📘 Mojeja > 📄 কুরাইশদের হাতে শাসন ক্ষমতা থাকবে

📄 কুরাইশদের হাতে শাসন ক্ষমতা থাকবে


আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীস। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “আলমদ সব অবস্থায় কুরাইশগণ কিয়ামত পর্যন্ত জনগণের নেতৃত্বের দায়িত্বে দিবে।”(তিরমিযী)

অপর এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন যে, যতদিন কুরাইশগণ তাদের চরিত্র উন্নত রাখবে এবং সাম্রাজ্যিকভাবে দ্বীনের কাজ বরণ করতে থাকবে আর তাদের মধ্যে যদি দু’জন লোকও সত্যের জন্য সংগ্রামী পাওয়া যায়, তাহলে শাসন ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকবে।

নবী (সঃ) এর একথা একটা সত্য ছিল যে, তার পরে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত ইতিহাসে তার সত্যতার প্রমাণ পেশ করতে থাকে। খেলাফতে রাশেদার যুগে চারজন খলিফা, এ গোত্রেই সর্বরাহ করে। তাদের বিজয়ের কোন নেতৃত্ব সারা বিশ্বে তখন ছিল না। অতঃপর এ গোত্রই প্রসিদ্ধ উমাইয়া শাসন কায়েম করে। এ গোত্রই আব্বাসীয় শাসনের পতন করে। স্পেনে বিরাট মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা এবং মিশরে ফাতেমীয় শাসন প্রতিষ্ঠা এ গোত্রেরই অবদান।

📘 Mojeja > 📄 উয়াইস করনী আসবে

📄 উয়াইস করনী আসবে


উমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ ইয়ামেনের সাহায্যকারী দলের সাথে উয়াইস ইবনে আমের নামক এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আসবে। সে মুদার গোত্রের উপগোত্র ‘করণ’ বংশের লোক। তার কুষ্ঠরোগ হবে এবং তা সে শুকিয়ে যাবে, তার এক দিরহাম পরিমাণ জ্ঞাতীও। তার মা জীবিত আছে এবং সে তার খুবই অনুগত। সে যদি (আল্লাহর উপর ভরসা করে) কোন কিছুর শপথ করে আল্লাহ তা পূরণ করে দেন। যদি তুমি তাকে দিয়ে তোমার অপরাধ ক্ষমার জন্য দুয়া করার সুযোগ পাও তবে তাই করবে। (মুসলিম)

সাহেয়তত ভাবিত হযরত উয়াইস ইবনে আমের সম্পর্কে মুসলিম শরীফে আরও কিছু হাদিসের বর্ণনা রয়েছে। হযরত উমর (রাঃ) এবং উসাইর ইবনে আমর (রাঃ) থেকে যেগুলো বর্ণিত হয়েছে। যার সার সংক্ষেপ হলোঃ

ইয়ামেন থেকে উয়াইস নামে এক উত্তম লোক মদীনায় আসবে। সে অত্যন্ত বুজুর্গ লোক। তার কুষ্ঠ রোগ হবে। আল্লাহর কাছে রোজগীরের দোয়া করলে আল্লাহ তার রোজগীতি দান করবেন। তবে এক দিরহাম পরিমাণ স্থানে তার চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে। তাঁর সুপারিশে রবী গোত্র ও মুদার গোত্রের সব সংখ্যক লোক জান্নাতে যাবে।

হযরত উমর (রাঃ) তাই রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর যুগ পেরোতে পারতেন। তাঁর বিচার অত্যন্ত অদ্ভুত হেলেনা। বন্ধুরা মায়ার সেবায়েতের কারণে তাকে একাকী ফেলে এসে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে সাক্ষাত করার তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এজন্য তাকে সাহাবীদের মধ্যে গণ্য না করে তাবেঈনদের মধ্যে গণ্য করা হয়।

হযরত উমরের শাসন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর বহুশ প্রশংসার পর হযরত উমর (রাঃ) তাঁর আপনার প্রতীক্ষায় থাকতেন। ইয়ামেন থেকে যখন কোন সাহায্যকারী সেনাদল আসত তখন তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “তোমাদের মধ্যে উয়াইস আমের নামে কেউ আছে কি?” সাধারণত তার সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারতো না। কারণ ইয়ামেন তিনি কোন সুপরিচিত ব্যক্তিও ছিলেন না।

একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি লক্ষ্য রেখে হযরত উমর (রাঃ) ইয়ামেন থেকে আগত প্রতিনিধি দলগুলোকে উয়াইস করণীয় অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন। পরবর্তী কেউ উয়াইস করণীকে সনাক্ত করতে পারলে ও তার সম্পর্কে মুসলিম জাহানের খলিফা হযরত উমর (রাঃ) এর আগ্রহ দেখে তা খুবই বিস্মিত হয়। তোরা। উয়াইসকে আমরা অতি সাধারণ লোক হিসেবেই জানি, তাঁকে তো কোন গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না।

অবশেষে একদিন কোন এক প্রতিনিধি দলের সাথে হযরত উয়াইস করণী এসে গেলেন। হযরত উমর (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাত হলো হুল তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মুদার গোত্রের উপগোত্র ‘করণ’ লোক? তিনি বলেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, আপনার কি কুষ্ঠরোগ হয়েছিল তা-ই তো সুস্থ হয়েছেন এবং মাত্র এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা অবশিষ্ট আছে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। উমর (রাঃ) বলেন, আপনার কি বেঁচে আছেন? উয়াইস উত্তর দিলেন, হ্যাঁ।

অতঃপর হযরত উমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ ইয়ামেনের সাহায্যকারী দলের সাথে উয়াইস ইবনে আমের এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আসবে। সে পরবর্তীকালে (তাবিন্দর) মধ্যে একজন উত্তম লোক হবে। সে কোন কিছুর শপথ করলে আল্লাহ তা পূরণ করে দেন। যদি তুমি তাকে দিয়ে তোমার গুণাহ ক্ষমার জন্য দোয়া করার সুযোগ পাও তবে তাই করবে। উমর (রাঃ) বলেন, কাজেই আপনি আমার ক্ষমার জন্য দোয়া করুন। অতএব আপনি উমরের (রাঃ) জন্য ক্ষমা চেয়ে দোয়া করলেন।

উমর (রাঃ) তাঁকে বললেন, আপনি কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা রাখেন? তিনি বললেন, ‘কুফা’। উমর (রাঃ) বললেন, সেখানকার গভর্ণরকে আপনার সাহায্যর জন্য লিখে দেই? তিনি বলেন, গরীব মিসকিনদের মধ্যে বাস করাই আমার কাছে অধিক প্রিয়।

পরবর্তী বছর কুফার এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হজ্জে এলেন এবং হযরত উমর (রাঃ) উয়াইস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, তাঁকে আমি এমন অবস্থায় রেখে এসেছি যে, তার ঘরটা অত্যন্ত ভাঙা রয়েছে এবং তার জীবনধারণ খুবই নগণ্য। হযরত উমর (রাঃ) তাকে উয়াইস সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর হাদীস বর্ণনা করলেন। লোকটি কুফায় ফিরে এসে উয়াইস করণীর সাথে সাক্ষাত করে বলল, আপনি আমার গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করুন। তিনি বললেন, আপনি এইমাত্র কল্যাণময় সফর (হজ্জ) থেকে ফিরে এসেছেন, বরং আপনিই আমার জন্য দোয়া করুন। অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি হযরত উমর (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করেছেন? লোকটি বললো, হ্যাঁ। তখন হযরত উয়াইস তার জন্য দোয়া করলেন।

লোকদের মধ্যে উয়াইস করণীর সম্পর্কে জানাজানি হয়ে যায়। সবাই তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হলে তিনি সেখান থেকে অন্যত্র চলে যান।

উয়াইস করণীর মাতৃভক্তি ও বুজুর্গী সম্পর্কে লোকমুখে নানা কথা প্রচলিত আছে। কিন্তু অনেকেরই জানা নেই যে, তিনি জিদ্দার ময়দানে আল্লাহর রাহে জীবন দিয়ে শহীদ হয়ে যান।

📘 Mojeja > 📄 মুসলমানগণ ইহুদী মুশরিকদের অনুসরণ করবে

📄 মুসলমানগণ ইহুদী মুশরিকদের অনুসরণ করবে


রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ। তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতি-নীতি অবলম্বন করবে।” (তিরমিযী)

অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, মুসলমানগণ ইহুদী খৃস্টানদের এমনভাবে অনুসরণ করবে যে, তারা যদি গুইসাপের গর্তে প্রবেশ করলে তোমরাও তাই করবে। এমনকি তারা নিজ মায়ের সাথে জিনা করে জিঁনা করে মুসলমানরাও কেউ কেউ তাই করবে।

মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর উপরোক্ত ভবিষ্যদ্বাণী আজ অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সাধারণভাবে বিশ্বের মুসলমানরা অবস্থাই এই যে, তারা ইসলামের বিধি-বিধানে বাদ দিয়ে ইহুদী খৃস্টানদের রীতি-নীতি অনুসরণ করাকে সম্মান ও গৌরবের মনে করে। ইহুদী-খৃস্টানদের সংস্কৃতি, চালচলন, সামাজিক রীতি-নীতি, রাজনৈতিক মতবাদ, আইন ও বিচার ব্যবস্থা, অর্থ ব্যবস্থা, ব্যবসায়-বাণিজ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ এমনকি হেয়ার স্টাইলও (মেয়েদের চুল ছোট রাখা, ছেলেদের বড় রাখা, দাড়ি মুণ্ডন করা ইত্যাদি) আজকের মুসলমানরা অনুসরণ করছে। অথচ ইসলাম হলো পরিপূর্ণ জীবন (Complete code of life). আল্লাহর রীতি-নীতি অনুসরণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয়, আল্লাহর রীতি-নীতির বিরুদ্ধাচরণ করাই হল রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আদর্শ।

ইসলামকে পরিপূর্ণ ইসলাম বিধি বিধানের অনুসারে অন্য কারোর থেকে কোন শ্রেণীর মুসলমানরা সেকেলে ধ্যান-ধারণা ও সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় বলে বিশ্বাস করে। কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে ইসলামকে বিভিন্ন বিধান পরিত্যাগ করাতে আধুনিকতা ও যুক্তির চাহিদা চচা মনে করে। অথচ ইসলাম হল পরিপূর্ণ ও সর্বাধুনিক ধর্ম ও জীবন বিধান। ইসলাম ছাড়া আর সব ধর্ম ও মতবাদ বাতিল ও যুক্তি ভেদে। আল কুরআন হল ঐশী গ্রন্থ সমূহের মধ্যে সর্বশেষ সংস্করণ। কুরআন ছাড়া বাইবেল, তওরাত বা অন্য কোন ধর্মগ্রন্থ এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের আদর্শ অনুসরণ করা মুসলমানদের জন্য বৈধ নয়, সম্পূর্ণ হারাম।

ইসলামই একমাত্র পরিপূর্ণ জীবন বিধান। ইসলাম ছাড়া আর কোন পরিপূর্ণ জীবন বিধান বা মতবাদ আছে বলে কেউ দাবি করে না-যাতে মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধানের দিকনির্দেশনা রয়েছে। যেমন- কমিউনিজমের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিধান (যদি ও তা ব্যর্থ) থাকলেও পারিবারিক সামাজিক, নৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ইত্যাদি বিষয়গুলোর কোন দিক নির্দেশনা নেই। আবার হিন্দু ও খৃস্টান ধর্মীয় বিধানের মধ্যে নৈতিক ও ধর্মীয় কিছু বিষয় থাকলেও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আন্তর্জাতিক বিষয়ের কোন দিক নির্দেশনা নেই। এসব বিষয়ের জন্য অন্যানো মতবাদের দ্বারস্থ হতে হয়।

সুতরাং ইসলামের কাছে ব্যতীত, কল্যাণকর এবং প্রভাবশালী সংস্কৃতিও নেই। হিন্দু ধর্মের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় কথাই যাক। প্রতি বছর শারদীয় পূজা উপলক্ষে হিন্দু সমাজ বহু উৎসব করতে দেখা যায়। প্রত্যেক মনেরা মিষ্টি, উপহার দুর্গোৎসব পূর্ণিমা তৈরি করে হয়। উপাসকদের দিকে পূর্যোৎসবের পূজা-অর্চনা করা হয়। আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে বেশ কটা দিন কাটানো হয়। অনেকে বিজয় দশমীর দিন মহাসমারোহে প্রতিমা বিসর্জনের নাম দিয়ে এই উৎসবের সমাপন হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীর প্রতি বিনিত শ্রদ্ধা রেখেই জিজ্ঞাসা করি, এতে কার কি লাভ হয়? এতে দুঃখী মানুষের কী কল্যাণ হয়?

অপরদিকে ইসলামের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার কথাই চিন্তা করুন। যাকাত-ফিতরার মাধ্যমে গরীবদের প্রতি বিনয়ের ধর্ম সাহায্য সাহায্যমূল্য করার কারণে প্রতি বছর অনেক গরীব অনাহারে সর্ব সাহায্য মানুষের জীবন আনন্দে ভরা ওঠে। যে সকল দুস্থ-গরীবের ভাগ্যে কখনো এক টুকরো গোশত কিনে খাবার সুযোগ হয় না তারাও ঈদে আনন্দে পৌঁছাতে সুযোগ পায়। এমন একজন মুসলমানও পাওয়া যাবে না যে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার এমন বিধান, এমন সংস্কৃতি আর কি কোথাও আছে? একেই বলে আল্লাহর বিধান। এর চেয়ে উত্তম বিধান আর হতে পারে না।

ইসলামের প্রত্যেকটি ইবাদত তথা নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি মঝে রয়েছে অফুরন্ত উপকার। এগুলো অন্যান্য ধর্মের মত অনুষ্ঠান সর্বস্ব ইবাদত নয়। এ সব ইবাদতের মধ্যে মানবতার জন্য এত কল্যাণকর বিষয় রয়েছে যা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। উদাহরণ স্বরূপ নামাযের কথাই ধরা যাক। ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ইবাদতের (স্তম্ভের) অন্যতম। নামাযের উপকার ও কল্যাণের কথা বর্ণনা করতে গেলে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করতে হয় তবু অতি সংক্ষেপে নামাযের কয়েকটি উপকারের কথা উল্লেখ করা হলঃ

১. বিশ্বস্ততাঃ নামায শান্তি ও মনকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এটি সর্বোত্তম যোগ ব্যায়াম। দাঁড়িয়ে, রুকু করা, সেজদা করার অতি উন্নতমানের রক্ত সঞ্চালন হয়।

২. পরিচ্ছন্নতাঃ নামাযের পূর্বে অজু করার মাধ্যমে শরীরকে পূত (ফরজ)। দিনে পাঁচবার অজুয মাধ্যমে শরীরের ময়লা দূর হয় ও রোগ জীবাণু থেকে মুক্ত থাকা যায়। যারা নিয়মিত নামায পড়ে তাদের রোগ বালাই তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

৩. মেডিটেশনঃ দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে সমাজে সর্বোত্তম মেডিটেশন চর্চা হয়। নামাযের মধ্যে দুনিয়ার সকল চিন্তা ভাবনা, কাজকর্ম থেকে মুক্ত হয়ে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর দিকে মনোযোগ দেয়া বাধ্যতামূলক। এজন্য নামাযের চেয়ে উত্তম মেডিটেশন আর হয়না। নিয়মিত নামায পড়লে নামাযের যোগ ব্যায়াম, মেডিটেশন, পবিত্রতা, আধ্যাত্মিকতার উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্ট এটাকের মত অনেক কঠিন রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়।

৪. পবিত্রতাঃ নামায মনকে পবিত্র ও রুচিশীল করে। নামাযের জ্ঞান, শরীর ও পোশাক পবিত্র হওয়া নামাযের পূর্বশর্ত। এছাড়া রুচিশীল পোশাক পরিধান, সুগন্ধি ব্যবহার করা নামাযের জন্য উত্তম কাজ।

৫. সময়জ্ঞানঃ নামায সর্বোচ্চ সময়জ্ঞান শিক্ষা দেয়। লক্ষ লক্ষ লোক কোন আধুনিক পারগ্রামনা ছাড়াই অত্যন্ত সুন্দর ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে এক সাথে নামায আদায় করতে পারে। নামাযের মধ্যে সমস্ত কাজ ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করতে হয়। একজন ইমামের নেতৃত্বের অনুসরনের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ লোক এক সাথে রুকু, সেজদা, কিয়াম করে সুচারুরূপে। কোন বিশৃঙ্খলার লেশমাত্র থাকে না। নামাযের মধ্যে নেতার অনুসরণের এই শিক্ষা জীবন জীবনের প্রয়োগ করলে সমাজ থেকে সমস্ত বিশৃঙ্খলতা দূর হয়ে যাবে। নামায হল একটি সুশৃঙ্খল সমাজের মডেল।

৬. সময়ানুবর্তিতাঃ প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা ফরজ (অবশ্য কর্তব্য)। সূর্য ওঠা এবং অস্ত যাওয়ার সময়ের মধ্যে নামাযের সময় থাকে না। একইভাবে সূর্য অস্ত্র যাওয়ার এক মিনিট পূর্বেও মাগরিবের নামায পড়া যায় না। নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিদিন পাঁচবার নামাযের জামাতে হাজির হয়ে যে সময়ানুবর্তিতার অভ্যাস গড়ে ওঠে তা অন্যভাবে সম্ভব নয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল আজ মুসলমানেরাই সময়ের ব্যাপারে সবচে উদাসীন কারণ এরা নামাযের ব্যাপারে উদাসীন।

৭. সাম্যবাদঃ নামায থেকে সাম্যবাদের প্রকৃত শিক্ষা পাওয়া যায়। ধনী - গরীব, বাদশাহ- ফকির সবাই এক জামাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মসজিদে নামায আদায় করে। কোন হিল্লা-ফিসার, ভেদাভেদ থাকে না। সেখানে কেউ ছোট কেউ বড় নয়। সবার জন্য সমান অধিকার।

৮. আনুগত্যঃ নামায নেতার প্রতি সঠিক আনুগত্যের শিক্ষা দেয়। একটি সমাজ, রাষ্ট্র, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান সুস্থভাবে চালাতে হলে নেতা এবং নেতার প্রতি আনুগত্য অপরিহার্য। নামাযে ইমামের প্রতি যে ভাবে আনুগত্য করা হয় তা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় নেতৃত্বের প্রতি কোন অবস্থায় কতখানি আনুগত্য করতে হবে। কোন অবস্থায় আনুগত্য করা যাবে নাঃ “নিশ্চয়ই অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখো”। নামাযে প্রতিষ্ঠিত থাকলে অন্যায়, অশ্লীলতা থেকে নামাযে মানুষকে কিভাবে বিরত রাখে তা পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কারণ বিষয়টি একই সাথে জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক (Spiritual)।

এ ছাড়াও নামাযের বহুবিধ উপকার সম্পর্কে লিখতে হলে একটি স্বতন্ত্র বই লিখতে যে হয় তা বলা যাবে না। নামাযের মত রোজা, হজ্জ, যাকাতের মধ্যেও রয়েছে বহুবিধ উপকার ও শিক্ষা।

অনর্থক, অকল্যাণকর কোন ইবাদত ইসলামে নেই। ইসলামে এমন কোন ইবাদত নেই যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। অথচ খৃস্টান ধর্মের প্রচলিত প্রথায় এমন মজবুত ও অমানবিক প্রথা ছিল যা মানুষ জন্মগত পাপী হিসাবেই পালন করা হতো। সৌভাগ্য যে, এই প্রথার বিলুপ্তি হচ্ছে। অথচ ইসলাম এমন কোন বিষয়ের বিধান দেয় না। ইসলামের কোন বিধানের কোন প্রয়োজন সংশোধন, পরিবর্তন বা পরিমার্জনা নেই। ইসলামের কোন বিধানের প্রয়োজনও নেই। শুধু ইসলাম ছাড়া আর অন্য কারো এত অনুপম ও শ্রেষ্ঠ হওয়া সম্ভব নয়। এর অনুসরণ করে মুসলিমরা মধে এমন কী অনাস্থা? এমন অনেক মুসলমান আছে যারা ইসলামের বিধি-বিধান অনুসরণ তো দূরের কথা নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিতেও আগ্রহ বোধ করে না।

এখনকার খরিয়াতি ও আত্মবিশ্বাসের উদাহরণ কেবল মুসলিম জাতির মধ্যেই দেখা যায়। আর কোন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে সাধারণত এমনটা হয় না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজ নিজ ধর্মাবলম্বীর কথা না। মুসলিম নাসরিন, আহমদ শরীফ, দাউদ হায়দার, হুমায়ূন আজাদরা অন্যান্য ধর্মে জন্ম নেয় না। এদের জন্ম হয় শুধু মুসলিমদের মধ্যে।

একদিন ব্রিটেনে দুর্গাপূজা উপলক্ষে এক বিশেষ অনুষ্ঠান হতে দেখলাম। অনুষ্ঠানে নিজেস্ব রাষ্ট্রদূতেরা রায় এবং রায় এবং বনমহত্ত্ব বনমহত্ত্ব অংশগ্রহণ করেন। অথচ অনেক মুসলিম শিখদের মধ্যে এই হীনমান্যতা কাজ করে। তাদেরকে কোন ইসলামী অনুষ্ঠানে বা পূর্বে অংশগ্রহণ করতে কখনোই দেখা যায় না। অনেক প্রখ্যাত খ্রিষ্টান আইনজীবি আছেন যারা কোন ইসলামী পণ কেন না। এমন কি ইসলামি নজরুল সংগীতের মত অনুষ্ঠানে সঙ্গীতও দেন না। এর একমাত্র কারণ হল নিজ ধর্ম ইসলামের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব।

বাংলাদেশ ইসলামি সেন্টার একবার একটি ‘ইসলামী কবিতা’ আবৃত্তির ভিডিও ক্যাসেট বের করে। শফি কামাল, কাজী আরিফের মত প্রখ্যাত আবৃত্তিকার এতে কবিতা আবৃত্তি করেছেন। অন্যকোন একজন প্রখ্যাত আবৃত্তি ও অভিনেতার নিকট ক্যাসেটটিতে কণ্ঠ দেওয়ার জন্য অনুনয় করা হয়েছিলেন। তিনি রাজি হন নি। একমাত্র কারণ ইসলামী কবিতা। এ বিষয়ে যে অন্য অন্য ধর্মযাজক কবিতা হয় তাতে কণ্ঠ দিতে এদের আপত্তি থাকে না।

অন্যদের প্রতি মুসলমানদের কেন এই মনোভাব? কেন এই হীনমান্যতা? অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে কোন এক ধরনের মগ্ন প্রজ্ঞা নিচিয়া মনে হয়। তারা একটি এহতিও ও আধুনিকতার মধ্যে বাস করে, মনে প্রাণে নির্লজ্জ্য মনে হয়। একটি রাষ্ট্র ও আধুনিকতার সঙ্গে মুসলিমদের কোন কোন বিশ্বাস নেই, কুসংস্কার নেই। কোন কোন অভাব, অকল্যাণকর বিধিবিধান। ইসলাম সর্বাধুনিক ও সর্বশেষ ধর্ম। আল কুরআন ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বশেষ সংস্করণ।

মধ্যযুগ ছিল মুসলমানদের স্বর্ণযুগ। আর একারণেই এরা মধ্যযুগীয় চিন্তাধারা, মধ্যযুগীয় বর্বরতা, মোলাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি সজ্ঞান আবিষ্কার করে তৃপ্তি পায়। আর তার পিছু পিছু সৃষ্টি-কলচার ও সংস্কৃতির অনুসরণে।

অধরা অতি হল মুসলমানরা আগ্রহ আল্লাহর রাসূলুল্লাহ আল্লাহঃ “তবে কি তোমরা ইসলাম ছাড়া আর কোন মতবাদের অনুসরণ করতে চাও? অথচ আসমান-জমীনে যা কিছু আছে-ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক সব কিছুই ইসলামের অনুসরণ করতে বাধ্য”। (সূরা ইমরান, আয়াতঃ ৮৩) এ জন্যই বোধ করি যারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী রীতি-নীতি অনুযায়ী অনুসরণ না করলেও এদের মৃত্যু পরবর্তী সকল কার্যক্রম ইসলামের সংস্কৃতি অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হয়। যেমন জানাযা, কাফন, দাফন, কুলখানিসহ সকল আচার অনুষ্ঠান ইসলামের সংস্কৃতিই অনুষ্ঠিত হয়। কারণ শেষ শয্যায় রাখার সময় এদের উপর কোন ভেরী “আপনার আপনি মিলান্তি মিলান্তি রাসূলিল্লাহি” অর্থাৎ আল্লাহ নামে ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মিলাতের উপর। যদিও এদের জীবন কেটেছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আদর্শের বিরোধী রূপে। এই হাস্যকর মানসিকতা, স্ববিরোধীতা ও আত্মবঞ্চনার অবসান কবে হবে?

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, “আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ”।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আদর্শের শ্রেষ্ঠ যুক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর। আমাদের চেয়ে উত্তম আদর্শ আর হতে পারে না। তাঁর আদর্শ বাদ দিয়ে যারা আমাদের আদর্শের উম্মদের আদর্শ বা অন্য জাতির আদর্শ ও রীতি-নীতি অনুসরণ করতে চায় তার চেয়ে বোকা আর হতভাগা আর কেউ হতে পারে না।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন এমন একজন অনন্য সাধারণ মহাপুরুষ যাঁর পবিত্র শরীর মোবারকে কখনো দুর্গন্ধ হতো না, সর্বদা সুগন্ধিত থাকতো। কেউ তাঁর (সাঃ) পবিত্র হাতের সাথে হাত মেলালে (করমর্দন করলে) সারা দিন তার হাত সুগন্ধিত থাকতো। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর গায়ে ঘাম মোবারক ছিল মুক্তোর দানার মত উজ্জ্বল ও সুত্র সুরভিত। অনেক সাহাবী তাঁর গায়ের ঘাম সংগ্রহ করে রাখতেন এবং সুগন্ধি (perfume) হিসেবে ব্যবহার করতেন। তাঁর পায়খানা প্রস্রাবও দুর্গন্ধি থাকতো না এবং মাটিতে পড়লে মাটি তা গ্রাস করে নিত।

প্রথম রাতে পথ চলতে থাকলে মেঘেরা এসে তাঁকে ছায়া দিয়ে চলতো। কখনো ফেরেশতা এসে ছায়া দিতো। গাছের শাখা ঝুঁকে এসে তাঁকে অভিবাদন জানাতো। যে পথ দিয়ে তিনি চলে যেতেন সে পথ দিয়ে অন্য লোকেরা চলতে গিয়ে বুঝতে পারতো যে, এ পথ দিয়ে নবীজী (সঃ) চলে গেছেন। সে পথের বাতাস স্নিগ্ধ সুরভিত যেত। নবীজীর (সঃ) শরীর মোবারকে কখনো মাছি বসতো না।

ডঃ কার্লীন মুহম্মদ বলেন, “মানব ইতিহাসে সবচেয়ে প্রগতি ও প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্ব এবং এক এক জন এক এক দিকে চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন করেছেন। প্রত্যেকের জীবনে একটি আদর্শের প্রতিফলন দেখা যায়। কেউ ছিলেন দয়ার সাগর, কেউ অমিত তেজ বীর, কেউবা রাজনীতিবিদ, আর কেউ চিন্তা প্রবণ, কেউ সরলতার প্রতীক, আবার কেউবা কঠোর রূঢ় বিনয়ী। মহানবী সক্রেটিস, এরিস্টটল প্রমুখ ছিলেন দার্শনিক। মহামতি আলেকজান্ডার, নেপোলিয়ান এরা ছিলেন বীর। এ যুগে এসে পাই মাও সে তুঙ, মোহেন লাল করমচাঁদ গান্ধীকে, আরো পাই লেলিন, স্টালিন, মার্ক্স এমনকি বার্ট্রান্ড রাসেল, বার্নাড শ’ সবাই যে যার ক্ষেত্রে প্রতিভার স্মরণ ঘটিয়েছেন। কিন্তু মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) -এর চরিত্রের সকল গুণের একত্রে সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি মানবীয় সকল গুণের উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন। সমগ্র মানুষের (Mankind as a whole) সম্পূর্ণ মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধনই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। তাঁর চরিত্রের বিভিন্ন রশ্মিরাজি চারদিকে বিকশিত হয়েছিল।

মহানবী (সাঃ) ছিলেন আদর্শ মানব। জীবনের সকল সময়ে সকল মানুষের জন্য তিনি সকল অবস্থায় আদর্শ হতে পারেন। অনাথ-ইয়াতীমদের আদর্শ আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ (সঃ)-এর শৈশব মাতৃস্নেহে বঞ্চিত থাকা, তায়েরা জায়গীরদারী ধারী হালিমা সাদিয়ার ঘরে বালক মুহাম্মদ। ধনীঘরের আদর্শ সকল ব্যবসায়ী আর বয়কোলে বাহরাইনের মালিক মুহাম্মদ (সাঃ) -এর জীবন; সর্বহারা নির্যাতিতদের আদর্শ আবু তালিবের প্রিয় ভাই নির্যাতিতদের জন্য বন্দী মুহাম্মদ (সঃ)। বিজয়ী বীরের আদর্শ বদর ও হুনায়নের সেনাপতি মুহাম্মদ (সঃ)। বিজিতদের আদর্শ ওযুদ্ধে যুদ্ধ মুহাম্মদ (সঃ)।

শিক্ষকের আদর্শ মদীনার মসজিদ আর আহলে সুফফার শিক্ষক বছরের জীবন। ছাত্রের আদর্শ কেহী ওযায় জিব্রাইলের নিকট শিক্ষার্থী সাদক; আদর্শ স্বামীর দশ বছর মদীনার মসজিদে গৃহী দান ও আত্মাত মদীনায় হৃদয়ের ভজেন্দের দানরত মুহাম্মদ (সাঃ)। আল্লাহর পথে সহায় সম্বলহীন সংগ্রাম ও সাধনারত মহামানবের আদর্শ মক্কায় ঘেরা নবীজীবন। পরাজিত দুশমনের প্রতি বিজয়ী বীরের আদর্শ মক্কা বিজয়ী মুহাম্মদ (সাঃ)।

আদর্শ সাংসারিক মহানমানব খায়বার, খন্দক, বনি নাজিরার গোত্রের উৎপীড়ন মালিক মুহাম্মদ (সাঃ)। আমরা মক্কা সেলেক তরত মুহাম্মদ আমি আল্লাহর বরণীয় জীবনী সারা বিশ্বের যুগ সমাজের আদর্শ। ব্যবসায়ী পণ্য কাঁধে কুরাইশ কাফেলার সাথী, সিরিয়াগামী সওদাগর মুহাম্মদ (সঃ)। কর্মী ব্যবসায়ী ও তরুণ সমাজের সম্মুখে আদর্শের আলোক স্তম্ভ।

মহানবী (সঃ) এর চরিত্রের আরো একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, প্রত্যেক মনুষ্যত্বের কর্মজীবন সংকীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ। আর মহানবী (সঃ) এর কর্ম মানবজীবনের সর্ব ক্ষেত্রে প্রসারিত। সংগ্রামী জয় এবং পাপ ও কুসংস্কার থেকে রক্ষা করা যদি মুহাম্মদপুরের লক্ষণ হয়, তবে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর জুড়ি এ পৃথিবীতে কোথাও পাওয়া যাবেনা”।

📘 Mojeja > 📄 নূহের (আঃ) নৌকা সংরক্ষিত থাকবে

📄 নূহের (আঃ) নৌকা সংরক্ষিত থাকবে


পবিত্র কুরআনের সূরা কামারের ১৫ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আমি নুহের আয়োজন করলাম কাষ্ঠ ও পেরেক দ্বারা নির্মিত এক জলযানে- যা চলতো আমার দৃষ্টির সামনে। এটা তার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ ছিল যাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। আমি একে এক নিদর্শন স্বরূপ রেখে দিয়েছি। অতএব কোন চিন্তাশীল আছে কি?” পথভ্রষ্ট মানুষদেরকে সাবধান করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পূর্ববর্তকালের অনেকগুলো নিদর্শন মানুষের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন। এসব নিদর্শন দেখলে মানুষের ঈমানের সংযোগ হয় এবং আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের চিন্তা জাগরুক হয়। ফেরাউনের মৃতদেহ এবং নূহ (আঃ) এর নৌকা এই নিদর্শনগুলোর অন্যতম।

হযরত নূহ (আঃ)ছিলেন আল্লাহর নবীদের একজন। তিনি প্রথম পুরুষ হযরত আদম (আঃ) এর ১০ম তম অধঃস্তন পুরুষ। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে তিনি ইরাকে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর জীবন কাল ছিল প্রায় সাড়ে নয়শত বছর। এই সুদীর্ঘ জীবন কালে তিনি বর্তমান ইরাকের দাজলা ও ফোরাত নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় আল্লাহর দ্বীন প্রচার ব্যাপৃত ছিলেন। সুদীর্ঘ কাল ধরে দিবারাত্র নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও খুব বেশি লোককে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারেন নি। মাত্র ৪০ জন লোক ছাড়া আর কেউ তাঁর দ্বীন গ্রহণ করেনি।

তারা যে শুধু তাঁর দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল তাই নয় বরং তাঁর দ্বীন প্রচারের বিরুদ্ধে সবরকমের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তারা হযরত নূহ (আঃ) এর উপর নির্যাতন করতে করতে তাকে অজ্ঞান করে ফেলত। অবশেষে হযরত নূহ (আঃ) দেখলেন যে, আমার আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আর কোন আশা নেই তখন তিনি এদেরকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দুয়া করলেন।

(নূহ) বললেন, হে আমার রব, আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবারাত্র দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু আমার দাওয়াত তাদের পলায়নকেই বৃদ্ধি করেছে। আমি যতবারই তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি - যাতে আপনি তাদের ক্ষমা করেন ততবারই তারা কানে আঙ্গুল দিয়েছে। মুখমণ্ডল ঢেকেছে, অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছে”--------- নূহ আরও বলেন, হে আমার রব, আপনি কোন কাফের গৃহবাসীকে রেহাই দেবেন না। যদি রেহাই দেন তবে তারা আপনার বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল পাপাচারী কাফের” (সূরা নূহ)।

আল্লাহ তায়ালা দুয়া কবুল করলেন এবং মহাপ্লাবন দ্বারা তাদেরকে ধ্বংস করার জন্য যে জানতেন দিলেন। তিনি তাঁর নবীকে একটি নৌকা তৈরী করার জন্য নির্দেশ দিলেন। আল্লাহর নির্দেশে এবং হযরত জিবরীল (আঃ) এর প্রত্যক্ষ তত্ত্ববধানে একটি বিশাল নৌকা তৈরী করলেন। এই নৌকাতে হযরত নূহ (আঃ) হলেন পৃথিবীর প্রথম জ্ঞানবাহনের আবিষ্কারক। তেমনি ভাবে হযরত আদম (আঃ) হলেন পৃথিবীর প্রথম উড্ডয়ন তথা গাড়ির চাকার আবিষ্কারক। কালের পরিক্রমায় হযরতের অনেক উন্নত ও উৎকর্ষ সাধন হলেও এই চাকার গুরুত্ব কমেনি বা এর বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। আজও গড়ের গাড়ি থেকে শুরু করে কোটি টাকার অত্যাধুনিক গাড়ির ভিত্তি হল আদম (আঃ) এর আবিষ্কৃত চাকা।

যাহোক, হযরত নূহ (আঃ) আবিষ্কৃত যে নৌকাটিই আমাদের আলোচ্য নিদর্শন যা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পরবর্তীদের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন বলে পবিত্র কুরআনের উল্লেখিত আয়াতে বর্ণনা করেছেন।

হযরত নূহ (আঃ) কাফেরদেরকে মহাপ্লাবনের কথা জানালেন। কাফেররা মেলেই এ কথা বিশ্বাস করল না। তারা নৌকাটিকে ঠাট্টা উপহাস করতে করতে লাগল। তারা ঠাট্টা পরিহাসে এমন পরাধীন দেখালো যে, সবাই এসে নৌকার মধ্যে বাহ্যক্রিয়া সম্পাদন করলো। কিন্তু দিনের মধ্যে বিশাল নৌকাটি মানুষের বিষ্ঠায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল।

আরব্য বেশকিছু দেখে হযরত নূহ (আঃ) প্রমাণ পেলেন। আল্লাহর নবী আগ্রহর কাছে সকরুণ প্ররথনা করলেন। এমনিতেই তাদের দ্বীনের প্রতি আগ্রহ নেই তা ওপর দ্বারা মহা সুযোগ পেয়ে গেল।

সুবহানাল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে কাফেরদের কাছে এ ভাবে অপদস্থ হতে দিতে পারেন। আল্লাহ তায়ালা মুশরিকীন। তিনি সহজেই এই মহা সমস্যার সমাধান করে দিলেন।

কাফেররা যখন নূহ (আঃ) এর নৌকা তারোহীরা সমালোচনা করতে লাগলো তখন দূর দূরান্তে এর খবর ছড়িয়ে পড়ল। একদিন এক বৃদ্ধ মহিলা লাগানোর এই আগ্রহে এই কাছে এসে অনেক অনুরোধ সাহায্য কামনা করল। লোকদের সহযোগিতায় বৃদ্ধা যখন যুবতী হয়ে গেল সে তার মেদের কাছে নিয়ে গেল। হাত ফসকে পড়ে গিয়ে বৃদ্ধা যখন নৌকা থেকে টুপ করে ডুবে গেল। তার ছেলেরা যখন তাকে তাড়াতাড়ি করে টেনে তুলল, তখন দেখা গেল এক অলৌকিক ব্যাপার। বয়োবৃদ্ধা মহিলা এক সুন্দরী তরুণী-তবতিতে পরিণত হয়ে গেছে। বিশাল দুর্গন্ধের পরিবর্তে তার দেহ স্বর্গীয় লাবন্য ও সৌন্দর্য-সুধা-সুবাসে সুরভিত পরিপূর্ণ। পরবর্তীতে সমগ্র নৌকায় রূপী হল মানুষের মনোবাসনা পূরণের এক মহাযজ্ঞ। যে কেউ যে আশায় নৌকা লাগায় সেই আশাই পূর্ণ হয়। বুন্ধা যুবতী হয়, কালোরা ফর্সা হয়, দুরাযোগ্য ব্যাধি ভালো হয়, কুষ্ঠরোগ নিরাময় হয়, অন্ধরা দৃষ্টি ফিরে পায়। চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়লো। সে এক এলাহি কাণ্ড। দূর দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে এসে এই মহাযজ্ঞে সংগ্রহ করতে লাগল। মানুষের প্রতিযোগিতা যারা প্রথমে পড়ে গিয়েছিল তারা এসে দেখল সব শেষ। তারা নৌকা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে পরিষ্কার করে সেই পানি নিয়ে গেল। এদিকে নৌকা আবার পূর্বের অবস্থা ফিরে পেল।

তারপর একদিন শুরু হল সেই প্রতিশ্রুত মহাপ্রলয়। নূহ (আঃ) ৮০ জন ঈমানদার নারীপুরুষ এবং প্রত্যেক প্রাণীর প্রত্যেক প্রাণী থেকে এক জোড়া নিয়ে নৌকায় আরোহন করলেন। ছাউনি হামাস প্রবল বন্যা, বারি বর্ষণ, জলচ্ছ্বাসে আর বড় ভূকম্পনে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেল। সারা পৃথিবী প্লাবিত হয়ে ডুবে গেল। কেবলমাত্র নৌকার আরোহীগণ ছাড়া আর কোন জীব জীবিত থাকলো না। নৌকায় আরোহী মাত্র ৮০ জন মানুষ থেকেই পরবর্তীকালে পৃথিবীর আবার মানুষের বিস্তার ঘটেছিল।

নূহ (আঃ) এর নৌকাটি তৈরি হয়েছিল একলক্ষ ১৪ হাজার তক্তা দিয়ে। প্রত্যেকটি তক্তার একজন নবীর নাম লেখা ছিল। তিনতলা বিশিষ্ট নৌকাটির দৈর্ঘ্য ছিল ১২০০ হাত, প্রস্থ ছিল ৬০০ হাত।

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩২ সালে বর্তমান ইরাকের উড় শহর থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে মক্কা গিয়ে এই একে একে সত্তর পৃথিবী পানির নীচে তলিয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর প্লাবন শেষে নৌকাটি জুদী পাহাড়ে গিয়ে থামে। এই জুদী পাহাড় আজও হযরত নূহ (আঃ) ও তার সময়কালের মহাপ্রলয়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ পাহাড়টি ৩৮০০ ফুট উঁচু এবং আরমেণীয় আরারাত পর্বতমালার অন্তর্ভুক্ত। পাহাড়টি তুরস্ক ও আরমেণীয়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত।

এই প্লাবন ও নৌকা প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “সে নৌকা নির্মাণ করতে লাগল এবং যখনই তার সম্প্রদায়ের প্রধানেরা তার নিকট দিয়ে যেত, তাহাতে উপহাস করত; সে বলিত, তোমরা যদি আমাকে উপহাস কর তাহলে আমরাও তোমাদেরকে উপহাস করব, যেমন তোমরা উপহাস করছ;

এবং তোমরা অচিরেই জানিতে পারিবে, কাহার উপর আসিবে লাঞ্ছনোদায়ক শাস্তি আর কাহার উপর আপতিত হইবে চিরস্থায়ী শাস্তি।

অবশেষে যখন আমার আদেশ আসিল এবং উনান উথলিয়া উঠিল, আমি বলিলাম, ইহাতে উঠাইয়া লও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগল, যাহাদিগের বিরুদ্ধে পূর্ব-সিদ্ধান্ত হইয়াছে, তাহারা ব্যতীত তোমার পরিবার পরিজনকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে। তাহার সঙ্গে ঈমান আনিয়াছিল অল্প কয়েক জন।’

সে বলিল, ইহাতে আরোহণ কর, আল্লাহর নামে ইহার গতি ও স্থিতি, আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ পর্বত-প্রমাণ তরঙ্গ মধ্যে ইহা তাহাদিগকে লইয়া বহিয়া চলিল; নূহ তাহার পুত্র, যে উহাদিগের হইতে পৃথক ছিল, তাহাকে আহ্বান করিয়া বলিল, হে আমার পুত্র! আমাদিগের সঙ্গে আরোহণ কর এবং কাফিরদিগের সঙ্গী হইও না।’

সে বলিল, আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় লইব যাহা আমাকে প্লাবন হইতে রক্ষা করিবে।’ সে (নূহ) বলিল, আজ আল্লাহর বিধান হইতে রক্ষা করিবার কেহ নাই, যাহাকে আল্লাহ দয়া করিবেন, সে ব্যতীত।’ ইহার পর তরঙ্গ উহাদিগকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিল এবং সে নিমজ্জিতদিগের অন্তর্ভুক্ত হইল।

ইহার পর বলা হইল, হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গ্রাস করিয়া লও এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও।’ ইহার পর বন্যা প্রশমিত হইল এবং কার্য সমাপ্ত হইল। নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হইল এবং বলা হইল, জালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হউক। ( সূরা হুদঃ ৩৮-৪৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00