📘 Mojeja > 📄 বরং আমিই তোমাকে হত্যা করব

📄 বরং আমিই তোমাকে হত্যা করব


উসাই ইবনে খালফ মক্কায় অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতঃ হে মুহাম্মদ (সাঃ) আমার একটা ঘোড়া আছে তার নাম ‘আউজ’। তাকে আমি প্রতিদিন এক ফরাক (প্রায় ৪০ কেজি) ভুট্টা খাওয়াই। এই ঘোড়ায় চড়েই আমি যুদ্ধের ময়দানে তোমাকে হত্যা করব। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিতেনঃ বরং ইনশাআল্লাহ আমিই তোমাকে হত্যা করব। (সিরাতে ইবনে হিশাম)

হযরত রাসূল মকবুল (সাঃ) জীবনে মাত্র এই একজন ব্যক্তিকে নিজে হাতে হত্যা করেছিলেন। উসাই ইবনে খালফ ছাড়া আর কোন ব্যক্তি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর হাতে নিহত হননি। জাহেলিয়াতকে উচ্ছেদ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জীবনে কমপক্ষে সাতাশটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এই জীবনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল উহুদের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়িক পরাজয় ঘটে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর শাহাদত লাভের গুজব ছড়িয়ে পড়ে।

পরাজয় ঘটার খবর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের শাহাদাত লাভের গুজব ছড়িয়ে পড়বার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সর্ব প্রথম চিনতে পারেন কা’ব ইবনে মালিক। কা’ব বললেনঃ শিরস্ত্রাণের ভেতর থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চোখ দুটি জ্বলজ্বল করছিল আমি তাঁকে চিনতে পারলাম এবং সব সঙ্গে চিৎিকার করে বললাম “হে মুসলমানগণ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) বেঁচে আছেন। তিনি এখানে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ইশারা করে বললেন, তুমি চুপ থাক।”

মুসলমানগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) চেনার পর তাঁকে নিয়ে সবাই পর্বতের চোটালো পেছালেন। এই সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সঙ্গে ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক, উমর ফারুক, আলী ইবনে আবু তালিব, তলহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ও জুবাইর ইবনুল আওয়ামসহ একদল সাহাবী।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্বতের ঘাটিতে যখন নিষ্ক্রিয়েন তখন উবাই ইবনে খালফ সেখানে পৌঁছালো। সে বললো, “হে মুহাম্মদ, এ যাবৎ তুমি প্রাণে বেঁচে গেলেও তোমার নিস্তার নেই।” সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ এ লোকটিকে মহানুভতি দেখানোর কি আমাদের জন্য ঠিক হবে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, ওকে আসতে দাও। যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এঙ্গে বলে তিনি হারবাস বর্মটি হাতে নিলেন। (কোন কোন বর্ণনায় আছে) হাত থেকে ছোঁড়া যায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন ভয়ঙ্কর পিয়ন করলেন যে, টি প্রবল গর্তে নয়ে উঠল তার পিঠের উপর বলা হয়। বিমাতার ফলে যেমন দ্রুত উড়ে যায়, আমার ঠিক তেমনি ভীত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে থেকে হারছস হওয়ার দূরে সরে পড়লাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তার ঘাড়ের উপর বর্শা আঘাত হানলেন। আঘাত খেয়ে উবাই ইবনে খালফ তার ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়লো এবং কয়েকটা গুতাড়ি খেলো।

ইতিপূর্বে উসাই ইবনে খালফ মক্কায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাথে দেখা করে বলতোঃ হে মুহাম্মদ, আমার একটা ঘোড়া আছে। তার নাম ‘আউজ’ তাকে আমি প্রতিদিন এক ফরাক (প্রায় ৪০ কেজি) ভুট্টা খাওয়াই। এই ঘোড়ায় চড়েই আমি তোমাকে হত্যা করব। জবাব দিতেন, বরং আল্লাহ চাহেতো আমিই তোমাকে হত্যা করব।

উবাইয়ের কাঁধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে জখমটি করে দিয়েছিলেন সেটা তেমন গুরুতর জখম না হলেও তা দিয়ে রক্ত ঝরছিল এবং ঐ অবস্থাতেই সে কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বলতে থাকলঃ মক্কায় থাকা কালেই মুহাম্মদ আমাকে বলেছিল, তোমাকে আমি হত্যা করব। এখন আমার আশংকা হয়, সে যদি আমার প্রতি থু থু নিক্ষেপ করে তা হলেও আমি মরে যাব।

কুরাইশরা তাকে নিয়ে মক্কায় অভিমুখে রওয়ানা হল। পথিমধ্যে সারাক নামক স্থানে উবাইয়ের এই দুশমনের জীবন-লীলা সাঙ্গ হলো।

উবাই ইবনে খালফ ছিল মক্কার শীর্ষস্থানীয় ধনাঢ্য কুরাইশ নেতা। ইসলাম ও ইসলামের নামে বিরোধিতা সম্পর্কে অনন্ত নিজের জীবনকেও সে ইসলামের বিরোধিতায় নিয়ে সূরা রুম রাজি ছিল উবাই এ কথা বিশ্বাস করত না। সে এই মর্মে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর সাথে বাজি ধরে যে, যদি রোম বিজয়ী হয় তাহলে সে প্রসংশিত উট প্রদান করবে। এই ঘটনার কয়েক বছর পর ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে রোম পারস্য সাম্রাজ্যকে বিপুলভাবে পরাজিত করে। বাংলায় যাতায়াতে উবাই ইবনে খালফ হযরত আবু বকর (রাঃ) কে একশত উট প্রদান করে তা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নির্দেশে সবগুলো উট মানুষের মধ্যে বিতরণ করে দেন।

এখানে প্রধানবিষয় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর যুগ ইসলামের कट्टर দুশমনদের মধ্যে যে প্রবল ব্যক্তিত্ব, আত্মম্ভরিতাবোধ ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় উন্নত মানসিকতা ছিল আজকের যুগের ইসলাম বিরোধীর কাছে তা মোটেও আশা করা যায় না।

📘 Mojeja > 📄 বনী ছকিফ গোত্রে একজন মিথ্যাবাদী ও একজন নরঘাতকের জন্ম হবে

📄 বনী ছকিফ গোত্রে একজন মিথ্যাবাদী ও একজন নরঘাতকের জন্ম হবে


ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ছকিফ গোত্রে একজন মিথ্যাবাদী ও এক নরঘাতকের জন্ম হবে”।

আবু ঈসা বলেন, এ অনুচ্ছেদে আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। হাজ্জাজ যে সব লোক খেলাফতের কোন হত্যা করে তাদের সংখ্যা ছিল এক লাখ বিশ হাজার (তিরমিযী)

হাজ্জাজ যখন মক্কা আক্রমণ করে তখন মক্কার গভর্ণর ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রাঃ)। হাজ্জাজ তাকে শহীদ করে তাঁর ছেলে বলতেন বলেন, আম্মাজান আব্দুল্লাহ (রাঃ) মা হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) পুত্র শাহাদাতের তৃতীয় দিনে এক দারীকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। ঘটনাক্রমে হাজ্জাজ সে সময় সেখানে খোরাক করছিল। হযরত আসমা (রাঃ) হাজ্জাজকে বললেন, এই সওয়ারীর নামায সময় কি এখনও হয়নি? হাজ্জাজ জবাব দিলঃ সে মূলহিদ ছিল। এই শান্তি তার প্রাপ্য ছিল। হাজ্জাজ তাঁকে আরো বললঃ গর্ভে উত্তোলন করে তাঁর বলতেন, খোদার কসম, সে খোদাদ্রোহী বা মুশরিক ছিল না; বরং নামাযী রোজাদার এবং মোস্তাকী ছিল।

হাজ্জাজ ঝাঁজালো কন্ঠে বললঃ এই বুড়ি, তুমি এখন থেকে চলে যাও। তোমার জ্ঞান লোপ পেয়েছে। হযরত আসমা (রাঃ) অত্যন্ত নির্ভীকতার সাথে জবাব দিলেন, আমার জ্ঞান লোপ পায়নি। কে বলতে শুনেছি যে, বনু সাকীফ গোত্রের লোকেরাই অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও সম্পন্নশালী।

মিথ্যাবাদী আল মুখতার પ્રથમ থেকে ইবনে হোসাইন (রাঃ) এর পক্ষে ছিল; কিন্তু পরে মুয়াবিয়ার পক্ষ অবলম্বন করে। পরবর্তীতে কারবালার যুদ্ধে সে পুনরায় হোসাইন (রাঃ) এর দলে যোগ দেয়। এজন উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ কর্তৃক কারারুদ্ধ হয়। কিয়ামত শুরু হয় পর দিন থেকে মক্কায় এসে মক্কার শাসক আব্দুল্লাহ বিন জুবাইরের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত করে; কিন্তু তিনি তাকে বিশ্বাস করেন নাই।

মক্কা থেকে পুনরায় ফিরে গিয়ে আল মুখতার নিজেকে হোসাইন হওয়ার প্রতিশোধ গ্রহণকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে হযরত আলী (রাঃ) এর অনুসারী কুফাবাসীদেরকে সংগঠিত করে এবং এইভাবে নিজেকে কুফায় প্রতিষ্ঠিত করে। ৬৪৮ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকে পরাজিত ও হত্যা করে কুফার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিপত্তি অর্পণ করে। এর তার শাসনের মূলে হাফিয়া ছিল মিথ্যা, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা।

উবাইদুল্লাহকে পরাজিত করার পর আল মুখতার আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরের আনুগত্য অস্বীকার করে। একদিন পর্যন্ত সে আনুগত্যের ভান করে ছিল। সুতরাং ইবনে জুবাইর তাঁর ভাই মুসয়াবকে তার বিরুদ্ধে একদল সৈন্য পাঠান। মুসয়াব ছিলেন বসরার শাসনকর্তা। মুসয়াব তাঁর সেনাপতি মুহাল্লবের সাহায্যে তাকে কুফার নিকট শোচনীয় ভাবে পরাজিত করেন। মে পর্যন্ত আল মুখতার ৬৮৬ ঈসঃ অনুসারে হত্যা করা হয়।

উমাইয়া শাসনে ইতিহাসে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম যুগে হাজ্জাজ তায়েফের এক মক্তবের শিক্ষক ছিল। আরবী ভাষা ও সাহিত্যে সে ছিল একজন সুপণ্ডিত। তার যোগ্যতা, কর্মকুশলতা ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক হাজ্জাজকে হিজাজের (মক্কা) গভর্নর পদে নিয়োগ দেন। ৬৬২ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইরের বিরুদ্ধে প্রেরক করে। ইবনে জুবাইরকে পরাজিত ও হত্যা করার পর ৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে হিজাজের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়। প্রায় কুড়ি বছর ধরে হাজ্জাজ এই পদে অধিষ্ঠিত থাকেন।

হাজ্জাজ একজন পণ্ডিত ও সুবক্তাও ছিল। আরবী লিপিতে হারকাতের ও নোকতার ব্যবহার প্রবর্তন করে আরবী বর্ণমালা পূর্ণতা সাধন তার বিশেষ কৃতিত্ব। উমাইয়া সাম্রাজ্যের সীমা বিস্তারে তার বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে। তারই নেতৃত্বে মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারতবর্ষে সিন্ধু ও মুলতান জয় করেন।

ঐতিহাসিক পি,কে হিট্টি মতে, হাজ্জাজ ছিল একজন রক্ত পিপাসু ও স্বেচ্ছাচারী শাসক এবং একজন বীর নেতা ‘নিগ্রো’। স্যার উইলিয়াম মর তাকে দুনিয়ার অন্যতম নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী স্বৈর শাসক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ঐতিহাসিক আমির আলী তাকে হিংস্র প্রকৃতির লোক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (হোসাইন, কে. আলী)

এই জন্যই রাসূল করীম (সঃ) এর পবিত্র জবান থেকে ছাকীফ গোত্রের এই দুই কুলঙ্গার ব্যক্তি সম্পর্কে তাদের জন্মের পূর্বে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরে এই ভবিষ্যদ্বাণী কার্যকর হয়েছিল।

📘 Mojeja > 📄 উসামা হত্যা

📄 উসামা হত্যা


হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উসামা (রাঃ) কে বলেছিলেন আফসোস! একমাত্র বিদ্রোহী তোমাকে হত্যা করবে।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর এই ভবিষ্যদ্বাণীটি মুতওয়াতের হাদীস দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। মুতাওয়াতির হাদীস হল ঐ বহু সংখ্যক সাহাবী থেকে যুগে যুগে বহু বহু রাবী নির্ভুল সনদে বর্ণনা করেছেন। এগুলো সন্দেহমুক্ত হাদীস।

হযরত উসামা বিন জায়েদ (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পালক পুত্র হযরত জায়েদ বিন হারিসা (রাঃ) এর পুত্র। ইসলামের পরিভাষে এঁরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মেহমানে দ্বীন বলা হয়েছিলেন।

মদিনায় হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মসজিদে নববী নির্মাণের কাজ শুরু করলেন। অত্যন্ত আনন্দ ও উদ্দীপনা নিয়ে সাহাবীগণ মসজিদ নির্মাণের জন্য ভারি ভারি ইট বহন করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁদের সাথে অংশ নিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, সবাই একটি করে ইট বহন করছে আর উসামা (রাঃ) একসাথে দুটি করে ইট বহন করছে। উসামা ছিলেন শক্তিশালী টনটনে যুবক। তিনি উসামাকে লক্ষ্য করে বললেন, আফসোস! একদল বিদ্রোহী তোমাকে হত্যা করবে।

সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর এই কথা শুনে ভয়ে আঁতকে উঠলেন। তারা অপেক্ষায় ছিলেন কখন এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়। তাঁরা জানতেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কোন কথা झूठा হয় না। এর প্রায় চল্লিশ বছর পর সিফফিনের যুদ্ধে আলী (রাঃ) নিহত হন। হযরত মুয়াবিয়া ও হযরত আলী (রাঃ) এর মধ্যে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় তা সীমালঙ্ঘনকারী। তখন অন্যান্য দল রাসূলুল্লাহ ও হযরত আম্বিয়াসহ রাদিয়াল্লাহু আলাইহি আনহুম। এদের মধ্যে ছিলেন হযরত তালহা ও হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আলাইহি আনহুমা।

সিফফিনের যুদ্ধে হযরত মুয়াবিয়ার লোকদের হাতে উসামা (রাঃ) নিহত হলে সবার কাছে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে, হযরত আলী (রাঃ) এর বিদ্রোহী পক্ষই ছিল সীমালঙ্ঘনকারী। তখন অন্যান্য দল মুয়াবিয়া (রাঃ) এর বিদ্রোহী বা সীমালঙ্ঘনকারী পক্ষই ছিল। কারণ পথে হযরত যুবাইর (রাঃ) বিদ্রোহীদের হাতে শহীদ হন। হযরত আম্বর ইবনুল আস (রাঃ) মুয়াবিয়ার পক্ষ ত্যাগ করলেন না বটে; কিন্তু তিনি উসামাকে (রাঃ) হত্যার জন্য মুয়াবিয়া (রাঃ) কে দায়ী করেন এবং এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ভবিষ্যদ্বাণী তাকে স্মরণ করিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (রাঃ) এ কথা অস্বীকার করেন নাই যেহেতু তিনিও এই হাদীস জানতেন। তিনি তার কারণ বা দায় দায়িত্ব হযরত আলী (রাঃ) এর দলের উপর চাপাতে চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, আমরা নই যারা তাঁকে আমাদের বর্শার সামনে এগিয়ে দিয়েছি তারাই তাঁকে হত্যা করেছে। অর্থাৎ তারাই এই হত্যার জন্য দায়ী।

📘 Mojeja > 📄 প্রতি বছর ঈমান কমতে থাকবে

📄 প্রতি বছর ঈমান কমতে থাকবে


হাদীসঃ যুবাইর ইবনে আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) এর কাছে এসে আমাদের উপর হাজ্জাজের পক্ষ থেকে যে জুলুম নির্যাতন চলছিল সে সম্পর্কে তাঁর নিকট অভিযোগ করলাম। তিনি বললেন, তোমাদের প্রতিটি বছর পূর্ববর্তী বছর অপেক্ষা নিকৃষ্টতর হবে, যাবৎ না তোমরা তোমাদের রবের সাথে মিলিত হও। আমি তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট একথা শুনেছি।

অপর এক হাদীস ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ আমার যুগই হল সর্বোৎকৃষ্ট যুগ। অতঃপর এর নিকটবর্তী যুগ। অতঃপর এর নিকটবর্তী যুগ। অপর এক বর্ণনায় হাসান বলেছেন লোকেরা তিন যুগকেই তারা স্বর্ণযুগী হতে পছন্দ করত। আশ্চর্য চাওয়া না হলেও তারা সাক্ষ্য দেয়।”

উপরোক্ত হাদীস দুটি তিরমিযী শরীফ থেকে গৃহীত। হাদীস দুটি থেকে জানা যায়- যতই দিন যাবে ততই মানুষের ঈমান কমতে থাকবে এবং এ কারণে সার্বিক জীবনে অশান্তি অবনতি ঘটতে থাকবে। আর এ সাহাবী অবস্থার জীবদ্দশায় ঈমানের অবনতি দেখে তার উপর এরূপ প্রভাব করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের আগে এবং বিজয়ের পরে ঈমানের অগ্রগামী সাহাবীদের মর্যাদার পার্থক্য করা পবিত্র কুরআনের সূরা হাদীসে বর্ণিত রয়েছে। হাদীসের এ ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছে।

ঈমানের অবনতি ঘটতে ঘটতে এমন এক যুগ আসবে যখন কেউ ঈমানের গুরুত্ব দিবে না। এ সম্পর্কে হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের কাছাকাছি সময়ে অন্ধাক্র রাতের টুকরোর ন্যায় বিপর্যয় দেখা দিবে। সে সময়ে যে ব্যক্তি সকাল বেলায় মুমিন থাকবে সন্ধ্যায় সে কাফের হয়ে যাবে। আর যে সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে সকালে সে কাফের হয়ে যাবে। একদল লোক পৃথিবীর স্বার্থে সামান্য মূল্যে তাদের দ্বীন বিক্রয় করবে।

এ সব হাদীসের সত্যতা সহজেই উপলব্ধি করা যায় যদি পূর্বযুগের ঈমানদারদের সাথে বর্তমান যুগের ঈমানদারদের তুলনা করা হয়। প্রতি বছর ঈমান কমতে কমতে চল্লিশ বছর পর ঈমানের কোন পর্যায়ে এসে পৌঁছাবে তা সহজেই অনুমেয়।

হিজরী ১৪ সন। মুসলিম জাহানের খেলাফতের দায়িত্ব পালন করছেন তখন আমীরুল মুমেনীন উমর ফারুক (রাঃ)। সেকালে তৎকালীন পরাক্রমশালী রোম সম্রাট কাইসার তখন পারস্যের যুদ্ধে লিপ্ত। রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযায়ী তখন নিত্য দিনের ব্যাপার। এমনই এক যুদ্ধক্ষেত্রে খলীফা আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফা আস সাহমী (রাঃ) রোমান সম্রাট কাইসার মুসলিম যুদ্ধবন্দীদের ঈমান, বীরত্ব এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য জীবন বিলিয়ে দেয়ার দৃঢ় কাহিনী শুনতেন। তাঁর কাছে এঁদের প্রতি খুবই শ্রদ্ধা জন্মায় এবং তাদের মন হতে হয়। তিনি কিছুতেই বুঝতে পারতেন না, কিভাবে মানুষ নিজের প্রিয় জীবনকে, আত্মীয়-স্বজনকে, স্ত্রী-পুত্রদেরকে দূরে ঠেলে দিয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে ছুটে বেড়াতে পারে। তাই তিনি তাঁর সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোন মুসলিম সৈনিক বন্দী হলে তাকে জীবিত অবস্থায় তার কাছে পাঠিয়ে দিতে।

আল্লাহর ইচ্ছায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হুযাইফা (রাঃ) রোমানদের হাতে বন্দী হলেন। রোমানরা তাঁকে তাদের সম্রাটের নিকট হাজির করে বললঃ “এ ব্যক্তি মুহাম্মদএর একজন সহচর, প্রথম ভাগেই সে তাঁর দ্বীন গ্রহণ করেছে। আমাদের হাতে বন্দী হয়েছে, আমরা আপনার নিকট উপস্থিত করেছি।”

রোমান সম্রাট আব্দুল্লাহ (রা) দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেনঃ আমি তোমার নিকট একটি বিষয় উপস্থাপনা করতে চাই।” আব্দুল্লাহ বললেনঃ বিষয়টি কি? সম্রাটঃ আমি প্রস্তাব করছি, তুমি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ কর। যদি তা কর, তোমাকে মুক্তি দেব এবং তোমাকে সম্মানিত করব।

আব্দুল্লাহ দ্রুত ও দৃঢ়তার সাথে বললেনঃ আফসোস! যে দিকে আপনি আহ্বান জানাচ্ছেন তার চেয়ে হাজার বার মৃত্যু আমার অধিক প্রিয়। সম্রাটঃ আমি মনে করি তুমি একজন বুদ্ধিমান লোক। প্রস্তাব মেনে নিলে আমি তোমাকে আমার ক্ষমতার অংশীদার বানাবো, আমার কন্যা তোমার হাতে সম্পূর্ণ করবো এবং আমার সাম্রাজ্যে তোমাকে দান করে দেব।

পেরী পরদিন বন্দী যুদ্ধ ভেসে বললেনঃ আল্লাহর কসম, আপনার গোটা সাম্রাজ্য এবং সেই সাথে আরবের অধিকার যা কিছু আছে সবই যদি আমাকে দেওয়া হয়, তা-ও আমি আমার থেকে এক তিল পরিমাণ অন্য দিকে আমার থেকে ফিরে গিয়ে পরত্যাগ কর, আমি তা করবো না।

সম্রাটঃ তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করবো।

সম্রাটের নির্দেশে বন্দীকে শুলেতে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। দু'হাতে ঝুলিয়ে বেঁধে খ্রিস্টধর্ম পেশ করা হল, তিন অস্বীকার করলেন। তার পা দু'খানি ঝুলিয়ে রেখে ইসলাম পরিত্যাগের আহ্বান জানানো হল, এবারও তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন।

সম্রাটের তার লোকদের থামতে বলে তাঁকে শুলে থেকে নামিয়ে আমার নির্দেশে দিলেন। তারপর বিশাল এক কড়াই আনিয়ে তার মধ্যে তেল ঢালতে বললেন। সে তেল আগুনে ফুটানো হল। টগবগ করে যখন তেল ফুটতে লাগল তখন অন্য দু জন মুসলমান বন্দীকে আনা হল। তাদের একজনকে সেই তপ্ত কড়াইয়ে ফেলার কোটা মোটের মধ্যে ফেলে দেওয়া হল। ফেলার সাথে সাথে বন্দীর মাংসপেশী গলে হাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

আব্দুল্লাহর দিকে ফিরে তাকে আবার খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানানো হল। এবার এবার পূর্বের চেয়েও ঘৃণা ভরে তিনি খ্রিষ্ট ধর্ম প্রত্যাখ্যান করলেন। সম্রাট নির্দেশে এবার আবদুল্লাহকে সেই তপ্ত তেল ভর্তি কড়াইয়ের কাছে আনা হল। এবং আবদুল্লাহর চোখে অশ্রু দেখা গেল।

লোকেরা সম্রাটকে বললঃ ‘বন্দী এবার কাঁদছে’।

সম্রাট মনে করলেন, বন্দী ভীত হয়ে পড়েছে। তিনি নির্দেশ দিলেন, ‘বন্দীকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ তাঁকে আনা হল। এবারও তিনি দৃঢ়ভাবে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রত্যাখ্যান করলেন।

সম্রাট তখন আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘তোমার কন্স হোক! তাহলে কাঁদলে কেন ?’

আব্দুল্লাহ জবাব দিলেনঃ আমি একথা চিন্তা করছি যে, এখনই আমাকে কড়াইয়ের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলা হবে এবং আমি শেষ হয়ে যাব। অথচ আমার একান্ত ইচ্ছা আমার দেহের পশম সংখ্যক জীবন যদি আমার হতো এবং সবগুলিই আল্লাহর রাস্তায় এই কড়াইয়ের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পারতাম।

এবার আল্লাহতায়ালা সম্রাটের মধ্যে প্রভাব ফেলল। বললেনঃ অন্ততপক্ষে তুমি যদি আমার মাথায় একটি চুম্বন কর, তবে তোমাকে মুক্তি দেব।

আব্দুল্লাহ প্রথমে এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করলেন। তবে শর্ত আরোপ করে বললেনঃ যদি আমার সাথে অন্য বন্দীদেরও মুক্তি দেয়া হয়, আমি রাজি আছি।’ সম্রাট বললেন, ‘হ্যাঁ, অন্যদেরও ছেড়ে দেওয়া হবে।'

আব্দুল্লাহ বললেন, ‘আমি মনে মনে বললাম, বিনিময়ে অন্য মুসলিম বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে, এতে কোন দোষ নেই।’ তিনি সম্রাটের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার মাথায় চুমু দিলেন। সম্রাট তাঁর প্রতিশ্রুতি মুসলিম বন্দীদের ছেড়ে দিতে বললেন। এই বন্দীদের মধ্যে ছিলেন ৮০ জন।

যৃত্যকে বাজি রেখে মুক্তি পেলেন যুদ্ধবন্দিগণ। আল্লাহর পথের সৈনিকেরা এবার ফিরে চললেন মদীনার উদ্দেশ্যে। খলিফা ওমর ফারুক (রাঃ) এর কাছে উপস্থিত হয়ে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন আল্লাহ রাসূল (সাঃ) এর প্রিয় সাহাবী ঈমানের দীপ্ত বলে আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফা আস-সাহমী (রা)।

পুরো ঘটনা শুনে খলিফা আনন্দে ফেটে পড়লেন। তিনি উপস্থিত বন্দীদের প্রতিটি তাকিয়ে বললেনঃ ‘প্রতিটি যুদ্ধবন্দীর মাথায় চুমু দেয়া এবং আমিই তার সূচনা করছি।’ এই বলে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর মাথায় চুমু করলেন।

খলিফা উমর (রাঃ) এর শাসন কাল। মুয়াবিয়া তখন সিরিয়ার শাসনকর্তা। মদীনার খাযরাজ গোত্রের হযরত উবাদা ইবন সামিত গেলেন সিরিয়ায়। বাইয়াতে রিদওয়ানে শরীক আনসার সাহাবী উবাদা ইবন সামিত (রাঃ) সত্য প্রকারের ক্ষেত্রে দুনিয়ার কোন মানুষকেই ভয় করতেন না। সিরিয়ায় ব্যবসা ও শাসন কার্যে কতকগুলো অনিয়ম দেখে তিনি সোচ্চার হলেন।

দামেশকের মসজিদে। সিরিয়ার গভর্ণর মুয়াবিয়া উপস্থিত মসজিদে নামাযের জামাত শেষে হযরত উবাদা ইবন সামিত (রাঃ) উঠে দাঁড়িয়ে মহানবীর (সাঃ) একটি হাদীস উদ্ধৃত করে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করলেন হযরত মুয়াবিয়াকে। চারদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল। মুয়াবিয়ার পক্ষে তাঁর মুখ রক্ষা করা সম্ভব হলো না। একা উবাদা ইবনে সামিত গোটা সিরিয়াকে যেন নাড়া দিয়ে হযরত উমর (রাঃ) ইঙ্গিত কাল করলেন। অবশেষে উসামায় না দেখে হযরত মুয়াবিয়া তৃতীয় খলিফা হযর উসমানকে (রাঃ) লিখলেন, “হয় আপনি উবাদাকে মদীনায় ডেকে নিন, নতুবা আমিই সিরিয়া ত্যাগ করব। উবাদা উসামাকে বিদ্রোহী করে তুলেছে।”

উবাদাকে মদীনায় ফিরিয়ে আনা হলো। হযরত উবাদা সোজা গিয়ে হযরত উসমান (রাঃ) বাড়িতে উঠলেন। হযরত উসমান (রাঃ) ঘরে বসে। ঘরের বাইরে প্রচুর লোক। তিনি ঘরে ঢুকে এক কোণে বসে পড়লেন। হযরত উসমান জিজ্ঞেস করলেন “কি খবর।” হযরত উসমান (রাঃ) এর কথার উত্তর উবাদা উঠে দাঁড়ালেন। স্পষ্টবাদী, নির্ভীক উবাদা (রাঃ) বললেন, “স্বয়ং মহানবীর উক্তিঃ পথের কাটার শাসকরা তাদের সঙ্গে এমন পরিতৃপ্ত করবে। কিন্তু তাদের অনুকরণ করা, তোমরা কখনো অন্যায় করো না।”

হযরত আবু হুরাইরা (রা) কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। হযরত উবাদা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “যখন আমরা মহানবীর (সঃ) হাতে বাইয়াত করি, তখন তোমরা ছিলে না, কাজেই তোমরা অনর্থক কথার মাঝখানে বাধা দাও কেন ? আমরা সেদিন মহানবীর (সঃ) কাছে শপথ করেছি সত্য ও অসত্যতা সব অবস্থায় আপনাকে মেনে চলব, গোঁড়া ও স্বার্থের বাইরে সবাইকে আপনাকে অগ্রগণ্য করব। সত্য কথা বলতে কাউকে ভয় করবো না।” হযরত উবাদা এসে শপথের প্রতিটি অক্ষর পালন করেন তাঁর জীবনভর শেষ পর্যন্ত।

তাঁর জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তাঁকে কিছু অসিয়ত করতে বলা হলে তিনি বললেন, “যত হাদীস প্রয়োজনীয় ছিল, তোমাদেরকে লোকে দিয়েছি, আর একটি হাদীস ছিল, বলছি শুন।” হাদীস বর্ণনা করার সাথে সাথেই হযরত উবাদা ইন্তেকাল করলেন।

উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শাহাদত নিহত হন। সে এক চরম পরীক্ষার দিন। সংবাদ পেয়ে গেল, এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে সেদিন তাঁর প্রিয় অনুচরগণ দেশের গভীর তলে রক্ষা করেছিলেন।

রাসূলের (সাঃ) মিথ্যার যুগে সংবাদে একজন আনসার মহিলা ছুটে চললো উহুদের মাঠের দিকে। একজন লোককে দেখে জিজ্ঞাসা করলো, “রাসূল কি অবস্থায় আছেন?”

লোকটি জানে রাসূল নিরাপদে আছেন, তাই প্রশ্নের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে বলল “তোমার পিতা শহীদ হয়েছেন।” মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে উঠলো তাঁর মুখ। নিজেকে সংযত করে মহিলাটি জিজ্ঞাসা করলো, রাসূল কেমন আছেন, তিনি কি জীবিত?

“তোমার ভাইও নিহত হয়েছে।”

মহিলা আবার সেই একই ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল। তখন সে আবার বলল, “তোমার স্বামীও শহীদ হয়েছেন।”

সকল শক্তি দিয়ে একত্রে করা মহিলা চিত্তা করে বলল, “আমার কোন পরমাত্মীয় মারা গেছে তা আমি জিজ্ঞাসা করছিলে, আমাকে শুধু বল আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কেমন আছেন?”

লোকটি উত্তর দিলেন, “তিনি নিরাপদে আছেন।” মুহূর্তো মহিলাটির বিবর্ণ মুখে আনন্দের আভাস দেখা দিল। উপস্থিত হয়ে সে বললো, “আল্লাহর বন্ধুদের প্রার্থনা ব্যর্থ হয় না। কোন দিনই ব্যর্থ হয় না। একটি প্রাণের একটি পবিত্র জীবনের অগ্রগতি সর্বোচ্চ আলোকের শিখা, সত্যের উপর উঁচুতে রলতে থাকে আরও জ্যোতির্ময় করে তোলে।

একজন নারীর কাছে আপন সন্তান ও স্বামী হারানোর বেদনার চেয়ে তুচ্ছ হয়ে যায় কোন পর্যায়ের ঈমান থাকলে তা বলাই বাহুল্য।

আরেক মহিলা অভিভাবকরা রাসূল (সঃ) এর কাছে এসে মৃত্যুদণ্ড গ্রহণ করতে চাইলো। (সঃ) তাঁকে বার বার ফিরিয়ে দিলেও এক পর্যায়ে তিনি এসে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে তাঁর তওবা পূরণ করলেন। তাঁর তওবা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, যে সে তওবা করেছে তা সমস্ত মদীনাবাসীর মধ্যে ভাগ করে দিলে তা যথেষ্ট হবে। এই ছিল প্রথম যুগের ঈমানের অবস্থা। ইসলামের ভবিষ্যতের মুমিনদের ঈমান অবস্থা। বর্তমান যুগে কি এমন ঈমানের কথা চিন্তা করা যায়?

হাকীম (সাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বললেন, আপনার পর আর কারো কাছে কিছু চাইবো না। সারা জীবন তিনি শত কষ্টের মধ্যেও একথার উপর দৃঢ় ছিলেন। কোন কারো কাছে দান গ্রহণ করেন নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে পাওয়া সেই তিনি কখন করেননি। হযরত আবু বকর(রাঃ) ও উমর (রাঃ) এর যুগে সম্পদের প্রাচুর্য হলে সবাই সম্পদ লাভ করলেন কিন্তু হাকীম ইবনে হিয়াম (রাঃ) তাদের দান সবসময়েই ফিরিয়ে দিয়েছেন।

রবি বিন খাইসাম একজন তাবেয়ী। তিনি সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের বন্ধু ছিলেন। বহু বছর ধরে বাড়িতে আনা যাওয়া করেছেন। দরজায় নক করলে আবু আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের দাসী এসে দরজা খুলে দিত। কোনদিন তিনি এ দাসীর দিকে চোখ তুলে তাকাননি। সর্বদা দৃষ্টি নীচু করে রাখতেন। “ তোমা হোমারদের দৃষ্টিকে অনবরণ করিন। এজন্য রবী বিন খাইসাম যখনই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের বাড়িতে আসতেন, দাসী দরজা খুলে দিয়ে ভিতরে গিয়ে বলতো, আপনার ঐ অন্ধ বন্ধুটি এসেছেন। দাসী তাঁকে অন্ধ মনে করতো। সেতো তার দৃষ্টি সবসময় অবনতই দেখেছে কোনদিন চোখ তুলে তাকাতে দেখে নি।

এই ছিল সাহাবী ও তাবেয়ীদের আমল এবং কুরআন সুন্নাহের অনুসরণ। এই ছিল প্রথম যুগের মুমিনদের ঈমানের অবস্থা। বর্তমান যুগে এসব কথা কল্পনা করা যায় কি ? মানুষের ঈমানের অবনতির সাথে সাথে সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর বাণীর সত্যতা প্রমাণ করবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00