📄 ঈসা (আ:) এর প্রতি বিশ্বাসীরা চিরকাল বিজয়ী থাকবে
আল-কুরআনের সূরা আল ইমরানের ৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘হে ঈসা, আমি তোমাকে নিজের কাছে তুলে নেব, কাফেরদের থেকে তোমাকে পবিত্র করে দেবো। আর যারা তোমার অনুগত রয়েছে তাদেরেকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যারা তোমাকে অস্বীকার করেছে তাদের উপর জয়ী করে রাখবো’।
উক্ত আয়াতের অনুগত বা অনুসারী অর্থ হযরত ঈসা (আঃ) এর নবুওয়াতে বিশ্বাসী যারা। সে হিসেবে খ্রিস্টান ও মুসলিম এই দুই সম্প্রদায় তার অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত।
খ্রিস্টানরা ঈসা (আঃ) এর প্রতি বিশ্বাসী কিন্তু শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি বিশ্বাসী নয়। ইহুদীরা শেষ দুই নবী ঈসা (আঃ) ও মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রতি বিশ্বাসী নয়। তারা নিজেদেরকে হযরত মূসা (আঃ) এর অনুসারী বলে দাবী করে। পক্ষান্তরে একমাত্র মুসলিমরাই, মূসা ও ঈসাসহ সকল নবীর প্রতি সমান বিশ্বাসী।
মূসা ও ঈসা (আঃ) এর বিধানগুলোর মধ্যে একটি বিরাট ব্যবধান ছিল যে, মুহাম্মদ (সাঃ) এর শরীয়তে তার সবাইকে প্রতি ঈমান আনতে হবে। কিন্তু ইহুদী ও খ্রিস্টানদের কেউ তা করে না। ফলে তারা হেদায়েত থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
খ্রিস্টানরা ঈসার নবুওয়াতে বিশ্বাসী হলেও সে বিশ্বাসে কিছু ত্রুটি আছে। ঈসা (আঃ) পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসবেন তখন তাদের এ ভ্রান্তি দূর হবে। ইহুদীরা ঈসা (আঃ) এর প্রতি যে কেবল ঈমান আনবে না তাই নয় বরং ঈসা (আঃ) এর পুনরায় মাবইয়ায্যাম যিনি নজির শ্রেষ্ঠ বারেজনের একজন তার প্রতিও ঈমান অপরাধ আরোপ করেছিল। বিনা পিতা জন্ম, কুমারী মায়ের সন্তান, ঈসা (আঃ) ছিলেন ইহুদীদের জন্য সুস্পষ্ট যুক্তি (miracle) যেন তারা ঈসার (আঃ) প্রতি ঈমান আনে। ইহুদীরা তা করেনি বরং তারা ঈসা (আঃ) কে শূলে চড় হত্যা করতে উদ্যত হয়। এ অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নিজের কাছে তুলে নেন এবং এ আয়াতে রক্ষিত হয়েছেন। তিনি চতুর্থ আসমানে অবস্থান করছেন। কিয়ামতের পূর্বে তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। উক্ত আয়াতে কত শতবছর যে দুই হাজার বছর ধরে খ্রিস্টানরা ইহুদীদের বিরুদ্ধে সফলভাবে বিজয়ী রয়েছে এবং এতদ্বিষয়ে আল-কুরআনের এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
বর্তমানে যদিও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইহুদী ও খ্রিস্টান শক্তি ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মুসলমানকে খ্রিস্টানদের বন্ধু, ইহুদীরা নয়। এ সত্য খ্রিস্টানরা বুঝতে পারবেন, যখন ঈসা (আঃ) পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং ইহুদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদেরকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিবেন।
📄 ঈসার প্রতি সবাই ঈমান আনবে
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ অবশিষ্ট থাকবেনা বরং তার (ঈসার) মৃত্যুর পূর্বে অবশ্যই তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে”। (সূরা নিসাঃ ১৫৯)
অত্র আয়াতের তফসীর হলঃ আহলে কিতাবরা যখন হযরত ঈসা (আঃ) এর প্রতি সত্যিকার ঈমান আনবে না। তাদের বিশ্বাসে ভ্রান্তি আছে। ইহুদীরা তো তাকে নবী বলে স্বীকারই করতো না, বরং শুধু মিথ্যাবাদী হিসেবেই নয় যালোক। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালেক)। অপর দিকে খ্রিস্টানরা যদিও ঈসা মসীহ (আঃ) কে ভক্তি ও মান্য করার দাবীদার কিন্তু তাদের মধ্যে একদল ইহুদীদের মতই হযরত ঈসা (আঃ) এর প্রশ্নে কিছু হওয়ার এবং আরেক মারাত্মক ভুল করার কথা আকুতিতে প্রদান করে চরম মূর্খতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের অনেকের ধারণা মতো উপস্থিতি দেখতে ঈসা (আঃ) কে স্বয়ং খোদা বা খোদার পুত্র রূপে বরণ করে বসেছে।
কুরআন পাকের এই আয়াতটি থেকে জানা যায় যে, ইহুদী ও খ্রিস্টানরা বর্তমানে যদিও হযরত ঈসা (আঃ) এর প্রতি যথাযথ ঈমান রাখে না, বরং শৈথিল্য বা বাড়াবাড়ি করে, কিন্তু কিয়ামতের নিকটবর্তী যুগে তিনি যখন পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ করবেন, তখন তারাও তাঁর প্রতি পুরোপুরি ও সত্যিকার ঈমান আনবে। খ্রিস্টানরা মুসলমানদের মত সহীহ আকীদা ও বিশ্বাসের সাথে ঈমানদার হয়ে যাবে। ইহুদীদের মধ্যে যারা তার বিরুদ্ধাচরণ করবে নির্ধন ও নিশ্চিহ্ন করা হবে। ইহুদীদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করবে। ইহুদীরা ধর্মী, বিদ্বেষ ও শত্রুতার কারণে নিশ্চিহ্ন করা হবে। এমনকি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সহস্র ধর্ম গ্রহণ পোষণ করে। কিন্তু এখন এই সময় আসবে, যখন তাদের দৃষ্টি উন্মীলিত হবে, তখন তারা যথার্থই বুঝতে পারবে যে, হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সম্পর্কে তাদের ধারণা একান্তই ভ্রান্তিপূর্ণ ছিল। তখন সমগ্র দুনিয়া থেকে সর্বপ্রকার কুফরী ধ্যান-ধারণা, আচার-অনুষ্ঠান উৎখাত হবে। সর্বত্র ইসলামের একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে। সর্বত্র ইসলামের একচ্ছত্র প্রাধান্য কায়েম হবে।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, হযরত ঈসা ইবনে মারিয়াম (আঃ) একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক রূপে অবশ্যই পৃথিবীতে অবতরণ করবেন। তিনি দাজ্জালকে কতল করবেন, শুকর নিধন করবেন, ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন এবং জিজিয়া কর তুলে দিবেন। তখন একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা হবে এবং পৃথিবীতে কোন অন্যায়, অশান্তি ও অভাব-অভিযোগ থাকবে না।
📄 আলী ইবনে হাতেম তায়ী সম্পর্কে
আলী ইবনে হাতেম (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেনঃ “আমি নবীর সামনে বসে ছিলাম। এমন সময় একজন লোক এসে তার ক্ষুধার্ত অবস্থার কথা জানাল। অন্য একজন এসে ডাকাতি রাহাজানির অভিযোগ করল। নবী মোস্তফা (সঃ) বললেনঃ হে আদী তুমি কি হীরা শহর দেখেছ? যদি তোমার আয়ু হয় বেশি দিন তবে দেখতে পাবে যে ঘোটায় চড়ে একজন মহিলা হীরা থেকে আসবে এবং কাবার তাওয়াফ করবে। এ সময়ে আল্লাহর ভয় ছাড়া অন্য কোন ভয় থাকবে না। যদি তুমি দীর্ঘজীবী হও, তবে দেখতে পাবে যে সোনা রূপার কোষ বের করা হবে, কিন্তু গ্রহণ করার লোক পাওয়া যাবেনা”। (বুখারী)
আল্লাহর রাসূল (সঃ) যখন এ ভবিষ্যদ্বাণী করেন তখন ইরান ছিল তৎকালীন বিশ্বের এক বিশাল শক্তির সাম্রাজ্য। আর মুসলমানের সংখ্যা তখন খুবই নগণ্য।
এ ঘটনার দীর্ঘদিন পরে আলী (রাঃ) বিগত দিনের কথা স্মরণ করে বলতেনঃ আমি দেখেছি, হাভাতে চড়ে একজন মহিলা হীরা থেকে থেকে এসে কাবার তাওয়াফ করে কিন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্য অন্য কারো ভয় ছিল না। কিসরার ধন ভাণ্ডার যারা জয় করেছিল আমি নিজেই ছিলাম তাদের মধ্যে একজন। তোমরা যদি দীর্ঘজীবী হও তবে আবুল কাসেমের সেই কথার সত্যতা আমার মতই দেখবে, তিনি বলেছিলেন, এমন এক সময় আসবে যখন তাঁর হাতের মুঠোতে সোনা রূপার কোষ বের করা হবে এবং তার গ্রহীতা লোক পাওয়া যাবেনা।
এ ঘটনা সত্য হয়েছিল যখন হযরত উমর বিন আঃ আজিজের শাসনামলে। আদী ইবনে হাতেম (রাঃ) বিগত হাতেম তাই এর পুত্র। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর বর্ণনা দিয়েছেন নিঃসন্দেহে সত্য। কেবল তিনি নন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সাহাবীর কেউই ইসলাম গ্রহণ করে কোনদিন মিথ্যা বলেননি। এমন সত্যবাদী সমাজ যা নবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তা বিরল।
📄 নানা রকম যানবাহন আবিষ্কৃত হবে
পবিত্র কুরআনের সূরা নাহল এর ৮নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমাদের আরোহণের জন্য এবং শোভার জন্য তিনি ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি এমন যানবাহন সৃষ্টি করবেন যা তোমরা জাননা।”
উল্লেখিত আয়াতে তৎকালীন যুগের মানুষের স্থলপথের তিনটি বাহন ঘোড়া, খচ্চর ও গাধার উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর দুই সুরার ১২ নং আয়াতে জলযানের (জাহাজ বা নৌকা) কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ কয়টি ছিল কুরআন নাজিল হওয়ার সময় পর্যন্ত মানুষের প্রধান বাহন। সে যুগের মানুষরা বর্তমান যুগের আবিষ্কৃত যানবাহন মোটরগাড়ি, ট্রেন, উড়োজাহাজ, রকেট ইত্যাদি সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না। তারা জানতো না যে ভবিষ্যতে কী কী যানবাহন আবিষ্কার হবে। এ সব যানবাহন আবিষ্কার হবার প্রায় ১৪০০ বছর পূর্বে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা জানিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া ভবিষ্যতে যে সব যানবাহন আবিষ্কৃত হবে সেগুলোরও অন্তর্ভুক্ত।
এগুলো কুরআনের বর্ণনা গুণা তো কোন যা কিছু, এর সব যানবাহন মানুষ সৃষ্টি করেনি। এগুলো আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন। কারণ এ সব যানবাহনের কলকব্জা (Parts) তৈরি করা হয়েছে প্রকৃতি প্রদত্ত খনিজ পদার্থ দিয়ে। বিজ্ঞানীরা তাতে প্রকৃতি প্রদত্ত বায়ু, পানি, অগ্নি ইত্যাদি থেকে উৎপাদিত প্রবাহ শক্তি করতে প্রকৃতি প্রদত্ত জ্বালানি তেল এসব যানবাহন ব্যবহার করেছে। প্রাচীন বা আধুনিক বিজ্ঞানে এমন একটি হয়েও কোন যানবাহন, যেমন ইত্যাদি পদার্থ তৈরি করতে পারে না। আমি মনে বায়ু, পানি, আগুন ইত্যাদি সৃষ্টি করতে তাদের সাধ্য নেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সৃষ্টি করা হয়েছে বলে সব কিছু আল্লাহ তায়ালা। কাজেই সামান্য চিন্তা করলেই একথা স্বীকার করতে হয় যে, যাবতীয় আবিষ্কার প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালারই সৃষ্টি।
এখানে প্রধানবিষয় যে, পূর্বোক্ত সব সৃষ্টির ফ্রেয়া ক্রিপয়াদের অতীত কাল ব্যবহৃত হয়েছে এবং অন্যান্য যানবাহনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ পদবাচ্য ব্যবহার করা হয়েছে। ত্রিপয়াপরের এ পরিবর্তন থেকে ফুটে উঠেছে যে, এ আয়াত নাযিল হওয়ার সময় পর্যন্ত ঐ সমস্ত যানবাহনের অস্তিত্ব ছিল না যা পরবর্তীতে আবিষ্কৃত হয়েছে অথবা ভবিষ্যতে আবিষ্কৃত হবে।