📄 প্রতি বছর ঈমান কমতে থাকবে
হাদীসঃ যুবাইর ইবনে আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) এর কাছে এসে আমাদের উপর হাজ্জাজের পক্ষ থেকে যে জুলুম নির্যাতন চলছিল সে সম্পর্কে তাঁর নিকট অভিযোগ করলাম। তিনি বললেন, তোমাদের প্রতিটি বছর পূর্ববর্তী বছর অপেক্ষা নিকৃষ্টতর হবে, যাবৎ না তোমরা তোমাদের রবের সাথে মিলিত হও। আমি তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট একথা শুনেছি।
অপর এক হাদীস ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ আমার যুগই হল সর্বোৎকৃষ্ট যুগ। অতঃপর এর নিকটবর্তী যুগ। অতঃপর এর নিকটবর্তী যুগ। অপর এক বর্ণনায় হাসান বলেছেন লোকেরা তিন যুগকেই তারা স্বর্ণযুগী হতে পছন্দ করত। আশ্চর্য চাওয়া না হলেও তারা সাক্ষ্য দেয়।”
উপরোক্ত হাদীস দুটি তিরমিযী শরীফ থেকে গৃহীত। হাদীস দুটি থেকে জানা যায়- যতই দিন যাবে ততই মানুষের ঈমান কমতে থাকবে এবং এ কারণে সার্বিক জীবনে অশান্তি অবনতি ঘটতে থাকবে। আর এ সাহাবী অবস্থার জীবদ্দশায় ঈমানের অবনতি দেখে তার উপর এরূপ প্রভাব করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের আগে এবং বিজয়ের পরে ঈমানের অগ্রগামী সাহাবীদের মর্যাদার পার্থক্য করা পবিত্র কুরআনের সূরা হাদীসে বর্ণিত রয়েছে। হাদীসের এ ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছে।
ঈমানের অবনতি ঘটতে ঘটতে এমন এক যুগ আসবে যখন কেউ ঈমানের গুরুত্ব দিবে না। এ সম্পর্কে হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের কাছাকাছি সময়ে অন্ধাক্র রাতের টুকরোর ন্যায় বিপর্যয় দেখা দিবে। সে সময়ে যে ব্যক্তি সকাল বেলায় মুমিন থাকবে সন্ধ্যায় সে কাফের হয়ে যাবে। আর যে সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে সকালে সে কাফের হয়ে যাবে। একদল লোক পৃথিবীর স্বার্থে সামান্য মূল্যে তাদের দ্বীন বিক্রয় করবে।
এ সব হাদীসের সত্যতা সহজেই উপলব্ধি করা যায় যদি পূর্বযুগের ঈমানদারদের সাথে বর্তমান যুগের ঈমানদারদের তুলনা করা হয়। প্রতি বছর ঈমান কমতে কমতে চল্লিশ বছর পর ঈমানের কোন পর্যায়ে এসে পৌঁছাবে তা সহজেই অনুমেয়।
হিজরী ১৪ সন। মুসলিম জাহানের খেলাফতের দায়িত্ব পালন করছেন তখন আমীরুল মুমেনীন উমর ফারুক (রাঃ)। সেকালে তৎকালীন পরাক্রমশালী রোম সম্রাট কাইসার তখন পারস্যের যুদ্ধে লিপ্ত। রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযায়ী তখন নিত্য দিনের ব্যাপার। এমনই এক যুদ্ধক্ষেত্রে খলীফা আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফা আস সাহমী (রাঃ) রোমান সম্রাট কাইসার মুসলিম যুদ্ধবন্দীদের ঈমান, বীরত্ব এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য জীবন বিলিয়ে দেয়ার দৃঢ় কাহিনী শুনতেন। তাঁর কাছে এঁদের প্রতি খুবই শ্রদ্ধা জন্মায় এবং তাদের মন হতে হয়। তিনি কিছুতেই বুঝতে পারতেন না, কিভাবে মানুষ নিজের প্রিয় জীবনকে, আত্মীয়-স্বজনকে, স্ত্রী-পুত্রদেরকে দূরে ঠেলে দিয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে ছুটে বেড়াতে পারে। তাই তিনি তাঁর সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোন মুসলিম সৈনিক বন্দী হলে তাকে জীবিত অবস্থায় তার কাছে পাঠিয়ে দিতে।
আল্লাহর ইচ্ছায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হুযাইফা (রাঃ) রোমানদের হাতে বন্দী হলেন। রোমানরা তাঁকে তাদের সম্রাটের নিকট হাজির করে বললঃ “এ ব্যক্তি মুহাম্মদএর একজন সহচর, প্রথম ভাগেই সে তাঁর দ্বীন গ্রহণ করেছে। আমাদের হাতে বন্দী হয়েছে, আমরা আপনার নিকট উপস্থিত করেছি।”
রোমান সম্রাট আব্দুল্লাহ (রা) দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেনঃ আমি তোমার নিকট একটি বিষয় উপস্থাপনা করতে চাই।” আব্দুল্লাহ বললেনঃ বিষয়টি কি? সম্রাটঃ আমি প্রস্তাব করছি, তুমি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ কর। যদি তা কর, তোমাকে মুক্তি দেব এবং তোমাকে সম্মানিত করব।
আব্দুল্লাহ দ্রুত ও দৃঢ়তার সাথে বললেনঃ আফসোস! যে দিকে আপনি আহ্বান জানাচ্ছেন তার চেয়ে হাজার বার মৃত্যু আমার অধিক প্রিয়। সম্রাটঃ আমি মনে করি তুমি একজন বুদ্ধিমান লোক। প্রস্তাব মেনে নিলে আমি তোমাকে আমার ক্ষমতার অংশীদার বানাবো, আমার কন্যা তোমার হাতে সম্পূর্ণ করবো এবং আমার সাম্রাজ্যে তোমাকে দান করে দেব।
পেরী পরদিন বন্দী যুদ্ধ ভেসে বললেনঃ আল্লাহর কসম, আপনার গোটা সাম্রাজ্য এবং সেই সাথে আরবের অধিকার যা কিছু আছে সবই যদি আমাকে দেওয়া হয়, তা-ও আমি আমার থেকে এক তিল পরিমাণ অন্য দিকে আমার থেকে ফিরে গিয়ে পরত্যাগ কর, আমি তা করবো না।
সম্রাটঃ তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করবো।
সম্রাটের নির্দেশে বন্দীকে শুলেতে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। দু'হাতে ঝুলিয়ে বেঁধে খ্রিস্টধর্ম পেশ করা হল, তিন অস্বীকার করলেন। তার পা দু'খানি ঝুলিয়ে রেখে ইসলাম পরিত্যাগের আহ্বান জানানো হল, এবারও তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন।
সম্রাটের তার লোকদের থামতে বলে তাঁকে শুলে থেকে নামিয়ে আমার নির্দেশে দিলেন। তারপর বিশাল এক কড়াই আনিয়ে তার মধ্যে তেল ঢালতে বললেন। সে তেল আগুনে ফুটানো হল। টগবগ করে যখন তেল ফুটতে লাগল তখন অন্য দু জন মুসলমান বন্দীকে আনা হল। তাদের একজনকে সেই তপ্ত কড়াইয়ে ফেলার কোটা মোটের মধ্যে ফেলে দেওয়া হল। ফেলার সাথে সাথে বন্দীর মাংসপেশী গলে হাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
আব্দুল্লাহর দিকে ফিরে তাকে আবার খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানানো হল। এবার এবার পূর্বের চেয়েও ঘৃণা ভরে তিনি খ্রিষ্ট ধর্ম প্রত্যাখ্যান করলেন। সম্রাট নির্দেশে এবার আবদুল্লাহকে সেই তপ্ত তেল ভর্তি কড়াইয়ের কাছে আনা হল। এবং আবদুল্লাহর চোখে অশ্রু দেখা গেল।
লোকেরা সম্রাটকে বললঃ ‘বন্দী এবার কাঁদছে’।
সম্রাট মনে করলেন, বন্দী ভীত হয়ে পড়েছে। তিনি নির্দেশ দিলেন, ‘বন্দীকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ তাঁকে আনা হল। এবারও তিনি দৃঢ়ভাবে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রত্যাখ্যান করলেন।
সম্রাট তখন আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘তোমার কন্স হোক! তাহলে কাঁদলে কেন ?’
আব্দুল্লাহ জবাব দিলেনঃ আমি একথা চিন্তা করছি যে, এখনই আমাকে কড়াইয়ের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলা হবে এবং আমি শেষ হয়ে যাব। অথচ আমার একান্ত ইচ্ছা আমার দেহের পশম সংখ্যক জীবন যদি আমার হতো এবং সবগুলিই আল্লাহর রাস্তায় এই কড়াইয়ের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পারতাম।
এবার আল্লাহতায়ালা সম্রাটের মধ্যে প্রভাব ফেলল। বললেনঃ অন্ততপক্ষে তুমি যদি আমার মাথায় একটি চুম্বন কর, তবে তোমাকে মুক্তি দেব।
আব্দুল্লাহ প্রথমে এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করলেন। তবে শর্ত আরোপ করে বললেনঃ যদি আমার সাথে অন্য বন্দীদেরও মুক্তি দেয়া হয়, আমি রাজি আছি।’ সম্রাট বললেন, ‘হ্যাঁ, অন্যদেরও ছেড়ে দেওয়া হবে।'
আব্দুল্লাহ বললেন, ‘আমি মনে মনে বললাম, বিনিময়ে অন্য মুসলিম বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে, এতে কোন দোষ নেই।’ তিনি সম্রাটের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার মাথায় চুমু দিলেন। সম্রাট তাঁর প্রতিশ্রুতি মুসলিম বন্দীদের ছেড়ে দিতে বললেন। এই বন্দীদের মধ্যে ছিলেন ৮০ জন।
যৃত্যকে বাজি রেখে মুক্তি পেলেন যুদ্ধবন্দিগণ। আল্লাহর পথের সৈনিকেরা এবার ফিরে চললেন মদীনার উদ্দেশ্যে। খলিফা ওমর ফারুক (রাঃ) এর কাছে উপস্থিত হয়ে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন আল্লাহ রাসূল (সাঃ) এর প্রিয় সাহাবী ঈমানের দীপ্ত বলে আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফা আস-সাহমী (রা)।
পুরো ঘটনা শুনে খলিফা আনন্দে ফেটে পড়লেন। তিনি উপস্থিত বন্দীদের প্রতিটি তাকিয়ে বললেনঃ ‘প্রতিটি যুদ্ধবন্দীর মাথায় চুমু দেয়া এবং আমিই তার সূচনা করছি।’ এই বলে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর মাথায় চুমু করলেন।
খলিফা উমর (রাঃ) এর শাসন কাল। মুয়াবিয়া তখন সিরিয়ার শাসনকর্তা। মদীনার খাযরাজ গোত্রের হযরত উবাদা ইবন সামিত গেলেন সিরিয়ায়। বাইয়াতে রিদওয়ানে শরীক আনসার সাহাবী উবাদা ইবন সামিত (রাঃ) সত্য প্রকারের ক্ষেত্রে দুনিয়ার কোন মানুষকেই ভয় করতেন না। সিরিয়ায় ব্যবসা ও শাসন কার্যে কতকগুলো অনিয়ম দেখে তিনি সোচ্চার হলেন।
দামেশকের মসজিদে। সিরিয়ার গভর্ণর মুয়াবিয়া উপস্থিত মসজিদে নামাযের জামাত শেষে হযরত উবাদা ইবন সামিত (রাঃ) উঠে দাঁড়িয়ে মহানবীর (সাঃ) একটি হাদীস উদ্ধৃত করে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করলেন হযরত মুয়াবিয়াকে। চারদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল। মুয়াবিয়ার পক্ষে তাঁর মুখ রক্ষা করা সম্ভব হলো না। একা উবাদা ইবনে সামিত গোটা সিরিয়াকে যেন নাড়া দিয়ে হযরত উমর (রাঃ) ইঙ্গিত কাল করলেন। অবশেষে উসামায় না দেখে হযরত মুয়াবিয়া তৃতীয় খলিফা হযর উসমানকে (রাঃ) লিখলেন, “হয় আপনি উবাদাকে মদীনায় ডেকে নিন, নতুবা আমিই সিরিয়া ত্যাগ করব। উবাদা উসামাকে বিদ্রোহী করে তুলেছে।”
উবাদাকে মদীনায় ফিরিয়ে আনা হলো। হযরত উবাদা সোজা গিয়ে হযরত উসমান (রাঃ) বাড়িতে উঠলেন। হযরত উসমান (রাঃ) ঘরে বসে। ঘরের বাইরে প্রচুর লোক। তিনি ঘরে ঢুকে এক কোণে বসে পড়লেন। হযরত উসমান জিজ্ঞেস করলেন “কি খবর।” হযরত উসমান (রাঃ) এর কথার উত্তর উবাদা উঠে দাঁড়ালেন। স্পষ্টবাদী, নির্ভীক উবাদা (রাঃ) বললেন, “স্বয়ং মহানবীর উক্তিঃ পথের কাটার শাসকরা তাদের সঙ্গে এমন পরিতৃপ্ত করবে। কিন্তু তাদের অনুকরণ করা, তোমরা কখনো অন্যায় করো না।”
হযরত আবু হুরাইরা (রা) কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। হযরত উবাদা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “যখন আমরা মহানবীর (সঃ) হাতে বাইয়াত করি, তখন তোমরা ছিলে না, কাজেই তোমরা অনর্থক কথার মাঝখানে বাধা দাও কেন ? আমরা সেদিন মহানবীর (সঃ) কাছে শপথ করেছি সত্য ও অসত্যতা সব অবস্থায় আপনাকে মেনে চলব, গোঁড়া ও স্বার্থের বাইরে সবাইকে আপনাকে অগ্রগণ্য করব। সত্য কথা বলতে কাউকে ভয় করবো না।” হযরত উবাদা এসে শপথের প্রতিটি অক্ষর পালন করেন তাঁর জীবনভর শেষ পর্যন্ত।
তাঁর জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তাঁকে কিছু অসিয়ত করতে বলা হলে তিনি বললেন, “যত হাদীস প্রয়োজনীয় ছিল, তোমাদেরকে লোকে দিয়েছি, আর একটি হাদীস ছিল, বলছি শুন।” হাদীস বর্ণনা করার সাথে সাথেই হযরত উবাদা ইন্তেকাল করলেন।
উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শাহাদত নিহত হন। সে এক চরম পরীক্ষার দিন। সংবাদ পেয়ে গেল, এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে সেদিন তাঁর প্রিয় অনুচরগণ দেশের গভীর তলে রক্ষা করেছিলেন।
রাসূলের (সাঃ) মিথ্যার যুগে সংবাদে একজন আনসার মহিলা ছুটে চললো উহুদের মাঠের দিকে। একজন লোককে দেখে জিজ্ঞাসা করলো, “রাসূল কি অবস্থায় আছেন?”
লোকটি জানে রাসূল নিরাপদে আছেন, তাই প্রশ্নের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে বলল “তোমার পিতা শহীদ হয়েছেন।” মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে উঠলো তাঁর মুখ। নিজেকে সংযত করে মহিলাটি জিজ্ঞাসা করলো, রাসূল কেমন আছেন, তিনি কি জীবিত?
“তোমার ভাইও নিহত হয়েছে।”
মহিলা আবার সেই একই ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল। তখন সে আবার বলল, “তোমার স্বামীও শহীদ হয়েছেন।”
সকল শক্তি দিয়ে একত্রে করা মহিলা চিত্তা করে বলল, “আমার কোন পরমাত্মীয় মারা গেছে তা আমি জিজ্ঞাসা করছিলে, আমাকে শুধু বল আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কেমন আছেন?”
লোকটি উত্তর দিলেন, “তিনি নিরাপদে আছেন।” মুহূর্তো মহিলাটির বিবর্ণ মুখে আনন্দের আভাস দেখা দিল। উপস্থিত হয়ে সে বললো, “আল্লাহর বন্ধুদের প্রার্থনা ব্যর্থ হয় না। কোন দিনই ব্যর্থ হয় না। একটি প্রাণের একটি পবিত্র জীবনের অগ্রগতি সর্বোচ্চ আলোকের শিখা, সত্যের উপর উঁচুতে রলতে থাকে আরও জ্যোতির্ময় করে তোলে।
একজন নারীর কাছে আপন সন্তান ও স্বামী হারানোর বেদনার চেয়ে তুচ্ছ হয়ে যায় কোন পর্যায়ের ঈমান থাকলে তা বলাই বাহুল্য।
আরেক মহিলা অভিভাবকরা রাসূল (সঃ) এর কাছে এসে মৃত্যুদণ্ড গ্রহণ করতে চাইলো। (সঃ) তাঁকে বার বার ফিরিয়ে দিলেও এক পর্যায়ে তিনি এসে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে তাঁর তওবা পূরণ করলেন। তাঁর তওবা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, যে সে তওবা করেছে তা সমস্ত মদীনাবাসীর মধ্যে ভাগ করে দিলে তা যথেষ্ট হবে। এই ছিল প্রথম যুগের ঈমানের অবস্থা। ইসলামের ভবিষ্যতের মুমিনদের ঈমান অবস্থা। বর্তমান যুগে কি এমন ঈমানের কথা চিন্তা করা যায়?
হাকীম (সাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বললেন, আপনার পর আর কারো কাছে কিছু চাইবো না। সারা জীবন তিনি শত কষ্টের মধ্যেও একথার উপর দৃঢ় ছিলেন। কোন কারো কাছে দান গ্রহণ করেন নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে পাওয়া সেই তিনি কখন করেননি। হযরত আবু বকর(রাঃ) ও উমর (রাঃ) এর যুগে সম্পদের প্রাচুর্য হলে সবাই সম্পদ লাভ করলেন কিন্তু হাকীম ইবনে হিয়াম (রাঃ) তাদের দান সবসময়েই ফিরিয়ে দিয়েছেন।
রবি বিন খাইসাম একজন তাবেয়ী। তিনি সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের বন্ধু ছিলেন। বহু বছর ধরে বাড়িতে আনা যাওয়া করেছেন। দরজায় নক করলে আবু আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের দাসী এসে দরজা খুলে দিত। কোনদিন তিনি এ দাসীর দিকে চোখ তুলে তাকাননি। সর্বদা দৃষ্টি নীচু করে রাখতেন। “ তোমা হোমারদের দৃষ্টিকে অনবরণ করিন। এজন্য রবী বিন খাইসাম যখনই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের বাড়িতে আসতেন, দাসী দরজা খুলে দিয়ে ভিতরে গিয়ে বলতো, আপনার ঐ অন্ধ বন্ধুটি এসেছেন। দাসী তাঁকে অন্ধ মনে করতো। সেতো তার দৃষ্টি সবসময় অবনতই দেখেছে কোনদিন চোখ তুলে তাকাতে দেখে নি।
এই ছিল সাহাবী ও তাবেয়ীদের আমল এবং কুরআন সুন্নাহের অনুসরণ। এই ছিল প্রথম যুগের মুমিনদের ঈমানের অবস্থা। বর্তমান যুগে এসব কথা কল্পনা করা যায় কি ? মানুষের ঈমানের অবনতির সাথে সাথে সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর বাণীর সত্যতা প্রমাণ করবে।
📄 মুসলিম মিল্লাত ধ্বংস হবে না
সাওবান (রা) থেকে বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পৃথিবীর আমাকে জন্য সংকুচিত করা হয়েছে, আমিই এর পূর্ব-পশ্চিম সবকিছু অবলোকন করি। পৃথিবীর যতটুকু আমার জন্য সংকুচিত করা হয়েছে, অচিরেই আমার উম্মতের রাজত্ব ততদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। আর লাল-সাদা (সোনা-রূপা) দুটি খনিজ ভাণ্ডারই আমাকে দেয় হয়েছে। আমিই আমার রবের কাছে আমার উম্মতের জন্য ফরিয়াদ জানিয়েছি যে, তিনি যেন তাদেরকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষে ফেলে ধ্বংস না করেন এবং তাদের ছাড়া ভিন্ন দুশমনদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে না দেন যেন যাতে তারা তাদেরকে সমূলে বিনাশ করতে সুযোগ পায়। আমার প্রভু বলেন, হে মুহাম্মদ! আমি কোন ফয়সালা করলে তা মোটেই পরিবর্তিত হওয়ার নয়। আমি তোমার উম্মতের জন্য মঞ্জুর করলাম যে, ব্যাপক দুর্ভিক্ষে তাদেরকে ধ্বংস করব না, নিজেদের ছাড়া অন্য কোন দুশমনদের তাদের উপর এমন আধিপত্য দান করব না যাতে তারা তোমার উম্মতকে বিনাশ করতে সুযোগ পায়, এমনকি তারা (পৃথিবীর) সকল থেকে একজোট হয়ে এলেও। তবে তারা পরস্পর পরস্পরকে ধ্বংস করবে এবং কতক কতককে বন্দী করবে”। (তিরমিযী)
অপর এক হাদীস থেকে জানা যায়, একদল লোক কিয়ামত পর্যন্ত (ইসলামের উপর) সত্যপন্থী হিসাবে টিকে থাকবে।
মুসলিম মিলিত ও মুসলিম সভ্যতাকে ধ্বংস করার জন্য যুগে যুগে শয়তানি অপশক্তি সব সময় তৎপর থেকেছে। এখনও তৎপর আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে। তারা যখনই সফল হয়েছে তখনই মুসলমানদের উপর চড়াও হয়েছে। গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে নির্বিচারে। বর্তমানে ইরাক, আফগানিস্তান, চেচনিয়া, বসনিয়া, কাশ্মীরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেভাবে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে অতীতে এমনিভাবে বার বার শয়তানি শক্তি প্রভাব বিস্তার করেছে। বিশেষ করে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার ক্ষেত্রে হাজার হাজার বছরের অনেক ইব্রাহী সভ্যতা। অথচ মুসলমানদেরকে সব সময় নিরাপদে ও শান্তিতে বসবাস করেছে। এথেকে প্রমাণ হয় যে, একমাত্র মুসলমানরাই সত্য বিশ্ববন্ধু। বেকিস খান বান্দাদ আক্রমণ করে প্রায় বিশ লক্ষ লোক হত্যা করে। তদানীন্তন বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র ছিল বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়। মুসলমানদের ছিল জ্ঞান বিজ্ঞানের সমৃদ্ধ। জন-বিজ্ঞানের ভাণ্ডার ছিল সমৃদ্ধ পৃষ্ঠপোষক। চেঙ্গিস খান এ সব কিছুই ধ্বংস করে দেয়। বর্ণিত আছে, চেঙ্গিস খানের ধ্বংসযজ্ঞের সময় বাগদাদের পাঠাগারগুলো থেকে যে বিপুল পরিমাণে বই-পুস্তক নেয়াতে ফেলে দেয়া হয় তাদের পানি কালো বর্ণ ধারণ করেছিল। এভাবে নানা সময় বর্বর অপশক্তি মুসলিম বিশ্বকে নির্মূল করতে চাইলেও তারা সক্ষম হয়নি। মুসলিম জাতি আল্লাহর রহমতে টিকে আছে এবং থাকবে। কখনও মুসলিম জাতিকে কেউ সমূলে উৎখাত করতে সক্ষম হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর আল্লাহ্ নূরকে এক ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে চায়। কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে (ইসলামকে) অবশ্যই বিজয়ী করবেন এতে কাফেরদের যতই মনোক্ষুণ্ণ হোক না কেন।” (সূরা সফ)
📄 ঈসা (আ:) এর প্রতি বিশ্বাসীরা চিরকাল বিজয়ী থাকবে
আল-কুরআনের সূরা আল ইমরানের ৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘হে ঈসা, আমি তোমাকে নিজের কাছে তুলে নেব, কাফেরদের থেকে তোমাকে পবিত্র করে দেবো। আর যারা তোমার অনুগত রয়েছে তাদেরেকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যারা তোমাকে অস্বীকার করেছে তাদের উপর জয়ী করে রাখবো’।
উক্ত আয়াতের অনুগত বা অনুসারী অর্থ হযরত ঈসা (আঃ) এর নবুওয়াতে বিশ্বাসী যারা। সে হিসেবে খ্রিস্টান ও মুসলিম এই দুই সম্প্রদায় তার অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত।
খ্রিস্টানরা ঈসা (আঃ) এর প্রতি বিশ্বাসী কিন্তু শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি বিশ্বাসী নয়। ইহুদীরা শেষ দুই নবী ঈসা (আঃ) ও মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রতি বিশ্বাসী নয়। তারা নিজেদেরকে হযরত মূসা (আঃ) এর অনুসারী বলে দাবী করে। পক্ষান্তরে একমাত্র মুসলিমরাই, মূসা ও ঈসাসহ সকল নবীর প্রতি সমান বিশ্বাসী।
মূসা ও ঈসা (আঃ) এর বিধানগুলোর মধ্যে একটি বিরাট ব্যবধান ছিল যে, মুহাম্মদ (সাঃ) এর শরীয়তে তার সবাইকে প্রতি ঈমান আনতে হবে। কিন্তু ইহুদী ও খ্রিস্টানদের কেউ তা করে না। ফলে তারা হেদায়েত থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
খ্রিস্টানরা ঈসার নবুওয়াতে বিশ্বাসী হলেও সে বিশ্বাসে কিছু ত্রুটি আছে। ঈসা (আঃ) পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসবেন তখন তাদের এ ভ্রান্তি দূর হবে। ইহুদীরা ঈসা (আঃ) এর প্রতি যে কেবল ঈমান আনবে না তাই নয় বরং ঈসা (আঃ) এর পুনরায় মাবইয়ায্যাম যিনি নজির শ্রেষ্ঠ বারেজনের একজন তার প্রতিও ঈমান অপরাধ আরোপ করেছিল। বিনা পিতা জন্ম, কুমারী মায়ের সন্তান, ঈসা (আঃ) ছিলেন ইহুদীদের জন্য সুস্পষ্ট যুক্তি (miracle) যেন তারা ঈসার (আঃ) প্রতি ঈমান আনে। ইহুদীরা তা করেনি বরং তারা ঈসা (আঃ) কে শূলে চড় হত্যা করতে উদ্যত হয়। এ অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নিজের কাছে তুলে নেন এবং এ আয়াতে রক্ষিত হয়েছেন। তিনি চতুর্থ আসমানে অবস্থান করছেন। কিয়ামতের পূর্বে তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। উক্ত আয়াতে কত শতবছর যে দুই হাজার বছর ধরে খ্রিস্টানরা ইহুদীদের বিরুদ্ধে সফলভাবে বিজয়ী রয়েছে এবং এতদ্বিষয়ে আল-কুরআনের এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
বর্তমানে যদিও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইহুদী ও খ্রিস্টান শক্তি ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মুসলমানকে খ্রিস্টানদের বন্ধু, ইহুদীরা নয়। এ সত্য খ্রিস্টানরা বুঝতে পারবেন, যখন ঈসা (আঃ) পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং ইহুদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদেরকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিবেন।
📄 ঈসার প্রতি সবাই ঈমান আনবে
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ অবশিষ্ট থাকবেনা বরং তার (ঈসার) মৃত্যুর পূর্বে অবশ্যই তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে”। (সূরা নিসাঃ ১৫৯)
অত্র আয়াতের তফসীর হলঃ আহলে কিতাবরা যখন হযরত ঈসা (আঃ) এর প্রতি সত্যিকার ঈমান আনবে না। তাদের বিশ্বাসে ভ্রান্তি আছে। ইহুদীরা তো তাকে নবী বলে স্বীকারই করতো না, বরং শুধু মিথ্যাবাদী হিসেবেই নয় যালোক। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালেক)। অপর দিকে খ্রিস্টানরা যদিও ঈসা মসীহ (আঃ) কে ভক্তি ও মান্য করার দাবীদার কিন্তু তাদের মধ্যে একদল ইহুদীদের মতই হযরত ঈসা (আঃ) এর প্রশ্নে কিছু হওয়ার এবং আরেক মারাত্মক ভুল করার কথা আকুতিতে প্রদান করে চরম মূর্খতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের অনেকের ধারণা মতো উপস্থিতি দেখতে ঈসা (আঃ) কে স্বয়ং খোদা বা খোদার পুত্র রূপে বরণ করে বসেছে।
কুরআন পাকের এই আয়াতটি থেকে জানা যায় যে, ইহুদী ও খ্রিস্টানরা বর্তমানে যদিও হযরত ঈসা (আঃ) এর প্রতি যথাযথ ঈমান রাখে না, বরং শৈথিল্য বা বাড়াবাড়ি করে, কিন্তু কিয়ামতের নিকটবর্তী যুগে তিনি যখন পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ করবেন, তখন তারাও তাঁর প্রতি পুরোপুরি ও সত্যিকার ঈমান আনবে। খ্রিস্টানরা মুসলমানদের মত সহীহ আকীদা ও বিশ্বাসের সাথে ঈমানদার হয়ে যাবে। ইহুদীদের মধ্যে যারা তার বিরুদ্ধাচরণ করবে নির্ধন ও নিশ্চিহ্ন করা হবে। ইহুদীদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করবে। ইহুদীরা ধর্মী, বিদ্বেষ ও শত্রুতার কারণে নিশ্চিহ্ন করা হবে। এমনকি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সহস্র ধর্ম গ্রহণ পোষণ করে। কিন্তু এখন এই সময় আসবে, যখন তাদের দৃষ্টি উন্মীলিত হবে, তখন তারা যথার্থই বুঝতে পারবে যে, হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সম্পর্কে তাদের ধারণা একান্তই ভ্রান্তিপূর্ণ ছিল। তখন সমগ্র দুনিয়া থেকে সর্বপ্রকার কুফরী ধ্যান-ধারণা, আচার-অনুষ্ঠান উৎখাত হবে। সর্বত্র ইসলামের একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে। সর্বত্র ইসলামের একচ্ছত্র প্রাধান্য কায়েম হবে।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, হযরত ঈসা ইবনে মারিয়াম (আঃ) একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক রূপে অবশ্যই পৃথিবীতে অবতরণ করবেন। তিনি দাজ্জালকে কতল করবেন, শুকর নিধন করবেন, ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন এবং জিজিয়া কর তুলে দিবেন। তখন একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা হবে এবং পৃথিবীতে কোন অন্যায়, অশান্তি ও অভাব-অভিযোগ থাকবে না।