📄 আস-সুন্নাহ
তৃতীয় হিজরী শতক থেকে ধর্ম-বিশ্বাস ও এ বিষয়ক মূলনীতিসমূহ বুঝাতে 'আস-সুন্নাহ' শব্দটির ব্যবহার ব্যাপকতা লাভ করে।
'সুন্নাহ' বা 'সুন্নাত' শব্দের আভিধানিক অর্থ: মুখ, ছবি, প্রতিচ্ছবি, প্রকৃতি, জীবন পদ্ধতি, কর্মধারা ইত্যাদি। ইসলামী শরীয়তে 'সুন্নাত' অর্থ রাসূলে আকরাম (স)-এর কথা, কর্ম, অনুমোদন বা এক কথায় তাঁর সামগ্রিক জীবনাদর্শ।” সুন্নাহ শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ ও ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি 'এহইয়াউস সুনান' গ্রন্থে। বিদগ্ধ পাঠককে গ্রন্থটি পাঠ করার জন্য অনুরোধ করছি।
আমরা উল্লেখ করেছি যে, সাহাবীগণের পরবর্তী প্রজন্ম থেকে ঈমান বা ধর্ম-বিশ্বাস বিষয়ক কিছু বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়। যুক্তি,
তর্ক, দর্শন ইত্যাদির মাধ্যমে বিশ্বাস বিষয়ক কুরআন ও হাদীসের নির্দেশাবলি বিচার করে কোনোটি গ্রহণ ও কোনোটি ব্যাখ্যার বর্জন করতে শুরু করলেন কোনো কোনো নতুন মুসলমান। এ বিষয়ে তারা কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও কোনো কোনো হাদীস প্রমাণ পেশ করতে লাগলেন ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের মূলনীতির সমালোচনা করতে লাগলেন। তৃতীয় শতাব্দী থেকে অনেক ইমাম ও আলিম ‘আস-সুন্নাহ’ নামে আকীদা বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন।
এদের অন্যতম ছিলেন ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল (২৪১ হি.)। তিনি ‘আস-সুন্নাহ’ নামে আকীদা বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন। একই নামে আকীদা বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন তাঁর প্রসিদ্ধ ছাত্র ইমাম আবূ বকর আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু হারুন আল-আসরাম (২৭৩হি.), ইমাম আবূ হালীল হামযা ইবনু ইসহাক ইবনু হাম্মাদ আল-শাইবানী (২৭৩হি.), ইমাম আবূ মুহাম্মাদ ইবনু আলী আল-সিজিস্তানী (২৯৫ হি.), ইমাম আবূ বকর আহমদ ইবনু আমর আবী আসিম আদ-দাহ্হাক আল-শাইবানী (২৮৭ হি.), ইমাম আবূ জা’ফার মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু হারুন আল-বাগদাদী আল-খায়য়াল (৩১১ হি), ইমাম আবূ বকর আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ জারীর তাবারী (৩১১ হি), ইমাম তাবারানী আবুল কাসিম সুলাইমান ইবনু আহমাদ (৩৬০হি.), ইমাম আবূশ শাইখ আবূ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু জাফর ইবনু হাইয়ান আল-আসপাহানী (৩৬৯ হি.), ইমাম ইবনু শাহীন আবূ হাফস উমার ইবনু আহমাদ ইবনু উসমান আল-বাগদাদী (৩৮৫হি), ইমাম আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক ইবনু মান্দাহ আল-ইসপাহানী (৩৯৫ হি.) ও আরো অনেক প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও ফকীহ।
📄 আশ-শারী‘আহ
‘শারীয়াত’ বা ‘শারীআহ্’ অর্থ নদীর ঘাট, জলাশয়ে পানি পানের স্থান, পথ ইত্যাদি। ইসলামের পরিভাষায় ‘শারীআহ’ শব্দটির বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। সেগুলির মধ্যে একটি অর্থ “ধর্ম বিশ্বাস” বা বিশ্বাস বিষয়ক মূলনীতিসমূহ। তৃতীয় শতকের কোনো কোনো ইমাম ‘আশ-শারীআহ্’ নামে আকীদা বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন। যেমন ইমাম আবূ বকর মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন আল-আজুররী (৩৬০ হি.) রচিত ‘আশ-শারীআহ্’ গ্রন্থ।
📄 উসূলুদ্দীন বা উসূলুদ্দিয়ানাহ
(أصول الدين) বা উসূলুদ্দিয়ানাহ্ (أصول الديانة) (অর্থ দীনের ভিত্তি সমূহ)। চতুর্থ শতক থেকে কোনো কোনো আলিম ‘ঈমান’ বা আকীদা বুঝাতে এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন চতুর্থ হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ আলিম ইমাম আবুল হাসান আলী ইবনু ইসমাঈল আল-আশ’আরী (৩২৪ হি.)। ‘আল-ইবানাতু ‘আন উসূলিদদিয়ানাহ্’ নামে এ বিষয়ক তাঁর গ্রন্থটি সুপ্রসিদ্ধ।
📄 আকীদা
ধর্ম-বিশ্বাস বিষয়ক প্রসিদ্ধতম পরিভাষা ‘আকীদা’। হিজরী চতুর্থ শতকের আগে এ শব্দটির প্রয়োগ তত প্রসিদ্ধ ছিল না। চতুর্থ হিজরী শতক থেকে এ পরিভাষাটি প্রচলন লাভ করে। পরবর্তী যুগে এটিই একমাত্র পরিভাষায় পরিণত হয়। আরবী আকীদা ও ইতিকাদ শব্দদ্বয় আরবী ‘আক্দ’ (عقد) ধাতু থেকে গৃহীত। এর অর্থ বন্ধন করা, গিরা দেওয়া, চুক্তি করা, শক্ত হওয়া ইত্যাদি। ইবনু ফারিস এ শব্দের অর্থ বর্ণনা করে বলেন: “আইন, কাফ্ ও দাল: ধাতুটির মূল অর্থ একটিই: দৃঢ় করা, দৃঢ়ভাবে বন্ধন, ধারণ বা নির্ভর করা। শব্দটি যত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা সবই এই অর্থ থেকে গৃহীত।” ‘ধর্মবিশ্বাস’ বুঝাতে আকীদা শব্দের ব্যবহার পরবর্তী যুগগুলিতে ব্যাপক হলেও প্রাচীন আরবী ভাষায় এ ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় না। ‘বিশ্বাস’ বা ধর্মবিশ্বাস অর্থে ‘আকীদা’ ও ‘ইতিকাদ’ শব্দের ব্যবহার কুরআন ও হাদীসে দেখা যায় না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে বা তাঁর পূর্বের যুগে আরবী ভাষায় ‘বিশ্বাস’ অর্থে বা অন্য কোনো অর্থে ‘আকীদা’ শব্দের ব্যবহার ছিল বলে জানা যায় না। তবে ‘দৃঢ় হওয়া’ বা ‘জমাট হওয়া’ অর্থে ‘ইতিকাদ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়া অতীতের বিশ্বাস অর্থেও ‘ইতিকাদ’ শব্দটির প্রচলন ছিল। দায়েবীদ ইমাম ইসমাঈল ইবনু হাম্মাদ জাওহারী (৩৬০ হি.) বলেন:
(اعتقد ضيعة الشيء: صلب واشتد، واعتقد كذا بقلبه، وليس له معقود، أي عقد رأي) “‘সম্পত্তি বা সম্পদ ইতিকাদ’ করেছে, অর্থাৎ তা অর্জন করেছে বা সঞ্চয় করেছে। কোনো কিছু ‘ইতিকাদ’ হয়েছে অর্থ তা শক্ত, কঠিন বা জমাটবদ্ধ হয়েছে। অন্তর দিয়ে অমুক বিষয় ইতিকাদ করেছে। তার কোনো মা’কুদ নেই, অর্থাৎ তার মতামতের স্থিরতা বা দৃঢ়তা নেই।”
কুরআন-হাদীসে কোথাও আকীদা শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা যায় না। ‘ইতিকাদ’ শব্দটি দু একটি হাদীসে ব্যবহৃত হয়েছে, তবে ‘বিশ্বাস’ অর্থে নয়, বরং সম্পদ, পতাকা ইত্যাদি দৃঢ়ভাবে ধারণ করা, বন্ধন করা বা গ্রহণ করা অর্থে। যেমন এক হাদীসে বলা হয়েছে ইবনু আযিব (রা) বলেন,
(لقيت النبي صلى الله عنه وقد اعتقد راية) “আমার চাচার সাথে আমার যখন সাক্ষাত হলো তখন তিনি (যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে) একটি ঝাণ্ডা দৃঢ়ভাবে ধারণ
করেছেন।”১৫
দ্বিতীয় শতাব্দীর কোনো কোনো ইমাম ও আলিমের কথায় 'ই'তিকাদ' বা 'আকীদা' শব্দ সুদৃঢ় ধর্ম বিশ্বাস অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে বলে দেখা যায়।১৬ পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে 'আকীদা' শব্দের ব্যবহার ব্যাপকতা লাভ করে।
চতুর্থ-পঞ্চম শতকে লিখিত প্রাচীন আরবী অভিধানগুলিতে 'আকীদা' শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে বলে দেখতে পাই নি। 'আব্দ' ধাতু থেকে গৃহীত আরবী ভাষায় ব্যবহৃত অনেক বিশেষ্য শব্দ এ সকল অভিধানে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন 'ইদ' (عقد), 'উকদাহ' (عقدة), 'উকাইদাহ' (عقيدة), 'আকীদ' (عقید) ইত্যাদি। কিন্তু 'আকীদাহ' শব্দটি এ সকল অভিধানে দেখতে পাই নি। ইবনু দুরাইদের (৩৩১ হি) জামহারাতুল লুগাহ, জাওহারীর (৩৯৩হি) আস-সিহাহ, ইবনু ফারিসের (৩৯৫হি) মু'জামু মাকাঈসিল লুগাহ, ইবনু মানযূরের (৭১১ হি) লিসানুল আরব ইত্যাদি অভিধান গ্রন্থে 'আকীদাহ' শব্দটির উল্লেখ পাই নি। পরবর্তী সময়ের অভিধানবিদগণ এই শব্দটির অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। ৮ম শতকের প্রসিদ্ধ অভিধানবেত্তা আহমদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-ফাইউমী (৭৭০হি) তাঁর আল-মিসবাহুল মুনীর গ্রন্থে লিখেছেন: العقيدة ما يدين الإنسان به، وله عقيدة حسنة سالمة من الشك "মানুষ ধর্ম হিসেবে যা গ্রহণ করে তাকে 'আকীদা' বলা হয়। বলা হয় 'তার ভাল আকীদা আছে', অর্থাৎ তার সন্দেহমুক্ত বিশ্বাস আছে।”১৭
আধুনিক ভাষাবিদ ড. ইবরাহীম আনীস ও তাঁর সঙ্গিগণ সম্পাদিত 'আল-মু'জামুল ওয়াসীত' গ্রন্থে বলা হয়েছে: العقيدة الحكم الذي لا يُقْبَلُ الشك فيه لدى معتقده، و في الدين ما يقصد به الاعتقاد دون العمل "আকীদা অর্থ এমন বিধান বা নির্দেশ যা বিশ্বাসীর বিশ্বাস অনুসারে কোনোরূপ সন্দেহের অবকাশ রাখে না.... ধর্মীয় বিশ্বাস যা কর্ম থেকে পৃথক..."।