📄 তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহর দাবি তাওহীদুল ইবাদাত
প্রথম কারণ হলো দ্বিতীয় পর্যায়ের তাওহীদ, অর্থাৎ ইবাদতের তাওহীদ (তাওহীদুল উলুহিয়া) প্রথম পর্যায়ের তাওহীদ বা জ্ঞানের তাওহীদের ফসল ও ফলাফাল। যেহেতু আল্লাহ একামাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, রিযিকদাতা ও সর্বশক্তিমান কাজেই একমাত্র তাঁরই ইবাদত উপাসনা করা দরকার। যেহেতু সকল ক্ষমতা তাঁর সেইহেতু তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে উপাসনা করা নিতান্তই অর্থহীন ও জঘন্য অন্যায়। এজন্য পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একত্বের (তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ) কথা আহ্বান জানিয়েছেন।
বস্তুত, ‘ইলাহ’ (উপাস্য) এবং ‘রাব্ব’ (প্রতিপালক)-এর মধ্যে অর্থগত পার্থক্য সহজেই অনুমেয়। তাওহীদ পন্থী মুমিন আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে কারো ‘ইলাহ’ বলতে পারেন না; কারণ মহান আল্লাহ্ ছাড়া কেউ কোনোভাবে কোনো মুমিনের ‘ইলাহ’ বা উপাস্য হতে পারে না। পক্ষান্তরে মুমিন আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে কারো পালনকর্তা বা মালিক হিসেবে ‘রাব্ব’ বলতে পারেন। প্রসিদ্ধ দাঊদ ইসমাঈল ইবনু হাম্মাদ জাহিরী (ওহী) বলেন:
رَبٌّ كُلُّ شَيْءٍ مَالِكُهُ، وَالرَّبُ: اِسْمٌ مِنْ أَسْمَاءِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَلَا يُقَالُ فِي غَيْرِهِ إِلَّا بِالإِضَافَةِ “রাব্ব অর্থ মালিক বা স্বত্বাধিকারী, যে কোনো কিছুর রাব্ব অর্থ তাঁর মালিক বা স্বত্বাধিকারী। ‘আর-রাব্ব’ মহান আল্লাহর একটি নাম। মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে এ নামটি ব্যবহার করা যায় শুধু সম্পর্কের সাথে (অমুকের রাব্ব)। ইঊসুফ (আ)-এর কারাবাসের ঘটনায় আল্লাহ বলেন:
وَقَالَ لِلَّذِي ظَنَّ أَنَّهُ نَاجٍ مِنْهُمَا اذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ فَأَنْسَاهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ "উভয়ের মধ্যে যে মুক্তি পাবে বলে ইউসুফ ধারণা করেছিল তাকে সে বলল, তোমার রবের (হুযুর) নিকট আমার কথা বলো; কিন্তু শয়তান তাকে তার রবের (হুযুর) নিকট তাঁর বিষয় বলার কথা ভুলিয়ে দেয়।"১৫১ এখানে রাব্বুকা ও রাব্বুহ বলতে বাদশাহকে বুঝানো হয়েছে।
আরবের কাফিরগণ এবং অন্যান্য কাফির-মুশরিকগণ মহান আল্লাহকে মহাবিশ্বের একমাত্র প্রতিপালক ও সর্বভৌম মানত, অথচ তাঁকে একমাত্র ‘ইলাহ’ হিসেবে মানত না। বিষয়টি ছিল একান্তে অযৌক্তিক ও হাস্যকর। কারণ যিনি একমাত্র প্রতিপালক তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কারো নিকট ‘ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভয় ও আশা-সহায়তা’ প্রকাশ করতে যাব কেন?
এভাবে আমরা বুঝতে পারি যে, ইলাহ এবং রাব্ব-এর মধ্যে অর্থগত পার্থক্য থাকলেও, ব্যবহার দু’টি শব্দ একই সত্তার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়া উচিৎ। যিনিই রাব্ব তিনিই ইলাহ হবেন। আর যিনি রাব্ব নন তাঁর ইলাহ হওয়ার যোগ্যতা থাকতে পারে না। এজন্য অনেক সময় ইলাহ অর্থে রাব্ব ও রাব্ব অর্থে ইলাহ ব্যবহার করা হয়।
এ কারণে কুরআনে কারীমে বারবার কাফিরদের কর্ম ও বিশ্বাসের এ অযৌক্তিকতা তুলে ধরে বারংবার মহান আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁকে বারবার রাব্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, যেহেতু তিনিই একমাত্র রাব্ব বলে তোমরাও স্বীকার করছ, তবে কেন তাঁকে ছাড়া অন্যর ইবাদত করছ?
আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি যে, আল্লাহ তা‘আলা কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে রাসূলুল্লাহ -কে নির্দেশ দিয়েছেন ‘তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ’ সম্পর্কে কাফিরদেরকে প্রশ্ন করতে। এ সকল প্রশ্নের উদ্দেশ্য জ্ঞানের তাওহীদ থেকে কর্মের তাওহীদের দাওয়াত দেওয়া। যেহেতু তোমরাই স্বীকার করছ যে, আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক ও সর্বশক্তিমান, সেহেতু তাঁকে ছাড়া অন্য কারও উপাসনা, প্রার্থনা করা, সাহায্য চাওয়া, জবাই, মানত বা উৎসর্গ করা সুস্পষ্ঠ বিজাতিয় ছাড়া কিছুই নয়। এভাবে কাফিরদেরকে
তাদের শিকের অসারতা সুস্পষ্টভাবে বুঝানো হয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের কর্মের অসারতা স্বীকার করে নিয়েছে। এ ছাড়াও কুরআন করীমে বিভিন্ন স্থানে আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একত্বের কথা উল্লেখ করে একমাত্র তারই ইবাদত করার নির্দেশ দেওয় হয়েছে। এখানে দুটি উদাহরণ উল্লেখ করছি। আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ. "হে মানব জাতি, তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। যিনি পুথিবীকে তোমাদের জন্য বিছানা এবং আকাশকে ছাদ করে দিয়েছেন এবং আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তা দিয়ে তোমাদের জীবিকা হিসাবে বিভিন্ন প্রকারের ফল ফসল উৎপাদন করেছেন। অতএব তোমরা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বানাবে না।"১৫২
অন্যত্র বলা হয়েছে: وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ اللَّهُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ اللَّيْلَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَالنَّهَارَ مُبْصِرًا إِنَّ اللَّهَ لَذُو فَضْلٍ عَلَى النَّاسِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ. ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ خَالِقَ كُلِّ شَيْءٍ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُؤْفَكُونَ. كَذَلِكَ يُؤْفَكُ الَّذِينَ كَانُوا بِآيَاتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ اللَّهُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ قَرَارًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَصَوَّرَكُمْ فَأَحْسَنَ صُوَرَكُمْ وَرَزَقَكُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَتَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ. هُوَ الْحَيُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ . قُلْ إِنِّي نُهِيتُ أَنْ أَعْبُدَ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَمَّا جَاءَنِيَ الْبَيِّنَاتُ مِنْ رَبِّي وَأُمِرْتُ أَنْ أُسْلِمَ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ. "তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। যারা অহঙ্কারে আমার ইবাদতে বিমুখ হয় তারা অবশ্যই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আল্লাহই তোমাদের বিশ্রামের জন্য রাত সৃষ্টি করেছেন এবং দিনকে আলোকজ্জ্বল করেছেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষদের প্রতি অনুগ্রহশীল, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক, সব কিছুর স্রষ্টা, তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ (মাবুদ বা উপাস্য) নেই। তাহলে তোমরা কিভাবে বিপথে যাচ্ছ? এইভাবেই বিপথগামী হয় তারা যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে অস্বীকার করে। আল্লাহই তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বসোপযোগী করেছেন এবং আকাশকে করেছেন ছাদ। তিনি তোমাদের আকৃতি গঠন করেছেন এবং তোমাদেরকে উত্তম আকৃতি দান করেছেন এবং তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন উৎকৃষ্ট রিযক। এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ, কত মহান তিনি! তিনি চিরজ্ঞীর, তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ বা উপাস্য নেই, সুতরাং তোমরা তারই আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে তাকেই ডাক। জগৎসমুহের প্রতিপালক আল্লাহর নিমিত্ত সকল প্রশংসা। বল, আমার প্রতিপালকের নিকট থেকে আমার কাছে সুষ্পষ্ট নির্দশন আসার পর আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে তোমর ডাক তাদের ইবাদত করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে এবং আমাকে জগৎসমূহের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দেওয়া হয়েছে।"১৫৩
আমরা দেখেছি যে, 'ডাকা' বা প্রার্থনা করাই ইবাদতের মূল। এখানে মহান আল্লাহ প্রথমে আল্লাহকে ডাকতে বা তাঁর কাছেই প্রার্থনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর 'অহঙ্কারবশত' যারা আল্লাহর ইবাদত করে না, অর্থাৎ আল্লাকে ছেড়ে অন্য কাউকে ডাকে তাদের পরিণতি উল্লেখ করেছেন। এরপর আল্লাহর রূবুবিয়্যাতের তাওহীদের বিভিন্ন দিক উল্লেখ করে তাদেরকে ইবাদতের তাওহীদের দিকে আহবান করেছেন।
এভাবে আমরা দেখছি যে, কর্ম পর্যায়ের বা ইবাদতের তাওহীদ জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদের স্বাভাবিক প্রকাশ ও ফলাফল। যিনি একমাত্র স্রষ্টা ও প্রতিপালক একমাত্র তাঁরই ইবাদত উপাসনা করা উচিৎ। আর তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে যদি উপাসনা করা হয় তাহলে তাঁকে একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, সব কিছুর মালিক বা সর্বশক্তিমান বলে বিশ্বাস করা অর্থহীন হয়ে যায়। এজন্যই ইসলামী বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কর্ম পর্যায়ের বা ইবাদতের তাওহীদের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ "যারা বলে, 'আমাদের রাব্ব (প্রতিপালক) তো আল্লাহ' এবং এতে অবিচলিত থাকে তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।"১৫৪
কাফিরগণ স্বীকার ও বিশ্বাস করত এবং বলত যে 'রাব্বুনাল্লাহ' বা 'আমাদের রব্ব তো আল্লাহ'। তারা মহান আল্লাহকে 'আল্লাহ' ও 'আল্লাহুম্মা' এবং 'রাব্বানা' বা 'রাব্বী' বলেই ডাকত। তবে তাদের এ ডাক ও বিশ্বাস ছিল অর্থহীন। কারণ আল্লাহকে রাব্ব হিসেবে বিশ্বাস করার পর আবার অন্য কারো ইবাদত করার অর্থ 'রাব্বুনাল্লাহ' বিশ্বাসে অবিচলিত না থেকে তা থেকে বিচ্যুত হওয়া। কাফিরদের এ বিচ্যুতির দিকে বারংবার ইঙ্গিত করে কুরআন কারীমে সর্বদা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
📄 তাওহীদুল ইবাদাতেই কাফিরদের আপত্তি
ইবাদতের তাওহীদের উপর গুরুত্ব দেয়ার দ্বিতীয় কারণ হলো, এ পর্যায়ের তাওহীদেই বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীর মধ্যে পার্থক্য
নির্ধারিত হয়। যুগে যুগে ঈমান ও কুফ্রের মধ্যে মূলত এ ব্যাপারেই বিরোধ। প্রথম পর্যায়ের তাওহীদ বা আল্লাহর সৃষ্টি এবং প্রতিপালনের একত্বে অধিকাংশ মানুষই বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বের একাধিক স্রষ্টা আছেন অথবা এই বিশ্বের কোনো স্রষ্টা নেই- এ ধরণের বিশ্বাস খুবই কম মানুষেই করেছে বা করে। সকল যুগে সকল দেশের প্রায় সব মানুষই মূলত বিশ্বাস করেছেন এবং করেন যে, এই বিশ্বের একজনই স্রষ্টা ও প্রতিপালক রয়েছেন। কিন্তু তারা উপাসনা বা ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে ফিরিশতা, নবীগণ, নেককারগণ, জিন্নগণ, অন্যান্য দেবদেবী, পাথর, গাছপালা, মানুষ, মানুষের মুর্তি, স্মৃতিবিজড়িত স্থান, দ্রব্য বা স্মৃতিচিহ্নের পূজা, উপাসনা বা 'ভক্তি' করেছেন। আমরা যে কোনো শিরকে লিপ্ত অমুসলিম সমাজের দিকে তাকালেই বিষয়টি খুব সহজে উপলব্ধি করতে পারি। বিভিন্ন যুগের ও জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তাঁরা সবাই এ বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন। ১৫৫
কুরআন ও হাদীসে এ বিষয়ে বিশদভাবে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আমরা দেখতে পাই যে, যুগে যুগে আল্লাহ যে সকল নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন তাঁদের উম্মতেরা কখনই বলে নি যে, আল্লাহ ছাড়া এই বিশ্বের কোনো স্রষ্টা বা পালনকর্তা আছেন। বরং তারা সবাই আল্লাহকে একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, সংহারক বলে বিশ্বাস করতেন। তবে তারা মনে করতেন যে, অনেক দেব-দেবী, গাছ-পাথর, ফিরিশতা, জিন্ন বা মানুষের ঐশ্বরিক শক্তি আছে বা তারা আল্লাহর প্রিয়, কাজেই তাদেরকে উপসনা করলে, তাদের নামে মানত, জবাই বা প্রার্থনা করলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়, তাই তারা আল্লাহর ইবাদতের সাথে সাথে তাদেরও ইবাদত করতেন। নবী রাসূলগণ তাদেরকে সকল দেবদেবী পাথর মূর্তি ও মানুষের উপাসনা ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর উপাসনার জন্য আহবান জানান। কাফিরেরা তা মানতে অস্বীকার করে।
আমরা পূর্ববর্তী আলোচনায় মক্কার কাফিরদের বিষয়ে কুরআনের বর্ণনা থেকে বিষয়টি ভালভাবে বুঝতে পেরেছি। আমরা দেখেছি যে, তারা প্রথম পর্যায়ের তাওহীদ বিশ্বাস করতো। কিন্তু তারা দ্বিতীয় পর্যায়ের তাওহীদ, অর্থাৎ ইবাদতের তাওহীদে বিশ্বাস করতো না।
তারা আল্লাহর ইবাদত করতে অস্বীকার করত না, কিন্তু একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে অস্বীকার করত। কুরআনে কাফিরদের 'দু'আ', মানত, উৎসর্গ ইত্যাদি ইবাদতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলি তারা আল্লাহর জন্য করত। তারা আল্লাহর নামে মানত-কুরবানি করত এবং সাথে সাথে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য উপাস্যদের জন্যও মানত-কুরবানি করত। ইরশাদ করা হয়েছে:
وَجَعَلُوا لِلَّهِ مِمَّا ذَرَأَ مِنَ الْحَرْثِ وَالْأَنْعَامِ نَصِيبًا فَقَالُوا هَذَا لِلَّهِ بِزَعْمِهِمْ وَهَذَا لِشُرَكَائِنَا فَمَا كَانَ لِشُرَكَائِهِمْ فَلَا يَصِلُ إِلَى اللَّهِ وَمَا كَانَ لِلَّهِ فَهُوَ يَصِلُ إِلَى شُرَكَائِهِمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ "আল্লাহ যে শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করেছেন তন্মধ্যে থেকে তারা আল্লাহর জন্য এক অংশ নির্দিষ্ট করে এবং নিজেদের ধারণা অনুযায়ী বলে, 'এটি আল্লাহর জন্য এবং এটি আমাদের উপাস্যদের জন্য'।"১৫৬
কুরআন কারীমের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, মুশরিকদের প্রধান ইবাদত ছিল 'দু'আ' অর্থাৎ ডাকা বা ত্রাণ বা উদ্ধারের জন্য আবেদন বা প্রার্থনা করা। এজন্য কুরআন করীমে এদের শিরককে অধিকাংশ স্থানে 'দু'আ' নামে অভিহিত করা হয়েছে। প্রায় ৭০ এরও অধিক স্থানে মুশরিকদের শিরককে 'দু'আ' বলে অভিহিত করা হয়েছে।
কুরআনে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুশরিকগণ মহান আল্লাহর কাছে দু'আ করত, তাঁকে ডাকত এবং তার কাছে সাহায্য, বিজয় ইত্যাদি প্রার্থনা করত। রাসূলুল্লাহ যখন তাদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে আহ্বান করলেন তখন কাফিরগণ আল্লাহর কাছে দু'আ করে বলত,
اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ هَذَا هُوَ الْحَقَّ مِنْ عِنْدِكَ فَأَمْطِرْ عَلَيْنَا حِجَارَةً مِنَ السَّمَاءِ أَوِ ائْتِنَا بِعَذَابٍ أَلِيمٍ "হে আল্লাহ, যদি (মুহম্মদ যা প্রচার করছে) তা আপনার পাঠান সঠিক ও সত্য ধর্ম হয়, তবে আপনি আমাদের উপর আসমান থেকে পাথর বর্ষণ করুন অথবা আমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দান করুন।"১৫৭
বদরের যুদ্ধে যাত্রার আগে মক্কার কাফিরগণ পবিত্র কা'বা গৃহের গিলাফ বা বহিরাবরণী ধরে আল্লাহর কাছে দু'আ করেন এবং বলেন, “হে আল্লাহ আপনি আমাদের এবং মুহাম্মাদের (৫) দলের মধ্যে যে দল বেশি সম্মানিত ও বেশি ভাল তাদেরকে বিজয়ী করে দেন।” কাফিরদের নেতা আবু জাহল আল্লাহর কাছে দু'আ করে বলে, "হে আল্লাহ আমাদের (কাফির ও মুসলিমদের) মধ্য থেকে যারা বেশি পাপী, যারা বেশী আত্মীয়তার সম্পর্ক বিনষ্টকারী তাদেরকে আপনি এই যুদ্ধে পরাজিত করুন।"১৫৮
এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
إِن تَسْتَفْتِحُوا فَقَدْ جَاءَكُمُ الْفَتْحُ "তোমরা যদি বিজয় প্রার্থনা করে থাক, তবে বিজয় এসে গিয়েছে"১৫৯।
অর্থাৎ তোমরা ভাল দলের বিজয় প্রার্থনা করেছিলে, আল্লাহ ভাল দলকে বিজয়ী করেছেন।
আল্লাহর কাছে দু'আ করার পাশাপাশি তারা তাদের অন্যান্য উপাস্যের কাছেও দু'আ করত। সাধারণত দু'আ কুবুল হওয়ার আশায় তারা দু'আর পূর্বে মানত, উৎসর্গ, কুরবানী ইত্যাদি পেশ করত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাফিরগণ সাধারণ ও ছোটখাট বিপদ-আপদে আল্লাহকে ডাকত না, বরং এ সকল ক্ষেত্রে তারা তাদের অন্যান্য উপাস্যকে ডাকত এবং তার সাহায্য প্রার্থনা করত। আর কঠিন বিপদে পড়লে তারা আল্লাহকে ডাকত। কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ أَرَأَيْتَكُمْ إِنْ أَتَاكُمْ عَذَابُ اللَّهِ أَوْ أَتَتْكُمُ السَّاعَةُ أَغَيْرَ اللَّهِ تَدْعُونَ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ بَلْ إِيَّاهُ تَدْعُونَ فَيَكْشِفُ مَا تَدْعُونَ إِلَيْهِ إِنْ شَاءَ وَتَنْسَوْنَ مَا تُشْرِكُونَ "বলুন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তোমরা বলতো, আল্লাহর শান্তি তোমাদের উপর আপতিত হলে, অথবা তোমাদের নিকট কিয়ামত উপস্থিত হলে তোমরা কি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে? বরং তোমরা শুধু তাকেই ডাকবে। তিনি ইচ্ছা করলে যে বিপদের জন্য তাকে ডাকবে তোমাদের সে বিপদ তিনি দূর করবেন এবং যাদেরকে তোমরা শরীক করতে তাদেরকে তোমরা ভুলে যাবে।"১৬০ মহান আল্লাহ আরো বলেন:
فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُونَ "তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে তখন তারা বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তারা শিরকে লিপ্ত হয়।"১৬১ অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন:
وَإِذَا غَشِيَهُمْ مَوْجٌ كَالظُّلَلِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ فَمِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ وَمَا يَجْحَدُ بِآيَاتِنَا إِلَّا كُلُّ خَتَّارٍ كَفُورٌ "যখন তরঙ্গ তাদেরকে আচ্ছন্ন করে মেঘচ্ছায়ার মত তখন তারা আল্লাহকে ডাকে তাঁর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে। কিন্তু যখন তিনি তাদেরকে উদ্দার করে স্থলে পৌঁছান তখন তাদের কেউ কেউ সরল পথে থাকে; কেবল বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই তার নিদর্শনাবলি অস্বীকার করে। "১৬২
কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।১৬৩ কুরআনের বিবরণ থেকে বুঝা যায় যে, অধিকাংশ মুশরিকই এইভাবে চলত। সূরা হজ্বের একটি বর্ণনা থেকে দেখা যায় যে, কিছু মানুষ সাধারণভাবে আল্লাহর ইবাদত করত। কিন্তু আল্লাহর প্রতি তাদের আস্থা ও ঈমানের দৃঢ়তা খুবই কম। এজন্য কঠিন বিপদে পড়লে তারা ঈমান হারিয়ে ফেলত এবং শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়ত। তখন আল্লাহ ছাড়া অন্য উপাস্যর কাছে চাওয়া শুরু করত। ১৬৪ এভাবে তারা আল্লাহর ইবাদত করলেও, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে ভয়ঙ্করভাবে অস্বীকার করত। মহান আল্লাহ বলেন:
إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ. وَيَقُولُونَ أَإِنَّا لَتَارِكُوا آلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَجْنُونٍ "তাদের নিকট যখন বলা হয় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ: আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই' তখন তারা অহঙ্কার করে। এবং বলে, আমরা কি এক উন্মাদ কবির জন্য আমাদের ইলাহগণকে বর্জন করব?"১৬৫ অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
وَعَجِبُوا أَنْ جَاءَهُمْ مُنْذِرٌ مِنْهُمْ وَقَالَ الْكَافِرُونَ هَذَا سَاحِرٌ كَذَّابٌ أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ. وَانطَلَقَ الْمَلَأُ مِنْهُمْ أَنْ امْشُوا وَاصْبِرُوا عَلَى آلِهَتِكُمْ إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ يُرَادُ. مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ إِنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلَاقٌ. "এবং তারা বিস্ময় বোধ করছে যে, তাদের কাছে তাদের মধ্য থেকে একজন সতর্ককারী (রাসূল) এসেছেন এবং কাফিররা বলে: এতো এক যাদুকর, মিথ্যাবাদী। সে কি বহু উপাস্যের (ইলাহের) স্থানে এক উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? এ তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার। তাদের প্রধানেরা সরে পড়ে এই বলে যে, তোমরা চলে যাও এবং তোমাদের উপাস্যদের বিষয়ে অবিচল-স্থিরচিত্ত থাক। নিশ্চয় এ ব্যাপারটি উদ্দেশ্যমূলক। আমরা তো অন্য ধর্মাদর্শে এরূপ কথা শুনি নি; নিশ্চয় এ এক মনগড়া কথা। "১৬৬
তারা তাদের মাবুদদের পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদত করলেও, মূলত এককভাবে আল্লাহর কথা আলোচনা করা বা আল্লাহর একত্বের ও মহত্বের আলোচনা করায় তারা বিরক্ত হতো। মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِذَا ذَكَرْتَ رَبَّكَ فِي الْقُرْآنِ وَحْدَهُ وَلَّوْا عَلَى أَدْبَارِهِمْ نُفُورًا "যখন তুমি তোমার প্রতিপালককে উল্লেখ কর কুরআনের মধ্যে এককভাবে তখন পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে তারা সরে পড়ে।"১৬৭ মহান আল্লাহ বলেন:
"একমাত্র আল্লাহর কথা বলা হলে যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না তাদের অন্তর বিতৃষ্ণায় সংকুচিত হয় এবং আল্লাহর পরিবর্তে যারা তাদের উল্লেখ করা হয়ে তারা আনন্দে উল্লসিত হয়।"১৬৮ ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে তাদের চরম শত্রুতা এবং রাসূলুল্লাহ-এর চরম বিরোধিতার কারণ ছিল এই তাওহীদুল ইবাদাতের বিশ্বাস।
📄 কাফিরদের আপত্তির কারণ
উপরের আলোচনা থেকে একটি প্রশ্ন আমাদের মনে স্বভাবতই জাগ্রত হয়। তা হলো, মহান আল্লাহকে একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক ও সর্বশক্তিমান বলে বিশ্বাস করার পরেও কেন তারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে এত কঠিনভাবে অস্বীকার করত? কেনই বা তারা এককভাবে আল্লাহর যিক্র বা আলোচনা হলে বিরক্ত হতো?
কুরআন ও হাদীসের বিবরণ থেকে বুঝা যায় যে, তারা মহান আল্লাহকে জাগতিক রাজা-মহারাজাদের মতই কল্পনা করত। তারা মনে করত যে, ফিরিশতাগণ, নবীগণ বা অনুরূপ পর্যায়ের আল্লাহর কিছু বান্দা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করে আল্লাহর বিশেষ প্রেম ও ভালবাসা অর্জন করেছেন। ফলে মহান আল্লাহ এদেরকে বিশেষ মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছেন, যে মর্যাদা ও অধিকারের ফলে এ সকল 'প্রিয়পাত্র' উলুহিয়্যাত' অর্থাৎ ইবাদত বা চূড়ান্ত ও অলৌকিক ভক্তি ও বিনয় লাভের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। একজন জাগতিক মহারাজ যেমন তার প্রিয় দাস বা খাদিমকে খুশি হয়ে রাজত্বের কিছু অংশ প্রদান করেন, অনুরূপভাবে মহান আল্লাহ এদেরকে বিশ্ব পরিচালনার কিছু ক্ষমতা প্রদান করেছেন। আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো ক্ষমতা এদের নেই, তবে মহারাজ যেমন সামন্ত রাজাদের রাজ্য পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করেন না, তেমনি আল্লাহও এদের কাজে কর্মে বাধা দেন না; কারণ তিনিই ভালবেসে এদেরকে উলুহিয়্যাত ও রবুবিয়্যাতে শরীক করেছেন। তাদের এ বিশ্বাস প্রকাশ করে হজ্জের তালবিয়া পাঠের সময় তারা বলত:
لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ إِلَّا شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُهُ وَمَا مَلَكَ লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক... আপনার কোনো শরীক নেই, তবে আপনি নিজে যাকে আপনার শরীক বানিয়েছেন সে ছাড়া। এরূপ শরীকও আপনারই মালিকানাধীন, আপনারই বান্দা, উক্ত শরীক ও তার সকল কর্তৃত্ব ও রাজত্ব আপনারই অধীন।"১৬৯
এজন্য তারা বিশ্বাস করত যে, সরাসরি আল্লাহর ডাকলে বা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করলে আল্লাহর এ সকল প্রিয়পাত্রের অধিকার ও ক্ষমতা অস্বীকার করা হয় এবং বেয়াদবি হয়। আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে হলে এদের মাধ্যমেই যেতে হবে, যেমন মহারাজের নিকট আবেদন করতে 'যথাযথ কর্তৃপক্ষে' মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। এদের মাধ্যম ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ সম্ভব না। তাদের এ বিশ্বাস সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য আউলিয়া (অভিভাবক বা বন্ধু) গ্রহন করেছে তারা বলে, আমরা তো এদের শুধু এজন্যই ইবাদাত করি যে এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেবে।"১৭০
তারা বিশ্বাস করত যে, এ সকল 'আউলিয়া'-র রয়েছে আল্লাহর কাছে বিশেষ অধিকার, ফলে এরা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে দ্রুত হাজত মিটিয়ে দিতে পারেন। কাজেই এদের ডাকলে যত দ্রুত সাড়া পাওয়া যায়, সরাসরি আল্লাহকে ডেকে তা পাওয়া যায় না। এবিষয়ে আল্লাহ বলেন:
وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ "তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করে তারা তাদের কোনো ক্ষতিও করতে পারে না উপকারও করতে পারে না। তারা বলে এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী (শাফায়াতকারী)।"১৭১
এখানে লক্ষণীয় যে, তাদের এ সকল দাবি ও বিশ্বাস বিবেক ও যুক্তি বিরোধী। কারণ আল্লাহই যখন একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক ও সর্বশক্তিমান তখন কেন মানুষ অন্য কারো কাছে নিজের চূড়ান্ত অসহায়ত্ব প্রকাশ করবে?
এছাড়া তাদের এ দাবিগুলি সবই মহান আল্লাহ কেন্দ্রিক। মহান আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ক্ষমতা প্রদান করেছেন, অথবা তিনি সাধারণভাবে ফিরিশতা বা নবীগণ বা বিশেষ শ্রেণীর মানুষদেরকে উলুহিয়্যাত বা রুবুবিয়্যাতের ক্ষমতা, অধিকার বা শরিকানা প্রদান করেছেন, এবং এসকল ক্ষমতা ও অধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে সরাসরি আল্লাহকে ডাকলে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন বলে দাবি করতে হলে তা আল্লাহর থেকে প্রাপ্ত ওহীর মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। এজন্য কুরআন কারীমে বারংবার তাদের নিকট কিতাবের প্রমাণ চাওয়া হয়েছে। স্বভাবতই তারা কখনো কোনো প্রমাণ দিতে পারে নি। তারা শুধু ওহীর কয়েকটি পরিভাষার অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার করেছে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে মহান আল্লাহ নেককার বান্দাদের বা নবী ও ফিরিশতাদের ভালবাসার কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া নেককার বান্দাদের সুপারিশ বা শাফা'আতের বিষয়টিও ওহীর মাধ্যমে স্বীকৃত। অনুরূপভাবে মুজিযা ও কারামতের বিষয়টিও ওহীর মাধ্যমে স্বীকৃত। মুশরিকগণ এ বিষয়গুলি বিকৃত করে তাদের শিরক প্রমাণ করতে চেষ্টা করত।
তাদের যুক্তির ধারা অনেকটা নিম্নরূপ: (১) আল্লাহ অমুক বা তমুককে ভালবাসেন, (২) যেহেতু তিনি তাঁকে ভালবাসেন সেহেতু নিশ্চয় তিনি তাকে রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতে শরীক বানিয়েছেন বা বিশ্ব পরিচালনার কিছু দায়িত্ব ও ক্ষমতা তাকে দিয়েছেন, (৩) এ ক্ষমতার প্রমাণ তাদের মুজিযা-কারামত বা অলৌকিক কার্যাদি, (৪) যেহেতু তিনি তাদেরকে রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের কিছু ক্ষমতা ও সুযোগ দিয়েছেন সেহেতু তাদের বাদ দিয়ে সরাসরি আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া যায় না, (৫) যেহেতু তাদের শাফা'আতের অধিকার স্বীকৃত, কাজেই তাদের কাছেই হাজত পেশ করতে হবে এবং (৬) তাদের বাদ দিয়ে সরাসরি আল্লাহকে ডাকা হলে বা তাদের মহত্বের আলোচনা বাদ দিয়ে শুধু আল্লাহর মহত্ব ও মর্যাদা আলোচনা করলে তাদের সাথে বেয়াদবি হয় যা ক্ষমার অযোগ্য।
তাদের এ সকল যুক্তির ভিত্তিতে তারা তওহীদের প্রচারকদের ভয়-ভীতি দেখাত। তারা বলত, আল্লাহর প্রিয়পাত্র যাদের আমরা ইবাদত করি তোমরা এদের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ না করলে এরা তোমাদের ক্ষতি করে দেবে। তাওহীদের প্রচারকদের ভীতিপ্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাদের চিন্তাধারা ছিল নিম্নরূপ:
(১) একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে বলার অর্থই আল্লাহর প্রিয়পাত্র ফিরিশতা, নবী, ওলী বা আল্লাহর সন্তানদের বিরুদ্ধে কথা বলা! আল্লাহ ছাড়া কারো ডাকা যাবে না, সাজদা করা যাবে না, মানত করা যাবে না ইত্যাদি বলার অর্থ এ আল্লাহর এ সকল প্রিয়পাত্রের সাথে বেয়াদবী করা!!
(২) এরূপ বেয়াদবীতে আল্লাহর এ সকল প্রিয়পাত্র বেজায় অখুশি ও নারায হন! ফলে এরূপ বেয়াদবদের তারা শাস্তি দেন!! মহান আল্লাহ তাদেরকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন সে ক্ষমতাবলে তারা বেয়াদবদের শাস্তি দিতে পারেন!!! মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আ)-এর প্রসঙ্গে বলেন:
وَحَاجَّهُ قَوْمُهُ قَالَ أَتُحَاجُّونِّي فِي اللَّهِ وَقَدْ هَدَانِ وَلَا أَخَافُ مَا تُشْرِكُونَ بِهِ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ رَبِّي شَيْئًا وَسِعَ رَبِّي كُلَّ شَيْءٍ عِلْمًا أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلَا تَخَافُونَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُمْ بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلُ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالْأَمْنِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ "তার সম্প্রদায় তার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হলো। সে বলল, তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হবে? তিনি তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন। তোমরা যাদেরকে তাঁর সাথে শরীক কর আমি তাদেরকে ভয় করি না, তবে আমার প্রতিপালক যদি কিছু ইচ্ছা করেন (অর্থাৎ এসকল উপাস্য আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে বলে আমি ভয় পাই না, আমার যদি কোনো ক্ষতি বা বিপদ হয় তবে আল্লাহর ইচ্ছাতেই হবে, তোমাদের উপাস্যদের ইচ্ছাতে নয়)। সব কিছুই আমার প্রতিপালকের জ্ঞানায়ত্ব, তবে কি তোমরা অবধান কর না? তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক কর আমি তাদেরকে কিভাবে ভয় করব? অথচ আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার কোনোরূপ অনুমতি প্রদান না করা সত্ত্বেও তেমারা আল্লাহর সাথে শরীক করতে ভয় পাও না? তাহলে তোমাদের যদি জ্ঞান থাকে তবে বল তো কোন দল নিরাপত্তা লাভের যোগ্য?"১৭২
রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَهُ وَيُخَوِّفُونَكَ بِالَّذِينَ مِنْ دُونِهِ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ وَمَنْ يَهْدِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُضِلٍّ أَلَيْسَ اللَّهُ بِعَزِيزِ ذِي انْتِقَامٍ وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلْ أَفَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِي اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ "আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? অথচ তারা তোমাকে আল্লাহর পরিবর্তে যারা তাদের ভয় দেখায়। আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার জন্য কোনো পথ-প্রদর্শক নেই। এবং আল্লাহ যাকে হিদায়াত করেন তার জন্য কোনো পথভ্রষ্টকারী নেই। আল্লাহ কি পরাক্রমশালী, দণ্ডবিধায়ক নন? তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ।' তুমি বল, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ আমার অনিষ্ট চাইলে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি সে অনুগ্রহ রোধ করতে পারবে? বল, 'আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।' নির্ভরকারিগণ আল্লাহর উপরেই নির্ভর করে।"১৭৩
এখানে কুরআন কারীমের যুক্তি প্রদান পদ্ধতি লক্ষ্য করুন। এ সকল মুশরিক রাসূলুল্লাহকে তাদের ভয় দেখাচ্ছে যে, তাদের বাদ দিয়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের কথা বলার অর্থই তাদের সাথে বেয়াদবী করা এবং তাদের অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা। এতে তারা নারাজ হয়ে তোমার অমঙ্গল ও ক্ষতি করবে। এখন প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহ যদি আমার ভাল চান তাহলে কি তারা তা ঠেকাতে পারে? যদি তিনি আমার অমঙ্গল চান তাহলে কি তারা তা রোধ করতে পারে? উভয় ক্ষেত্রে মুশরিকদের উত্তর হলো: না। আর তারা যেহেতু এতই অক্ষম তাহলে তাদের ডাকার দরকার কী? মহান আল্লাহকে ডাকলেই তো হলো। তিনিই তো তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট।
এভাবে আমরা দেখছি যে, মুশরিকগণ একটি ভিত্তিহীন কল্পনার উপরেই শিরকে লিপ্ত হয়, যে মহান আল্লাহ যেহেতু এ সকল বান্দাকে ভালবাসেন, সেহেতু তিনি অবশ্যই এদেরকে কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন এবং এদের না ডেকে সরাসরি আল্লাহকে ডাকলে এদের সাথে বেয়াদবী হয়। তাদের এ সকল যুক্তি সবই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কল্পনা এবং ওহীর কয়েকটি বিষয়ে বিকৃতি বৈ কিছুই নয়। শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলবী বলেন: “প্রত্যেক নবীই তাঁর উম্মাতকে সুনিশ্চিতরূপে শিরকের হাকীকত বুঝিয়ে গিয়েছেন। এরপর যখন নবীর
প্রিয় সহযোগীগণ এবং তাঁর দীনের বাহকগণ গত হন, তাদের পরে নতুন একটি প্রজন্ম আগমন করে, যারা সালাত বিনষ্ট করে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। তখন এরা ওহীর মধ্যে ব্যবহৃত দ্ব্যর্থবোধক শব্দাবলিকে বিকৃত অর্থে ব্যবহার করে। অনুরূপভাবে আল্লাহর প্রিয়ত্ব এবং শাফা'আতের বিষয়দুটি সকল শরীয়তেই বিশেষ মানুষদের জন্য উল্লেখ করা হয়েছে। তারা এ দুটি বিষয়েরও বিকৃত অর্থ করে। এছাড়া তারা অলৌকিক কর্মাদি এবং কাশফ-ইলহামের বিষয়টিকে ক্ষমতা ও গাইবী ইলমের প্রমাণ হিসেবে পেশ করে। যার থেকে এরূপ অলৌকিক কর্ম বা কাশফ দেখা গিয়েছে তাকে অলৌকিক ক্ষমতা ও জ্ঞানের মালিক বলে তারা দাবি করে। "১৭৪
📄 ইবাদতের তাওহীদই সকল নবী-রাসূলের দাও‘আত
ইবাদততের তাওহীদই ছিল যুগে যুগে সকল নবী-রাসূলের প্রথম ও মূল দাও'আত। কুরআন কারীম থেকে আমরা জানতে পারি যে, সকল নবী ও রাসূল তাঁর উম্মাতকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে আহবান করেছেন। প্রথম রাসূল নূহ (আ) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
لَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ "আমি তো নূহকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের নিকট এবং সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়, আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীয়ত তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ (মাবুদ বা উপাস্য) নেই।"১৭৫ হৃদ (আ) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ "'আদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা হৃদকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। "১৭৬ সালিহ (আ) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ "সামূদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা সালিহকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই।"১৭৭ শু'আইব (আ) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ "মায়ানবাসীদের নিকট তাদের ভ্রাতা শু'আইবকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর 'ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। "১৭৮ সকল নবীকেই এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ "আমি তোমার পূর্বে কোনো রাসূলই প্রেরণ করি নি এই ওহী ব্যতীত যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই, সুতরাং আমারই ইবাদত কর।"১৭৯
আমরা দেখেছি যে, অন্য আয়াতে এ বিষয়ে বলা হয়েছে: "আল্লাহর ইবাদত করার এবং তাগূতকে বর্জন করার নির্দেশ দিয়ে আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল প্রেরণ করেছি।"