📄 ইবাদতের পরিচয় ও সংজ্ঞা
ইবাদত শব্দটি আভিধানিকভাবে 'আবদ' বা 'দাস' শব্দ থেকে গৃহীত। দাসত্ব বলতে 'উবৃদিয়্যাত' ও 'ইবাদত' দুটি শব্দ
ব্যবহৃত হয়। উবৃদিয়্যাত ব্যবহৃত হয় লৌকিক বা জাগতিক দাসত্বের ক্ষেত্রে। আর 'ইবাদত' বুঝানো হয় অলৌকিক, অজাগতিক বা অপার্থিব দাসত্বের ক্ষেত্রে। সকল যুগে সকল দেশের মানুষই জীবন, মৃত্যু ইত্যাদি অতিপরিচিত শব্দের মতই 'ইবাদত', উপাসনা, worship, veneration ইত্যাদি শব্দের অর্থ স্বাভাবিকভাবেই বুঝে। মানুষ অন্য মানুষের দাস হতে পারে বা দাসত্ব করতে পারে, তবে সে অন্য যে কোনো সত্তার 'ইবাদত' বা উপাসনা করে না। শুধু মাত্র যার মধ্যে অলৌকিক বা অপার্থিব ক্ষমতা আছে, ইচ্ছা করলেই মঙ্গল করার বা অমঙ্গল করার বা তা রোধ করার অলৌকিক শক্তি বা অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করে তারই 'ইবাদত' করে।
প্রসিদ্ধ ভাষাবিদ রাগিব ইস্পাহানী হুসাইন ইবনু মুহাম্মাদ (৫০২ হি) বলেন: العبودية إظهار التذلل والعبادة أبلغ منها لأنها غاية التذلل ولا يستحقها إلا من له غاية الأفعال (الإفضال) "'উবৃদিয়াত' (slavery, serfdom, bondage) হলো বিনয়-ভক্তি প্রকাশ করা। আর 'ইবাদত' (worship, veneration) এর চেয়েও অধিক গভীর অর্থজ্ঞাপক। কারণ ইবাদত হলো চূড়ান্ত বিনয়-ভক্তি-অসহায়ত্ব প্রকাশ, যিনি চূড়ান্ত কর্ম- ক্ষমতা ও দয়ার মালিক তিনি ছাড়া কেউ এই চূড়ান্ত বিনয়-ভক্তি পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না।"১৩৬ অন্যান্য আলিমও অনুরূপ সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তাদের ভাষায়:
"ইবাদতের আভিধানিক অর্থ হলো, চূড়ান্ত বিনয়-ভক্তি, অসহায়ত্ব ও মুখাপেক্ষিত্ব। "১৩৭ আল্লামা ইবনু কাসীর (৭৭৪ হি) বলেন: الْعِبَادَةُ عَلَى الْمَعْنَى اللُّغَوِيِّ غَايَةُ التَّذَلُّلِ وَالِافْتِقَارِ وَالِاسْتِكَانَةِ وَالْعِبَادَةُ فِي اللُّغَةِ مِنَ الذِّلَّةِ ... وَفِي الشَّرْعِ عِبَارَةٌ عَمَّا يَجْمَعُ كَمَالَ الْمَحَبَّةِ وَالْخُضُوعِ وَالْخَوْفِ "আভিধানিকভাবে ইবাদত অর্থ ভক্তি-বিনয় বা অসহায়ত্ব।... আর শরীয়তের পরিভাষায় পরিপূর্ণ ভালবাসা, ভক্তি, বিনয় ও ভীতির সমন্বিত অবস্থাকে ইবাদত বলা হয়।"১৩৮
এভাবে আমরা দেখছি যে, পরিপূর্ণ ভালবাসা ও ভীতিময় চূড়ান্ত ভক্তিই ইবাদত। আর চূড়ান্ত বিনয়, অসহায়ত্ব ভক্তি প্রকাশ করে চূড়ান্ত ক্ষমতা ও করুণার অধিকারীর জন্য যে কর্ম করা হয় তা বিভিন্ন পর্যায়ের। তার কাছে যেমন প্রার্থনা করা হয় তেমনি তার প্রশংসাও করা হয়। সবই ইবাদত। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষ যা কিছু করে সবই ইবাদত বলে গণ্য। এজন্য ইবাদতের ব্যাখ্যায় বলা হয়: اسْمٌ جَامِعٌ لِكُلِّ مَا يُحِبُّهُ اللَّهُ وَيَرْضَاهُ مِنَ الْأَقْوَالِ وَالْأَعْمَالِ الظَّاهِرَةِ وَالْبَاطِنَةِ “আল্লাহ ভালবাসেন এরূপ সকল কথা, বাহ্যিক কর্ম ও হার্দিক বা মানসিক কর্ম সব কিছুই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। "১৩৯
📄 কর্ম পর্যায়ের একত্ব বা ইবাদতের একত্ব
আরবীতে একে 'তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ' )توحيد الألوهية অর্থাৎ 'ইবাদত বা উপাসনার একত্ব' বা 'আত-তাওহীদুল ইরাদী আত-তালাবী' )التوحيد الإرادي الطلبي অর্থাৎ 'ইচ্ছাধীন নির্দেশিত একত্ব' বলা হয়।
📄 ইবাদতের প্রকারভেদ
তবে সব কর্ম এক পর্যায়ের নয়। কিছু কর্ম আছে যা সাধারণভাবে মানুষ 'ইবাদত' হিসেবেই করে। যে সত্তার এরূপ অলৌকিক ক্ষমতা ও আধিপত্য আছে তাকেই তা প্রদান করে। সকল সমাজের সকল ভাষার মানুষই এগুলি জানেন। পূজা, অর্চনা, বলি, কুরবানী, মানত, প্রার্থনা ইত্যাদি এই জাতীয় কর্ম। পাশাপাশি কিছু কর্ম আছে যা মানুষ ইবাদত হিসেবে করে, আবার জাগতিকভাবেও করে। যেমন প্রশংসা করা, ভয় করা, আনুগত্য করা ইত্যাদি। এগুলি মানুষ মানুষ হিসেবে জাগতিকভাবে অন্য মানুষের জন্য করে। আবার 'মা'বূদ' বা পূজিত সত্তার জন্যও করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রথম প্রকারের কর্ম আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করাই শিরক। যেমন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য মানত, বলি, উৎসর্গ, জবাই ইত্যাদি করা। এগুলি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করলে তা শিরক বলে গণ্য হবে। কারণ কারো ভিতরে ঈশ্বরত্ব (divinity, holiness, sacredness, sanctity) ঐশ্বরিক ক্ষমতা, চূড়ান্ত আধিপত্য, অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা, অলৌকিক শক্তি ইত্যাদি কল্পনা না করলে কেউ তার জন্য এরূপ কর্ম করে না। এ বিষয়ে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রাহ) বলেন: اعْلَمْ أَنَّ الْعِبَادَةَ هِيَ التَّذَلُّلُ الْأَقْصَى. وَكَوْنُ التَّذَلُّلِ أَقْصَى مِنْ غَيْرِهِ لَا يَخْلُو إِمَّا أَن يَكُونَ بِالصُّورَةِ، مِثْلَ كَوْنِ هَذَا قِيَامًا وَذَلِكَ سُجُودًا، أَوْ بِالنِّيَّةِ بِأَن نَوَى بِهَذَا الْفِعْلِ تَعْظِيمَ الْعِبَادِ لِمَوْلَاهُمْ، وَبِذَلِكَ تَعْظِيمَ الرَّعِيَّةِ لِلْمُلُوكِ، أَوِ التَّلَامِذَةِ لِلْأُسْتَاذِ، لَا ثَالِثَ لَهُمَا. "জেনে রাখ, ইবাদত হলো চূড়ান্ত ভক্তি-বিনয়। কোন্ ভক্তি-বিনয় চূড়ান্ত এবং কোন্টি চূড়ান্ত নয় তা দুভাবে জানা যায়: (১) ভক্তি-বিনয়ের প্রকার থেকে, যেমন দাঁড়িয়ে ভক্তি করা চূড়ান্ত ভক্তি নয় তবে সাজদা করা চূড়ান্ত ভক্তি এবং (২) নিয়্যাত বা উদ্দেশ্য থেকে, যেমন বান্দা হিসেবে তার মাবুদকে ভক্তি করার উদ্দেশে যে ভক্তি বা বিনয় প্রকাশ করা হয় তা চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে এবং প্রজা হিসেবে রাজার বা ছাত্র হিসেবে শিক্ষকের ভক্তির নিয়েতে যা করা হয় তা চূড়ান্ত ভক্তি নয় বলে গণ্য। ভক্তি-বিনয় চূড়ান্ত পর্যায়ের কি না তা জানার তৃতীয় কোনো পথ নেই। "১৪০
📄 তাওহীদুল ইবাদাতের অর্থ
তাওহীদুল ইবাদাতের অর্থ সকল প্রকার ইবাদাত, যেমন প্রার্থনা, সাজদা, জবাই, উৎসর্গ, মানত, তাওয়াক্কুল-নির্ভরতা
ইত্যাদি- একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য বলে বিশ্বাস করা।
কেউ যদি আল্লাহর ইবাদাত করেন এবং সাথে সাথে অন্য কারো ইবাদাত করেন তাহলে তিনি আল্লাহর ইবাদাতকারী বলে গণ্য হবেন না, কারণ তিনি ইবাদাতে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক বা অংশীদার করেছেন এবং শিরকে লিপ্ত হয়েছেন। আল্লাহর ইবাদাতের অর্থ বিশুদ্ধভাবে, একনিষ্ঠভাবে, নিষ্কলুষভাবে বা শিরকের কলুষতা থেকে মুক্তভাবে আল্লাহর ইবাদত করা। অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা এবং কোনো প্রকার ইবাদাত আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য না করা। কুরআন কারীমে অসংখ্য স্থানে আল্লাহ নির্দেশ দান করেছেন বিশুদ্ধভাবে ইবাদাত করতে এবং আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করতে। এ হলো (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)-র অর্থ ও নির্দেশ। মহান আল্লাহ বলেন:
هُوَ الْحَيُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ "তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ (উপাস্য বা মাবুদ) নেই, সুতরাং সার্বিক আনুগত্য ও একনিষ্ঠার সাথে বিশুদ্ধভাবে তাঁকেই ডাক।"১৪১
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ "তাদেরকে তো কেবলমাত্র এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা বিশুদ্ধ চিত্তে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে এবং সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত প্রদান করবে, আর এটাই সঠিক ধর্ম।"১৪২ মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ “হে মানব জাতি, তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।"১৪৩ অন্যত্র আল্লাহ একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করার এবং শিরক থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا "এবং তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক বানিও না। "১৪৪ মহান আল্লাহ বলেন,
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ "দীন সম্পর্কে কোনো জবরদস্তি নেই। সত্য পথ ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে। যে তাগূতকে অস্বীকার (অবিশ্বাস) করবে এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করবে সে এমন এক মযবুত হাতল ধরবে যা কখনো ভাঙ্গবে না। আল্লাহ সর্বশ্রোতা প্রজ্ঞাময়। "১৪৫ অন্যত্র বলা হয়েছে:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنْ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ "আল্লাহর ইবাদত করার এবং তাগূতকে বর্জন করার নির্দেশ দিয়ে আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল প্রেরণ করেছি।"১৪৬ এখানে তাগুতকে বর্জন করা বলতে তাগুতের ইবাদত বর্জন করা বুঝানো হয়েছে। এ বিষয়ে অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
وَالَّذِينَ اجْتَنَبُوا الطَّاغُوتَ أَنْ يَعْبُدُوهَا وَأَنَابُوا إِلَى اللَّهِ لَهُمُ الْبُشْرَى فَبَشِّرْ عِبَادِ "যারা তাগূতের ইবাদত বর্জন করে এবং আল্লাহ অভিমুখী হয়, তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ। অতএব সুসংবাদ দাও আমার বান্দাদেরকে। "১৪৭ তাগূত শব্দটি আরবী 'তুগইয়ান' শব্দ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে, যার অর্থ সীমা লঙ্ঘন করা। অবাধ্যতা, জুলুম বা অন্যায়ের ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘনকারীকে 'তাগী' (الطاغي) বা সীমালঙ্ঘনকারী বলা হয়। অত্যধিক সীমলঙ্ঘনকারীকে 'তাগিয়াহ' (الطاغية) বলা হয়। কঠিনতম সীমালঙ্ঘণকারী বা মহা-অবাধ্যকে 'তাগূত' (الطاغوت) বলা হয়। এভাবে আমরা দেখছি যে, আভিধানিকভাবে 'তাগূত' অর্থ মহা-সীমালঙ্ঘনকারী। ১৪৮ আভিধানিকভাবে সকল সীমা-লঙ্ঘনকারীকে তাগূত বলা যায়। তবে কুরআনের পরিভাষায় 'তাগূত' অর্থ শয়তান। এছাড়া
আল্লাহকে ছাড়া যা কিছুর ইবাদত, পূজা বা উপাসনা করা হয়ে থাকে, তাকে ‘তাগুত’ বলা হয়।
এভাবে পবিত্র কুরআনের অসংখ্য স্থানে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, একমাত্র তাঁরই উপাসনা ইবাদত করতে এবং অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর ইবাদত-উপাসনা সর্বতোভাবে বর্জন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এ হলো তাওহীদ উলুহিয়্যাহ অর্থাৎ ইবাদতের একত্ব ও কর্ম পর্যায়ের তাওহীদ।