📄 নূহের (আঃ) নৌকা সংরক্ষিত থাকবে
পবিত্র কুরআনের সূরা কামারের ১৫ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আমি নুহের আয়োজন করলাম কাষ্ঠ ও পেরেক দ্বারা নির্মিত এক জলযানে- যা চলতো আমার দৃষ্টির সামনে। এটা তার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ ছিল যাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। আমি একে এক নিদর্শন স্বরূপ রেখে দিয়েছি। অতএব কোন চিন্তাশীল আছে কি?” পথভ্রষ্ট মানুষদেরকে সাবধান করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পূর্ববর্তকালের অনেকগুলো নিদর্শন মানুষের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন। এসব নিদর্শন দেখলে মানুষের ঈমানের সংযোগ হয় এবং আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের চিন্তা জাগরুক হয়। ফেরাউনের মৃতদেহ এবং নূহ (আঃ) এর নৌকা এই নিদর্শনগুলোর অন্যতম।
হযরত নূহ (আঃ)ছিলেন আল্লাহর নবীদের একজন। তিনি প্রথম পুরুষ হযরত আদম (আঃ) এর ১০ম তম অধঃস্তন পুরুষ। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে তিনি ইরাকে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর জীবন কাল ছিল প্রায় সাড়ে নয়শত বছর। এই সুদীর্ঘ জীবন কালে তিনি বর্তমান ইরাকের দাজলা ও ফোরাত নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় আল্লাহর দ্বীন প্রচার ব্যাপৃত ছিলেন। সুদীর্ঘ কাল ধরে দিবারাত্র নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও খুব বেশি লোককে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারেন নি। মাত্র ৪০ জন লোক ছাড়া আর কেউ তাঁর দ্বীন গ্রহণ করেনি।
তারা যে শুধু তাঁর দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল তাই নয় বরং তাঁর দ্বীন প্রচারের বিরুদ্ধে সবরকমের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তারা হযরত নূহ (আঃ) এর উপর নির্যাতন করতে করতে তাকে অজ্ঞান করে ফেলত। অবশেষে হযরত নূহ (আঃ) দেখলেন যে, আমার আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আর কোন আশা নেই তখন তিনি এদেরকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দুয়া করলেন।
(নূহ) বললেন, হে আমার রব, আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবারাত্র দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু আমার দাওয়াত তাদের পলায়নকেই বৃদ্ধি করেছে। আমি যতবারই তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি - যাতে আপনি তাদের ক্ষমা করেন ততবারই তারা কানে আঙ্গুল দিয়েছে। মুখমণ্ডল ঢেকেছে, অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছে”--------- নূহ আরও বলেন, হে আমার রব, আপনি কোন কাফের গৃহবাসীকে রেহাই দেবেন না। যদি রেহাই দেন তবে তারা আপনার বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল পাপাচারী কাফের” (সূরা নূহ)।
আল্লাহ তায়ালা দুয়া কবুল করলেন এবং মহাপ্লাবন দ্বারা তাদেরকে ধ্বংস করার জন্য যে জানতেন দিলেন। তিনি তাঁর নবীকে একটি নৌকা তৈরী করার জন্য নির্দেশ দিলেন। আল্লাহর নির্দেশে এবং হযরত জিবরীল (আঃ) এর প্রত্যক্ষ তত্ত্ববধানে একটি বিশাল নৌকা তৈরী করলেন। এই নৌকাতে হযরত নূহ (আঃ) হলেন পৃথিবীর প্রথম জ্ঞানবাহনের আবিষ্কারক। তেমনি ভাবে হযরত আদম (আঃ) হলেন পৃথিবীর প্রথম উড্ডয়ন তথা গাড়ির চাকার আবিষ্কারক। কালের পরিক্রমায় হযরতের অনেক উন্নত ও উৎকর্ষ সাধন হলেও এই চাকার গুরুত্ব কমেনি বা এর বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। আজও গড়ের গাড়ি থেকে শুরু করে কোটি টাকার অত্যাধুনিক গাড়ির ভিত্তি হল আদম (আঃ) এর আবিষ্কৃত চাকা।
যাহোক, হযরত নূহ (আঃ) আবিষ্কৃত যে নৌকাটিই আমাদের আলোচ্য নিদর্শন যা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পরবর্তীদের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন বলে পবিত্র কুরআনের উল্লেখিত আয়াতে বর্ণনা করেছেন।
হযরত নূহ (আঃ) কাফেরদেরকে মহাপ্লাবনের কথা জানালেন। কাফেররা মেলেই এ কথা বিশ্বাস করল না। তারা নৌকাটিকে ঠাট্টা উপহাস করতে করতে লাগল। তারা ঠাট্টা পরিহাসে এমন পরাধীন দেখালো যে, সবাই এসে নৌকার মধ্যে বাহ্যক্রিয়া সম্পাদন করলো। কিন্তু দিনের মধ্যে বিশাল নৌকাটি মানুষের বিষ্ঠায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল।
আরব্য বেশকিছু দেখে হযরত নূহ (আঃ) প্রমাণ পেলেন। আল্লাহর নবী আগ্রহর কাছে সকরুণ প্ররথনা করলেন। এমনিতেই তাদের দ্বীনের প্রতি আগ্রহ নেই তা ওপর দ্বারা মহা সুযোগ পেয়ে গেল।
সুবহানাল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে কাফেরদের কাছে এ ভাবে অপদস্থ হতে দিতে পারেন। আল্লাহ তায়ালা মুশরিকীন। তিনি সহজেই এই মহা সমস্যার সমাধান করে দিলেন।
কাফেররা যখন নূহ (আঃ) এর নৌকা তারোহীরা সমালোচনা করতে লাগলো তখন দূর দূরান্তে এর খবর ছড়িয়ে পড়ল। একদিন এক বৃদ্ধ মহিলা লাগানোর এই আগ্রহে এই কাছে এসে অনেক অনুরোধ সাহায্য কামনা করল। লোকদের সহযোগিতায় বৃদ্ধা যখন যুবতী হয়ে গেল সে তার মেদের কাছে নিয়ে গেল। হাত ফসকে পড়ে গিয়ে বৃদ্ধা যখন নৌকা থেকে টুপ করে ডুবে গেল। তার ছেলেরা যখন তাকে তাড়াতাড়ি করে টেনে তুলল, তখন দেখা গেল এক অলৌকিক ব্যাপার। বয়োবৃদ্ধা মহিলা এক সুন্দরী তরুণী-তবতিতে পরিণত হয়ে গেছে। বিশাল দুর্গন্ধের পরিবর্তে তার দেহ স্বর্গীয় লাবন্য ও সৌন্দর্য-সুধা-সুবাসে সুরভিত পরিপূর্ণ। পরবর্তীতে সমগ্র নৌকায় রূপী হল মানুষের মনোবাসনা পূরণের এক মহাযজ্ঞ। যে কেউ যে আশায় নৌকা লাগায় সেই আশাই পূর্ণ হয়। বুন্ধা যুবতী হয়, কালোরা ফর্সা হয়, দুরাযোগ্য ব্যাধি ভালো হয়, কুষ্ঠরোগ নিরাময় হয়, অন্ধরা দৃষ্টি ফিরে পায়। চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়লো। সে এক এলাহি কাণ্ড। দূর দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে এসে এই মহাযজ্ঞে সংগ্রহ করতে লাগল। মানুষের প্রতিযোগিতা যারা প্রথমে পড়ে গিয়েছিল তারা এসে দেখল সব শেষ। তারা নৌকা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে পরিষ্কার করে সেই পানি নিয়ে গেল। এদিকে নৌকা আবার পূর্বের অবস্থা ফিরে পেল।
তারপর একদিন শুরু হল সেই প্রতিশ্রুত মহাপ্রলয়। নূহ (আঃ) ৮০ জন ঈমানদার নারীপুরুষ এবং প্রত্যেক প্রাণীর প্রত্যেক প্রাণী থেকে এক জোড়া নিয়ে নৌকায় আরোহন করলেন। ছাউনি হামাস প্রবল বন্যা, বারি বর্ষণ, জলচ্ছ্বাসে আর বড় ভূকম্পনে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেল। সারা পৃথিবী প্লাবিত হয়ে ডুবে গেল। কেবলমাত্র নৌকার আরোহীগণ ছাড়া আর কোন জীব জীবিত থাকলো না। নৌকায় আরোহী মাত্র ৮০ জন মানুষ থেকেই পরবর্তীকালে পৃথিবীর আবার মানুষের বিস্তার ঘটেছিল।
নূহ (আঃ) এর নৌকাটি তৈরি হয়েছিল একলক্ষ ১৪ হাজার তক্তা দিয়ে। প্রত্যেকটি তক্তার একজন নবীর নাম লেখা ছিল। তিনতলা বিশিষ্ট নৌকাটির দৈর্ঘ্য ছিল ১২০০ হাত, প্রস্থ ছিল ৬০০ হাত।
খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩২ সালে বর্তমান ইরাকের উড় শহর থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে মক্কা গিয়ে এই একে একে সত্তর পৃথিবী পানির নীচে তলিয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর প্লাবন শেষে নৌকাটি জুদী পাহাড়ে গিয়ে থামে। এই জুদী পাহাড় আজও হযরত নূহ (আঃ) ও তার সময়কালের মহাপ্রলয়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ পাহাড়টি ৩৮০০ ফুট উঁচু এবং আরমেণীয় আরারাত পর্বতমালার অন্তর্ভুক্ত। পাহাড়টি তুরস্ক ও আরমেণীয়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত।
এই প্লাবন ও নৌকা প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “সে নৌকা নির্মাণ করতে লাগল এবং যখনই তার সম্প্রদায়ের প্রধানেরা তার নিকট দিয়ে যেত, তাহাতে উপহাস করত; সে বলিত, তোমরা যদি আমাকে উপহাস কর তাহলে আমরাও তোমাদেরকে উপহাস করব, যেমন তোমরা উপহাস করছ;
এবং তোমরা অচিরেই জানিতে পারিবে, কাহার উপর আসিবে লাঞ্ছনোদায়ক শাস্তি আর কাহার উপর আপতিত হইবে চিরস্থায়ী শাস্তি।
অবশেষে যখন আমার আদেশ আসিল এবং উনান উথলিয়া উঠিল, আমি বলিলাম, ইহাতে উঠাইয়া লও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগল, যাহাদিগের বিরুদ্ধে পূর্ব-সিদ্ধান্ত হইয়াছে, তাহারা ব্যতীত তোমার পরিবার পরিজনকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে। তাহার সঙ্গে ঈমান আনিয়াছিল অল্প কয়েক জন।’
সে বলিল, ইহাতে আরোহণ কর, আল্লাহর নামে ইহার গতি ও স্থিতি, আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ পর্বত-প্রমাণ তরঙ্গ মধ্যে ইহা তাহাদিগকে লইয়া বহিয়া চলিল; নূহ তাহার পুত্র, যে উহাদিগের হইতে পৃথক ছিল, তাহাকে আহ্বান করিয়া বলিল, হে আমার পুত্র! আমাদিগের সঙ্গে আরোহণ কর এবং কাফিরদিগের সঙ্গী হইও না।’
সে বলিল, আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় লইব যাহা আমাকে প্লাবন হইতে রক্ষা করিবে।’ সে (নূহ) বলিল, আজ আল্লাহর বিধান হইতে রক্ষা করিবার কেহ নাই, যাহাকে আল্লাহ দয়া করিবেন, সে ব্যতীত।’ ইহার পর তরঙ্গ উহাদিগকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিল এবং সে নিমজ্জিতদিগের অন্তর্ভুক্ত হইল।
ইহার পর বলা হইল, হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গ্রাস করিয়া লও এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও।’ ইহার পর বন্যা প্রশমিত হইল এবং কার্য সমাপ্ত হইল। নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হইল এবং বলা হইল, জালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হউক। ( সূরা হুদঃ ৩৮-৪৪)।
📄 বরং আমিই তোমাকে হত্যা করব
উসাই ইবনে খালফ মক্কায় অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতঃ হে মুহাম্মদ (সাঃ) আমার একটা ঘোড়া আছে তার নাম ‘আউজ’। তাকে আমি প্রতিদিন এক ফরাক (প্রায় ৪০ কেজি) ভুট্টা খাওয়াই। এই ঘোড়ায় চড়েই আমি যুদ্ধের ময়দানে তোমাকে হত্যা করব। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিতেনঃ বরং ইনশাআল্লাহ আমিই তোমাকে হত্যা করব। (সিরাতে ইবনে হিশাম)
হযরত রাসূল মকবুল (সাঃ) জীবনে মাত্র এই একজন ব্যক্তিকে নিজে হাতে হত্যা করেছিলেন। উসাই ইবনে খালফ ছাড়া আর কোন ব্যক্তি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর হাতে নিহত হননি। জাহেলিয়াতকে উচ্ছেদ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জীবনে কমপক্ষে সাতাশটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এই জীবনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল উহুদের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়িক পরাজয় ঘটে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর শাহাদত লাভের গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
পরাজয় ঘটার খবর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের শাহাদাত লাভের গুজব ছড়িয়ে পড়বার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সর্ব প্রথম চিনতে পারেন কা’ব ইবনে মালিক। কা’ব বললেনঃ শিরস্ত্রাণের ভেতর থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চোখ দুটি জ্বলজ্বল করছিল আমি তাঁকে চিনতে পারলাম এবং সব সঙ্গে চিৎিকার করে বললাম “হে মুসলমানগণ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) বেঁচে আছেন। তিনি এখানে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ইশারা করে বললেন, তুমি চুপ থাক।”
মুসলমানগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) চেনার পর তাঁকে নিয়ে সবাই পর্বতের চোটালো পেছালেন। এই সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সঙ্গে ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক, উমর ফারুক, আলী ইবনে আবু তালিব, তলহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ও জুবাইর ইবনুল আওয়ামসহ একদল সাহাবী।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্বতের ঘাটিতে যখন নিষ্ক্রিয়েন তখন উবাই ইবনে খালফ সেখানে পৌঁছালো। সে বললো, “হে মুহাম্মদ, এ যাবৎ তুমি প্রাণে বেঁচে গেলেও তোমার নিস্তার নেই।” সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ এ লোকটিকে মহানুভতি দেখানোর কি আমাদের জন্য ঠিক হবে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, ওকে আসতে দাও। যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এঙ্গে বলে তিনি হারবাস বর্মটি হাতে নিলেন। (কোন কোন বর্ণনায় আছে) হাত থেকে ছোঁড়া যায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন ভয়ঙ্কর পিয়ন করলেন যে, টি প্রবল গর্তে নয়ে উঠল তার পিঠের উপর বলা হয়। বিমাতার ফলে যেমন দ্রুত উড়ে যায়, আমার ঠিক তেমনি ভীত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে থেকে হারছস হওয়ার দূরে সরে পড়লাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তার ঘাড়ের উপর বর্শা আঘাত হানলেন। আঘাত খেয়ে উবাই ইবনে খালফ তার ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়লো এবং কয়েকটা গুতাড়ি খেলো।
ইতিপূর্বে উসাই ইবনে খালফ মক্কায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাথে দেখা করে বলতোঃ হে মুহাম্মদ, আমার একটা ঘোড়া আছে। তার নাম ‘আউজ’ তাকে আমি প্রতিদিন এক ফরাক (প্রায় ৪০ কেজি) ভুট্টা খাওয়াই। এই ঘোড়ায় চড়েই আমি তোমাকে হত্যা করব। জবাব দিতেন, বরং আল্লাহ চাহেতো আমিই তোমাকে হত্যা করব।
উবাইয়ের কাঁধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে জখমটি করে দিয়েছিলেন সেটা তেমন গুরুতর জখম না হলেও তা দিয়ে রক্ত ঝরছিল এবং ঐ অবস্থাতেই সে কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বলতে থাকলঃ মক্কায় থাকা কালেই মুহাম্মদ আমাকে বলেছিল, তোমাকে আমি হত্যা করব। এখন আমার আশংকা হয়, সে যদি আমার প্রতি থু থু নিক্ষেপ করে তা হলেও আমি মরে যাব।
কুরাইশরা তাকে নিয়ে মক্কায় অভিমুখে রওয়ানা হল। পথিমধ্যে সারাক নামক স্থানে উবাইয়ের এই দুশমনের জীবন-লীলা সাঙ্গ হলো।
উবাই ইবনে খালফ ছিল মক্কার শীর্ষস্থানীয় ধনাঢ্য কুরাইশ নেতা। ইসলাম ও ইসলামের নামে বিরোধিতা সম্পর্কে অনন্ত নিজের জীবনকেও সে ইসলামের বিরোধিতায় নিয়ে সূরা রুম রাজি ছিল উবাই এ কথা বিশ্বাস করত না। সে এই মর্মে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর সাথে বাজি ধরে যে, যদি রোম বিজয়ী হয় তাহলে সে প্রসংশিত উট প্রদান করবে। এই ঘটনার কয়েক বছর পর ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে রোম পারস্য সাম্রাজ্যকে বিপুলভাবে পরাজিত করে। বাংলায় যাতায়াতে উবাই ইবনে খালফ হযরত আবু বকর (রাঃ) কে একশত উট প্রদান করে তা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নির্দেশে সবগুলো উট মানুষের মধ্যে বিতরণ করে দেন।
এখানে প্রধানবিষয় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর যুগ ইসলামের कट्टर দুশমনদের মধ্যে যে প্রবল ব্যক্তিত্ব, আত্মম্ভরিতাবোধ ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় উন্নত মানসিকতা ছিল আজকের যুগের ইসলাম বিরোধীর কাছে তা মোটেও আশা করা যায় না।
📄 বনী ছকিফ গোত্রে একজন মিথ্যাবাদী ও একজন নরঘাতকের জন্ম হবে
ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ছকিফ গোত্রে একজন মিথ্যাবাদী ও এক নরঘাতকের জন্ম হবে”।
আবু ঈসা বলেন, এ অনুচ্ছেদে আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। হাজ্জাজ যে সব লোক খেলাফতের কোন হত্যা করে তাদের সংখ্যা ছিল এক লাখ বিশ হাজার (তিরমিযী)
হাজ্জাজ যখন মক্কা আক্রমণ করে তখন মক্কার গভর্ণর ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রাঃ)। হাজ্জাজ তাকে শহীদ করে তাঁর ছেলে বলতেন বলেন, আম্মাজান আব্দুল্লাহ (রাঃ) মা হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) পুত্র শাহাদাতের তৃতীয় দিনে এক দারীকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। ঘটনাক্রমে হাজ্জাজ সে সময় সেখানে খোরাক করছিল। হযরত আসমা (রাঃ) হাজ্জাজকে বললেন, এই সওয়ারীর নামায সময় কি এখনও হয়নি? হাজ্জাজ জবাব দিলঃ সে মূলহিদ ছিল। এই শান্তি তার প্রাপ্য ছিল। হাজ্জাজ তাঁকে আরো বললঃ গর্ভে উত্তোলন করে তাঁর বলতেন, খোদার কসম, সে খোদাদ্রোহী বা মুশরিক ছিল না; বরং নামাযী রোজাদার এবং মোস্তাকী ছিল।
হাজ্জাজ ঝাঁজালো কন্ঠে বললঃ এই বুড়ি, তুমি এখন থেকে চলে যাও। তোমার জ্ঞান লোপ পেয়েছে। হযরত আসমা (রাঃ) অত্যন্ত নির্ভীকতার সাথে জবাব দিলেন, আমার জ্ঞান লোপ পায়নি। কে বলতে শুনেছি যে, বনু সাকীফ গোত্রের লোকেরাই অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও সম্পন্নশালী।
মিথ্যাবাদী আল মুখতার પ્રથમ থেকে ইবনে হোসাইন (রাঃ) এর পক্ষে ছিল; কিন্তু পরে মুয়াবিয়ার পক্ষ অবলম্বন করে। পরবর্তীতে কারবালার যুদ্ধে সে পুনরায় হোসাইন (রাঃ) এর দলে যোগ দেয়। এজন উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ কর্তৃক কারারুদ্ধ হয়। কিয়ামত শুরু হয় পর দিন থেকে মক্কায় এসে মক্কার শাসক আব্দুল্লাহ বিন জুবাইরের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত করে; কিন্তু তিনি তাকে বিশ্বাস করেন নাই।
মক্কা থেকে পুনরায় ফিরে গিয়ে আল মুখতার নিজেকে হোসাইন হওয়ার প্রতিশোধ গ্রহণকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে হযরত আলী (রাঃ) এর অনুসারী কুফাবাসীদেরকে সংগঠিত করে এবং এইভাবে নিজেকে কুফায় প্রতিষ্ঠিত করে। ৬৪৮ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকে পরাজিত ও হত্যা করে কুফার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিপত্তি অর্পণ করে। এর তার শাসনের মূলে হাফিয়া ছিল মিথ্যা, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা।
উবাইদুল্লাহকে পরাজিত করার পর আল মুখতার আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরের আনুগত্য অস্বীকার করে। একদিন পর্যন্ত সে আনুগত্যের ভান করে ছিল। সুতরাং ইবনে জুবাইর তাঁর ভাই মুসয়াবকে তার বিরুদ্ধে একদল সৈন্য পাঠান। মুসয়াব ছিলেন বসরার শাসনকর্তা। মুসয়াব তাঁর সেনাপতি মুহাল্লবের সাহায্যে তাকে কুফার নিকট শোচনীয় ভাবে পরাজিত করেন। মে পর্যন্ত আল মুখতার ৬৮৬ ঈসঃ অনুসারে হত্যা করা হয়।
উমাইয়া শাসনে ইতিহাসে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম যুগে হাজ্জাজ তায়েফের এক মক্তবের শিক্ষক ছিল। আরবী ভাষা ও সাহিত্যে সে ছিল একজন সুপণ্ডিত। তার যোগ্যতা, কর্মকুশলতা ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক হাজ্জাজকে হিজাজের (মক্কা) গভর্নর পদে নিয়োগ দেন। ৬৬২ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইরের বিরুদ্ধে প্রেরক করে। ইবনে জুবাইরকে পরাজিত ও হত্যা করার পর ৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে হিজাজের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়। প্রায় কুড়ি বছর ধরে হাজ্জাজ এই পদে অধিষ্ঠিত থাকেন।
হাজ্জাজ একজন পণ্ডিত ও সুবক্তাও ছিল। আরবী লিপিতে হারকাতের ও নোকতার ব্যবহার প্রবর্তন করে আরবী বর্ণমালা পূর্ণতা সাধন তার বিশেষ কৃতিত্ব। উমাইয়া সাম্রাজ্যের সীমা বিস্তারে তার বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে। তারই নেতৃত্বে মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারতবর্ষে সিন্ধু ও মুলতান জয় করেন।
ঐতিহাসিক পি,কে হিট্টি মতে, হাজ্জাজ ছিল একজন রক্ত পিপাসু ও স্বেচ্ছাচারী শাসক এবং একজন বীর নেতা ‘নিগ্রো’। স্যার উইলিয়াম মর তাকে দুনিয়ার অন্যতম নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী স্বৈর শাসক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ঐতিহাসিক আমির আলী তাকে হিংস্র প্রকৃতির লোক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (হোসাইন, কে. আলী)
এই জন্যই রাসূল করীম (সঃ) এর পবিত্র জবান থেকে ছাকীফ গোত্রের এই দুই কুলঙ্গার ব্যক্তি সম্পর্কে তাদের জন্মের পূর্বে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরে এই ভবিষ্যদ্বাণী কার্যকর হয়েছিল।
📄 উসামা হত্যা
হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উসামা (রাঃ) কে বলেছিলেন আফসোস! একমাত্র বিদ্রোহী তোমাকে হত্যা করবে।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর এই ভবিষ্যদ্বাণীটি মুতওয়াতের হাদীস দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। মুতাওয়াতির হাদীস হল ঐ বহু সংখ্যক সাহাবী থেকে যুগে যুগে বহু বহু রাবী নির্ভুল সনদে বর্ণনা করেছেন। এগুলো সন্দেহমুক্ত হাদীস।
হযরত উসামা বিন জায়েদ (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পালক পুত্র হযরত জায়েদ বিন হারিসা (রাঃ) এর পুত্র। ইসলামের পরিভাষে এঁরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মেহমানে দ্বীন বলা হয়েছিলেন।
মদিনায় হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মসজিদে নববী নির্মাণের কাজ শুরু করলেন। অত্যন্ত আনন্দ ও উদ্দীপনা নিয়ে সাহাবীগণ মসজিদ নির্মাণের জন্য ভারি ভারি ইট বহন করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁদের সাথে অংশ নিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, সবাই একটি করে ইট বহন করছে আর উসামা (রাঃ) একসাথে দুটি করে ইট বহন করছে। উসামা ছিলেন শক্তিশালী টনটনে যুবক। তিনি উসামাকে লক্ষ্য করে বললেন, আফসোস! একদল বিদ্রোহী তোমাকে হত্যা করবে।
সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর এই কথা শুনে ভয়ে আঁতকে উঠলেন। তারা অপেক্ষায় ছিলেন কখন এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়। তাঁরা জানতেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কোন কথা झूठा হয় না। এর প্রায় চল্লিশ বছর পর সিফফিনের যুদ্ধে আলী (রাঃ) নিহত হন। হযরত মুয়াবিয়া ও হযরত আলী (রাঃ) এর মধ্যে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় তা সীমালঙ্ঘনকারী। তখন অন্যান্য দল রাসূলুল্লাহ ও হযরত আম্বিয়াসহ রাদিয়াল্লাহু আলাইহি আনহুম। এদের মধ্যে ছিলেন হযরত তালহা ও হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আলাইহি আনহুমা।
সিফফিনের যুদ্ধে হযরত মুয়াবিয়ার লোকদের হাতে উসামা (রাঃ) নিহত হলে সবার কাছে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে, হযরত আলী (রাঃ) এর বিদ্রোহী পক্ষই ছিল সীমালঙ্ঘনকারী। তখন অন্যান্য দল মুয়াবিয়া (রাঃ) এর বিদ্রোহী বা সীমালঙ্ঘনকারী পক্ষই ছিল। কারণ পথে হযরত যুবাইর (রাঃ) বিদ্রোহীদের হাতে শহীদ হন। হযরত আম্বর ইবনুল আস (রাঃ) মুয়াবিয়ার পক্ষ ত্যাগ করলেন না বটে; কিন্তু তিনি উসামাকে (রাঃ) হত্যার জন্য মুয়াবিয়া (রাঃ) কে দায়ী করেন এবং এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ভবিষ্যদ্বাণী তাকে স্মরণ করিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (রাঃ) এ কথা অস্বীকার করেন নাই যেহেতু তিনিও এই হাদীস জানতেন। তিনি তার কারণ বা দায় দায়িত্ব হযরত আলী (রাঃ) এর দলের উপর চাপাতে চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, আমরা নই যারা তাঁকে আমাদের বর্শার সামনে এগিয়ে দিয়েছি তারাই তাঁকে হত্যা করেছে। অর্থাৎ তারাই এই হত্যার জন্য দায়ী।