📄 সূন্নাতী ইবনে মালেক সূন্নাতী কিসরার পোশাক পরিধান করবে
প্রতিমা পূজারীদের অত্যাচার অতিষ্ঠ হয়ে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতৃভূমি মক্কা ত্যাগ করলেন মদীনার পানে। কিন্তু দুশমনও পিছু ধাওয়া করে চলল। কি হবে এখন? পারতেন কি তিনি অন্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফাঁকি দিয়ে মদীনায় পৌঁছাতে?
ধাওয়া কারীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে একটি আশ্রয় নিল মক্কার কাফের এক পাহাড়ী গুহায়। আল্লাহর রহমতে সেখানে দুবার ভাব ঘুরে পৌঁছে দেখতে পেলেন না যে, তিনি সেখানে আছেন। কিন্তু ওরা গুহার পূর্বতে নবীজী তখনও গুহায় বেশি দূর যেতে পারেননি।
তাঁই যেন কোনভাবে মদীনায় পৌঁছাতে না পারেন, এজন্য ধাওয়াকারী মুশরিকরা মক্কা-মদীনার মাঝামাঝি যেসব মানুষেরা থাকত, তাদের মাঝে ঘোষণা করে দিলঃ কোন ব্যক্তি মুহাম্মদকে জীবিত বা মৃত যে কোন অবস্থায় ধরে দিতে পারলে তাকে একশ'টি উট পুরস্কার দেয়া হবে।
ঘোষণামটি শুনেছে এমন অনেক লোক ছিল সূরাকা ইবন মালিক। সে তখন এক জায়গায় বসে ছিল। ঘোষণামটি শুনে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না সূরাকা। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল ঝুঁকির নেবে। আবার নিজের কথার কথা বলে ফেললে আরও কেউ সাক্ষী হতে চাইবে তার, এ আশায় চুপিচাপি রইল।
সূরাকার মত অপর একজনও আগ্রহী হয়ে উঠল নবীজীর পিছু ধাওয়া করতে। সে বললোঃ আল্লাহর শপথ, আমার এই এখনই তিন জন লোক চলে গেল। আমার ধারণা তারা মুহাম্মদ, আবু বকর ও আবদুল্লাহকে ধাওয়া করবে।
কি সর্বনাশ! এ লোক তাঁর চেয়ে আগে গেলে তো সে কিছু বলতে পারে!
একে তাঁকাতে সূরাকা বললঃ না, তা নয়। তারা হচ্ছে অমুক গোত্রের লোক। তাদের উট হারিয়ে গেছে, তাই তারা উটের খোঁজে বেরিয়েছে।
তা হতে পারে- এ কথা বলে আগ্রহী লোকটি চুপ করে গেল।
আল্গা থেকে ঘোষণা শুনে উঠে পড়লো অন্যেরা সাগরে করবে, এ কারণে সে আরও কিছুক্ষণ সেখানে বসে রইল। এরপর এক ফাঁকে আগে থেকে যে বাড়ির পথ ধরল সূরাকা। তাকে চটপটে করে ‘একদম’ উটের লোকটির পুরস্কার হাতছানি তখন তার হৃদয়-মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে।
বাড়ি গিয়ে দাসীকে বললঃ তুমি চুপি চুপি কেউ না দেখে এমনভাবে অমুক জায়গায় গিয়ে আমার ঘোড়াটা বেঁধে রেখে আসবে। আর দাসকে বললোঃ তুমি এ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড়ির পেছনে গিয়ে থেকে টপটপ বেরিয়ে যাবে, যেন কেউ টের না পায়। এরপর দাসী যেখানে ঘোড়াটি রেখে দেবে, তার আশেপাশে একজন এসে অস্ত্র রেখে দেবে।
এবার সূরাকাও বেরিয়ে গেল ঘোড়া-অস্ত্রশস্ত্রের কাছে। ধর্ম পরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘোড়ায় চেপে সে রওনা হলো নবীজীর দিকে। ধর্ম পরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘোড়ায় চেপে সে রওনা হলো বিশ্বনবীজির পানে।
সূরাকা ছিল বিশ্বনবীজীর পুরস্কারের কারো দ্বারা যা হাতে পেতে চেয়েছিল, তেমনই ধৈর্যশীল। তার ঘোড়াটিও খুব দ্রুতগামী। আরও যেন শান্ত ঘোড়া-মায়ার। এমন একজন মানুষ যার মা’ উ’ টা বুঝতে তাদের নিজেকে পারে।
কিন্তু সে কি জানত, কার পিছু ধাওয়া করতে চলেছে সে?
এগিয়ে চলেছে সূরাকা। হঠাৎ ঘোড়া ছোট খেলো আর দশ খণ্ড লম্বা একটা হয়ে পিঠে পড়ে গেল। কেন এমন হল! ঘোড়াটা মোটেও তো লম্পত মনে হল না তার কাছে। বললঃ একই তো নিপাত যা এই বলে সে আবার ঘোড়াটা পিঠে উঠল। কিন্তু দূর যেতে না যেতেই ঘোড়াটি আবার ছোট খেলো। এবার তার অঙ্গ লক্ষ্মণ কথার আর কিছুই বেশ মনে করতে লাগল।
আবার মনে মনে মনে বললঃ 'কিন্তু এক উট পুরস্কার! নাহ, এগিয়ে যাই।
দ্বিতীয়বার ঘোড়াটা সেখানে ছোট খেলো থেকে সামান্য দূরে যে দেখতে পেল আল্লাহর রাসূল (স) ও তাঁর দু’সঙ্গীকে। সঙ্গে সঙ্গে সে তার হাত ধনুকের দিকে বাড়ালো। কিন্তু সে হাতটা যেন একেবারে প্যারালাইজড, অসাড়। আর বাড়ানোর সাধ্য রইল না।
সে দেখতে পেল, তার ঘোড়ার পা যেন শুকনো মাটিতে দেবে যাচ্ছে এবং সামনে তার আকাশ থেকে ধোঁয়া ও তার ধোঁয়া অন্ধকার করে ফেলছে। ঘোড়াটি এমন স্থির হয়ে হয়ে পড়ল যে, তার মনে হল ঘোড়ার পা যেন কেউ লোহার পেরেক দিয়ে আটকে দিয়েছে।
অন্য রকম ভয় পেয়ে গেল সূরাকা। বুঝতে পারল, সাধারণ কাঁদার পিছু ধাওয়া সে করেনি। কিসের যে মুক্তি পাবে এ বিপদ থেকে? পুরস্কারের লোভ যে তাকে এখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
উভ-সংজ্ঞস্ত সূরাকা চেঁচিয়ে মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের দিকে ফিরে বললঃ ‘অরে! তোমরা তোমাদের রব্বের দরবারে আমার ঘোড়ার পা মুক্ত হওয়ার জন্য দু'আ কর। আমি তোমাদের অকল্যাণ করবো না'।
মুহাম্মদ (সঃ) কিন্তু ধাওয়া করে আসা সূরাকাকে হাতের মুঠোয় পেয়ে শাস্তি দিলেন না। বরং তার জন্য দুয়া করলেন।
সূরাকা ও তার ঘোড়া মুক্ত হয়ে গেল। সাথে সাথেই আবার তার মধ্যে ‘একশ’ উটের লালসা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আবারও সে ঘোড়া হাঁকাতে চাইল নবীজীর দিকে।
আবার আগের বারের চাইতে মারাত্মকভাবে ঘোড়ার পা মাটিতে আটকে গেল। এবারেও সে ভয় পেয়ে আবার মত নবীজীর (সঃ) সাহায্য কামনা করে বললঃ ‘আমার এ খাবার-দাবার, অস্ত্রশস্ত্র সবই তোমরা নিয়ে যাও। আমি আল্লাহর নামে শপথ করছি, মুক্তি পেলে আমি আমার পেছনে ধেয়ে আসা লোকদের তোমাদের থেকে অন্য দিকে হটিয়ে দেব’।
নবীজীর সাথে ছিলেন আব্দুল্লাহ (রাঃ) ও একজন গাইড। তারা বললেনঃ ‘তোমার খাবার ও অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজন আমাদের নেই। তবে তুমি লোকদের আমাদের থেকে হটিয়ে দেবে’।
এবার নবীজী (সঃ) সূরাকার জন্য দু'আ করলেন। আগের মত এবারও ঘোড়াটি মুক্ত হয়ে গেল। এবার সে আর কিছু ধোঁকা করে ফিরে যেতে চাইল। কিন্তু ফিরে গিয়ে সে আর কিছু ধোঁকা করতে পারে এত ঘটনা, তাদের সাথে কিছু কথা না বলে চলে যাবে তা কি করে হয়। তাই সে নবীজীদের দিকে ফিরে বললঃ আপনার একটু থামুন, আমি আপনাদের সাথে আমি কিছু কথা বলতে চাই। আল্লাহ কসম, আপনারা কোন ক্ষতি আমি করবো না।
নবীজী (স) ও আবু বকর (রাঃ) একসাথে জিজ্ঞেস করলেন তুমি আমাদের কাছে কি চাও?
সে বললোঃ আল্লাহর কসম, হে মুহাম্মদ, আমি নিশ্চিতভাবে জানি শিগগিরই আপনার দ্বীন বিজয়ী হবে। আমি সাথে আপনি প্রদান করুন, আমি যেন আপনার সাম্রাজ্যে যেতে তখন আমাকে সম্মান দেখান। আর একটি একটি লিখে দিন। নবীজী (সঃ) আবুবকরকে নির্দেশ দিলেন। তিনি এখনও একেক তার কথাগুলি লিখে তার হাতে দিলেন।
সূরাকা ফিরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন সময় রাসূল (সঃ) তাকে বললেনঃ সূরাকা, তুমি যখন কিসরার (ইরান সম্রাট) রাজকীয় পোশাক পরবে, তখন কেমন হবে?
রাসূল (সঃ) বললেনঃ হ্যাঁ। কিসরার ইবন হরমুয।
কি অবাক করা কাণ্ড! একশ' উটের পুরস্কারের লোভে যাকে ধাওয়া করতে এসেছে, সে কিনা হাতের মুঠোয় পেয়েও তাকে ছেড়ে দিল। শুধু তাই নয় ইরান রাজার পোশাক পুরস্কার পাবার মতো বিস্ময়কর ভবিষ্যদ্বাণীও করে গেল। এ তো কল্পনারও অতীত!
যাহোক সূরাকা পেছনে ফিরে চলে গেল। ফেরার পথে সে দেখতে পেল লোকেরা তখনও রাসূল (সঃ) কে অনুসরণ করে ফিরছে। সে তাদেরকে বললোঃ ‘তোমরা ফিরে যাও। আমি এ অঞ্চলে বড়বড় পর্যন্ত তাঁকে খুঁজেছি। আর তোমরা তা জানতে পারলে তার অনুসরণ করার ব্যাপারে আমার কতখানি।’
তার এ কথা শুনে ধাওয়াকারীরা ফিরে গেল। সে-ও পুরো ব্যাপারটা ঠোঁটে গেল। যখন সে হীরা নগরী মদীনা পৌঁছে কুরাইশদের শত্রুতা শেষ লাভ করলেন, তখন সে তার ঘটনাটি সবার সামনে বলল।
নবীজীর সঙ্গে সূরাকার ঘটনা কথার মত আল্লাহর জ্ঞানের কোনো শেষ নেই। সুযোগ পেয়েও হতভাগী করার জন্য আবু জাহেল সূরাকাকে কঠিনভাবে তিরস্কার করল। সূরাকাও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। সে কবিতায় এর জবাব দিল। সে আরক্তি করলঃ ‘আল্লাহর শপথ, তুমি যদি দেখতা, হে হকাম,
আমার ঘোড়ার ব্যাপারটি, যখন তার পা দেবে যাচ্ছিল, তুমি জানতে আমার ঘোড়াটি কেন থামতে বাধ্য হলো, মুহাম্মদ রাসূল-সুতরাং কে তাঁকে প্রতিরোধ করে?'
সময় বয়ে গেল। একদিন যে মুহাম্মদ (সঃ) রাতে আঁধারে মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরত করেছিলেন, তিন মাস বিজয়ী বেশে মক্কায় এসেছেন হাজার হাজার মুজাহিদ নিয়ে। তার অত্যাচারী-অহংকারী কুরাইশ সরদাররা আজ তাঁর ভয়ে ভীতু এবং তাঁর সামনে নতমস্তকে উপস্থিত।
অন্যদের মত সূরাকাও এল। সাথে তার দশ বছর আগে তাঁর অক্ষর করা লেখাটিও রয়েছে। অতি কষ্টে নবীজীর কাছে পৌঁছাতে বললঃ হে আল্লাহ রাসূল! আমি সূরাকা ইবন মালিক। আর এই হলো আপনার অঙ্গীকার পত্র।
নবীজী (সঃ) বললেনঃ ‘সূরাকা আমার কাছে এসো, আজ প্রতিশ্রুতি পূরণ ও সদ্ব্যবহারের দিন’। এরপর সূরাকা নবীজীর কাছাকাছি গেলে তাঁর শরীর আবৃত করতে বলা হল। নবীজী (সঃ) ইতস্তত করলেন। কিসরার পোশাক যে কেমন হবে’ কিসরার পোশাক যে সত্যি সত্যি তিনি পরবেন সে ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না।
সময় গড়িয়ে গেল আরও অনেক দূর। প্রথম খলিফা আবু বকর (রাঃ) ইরান অভিযান আরম্ভ করলেন। তৎকালীন বিশ্বের মুদ্রার পারস্য সাম্রাজ্যের বিশাল বাহিনী কুফাতে সেনাবাহিনীর সাথে মুসলিম মুজাহিদদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলতে লাগল। জামরাজ মুসলিম মুজাহিদগণ বহু রক্তের বিনিময়ে পারস্য সেনাবাহিনীর সকল প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে থাকতে থাকলেন।
দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা)-এর খেলাফতের সময় ৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম মুজাহিদরা পারস্য রাজ্যের সকল প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে এক সময় তাদের রাজধানী মাদায়েনও দখল করে ফেললেন। ইরানের হাজার বছরের রাজ সিংহাসন এখন মুজাহিদদের পদতলে।
এ বিরাট বিজয়ের সংবাদ পেয়ে খলিফা মুজাহিদীন সেনাপতি সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) এর দূত পৌঁছল মদীনায়। সঙ্গে তার গণীমতোর সম্পদ। একসাথে যখন রাখা হল বিশাল এক স্তূপে পরিণত হল।
সম্পদের দিকে তাকিয়ে ইসলামী সাম্রাজ্যের এত ক্ষমতায় শাসক উমর ফারুক (রাঃ) বিস্ময়ে চোখে তাকিয়ে রইলেন। এ সম্পদের মধ্যে ছিল ইরান সম্রাট (ইরান সম্রাট) মহান যুবতী যার মধ্যে মুক্তো যুক্ত মুকুট, সোনার জরি করা কাপড়, মুক্তার হার এবং এমন চমৎকার দু'টি জামা যা আগে তিনি কখনও দেখেননি। আরও কত কি!
হাতের লাঠিটি দিয়ে সম্পদ উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে তিনি আর উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বললেনঃ যারা এসব জিনিস থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে জমা দিয়েছে, নিশ্চয় তারা অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন হযরত আলী (রাঃ)। তিনি বললেনঃ আমীরুল মুমিনীন (বিশ্ববাসীদের নেতা)! আপনি বিশ্বাস ভঙ্গ করেন নি, আপনার প্রজারাও বিশ্বাস ভঙ্গ করেনি। আপনি যদি অন্যায়ভাবে খেতেন, তাহলে তারাও খেত।
আপনি পরে এল সেই ভবিষ্যদ্বাণী পূরণের দিনটি। খলিফা সূরাকা ইবন মালিককে ডেকে আনলেন। নিজ হাতে তিনি কিসরার জামা, পাজামা, জুতো ও অন্যান্য পোশাক পরিয়ে দিলেন তাঁর শরীরে। কাঁধে ঝুলিয়ে দিলেন কিসরার তরবারি, কোমরে বেঁধে দিলেন বেল্ট, মাথায় রাখলেন মুকুট আর হাতে পরিয়ে দিলেন রাজকীয় ব্রেসলেট। খলিফা উমর সূরাকাকে পরিয়ে দিচ্ছেন কিসরার পোশাক, আর এদিকে মুসলমানদের মুহূর্তে ‘আল্লাহু আকবার’ আওয়াজে মদীনার আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠছে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আল্লাহর রাসূলের ভবিষ্যদ্বাণী আবারও সত্য প্রমাণিত হল।
কিসরার পোশাক পরা শেষ হলে সূরাকার দিকে ফিরে হযরত উমর (রাঃ) বললেনঃ সাবাস, সাবাস, মুদলাজ গোত্রের এক বেদুঈনের মাথায় শোভা পাচ্ছে শাহানশাহ্ কিসরার মুকুট আর হাতে বালা।'
তারপর খলিফা আসমানের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ হে আল্লাহ! এ সম্পদ তুমি আজকের রাসূলকে (সঃ) দাও নি অথচ তিনি তোমার কাছে অধিক বেশী প্রিয় ও সম্মানিত। তুমি দাও নি এ সম্পদ আবু বকরকেও। তিনিও ছিলেন তোমার নিকট অধিক প্রিয় ও সম্মানিত। আর তা দান করছ আমাকে। পরক্ষণে তিনি সূরা মুমিনুনের আয়াতও দু'টি তেলাওয়াত করলেনঃ
‘তার কি মনে করে, আমি তাদেরকে সাহায্য হিসেবে যে ধন-সম্পদ ও ছেলে-মেয়ে দান করি, তা দিয়ে তাদের সকল প্রকার মঙ্গল এগিয়ে নিয়ে আসছি? না, তারা বুঝে না।’ (২৫-২৬)
খলিফা এ সম্পদকে নিজের সম্পদ তো মনে করেননি, এ সম্পদের প্রতি তার বিন্দুমাত্র লোভও জাগেনি। এমনকি তিনি সকল সম্পদ মুসলমানদের মাঝে বণ্টন শেষ করে, তবেই সেখান থেকে উঠলেন। (আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ১ম খণ্ড)
সূরাকা (রা) মোস্তফা আল্লাহর রাসূলের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হিসেবে পেয়েছিলেন, তেমনি আমাদের জন্যেও রয়েছে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী-যা রয়েছে কুরআন-হাদীসের পাতায় পাতায়। আজ নিজেদেরকে প্রশ্নবাণে জেনা করে দেখে নেয়া কোরআন-হাদীস থেকে, যেন আমরাও আমাদের জীবনে সেসব ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত করতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদের সে সুযোগ দান করুন।
📄 হিংস্র জন্তুও কথা বলবে
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ! কিয়ামত কায়েম হবে না যতক্ষণ না হিংস্র প্রাণী মানুষের সাথে কথা বলবে, যতক্ষণ না কোন ব্যক্তির চাবুকের ডগার প্রান্ত তার সাথে কথা বলবে এবং তার উরুর উপদেশ দেবে তার অনুপস্থিতিতে তার পরিবার কি করেছে (তিরমিযী)
কিয়ামতের কিছু কাল পূর্বে এ ধরনের বেশ কিছু সুস্পষ্ট কিয়ামতের আলামত প্রকাশিত হবে। বিভিন্ন হাদীসে এ সব আলামতের বর্ণনা পাওয়া যায়।
📄 পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে
হাদীস: আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মত যখন পনেরটি বিষয়ে লিপ্ত হবে তখন তাদের উপর বিপদ-মুসীবত আপতিত হবে। জিজ্ঞেস করা হল, ইয়া রাসূলুল্লাহ, সেগুলো কী? তিনি বললেনঃ যখন গনীমতের মাল ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হবে, আমানত লুঠের মালে পরিণত হবে, যাকাত জরিমানারূপে গণ্য হবে, পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে এবং তার মায়ের অবাধ্য হবে, বন্ধুর সাথে সদ্ব্যবহার করা হবে কিন্তু পিতার সাথে দুর্ব্যবহার করা হবে, মসজিদে শোরগোল করা হবে, সবচাইতে নিকৃষ্ট চরিত্রের লোক তার সম্প্রদায়ের নেতা। কোন লোককে তার অনিষ্টের ভয়ে সম্মান করা হবে, মদ পান করা হবে, রেশমী বস্ত্র পরিধান করা হবে, নর্তকী-গায়িকাদের প্রতিষ্ঠিত করা হবে, বাদ্যযন্ত্রসমূহের কদর করা হবে এবং এই উম্মতের শেষ যামানার লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষদেরকে অভিসম্পাত করবে। তখন তোমরা একটি অগ্নিবায়ু অথবা ভূমিক্ষয় অথবা আকৃতির বিকৃতির আপেক্ষা করবে।
সামাজিক অবস্থা ও পরিবেশ পর্যালোচনা করলে এখন দেখতেই যে, তাঁর আনুগত্য করা সহজ হচ্ছে। অপরাপর হাদীস থেকে জানা যায় যে, স্ত্রীলোকের সংখ্যা বাড়তে এমন এক পর্যায় আসবে যখন স্ত্রীলোকের সংখ্যা পঞ্চাশ গুণ পর্যন্ত পৌঁছতে যাবে। সুতরাং কোন পুরুষদের অবস্থা কি হবে তা সহজেই অনুমেয়।
উপরের হাদীসে কিয়ামতের পূর্বে ঘটা কয়েকটি ছোট আলামতের কথা বর্ণিত হয়েছে। এরপরে হাদীসে আরও অনেক বড় আলামতের কথা জানা যায় যা আরও পরে কিয়ামতের প্রাক্কালে ঘটবে। (১) পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবে। (২) ইয়াজুজ ও মাজুজের আত্মপ্রকাশ ঘটবে, (৩) দাব্বাতুল আরদ নামক প্রাণীর আত্মপ্রকাশ ঘটবে-যা প্রত্যেক প্রাণীর থেকে কথা বলবে, (৪) তিনটি ভূমিক্ষয় হবেঃ একটি প্রাচ্যে, একটি পাশ্চাত্যে এবং একটি আরব উপদ্বীপে, (৫) ইয়ামেনের অন্তর্গত আদান (এডেন)-এর একটি গভীর কূপ থেকে অগ্নিপাত হবে, যা মানুষকে তাড়িয়ে নেড়ে বা एकत्र করবে, তারা যেখানে রাত যাপন করবে সেখানেও বিশ্রাম করবে এবং তারা যেখানে দিনের বেলায় বিশ্রাম করবে, আগুনও সেখানে বিশ্রাম করবে।
📄 দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে
হাদীসঃ আন্-নাওয়াস ইবনে সামআন আল-কিলারী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি এর ভয়াবহতা ও নিকৃষ্টতা তুলে ধরেন। এমনকি আমাদের ধারণা জন্মাল যে, সে হয়ত খেজুর বাগানের ওপাশে উপস্থিত রয়েছে। রাবী বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে চলে গেলাম, অতঃপর বিকালে আবার হাযির হলাম। তিনি আমাদের মধ্যে দাজ্জালের ভীতির আলামত দেখে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের কি হয়েছে? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সকালে আপনি দাজ্জালের আলোচনা করেছেন। আবার এর ভয়াবহতা ও নিকৃষ্টতা এমন ভাষায় তুলে ধরেছেন যে, আমাদের মনে হচ্ছিল যে, সে বোধ হয় খেজুর বাগানের পাশেই উপস্থিত আছে। তিনি বলেনঃ দাজ্জাল ছাড়াও তোমাদের ব্যাপারে আমার আরও কিছু আশংকা আছে। আমার জীবদ্দশায় সে যদি তোমাদের মাঝে আত্মপ্রকাশ করে তবে আমিই তোমাদের পক্ষ তার প্রতিরোধ করব। আর আমার অবর্তমানে যদি সে প্রকাশিত হয়, তাহলে তোমরাই তার প্রতিরোধ করবে। আর আমার প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আল্লাহই সাহায্য করবেন। দাজ্জাল এক শক্তিশালী, কদম চুলবিশিষ্ট, এক চক্ষুওয়ালা যুবক, সে হবে আব্দুল উযযা ইবনে কাতন সদৃশ। তোমাদের মধ্যে কেউ তার সাক্ষাত পেলে সে যেন সূরা কাহফ-এর প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। তিনি বলেনঃ সে আত্মপ্রকাশ করবে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী কোন অঞ্চল থেকে। অতঃপর সে ডান-বামে ফিতনা ফাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়াবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা দৃঢ়পদ থাকবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, সে পৃথিবীতে কতদিন অবস্থান করবে? তিনি বলেনঃ চল্লিশ দিন। এর এক দিন হবে এক বছরের সমান, এক দিন হবে এক মাসের সমান এবং এক দিন হবে এক সপ্তাহের সমান, আর বাকী দিনগুলো তোমাদের বর্তমান দিনের সমান হবে। রাবী বলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি মনে করেন, যে দিনটি এক বছরের সমান হবে, তাতে এক দিনের নামায আদায় আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? তিনি বলেনঃ না, বরং তোমরা সে দিনের সঠিক অনুমান করে নেবে (এবং তদনুযায়ী নামায পড়বে)। আমরা আবার জিজ্ঞেস করলাম, পৃথিবীতে তার চলার গতি কত দ্রুত হবে? তিনি বললেনঃ তার গতি বাতাসের মেঘের ন্যায়; অতঃপর সে কোন জাতির কাছে গিয়ে তাদেরকে নিজের দাবীর প্রতি আহবান করবে, কিন্তু তারা তাকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করতে এবং তার দাবী প্রত্যাখ্যান করবে। সে তখন তাদের নিকট থেকে প্রস্থান করবে এবং তাদের ধন-সম্পদও তার পেছনে চলে আসবে। পরদিন সকালে তারা নিজেদেরকে নিঃস্ব অবস্থায় পাবে। অতঃপর সে আরেক জাতির নিকট গিয়ে আহ্বান করবে। তারা তার আহ্বানে সাড়া দেবে এবং তাকে সত্য বলে গ্রহণ করবে। তখন সে আসমানকে বৃষ্টি বর্ষাতে আদেশ করবে এবং তদানুযায়ী বৃষ্টি বর্ষিত হবে। অতঃপর সে জমিনকে ফসল উৎপাদনের নির্দেশ দিবে এবং তদানুযায়ী ফসল উৎপাদিত হবে। মাগরুহে নূয়ানিফাত ও ভূপেনভিস্টা হতে হবে। অতঃপর সে নির্জন প্রান্তরে গমিত দিয়ে বলবে, তার ভেতরের খনিজ ভাণ্ডার বের কর এবং তা বের কর এবং সে যখন থেকে প্রস্থান করবে তখন সেখানকার ধনভাণ্ডার মু-মাছির ন্যায় তার অনুসরণ করবে। অতঃপর সে পূর্ণ যৌবনকে এক যুবককে তার দিকে আহ্বান করবে। অতঃপর সে তরবারিতে আঘাত হেনে দুই টুকরো করে ফেলবে। অতঃপর সে তাকে ডাক দিবে, অমনি সে সোৎসাহে উজ্জ্বল চেহারায় সামনে এসে দাঁড়াবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ দাজ্জালের পূর্র গণের এর একদলকে সাহায্য করার জন্য পাঠাবেন। তিনি তার মধ্যে নিজেরা যুদ্ধ করার জন্য ইরাক ইবনে মারয়াম (আঃ) অবতরণ করবেন। তিনি তার মাথা নিচু করলে ফোঁটায় ফোঁটায় দুই আর তার মাথা উঠালে তার তা মুক্তার মত ঝকঝকে হবে। তার নিঃশ্বাস যাবে যে কাফের মারবে তাকে মারবে। আর তার শ্বাস বায়ু দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছবে। অতঃপর তিনি দাজ্জালকে অনুসন্ধান করবেন এবং বাব লুদ-এর কাছে তাকে পাবেন। অতঃপর তিনি দাজ্জালকে অনুসন্ধান করবেন এবং তাকে ‘লুদ’ এর নগরদ্বারে প্রাপ্ত হয়ে হত্যা করবেন। তিনি বলেনঃ অতঃপর আল্লাহ এমন একদল নাযিল করছি যাদেরকে আল্লাহ তাঁর থেকে রক্ষা করবেন। তিনি তাদের মুখমণ্ডল থেকে ধুলোবালি মুছে ফেলবেন। অতঃপর তিনি বেহেশতের মধ্যে তাদের পদমর্যাদা সম্পর্কে অবহিত করবেন। এমন অবস্থায় আল্লাহ বাণী অনুযায়ী, তার শ্রবণ শুনতে হবে, “তার প্রথম উত্তরটা থেকে দুটি আসতেছে।” তিনি বলেন, তাহলে তিনি বলেন (সিরিয়ায়) তরবারি উপাসনা অতিক্রমকালে এর সমস্ত পানি পান করে ফেলবে। এখান দিয়ে এদের শেষ দলটি অতিক্রমকালে বলবে, এই জলপ্রবাহে নিশ্চয়ই কোনকালে পানি ছিল। পরকালে, আমরা তো পৃথিবীর বাসিন্দাদের ভয় করেছি, আর বলা আসমানের বাসিন্দাদের শেষ করি। এই বলে তারা আসমানের দিকে তাঁর তীর নিক্ষেপ করবে। আল্লাহ তাদের তীরসমূহ রক্ত রঞ্জিত করে ফেরত দিবেন। তারা (খাদ্যদ্রব্য) এমন এক স্থানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে যে, তখন তাদের জন্য একটি গরুর মাথা তোমাদের এ যুগের একশত দীনারের চেয়ে উত্তম মনে হবে। তখন আল্লাহ তাঁর রসূল ঈসা (আঃ) ও তাঁর সাথীর আল্লাহর দিকে রুজু হয়ে দোয়া করবেন। আল্লাহ তখন তাদের (ইয়াজুজ-মাজুজ বাহিনীর) ঘাড়ে ‘নাগাফ’ নামক কীটের উদ্ভব করবেন। অতঃপর তারা এমনভাবে মরা যাবে যেন একটি প্রাণের মৃত্যু হয়। অতঃপর নবী ঈসা (আঃ) এর এমনকার হয়ে যারা এবং পাহাড় থেকে নেমে আসবেন। তিনি সেখানে এমন এক বিস্তৃত জায়গা পাবেন না, যেখানে তাদের পচা দেহের दुर्गन्ध রয়-মাছি ছড়িয়ে না থাকে। আল্লাহ তখন উটের ঘাড়ের ন্যায় লম্বা ঘাড়বিশিষ্ট এক প্রকার পাখি পাঠাবেন। সেই পাখি ওদের লাশগুলো তুলে নিয়ে গভীর খাদে নিক্ষেপ করবে। মুসলমানগণ তাদের পরিত্যক্ত তীর, ধনুক ও গুলীগুলো সাত বছর পর্যন্ত জ্বালানীরূপে ব্যবহার করবে। অতঃপর আল্লাহ এমন বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যা সমস্ত ঘরবাড়ি, স্থাবর ও কঠিন মাটির স্তরে গিয়ে পৌঁছবে এবং সমস্ত পৃথিবী ধুয়েমুছে আয়নার মত ঝকঝকে করে দেবে। অতঃপর যমীনকে বলা হবে, তোমার ফল ও ফসলসমূহ বের করে দে এবং বরকত ও কল্যাণ ফিরিয়ে দে। তখন এমন হবে যে, একদল লোক একটি ডালিম খেয়েও পরিতৃপ্ত হতে পারবে না। যেহেতু এমন বরকত হবে যে, একটি একটি উটনী একটি একটি দুধ এবং একটি গাভী এবং একটি ছাগল এবং একটি বকরী হতে দুধ এক দল এবং এক এক গোত্রের যথেষ্ট হবে। এমতাবস্থায় কিছু দিন পর হঠাৎ এক সকাল সবাই দৃশ্যমান হয়ে সকল মুসলমানদেরকে দেখে ফেলবেন এবং তাদের অপর কিয়ামত সংঘটিত হবে। (তিরমিযী)
আناس (রা) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দাজ্জাল মদীনায় উপস্থিত হয়ে দেখতে পাবে যে, ফেরেশতাগণ তা পাহারা দিচ্ছেন। অতএব আল্লাহর ইচ্ছায় ইহুদী মহামারী ও দাজ্জাল মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না। (তিরমিযী)