📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাঁর আনুগত্য

📄 তাঁর আনুগত্য


'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'- এ বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো জীবনের সকল ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে তার আনুগত্য করা। জীবনের সকল বিষয়ে, সকল ক্ষেত্রে মহানবীর শিক্ষা, বিধান ও নির্দেশ দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেওয়া। সকল মানুষের কথা ও সকল মতের উর্দ্ধে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কথাকে স্থান দেওয়া। তাঁর আনুগত্যই ঈমানের আলামত। মহান আল্লাহ বলেন:
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ "আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য কর- যদি ঈমানদার হয়ে থাক।" মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ "আর তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রাসূলের, যাতে তোমাদেরকে রহমত করা হয়।" অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ يُطِعْ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ "যে কেউ আল্লাহ ও রাসূলের আদেশমতো চলে, তিনি তাকে জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এ হলো বিরাট সাফল্য।" আল্লাহ আরো বলেন,
وَمَنْ يُطِعْ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا "আর যদি কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর রসূলের হুকুম মান্য করে, তবে যাদের প্রতি আল্লাহ নিয়ামত দান করেছেন সে তাদের সঙ্গী হবে। তারা নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর সাথী হিসেবে তারাই উত্তম।" অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ "যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি থেকে আত্মরক্ষা করে তারাই কৃতকার্য।" এভাবে কুরআন কারীমে বারংবার আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) আনুগত্যকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং মুমিনের জাগতিক সফলতা ও পারলৌকিক মুক্তির শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে, আল্লাহর আনুগত্য মূলত তাঁর রাসূলের (ﷺ) আনুগত্যের মাধ্যমেই সম্ভব। কারণ আল্লাহর আনুগত্য করতে হলে তার আদেশ নিষেধ জানতে হবে। আর আল্লাহর আদেশ নিষেধ একমাত্র রাসূলুল্লাহ -এর প্রাপ্ত ওহীর মাধ্যম ছাড়া কোনোভাবেই জানা সম্ভব নয়। এভাবে
আমরা বুঝতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ-এর আনুগত্যই আল্লাহর আনুগত্য। বিষয়টি কুরআন কারীমে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে:
مَنْ يُطِعْ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا "যে ব্যক্তি রাসূলের হুকুম মান্য করল সে আল্লাহরই হুকুম মান্য করল। আর যে লোক বিমুখতা অবলম্বন করল, আমি আপনাকে, তাদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে পাঠাইনি।" অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُمْ مَا حُمِّلْتُمْ وَإِنْ تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ "বল, আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা তাঁর (রাসূল) থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার উপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্যে সে দায়ী এবং তোমাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্যে তোমরা দায়ী। তোমরা যদি তাঁর আনুগত্য কর, তবে সঠিক পথ পাবে। রাসূলের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টরূপে পৌঁছে দেওয়া।"
এখানেও আমরা দেখছি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। জাগতিক বিষয়ে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ বা 'আদেশ-নিষেধের অধিকারীদের' আনুগত্য প্রয়োজনীয়। তবে এ বিষয়ে যে কোনো মতভেদ বা সমস্যা নিষ্পত্তি করতে অবশ্য রাসূলুল্লাহ ﷺ বা তাঁর শিক্ষার কাছে ফিরে আসতে হবে। মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে আল্লাহর রাসূল বলে বিশ্বাসকারী প্রতিটি মুসলিমের অন্যতম দায়িত্ব হলো তাদের মধ্যকার সকল মতবিরোধের নিষ্পত্তি করা তার নির্দেশ ও শিক্ষা অনুসারে, অর্থাৎ কুরআন-হাদীসের নির্দেশ অনুসারে। কুরআনে বা হাদীসে যে নির্দেশ থাকবে তা সর্বান্তঃকরণে মেনে নিতে হবে। নিজেদের মতামতের উর্দ্ধে স্থান দিতে হবে তাঁর সিদ্ধান্তকে। এ বিষয়ে একটি আয়াত আমরা উপরে দেখেছি। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ "হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা 'আদেশের মালিক' তাদের। তারপর যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক।"

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 খাতমুন নুবুওয়াত বা নুবুওয়াতের সমাপ্তি

📄 খাতমুন নুবুওয়াত বা নুবুওয়াতের সমাপ্তি


একজন মুসলিম আরো বিশ্বাস করেন যে, মুহাম্মদ (ﷺ) আল্লাহর মনোনীত সর্বশেষ নবী ও রাসূল, তাঁর পরে আর কোনো ওহী নাযিল হবে না এবং কোনো নবী বা রাসূল আসবেন না। বস্তুত, কুরআন ও হাদীসের এ বিষয়ক কোনো ঘোষণা না থাকলেও কয়েকটি কারণে মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে শেষ নবী হিসেবে বিশ্বাস করতে আমরা বাধ্য হতাম।
প্রথমত, সকল নবীই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন তাঁর পরে অন্য নবী, রাসূল বা বার্তাবাহক আগমন করবেন, যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে বাণী গ্রহণ করে মানুষদেরকে জানাবেন। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে বা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাদীস শরীফে কখনো কোনোভাবে জানান নি যে, তাঁর পরে মানব জাতির মধ্যে কোনো নবী, রাসূল বা বার্তাবাহক আসবেন। এ বিষয়টিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, তাঁর পরে কোনো নবী আসবে না।
দ্বিতীয়ত, পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের দাওয়াত ছিল সাময়িক এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য। এজন্য তাঁদের প্রতি প্রেরিত ওহী চূড়ান্ত ভাবে সংরক্ষিত হতো না। কাজেই তাঁদের পরে নতুন নবীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিত। মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর দীনের সর্বজনীনতা ও পরিপূর্ণতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কুরআন ও হাদীসে বারংবার এবং তাঁর দীনকে পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কাজেই এরপর আর কোনো নতুন নবীর আগমন নিষ্প্রয়োজন।
কিন্তু বিষয়টি এখানেই শেষ হয় নি। উপরন্তু কুরআন কারীমে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) শেষ নবী। অসংখ্য হাদীসে এ বিষয়ে বারংবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন:
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا "মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।"
মুতাওয়াতির পর্যায়ে বর্ণিত অর্ধশতাধিক সহীহ হাদীসে খাতমুন নুবুওয়াত বা রাসূলুল্লাহ -এর মাধ্যমে নুবুওয়াতের পরিসমাপ্তির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। উপরে উল্লিখিত হাদীসে আমরা দেখেছি যে, আবূ হুরাইরা (রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন: "ছয়টি বিষয়ের মাধ্যমে আমাকে নবীগণের (সকল নবীর) উপরে মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য প্রদান করা হয়েছে: ... (৬) আমার দ্বারা নবীগণ সমাপ্ত হয়েছেন।"
অন্য হাদীসে আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوسُهُمْ الْأَنْبِيَاءُ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيٌّ خَلَفَهُ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِي وَسَيَكُونُ خُلَفَاءُ فَيَكْثُرُونَ قَالُوا فَمَا تَأْمُرُنَا قَالَ: قُوا بِبَيْعَةِ الْأَوَّلِ فَالْأَوَّلِ أَعْطُوهُمْ حَقَّهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ سَائِلُهُمْ عَمَّا اسْتَرْعَاهُمْ. "ইস্রায়েল সন্তানগণকে (বনী ইস্রায়েলকে) শাসন করতেন নবীগণ। যখনই কোনো নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন অন্য একজন নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোনো নবী নেই, কিন্তু খলীফাগণ থাকবেন এবং তারা সংখ্যায় অনেক হবেন। উপস্থিত সাহাবীগণ বলেন: আপনি আমাদেরকে তাদের বিষয়ে কি নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলেন: ধারাবাহিকভাবে প্রথম ব্যক্তির পরে পরবর্তী ব্যক্তি এভাবে তাদের বাইয়াত বা আনুগত্যের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করবে এবং তাদেরকে তাদের প্রাপ্য (আনুগত্য) প্রদান করবে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের অধীনস্থ জনগণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।"
সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস বলেন, রাসূলুল্লাহ আলীকে (রা) বলেন:
أَنْتَ مِنِّي بِمَنْزِلَةٍ هَارُونَ مِنْ مُوسَى إِلَّا أَنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِي "মুসার সাথে হারুনের মর্যাদা যেরূপ ছিল আমার সাথে তোমার মর্যাদা সেরূপ, ব্যতিক্রম এই যে, আমার পরে কোনো নবী নেই।"
আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
مَثَلِي وَمَثَلُ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بُنْيَانًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ مِنْ زَوَايَاهُ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ بِهِ وَيَعْجَبُونَ لَهُ وَيَقُولُونَ هَلَّا وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَةُ قَالَ فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ "আমার ও আমার পূর্ববর্তী নবীদের উদাহরণ এক ব্যক্তির মত যিনি একটি খুবই সুন্দর ও মনোরম ইমারত তৈরী করেছে, কিন্তু ইমারতের এক দিকে একটি ইটের জায়গা খালি রেখেছেন। মানুষেরা আশ্চর্য হয়ে এই মনোরম ইমরতটির চারিদিকে ঘুরতে থাকে এবং বলতে থাকে: এ ইটটি যদি স্থাপন করা হতো! তিনি বলেন: আমিই এই সর্বশেষ ইট, আমিই সর্বশেষ নবী।"
অন্য হাদীসে জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
مَثَلِي وَمَثَلُ الْأَنْبِيَاءِ كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى دَارًا فَأَتَمَّهَا وَأَكْمَلَهَا إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَدْخُلُونَهَا وَيَتَعَجَّبُونَ مِنْهَا وَيَقُولُونَ لَوْلَا مَوْضِعُ اللَّبِنَةِ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَأَنَا مَوْضِعُ اللَّبِنَةِ جِئْتُ فَخَتَمْتُ الْأَنْبِيَاءَ "আমার ও অন্যান্য সকল নবীর উদাহরণ একজন ব্যক্তির ন্যায়, যিনি একটি বাড়ি তৈরি করেছেন এবং তাকে পূর্ণতা দান করেছেন, কিন্তু একটি ইটের স্থান অপূর্ণ রেখেছেন। মানুষেরা এ বাড়িতে প্রবেশ করতে লাগল এবং অবাক হতে লাগল। তারা বলতে লাগল, এই ইটের স্থানটি যদি অপূর্ণ না থাকত! রাসূলুল্লাহ বলেন, আমিই সেই ইটের স্থান, আমি এসে নবীগণের সমাপ্তি টেনেছি।"
অন্য হাদীসে জুবাইর ইবনু মুতয়িম (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ لِي أَسْمَاءَ أَنَا مُحَمَّدٌ وَأَنَا أَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِي يَمْحُو اللَّهُ بِيَ الْكُفْرَ وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِي يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى قَدَمَيَّ وَأَنَا الْعَاقِبُ الَّذِي لَيْسَ بَعْدَهُ أَحَدٌ (نَبِيُّ) "আমার অনেক নাম আছে। আমি মুহাম্মাদ, এবং আমি আহমদ, এবং আমি 'মাহী' (উচ্ছেদকারী), আমার মাধ্যমে আল্লাহ কুফ্র উচ্ছেদ করবেন, এবং আমি 'হাশির' (একত্রিতকারী), আমার পদদ্বয়ের নিকটেই মানুষেরা কিয়ামতের দিন একত্রিত হবে, এবং
আমি 'আকিব' (সর্বশেষ), যার পরে আর কোনো নবী নেই।" অন্য হাদীসে আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ الرِّسَالَةَ وَالنُّبُوَّةَ قَدْ انْقَطَعَتْ فَلَا رَسُولَ بَعْدِي وَلَا نَبِيَّ "রিসালাত বা রাসূলের পদ এবং নুবুওয়াত বা নবীর পদ শেষ হয়ে গিয়েছে, কাজেই আমার পরে কোনো রাসূল নেই এবং কোনো নবীও নেই।"
এভাবে বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত পরিস্কারভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসূল, তাঁর আগমনের সাথে সাথে নুবুওয়াত ও রিসালাতের সমাপ্তি ঘটেছে। তাঁর পরে আর কোনো নবী বা রাসূল আসবেন না। তিনি একথাও স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তাঁর পরে যদি কেউ নুবুওয়াতের দাবী করে তবে সে অবশ্যই একজন ঘোর মিথ্যাবাদী ভণ্ড। বিভিন্ন হাদীসে তিনি তাঁর উম্মতকে ভণ্ড নবীদের আবির্ভাবের সংবাদ দান করে তাদের থেকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এক হাদীসে জাবির ইবনু সামুরাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ بَيْنَ يَدَيْ السَّاعَةِ كَذَّابِينَ فَاحْذَرُوهُمْ "নিশ্চয় কিয়ামতের পূর্বেই অনেক ঘোর মিথ্যাবাদীর (ভণ্ড নবীর) আবির্ভাব ঘঠবে। তোমরা তাদের থেকে সাবধান থাকবে।"
গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ-এর মাধ্যমে নুবুওয়াতের সমাপ্তির বিষয়ে ৩৭ জন সাহাবী থেকে সহীহ সনদে ৬৫টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এভাবে আমরা দেখছি যে, কুরআন কারীমের সুস্পষ্ট নির্দেশনার পাশাপাশি মুতাওয়াতির হাদীসের মাধ্যমে বিষয়টি সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত। বরং প্রকৃত বিষয় যে, রাসূলুল্লাহ-এর নবুয়ত ও খাতমুন-নুবুওয়াত একইভাবে বর্ণিত ও প্রমাণিত। যারা তাঁর নুবুওয়াতের বিষয় বর্ণনা করেছেন তাঁরাই তাঁর খাতমুন নুবুওয়াতের বিষয়ও বর্ণনা করেছেন। সাহাবীগণ সর্বসম্মতভাবে নবুওয়তের দাবিদার এবং তাদের অনুসারীদেরকে ধর্মত্যাগী মুরতাদ বলে গণ্য করেছেন।
যদি রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরে কেউ নিজেকে নবী বলে দাবি করে বা কেউ এরূপ দাবিদারের কথা সত্য বলে মনে করে তবে সে নিঃসন্দেহে ভণ্ড ও মিথ্যাবাদী দাজ্জাল বা এরূপ ভণ্ডের অনুসারী। যদি কোনো মুসলিম নামধারী এরূপ দাবি করে বা এরূপ দাবিদারের কথা বিশ্বাস করে তবে সে ধর্মত্যাগী মুরতাদ বলে গণ্য হবে।
উপরন্তু যদি কেউ বিশ্বাস করে যে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পরে কোনো নবী বা রাসূল এসেছেন, আসতে পারেন, আসার সম্ভাবনা আছে বা আসা অসম্ভব নয় তবে সে ব্যক্তিও অমুসলিম কাফির ও ধর্মত্যাগী মুরতাদ বলে গণ্য হবে, যদিও সে মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে একজন নবী ও রাসূল বলে মানে, অথবা তাঁকে শ্রেষ্ঠ নবী বলে মানে, অথবা তাঁর শরীয়তের বিধান মেনে চলে। এই ব্যক্তি মূলত "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-য় বিশ্বাস করে নি। কারণ কুরআনের মাধ্যমে এবং অগণিত মুতাওয়াতির হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত তাঁর দ্ব্যর্থহীন শিক্ষাকে অস্বীকার ও অমান্য করলে আর তাঁর নুবুওয়াতের স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ থাকে না।
এখানে উল্লেখ্য যে, ইসলামের সোনালী দিনগুলিতে নুবুওয়াতের দাবি করে কেউ ইসলামের ক্ষতিসাধন করতে পারে নি। কারণ এ বিষয়ে মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রের সচেতনতা ছিল সুস্পষ্ট। কিন্তু গত কয়েক শতাব্দী যাবত অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষত ইসলামের মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে মুসলিমদের অজ্ঞতা এবং সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসকগণের কূটকৌশলের কারণে এ সকল ভণ্ড মুসলিম সমাজের বিশেষ ক্ষতি সাধন করতে এবং অসংখ্য মুসলিমকে ধর্মচ্যুত করতে সক্ষম হয়েছে। এ সকল ভণ্ডের অন্যতম পাঞ্জাবের গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (১৮৪০-১৯০৮ খৃ)।
এখানে উল্লেখ্য যে, গোলাম আহমদ ও তার মত ভণ্ড নবীরা সরাসরি নুবুওয়াত দাবি করে নি; কারণ তাহলে কোনো মুসলিমই তার দাবি গ্রহণ করবে না। বরং তারা প্রথমে বেলায়াত, কাশফ, ইলহাম, ইলকা ইত্যাদি দাবি করে। এরপর তারা নিজেদেরকে মুজাদ্দিদ বলে দাবি করে। এগুলি সবই ইসলামী পরিভাষা ও ইসলাম স্বীকৃত বিষয়। কিন্তু এগুলির অর্থ ও মর্ম না জানার কারণে অনেকেই এ সকল কথা দ্বারা বিভ্রান্ত হয়। এভাবে তারা যখন কিছু মানুষকে তাদের একান্ত ভক্ত হিসেবে পেয়ে যায়, তখন বিভিন্ন কৌশলে নুবুওয়াত দাবি করে। আর তার অনুসারী ভক্তরা বিভিন্ন অজুহাত ও ব্যাখ্যা দিয়ে তার দাবি মেনে নেয়।
এ সকল বিষয় বিস্তারিত আলোচনা আমাদের গ্রন্থের পরিসরে সম্ভব নয়। তবে সংক্ষেপে এতটুকু বলা যায় যে, খাতমুন নুবুওয়াতের একটি দিক এই যে, ইসলামকে জানতে, বুঝতে, ব্যাখ্যা করতে বা বিধান দিতে রাসূলুল্লাহ-এর পরে আর কোনো 'ব্যক্তির' কোনো 'ইসমাত' (অভ্রান্ততা), কাদাসাত (পবিত্রতা) বা বিশেষ পদমর্যাদা নেই।
ইসলামকে জানার জন্য কুরআন হাদীসের আলোকে মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ ইজতিহাদ করবেন, কিন্তু কোনো মুজতাহিদ দাবি করতে পারবেন না যে, তাঁর মতটি কোনোভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এবং সেটিই ইসলামের একমাত্র অভ্রান্ত ব্যাখ্যা, অথবা মহান আল্লাহ তাকে বিশেষ কোনো পদমর্যাদা প্রদান করেছেন। উম্মাতের মধ্যে আলিম-মুজতাহিদগণ থাকবেন। তাঁদের যোগ্যতা তাঁদের ইলম ও ইখলাসে, আল্লাহর বা রাসূলুল্লাহ-এর পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো বাণী বা নির্দেশনা গ্রহণের মাধ্যমে নয়। কাজেই কোনো আলিম বা বুজুর্গ বলে পরিচিত ব্যক্তি যদি এরূপ কোনো 'পদমর্যাদা', 'ইসমাত' বা 'অভ্রান্ততা' দাবি করেন, বা নিজের মতটি সরাসরি আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের (ﷺ) নিকট থেকে প্রাপ্ত এবং অন্যান্য আলিমদের মতামত এদিক থেকে অধিকতর
মর্যাদাময় ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বলে দাবি করেন তবে তিনি ভণ্ড প্রতারক মিথ্যাবাদী অথবা শয়তান কর্তৃক প্রতারিত।
ইসলামে কাশফ, ইলহাম, ইলকা ও সত্য স্বপ্ন রয়েছে। তবে এগুলি একান্তই আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া ব্যক্তিগত সম্মান, কারামত ও নিয়ামত মাত্র। এগুলি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা অন্য কোনো মানুষের জন্য দীন বুঝার বা দীনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে প্রমাণ বা ভিত্তি নয়। যদি কেউ নিজেকে এরূপ কাশফ, ইলকা বা ইলহাম-ধারী বলে দাবি করেন বা এই দাবির ভিত্তিতে নিজের মতটির নির্ভুলতা, অভ্রান্ততা (ইসমাত) বা বিশেষত্ব দাবি করেন তবে তিনিও ভণ্ড, প্রতারক মিথ্যাবাদী অথবা শয়তান কর্তৃক প্রতারিত।
যুগে যুগে মুসলিম সমাজে মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক আসবেন বলে আবূ দাউদ সংকলিত একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কেউ কখনোই নিজেকে মুজাদ্দিদ দাবি করেন নি। আলিমদের কর্ম বিবেচনা করে সাধারণত তাঁদের মৃত্যুর অনেক পরে পরবর্তী যুগের আলিমগণ কাউকে কাউকে মুজাদ্দিদ বলে মনে করেছেন। এ-ই 'মনে করা' বা ধারণা করাও একান্তই ব্যক্তিগত ইজতিহাদ। কোন্ যুগে কে বা কারা মুজাদ্দিদ ছিলেন সে বিষয়ে আলিমদের অনেক মতভেদ রয়েছে।
গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর পূর্বে কেউ কখনো নিজেকে মুজাদ্দিদ বলে দাবি করেন নি। যদি কেউ নিজেকে মুজাদ্দিদ বলে দাবি করে, অথবা তার অনুসারীগণ তার জীবদ্দশাতেই তাকে মুজাদ্দিদ বলে দাবি ও প্রচার করে আর তিনি তা সমর্থন করেন এবং তার এই 'পদমর্যাদা'-র কারণে তার মতের বিশেষত্ব, অভ্রান্ততা বা পবিত্রতা দাবি করেন তবে তিনিও অনুরূপভাবে মিথ্যাবাদী ভণ্ড প্রতারক বা শয়তান কর্তৃক প্রতারিত।
এগুলি সবই নুবুওয়াত দাবি করার বিভিন্ন পর্যায় ও পদক্ষেপ। এগুলির পরে কেউ যদি সরাসরি নুবুওয়াত দাবি করে তবে সে নিঃসন্দেহে প্রতারক ভণ্ড ও ধর্মত্যাগী মুরতাদ কাফির।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 তাঁর অনুকরণ

📄 তাঁর অনুকরণ


ইতা'আত বা আনুগত্য অর্থ আদেশ নিষেধ পালন করা। আর আদেশ-নিষেধের বাইরেও কর্মে ও বর্জনে অনুকরণকে আরবীতে 'ইত্তিবা' বলা হয়। 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও দাবি হলো কর্মে ও বর্জনে হুবহু তাঁর অনুকরণ করা। তিনি যা নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করা এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করার সাথে সাথে মুহাম্মদ (ﷺ)-কে রাসূল হিসেবে বিশ্বাসকারী প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হলো জীবনের সকল পর্যায়ে কর্মে ও বর্জনে তাঁর অনুসরণ ও অনুকরণ করা। তিনি যা যেভাবে করেছেন তা করা এবং তিনি যা বর্জন করেছেন তা বর্জন করা। কর্মে ও বর্জনে তাঁর সুন্নাত বা জীবনাদর্শই মুসলিমের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا "নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য।"
এ থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, শুধু যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে না, অর্থাৎ শুধুমাত্র কাফিররাই তাঁর আদর্শ গ্রহণ করে না বা পূর্ণাঙ্গ মনে করে না। শুধু কাফেরদের জন্যই অন্য কারো আদর্শের প্রয়োজন হয়। মুমিনদের জন্য তাঁর আদর্শই পরিপূর্ণ আদর্শ। আর হুবহু তাঁর আদর্শে জীবন পরিচালনাই ঈমানের আলামত।
তাঁর আদর্শের অনুসরণ ও জীবন গঠনই আল্লাহর প্রেম, ক্ষমা ও মুক্তি লাভের একমাত্র পথ। মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ . قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ "বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসেন এবং তোমাদেরকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। বল, আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য প্রকাশ
কর। বস্তুত যদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে, তাহলে আল্লাহ কাফিরদিগকে ভালবাসেন না।" এভাবে আমরা দেখি যে, 'লাইলাহা ইল্লাল্লাহ' বিশ্বাসের অর্থ হলো, চূড়ান্ত ও অলৌকিক ভক্তি বা ভয় ও আশা মিশ্রিত অলৌকিক ভক্তি ও বিনয় একমাত্র আল্লাহর জন্য। আর 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' বিশ্বাসের অর্থ হলো প্রশ্নাতীত ও সামগ্রিক আনুগত্য ও অনুসরণ একমাত্র মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর জন্য। কাজেই যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ আছে যে তাঁর আনুগত্যের উর্দ্ধে বা সে এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যেখানে রাসূলুল্লাহ-এর আনুগত্য ও অনুসরণ না করলেও তার চলে, অথবা তাঁর আনুগত্য-অনুকরণ ছাড়াও আল্লাহর নৈকট্য লাভ সম্ভব তাহলে সে ব্যক্তি মুসলিম বলে গণ্য হবে না, যদিও সে কোনো বিষয়ে তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ করে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 অনুকরণের ব্যতিক্রম ঈমান বিধ্বংসী

📄 অনুকরণের ব্যতিক্রম ঈমান বিধ্বংসী


রাসূলুল্লাহ-এর অনুসরণের অতিরিক্ত বা ব্যতিক্রম কোনো কর্মের মধ্যে কোনো কল্যাণ আছে বলে মুমিন বিশ্বাস করেন না। 'মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল' একথা বিশ্বাস করার অর্থ হলো আল্লাহকে ডাকতে হলে, তাঁকে পেতে হলে, তাঁর বন্ধুত্ব, বেলায়াত, সাওয়াব, প্রেম ও করুণা লাভ করতে হলে, তাঁর ইবাদত করতে হলে বা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে অবশ্যই মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর শিক্ষা অনুসারে আল্লাহকে ডাকতে হবে বা তাঁর ইবাদত করতে হবে। তাঁর শিক্ষার বাইরে, ব্যতিক্রম বা অতিরিক্ত কোনো পদ্ধতিতে আল্লাহকে ডাকলে বা ইবাদত করলে তা কখনো আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেন:
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ "অতএব যারা তাঁর (রাসূলুল্লাহ-এর) আদেশের ব্যতিক্রম বা বিরুদ্ধাচারণ করে, তারা যেন সতর্ক হয়, তাদের উপর বিপর্যয় আপতিত হবে, অথবা কোনো কঠিন শাস্তি তাদের উপর আপতিত হবে।" 'মুখালাফাহ' (مخالفة) অর্থ ব্যতিক্রম করা বা বিরোধিতা করা (to contradict, to be at variance)। 'খিলাফ' (خلاف) অর্থ ব্যতিক্রম, বিপরীত বা অসমঞ্জস (difference, dissimilarity)। এ থেকে আমরা বুঝি যে, রাসূলুল্লাহ-এর কর্ম, শিক্ষা বা আদর্শের ব্যতিক্রম বা তাঁর পথের ব্যতিক্রম চলা বা তাঁর শিক্ষার ব্যতিক্রম কিছু করাই ভয়ঙ্কর বিপদ ও ধবংসের কারণ। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ. "হে মুমিনগণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোনো বিষয়ে অগ্রবর্তী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।" আমরা জানি যে, একমাত্র আল্লাহর রাসূলের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর নির্দেশনা লাভ করেছি। কাজেই আল্লাহর রাসূলের সামনে এগিয়ে যাওয়া বা অগ্রবর্তী হওয়ার অর্থই আল্লাহর সামনে অগ্রণী হওয়া। কোনো মুমিনের পক্ষে সম্ভব নয় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শিক্ষা, আদর্শ, পথ ও মত থেকে একটু সামনে অগ্রবর্তী হবে বা দীন বুঝতে, পালন করতে বা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে তাঁর অতিরিক্ত কিছু কর্ম করবে। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلَهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا "কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিক সে ফিরে যায় সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দিব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব, আর তা কতই না মন্দ আবাস!" রাসূলুল্লাহ অনেক হাদীসে তাঁর পথের বা আদর্শের বাইরে চলতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। তাঁর রীতি, পদ্ধতি বা কর্মের বাইরে কোনো কর্ম করলে তা আল্লাহ কবুল করবেন না বলে জানিয়েছেন। তাঁর কর্মের বা আদর্শের বাইরে নব-উদ্ভাবিত কর্ম বা পদ্ধতিকে 'বিভ্রান্তি' বলে আখ্যায়িত করেছেন। এক হাদীসে আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ "আমাদের কর্ম যা নয় এমন কোনো কর্ম যদি কোনো মানুষ করে তাহলে তার কর্ম প্রত্যাখ্যাত হবে (আল্লাহর নিকট কবুল হবে না)।” এ বিষয়ক আরো অনেক হাদীস আমরা ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে বিদ'আত ও বিভক্তি বিষয়ক আলোচনায় উল্লেখ করব, ইনশা আল্লাহ। এখানে আমরা মূলনীতি হিসেবে বলতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ-এর অনুকরণের ব্যতিক্রম মুমিনের ঈমানের জন্য ভয়ঙ্কর। জীবনের প্রতি বিষয়ে ও প্রতি কর্মেই রাসূলুল্লাহ-এর আদর্শ রয়েছে। আদেশ নিষেধ ছাড়াও তাঁর কর্মরীতির বিভিন্ন দিক রয়েছে। প্রতি বিষয়েই তাঁর কর্মরীতি অনুসরণ প্রয়োজন। অন্তত তাঁর কর্মরীতিকে অপছন্দ করার পর্যায়ে কোনো মুমিনই যেতে পারেন না। আনাস
বিন মালেক (রা.) বলেন:
جَاءَ ثَلَاثَةُ رَهْطٍ إِلَى بُيُوتِ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ ﷺ يَسْأَلُونَ عَنْ عِبَادَةِ النَّبِيِّ ﷺ فَلَمَّا أُخْبِرُوا كَأَنَّهُمْ تَقَالُوهَا فَقَالُوا وَأَيْنَ نَحْنُ مِنَ النَّبِيِّ ﷺ قَدْ غَفَرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ . قَالَ أَحَدُهُمْ أَمَّا أَنَا فَإِنِّي أُصَلِّي اللَّيْلَ أَبَدًا. وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَصُومُ الدَّهْرَ وَلَا أُقْطِرُ. وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلَا أَتَزَوَّجُ أَبَدًا فَجَاءَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِلَيْهِمْ فَقَالَ : أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا؟ أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي".
"তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ-এর স্ত্রীগণের নিকট যেয়ে তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তাঁরা তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জানালেন। মনে হলো এই প্রশ্নকারী সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ-এর ইবাদত কিছুটা কম ভাবলেন। তাঁরা বললেন: রাসূলুল্লাহ -এর সাথে কি আমাদের তুলনা হতে পারে? আল্লাহ তাঁর পূর্ববর্তী ও পবরর্তী সকল গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন (তাঁর কোনো গোনাহ নেই, আর আমরা গোনাহগার উম্মত, আমাদের উচিৎ তাঁর চেয়েও বেশি ইবাদত করা)। তখন তাদের একজন বললেন: আমি সর্বদা সারা রাত জেগে (রাতের বা তাহাজ্জুদের) সালাত আদায় করব। অন্যজন বললেন: আমি সর্বদা সিয়াম পালন করব, কখনই রোযা ভাঙ্গব না। অন্যজন বললেন: আমি কখনো বিবাহ করব না, আজীবন নারী সংসর্গ পরিত্যাগ করব। রাসূলুল্লাহ এদের কথা জানতে পেরে এদেরকে বলেন: তোমরা কি এ ধরনের কথা বলেছ? তোমরা জেনে রাখ! আমি তোমাদের সকলের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি, তাকওয়ার দিক থেকে আমি তোমাদের সবার উপরে অবস্থান করি। তা সত্ত্বেও আমি মাঝেমাঝে (নফল) সিয়াম পালন করি, আবার মাঝেমাঝে সিয়াম পরিত্যাগ করি। রাতে কিছু সময় তাহাজ্জুদ আদায় করি এবং কিছু সময় ঘুমাই। আমি বিবাহ করেছি- স্ত্রীদেরকে সময় প্রদান করি। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত অপছন্দ করল তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।"
এখানে এ সকল সাহাবী মূলত রাসূলুল্লাহ-এর রীতিকে অপছন্দ করেন নি। তাঁরা তাঁর রীতি জেনেছিলেন এবং মেনেও নিয়েছিলেন, তবে তাঁদের নিজেদের জন্য অতিরিক্ত কিছু নেক আমলের জন্য তাঁর সুন্নাতের ব্যতিক্রম কিছু পদ্ধতির কথা চিন্তা করেছিলেন। আমরা জানি, সারারাত তাহাজ্জুদ আদায় করা নিষিদ্ধ নয়। হারাম দিবসগুলি বাদ দিয়ে সারা মাস সিয়াম পালনও নিষিদ্ধ নয়। অনুরূপভাবে কোনো পুরুষের প্রয়োজন না থাকলে বা অসুবিধা থাকলে অবিবাহিত থাকাও সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তাঁদেরকে নিষেধ করেছেন। কারণ আল্লাহর নৈকট্য, বেলায়াত, সন্তুষ্টি বা সাওয়াবের জন্য রাসূলুল্লাহ-এর রীতির বাইরে বা অতিরিক্ত কোনো রীতির অনুসরণ করা মানুষের মনে এ ধারণা সৃষ্টি করতে পারে যে, কেবলমাত্র সুন্নাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে কর্ম করলে বোধহয় প্রয়োজনীয় বেলায়াত, সন্তুষ্টি বা সাওয়াব অর্জন করা সম্ভব হবে না। অবিকল সুন্নাত অনুসরণকারীর চেয়ে অতিরিক্ত বা ব্যতিক্রম রীতিটি তার কাছে উত্তম মনে হতে পারে। মনে হতে পারে তাহাজ্জুদ খুবই ভাল ইবাদত, কাজেই রাতে কিছু সময় ঘুমিয়ে নষ্ট করার চেয়ে সারারাত এই মহান ইবাদতে মাশগুল থাকাই উত্তম। রাতের অনেকখানি সময় ঘুমিয়ে নষ্ট করে কি লাভ? ইত্যাদি। আর একেই রাসূলুল্লাহ 'তাঁর সুন্নাতকে অপছন্দ করা' বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) বলেন:
لَمَّا كَانَ مِنْ أَمْرٍ عُثْمَانَ بْن مَظْعُونِ الَّذِي كَانَ مِنْ تَرْكِ النِّسَاءِ بَعَثَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَقَالَ يَا عُثْمَانُ إِنِّي لَمْ أُومَرْ بِالرَّهْبَانِيَّةِ أَرَغِبْتَ عَنْ سُنَّتِي قَالَ لَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ إِنَّ مِنْ سُنَتِي أَنْ أُصَلِّيَ وَأَنَامَ وَأَصُومَ وَأُطْعَمَ وَأَنكِحَ وَأُطَلَقَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَتِي فَلَيْسَ مِنِّي. "যখন উসমান বিন মাযউন (রা) দাম্পত্য জীবন বা স্ত্রী সংসর্গ পরিত্যাগের চিন্তা করেন তখন রাসূলুল্লাহ তাঁকে ডেকে পাঠান এবং বলেন: উসমান, আমাকে বৈরাগ্যের নির্দেশ দেওয়া হয়নি, তুমি কি আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করছ? তিনি বলেন: না, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আপনার সুন্নাতকে অপছন্দ করছি না। রাসূলে আকরাম (ﷺ) বলেন: আমার সুন্নাতের মধ্যে রয়েছে যে, আমি রাতে তাহাজ্জুদ পড়ি আবার ঘুমাই, কখনো (নফল) সিয়াম পালন করি, কখনো করি না, বিবাহ করি, আবার বিবাহ বিচ্ছেদও করি। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করবে তার সাথে আমার সম্পর্ক নেই।"
এ অর্থে অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা) বলেন, আমার আব্বা আমাকে বিবাহ দেন, কিন্তু ইবাদতের আগ্রহের কারণে আমি রাতদিন নামায রোযায় ব্যস্ত থাকতাম এবং আমার স্ত্রীর কাছে যেতাম না। তখন আমার আব্বা আমাকে অনেক রাগ করেন এবং রাসূলুল্লাহ-এর কাছে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করেন। আব্দুল্লাহ (রা) বলেন:
فَأَرْسَلَ إِلَيَّ النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ لِي أَتَصُومُ النَّهَارَ قُلْتُ نَعَمْ قَالَ وَتَقُومُ اللَّيْلَ قُلْتُ نَعَمْ قَالَ لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَنَامُ وَأَمَسُّ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي ... ثُمَّ قَالَ فَإِنَّ لِكُلِّ عَابِدٍ شَرَّةً وَلِكُلِّ شَرَّةٍ فَتْرَةً فَإِمَّا إِلَى سُنَّةٍ وَإِمَّا إِلَى بِدْعَةٍ فَمَنْ كَانَتْ فَتْرَتُهُ إِلَى سُنَّةٍ فَقَدِ اهْتَدَى وَمَنْ كَانَتْ فِتْرَتُهُ إِلَى غَيْرِ ذَلِكَ فَقَدْ هَلَكَ. "রাসূলুল্লাহ আমাকে ডেকে নিয়ে বলেন: তুমি কি প্রতিদিন সিয়াম পালন কর? আমি বললাম: হাঁ। তিনি বলেন: তুমি কি সারা রাত জেগে সালাত আদায় কর? আমি বললাম: হাঁ। তিনি বললেন: কিন্তু আমি তো সিয়াম পালন করি, আবার মাঝে মাঝে বাদ
দিই, রাতে সালাত আদায় করি, আবার ঘুমাই, স্ত্রীদেরকে সময় প্রদান করি। আর যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করল আমার সাথে তার সম্পর্ক থাকবে না।... এরপর তিনি বলেন: প্রত্যেক আবেদের কর্মের উদ্দীপনার জোয়ার ভাটা আছে। ইবাদতের উদ্দীপনা কখনো তীব্র হয় আবার এই তীব্রতা এক সময় থেমে যায়, কখনো সুন্নাতের দিকে, কখনো বিদ'আতের দিকে। যার স্থিতি- প্রশান্তি সুন্নাতের প্রতি হবে সে হেদায়েত প্রাপ্ত হবে। আর যার স্থিতি-প্রশান্তি অন্য কিছুর দিকে হবে সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।"
এখানে প্রশ্ন হলো, উপরের হাদীসগুলিতে সুন্নাতের ব্যতিক্রম করাকে রাসূলুল্লাহ 'সুন্নাত অবহেলা করা' বা 'সুন্নাত অপছন্দ করা' বলে আখ্যায়িত করলেন কেন? আমরা সুনিশ্চিত যে, উপরের হাদীসগুলিতে উল্লেখিত সাহাবীগণ কখনোই রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাত বা রীতিকে অপছন্দ করেন নি। তাঁরা এমন কিছু করতে ইচ্ছা করেন নি যা ইসলামের নিষিদ্ধ। বরং তাঁরা কিছু নেক আমল রাসূলুল্লাহ-এর রীতির অতিরিক্ত বা ব্যতিক্রম পদ্ধতিতে পালন করতে আগ্রহ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও কেন বারংবার রাসূলুল্লাহ এরূপ করাকে 'তাঁর সুন্নাত অপছন্দ করা' বলে আখ্যায়িত করলেন এবং বললেন যে, যে তাঁর সুন্নাতকে অপছন্দ করবে সে তাঁর উম্মাত নয় বা তাঁর সাথে সম্পর্কিত নয়?
বিষয়টি অনুধাবন করা অতীব প্রয়োজন। সুন্নাত, খেলাফে সুন্নাত ও বিদ'আত সম্পর্কে আমি 'এহইয়াউস সুনান' গ্রন্থে বিস্ত ারিত আলোচনা করেছি। এ ছাড়া ষষ্ঠ অধ্যায়ে মুসলিম উম্মাহর ফিরকাসমূহ, বিদ'আতী আকীদা ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের পরিচয় প্রসঙ্গে সুন্নাত বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশা আল্লাহ। এখানে সুন্নাতের ব্যতিক্রমে ঈমানের বিচ্যুতি প্রসঙ্গে সংক্ষেপে নিম্নের কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজনীয় বলে মনে করছি:
(১) উপরের হাদীসগুলি থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, রাসূলুল্লাহ যে কাজ যতটুকু যেভাবে করেছেন তা ততটুকু ও সেভাবে করাই সুন্নাত এবং তিনি যা করেন নি বা বর্জন করেছেন তা বর্জন করাই সুন্নাত।
(২) তাঁর সুন্নাতের ব্যতিক্রম কর্ম বা পদ্ধতি ইসলামের অন্যান্য দলীলের আলোকে জায়েয বা বৈধ হতে পারে, বিশেষ কোনো কারণে জরুরীও হতে পারে, তবে তা কখনোই দীনের অংশ হতে পারে না। তাঁর পদ্ধতির ব্যতিক্রম, খেলাফ বা অতিরিক্ত কোনো কর্ম, রীতি বা পদ্ধতিকে দীনের অংশ বলে মনে করা বা তা পালন না করলে দীন, বেলায়াত, ভক্তি, সাওয়াব বা আখিরাতের মর্যাদা সামান্য পরিমাণ ব্যাহত হবে বলে ধারণা করার অর্থ রাসূলুল্লাহ-এর পদ্ধতি দীনের জন্য যথেষ্ট নয় বলে বিশ্বাস করা। এরই অর্থ সুন্নাত অপছন্দ করা। এরূপ বিশ্বাস পোষণ কারী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর রিসালাতের পূর্ণতায় বিশ্বাসী নয়। ফলে সে আর তাঁর সাথে সম্পর্কিত থাকতে পারে না।
(৩) তাহাজ্জুদের সালাত কুরআন ও হাদীসের আলোকে অত্যন্ত ফযীলতের ইবাদত। এ সকল সাধারণ দলীলের আলোকে বেশি বেশি তাহাজ্জুদ আদায় বা সারারাত তাহাজ্জুদ আদায় নিষিদ্ধ নয়। কোনো আবিদ যদি ইবাদতের উদ্দীপনায় তা কখনো করেন তবে তা ক্ষতিকর নয়। তবে তার কর্মের স্থিতি ও নিয়মিত অবস্থান যদি রাসূলুল্লাহ-এর রীতির ব্যতিক্রম হয় তবে তা ক্ষতিকর। কারণ এ পর্যায়ে তিনি 'সারারাত' তাহাজ্জুদ আয়ায়কে রাতের কিছু অংশ ঘুমানোর চেয়ে অধিক ফযীলত বলে মনে করবেনই এবং বিভিন্ন দলিল দিয়ে নিজের এরূপ কর্মকে রাতে কিছু সময় ঘুমিয়ে বাকি সময় তাহাজ্জুদ আদায়ের চেয়ে অধিক উত্তম বলে প্রমাণ করতে সচেষ্ট থাকবেন। সর্বোপরি যে ব্যক্তি সারারাত তাহাজ্জুদ আদায় না করে রাতে কিছু সময় ঘুমিয়ে কাটান তার প্রতি তিনি কিছুটা হলেও কষ্ট বোধ করবেন এবং তাঁর বেলায়াত, সাওয়াব বা কামালাত কিছুটা হলেও অপূর্ণ বলে অনুভব করবেন। তার কাছে মনে হবে, এভাবে কিছু সময় ঘুমিনে নষ্ট না করে একটু কষ্ট করে সারারাত তাহাজ্জুদ আদায় করলে আরো বেশি কামালাত তিনি অর্জন করতেন! এভাবে জেনে অথবা না জেনে তিনি রাসূলুল্লাহ-এর আমল ও রীতিকে 'অপূর্ণ' বলে মনে করলেন!! আর এই হলো সুন্নাত অপছন্দ করা।
(৪) সুন্নাতের ব্যতিক্রম নেক কর্ম বা নেক কর্মের বা রীতির উন্মেষ, উৎপত্তি ও বিকাশ সাধারণত 'সুন্নাত অবহেলা করা' বা সুন্নাত অপছন্দ করা'-র কারণে হয় না, বরং ইসলাম নির্দেশিত ও সুন্নাত সম্মত নেক আমল বেশি করে পালনের জন্য এবং বেশি করে আল্লাহর পুরস্কার ও বরকত লাভের জন্যই তা হয়ে থাকে। কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে, সকল খেলাফে সুন্নাতই 'সুন্নাত অপছন্দ করার' পর্যায়ে চলে যায়। এখানে একটি মাত্র উদাহরণ উল্লেখ করছি।
(৫) ঈদে মীলাদুন্নবী ও মীলাদ মাহফিল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি 'এহইয়াউস সুনান' গ্রন্থে। আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ-এর জন্মে আনন্দিত হওয়া, তাঁর জন্ম, জীবনী ও সীরাত-শামাইল আলোচনা করা বা তাঁর উপর দরুদ-সালাম পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত সম্মত ইবাদত। তবে এ সকল ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে সাহাবীগণ, তাবিয়ীগণ ও পরবর্তী কয়েক শতকের মুসলিমগণের পদ্ধতি ছিল সাধারণ। মীলাদে নববীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুন্নাত পদ্ধতি ছিল সোমবার সিয়াম পালন করা। আর তাঁর জন্ম জীবনী আলোচনার ক্ষেত্রে যে যখন যেভাবে পেরেছেন তাঁর জন্ম, জীবনী, সীরাত, শামাইল ইত্যাদি আলোচনা করেছেন। ৭ম হিজরী শতাব্দী থেকে বাৎসরিক ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনের পদ্ধতি চালু হয়। কয়েক শতাব্দী পরে মীলাদ মাহফিলের প্রচলন ঘটে।
(৬) মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ একমত যে, ঈদে মীলাদুন্নবী ও মীলাদ মাহফিল 'বিদ'আত' বা নব-উদ্ভাবিত কর্ম। তাঁদের কেউ তা বিদ'আতে হাসানা এবং কেউ তা বিদ'আতে সাইয়েয়াহ বলে গণ্য করেছেন। যারা তা বিদ'আতে সাইয়েয়াহ বলেছেন তারা রাসূলুল্লাহ-এর জন্মে আনন্দ প্রকাশ, জন্ম, জীবনী, সীরাত-শামাইল আলোচনা ও দরুদ-সালাম পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে কোনোরূপ দ্বিমত পোষণ করেন নি। বরং তারা এ সকল ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে সুন্নাত পদ্ধতি অনুসরণের তাকিদ দিয়েছেন। যারা একে বিদ'আতে হাসানা বলেছেন তারাও এ সকল ইবাদত পালনের জন্য এ পদ্ধতিকে জরুরী বলে গণ্য করেন নি, বরং এ পদ্ধতিকে তারা জায়েয বা বৈধ বলে গণ্য করেছেন।
(৭) কিন্তু প্রকৃত অবস্থা এই যে, যারা ঈদে মীলাদুন্নবী বা মীলাদ মাহফিল পালন করেন তারা বিশেষ পদ্ধতিকে দীনের অবিচ্ছেদ্য
অংশ বলে গণ্য করেন। এখন যদি কোনো ব্যক্তি অবিকল সুন্নাত পদ্ধতিতে বা সাহাবীগণের মত গাম্ভীর্যের সাথে দরূদ-সালাম পাঠ করেন এবং রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর জন্য জীবনী ও সীরাত-শামাইল আলোচনা করেন, কিন্তু তাঁদের নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ঈদে মীলাদুন্নবী বা মীলাদ মাহফিল পালন না করেন তবে তারা কখনোই তাঁকে কামিল মুমিন মনে করবেন না। তাদের মধ্যে কেউ মনে করেন লোকটা ভাল, তবে আমাদের মত মীলাদ করলে আরো ভালো হতো। আর কেউ হয়ত বলবেন, যত কিছুই কর না কেন, মীলাদ পালন না করে জান্নাতে যেতে পারবে না। জেনে অথবা না জেনে তিনি ‘শুদ্ধ মীলাদুন্নবী’ বা মীলাদ মাহফিলকেই রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর জন্যে আনন্দ প্রকাশের একমাত্র পথ বলে গণ্য করছেন।
(৮) ভালো করে লক্ষণীয় যে, যে ব্যক্তি এরূপ সুন্নাতের ব্যতিক্রম, খিলাফে সুন্নাত বা ‘বিদ'আত’ পদ্ধতির অনুসারী তাঁর মধ্যে এরূপ কর্ম বা পদ্ধতির মুহাব্বত বা ভালবাসা সাধারণত সুন্নাতের ভালবাসার চেয়ে অনেক গভীর ও সুদৃঢ় হয়। যিনি মীলাদ মাহফিল বা ঈদ মীলাদুন্নবী পালন করেন তিনি প্রতি সোমবারে সিয়াম পালন করে অথবা সাহাবীগণের পদ্ধতিতে সীরাত-শামাইল আলোচনা করে তত তৃপ্তি, হাল বা ‘ফায়েয’ লাভ করবেন না যতটা তৃপ্তি, হাল বা ফায়েয তিনি লাভ করবেন আনুষ্ঠানিক মীলাদ পালন করে। এভাবে তাঁর মনের গভীরে এ বিশ্বাস দৃঢ় হতে থাকে যে, হুবহু সুন্নাত পদ্ধতিতে এ সকল ইবাদত পালনে পূর্ণ লাভ সম্ভব নয়।
(৯) খেলাফে সুন্নাতের প্রতি অস্বাভাবিক ভালবাসার একটি বিশেষ দিক এই যে, এরূপ কর্মই মুসলিম উম্মাহর দলাদলি ও বিভক্তির অন্যতম কারণ। যতদিন মীলাদের উদ্ভাবন হয় নি, রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর জন্মের নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং আনন্দ প্রকাশের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোনো বিভক্তি সৃষ্টি হয় নি। বিষয়টি ছিল উন্মুক্ত। যে যখন যেভাবে পেরেছেন তা পালন করেছেন। ঈদে মীলাদুন্নবী এবং মীলাদ মাহফিলের উদ্ভাবনের পরে অনেক আলিমই এ বিষয়ক বিতর্ক হাক্ক বা সমঝোতার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিভক্তি রোধ করা যায় নি। সাধারণভাবে মীলাদের পক্ষের ব্যক্তি ‘সুন্নাহ’ ও ‘বেদাতের’ মাপকাঠি হিসেবে ইসলামকে সম্পূর্ণ ফরোয়াযি ও সুন্নাত ইবাদত পূর্ণভাবে পালন করেন কিন্তু মীলাদ না করেন তবে তিনি তাঁকে নিজের দলের বলে মনে করেন না। পক্ষান্তরে যদি কোনো ব্যক্তি আরকানুল ইসলাম সম্পূর্ণ সরোষ, ওয়াজিব ও সুন্নাত ইবাদতে অবহেলা করেন, কিন্তু মীলাদ পালনের পক্ষে থাকেন তবে তিনি তাঁকে নিজের দলের মানুষ বলেই মনে করেন।
(১০) এভাবে জেনে রাখুন যে, মীলাদ তিনি মনে করছেন যে, রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর জন্য আনন্দ প্রকাশের জন্য, তাঁর জন্য ও জীবনী আলোচনার জন্য দরূদ-সালাম পাঠের জন্য রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর নিজের শেখানো ও তাঁর সাহাবীগণের আচরণের পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। বরং সুন্নাত পদ্ধতি অপূর্ণ বা অচল, নতুন পদ্ধতিতে তা পালন না করা পর্যন্ত মুমিন তাঁর কামালাত, বেলায়াতে বা সাওয়াবের পূর্ণতা লাভ করতে পারেন না। আর এ-ই হলো ‘সুন্নাত অপছন্দ করা’।
(১১) এভাবে ধীরে ধীরে যে বিষয়ে সুন্নাতের ব্যতিক্রম নেইক আমল বা নেক আমলের পদ্ধতি চালু হয়েছে সেখানেও তাই করতে করতে সুন্নাত অপছন্দ করার পর্যায়ে চলে গিয়েছে।
(১২) এভাবে আমরা দেখছি যে, যত ভাল নিয়্যাতে সুন্নাতের ব্যতিক্রম নেইক কর্ম করা হোক সেই কর্ম করাও সুন্নাত অপছন্দ করার পর্যায়ে চলে যায়। আর বাহ্যত এজন্যেই রাসূলাল্লাহ ﷺ তাঁর সুন্নাতের অতিরিক্ত বা ব্যতিক্রম নেইক কর্ম করতে আপত্তি করেছেন। যদিও আপত্তি করেছেন তাঁর চেয়ে বেশি আপত্তি করেছেন সুন্নাতের অতিরিক্ত বা ব্যতিক্রম পদ্ধতিতে নেক কর্ম করতে উৎসাহ দিয়েছেন, কিন্তু খতম দেন নি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তাঁর পদ্ধতির ব্যতিক্রমভাবে তাহাজ্জুদ আদায় করতে ইচ্ছা করেছেন তাঁকে খতম দিয়েছেন। কারণ সাধারণভাবে প্রথম ব্যক্তির ক্ষেত্রে সুন্নাত অপছন্দ করার পর্যায়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, অথচ এরূপ সম্ভাবনা দ্বিতীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রে খুবই প্রবল। বাহ্যত এজন্যেই কুরআন কারীমে রাসূলাল্লাহ ﷺ-এর মুখালাফাত বা ব্যতিক্রম করতে এবং অবাধ্য হওয়া কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
এজন্যে মুহাম্মাদ ﷺ-এর রিসালাতে বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিশ্বাস করেন যে, মুহাম্মাদ ﷺ-এর কর্মের, রীতির ও আদর্শের অতিরিক্ত, ব্যতিক্রম বা বিরোধী কোনো কর্ম, রীতি বা আদর্শ আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর আদর্শই পরিপূর্ণ। আল্লাহর নৈকট্য, কামালাত, তাকওয়া, বেলায়েত, সাওয়াব যা জানাতে লাভের জন্য সুন্নাতের অতিরিক্ত কোনো কিছু করার প্রয়োজন নেই। আর রিসালাতের পূর্ণতা অবিশ্বাস করা। মুমিন হয়তো কোনো কারণে কোনো সুন্নাত পালনে অক্ষম হজরে সুন্নাতের ব্যতিক্রম কর্ম করতে পারেন, তবে সুন্নাতের ব্যতিক্রমকে তিনি কখনোই সুন্নাতের চেয়ে উত্তম, সুন্নাতের সমতুল্য, দ্বীন, সাওয়াব বা বেলায়েতের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করতে পারেন না। মুমিন কখনোই বিশ্বাস করতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যা করেন নি তা না করলে তাঁর দীনের কোনো ক্ষতি হবে বা অপূর্ণ থাকবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00