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহর জ্ঞান অর্জিত হয়েছে তাঁর প্রভুর শেখানোর মাধ্যমে।"
এ কথা উল্লেখ করার পর আল্লামা আব্দুল হাই লাখনবী বলেন: "এগুলি সবই সুন্দর করে সাজানো মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। ইবনু হাজার মাক্কী তার 'আল-মিনাহুল মাক্কিয়াহ' গ্রন্থে ও অন্যান্য প্রাজ্ঞ আলিম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই কথাগুিলি ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও বিভিন্ন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, সামগ্রিক ও ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
একমাত্র তিনিই সকল অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী বা আলিমুল গাইব। এই জ্ঞান একমাত্র তাঁরই বিশেষত্ব ও তাঁরই গুণ। আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্য কাউকে এই গুণ প্রদান করা হয় নি। হ্যাঁ, আমাদের নবী (ﷺ)-এর জ্ঞান অন্য সকল নবী-রাসূলের (আ) জ্ঞানের চেয়ে বেশি। গাইবী বা অতিন্দ্রীয় বিষয়াদি সম্পর্কে তাঁর প্রতিপালক অন্যান্য সবাইকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তার চেয়ে অধিকতর ও পূর্ণতর শিক্ষা দিয়েছেন তাঁকে। তিনি জ্ঞান ও কর্মে পূর্ণতম এবং সম্মান ও মর্যাদায় সকল সৃষ্টির নেতা।"
মোল্লা আলী কারীও অনুরূপ কথা বলেছেন। কুরআন কারীমের যে সকল আয়াতে সুস্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ 'গাইব' জানতেন না সেগুলি তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া রাসূলুল্লাহ-এর জীবনের বিভিন্নন ঘটনা, যেমন আয়েশা (রা)-এর গলার হার হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদের ঘটনা ইত্যাদি উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, এ সকল ঘটনা প্রমাণ করে যে, এরূপ গাইব কখনোই রাসূলুল্লাহ জানতেন না এবং এরূপ জানার দাবি তিনি কখনোই করেন নি, বরং তিনি বারংবার বলেছেন যে, আমি গাইব জানি না। এরপর তিনি বলেন: "নিঃসন্দেহে তাদের এরূপ অতিভক্তি ও সীমালঙ্ঘনের কারণ হলো, তারা মনে করে স্বয় স্বয়ং রাসূলুল্লাহ তাদের গোনাহগুলি মাফ করে দিবে এবং তাদেরকে জান্নাতে ঢুকিয়ে দিবেন। তারা এভাবে তাঁর বিষয়ে যত বেশি অতিভক্তি ও অতিরিক্ত কথা বলবে ততই তারা তাঁর বেশি প্রিয় হবে। এভাবে ভক্তির নামে এরা তাঁর সবেচেয়ে বেশি অবাধ্যতা করছে এবং তাঁর সুন্নাত সবচেয়ে বেশি লঙ্ঘন করছে। খৃস্টানদের সাথে এদের সাদৃশ্য খুবই স্পষ্ট, যারা ঈসা মাসীহের (আ) বিষয়ে অতিভক্তি করেছে, তাঁর শরীয়ত লঙ্ঘন করেছে এবং তার দীনের সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছে। প্রকৃত অবস্থা এই যে, এরা মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীসগুলি সত্য বলে গ্রহণ করে আর সহীহ হাদীসগুলিকে বিকৃত ব্যাখ্যা করে বাতিল করে।"
এক নযরেই আমরা বুঝতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ-এর ইলমুল গাইব বিষয়ক উপরের এ মতটি একটি বিদ'আতী বা বিভ্রান্ত মত। কারণ কুরআন কারীমে, কোনো সহীহ মুতাওয়াতির বা আহাদ হাদীসে বা সাহাবীগণের বাণীতে কোথাও এরূপ কথা বলা হয় নি। অন্যান্য বিভ্রান্ত বিদ'আতী আকীদার ন্যায় কুরআনের কোনো কোনো কথার ব্যাখ্যা, কোনো কোনো হাদীসের ব্যাখ্যা এবং বিভিন্ন যুক্তির মাধ্যমে এ 'আকীদা' তৈরি করা হয়েছে।
এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়: (১) কুরআনে অনেক স্থানে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে যে, একমাত্র আল্লাহই 'আলিমুল গাইব' এবং তিনি ছাড়া আসমান-যমীনের মধ্যে অন্য কেউ গাইব জানেন না। এ কথা বলা হয় নি যে, 'আল্লাহর মত গাইব' কেউ জানেন না, বরং বলা হয়েছে আল্লাহ ছাড়া কেউই গাইব জানেন না।
(২) কুরআন কারীমে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাষায় বারংবার বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ গাইব জানেন না। এর বিপরীতে একটি স্থানেও একটি বারের জন্য দ্ব্যর্থহীন বা সুস্পষ্টভাবে বলা হয় নি যে, তিনি 'আল্লামুল গুইউব', বা 'আলিমুল গাইব' বা সকল গাইবের জ্ঞান তাঁরা আছে।
(৩) অনেক সহীহ হাদীসে বারংবার বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ গাইব জানেন না। এর বিপরীতে একটি হাদীসেও তিনি বলেন নি যে, 'আমি গাইব জানি' বা 'আমি আলিমুল গাইব'।
(৪) এই মতটিতে যে কথাগুলি দাবি করা হয়েছে সে কথাগুলি কখনোই এরূপভাবে বা এ ভাষায় কখনো কোনো সহীহ, যয়ীফ বা জাল হাদীসেও বলা হয় নি।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 হাযির-নাযির প্রসঙ্গ

📄 হাযির-নাযির প্রসঙ্গ


রাসূলুল্লাহ-এর ইলমুল গাইবের দাবির আরেকটি পরিভাষা তাঁকে 'হাযির-নাযির' বলে দাবি করা। হাযির-নাযির দুইটি আরবী শব্দ। (حاضر) হাযির অর্থ উপস্থিত। (ناظر) নাযির অর্থ দর্শক, পর্যবেক্ষক বা সংরক্ষক। 'হাযির-নাযির' বলতে বোঝান হয় 'সদাবিরাজমান ও সর্বজ্ঞ বা সবকিছুর দর্শক'। অর্থাৎ তিনি সদা-সর্বদা সবত্র উপস্থিত বা বিরাজমান এবং তিনি সদা সর্বদা সবকিছুর দর্শক। স্বভাবতই যিনি সদাসর্বত্র বিরাজমান ও সবকিছুর দর্শক তিনি সর্বজ্ঞ ও সকল যুগের সকল স্থানের সকল গাইবী জ্ঞানের অধিকারী। কাজেই যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে 'হাযির-নাযির' দাবি করেন, তাঁরা দাবি করেন যে, তিনি শুধু সর্বজ্ঞই নন, উপরন্তু তিনি সর্বত্র বিরাজমান।
এখানেও কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়: প্রথমত, এই গুণটি শুধুমাত্র আল্লাহর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ আল্লাহ বারংবার এরশাদ করেছেন যে, বান্দা যেখানেই থাক্ তিনি তার সাথে আছেন, তিনি বান্দার নিকটে আছেন... ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সম্পর্কে কখনোই ঘুনাক্ষরেও কুরআন বা হাদীসে বলা হয় নি যে, তিনি সর্বদা উম্মাতের সাথে আছেন, অথবা সকল মানুষের সাথে আছেন, অথবা কাছে আছেন, অথবা সর্বত্র উপস্থিত আছেন, অথবা সবকিছু দেখছেন। কুরআনের আয়াত তো দূরের কথা একটি যয়ীফ হাদীসও দ্ব্যর্থহীনভাবে এই অর্থে কোথাও বর্ণিত হয় নি। কোনো একটি সহীহ, যয়ীফ বা মাউযূ হাদীসেও বর্ণিত হয় নি যে, তিনি বলেছেন 'আমি হাযির-নাযির'। অথচ তাঁর নামে এ মিথ্যা কথাটি বলা হচ্ছে। এমনকি কোনো সাহাবী, তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ী বা ইমাম কখনোই বলেন নি যে, 'রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাযির-নাযির'।
দ্বিতীয়ত, কুরআন-হাদীসে বারংবার অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) গোপন জ্ঞানের অধিকারী নন। রাসূলুল্লাহ (স)-কে 'হাযির-নাযির' বলে দাবি করা উক্ত সকল স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন আয়াত ও হাদীসের সুস্পষ্ট
বিরোধিতা করা।
তৃতীয়ত, বিভিন্ন হাদীসে তিনি বলেছেন, উম্মাতের দরুদ-সালাম তাঁর কবরে উপস্থিত করা হয়। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে হাযির-নাযির বলে দাবি করার অর্থ হলো, এ সকল হাদীস সবই মিথ্যা। উম্মাতের দরুদ-সালাম তাঁর কাছে উপস্থিত হয় না, বরং তিনিই উম্মাতের কাছে উপস্থিত হন!! কাজেই যারা এ দাবিটি করছেন, তাঁর শুধু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নামে মিথ্যা বলেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না। উপরন্তু তাঁরা স্বয় স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মিথ্যাবাদী বলে দাবি করেন, নাউযু বিল্লাহ!
চতুর্থত, যারা রাসূলুল্লাহ-এর ইলমুল গাইব ও সদাসর্বদা সর্বত্র বিরাজমান হওয়ার মত পোষণ করেছেন, তারা একে রাসূলুল্লাহ-এর ফযীলত বা মর্যাদা বিষয়ক মতামত হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেন নি, বরং একে মুমিনের ঈমানের অংশ বলে দাবি করেছেন।
ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, দশাধিক সাহাবী থেকে বর্ণিত বিভিন্ন হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, ওফাতের পরে মহাবিশ্বের সর্বত্র বা সকল উম্মাতের কাছে 'হাযির-নাযির' থেকে তাদের সকল পরিবর্তন বা অন্যায়-অপকর্ম অবলোকন করার ঝামেলা মহান আল্লাহ তাঁকে দেন নি। অনুরূপভাবে কুরআনে বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ বারংবার বলেছেন যে, অতীত উম্মাতগুলির নিকটও তিনি উপস্থিত বা হাযির-নাযির ছিলেন না। আল্লাহ বলেন:
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُونَ أَقْلَامَهُمْ أَيُّهُمْ يَكْفُلُ مَرْيَمَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يَخْتَصِمُونَ "এ গাইবের সংবাদ যা আমি ওহীর মাধ্যমে তোমাকে অবহিত করছি। মায়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাদের মধ্যে কে গ্রহণ করবে তার জন্য যখন তারা কলম নিক্ষেপ করছিল তখন তুমি তাদের নিকট ছিলে না এবং তারা যখন বাদানুবাদ করছিল তখনও তুমি তাদের নিকট ছিলে না।" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِيِّ إِذْ قَضَيْنَا إِلَى مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنْتَ مِنَ الشَّاهِدِينَ ... وَمَا كُنْتَ ثَاوِيًا فِي أَهْلِ مَدْيَنَ تَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا وَلَكِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا "মূসাকে যখন আমি বিধান দিয়েছিলাম তখন পশ্চিম প্রান্তে তুমি উপস্থিত ছিলে না এবং তুমির শাহিদ বা প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না। তুমি তো মাদয়নবাসীদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলে না তাদের নিকট আমার আয়াত আবৃত্তি করার জন্য। আমিই তো ছিলাম রাসূল প্রেরণকারী। মূসাকে যখন আমি আহবান করেছিলাম তখন তুমি তূর পর্বতের পার্শে উপস্থিত ছিলে না...।"
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ أَجْمَعُوا أَمْرَهُمْ وَهُمْ يَمْكُرُونَ "এ গাইবের সংবাদ যা তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করছি। ষড়যন্ত্রকালে যখন তারা মতৈক্যে পৌছেছিল তখন তুমি তাদের সংগে ছিলে না।"
আর রাসূলুল্লাহ-এর জীবনী, সীরাত, সাহাবীগণের কর্ম, মতামত ইত্যাদি সম্পর্কে যার সামান্য জ্ঞান আছে তিনিও বুঝতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় তিনি নিজে কখনো কোনোভাবে দাবি করেন নি যে, তিনি সদা সর্বদা সর্বত্র বা সকল উম্মাতের কাছে 'হাযির-নাযির' বা তাদের কাছে উপস্থিত থেকে তাদের সব কিছু দেখছেন। অনুরূপভাবে সাহাবীগণও কখনোই এরূপ কোনো কথা কল্পনা করেন নি।
তাদের এ মতের পক্ষে পেশকৃত দলিলগুলি নিম্নরূপ: স্বভাবতই কুরআন কারীম বা হাদীস শরীফ থেকে কোনো একটি সুস্পষ্ট বা দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যও তাঁরা প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন না। বিভিন্ন আয়াত বা হাদীসের ব্যাখ্যা বা ব্যাখ্যা-ভিত্তিক যুক্তি-তর্কই তাদের দলিল। তাঁদের এ জাতীয় দলিল-প্রমাণাদির মধ্যে রয়েছে:
প্রথম দলীল: কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে 'শাহিদ' ও 'শাহীদ' (شاهد و شهید) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই শব্দ দুইটির অর্থ 'সাক্ষী', 'প্রমাণ', 'উপস্থিত' (witness, evidence, present) ইত্যাদি। সাহাবীগণের যুগ থেকে পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মুফাসসিরগণ এই শব্দের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে (ﷺ) দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব দিয়ে ও সাক্ষীরূপে প্রেরণ করেছেন। যারা তাঁর প্রচারিত দ্বীন গ্রহণ করবেন, তিনি তাঁদের পক্ষে সাক্ষ্য দিবেন। এছাড়া পূর্ববর্তী নবীগণ যে তাদের দীন প্রচার করেছেন সে বিষয়েও তিনি এবং তাঁর উম্মাত সাক্ষ্য দিবেন। অনেকে বলেছেন, তাঁকে আল্লাহ তাঁর একত্বের বা ওয়াহদানিয়তের সাক্ষী ও প্রমাণ-রূপে প্রেরণ করেছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, অনেক স্থানে মুমিনগণকেও মানব জাতির জন্য 'শাহীদ' বলা হয়েছে। অনেক স্থানে আল্লাহকে 'শাহীদ'
বলা হয়েছে। যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে 'সকল অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী' বা 'হাযির-নাযির' বলে দাবি করেন তাঁরা এই 'দ্ব্যর্থবোধক' শব্দটির একটি বিশেষ অর্থ গ্রহণ করেন। এরপর সেই অর্থের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে কুরআনের সকল সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বাণী বাতিল করে দেন। তাঁরা বলেন, 'শাহিদ' অর্থ উপস্থিত। কাজেই তিনি সর্বত্র উপস্থিত। অথবা 'শাহিদ' অর্থ যদি সাক্ষী হয় তাহলেও তাঁকে সর্বত্র উপস্থিত থাকতে হবে। কারণ না দেখে তো সাক্ষ্য দেওয়া যায় না। আর এভাবে তিনি সদা সর্বদা সর্বত্র বিরাজমান বা হাযির-নাযির ও সকল স্থানের সকল গোপন ও গাইবী জ্ঞানের অধিকারী।
তাঁদের এই ব্যাখ্যা ও দাবির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়: প্রথমত, তাঁরা এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবী, তাবিয়ী ও পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের মতামত গ্রহণ না করে নিজেদের মর্জি মাফিক ব্যাখ্যা করেন এবং সাহাবী-তাবিয়ীদের ব্যাখ্যা বাতিল করে দেন। দ্বিতীয়ত, তাঁরা একটি দ্ব্যর্থবোধক শব্দের ব্যাখ্যাকে মূল আকীদা হিসাবে গ্রহণ করে তার ভিত্তিতে কুরআন ও হাদীসের অগণিত দ্ব্যর্থহীন নির্দেশনা নিজেদের মর্জিমাফিক বাতিল করে দিলেন। তাঁরা এমন একটি অর্থ গ্রহণ করলেন, যে অর্থে একটি দ্ব্যর্থহীন আয়াত বা হাদীসও নেই। সাহাবী, তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ী বা কোনো ইমামও কখনো এ কথা বলেন নি। তৃতীয়ত, তাঁদের এ ব্যাখ্যা ও দাবি মূলতই বাতিল। তাদের ব্যাখ্যা অনুসারে প্রত্যেক মুসলমানকেই 'ইলমে গাইবের অধিকারী' ও হাযির-নাযির বলে দাবি করতে হবে। কারণ মুমিনগণকেও কুরআনে 'শাহীদ' অর্থাৎ 'সাক্ষী' বা 'উপস্থিত' বলা হয়েছে এবং বারংবার বলা হয়েছে যে, তাঁরা পূর্ববর্তী সকল উম্মাত সহ পুরো মানব জাতি সম্পর্কে কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য দিবেন। আর উপস্থিত না হলে তো সাক্ষ্য দেওয়া যায় না। কাজেই তাঁদের ব্যাখ্যা ও দাবি অনুসারে বলতে হবে যে, প্রত্যেক মুমিন সৃষ্টির শুরু থেকে বিশ্বের সর্বত্র সর্বদা বিরাজমান এবং সবকিছু দেখছেন ও শুনছেন। কারণ না দেখে তাঁরা কিভাবে মানবজাতির পক্ষে বা বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবেন?!
দ্বিতীয় দলীল: কুরআন কারীমে অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ "নবী মু'মিনগণের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর (closer) এবং তাঁর স্ত্রী তাদের মাতা। এবং আল্লাহর কিতাবে আত্মীয়গণ পরস্পর পরস্পরের ঘনিষ্ঠতর।" এখানে 'আউলা' (أولى) শব্দটির মূল হলো 'বেলায়াত' (الولاية), অর্থাৎ বন্ধুত্ব, নৈকট্য, অভিভাবকত্ব ইত্যাদি। "বেলায়েত” অর্জনকারীকে "ওলী” (الولي), অর্থাৎ বন্ধু, নিকটবর্তী বা অভিভাবক বলা হয়। ওলী অর্থ নিকটবর্তী, বন্ধু, সাহায্যকারী, অভিভাবক ইত্যাদি। বেলায়াত ধাতু থেকে নির্গত 'ওলী' অর্থেরই আরেকটি সুপরিচিত শব্দ 'মাওলা' (المولى)। 'মাওলা' অর্থও অভিভাবক, বন্ধু, সঙ্গী ইত্যাদি (master, protector, friend, companion)। ইসলামী পরিভাষায় 'বেলায়াত' 'ওলী' ও 'মাওলা' শব্দের বিভিন্ন প্রকারের ব্যবহার রয়েছে। উত্তরাধিকার আইনের পরিভাষায় ও রাজনৈতিক পরিভাষায় এ সকল শব্দ বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত। তবে বেলায়াত বা ওলী শব্দদ্বয় সর্বাধিক ব্যবহৃত (ولاية الله) 'আল্লাহর বন্ধুত্ব' ও (ولي الله) 'আল্লাহর বন্ধু' অর্থে। আল্লাহর বন্ধুদের পরিচয় দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ "জেনে রাখ! নিশ্চয় আল্লাহর ওলীগণের কোনো ভয় নেই এবং তরা চিন্তাগ্রস্তও হবে না- যারা ঈমান এনেছে এবং যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করে চলে বা তাকওয়া অবলম্বন করে।" ঈমান অর্থ তাওহীদ ও রিসালাতের প্রতি বিশুদ্ধ, শিরক ও কুফর মুক্ত বিশ্বাস। "তাকওয়া” শব্দের অর্থ আত্মরক্ষা করা। যে কর্ম বা চিন্তা করলে মহান আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন সেই কর্ম বা চিন্তা বর্জনের নাম তাকওয়া। মূলত সকল হারাম, নিষিদ্ধ ও পাপ বর্জনকে তাকওয়া বলা হয়। এখানে আমরা দেখছি যে, দুটি গুণের মধ্যে ওলীর পরিচয় সীমাবদ্ধ। ঈমান ও তাকওয়া। এই দু'টি গুণ যার মধ্যে যত বেশি ও যত পরিপূর্ণ হবে তিনি বেলায়াতের পথে তত বেশি অগ্রসর ও আল্লাহর তত বেশি ওলী বা প্রিয় বলে বিবেচিত হবেন। এথেকে আমরা বুঝতে পারি যে, প্রত্যেক মুসলিমই আল্লাহর ওলী। ইমান ও তাকওয়ার গুণ যার মধ্যে যত বেশি থাকবে তিনি তত বেশি ওলী।
ইমাম আবূ হানীফা (রাহ), ইমাম তাহাবী (রাহ) ও অন্যান্য আলিম উল্লেখ করেছেন যে, ঈমান ও মা'রিফাতের দিক থেকে সকল মুমিনই সমান। এজন্য বেলায়াতের কমবেশি হয় মূলত নেক আমলে। যার নেক আমল ও সুন্নাতের ইত্তিবা যত বেশি তিনি তত বেশি ওলী। ইমাম তাহাবী বলেন:
الْمُؤْمِنُونَ كُلُّهُمْ أَوْلِيَاءُ الرَّحْمَنِ، وَأَكْرَمُهُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَطْوَعُهُمْ وَأَتْبَعُهُمْ لِلْقُرْآنِ "সকল মুমিন করুণাময় আল্লাহর ওলী। তাঁদের মধ্য থেকে যে যত বেশি আল্লাহর অনুগত ও কুরআনের অনুসরণকারী সে ততবেশি আল্লাহর নিকট সম্মানিত (ততবেশি বেলায়াতের অধিকারী)।" ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেন:
وَيَسْتَوِي الْمُؤْمِنُونَ كُلُّهُمْ فِي الْمَعْرِفَةِ وَالْيَقِينِ وَالتَّوَكُّلِ وَالْمَحَبَّةِ وَالرِّضَا وَالْخَوْفِ وَالرَّجَاءِ وَالإِيمَانِ فِي ذَلِكَ وَيَتَفَاوَتُونَ فِيمَا دُونَ الإِيمَانِ فِي ذَلِكَ كُلِّهِ. "মারিফাত (পরিচয় লাভ), ইয়াকীন (বিশ্বাস), তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা), মাহাব্বাত (ভালবাসা), রিযা (সন্তুষ্টি), খাওফ (ভয়), রাজা (আশা) এবং এ সকল বিষয়ের ঈমান-এর ক্ষেত্রে মুমিনগণ সকলেই সমান। তাদের মর্যাদার কমবেশি হয় মূল ঈমান বা বিশ্বাসের অতিরিক্ত যা কিছু আছে তার সবকিছুতে।" ইমাম তাহাবী (রাহ) বলেন:
الإِيمَانُ وَاحِدٌ وَأَهْلُهُ فِي أَصْلِهِ سَوَاءٌ وَالتَّفَاضُلُ بَيْنَهُمْ بِالْخَشْيَةِ وَالتَّقِيِّ، وَمُخَالَفَةِ الْهَوَى وَمُلَازَمَةِ الْأَوْلَى "ঈমান একই, এবং ঈমানদারগণ এর মূলে সবাই সমান। তবে, আল্লাহর ভয়, তাক্বওয়া, কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচারণ এবং সর্বদা উত্তম কর্ম সম্পাদনের অনুপাতে তাদের মধ্যে স্তর ও মর্যাদাগত প্রভেদ হয়ে থাকে।" রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বেলায়াতের পথের কর্মকে দুভাগে ভাগ করেছেন: ফরয ও নফল। সকল ফরয পালনের সাথেসাথে অনবরত
নফল ইবাদত পালনের মাধমে বান্দা বেলায়াত অর্জন করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ বলেছেন:
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا وَإِنْ سَأَلَنِي لأُعْطِيَنَّهُ وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيدَنَّهُ. "যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা করে আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার নৈকট্য অর্জন বা ওলী হওয়ার জন্য বান্দা যত কাজ করে তন্মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসি যে কাজ আমি ফরয করেছি। (ফরয পালন করাই আমার নৈকট্যে অর্জনের জন্য সবচেয়ে প্রিয় কাজ)। এবং বান্দা যখন সর্বদা নফল ইবাদত পালনের মাধ্যমে আমার বেলায়তের পথে অগ্রসর হতে থাকে তখন আমি তাকে ভালবাসি। আর যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার শ্রবণযন্ত্রে পরিণত হই, যা দিয়ে সে শুনতে পায়, আমি তার দর্শনেন্দ্রিয় হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখতে পায়, আমি তার হাত হয়ে যাই, যদ্দ্বার সে ধরে বা আঘাত করে এবং আমি তার পা হয়ে যাই, যদ্দ্বারা সে হাঁটে। সে যদি আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করে তাহলে আমি অবশ্যই তাকে তা প্রদান করি। সে যদি আমার কাছে আশ্রয় চায় তাহলে আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় প্রদান করি।"
কারামত (الكرامة) শব্দটির অর্থ 'ভদ্রতা', 'সম্মান', 'সম্মাননা', 'সম্মান-চিহ্ন' (nobility, dignity, respect, mark of honour, token of esteem)। ঈমান ও তাকওয়ার অধিকারী ফরয ও নফল ইবাদত পালনকারী কোনো ব্যক্তি থেকে যদি কোনো অলৌকিক কর্ম প্রকাশিত হয় তবে তাকে ইসলামী পরিভাষায় 'কারামাত' বলা হয়। কুরআন কারীমে এরূপ অলৌকিক কর্মকেও আয়াত বলা হয়েছে। পূর্ববর্তী যুগের একজন 'ওলী'-র পদস্খলন সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغَاوِينَ "তাদেরকে সেই ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শুনাও যাকে আমি 'আয়াত' বা অলৌকিক নির্দশন দিয়েছিলাম, অতঃপর সে তা থেকে বিচ্যুত হয় এবং শয়তান তার পিছনে লাগে, আর সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।" এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাস্স্সিরগণ পূর্ববর্তী যুগের বিভিন্ন ওলীর কথা উল্লেখ করেছেন যাদের বেলায়াতের কারণে মহান আল্লাহ তাদেরকে 'কারামাত' বা অলৌকিক কর্ম প্রদান করেছিলেন, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশের বিরোধিতা করায় পরে তিনি বিপথগামী হয়ে যান। এ আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, বেলায়াত কোনো পদমর্যাদা নয় এবং কারামত স্থায়ী পদমর্যাদার দলিল নয়। একজন নেককার মানুষ বেলায়াত ও কারামাত লাভের পরেও বিভ্রান্ত হতে পারেন। 'কারামত' প্রকাশিত হওয়া ওলী হওয়ার প্রমাণ নয়, বরং ঈমান ও তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকাই ওলী হওয়ার প্রমান। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য, অনুসরণ ও তাকওয়ার উপর টিকে থাকা ও অনবরত ফরয ও নফল ইবাদত পালন করতে থাকই বেলায়াতের একমাত্র চিহ্ন। দ্বিতীয়-তৃতীয় হিজরী শতাব্দী থেকে মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ নবীগণেরর অলৌকিক কর্মকে 'মুজিযা' বলে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ নুবুওয়াতের চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাফিরদের অক্ষমতা প্রকাশ করার জন্য আল্লাহ তাদের মাধ্যমে তা প্রকাশ করবেন। অনুরূপভাবে তাঁরা ওলীদের অলৌকিক কর্মকে 'কারামত' নামে আখ্যায়িত করেছেন, যেন মানুষ বুঝতে পারে যে, এরূপ অলৌকিক কর্ম ওলীর কোনো ক্ষমতা বা শক্তি নয়, বরং একান্তই আল্লাহর পক্ষ থেকে 'ইকরাম' বা সম্মাননা মাত্র।
ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেছেন: "ওলীগণের কারামত সত্য।" এ কথা অর্থ ওলীগণ থেকে অলৌকিক কর্ম প্রকাশ পাওয়া সম্ভব। যদি কোনো বাহ্যত নেককার মুমিন মুত্তাকী মানুষ থেকে কোনো অলৌকিক কার্য প্রকাশ পায় তাহলে তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত সম্মাননা বা কারামত বলে বুঝতে হবে। অনুরূপভাবে যদি কোনো নেককার বুযুর্গ মানুষ থেকে কোনো অলৌকিক কার্য প্রকাশিত হয়েছে বলে বিশুদ্ধ সূত্রে জানা যায় তবে তা সত্য বলে বিশ্বাস করতে হবে। তা অস্বীকার করা বা অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেওয়া মু'তাযিলী ও অন্যান্য বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের আকীদা। কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে নবী ছাড়াও অন্যান্য মুমিন মুত্তাকী মানুষের অলৌকিক কর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন হাদীসে এরূপ অনেক কারামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইমাম তাহাবী (রাহ) বলেন:
لَا نُفَضِّلُ أَحَدًا مِنَ الْأَوْلِيَاءِ عَلَى أَحَدٍ مِنَ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ، وَنَقُولُ نَبِيٌّ وَاحِدٌ أَفْضَلُ مِنْ جَمِيعِ الْأَوْلِيَاءِ. وَنُؤْمِنُ بِمَا جَاءَ مِنْ كَرَامَاتِهِمْ وَصَحَّ عَنِ الثِّقَاتِ مِنْ رِوَايَاتِهِمْ. "আমরা কোনো ওলীকে কোনো নবীর উপর প্রাধান্য দেই না। বরং আমরা বলি: একজন নবী সকল ওলী থেকে শ্রেষ্ঠ। তাদের যে সকল কারামত নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত রাবীদের মাধ্যমে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে তা আমরা বিশ্বাস করি।" ৪. ৪. ৯. ৩. ইসতিদরাজ 'ইসতিদরাজ' শব্দটি আরবী 'দারাজ' (درج) ক্রিয়ামূল থেকে গৃহীত, যার অর্থ চলা, হাঁটা, অগ্রসর হওয়া, ক্রমান্বয়ে এগোনো ইত্যাদি। 'দারাজাহ' (الدرجة) অর্থ ধাপ বা পর্যায়। ইসতিদরাজ (الاستدراج) অর্থ ক্রমান্বয়ে এগিয়ে নেওয়া, ক্রমান্বয়ে উপরে তোলা বা নিচে নামান, ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি (To make advance gradually, promote
gradually, to entice, tempt, lure into destruction)।
কোনো পাপী বা অবিশ্বাসী ব্যক্তি থেকে কোনো অলৌকিক কর্ম প্রকাশিত হলে তাকে ইসলামের পরিভাষায় 'ইসতিদরাজ' বলা হয়। আমরা দেখেছি যে, ইসতিদরাজের ব্যাখ্যায় ইমাম আবূ হানীফা বলেছেন: "বরং এগুলিকে আমরা তাদের কাযায়ে হাজাত বা প্রয়োজন মেটানো বলি। কারণ আল্লাহ তাঁর দুশমনদের প্রয়োজন মিটিয়ে দেন তাদেরকে ক্রমান্বয়ে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং তাদের শাস্তি হিসেবে।"
মোল্লা আলী কারী বলেন: "ফিরাসাত তিন প্রকার। (১) ঈমানী ফিরাসাত। এর কারণ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত নূর যা আল্লাহ তার বান্দার অন্তরে নিক্ষেপ করেন। হঠাৎ অনুভূতি হিসেবে তা মানুষের অন্তরে হামলা করে, যেমন সিংহ তার শিকারের উপরে হামলা করে। .... (২) রিয়াজত বা অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জিত ফিরাসাত। এ প্রকারের ফিরাসাত অর্জিত হয় ক্ষুধা, রাত্রি-জাগরণ, নির্জনবাস ইত্যাদির মাধ্যমে। কারণ মানুষের নফস যখন জাগতিক সম্পর্ক ও সৃষ্টির সাথে যোগাযোগ থেকে বিমুক্ত হয় তখন তার বিমুক্তির মাত্রা অনুসারে তার মধ্যে অন্তর্দিষ্টি ও কাশফ সৃষ্টি হয়। এ প্রকার ফিরাসাত কাফির ও মুমিন উভয়েরই হতে পারে। এ প্রকার কাশফ বা ফিরাসাত ঈমান বা বেলায়াত প্রমাণ করে না। এর দ্বারা কোনো কল্যাণ বা সঠিক পথও জানা যায় না।... (৩) সৃষ্টিগত ফিরাসাত। এ হলো চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশার মানুষের ফিরাসাত যারা সৃষ্টিগত আকৃতি থেকে প্রকৃতি ও আভ্যন্তরীন অবস্থা অনুমান করতে পারেন।"
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, সকল অলৌকিক কর্মই কারামত নয় এবং কোনো অলৌকিক কর্ম কারো বেলায়াতের প্রমাণ নয়, কারণ একই প্রকার অলৌকিক কর্ম মুত্তাকী মুমিন থেকেও প্রকাশিত হতে পারে এবং ফাসিক বা কাফির থেকেও প্রকাশিত হতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো অলৌকিক কর্ম কোনো মানুষের বেলায়াত তো দূরের কথা, ঈমানেরও প্রমাণ নয়। বরং মানুষের ঈমান, তাকওয়া, আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) আনুগত্য ও সদা সর্বদা ফরয ও নফল ইবাদত পালন করাই বেলায়াতের প্রমাণ। যদি এরূপ ব্যক্তি থেকে কোনো অলৌকিক কর্ম প্রকাশিত হয় তবে তাকে কারামত বলা হবে। আর যদি কোনো ব্যক্তির ঈমান, তাকওয়া বা ইত্তিবায়ে সুন্নাত না থাকে কিন্তু তিনি বিভিন্ন অলৌকিক কর্ম সম্পাদন করেন তবে তাকে ইসতিদরাজ বলা হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00