📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাঁর অনুকরণ

📄 তাঁর অনুকরণ


ইতা'আত বা আনুগত্য অর্থ আদেশ নিষেধ পালন করা। আর আদেশ-নিষেধের বাইরেও কর্মে ও বর্জনে অনুকরণকে আরবীতে 'ইত্তিবা' বলা হয়। 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও দাবি হলো কর্মে ও বর্জনে হুবহু তাঁর অনুকরণ করা। তিনি যা নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করা এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করার সাথে সাথে মুহাম্মদ (ﷺ)-কে রাসূল হিসেবে বিশ্বাসকারী প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হলো জীবনের সকল পর্যায়ে কর্মে ও বর্জনে তাঁর অনুসরণ ও অনুকরণ করা। তিনি যা যেভাবে করেছেন তা করা এবং তিনি যা বর্জন করেছেন তা বর্জন করা। কর্মে ও বর্জনে তাঁর সুন্নাত বা জীবনাদর্শই মুসলিমের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا "নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য।"
এ থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, শুধু যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে না, অর্থাৎ শুধুমাত্র কাফিররাই তাঁর আদর্শ গ্রহণ করে না বা পূর্ণাঙ্গ মনে করে না। শুধু কাফেরদের জন্যই অন্য কারো আদর্শের প্রয়োজন হয়। মুমিনদের জন্য তাঁর আদর্শই পরিপূর্ণ আদর্শ। আর হুবহু তাঁর আদর্শে জীবন পরিচালনাই ঈমানের আলামত।
তাঁর আদর্শের অনুসরণ ও জীবন গঠনই আল্লাহর প্রেম, ক্ষমা ও মুক্তি লাভের একমাত্র পথ। মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ . قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ "বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসেন এবং তোমাদেরকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। বল, আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য প্রকাশ
কর। বস্তুত যদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে, তাহলে আল্লাহ কাফিরদিগকে ভালবাসেন না।" এভাবে আমরা দেখি যে, 'লাইলাহা ইল্লাল্লাহ' বিশ্বাসের অর্থ হলো, চূড়ান্ত ও অলৌকিক ভক্তি বা ভয় ও আশা মিশ্রিত অলৌকিক ভক্তি ও বিনয় একমাত্র আল্লাহর জন্য। আর 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' বিশ্বাসের অর্থ হলো প্রশ্নাতীত ও সামগ্রিক আনুগত্য ও অনুসরণ একমাত্র মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর জন্য। কাজেই যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ আছে যে তাঁর আনুগত্যের উর্দ্ধে বা সে এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যেখানে রাসূলুল্লাহ-এর আনুগত্য ও অনুসরণ না করলেও তার চলে, অথবা তাঁর আনুগত্য-অনুকরণ ছাড়াও আল্লাহর নৈকট্য লাভ সম্ভব তাহলে সে ব্যক্তি মুসলিম বলে গণ্য হবে না, যদিও সে কোনো বিষয়ে তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ করে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 অনুকরণের ব্যতিক্রম ঈমান বিধ্বংসী

📄 অনুকরণের ব্যতিক্রম ঈমান বিধ্বংসী


রাসূলুল্লাহ-এর অনুসরণের অতিরিক্ত বা ব্যতিক্রম কোনো কর্মের মধ্যে কোনো কল্যাণ আছে বলে মুমিন বিশ্বাস করেন না। 'মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল' একথা বিশ্বাস করার অর্থ হলো আল্লাহকে ডাকতে হলে, তাঁকে পেতে হলে, তাঁর বন্ধুত্ব, বেলায়াত, সাওয়াব, প্রেম ও করুণা লাভ করতে হলে, তাঁর ইবাদত করতে হলে বা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে অবশ্যই মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর শিক্ষা অনুসারে আল্লাহকে ডাকতে হবে বা তাঁর ইবাদত করতে হবে। তাঁর শিক্ষার বাইরে, ব্যতিক্রম বা অতিরিক্ত কোনো পদ্ধতিতে আল্লাহকে ডাকলে বা ইবাদত করলে তা কখনো আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেন:
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ "অতএব যারা তাঁর (রাসূলুল্লাহ-এর) আদেশের ব্যতিক্রম বা বিরুদ্ধাচারণ করে, তারা যেন সতর্ক হয়, তাদের উপর বিপর্যয় আপতিত হবে, অথবা কোনো কঠিন শাস্তি তাদের উপর আপতিত হবে।" 'মুখালাফাহ' (مخالفة) অর্থ ব্যতিক্রম করা বা বিরোধিতা করা (to contradict, to be at variance)। 'খিলাফ' (خلاف) অর্থ ব্যতিক্রম, বিপরীত বা অসমঞ্জস (difference, dissimilarity)। এ থেকে আমরা বুঝি যে, রাসূলুল্লাহ-এর কর্ম, শিক্ষা বা আদর্শের ব্যতিক্রম বা তাঁর পথের ব্যতিক্রম চলা বা তাঁর শিক্ষার ব্যতিক্রম কিছু করাই ভয়ঙ্কর বিপদ ও ধবংসের কারণ। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ. "হে মুমিনগণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোনো বিষয়ে অগ্রবর্তী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।" আমরা জানি যে, একমাত্র আল্লাহর রাসূলের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর নির্দেশনা লাভ করেছি। কাজেই আল্লাহর রাসূলের সামনে এগিয়ে যাওয়া বা অগ্রবর্তী হওয়ার অর্থই আল্লাহর সামনে অগ্রণী হওয়া। কোনো মুমিনের পক্ষে সম্ভব নয় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শিক্ষা, আদর্শ, পথ ও মত থেকে একটু সামনে অগ্রবর্তী হবে বা দীন বুঝতে, পালন করতে বা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে তাঁর অতিরিক্ত কিছু কর্ম করবে। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلَهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا "কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিক সে ফিরে যায় সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দিব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব, আর তা কতই না মন্দ আবাস!" রাসূলুল্লাহ অনেক হাদীসে তাঁর পথের বা আদর্শের বাইরে চলতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। তাঁর রীতি, পদ্ধতি বা কর্মের বাইরে কোনো কর্ম করলে তা আল্লাহ কবুল করবেন না বলে জানিয়েছেন। তাঁর কর্মের বা আদর্শের বাইরে নব-উদ্ভাবিত কর্ম বা পদ্ধতিকে 'বিভ্রান্তি' বলে আখ্যায়িত করেছেন। এক হাদীসে আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ "আমাদের কর্ম যা নয় এমন কোনো কর্ম যদি কোনো মানুষ করে তাহলে তার কর্ম প্রত্যাখ্যাত হবে (আল্লাহর নিকট কবুল হবে না)।” এ বিষয়ক আরো অনেক হাদীস আমরা ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে বিদ'আত ও বিভক্তি বিষয়ক আলোচনায় উল্লেখ করব, ইনশা আল্লাহ। এখানে আমরা মূলনীতি হিসেবে বলতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ-এর অনুকরণের ব্যতিক্রম মুমিনের ঈমানের জন্য ভয়ঙ্কর। জীবনের প্রতি বিষয়ে ও প্রতি কর্মেই রাসূলুল্লাহ-এর আদর্শ রয়েছে। আদেশ নিষেধ ছাড়াও তাঁর কর্মরীতির বিভিন্ন দিক রয়েছে। প্রতি বিষয়েই তাঁর কর্মরীতি অনুসরণ প্রয়োজন। অন্তত তাঁর কর্মরীতিকে অপছন্দ করার পর্যায়ে কোনো মুমিনই যেতে পারেন না। আনাস
বিন মালেক (রা.) বলেন:
جَاءَ ثَلَاثَةُ رَهْطٍ إِلَى بُيُوتِ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ ﷺ يَسْأَلُونَ عَنْ عِبَادَةِ النَّبِيِّ ﷺ فَلَمَّا أُخْبِرُوا كَأَنَّهُمْ تَقَالُوهَا فَقَالُوا وَأَيْنَ نَحْنُ مِنَ النَّبِيِّ ﷺ قَدْ غَفَرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ . قَالَ أَحَدُهُمْ أَمَّا أَنَا فَإِنِّي أُصَلِّي اللَّيْلَ أَبَدًا. وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَصُومُ الدَّهْرَ وَلَا أُقْطِرُ. وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلَا أَتَزَوَّجُ أَبَدًا فَجَاءَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِلَيْهِمْ فَقَالَ : أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا؟ أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي".
"তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ-এর স্ত্রীগণের নিকট যেয়ে তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তাঁরা তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জানালেন। মনে হলো এই প্রশ্নকারী সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ-এর ইবাদত কিছুটা কম ভাবলেন। তাঁরা বললেন: রাসূলুল্লাহ -এর সাথে কি আমাদের তুলনা হতে পারে? আল্লাহ তাঁর পূর্ববর্তী ও পবরর্তী সকল গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন (তাঁর কোনো গোনাহ নেই, আর আমরা গোনাহগার উম্মত, আমাদের উচিৎ তাঁর চেয়েও বেশি ইবাদত করা)। তখন তাদের একজন বললেন: আমি সর্বদা সারা রাত জেগে (রাতের বা তাহাজ্জুদের) সালাত আদায় করব। অন্যজন বললেন: আমি সর্বদা সিয়াম পালন করব, কখনই রোযা ভাঙ্গব না। অন্যজন বললেন: আমি কখনো বিবাহ করব না, আজীবন নারী সংসর্গ পরিত্যাগ করব। রাসূলুল্লাহ এদের কথা জানতে পেরে এদেরকে বলেন: তোমরা কি এ ধরনের কথা বলেছ? তোমরা জেনে রাখ! আমি তোমাদের সকলের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি, তাকওয়ার দিক থেকে আমি তোমাদের সবার উপরে অবস্থান করি। তা সত্ত্বেও আমি মাঝেমাঝে (নফল) সিয়াম পালন করি, আবার মাঝেমাঝে সিয়াম পরিত্যাগ করি। রাতে কিছু সময় তাহাজ্জুদ আদায় করি এবং কিছু সময় ঘুমাই। আমি বিবাহ করেছি- স্ত্রীদেরকে সময় প্রদান করি। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত অপছন্দ করল তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।"
এখানে এ সকল সাহাবী মূলত রাসূলুল্লাহ-এর রীতিকে অপছন্দ করেন নি। তাঁরা তাঁর রীতি জেনেছিলেন এবং মেনেও নিয়েছিলেন, তবে তাঁদের নিজেদের জন্য অতিরিক্ত কিছু নেক আমলের জন্য তাঁর সুন্নাতের ব্যতিক্রম কিছু পদ্ধতির কথা চিন্তা করেছিলেন। আমরা জানি, সারারাত তাহাজ্জুদ আদায় করা নিষিদ্ধ নয়। হারাম দিবসগুলি বাদ দিয়ে সারা মাস সিয়াম পালনও নিষিদ্ধ নয়। অনুরূপভাবে কোনো পুরুষের প্রয়োজন না থাকলে বা অসুবিধা থাকলে অবিবাহিত থাকাও সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তাঁদেরকে নিষেধ করেছেন। কারণ আল্লাহর নৈকট্য, বেলায়াত, সন্তুষ্টি বা সাওয়াবের জন্য রাসূলুল্লাহ-এর রীতির বাইরে বা অতিরিক্ত কোনো রীতির অনুসরণ করা মানুষের মনে এ ধারণা সৃষ্টি করতে পারে যে, কেবলমাত্র সুন্নাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে কর্ম করলে বোধহয় প্রয়োজনীয় বেলায়াত, সন্তুষ্টি বা সাওয়াব অর্জন করা সম্ভব হবে না। অবিকল সুন্নাত অনুসরণকারীর চেয়ে অতিরিক্ত বা ব্যতিক্রম রীতিটি তার কাছে উত্তম মনে হতে পারে। মনে হতে পারে তাহাজ্জুদ খুবই ভাল ইবাদত, কাজেই রাতে কিছু সময় ঘুমিয়ে নষ্ট করার চেয়ে সারারাত এই মহান ইবাদতে মাশগুল থাকাই উত্তম। রাতের অনেকখানি সময় ঘুমিয়ে নষ্ট করে কি লাভ? ইত্যাদি। আর একেই রাসূলুল্লাহ 'তাঁর সুন্নাতকে অপছন্দ করা' বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) বলেন:
لَمَّا كَانَ مِنْ أَمْرٍ عُثْمَانَ بْن مَظْعُونِ الَّذِي كَانَ مِنْ تَرْكِ النِّسَاءِ بَعَثَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَقَالَ يَا عُثْمَانُ إِنِّي لَمْ أُومَرْ بِالرَّهْبَانِيَّةِ أَرَغِبْتَ عَنْ سُنَّتِي قَالَ لَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ إِنَّ مِنْ سُنَتِي أَنْ أُصَلِّيَ وَأَنَامَ وَأَصُومَ وَأُطْعَمَ وَأَنكِحَ وَأُطَلَقَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَتِي فَلَيْسَ مِنِّي. "যখন উসমান বিন মাযউন (রা) দাম্পত্য জীবন বা স্ত্রী সংসর্গ পরিত্যাগের চিন্তা করেন তখন রাসূলুল্লাহ তাঁকে ডেকে পাঠান এবং বলেন: উসমান, আমাকে বৈরাগ্যের নির্দেশ দেওয়া হয়নি, তুমি কি আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করছ? তিনি বলেন: না, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আপনার সুন্নাতকে অপছন্দ করছি না। রাসূলে আকরাম (ﷺ) বলেন: আমার সুন্নাতের মধ্যে রয়েছে যে, আমি রাতে তাহাজ্জুদ পড়ি আবার ঘুমাই, কখনো (নফল) সিয়াম পালন করি, কখনো করি না, বিবাহ করি, আবার বিবাহ বিচ্ছেদও করি। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করবে তার সাথে আমার সম্পর্ক নেই।"
এ অর্থে অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা) বলেন, আমার আব্বা আমাকে বিবাহ দেন, কিন্তু ইবাদতের আগ্রহের কারণে আমি রাতদিন নামায রোযায় ব্যস্ত থাকতাম এবং আমার স্ত্রীর কাছে যেতাম না। তখন আমার আব্বা আমাকে অনেক রাগ করেন এবং রাসূলুল্লাহ-এর কাছে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করেন। আব্দুল্লাহ (রা) বলেন:
فَأَرْسَلَ إِلَيَّ النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ لِي أَتَصُومُ النَّهَارَ قُلْتُ نَعَمْ قَالَ وَتَقُومُ اللَّيْلَ قُلْتُ نَعَمْ قَالَ لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَنَامُ وَأَمَسُّ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي ... ثُمَّ قَالَ فَإِنَّ لِكُلِّ عَابِدٍ شَرَّةً وَلِكُلِّ شَرَّةٍ فَتْرَةً فَإِمَّا إِلَى سُنَّةٍ وَإِمَّا إِلَى بِدْعَةٍ فَمَنْ كَانَتْ فَتْرَتُهُ إِلَى سُنَّةٍ فَقَدِ اهْتَدَى وَمَنْ كَانَتْ فِتْرَتُهُ إِلَى غَيْرِ ذَلِكَ فَقَدْ هَلَكَ. "রাসূলুল্লাহ আমাকে ডেকে নিয়ে বলেন: তুমি কি প্রতিদিন সিয়াম পালন কর? আমি বললাম: হাঁ। তিনি বলেন: তুমি কি সারা রাত জেগে সালাত আদায় কর? আমি বললাম: হাঁ। তিনি বললেন: কিন্তু আমি তো সিয়াম পালন করি, আবার মাঝে মাঝে বাদ
দিই, রাতে সালাত আদায় করি, আবার ঘুমাই, স্ত্রীদেরকে সময় প্রদান করি। আর যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করল আমার সাথে তার সম্পর্ক থাকবে না।... এরপর তিনি বলেন: প্রত্যেক আবেদের কর্মের উদ্দীপনার জোয়ার ভাটা আছে। ইবাদতের উদ্দীপনা কখনো তীব্র হয় আবার এই তীব্রতা এক সময় থেমে যায়, কখনো সুন্নাতের দিকে, কখনো বিদ'আতের দিকে। যার স্থিতি- প্রশান্তি সুন্নাতের প্রতি হবে সে হেদায়েত প্রাপ্ত হবে। আর যার স্থিতি-প্রশান্তি অন্য কিছুর দিকে হবে সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।"
এখানে প্রশ্ন হলো, উপরের হাদীসগুলিতে সুন্নাতের ব্যতিক্রম করাকে রাসূলুল্লাহ 'সুন্নাত অবহেলা করা' বা 'সুন্নাত অপছন্দ করা' বলে আখ্যায়িত করলেন কেন? আমরা সুনিশ্চিত যে, উপরের হাদীসগুলিতে উল্লেখিত সাহাবীগণ কখনোই রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাত বা রীতিকে অপছন্দ করেন নি। তাঁরা এমন কিছু করতে ইচ্ছা করেন নি যা ইসলামের নিষিদ্ধ। বরং তাঁরা কিছু নেক আমল রাসূলুল্লাহ-এর রীতির অতিরিক্ত বা ব্যতিক্রম পদ্ধতিতে পালন করতে আগ্রহ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও কেন বারংবার রাসূলুল্লাহ এরূপ করাকে 'তাঁর সুন্নাত অপছন্দ করা' বলে আখ্যায়িত করলেন এবং বললেন যে, যে তাঁর সুন্নাতকে অপছন্দ করবে সে তাঁর উম্মাত নয় বা তাঁর সাথে সম্পর্কিত নয়?
বিষয়টি অনুধাবন করা অতীব প্রয়োজন। সুন্নাত, খেলাফে সুন্নাত ও বিদ'আত সম্পর্কে আমি 'এহইয়াউস সুনান' গ্রন্থে বিস্ত ারিত আলোচনা করেছি। এ ছাড়া ষষ্ঠ অধ্যায়ে মুসলিম উম্মাহর ফিরকাসমূহ, বিদ'আতী আকীদা ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের পরিচয় প্রসঙ্গে সুন্নাত বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশা আল্লাহ। এখানে সুন্নাতের ব্যতিক্রমে ঈমানের বিচ্যুতি প্রসঙ্গে সংক্ষেপে নিম্নের কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজনীয় বলে মনে করছি:
(১) উপরের হাদীসগুলি থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, রাসূলুল্লাহ যে কাজ যতটুকু যেভাবে করেছেন তা ততটুকু ও সেভাবে করাই সুন্নাত এবং তিনি যা করেন নি বা বর্জন করেছেন তা বর্জন করাই সুন্নাত।
(২) তাঁর সুন্নাতের ব্যতিক্রম কর্ম বা পদ্ধতি ইসলামের অন্যান্য দলীলের আলোকে জায়েয বা বৈধ হতে পারে, বিশেষ কোনো কারণে জরুরীও হতে পারে, তবে তা কখনোই দীনের অংশ হতে পারে না। তাঁর পদ্ধতির ব্যতিক্রম, খেলাফ বা অতিরিক্ত কোনো কর্ম, রীতি বা পদ্ধতিকে দীনের অংশ বলে মনে করা বা তা পালন না করলে দীন, বেলায়াত, ভক্তি, সাওয়াব বা আখিরাতের মর্যাদা সামান্য পরিমাণ ব্যাহত হবে বলে ধারণা করার অর্থ রাসূলুল্লাহ-এর পদ্ধতি দীনের জন্য যথেষ্ট নয় বলে বিশ্বাস করা। এরই অর্থ সুন্নাত অপছন্দ করা। এরূপ বিশ্বাস পোষণ কারী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর রিসালাতের পূর্ণতায় বিশ্বাসী নয়। ফলে সে আর তাঁর সাথে সম্পর্কিত থাকতে পারে না।
(৩) তাহাজ্জুদের সালাত কুরআন ও হাদীসের আলোকে অত্যন্ত ফযীলতের ইবাদত। এ সকল সাধারণ দলীলের আলোকে বেশি বেশি তাহাজ্জুদ আদায় বা সারারাত তাহাজ্জুদ আদায় নিষিদ্ধ নয়। কোনো আবিদ যদি ইবাদতের উদ্দীপনায় তা কখনো করেন তবে তা ক্ষতিকর নয়। তবে তার কর্মের স্থিতি ও নিয়মিত অবস্থান যদি রাসূলুল্লাহ-এর রীতির ব্যতিক্রম হয় তবে তা ক্ষতিকর। কারণ এ পর্যায়ে তিনি 'সারারাত' তাহাজ্জুদ আয়ায়কে রাতের কিছু অংশ ঘুমানোর চেয়ে অধিক ফযীলত বলে মনে করবেনই এবং বিভিন্ন দলিল দিয়ে নিজের এরূপ কর্মকে রাতে কিছু সময় ঘুমিয়ে বাকি সময় তাহাজ্জুদ আদায়ের চেয়ে অধিক উত্তম বলে প্রমাণ করতে সচেষ্ট থাকবেন। সর্বোপরি যে ব্যক্তি সারারাত তাহাজ্জুদ আদায় না করে রাতে কিছু সময় ঘুমিয়ে কাটান তার প্রতি তিনি কিছুটা হলেও কষ্ট বোধ করবেন এবং তাঁর বেলায়াত, সাওয়াব বা কামালাত কিছুটা হলেও অপূর্ণ বলে অনুভব করবেন। তার কাছে মনে হবে, এভাবে কিছু সময় ঘুমিনে নষ্ট না করে একটু কষ্ট করে সারারাত তাহাজ্জুদ আদায় করলে আরো বেশি কামালাত তিনি অর্জন করতেন! এভাবে জেনে অথবা না জেনে তিনি রাসূলুল্লাহ-এর আমল ও রীতিকে 'অপূর্ণ' বলে মনে করলেন!! আর এই হলো সুন্নাত অপছন্দ করা।
(৪) সুন্নাতের ব্যতিক্রম নেক কর্ম বা নেক কর্মের বা রীতির উন্মেষ, উৎপত্তি ও বিকাশ সাধারণত 'সুন্নাত অবহেলা করা' বা সুন্নাত অপছন্দ করা'-র কারণে হয় না, বরং ইসলাম নির্দেশিত ও সুন্নাত সম্মত নেক আমল বেশি করে পালনের জন্য এবং বেশি করে আল্লাহর পুরস্কার ও বরকত লাভের জন্যই তা হয়ে থাকে। কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে, সকল খেলাফে সুন্নাতই 'সুন্নাত অপছন্দ করার' পর্যায়ে চলে যায়। এখানে একটি মাত্র উদাহরণ উল্লেখ করছি।
(৫) ঈদে মীলাদুন্নবী ও মীলাদ মাহফিল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি 'এহইয়াউস সুনান' গ্রন্থে। আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ-এর জন্মে আনন্দিত হওয়া, তাঁর জন্ম, জীবনী ও সীরাত-শামাইল আলোচনা করা বা তাঁর উপর দরুদ-সালাম পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত সম্মত ইবাদত। তবে এ সকল ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে সাহাবীগণ, তাবিয়ীগণ ও পরবর্তী কয়েক শতকের মুসলিমগণের পদ্ধতি ছিল সাধারণ। মীলাদে নববীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুন্নাত পদ্ধতি ছিল সোমবার সিয়াম পালন করা। আর তাঁর জন্ম জীবনী আলোচনার ক্ষেত্রে যে যখন যেভাবে পেরেছেন তাঁর জন্ম, জীবনী, সীরাত, শামাইল ইত্যাদি আলোচনা করেছেন। ৭ম হিজরী শতাব্দী থেকে বাৎসরিক ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনের পদ্ধতি চালু হয়। কয়েক শতাব্দী পরে মীলাদ মাহফিলের প্রচলন ঘটে।
(৬) মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ একমত যে, ঈদে মীলাদুন্নবী ও মীলাদ মাহফিল 'বিদ'আত' বা নব-উদ্ভাবিত কর্ম। তাঁদের কেউ তা বিদ'আতে হাসানা এবং কেউ তা বিদ'আতে সাইয়েয়াহ বলে গণ্য করেছেন। যারা তা বিদ'আতে সাইয়েয়াহ বলেছেন তারা রাসূলুল্লাহ-এর জন্মে আনন্দ প্রকাশ, জন্ম, জীবনী, সীরাত-শামাইল আলোচনা ও দরুদ-সালাম পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে কোনোরূপ দ্বিমত পোষণ করেন নি। বরং তারা এ সকল ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে সুন্নাত পদ্ধতি অনুসরণের তাকিদ দিয়েছেন। যারা একে বিদ'আতে হাসানা বলেছেন তারাও এ সকল ইবাদত পালনের জন্য এ পদ্ধতিকে জরুরী বলে গণ্য করেন নি, বরং এ পদ্ধতিকে তারা জায়েয বা বৈধ বলে গণ্য করেছেন।
(৭) কিন্তু প্রকৃত অবস্থা এই যে, যারা ঈদে মীলাদুন্নবী বা মীলাদ মাহফিল পালন করেন তারা বিশেষ পদ্ধতিকে দীনের অবিচ্ছেদ্য
অংশ বলে গণ্য করেন। এখন যদি কোনো ব্যক্তি অবিকল সুন্নাত পদ্ধতিতে বা সাহাবীগণের মত গাম্ভীর্যের সাথে দরূদ-সালাম পাঠ করেন এবং রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর জন্য জীবনী ও সীরাত-শামাইল আলোচনা করেন, কিন্তু তাঁদের নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ঈদে মীলাদুন্নবী বা মীলাদ মাহফিল পালন না করেন তবে তারা কখনোই তাঁকে কামিল মুমিন মনে করবেন না। তাদের মধ্যে কেউ মনে করেন লোকটা ভাল, তবে আমাদের মত মীলাদ করলে আরো ভালো হতো। আর কেউ হয়ত বলবেন, যত কিছুই কর না কেন, মীলাদ পালন না করে জান্নাতে যেতে পারবে না। জেনে অথবা না জেনে তিনি ‘শুদ্ধ মীলাদুন্নবী’ বা মীলাদ মাহফিলকেই রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর জন্যে আনন্দ প্রকাশের একমাত্র পথ বলে গণ্য করছেন।
(৮) ভালো করে লক্ষণীয় যে, যে ব্যক্তি এরূপ সুন্নাতের ব্যতিক্রম, খিলাফে সুন্নাত বা ‘বিদ'আত’ পদ্ধতির অনুসারী তাঁর মধ্যে এরূপ কর্ম বা পদ্ধতির মুহাব্বত বা ভালবাসা সাধারণত সুন্নাতের ভালবাসার চেয়ে অনেক গভীর ও সুদৃঢ় হয়। যিনি মীলাদ মাহফিল বা ঈদ মীলাদুন্নবী পালন করেন তিনি প্রতি সোমবারে সিয়াম পালন করে অথবা সাহাবীগণের পদ্ধতিতে সীরাত-শামাইল আলোচনা করে তত তৃপ্তি, হাল বা ‘ফায়েয’ লাভ করবেন না যতটা তৃপ্তি, হাল বা ফায়েয তিনি লাভ করবেন আনুষ্ঠানিক মীলাদ পালন করে। এভাবে তাঁর মনের গভীরে এ বিশ্বাস দৃঢ় হতে থাকে যে, হুবহু সুন্নাত পদ্ধতিতে এ সকল ইবাদত পালনে পূর্ণ লাভ সম্ভব নয়।
(৯) খেলাফে সুন্নাতের প্রতি অস্বাভাবিক ভালবাসার একটি বিশেষ দিক এই যে, এরূপ কর্মই মুসলিম উম্মাহর দলাদলি ও বিভক্তির অন্যতম কারণ। যতদিন মীলাদের উদ্ভাবন হয় নি, রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর জন্মের নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং আনন্দ প্রকাশের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোনো বিভক্তি সৃষ্টি হয় নি। বিষয়টি ছিল উন্মুক্ত। যে যখন যেভাবে পেরেছেন তা পালন করেছেন। ঈদে মীলাদুন্নবী এবং মীলাদ মাহফিলের উদ্ভাবনের পরে অনেক আলিমই এ বিষয়ক বিতর্ক হাক্ক বা সমঝোতার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিভক্তি রোধ করা যায় নি। সাধারণভাবে মীলাদের পক্ষের ব্যক্তি ‘সুন্নাহ’ ও ‘বেদাতের’ মাপকাঠি হিসেবে ইসলামকে সম্পূর্ণ ফরোয়াযি ও সুন্নাত ইবাদত পূর্ণভাবে পালন করেন কিন্তু মীলাদ না করেন তবে তিনি তাঁকে নিজের দলের বলে মনে করেন না। পক্ষান্তরে যদি কোনো ব্যক্তি আরকানুল ইসলাম সম্পূর্ণ সরোষ, ওয়াজিব ও সুন্নাত ইবাদতে অবহেলা করেন, কিন্তু মীলাদ পালনের পক্ষে থাকেন তবে তিনি তাঁকে নিজের দলের মানুষ বলেই মনে করেন।
(১০) এভাবে জেনে রাখুন যে, মীলাদ তিনি মনে করছেন যে, রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর জন্য আনন্দ প্রকাশের জন্য, তাঁর জন্য ও জীবনী আলোচনার জন্য দরূদ-সালাম পাঠের জন্য রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর নিজের শেখানো ও তাঁর সাহাবীগণের আচরণের পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। বরং সুন্নাত পদ্ধতি অপূর্ণ বা অচল, নতুন পদ্ধতিতে তা পালন না করা পর্যন্ত মুমিন তাঁর কামালাত, বেলায়াতে বা সাওয়াবের পূর্ণতা লাভ করতে পারেন না। আর এ-ই হলো ‘সুন্নাত অপছন্দ করা’।
(১১) এভাবে ধীরে ধীরে যে বিষয়ে সুন্নাতের ব্যতিক্রম নেইক আমল বা নেক আমলের পদ্ধতি চালু হয়েছে সেখানেও তাই করতে করতে সুন্নাত অপছন্দ করার পর্যায়ে চলে গিয়েছে।
(১২) এভাবে আমরা দেখছি যে, যত ভাল নিয়্যাতে সুন্নাতের ব্যতিক্রম নেইক কর্ম করা হোক সেই কর্ম করাও সুন্নাত অপছন্দ করার পর্যায়ে চলে যায়। আর বাহ্যত এজন্যেই রাসূলাল্লাহ ﷺ তাঁর সুন্নাতের অতিরিক্ত বা ব্যতিক্রম নেইক কর্ম করতে আপত্তি করেছেন। যদিও আপত্তি করেছেন তাঁর চেয়ে বেশি আপত্তি করেছেন সুন্নাতের অতিরিক্ত বা ব্যতিক্রম পদ্ধতিতে নেক কর্ম করতে উৎসাহ দিয়েছেন, কিন্তু খতম দেন নি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তাঁর পদ্ধতির ব্যতিক্রমভাবে তাহাজ্জুদ আদায় করতে ইচ্ছা করেছেন তাঁকে খতম দিয়েছেন। কারণ সাধারণভাবে প্রথম ব্যক্তির ক্ষেত্রে সুন্নাত অপছন্দ করার পর্যায়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, অথচ এরূপ সম্ভাবনা দ্বিতীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রে খুবই প্রবল। বাহ্যত এজন্যেই কুরআন কারীমে রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর মুখালাফাত বা ব্যতিক্রম করতে এবং অবাধ্য হওয়া কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
এজন্যে মুহাম্মাদ ﷺ-এর রিসালাতে বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিশ্বাস করেন যে, মুহাম্মাদ ﷺ-এর কর্মের, রীতির ও আদর্শের অতিরিক্ত, ব্যতিক্রম বা বিরোধী কোনো কর্ম, রীতি বা আদর্শ আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর আদর্শই পরিপূর্ণ। আল্লাহর নৈকট্য, কামালাত, তাকওয়া, বেলায়েত, সাওয়াব যা জানাতে লাভের জন্য সুন্নাতের অতিরিক্ত কোনো কিছু করার প্রয়োজন নেই। আর রিসালাতের পূর্ণতা অবিশ্বাস করা। মুমিন হয়তো কোনো কারণে কোনো সুন্নাত পালনে অক্ষম হজরে সুন্নাতের ব্যতিক্রম কর্ম করতে পারেন, তবে সুন্নাতের ব্যতিক্রমকে তিনি কখনোই সুন্নাতের চেয়ে উত্তম, সুন্নাতের সমতুল্য, দ্বীন, সাওয়াব বা বেলায়েতের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করতে পারেন না। মুমিন কখনোই বিশ্বাস করতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যা করেন নি তা না করলে তাঁর দীনের কোনো ক্ষতি হবে বা অপূর্ণ থাকবে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাঁর ভালবাসা

📄 তাঁর ভালবাসা


(মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) -এ বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এ বিশ্বাস পোষণকারী অবশ্যই রাসূলাল্লাহ ﷺ-কে সকল মানুষের ঊর্ধ্বে ভালবাসবেন। আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
فَوَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ "যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, তোমাদের কেউ ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে আমাকে তার পিতা ও সন্তান থেকে বেশি ভালবাসবে।"
অন্য হাদীসে আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ "তোমাদের কেউ ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে আমাকে তার পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে বেশি ভালবাসবে।"
অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ বিন হিশাম (রা) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ-এর কাছে বসে ছিলাম। তিনি তখন উমারের (রা) হাত ধরে ছিলেন। উমর বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমার কাছে আমার নিজের জীবন ছাড়া দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়। তখন তিনি বলেন:
لَا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ فَقَالَ لَهُ عُمَرُ فَإِنَّهُ الْآنَ وَاللَّهِ لأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ نَفْسِي فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: الْآنَ يَا عُمَرُ "হলো না উমার, যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর কসম, অবশ্যই আমাকে তোমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসতে হবে। তখন উমার (রা) বলেন: আল্লাহর কসম, আপনি এখন আমার কাছে আমার জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন, হাঁ, উমর, এখন (তোমার ঈমান পূর্ণতা পেল)।"
এখানে বুঝতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ভালবাসা কোনো মুখের দাবির ব্যাপার নয়। তার নির্দেশিত পথে চলা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলা, তার শরীয়াতকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পালন করা, তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকাই হলো তার মহব্বতের প্রকাশ। যে যত বেশী তার শরীয়তকে মেনে চলবেন এবং তার সুন্নাত মত জীবন যাপন করবেন, তার ভালবাসা তত বেশী গভীর হবে। সাহাবীগণ, তাবিয়ীগ, ইমামগণ কর্ম ও অনুসরণের মাধ্যমেই তাকে ভালবেসেছেন।
তাই রাসূলুল্লাহ-কে ভালবাসার অর্থ হলো তাঁর উপর ঈমান আনা, তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, সকল নবীর নেতা, সর্বশেষ নবী ও রাসূল বলে বিশ্বাস করা, তাঁর সকল আদেশ নিষেধ মেনে চলা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অনুসরণ করা এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে তাঁকে সম্মান দান করা, তাঁর জন্য বেশি বেশি সালাত ও সালাম পাঠ করা, তাঁর জীবনী, শিক্ষা, আদেশ-নিষেধ ভালোভাবে জানার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকা। এভাবেই মুসলিমের অন্তরে তাঁর প্রতি ভালবাসা গভীর হতে থাকে, তখন জীবনের সবকিছুর ঊর্ধ্বে, সকল মানুষের ঊর্ধ্বে, এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও তাঁকে ভালবাসতে সক্ষম হয় একজন মুসলিম। আমরা আল্লাহর দরবারে সকাতরে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ-এর প্রকৃত অনুসরণের ও প্রকৃত ভালবাসার তাওফীক দান করেন। আমীন!

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাঁর মর্যাদা ও সম্মান

📄 তাঁর মর্যাদা ও সম্মান


রিসালাতের সাক্ষের অবিচ্ছেদ্য অংশ মুহাম্মাদ ﷺ-কে সম্মান করা। তিনি সর্ব কালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, মানবজাতির নেতা, নবী-রাসূলদের প্রধান। তিনি আল্লাহর প্রিয়তম বান্দা, তাঁর হাবীব, তাঁর সবচেয়ে সম্মানিত বান্দা, সর্বযুগের সকল মানুষের নেতা। অন্যান্য নবী-রাসূলের সাধারণ মর্যাদা সবই তিনি লাভ করেছেন। তিনি নিষ্পাপ, মনোনীত ও সকল কলুষতা থেকে মুক্ত ছিলেন। নবুয়ত প্রাপ্তির আগে ও নবুয়তের পরে সর্ব অবস্থায় আল্লাহ তাকে সকল পাপ, অন্যায় ও কালিমা থেকে রক্ষা করেছেন। এছাড়াও আল্লাহ তাঁকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াতে তাঁর মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর প্রতি আল্লাহর অপার অনুগ্রহের বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
وَلَوْلا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ وَرَحْمَتُهُ لَهَمَّتْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ أَنْ يُضِلُّوكَ وَمَا يُضِلُّونَ إِلا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَضُرُّونَكَ مِنْ شَيْءٍ
وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا. "তোমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তাদের একদল তোমাকে পথভ্রষ্ট করতে চাইত; কিন্তু তারা নিজেদেরকে ছাড়া আর কাউকে পথভ্রষ্ট করে না, এবং তোমার কোনোই ক্ষতি করতে পারে না। আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব এবং হিকমাত অবতীর্ণ করেছেন এবং তুমি যা জানতে না তা তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন, তোমার প্রতি আল্লাহর মহা-অনুগ্রহ রয়েছে।" অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَئِنْ شِئْنَا لَنَذْهَبَنَّ بِالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ ثُمَّ لَا تَجِدُ لَكَ بِهِ عَلَيْنَا وَكِيلًا إِلَّا رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ إِنَّ فَضْلَهُ كَانَ عَلَيْكَ كَبِيرًا "ওহীর মাধ্যমে আমি তোমার প্রতি যা নাযিল করেছি তা আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যাহার করে নিতে পারতাম, সে অবস্থায় তুমি আমার বিরুদ্ধে কোনো সাহায্যকারী বা কর্মবিধায়ক পেতে না। কিন্তু তোমার প্রতিপালকের দয়া; নিশ্চয় তোমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ মহান।"
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ "আমি তো তোমাকে রাসূল বানিয়েছি কেবল বিশ্ব জগতের জন্য রহমত-রূপে।" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ وَوَضَعْنَا عَنْكَ وِزْرَكَ الَّذِي أَنْقَضَ ظَهْرَكَ وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ "আমি কি তোমার বক্ষ তোমার কল্যাণে প্রশস্ত করে দেই নি? আমি অপসারণ করেছি তোমার ভার, যা ছিল তোমার জন্য অতিশয় কষ্টদায়ক। এবং আমি তোমার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছি।" তাঁর মর্যাদা বর্ণনা করে আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا "হে নবী, আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি, সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে তার দিকে আহবানকারীরূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।"
তাঁকে সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا "নিশ্চয় আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। যেন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং তাঁকে (রাসূলকে) সাহায্যকর এবং সম্মান কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর (আল্লাহর) পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।"
সকল মানুষের ঊর্ধ্বে তাঁর সম্মান। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ "মুমিনদের নিকট নবী তাদের নিজেদের চেয়েও ঘনিষ্টতর এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা। আল্লাহর বিধান অনুসারে মুমিনগণ ও মুহাজিরগণ অপেক্ষা যারা আত্মীয় তারা পরস্পরের ঘনিষ্টতর।"
এভাবে আল্লাহ সকলের ঊধের্ব তাঁকে সম্মান দান করেছেন এবং কোনো ভাবে তাঁকে কষ্ট দান করা বা তার মনোকষ্টের কারণ হওয়া মুসলিমের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন। তাঁর বিশেষ মর্যদার অংশ হিসাবে তার মৃত্যুর পরে তার স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ করেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلا أَنْ تَنْكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِنْ بَعْدِهِ أَبَدًا إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمًا "তোমাদের জন্য সংগত নয় যে, তোমরা আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দিবে অথবা তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর পত্নীদিগকে বিবাহ করবে। আল্লাহর নিকট তা ঘোরতর অপরাধ।"
অন্যান্য সকল মানুষের থেকে পৃথকভাবে সম্মানের সাথে তাঁকে ডাকতে হবে এবং তাঁর ডাকে সাড়া দিতে হবে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন:
لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا "রাসূলের আহবানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহবানের মত গণ্য করো না।" তাঁর সাথে আদব রক্ষার বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ إِنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ أُولَئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَى لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ "হে মুমিনগণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে কোনো বিষয়ে অগ্রসর হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে মুমিনগণ, তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর তোমাদের নিজেদের কন্ঠস্বর উঁচু করো না এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যে যেভাবে জোরে কথা বল সেরূপ জোরে বা সশব্দে তাঁর সাথে কথা বলো না; কারণ এতে তোমাদের কর্ম বিনষ্ট ও নিষ্ফল হয়ে যাবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে। যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে নিজেদের কন্ঠস্বর নীচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরিশোধিত করেছেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহা-পুরস্কার।"
পাঠক, চিন্তা করুন! কত বড় সাবধানতার প্রয়োজন! কোনোভাবেই রাসূলুল্লাহ-এর সামনে অগ্রণী হওয়া যাবে না। তাঁর কথার উপরে কথা বলা যাবে না। নিজেদের মতামত, যুক্তি, কর্ম, পছন্দ ইত্যাদি দিয়ে তাঁর আগে যাওয়া যাবে না। বরং মতামতে, কর্মে, ইবাদতে, দাওয়াতে, পছন্দে-অপছন্দে সকল বিষয়ে তাঁর পিছে থাকতে হবে এবং তাঁকে অনুসরণ করতে হবে। তাঁর সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করা যাবে না। তাঁর মত, কর্ম, রীতি, নির্দেশ কোনো কিছু মুমিনের নিকট পৌঁছালে মুমিন আর তার সামনে নিজের মতামত বা পছন্দ বিকল্প হিসেবে দাঁড় করান না। বরং নিজের মত ও পছন্দকে নীচু করে তাঁর মতকে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করেন। এ-ই ঈমানের দাবি। এ-ই আল্লাহর নির্দেশ। না হলে আমাদের বড় বড় কথা, মহা মহা কর্ম আমাদের অজান্তে-অজ্ঞাতে নিষ্ফল হয়ে যাবে! কী করুণ পরিণতি!
বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ তাঁর মর্যাদার কথা উম্মাতকে জানিয়েছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। নিজের অহংকার প্রকাশের জন্য নয়, উম্মাতকে তাদের বিশ্বাসের ও কর্মের দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্যই তিনি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি তাদেরকে জানিয়েছেন। ইতোপূর্বে আমরা এ অর্থে কয়েকটি হাদীস দেখেছি। আমরা দেখেছি যে, মহান আল্লাহ বিভিন্ন দিক থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে অন্যান্য সকল নবী-রাসূল থেকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। এ বিষয়ক আরো কয়েকটি হাদীস আমরা এখানে আলোচনা করব। আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
أَنَا أَوَّلُ النَّاسِ خُرُوجًا إِذَا بُعِثُوا وَأَنَا خَطِيبُهُمْ إِذَا وَقَدُوا وَأَنَا مُبَشِّرُهُمْ إِذَا أَيِسُوا لِوَاءُ الْحَمْدِ يَوْمَئِذٍ بِيَدِي وَأَنَا أَكْرَمُ وَلَدِ آدَمَ عَلَى رَبِّي وَلَا فَخَرَ "মানুষ যখন কিয়ামতের সময় পুনরুত্থিত হবে তখন আমিই সর্বপ্রথম বের হব, মানুষেরা যখন হাজিরা দেবে তখন আমিই তাদের পক্ষ থেকে বক্তব্য প্রদান করব, যখন তারা নিরাশ হয়ে যাবে তখন আমিই তাদের সুসংবাদ প্রদান করব এবং সেদিন আমার হাতেই থাকবে প্রশংসার ঝাণ্ডা। আদম সন্তানদের মধ্যে আমার প্রতিপালকে কাছে আমিই সবচেয়ে সম্মানিত, আর এতে কোনো অহংকার নেই।"
আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعِ وَأَوَّلُ مُشَفَّع "কিয়ামদের দিন আমি আদম সন্তানদের নেতা, কবর ফুড়ে আমিই প্রথম পুনরুত্থিত হব, আমিই প্রথম শাফা'আতকারী এবং আমার শাফা'আতই প্রথম গ্রহণ করা হবে।" আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا فَخْرَ وَبِيَدِي لِوَاءُ الْحَمْدِ وَلَا فَخْرَ وَمَا مِنْ نَبِيٍّ يَوْمَئِذٍ آدَمَ فَمَنْ سِوَاهُ إِلَّا تَحْتَ لِوَائِي وَأَنَا أَوَّلُ مَنْ تَنْشَقُّ عَنْهُ الْأَرْضُ وَلَا فَخْرَ "কিয়ামতের দিন আমি আদম সন্তানদের নেতা, তবে এতে কোনো অহংকার নেই। আমার হাতেই প্রশংসার ঝাণ্ডা থাকবে, তবে এতে কোনো অহংকার নেই। আদম থেকে শুরু করে যত নবী আছেন তারা সবাই আমার ঝাণ্ডার নীচে সমবেত হবেন। আমিই প্রথম মাটি ফুড়ে পুনরুত্থিত হব, তবে এতে কোনো অহংকার নেই। তাঁর মর্যাদা সুপ্রাচীন। প্রথম মানব আদম (আ)-এর সৃষ্টির সময়েই আল্লাহ তার জন্য নুবুওয়াত ও খাতিমুন্নাবিয়ীনের মর্যাদা সংরক্ষিত করেছেন। আবু হুরায়রা বলেন:
قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ مَتَى وَجَبَتْ لَكَ النُّبُوَّةُ قَالَ وَآدَمُ بَيْنَ الرُّوحِ وَالْجَسَدِ "সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রাসূল, কখন আপনার জন্য নবুয়ত নির্ধরিত হয়েছে? তিনি বললেন: যখন আদম দেহ ও আত্মার মধ্যে ছিলেন।" ইরবাদ ইবনু সারিয়া (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ فِي أُمِّ الْكِتَابِ لَخَاتَمُ النَّبِيِّينَ وَإِنَّ آدَمَ لَمُنْجَدِلٌ فِي طِينَتِهِ وَسَأُنَبِّئُكُمْ بِتَأْوِيلِ ذَلِكَ بِأَوَّلِ ذَلِكَ) دَعْوَةِ أَبِي إِبْرَاهِيمَ وَبِشَارَةٍ عِيسَى قَوْمَهُ وَرُؤْيَا أُمِّي الَّتِي رَأَتْ أَنَّهُ خَرَجَ مِنْهَا نُورٌ أَضَاءَتْ لَهُ قُصُورُ الشَّامِ وَكَذَلِكَ تَرَى أُمَّهَاتُ النَّبِيِّينَ، صَلَوَاتِ اللَّهِ عَلَيْهِمْ. "আদম যখন তাঁর কাদার মধ্যে ভূলুণ্ঠিত ছিলেন তখনই আমি আল্লাহর নিকট লাওহে মাহফুযের মধ্যে সর্বশেষ নবী ছিলাম। আমি তোমাদেরকে আমার প্রথম শুরুর কথা বলব: আমার পিতা ইব্রাহীমের (আ) দু'আ, ঈসার (আ) জাতিকে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী এবং আমার আম্মার স্বপ্ন; তিনি দেখতে পান যে তাঁর ভিতর থেকে একটি নূর (আলো) নির্গত হয়ে সিরিয়ার প্রাসাদসমূহকে আলোকিত করে তোলে। এভাবেই নবীগণের (আ) মায়েরা দেখেন।" আবূ উমামা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ فَضَّلَنِي عَلَى الْأَنْبِيَاءِ "নিশ্চয় আল্লাহ নবীগণের উপরে আমাকে মর্যাদা দান করেছেন।"
কুরআন ও হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে ওসীলা, মাকাম মাহমূদ ও শাফা'আত-এর মর্যাদা প্রদান করবেন। ওসীলা শব্দের অর্থ নৈকট্য। এ বিষয়ে আমরা পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচনা করব, ইনশা আল্লাহ। হাদীস শরীফ থেকে আমরা জানতে পারি যে, মহান আল্লাহর নিকটতম ও সর্বোচ্চ মর্যাদার স্থানকে "ওসীলা” বলা হয়, যা মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে প্রদান করবেন। আমর ইবনুল আস (রা) এবং আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেন;
إِذَا سَمِعْتُمْ الْمُؤَذِّنَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ ثُمَّ صَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّهُ مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا ثُمَّ سَلُوا اللَّهَ لِي الْوَسِيلَةَ فَإِنَّهَا مَنْزِلَةٌ فِي الْجَنَّةِ في حديث الترمذي وأبي داود: أَعْلَى دَرَجَةٍ فِي الْجَنَّةِ لَا تَنْبَغِي إِلَّا لِعَبْدِ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ وَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَنَا هُوَ فَمَنْ سَأَلَ لِي الْوَسِيلَةَ حَلَّتْ لَهُ الشَّفَاعَةُ "যখন তোমরা মুয়াযয্যিকে (তার আযান) শুনবে তখন সে যেরূপ বলে সেরূপ বলবে। এরপর আমার উপর সালাত (দরুদ) পাঠ করবে; কারণ যে ব্যক্তি আমার উপর একবার সালাত পাঠ করে আল্লাহ তাঁর উপর দশবার রহমত করেন। অতঃপর তোমরা আল্লাহর কাছে আমার জন্য ওসীলা প্রার্থনা করবে। ওসীলা জান্নাতের এমন একটি মর্তবা (তিরমিযী ও আবূ দাউদের বর্ণনায়: জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা) যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একজন ছাড়া কেউ লাভ করবে না। আমি আশা করি আমিই সেই বান্দা। আর যে ব্যক্তি আমার জন্য 'ওসীলা' প্রার্থনা করবে তার জন্য শাফা'আত প্রাপ্য হবে।" মাকাম মাহমূদ অর্থ প্রশংসিত অবস্থান, যে অবস্থানে সৃষ্টির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকলেই তাঁর প্রশংসা করবেন। মহান আল্লাহ বলেন:
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا "এবং রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে; এ তোমার জন্য অতিরিক্ত, আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন 'মাকামে মাহমূদে' বা প্রশংশিত স্থানে।" মুফাস্সিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, 'মাকাম মুহামদ' বলতে কিয়ামদের দিন মহান আল্লাহর দরবারে শাফা'আতের মাকাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00